📄 বায়তুল মুকাদ্দাসে ওমর রা.
ওমর (রা)-এর খেলাফাতে আল্লাহ্র সাহায্যে মুসলমানগণ বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয় করেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের অধিবাসীরা আমীরুল মুমিনীন ওমর (রা)-এর ব্যতীত অন্য কারো হাতে বায়তুল মুকাদ্দাসের চাবি অর্পণ করতে অস্বীকার করল।
ওমর (রা) একটি উটের ওপর আরোহণ করলেন। তার সাথে তাঁর গোলাম আসলামও ছিল। তখন তিনি তাঁর গোলামকে বললেন, আমরা আহবোয়াবে ভাগ করে নিব। কিছু পথ আমি আরোহণ করব আর কিছু পথ তুমি আরোহণ করবে।
কথা অনুযায়ী তারা পথ চলতে লাগলেন। কিন্তু ওমর (রা) উটের ওপর আরোহণ করেছেন আর কিছু সময় তাঁর গোলাম আরোহণ করেছে। যখন তাঁরা বায়তুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী হলেন তখন ওমর (রা)-এর হাঁটার পালা ছিল।
তাঁর গোলামটি উট থেকে নেমে যেতে চাইল, কিন্তু তিনি তাকে নামতে দিলেন না।
এবং এদিকে পথে কাঁদা ছিল। যার কারণে তিনি কাপড় উঠিয়ে চলছিলেন। তারা যখন বায়তুল মুকাদ্দাসে গিয়ে পৌঁছলেন তখন তাঁর পায়ে কাঁদা লেগে ছিল। তাঁর গোলাম উটে আরোহী ছিল আর তিনি উটের রশি ধরে ধরে গিয়ে যাচ্ছিলেন। এ দৃশ্য দেখে সেখানে উপস্থিত মুসলমানগণ হতভম্ব হয়ে গেল। এ দিকে বায়তুল মুকাদ্দাসের অধিবাসীরা চিৎকার দিয়ে বলল, এই হচ্ছে ওমর, তাঁর পায়ে কাঁদা লেগে আছে!
মুসলমানগণ তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, তোমরা তাঁকে কীভাবে চিনলে? তারা বলল, এভাবে আমরা আমাদের ধর্মীয় কিতাবে পেয়েছি। তখন তারা ওমর (রা.)-এর হাতে চাবি অর্পণ করল।
তখন ওমর (রা.) বললেন, আমরা এমন জাতি যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ইসলাম দ্বারা সম্মানিত করেছেন, সুতরাং আমরা যদি ইসলাম ব্যতীত অন্যকিছুতে সম্মান খুঁজতে যাই তবে আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে অপমানিত করবেন।
এরপর তিনি তাদের গির্জায় প্রবেশ করলেন। ঠিক সময়ে নামাজের সময় হলে তিনি গির্জার ভেতরে নামাজ পড়তে অস্বীকার করেন। তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, যতক্ষণ না মুসলমানগণ তা গ্রহণ করবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি সেখানে নামাজ পড়ব না। তারপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসের পাথরের কাছে গেল। যে পাথরের থেকে রাসুল (সা.) মিরাজের সফর শুরু করেছেন। ওমর (রা.) সে পাথরটিকে নিজের কাপড় দ্বারা পরিষ্কার করলেন এবং সেটিকে স্বচ্ছ সাদা করে দিলেন। ............. হে আল্লাহ আমাদেরকে বায়তুল মুকাদ্দাস আবার ফিরিয়ে দাও এবং বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইহুদিদের থেকে পবিত্র করে দাও।”
টিকাঃ
৭ বুখারীর রাফিশীন লাল আওকাল।
📄 কিয়ামতের দিন কী তুমি আমার বোঝা বহন করবে?
আমরা এ ঘটনা থেকে জানতে পারব ওমর (রা.) দুর্বলদের প্রতি কতটা দয়া করতেন এবং ক্ষুধার্থদেরকে কীভাবে খেতে দিতেন।
আসলাম নামে তার একজন দাস আছে, এক রাতে তিনি তাকে নিয়ে বের হলেন। এটা ওমর (রা.)-এর স্বভাব ছিল তিনি রাতের বেলা ঘুরে ঘুরে প্রজাদের অবস্থা দেখতেন। যাচেকেরাও তিনি ক্ষুধার্থ ও অভাবীদের অবস্থা দেখতে পান। তেমনই সে রাতে তিনি চলতে চলতে দূরে এক জায়গায় আগুন জ্বলছে। সেখানে বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ শুনা যাচ্ছে। তিনি গিয়ে দেখলেন এক মহিলা চুলার উপর একটি পাত্রে তাপ দিচ্ছে। যে পাত্রে পানি আর পাথর ছিল। সে মহিলার পাশেই বাচ্চারা বসে বসে কাঁদছে।
ওমর (রা.) তাদের একটু দূরে থাকতেই বললেন, আসসালামু আলাইকুম হে আলো অধিবাসীরা। এটা ওমর (রা.)-এর স্বভাব ছিল তিনি কোনো আগুন প্রজ্জ্বলনকারীদেরকে তাদের অধিবাসী বলে সম্বোধন করতেন না। মহিলাটি তাঁর সালামের উত্তর দিল।
তারপর তিনি বললেন, আমরা কি কাছে আসতে পারি? মহিলা বলল, কল্যাণের সাথে আসুন। তিনি বললেন, তোমাদের কি হয়েছে? মহিলা বলল, আমাদের ঘরে এমন কিছুই নেই যা দ্বারা আমরা রাতের শীত নিবারণ করব। তিনি বললেন, এ বাচ্চাদের কি হয়েছে তারা কাঁদছে কেন? মহিলা বলল, তারা ক্ষুধার্থ। তিনি বললেন, এ পাত্রে কী? মহিলাটি ওমর (রা.)-কে চিনত না, তাই সে বলল, এতে পাথর, আমি তা রেখেছি এদেরকে শান্ত রাখতে যাতেকরে তারা এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। আমাদের মাঝে আর ওদেরর মাঝে আল্লাহ তা'আলা আছেন!
তিনি বললেন, আল্লাহ তোমাকে রহম করুন, তুমি ওমর সম্পর্কে কি জান? মহিলা বলল, সে আমাদের দায়িত্ব পেয়ে আমাদের ব্যাপারে গাফেল হয়ে আছে। মহিলায় এ কথাটি ওমর (রা.)-এর অন্তরে গিয়ে আঘাত করল। তিনি তাঁর গোলাম আসলামকে নিয়ে দ্রুত বায়তুল মালে গিয়ে এক পাত্র আটা ও কিছু তেল নিলেন। তিনি তাঁর গোলামকে বললেন, আমার পিঠে উঠিয়ে দাও ও সে বলল, না; বরং আমি বহন করে নিব।
তখন তিনি তাকে বললেন, কিয়ামতের দিন কি তুমি আমার ওনার বহন করবে? তারপর তিনি ওই আটা ও তেল নিজে বহন করে মহিলার বাড়িতে দিয়ে আসলেন।
তিনি তাকে বললেন, তুমি রুটি বানাও, আমি তা পাত্রে উঠিয়ে দিচ্ছি। ওমর (রা.) লম্বা দাড়ি অধিকারী ছিলেন। তাই ধোঁয়া তাঁর দাড়ি স্পর্ষ করছিল। তারপরও তিনি তাপ দিচ্ছিলেন আর রুটি উঠিয়ে দিচ্ছিলেন। রুটি হওয়ার পর তা বাচ্চাদেরকে খেতে দেওয়া হলো। বাচ্চারা তা খেয়ে পরিতৃপ্ত হলো। এমনকি তারা খুশি হয়ে হাসতে লাগল। এরপর বাচ্চাতোলা ঘুমিয়ে গেল।
তখন মহিলা বলল, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন, আল্লাহর শপথ! ওমরের থেকেও তুমি খেলাফতের অধিক উপযুক্ত। তখন ওমর (রা.) বললেন, তুমি যখন আমীরুল মুমিনীনর কাছে যাবে তখন সেখানে আমাকে পাবে। এটা বললেন, যাতে করে সে আমীরুল মুমিনীনর কাছে যেতে ভয় না করে। বাচ্চাদেরকে হাসিখুশি না দেখে তিনি যেতে চাননি। এরপর তিনি তাঁর গোলাম আসলামকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আসলাম! ক্ষুধায় তাদেরকে কাঁদিয়েছে, আর তাই আমি তাদেরকে হাসিখুশি না দেখে ফিরে আসতে চাহিনি。
টিকাঃ
১৪
২ মুন্তাওয়ারু কানফীল উয়াহ, ৪র্থ খণ্ড, ৪১০ পৃ.
📄 ওমর রা. ও তাঁর ভাইয়ের খুনি
ওমর (রা.) তাঁর ভাই যায়েদকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, তিনি আমার আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং আমার আগেই শাহাদাত বরণ করেছেন।
আল্লাহ তা’আলা তাঁর ওপর রহম করুন, তিনি একজন কোরআনে হাফেজ ছিলেন। ইমায়ামার যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি সে যুদ্ধেই শহীদ হয়েছেন। ওমর (রা.) তাঁর খুনিকে চিনতেন। পরে যায়েদ (রা.)-এর হত্যাকারী লোকটি তাওবা করে ইসলাম গ্রহণ করেছে, কিন্তু যখনই ওমর (রা.) ঐ লোকটিকে দেখতেন তিনি মুখ ফিরিয়ে নিতেন, আমি তোমাকে দেখতে পছন্দ করি না, কেননা তুমি আমার ভাইকে হত্যা করেছ।
তখন লোকটি বলল, এ কারণে কি আমি আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত হব? তিনি বললেন, না। এভাবেই ওমর (রা.) শত্রুদের অধিকারও আদায় করে দিতেন。
টিকাঃ
১৩ বুখারীর রাফিশীন লাল আওফাল।
📄 চন্দ্রের সাথে বিচারক
হযরত ওমর (রা.)-এর কাছে এক লোক আসল। তিনি লোকটিকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিলেন, কিন্তু লোকটি আবার তাঁর নিকট এসে বলল, আমীরুল মুমিনীন, আমি স্বপ্নে দেখেছি সূর্য আর চন্দ্র যুদ্ধ করছে।
তখন ওমর (রা.) বললেন, তুমি কার পক্ষে যুদ্ধ করেছ? লোকটি বলল, আমি চাঁদের পক্ষ নিয়ে সূর্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি।
ওমর (রা.) বললেন, আমি তোমাকে বিচারকের পদ থেকে বরখাস্ত করলাম। এরপর লোকটি চলে যেতে লাগল তখন সে জানাল না কি কারণে তাকে বরখাস্ত করা হলো, কিন্তু ওমর (রা.) জানতেন যে, আল্লাহর হুকুমে চন্দ্র সূর্য থেকে আলো নিয়ে তা ছাড়িয়ে দেয়। এ কারণে সূর্যের অধিকার চন্দ্র থেকে বেশি। সূর্য চন্দ্র থেকে অধিক শক্তিশালী। এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা হয়েছে অচিরেই একটি যুদ্ধ হবে, সে যুদ্ধে এ লোকটি বাতিলের পক্ষ হয়ে সত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিবে। তা হয়েও ছিল। ওমর (রা.)-এর ইন্তিকালের পর সত্যপন্থী ও বাতিল পন্থীর মাঝে যুদ্ধ হয়েছিল। তখন সে লোকটি বাতিল পন্থীদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করেছে。
টিকাঃ
১৪ বুখারীর রাফিশীন লাল আওফাল।