📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 কিসরার মুকুট সুরাকা রা.-এর মাথায়

📄 কিসরার মুকুট সুরাকা রা.-এর মাথায়


কিসরার সুরাকা বিন মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু-এর মাথায় সুরাকা বিন মালিক আল মদলাজী 'কুদায়েন' তাঁর গোত্রের একটি মিলনমেলায় ছিলেন। তখন হঠাৎ করে কোরাইশের এক দূত এসে ঘোষণা করতে লাগল- হে মুহাম্মাদকে জীবিত বা মৃত ধরে নিয়ে আসতে পারবে তাকে একশত উট পুরস্কার দেওয়া হবে। এ পুরস্কারের কথা শুনে সুরাকা বিন মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু একত্রিত হয়ে তাঁর ঘোড়াকে দ্রুতগতিতে ছুটিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন, কিন্তু কিছুদূর না যেতেই তাঁর ঘোড়া তাঁকে নিয়ে হোঁচট খেল। এতে তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেলেন। তিনি এটিকে অশুভ লক্ষণ মনে করলেন। তিনি ঘোড়াটিকে বললেন, তোমার ধ্বংস হোক। তারপর আবার ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলেন, কিন্তু কিছুদূর না যেতেই ঘোড়া আবার তাঁকে নিয়ে হোঁচট খেল। এতে তিনি মনে মনে এটিকে অশুভ মনে করলেন এবং ফিরে যেতে চাইলেন, কিন্তু উটের লোভে তিনি ফিরে যেতে চাইলেন। হোঁচট খাওয়ার পর কিছুদূর না যেতেই তিনি রাসূল রদিয়াল্লাহু আনহু ও আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখতে পেলেন। তিনি তাঁদেরকে দেখে তাঁর ধনুক হাতে টান দিতে চাইলেন, কিন্তু তাঁর হাতগুলো জমে গেছে। ওদিকে তাঁর ঘোড়ার পা মাটিতে দেবে গেছে এবং ধোঁয়া ও ঘোড়ার চোখকে ঘিরে ফেলছে। তিনি তাঁর ঘোড়াকে সামনের দিকে হাঁকালেন, কিন্তু তিনি দেখলেন তাঁর ঘোড়া ধসালো মাটিতে দেবে গেছে। তিনি রাসূল রদিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর সাহাবী আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর দিকে তাকিয়ে হোঁচট হয়ে বললেন, এই যে, আমার সাহায্যে তোমাদের প্রভুর নিকট দোয়া কর যাতে তিনি আমার ঘোড়ার পাগুলো মুক্ত করে দেন। রাসূল রদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর জন্য দোয়া করলেন। এরপর আল্লাহ তা’আলা তাঁর ঘোড়ার পাগুলো মাটি থেকে মুক্ত করে দিলেন, কিন্তু তারপরও তাঁর লোভ দমন হয়নি। তিনি আবার তাঁর ঘোড়া সামনের দিকে হাঁকালেন। সাথে সাথে তাঁর ঘোড়ার পাজরা আগের থেকে বেশি চেপে গেছে।
তিনি আবার রাসূল ﷺ-এর নিকটে সাহায্য চেয়ে বললেন, আপনারা আমার পাথেয় ও অস্ত্র নিয়ে যান এবং আপনাদের জন্যে আল্লাহকে সাক্ষ্য রেখে আমার ওয়াদা আপনাদেরকে ধরোত। আমার পেছনে যারা ছুটে আসছে তাদেরকে আমি ফিরিয়ে দিব।
তারা দুইজন বললেন, তোমার পাথেয় ও সামগ্রীর আমাদের কোনো দরকার নেই, কিন্তু তুমি আমাদের থেকে মানুষদেরকে ফিরিয়ে দিবে।
তারপর রাসূল ﷺ তাঁর জন্য দোয়া করলেন; এতে তাঁর ঘোড়া চলতে শুরু করল। তিনি ফিরে যাওয়ার সময় তাদের ডেকে বললেন, আপনারা একটু অপেক্ষা করেন, আমি তোমাদের সাথে কথা বলব- আল্লাহ্র শপথ! আমার পক্ষ থেকে আপনাদেরকে অপছন্দনীয় কোনো কিছু আক্রমণ করবে না।
তারা বললেন, তুমি আমাদের নিকট কি চাও?
তিনি বললেন, আল্লাহ্র শপথ! হে মুহাম্মাদ, আমি জানি আপনার ধর্ম অচিরেই জয়ী হবে এবং আপনার কাজ অনেক উপরে উঠবে; সুতরাং আপনি আমাকে ওয়াদা দিন যখন আমি আপনাদের রাজ্যে আসব তখন আপনি আমাকে সম্মানিত করবেন।
রাসূল ﷺ আবু বকর رضي الله عنه-কে নির্দেশ দিলেন তাঁকে তা লিখে দিতে। হযরত আবু বকর رضي الله عنه একটি হাড্ডির গায়ে তা লিখে তাঁকে দিলেন। তিনি যখন ফিরে যাবেন তখন রাসূল ﷺ তাঁকে বললেন, হে সুরাকা! যখন তুমি কিসরার বালা দুইটি পরবে তখন তোমার কেমন লাগবে?
তিনি বিস্ময় হয়ে বললেন, কিসরা বিন হরমুজ?
রাসূল ﷺ বললেন, হ্যাঁ, কিসরা বিন হরমুজ।
এরপর দিনের পর দিন চলে যেত। ......
এরই মধ্যে মক্কা বিজয় হয়। মক্কা বিজয়ের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মদিনা চলে আসেন, কিন্তু তিনি মদিনায় আসার পর কিছু মাস না যেতেই রাসূল ﷺ তাঁর রবের নিকটে চলে গেলেন।
এরপর আবার দিনের পর দিন অতিক্রম করতে লাগল......।
তখন মুসলমানদের খলিফা ছিলেন হযরত ওমর رضي الله عنه। তাঁর শাসনামলে মুসলমানগণ পারস্যের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে প্রস্তুতি নিতে লাগলেন।
অবশেষে তাঁরা পারস্য জয় করেন এবং পারস্যের সকল ধনভাণ্ডার তাঁদের হাতে চলে আসে।
ওমর رضي الله عنه-এর খেলাফতের শেষদিকে সা'د বিন ওয়াক্কাসের দূত তাঁর নিকটে এসে বিজয়ের সুসংবাদ দেয় এবং তারা তাঁদের সাথে গণীমতেরও এক-পঞ্চমাংশ নিয়ে আসে। হযরত ওমর رضي الله عنه-এর সামনে গণীমতের মাল রাখা হলে তিনি আশ্চর্য হয়ে তা দেখতে লাগলেন। সে গণীমতের মধ্যে ছিল কিসরার মণিমুক্তা খচিত তাজ। স্বর্ণ খচিত জামা, হিরা খচিত যাওয়া......, এবং তাঁর বাহু বন্ধন।
হযরত ওমর رضي الله عنه তখন সুরাকা বিন মালিককে ডেকে তাঁকে কিসরার জামা, পায়জামা, মুজা এগুলো পরিয়ে দেন। তাঁর গলায় কিসরার তরবারি ঝুলিয়ে দেন, তাঁর মাথায় কিসরার তাজ পরিয়ে দেন এবং তাঁকে কিসরার বালা পরিয়ে দেন। হ্যাঁ, সেই বালা!
তখন মুসলমানরা চিৎকার দিয়ে বললেন, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।
এরপর ওমর رضي الله عنه সুরাকার দিকে তাকিয়ে বললেন, বাহ বাহ!
বনু মালাকদের এক আরবের মাথায় কিসরার তাজ!
তাঁর হাতে কিসরার বালা!
তারপর তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, হে আল্লাহ! তুমি এ সম্পদ তোমার রাসূলের দাবিগণ অথচ তিনি তোমার কাছে আমার থেকেও বেশি প্রিয় এবং আমার থেকেও বেশি সম্মানিত।
তুমি এ সম্পদ আবু বকরকে দাওনি অথচ তিনিও তোমার কাছে আমার থেকে বেশি প্রিয় এবং সম্মানিত। তুমি তা আমাকে দান করেছ, সুতরাং তুমি আমাকে যা পরীক্ষা করছো জনো্য দান করেছ তা থেকে আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এরপর তিনি মজলিস থেকে ওঠার পূর্বে সবগুলো মুসলমানদের মাঝে বণ্টন করে দিলেন。

টিকাঃ
১১২ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৩/১৪৭, ১১৪।

📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 এত বড় শক্তিশালী যুবক আমি আর দেখিনি

📄 এত বড় শক্তিশালী যুবক আমি আর দেখিনি


আব্দুল্লাহ বিন ওমর رضي الله عنه থেকে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ বলেছেন, এক দিন আমি স্বপ্নে দেখি একটি কূপের কাছে দাঁড়িয়ে উদয়কে পানি পান করাবার বলছি। সে কূপ থেকে পানি টেনে তুলছি। এ সময় আবু বকর رضي الله عنه কিছু দুবর্লতার সাথে এক, দু'বালতি পানি টেনে তুললেন। আর এ দুর্বলতার জন্য আল্লাহ তাকে মাফ করবেন। তারপর ওমর বিন খাত্তাব رضي الله عنه। তখন ওই বালতির আয়তন বেড়ে গেল। সে এতোটা শক্তি দিয়ে পানি তুলতে লাগল যে, কোনো বাছায়ার লোককে আমি তাঁর মতো শক্তি দিয়ে কাজ করতে দেখিনি। সে এত পরিমাণ পানি তুলল যে, লোকেরা ব্যক্তিগতভাবে পান করল এবং উটকেও পরিতৃপ্ত করে পানি পান করিয়ে উঠশাখায় নিয়ে গেল。

টিকাঃ
১১২ খোলাফায়ে রাশেদীন, পৃ. ২১৮, ২১৯।

📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 আমি তোমাকে বসরার কাজী নির্বাচন করলাম

📄 আমি তোমাকে বসরার কাজী নির্বাচন করলাম


হযরত ইবনে ওমর رضي الله عنه থেকে বর্ণিত, ওমর رضي الله عنه এক মহিলা এবং বিন খাত্তাব رضي الله عنه-এর কাছে এলেন, আমীরাুল মুমিনীন, আমার স্বামী দিনে রোযা রাখে আর রাতে নামায পড়ে। তিনি যেহেতু আল্লাহ্র ইবাদতে লিপ্ত থাকে তাঁর অভিযোগ করাও আমি পছন্দ করি না।
তখন কা'ব رضي الله عنه বললেন, আমীরুল মুমিনীন, এ মহিলা এ কথা দ্বারা এ ব্যাপারে অভিযোগ করছে যে, তাঁর স্বামী তার থেকে দূরে থাকে। অর্থাৎ তাঁকে সময় দেয় না।
তখন ওমর رضي الله عنه বললেন, তুমি যেভাবে বুঝেছো সেভাবে তাদের মালে ফয়সালা করে দাও।
কা'ব رضي الله عنه বললেন, তার স্বামীকে আমার কাছে উপস্থিত হতে হবে। তখন তাঁর স্বামীকে আনা হলো।
কা'ব رضي الله عنه তাকে বললেন, তোমার স্ত্রী তোমার ব্যাপারে অভিযোগ করেছে।
মহিলার স্বামী বলল, কী খাদ্যের ব্যাপারে নাকি পানীয়ের ব্যাপারে?
তিনি বললেন, না, এগুলোর ব্যাপারে না।
তখন মহিলা বলল, হে বিচারক, নারীদের প্রতি আমার স্বামীর কোনো আকর্ষণ নেই। তিনি ইবাদতের মধ্যে রাত কাটান।
তখন এ কথা শুনে তার স্বামী বলল, সূরা নাহল আর আল্লাহ্র কালামের ভয় আমাকে নারী থেকে উদাসীন করে রেখেছে।
তাঁর কথা শুনে কা'ব رضي الله عنه বললেন, হে পুরুষ, তোমার ওপর স্ত্রীর হক রয়েছে, যার জ্ঞান আছে সে যেন চার দিন পর হতেও স্ত্রীর কাছে যায়। সুতরাং তুমি তার হক আদায় করো এবং ভোগসুখও। এরপর তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা তোমার জন্য এক থেকে চারজন নারী বিয়ে করা হালাল করেছেন। সুতরাং তোমার উচিত তিন দিন তিন রাত তোমার রবের ইবাদত করা। (বাকি একদিন তোমার স্ত্রীকে সময় দেওয়া)।
হযরত কা'ব رضي الله عنه-এর এমন ফয়সালা শুনে ওমর رضي الله عنه বললেন, আমি বুঝতে পারছি না তোমার কোন বিষয়টি অধিক আশ্চর্যজনক। তাদের সমস্যাটি বুঝতে পারা নাকি তাদের মধ্যকার তোমার ফয়সালা। যাও আমি তোমাকে বসরার কাজী নির্বাচিত করলাম。

টিকাঃ
১১৩

📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 হে সারিয়া, পাহাড়! পাহাড়!

📄 হে সারিয়া, পাহাড়! পাহাড়!


হযরত ইবনে ওমর رضي الله عنه থেকে বর্ণিত, ওমর رضي الله عنه একটি সেনাদলের শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলেন। সে সেনাদলের প্রধান যে ছিল তাকে সারিয়া বলা হতো। এরই মাঝে একদিন ওমর رضي الله عنه খুৎবা দিচ্ছিলেন এমন সময় তিনি ডাক দিয়ে বললেন, হে সারিয়া, পাহাড়! পাহাড়!
এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। এরপর একদিন ওই সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এক লোক মদিনায় গমন করল। তখন ওমর رضي الله عنه তাকে সেনাবাহিনীর অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন সে বলল, একদিন আমরা শত্রুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলাম এমন সময় আমরা শুনতে পেলাম কেউ একজন বলছে, হে সারিয়া, পাহাড়! পাহাড়! এ কথাটি আমরা তিনবার শুনতে পেলাম। তখন আমরা পাহাড়ের দিকে দিয়ে পাহাড়কে পিছনে স্থান নেই। এভাবে আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে শত্রুদেরকে আক্রমণ করতে সাহায্য করেছেন।
তখন ওমর رضي الله عنه কে বলা হলো, আপনিই সতর্ক করেন।
প্রিয় পাঠক! হযরত ওমর رضي الله عنه তখন মদিনায় ছিলেন আর সেনা ছিল নাহাওয়াদে। যে শহরটি ইরাকের পাশে অবস্থিত। এভাবেই আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে তাঁকে অবগত করতেন। মনে হতো সেখানে কোনো সমস্যা হতো সেখানে তিনি উপস্থিত হতেন。

টিকাঃ
১১৪ আল ইনাবা, ২য় খণ্ড, পৃ. ১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00