📄 আপনার সাথের লোককে ছেলের সুসংবাদ দিন
ওমর (রা) গায়ের কাঁথা সরিয়ে উঠে পড়লেন এবং অন্ধকারের মাঝে হাঁটা শুরু করলেন। চলতে চলতে তিনি একটি তাঁবু থেকে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন, কিন্তু গতকালও এখানে কোনো তাঁবু ছিল না। ওমর (রা) কাছে গিয়ে দেখলেন, দরজার কাছে এক লোক বসে আছে। ওমর (রা) তাঁকে সালাম দিয়ে বললেন, তুমি কে? সে বলল, আমি একজন বেদুইন। আমি আমীরুল মু'মিনিনের কাছে এসেছি তাঁর অনুগ্রহ পাওয়ার আশায়। [লোকটি ওমর (রা)-কে আগে কখনো দেখেনি] তিনি বললেন, ঘরের ভেতর থেকে কিসের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছো? লোকটি বলল, আল্লাহ্ তোমায় প্রতি রহম করুন, তুমি তোমার কাছে যাও।
তিনি বললেন, আমাকে এটা জানতেই হবে...,এটি কিসের আওয়াজ? লোকটি বলল, এক মহিলা সন্তান প্রসব করছে। তিনি বললেন, তার কাছে কি কেউ আছে? লোকটি বলল, না। ওমর (রা) দ্রুত বাড়িতে ফিরে এসে তাঁর স্ত্রী উম্মে কুলসুম বিনতে আলী (রা)-কে বললেন, তোমার কি কোনো ছাওয়াব অর্জন করার ইচ্ছা আছে? যে ছাওয়াব আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী বললেন, কি তা? তিনি বললেন, সন্তান জন্মগ্রহণ করতে যা যা প্রয়োজন তা নিয়ে এসো। ওমর (রা) নিজেই এগুলো বহন করে নিয়ে আসতে লাগলেন। আর তাঁর স্ত্রীকে বললেন, তুমি আমার সাথে চল্...........তাঁর স্ত্রী তাঁর সাথে সাথে চলতে লাগল। চলতে চলতে তারা ওই তাঁবুর কাছে গিয়ে পৌঁছলেন। তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, তুমি মহিলার কাছে যাও। এদিকে ওমর (রা) লোকটির কাছে এসে বসলেন। তিনি পাতিলের আগুন দিতে লাগলেন। আগুনের ধোঁয়া তাঁর দাড়ি স্পর্শ করছিল। এদিকে মহিলাটি সন্তান প্রসব করার সাথে সাথে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসল। তাঁর স্ত্রী উম্মুল কুলসুম (রা) বললেন, আমীরুল মু'মিনিন! আপনার সাথে থাকা লোককে ছেলের সুসংবাদ দিন। লোকটি যখন আমীরুল মু'মিনিন শব্দটি শুনল সে ভয়ে পেয়ে গেল এবং ওমর (রা)-এর থেকে দূরে সরে বসতে চাইল। ওমর (রা) বললেন, তুমি তোমার জায়গায় বসে থাক। তিনি পাতিলটি দরজার কাছে নিয়ে গেলেন। তারপর তিনি বললেন, মহিলাটিকে এগুলো খাইয়ে পরিতৃপ্ত কর। তখন তাঁর স্ত্রী তা করল। এরপর সে পাতিলটি এনে দরজা রাখল। ওমর (রা) পাতিলটি নিয়ে লোকটির সামনে রেখে বললেন, খাও, খাও, তুমিও তো সারা রাত জেগেছিলে। তারপর তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, চল। আর লোকটিকে বললেন, তুমি কালকে আমাদের কাছে যেয়ো আমরা তোমার প্রয়োজন মিটিয়ে দিব। লোকটি পরের দিন তাঁর কাছে গেল তিনি তাকে তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী সবকিছু দিয়ে দিলেন。
টিকাঃ
১৯৬ আল মা'ফাকির, লি ইবনিল জাওযী, ৮৫ পৃ.
📄 আমাদেরকে অমুক ব্যক্তির কাছে নিয়ে চলুন
ওমর (রা)-এর মজলিসে নিয়মিত আসত এমন একজন লোক। কিন্তু তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন না। তিনি ভাবলেন হয়ত কোনো ব্যবস্থার লোকটি কষ্ট পেয়েছে। তখন ওমর (রা) আবদুর রহমান (রা)-কে বললেন, আমাদেরকে অমুক ব্যক্তির কাছে নিয়ে চলুন। তারা উভয়ে লোকটির বাড়িতে এসে তার দরজা খোলা দেখলেন। ঘরের ভেতরে তার স্ত্রী তার জন্যে পাত্রে মদ ঢালছিল। ওমর (রা) আবদুর রহমান (রা)-কে বললেন, এটাই তাঁকে আমাদের কাছে আসা থেকে দূরে রেখেছে। আবদুর রহমান (রা) বললেন, আপনি কি জানেন পাত্রে কী আছে? ওমর (রা) মনের ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি মনে করেছেন এটি তাজাচ্ছুস (অন্যের গোপনীয়তা অন্বেষণ)? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এটি তাজাচ্ছুস। ওমর (রা) বললেন, তাহলে এর জাওয়ায কীভাব হবে। তিনি বললেন, তুমি তার ব্যাপারে যা জেনেছ তা কাউকে জানাবে না এবং তার ব্যাপারে আদৌ ছাড়া অন্য কিছু ধারণা করবে না。
টিকাঃ
১৯৭ কানযুল উম্মাল, ৩য় খণ্ড, ৮০৭, ৮০৮। ফার্মা--১০
📄 তাওবাকারী বৃদ্ধ
এক সন্ধ্যাবেলায় হাতে একটি মশলা নিয়ে ওমর (রা) বের হলেন। ইবনে মাসউদ (রা)-ও তাঁর সাথে সাথে চলতে লাগলেন। চলতে চলতে সামান্য দূরে তিনি আলো জ্বলতে দেখলেন। সেখানে এসে তিনি দেখলেন চুল পাকা এক বৃদ্ধ মদ নিয়ে বসে আছে আর তার সামনে একটি দাসী গান গাইছে। বৃদ্ধ লোকটি কিছু বুঝার আগেই ওমর (রা) তাঁর লোহার হাত দিয়ে ধরলেন। তারপর তিনি বললেন, মৃত্যুর শপথ শুনলে এমন বৃদ্ধ থেকে এই নিকৃষ্ট দৃশ্য আমি আর কোনো দিনও দেখিনি। তখন লোকটি মাথা তুলে বলল, আপনি যা করেছেন তা আরো নিকৃষ্ট, আপনি গোপনীয় দোষ অন্বেষণ করেছেন, অথচ তা নিষেধ করা হয়েছে। এরপর আপনি অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করেছেন। ওমর (রা) বললেন, তুমি সত্য বলেছ। এরপর ১ মাস চলে গেল। ওমর (রা) বৃদ্ধের কথাটি নিয়ে চিন্তা করতে লাগলেন। এদিকে বৃদ্ধ লোকটি ওমর (রা)-এর মজলিসে আসা থেকে বিরত থাকল। অনেক দিন পরে বৃদ্ধ লোকটি নিজেকে আড়ালে রেখে ওমর (রা)-এর মজলিসের শেষ প্রান্তে গিয়ে বসল, কিন্তু এরপরও ওমর (রা) তাঁকে দেখে ফেললেন।
ওমর (রা) বললেন, এ বৃদ্ধকে ডাক। লোকেরা বৃদ্ধ লোকটির কাছে এসে দিল, আমীরুল মু'মিনিনের ডাকে সাড়া দাও। লোকটি ভয়ে ভয়ে ওমর (রা)-এর দিকে যেতে লাগল। কেননা ওমর (রা) তাকে যে অবস্থায় দেখেছেন তার জন্যে কঠিন শাস্তি অবধারিত। ওমর (রা) বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে আস। লোকটিকে তাঁর একেবারে পাশে এনে বসানো হলো। তখন তিনি তার কানে কানে বললেন, যিনি মুহাম্মদকে সত্যসহ রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন তার শপথ করে বলছি, আমি তোমাকে যে অবস্থায় দেখেছি তা কাউকে বলিনি এমনকি ইবনে মাসউদকে না অথচ তখন সে আমার সাথেই ছিল। তখন লোকটি তাঁকে বলল, আমীরুল মু'মিনিন আপনার কান আমার কাছে আনুন। সে তাঁর কানে কানে বলল, যিনি মুহাম্মদকে সত্যসহ রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন তার শপথ, আমিও সে দিনের পর থেকে আপনার মজলিসে বসা পর্যন্ত সে কাজ করিনি। তখন ওমর (রা) উচ্চস্বরে তাকবীর দিলেন, কিন্তু তিনি তাকবীর দিলেন তা মজলিসের লোকেরা বুঝতে পারল না。
টিকাঃ
১৯৮ কানযুল উম্মাল, ৩য় খণ্ড, ৮৯২, ৮৯৩।
📄 পলায়নকারী রাজা
গাস্সানাদের শাসনকর্তা জিবিল্লা বিন আয়হাম ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে ওমর (রা)-এর কাছে জাঁকজমকপূর্ণভাবে একদল লোক নিয়ে আসল। তখন তাকে যথেষ্ট সম্মান ও মর্যাদার সাথে স্বাগত জানানো হলো। একই সাথে একদিন জিবিল্লা বিন আয়হাম কা'বার তাওয়াফ করছিল। তখন ফাযারা গোত্রের এক বেদুইনের পা দিয়ে জামায় পড়ল। এতে সে রেগে গিয়ে তার গালে থাপ্পড় দিল। বেদুইনটি ওমর (রা)-এর কাছে গিয়ে জিবিল্লার নামে অভিযোগ করল। ওমর (রা) ন্যায়সঙ্গতভাবে জিবিল্লাকে বললেন, হয় তুমি তাকে খুশি করবে না হয় সে তোমাকে থাপ্পড় দিয়ে যেভাবে তুমি তাকে দিয়েছ। বিষয়টি জিবিল্লাকে কঠিন অপমান মনে হলো। সে অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে বলল, তোমরা কি রাজা ও সাধারণ মানুষের সাথে পার্থক্য কর না। ওমর (রা) বললেন, না, ইসলাম তোমাদেরকে সমান করে দিয়েছে। তখন জিবিল্লা বলল, তাহলে আমি খ্রিস্টান হয়ে যাব। ওমর (রা) বললেন, তাহলে আমি তোমার ঘাড়ও আঘাত করব। অর্থাৎ হত্যা করব। জিবিল্লাহ ও ওমর (রা)-এর দৃঢ়তা দেখে তাঁর কাছে পরের দিন পর্যন্ত সুযোগ চাইল। পরে সে তার দলবল নিয়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেল。
টিকাঃ
১৯৯