📄 দুগ্ধপোষ্য বালক ও চার মহিলা
এক মহিলা উটে আরোহণ করে ওমর (রা)-এর কাছে আসল। তার বয়স এখনো চল্লিশে পৌঁছায়নি। তার চেহারায় চিন্তার রেখা ফুটে উঠেছে। সে ধীর পায়ে ওমর (রা)-এর কাছে এসে নিচু আওয়াজে বলল, আমি দুগ্ধপোষ্যা একটি সন্তান পেয়েছি। তার পাশে এক টুকরো কাপড় ছিল। যার ভেতরে একশত দিনার ছিল। তখন আমি তাকে তুলে নিলাম এবং তার জন্যে একজন দুধ মাতা ভাড়া করলাম। এরই মধ্যে চারজন মহিলা এসে তাকে চুমু দিতে লাগল অথচ আমি জানি না তার মা কোন্জন।
তখন ওমর (রা) মহিলাটিকে বললেন, তারা আবার আসলে তুমি আমাকে জানাইও। এ কথা বলার পর মহিলাটি চলে গেল। পরে যখন ওই চার মহিলা আবার আসল তখন মহিলাটি ওমর (রা)-কে ডেকে পাঠালেন।
ওমর (রা) তাদের কাছে এসে বললেন, তোমাদের মধ্যে কে এ বাচ্চার মা?
তখন ওই চার মহিলার একজন বলল, আল্লাহ্র শপথ! আপনি ভালো করেননি, ঠিকও করেননি। আল্লাহ্ তা'আলা এক মহিলার ব্যাপারটি গোপন রেখেছেন আর আপনি তা প্রকাশ করে দিতে চাচ্ছেন।
তার এমন কথায় লজ্জিত হয়ে ওমর (রা) বললেন, তুমি সত্য বলেছ। এরপর তিনি তাকে ডেকে দেওয়া মহিলাকে বললেন, যখন এ চার মহিলা আসবে তখন তুমি তাদেরকে কিছুই জিজ্ঞেস করবে না; বরং তাদের এ বাচ্চাকে ভালোভাবে দেখাশোনা কর。
টিকাঃ
১০২ কানযুল উম্মাল, ১৬তম খণ্ড, ২৩০, ২৩১ হাদিস নং ৪০৬৬৫।
📄 দুনিয়াবিরাগী আমীর
হিমসবাসীদের জন্যে যে আমীরই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তারা তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ করেছে। আর তাই ওমর (রা) হিমসবাসীর জন্যে একজন যোগ্য আমীর খুঁজতে লাগলেন। অবশেষে পেয়েও গেলেন। তিনি তাদের আমীর হিসেবে উমায়ের (রা)-কে নিযুক্ত করলেন।
উমায়ের (রা) হিমসে একটি বছর শাসন করলেন। তাঁর শাসন আমলে তাঁর বিরুদ্ধে খলিফার কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি।
কিন্তু তিনি এ এক বছরে বায়তুল মালে একটি দিনারও গ্রহণ করেননি। আর এ কারণে হযরত ওমর (রা)-এর মনে সন্দেহ জাগতে লাগল। তিনি ভয় করলেন যে, তাঁর গভর্নরকে না জানি শয়তানের লোভ পেয়ে বসল। তিনি রাসূল (সা) ব্যতীত অন্য কাউকে এ লোভ থেকে মুক্ত মনে করতেন না।
তিনি কাতেব (লেখক)-কে নির্দেশ দেন- তুমি উমায়ের বিন সাদকে চিঠি লিখে বল যে খলিফার চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে তাঁর কাছে এসে হাজির হয় এবং সাথে করে মুসলমানদের থেকে আদায়কৃত সকল ফাই (এক প্রকারের কর) নিয়ে আসে।
উমায়ের (রা) খলিফার চিঠি পাওয়ার পর মদিনার উদ্দেশে রওনা হলেন। তিনি সাথে করে তাঁর সফরের সামান্য পাথেয় নিলেন। তিনি কাঁধে তাঁর পানপাত্র ও অজুর পাত্রটি নিলেন এবং হাতে বর্শাটি নিলেন। এরপর তিনি হিমস নগরী ত্যাগ করে মদিনার দিকে রওনা হন।
দীর্ঘ সফরের কারণে তাঁর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে এবং তাঁর চুল অনেক লম্বা হয়ে গেছে। তাঁর শরীরে সফরের ক্লান্তি চলে এসেছে।
উমায়ের (রা) খলিফার কাছে আসলেন। ওমর (রা) তাঁর অবস্থা দেখে অবাক হয়ে বললেন, উমায়ের তোমার এ অবস্থা কেন?
তিনি বললেন, আমীরুল মুমিনীন আল্লাহ্ই কিছুই হারামি আমি সুস্থ আছি। আমি আমার সাথে দুনিয়াকে পুরোপুরিভাবে নিয়ে এসেছি।
ওমর (রা) বললেন, তোমার সাথে কি পরিমাণ দুনিয়া (অর্থকড়ি) আছে? ওমর (রা) ধারণা করেছেন তিনি বায়তুল মাল নিয়ে এসেছেন।
তিনি বললেন, আমার সাথে আমার থলেটি আছে, এর মধ্যে আমি আমার পাথেয় রেখেছি। আর আমার সাথে আমার একটি পাত্র আছে যার মধ্যে খাদ্য রেখে খাই এবং গোসল ও কাপড় ধোয়ার সময় তা ব্যবহার করি। আর আমার কাছে আমার অযু করার পাত্রটি আছে। এ হচ্ছে আমার দুনিয়া। এর অতিরিক্ত কিছুই আমার প্রয়োজন নেই এবং অন্য কারোরও প্রয়োজন নেই。
টিকাঃ
১০৩ সওয়াক্বুম মিল হায়াতিস সাহাবা, ২য় খণ্ড।
📄 মদ্যপানকারী ও আবু মূসা রা.
ওমর (রা) এক আরোহীকে আহবান করে জমিনে ঘুরছিলেন। তখন তিনি বললেন, আমি দেখছি এ লোক আমাদেরকে ডুবোতাক দেখাচ্ছে। তখন লোকটি কাঁদতে কাঁদতে তাঁর কাছে আসল।
ওমর (রা) তাকে বললেন, তোমার কি হয়েছে? তুমি যদি সুখী হয়ে থাক তবে আমি তোমার ঋণ শোধ করে দিব, যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগ থাক তবে আমি তোমাকে নিরাপত্তা দিব যদি না তুমি কাউকে হত্যা করে থাক। আর যদি তুমি কোনো জাতির সাথে থাকতে অপছন্দ কর তবে আমি তোমাকে অন্য জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করে দিব।
তখন লোকটি বলল, আমি মদপান করেছিলাম। আমি বনু তামিমের একজন। আর মুসা আমাকে মদ খাওয়াও শাস্তি দিয়েছে। এরপর সে আমার চেহারা কালো করে মানুষের সামনে ঘুরিয়েছে এবং তাদেরকে বলেছে, তোমরা তার সাথে বসবে না, তার সাথে খাবে না।
আমাকে নিয়ে সে এমন করার কারণে আমার মনে তিনটি চিন্তা আছে, হয় আমি তরবারি নিয়ে তাকে হত্যা করব। অথবা, আমি আপনার কাছে আসব আর আপনি আমাকে সিরিয়ায় পাঠিয়ে দিবেন, কেননা তারা আমাকে চেনে না। অথবা, আমি শত্রুদের সাথে মিলিত হয়ে মদ খাব।
ওমর (রা) বললেন, তুমি এমন খেটে করেছ তা আমাকে খুশি করেনি। আমিও ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মদ খেয়েছি। মদ খাওয়া তো জিনা করার মতো নয়। তারপর তিনি আবু মূসা (রা)-এর কাছে লিখে বললেন, আমি যদি সেখানে আসি তবে তোমার চেহারা কালো করে মানুষের সামনে ঘুরাব। যদি তুমি জানতে চাও পর আমি কি বলব, তবে মানুষকে তার সাথে বসার ও খাওয়ার নির্দেশ দাও। যদি এ লোক তাওবা করে তবে তার সাক্ষাতও গ্রহণ করবে।
এরপর ওমর (রা) সে লোকটিকে যাওয়ার জন্যে বাহনের ব্যবস্থা করে দিলেন। সাথে দুই শত দিরহাম দিলেন。
টিকাঃ
১০৪ কানযুল উম্মাল, ১৫তম খণ্ড, ৭৬ পৃ.
📄 দুধ বিক্রয়কারিনী কন্যা
রাত ঘনিয়ে এসেছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসে। এদিকে হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা) তাঁর গোলাম আসলামকে নিয়ে প্রজাসাধারণের খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য বেশ করে ঘুরতে লাগলেন। তিনি চলতে লাগলেন, চলতে চলতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে গেলেন। ক্লান্তি হালকা করতে তিনি পাশের একটি দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। ঠিক সে সময় এক মহিলার কণ্ঠস্বর তাঁর কানে গিয়ে পৌঁছল।
মহিলাটি তার মেয়েকে বলছিল, হে মেয়ে! তুমি দুধের সাথে পানি মিশিয়ে দাও।
মেয়ে মাকে বলল, মা! আপনি কি বর্তমান আমীরুল মুমিনীন নির্দেশ জানেন না? তিনি তাঁর লোককে ঘোষণা দিতে বলেছেন, “দুধের সাথে যেন কেউ পানি না মিশায়।”
মা বললেন, তুমি দুধের সাথে পানি মিশিয়ে দাও। কেননা তুমি তো এমন জায়গায় আছ যেখানে ওমর বা ওমরকে তোমাকে দেখছে না।
মেয়ে বলল, মা! ওর আমাদেরকে দেখছে না, ঠিক কিন্তু ওমরের রব তো দেখছেন। আল্লাহ্র শপথ! আমীরও এমন নেই যে, প্রকাশ্যে তাঁর আনুগত্য করব আর গোপনে অবাধ্য হব।
সত্য ও ন্যায়ের মানদণ্ড ওমর (রা) এতক্ষণ যাবত মা-মেয়ের কথোপকথন শুনছেন। অতঃপর তিনি তাঁর গোলাম আসলামকে বললেন, আসলাম! এ দরজা ও জায়গা ভালোভাবে চিনে রাখ। তারপর তিনি ফিরে গেলেন।
পরের দিন সকালে ওমর (রা) আসলামকে বললেন, আসলাম! গতরাতের ওই বাড়িতে গিয়ে দেখ, কথাগুলো কে বলেছে আর কাকে বলেছে এবং তাদের কোনো অভিভাবক আছে কিনা।
আসলাম বাড়িতে গিয়ে জানতে পারলেন, গত রাতের কথাগুলো এক কুমারী মেয়ে তার মাকে বলেছিল। তাদের কোনো অভিভাবক নেই।
হযরত ওমর (রা) তাঁর সন্তানদের ডেকে একত্রিত করে বললেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি বিয়ে করতে চাও? যদি মহিলাদের কাছে যাওয়ারও শক্তি তোমাদের বাবার থাকত তবে তিনিই ঐ মেয়েকে বিয়ে করতেন।
তখন তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ্ বলল, আমার একজন স্ত্রী আছে।
তাঁর আরেক ছেলে আব্দুর রহমান বললেন, আমারও একজন স্ত্রী আছে।
তখন তাঁর ছেলে আসেম বললেন, বাবা! আমার কোনো স্ত্রী নেই, আপনি চাইলে আমাকে বিয়ে করাতে পারেন, আর তখন হযরত আসেম সেই মেয়েটিকে নিজের বউ হিসেবে গ্রহণ করেন। পরে সেই মেয়ের ঘরে উম আসেম নামে এক মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাকে আব্দুল আযীয বিন মারওয়ান বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরে হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ) জন্মগ্রহণ করেন。
টিকাঃ
১০৫ তাবাক্বাতুল কুবরা, ৫ ম খণ্ড, ৩০৫ পৃ.