📄 তাওবাকারী বৃদ্ধ
এক সন্ধ্যাবেলায় হাতে একটি মশলা নিয়ে ওমর (রা) বের হলেন। ইবনে মাসউদ (রা)-ও তাঁর সাথে সাথে চলতে লাগলেন। চলতে চলতে সামান্য দূরে তিনি আলো জ্বলতে দেখলেন। সেখানে এসে তিনি দেখলেন চুল পাকা এক বৃদ্ধ মদ নিয়ে বসে আছে আর তার সামনে একটি দাসী গান গাইছে। বৃদ্ধ লোকটি কিছু বুঝার আগেই ওমর (রা) তাঁর লোহার হাত দিয়ে ধরলেন। তারপর তিনি বললেন, মৃত্যুর শপথ শুনলে এমন বৃদ্ধ থেকে এই নিকৃষ্ট দৃশ্য আমি আর কোনো দিনও দেখিনি। তখন লোকটি মাথা তুলে বলল, আপনি যা করেছেন তা আরো নিকৃষ্ট, আপনি গোপনীয় দোষ অন্বেষণ করেছেন, অথচ তা নিষেধ করা হয়েছে। এরপর আপনি অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করেছেন। ওমর (রা) বললেন, তুমি সত্য বলেছ। এরপর ১ মাস চলে গেল। ওমর (রা) বৃদ্ধের কথাটি নিয়ে চিন্তা করতে লাগলেন। এদিকে বৃদ্ধ লোকটি ওমর (রা)-এর মজলিসে আসা থেকে বিরত থাকল। অনেক দিন পরে বৃদ্ধ লোকটি নিজেকে আড়ালে রেখে ওমর (রা)-এর মজলিসের শেষ প্রান্তে গিয়ে বসল, কিন্তু এরপরও ওমর (রা) তাঁকে দেখে ফেললেন।
ওমর (রা) বললেন, এ বৃদ্ধকে ডাক। লোকেরা বৃদ্ধ লোকটির কাছে এসে দিল, আমীরুল মু'মিনিনের ডাকে সাড়া দাও। লোকটি ভয়ে ভয়ে ওমর (রা)-এর দিকে যেতে লাগল। কেননা ওমর (রা) তাকে যে অবস্থায় দেখেছেন তার জন্যে কঠিন শাস্তি অবধারিত। ওমর (রা) বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে আস। লোকটিকে তাঁর একেবারে পাশে এনে বসানো হলো। তখন তিনি তার কানে কানে বললেন, যিনি মুহাম্মদকে সত্যসহ রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন তার শপথ করে বলছি, আমি তোমাকে যে অবস্থায় দেখেছি তা কাউকে বলিনি এমনকি ইবনে মাসউদকে না অথচ তখন সে আমার সাথেই ছিল। তখন লোকটি তাঁকে বলল, আমীরুল মু'মিনিন আপনার কান আমার কাছে আনুন। সে তাঁর কানে কানে বলল, যিনি মুহাম্মদকে সত্যসহ রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন তার শপথ, আমিও সে দিনের পর থেকে আপনার মজলিসে বসা পর্যন্ত সে কাজ করিনি। তখন ওমর (রা) উচ্চস্বরে তাকবীর দিলেন, কিন্তু তিনি তাকবীর দিলেন তা মজলিসের লোকেরা বুঝতে পারল না。
টিকাঃ
১৯৮ কানযুল উম্মাল, ৩য় খণ্ড, ৮৯২, ৮৯৩।
📄 পলায়নকারী রাজা
গাস্সানাদের শাসনকর্তা জিবিল্লা বিন আয়হাম ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে ওমর (রা)-এর কাছে জাঁকজমকপূর্ণভাবে একদল লোক নিয়ে আসল। তখন তাকে যথেষ্ট সম্মান ও মর্যাদার সাথে স্বাগত জানানো হলো। একই সাথে একদিন জিবিল্লা বিন আয়হাম কা'বার তাওয়াফ করছিল। তখন ফাযারা গোত্রের এক বেদুইনের পা দিয়ে জামায় পড়ল। এতে সে রেগে গিয়ে তার গালে থাপ্পড় দিল। বেদুইনটি ওমর (রা)-এর কাছে গিয়ে জিবিল্লার নামে অভিযোগ করল। ওমর (রা) ন্যায়সঙ্গতভাবে জিবিল্লাকে বললেন, হয় তুমি তাকে খুশি করবে না হয় সে তোমাকে থাপ্পড় দিয়ে যেভাবে তুমি তাকে দিয়েছ। বিষয়টি জিবিল্লাকে কঠিন অপমান মনে হলো। সে অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে বলল, তোমরা কি রাজা ও সাধারণ মানুষের সাথে পার্থক্য কর না। ওমর (রা) বললেন, না, ইসলাম তোমাদেরকে সমান করে দিয়েছে। তখন জিবিল্লা বলল, তাহলে আমি খ্রিস্টান হয়ে যাব। ওমর (রা) বললেন, তাহলে আমি তোমার ঘাড়ও আঘাত করব। অর্থাৎ হত্যা করব। জিবিল্লাহ ও ওমর (রা)-এর দৃঢ়তা দেখে তাঁর কাছে পরের দিন পর্যন্ত সুযোগ চাইল। পরে সে তার দলবল নিয়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেল。
টিকাঃ
১৯৯
📄 বাড়ির দেওয়ালে ওমর রা.
একদিন গভীর রাতে ওমর (রা) মদিনার অলি-গলিতে হাঁটছিলেন। অন্ধকার এত বেশি ছিল যে, পা দেখা যাচ্ছিল না। এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন একলোক বিচ্ছি ভাষায় গান গাইছে ছিল। তখন ওমর (রা) ঘরের দেওয়ালে আঘাত করে বললেন, হে আল্লাহর শত্রু, তুমি কি ভেবেছো তুমি পাপ করবে আর আল্লাহ্ তা'আলা তা গোপন রাখবেন? লোকটি বলল, আমীরুল মু'মিনিন, আপনি আমার বিচারে তাড়াঘড়া করবেন না। আমি যদি একবার আল্লাহ্র অবাধ্য হয়ে থাকি তবে আপনি তিনবার অবাধ্য হয়েছেন। আপনি আড়াল থেকে আমার কথা শুনছেন অথচ আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন, يُؤْمِنُ بِهَا ۗ وَأَنَّهَا الْحَقُّ مِن رَّبِّكُمْ ۖ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ. 'তোমরা গোপণকারি করো না।' সুমার দেওয়ার ওপর দিয়ে এসেছেন অথচ আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন, وَإِذَا وَأَدَ وَبَعْضَ الْآيَاتِ لِيُبَيِّنَ لَكُم مِّنَ الْآيَاتِ. 'তোমরা ঘরের দরজা দিয়ে এসো।' আপনি অনুমতি ব্যতীতও এসেছেন অথচ আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ۚ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ. ওরে যারা ঈমান এনেছো, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য গৃহে প্রবেশ করো না, যে পর্যন্ত না আলাপ-পরিচয় কর এবং গৃহবাসীকে সালাম না কর। এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম, যাতে তোমরা স্মরণ রাখ। (সূরা নূর : ২৭) তখন ওমর (রা) বললেন, আমি যদি তোমাকে ক্ষমা করে দেই তবে তুমি কী ভালো হবে? লোকটি বলল, হ্যাঁ। তখন ওমর (রা) লোকটিকে ক্ষমা করে দিলেন এবং তাকে ছেড়ে দিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন。
টিকাঃ
২০০ তাসল তাকারতাতু হিজায়া ওয়া ওমর (রা), ২১৭। আল কানয, ৩য় খণ্ড, ৮০৮ পৃ.
📄 তুমি তোমার প্রতিপালককে কি বলবে?
এক ব্যক্তি জোরগলায় চিৎকার করে বলল, আমীরুল মু'মিনিন, আমার সাথে চলুন, অমুক ব্যক্তি আমার ওপর জুলুম করেছে। তখন ওমর (রা) চাবুক নিয়ে লোকটির মাথায় আঘাত করত বললেন, ওমায়র যখন তোমাদেরকে অধিকার থেকে তখন তোমরা তার থেকে দূরে থাক। আর যখন সে মুসলমানদের কোনো কাজে ব্যস্ত হয় তখন তোমরা বল, আমার দিকে আসুন ........ আমার দিকে আসুন। লোকটি ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর এমন ব্যবহারে রাগে বিচলিত করতে করতে চলে গেল। ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, লোকটিকে আমার কাছে নিয়ে আস। লোকটিকে নিয়ে আসলে ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু তার হাতে চাবুক দিয়ে বললেন, খবর....আমার থেকে প্রতিশোধ নাও। লোকটি বলল, না; বরং আমি আপনার ও আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য প্রতিশোধ নেওয়া থেকে বিরত থাকলাম। ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, বিষয়টি এমন নয়, হয় তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রতিশোধ নেওয়া থেকে বিরত থাক আর তাঁর থেকে প্রতিদানের আশা করো। অথবা আমার সন্তুষ্টির জন্য প্রতিশোধ নেওয়া থেকে বিরত থাকো.........। লোকটি বলল, তাহলে আল্লাহর জন্য। তখন ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, তুমি ফিরে যাও। এরপর ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন। তিনি ঘরে ঢোকার কিছুক্ষণ পর নামাযের সময় হলো। আমরা তখন তাঁর সাথেই ছিলাম। নামায শেষ হওয়ার পর তিনি বললেন, হে খাত্তাবের ছেলে, তুমি নীচু ছিলে, আল্লাহ তোমাকে উঁচু করেছেন, তুমি পথভ্রষ্ট ছিলে তিনি তোমাকে পথপ্রদর্শন করেছেন। তুমি অপমানিত ছিলে, তিনি তোমাকে সম্মানিত করেছেন। অতঃপর তিনি তোমার ও ওর مسلمانوں দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। আর যখন এক লোক তোমার কাছে সাহায্যের জন্য আসল তখন তুমি তাকে প্রহার করেছ। যদি সে আল্লাহর দরবারে বিচার নিয়ে আসে তুমি তোমার প্রতিপালককে কী উত্তর দিবে। আহনাফ বলল, ওমর নিজেকে নিজে তিরস্কার করছিল তখন আমার কাছে মনে হলো পৃথিবীর ওপর সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি ওমর。
টিকাঃ
¹৩৮ মানাকিব লি ইবনিল জাওযী, ১১২,১১২ ও আল কানয, ১২তম খণ্ড, ২৭১,২৭১।