📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 ইবনে হুজাফার কপালে চুমু দিলেন ওমর রা.

📄 ইবনে হুজাফার কপালে চুমু দিলেন ওমর রা.


ঊনবিংশ হিজরিতে রোমের সাথে যুদ্ধ করার জন্য হযরত ওমর (রা.) একদল সেনা পাঠালেন। তাঁদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফাও ছিলেন। ইতোমধ্যে মুসলিম সৈন্যদের ঈমানী শক্তি ও সাহসিকতার কথা রোমান সম্রাটের কানে গিয়ে পৌঁছে। আল্লাহর জন্য বুকের ময়দানে নির্ভীকভাবে মুসলিম সেনদের শহীদ হওয়ার কথাও সে জানতে পারে।
আর তাই সে তার সেনাবাহিনীকে আদেশ করে- যখন তারা বিজয় লাভ করবে তখন তারা যেন মুহাম্মাদ (সা.)-এর সাহাবীদের থেকে কাউকে বন্দি করে জীবিত নিয়ে আসে। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফা তাদের হাতে বন্দি হয়ে গেলেন। তারা তাঁকে বন্দি করে তাদের সম্রাটের নিকটে নিয়ে গিয়ে বলল, এ লোকটি মুহাম্মাদ (সা.)র আগামী সাহাবীদের একজন। আমাদের হাতে বন্দি হয়েছে। আমরা তাকে আপনার নিকটে নিয়ে এসেছি।
রোমের সম্রাট আব্দুল্লাহ বিন হুজাফার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তারপর বলল, আমি তোমার কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করছি।
হযরত হুজাফা (রা.) বললেন, কী প্রস্তাব?
সম্রাট বলল, তুমি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ কর। যদি তুমি তা কর আমি তোমাকে ছেড়ে দিব এবং তোমাকে যথেষ্ট সম্মানজনক পুরস্কার প্রদান করব।
তখন হযরত হুজাফা (রা.) ঘৃণা ও দৃঢ়তার সাথে বললেন, হায় আফসোস! তুমি আমাকে যেদিকে ডাকছ তা করা থেকে হাজার বার মৃত্যুবরণ করা আমার কাছে অধিক উত্তম।
সম্রাট বলল, আমি তোমাকে কিছুক্ষণ সময় দিচ্ছি।.... সুতরাং তুমি যদি আমার কথায় সাড়া দাও তাহলে তোমাকে আমার রাজ্যের অংশীদার করব এবং আমার রাজত্বের ভাগ দিব।
এ কথা শুনে লোহার শিকল বন্দি হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফা মৃদু হেসে বললেন, আল্লাহর শপথ! তুমি যদি আমাকে তোমার সমস্ত রাজত্ব দিয়ে দাও এবং আরব তুমি যা কিছুর মালিক সব দিয়ে দাও তাহলেও আমি মুহাম্মাদ (সা.)র ধর্ম থেকে এক চুল পরিমাণও নড়ব না।
সম্রাট বলল, তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করব। তিনি বললেন, তোমার ইচ্ছে।
তারপর সম্রাট তাঁকে শূলিতে চড়ানোর নির্দেশ দিল। সম্রাটের অনুসারে তাঁকে শূলিতে চড়ানো হলো। সম্রাট আব্দুল্লাহকে বলল: তোমরা তার হাতের আশপাশে তীর নিক্ষেপ কর। এরপর সম্রাট তাঁকে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করতে আহ্বান করল, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন।
সম্রাট আব্দুল্লাহকে বলল, তোমরা তার পায়ের আশপাশে তীর নিক্ষেপ কর। অন্যদিকে সে তাঁকে তার নিজ ধর্ম ত্যাগ করতে আহ্বান করে, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
সম্রাট নিরাশ হয়ে তাঁকে শূলি থেকে নামানোর আদেশ দিল। সে তার লোকবলকে বড় একটি পাত্র নিয়ে আসার নির্দেশ দিল। সেই পাত্রটি তেল তেলে ভর্তি করা হলো। এরপর তা আগুনের উপরে রেখে উত্তপ্ত করা হলো। তেলগুলো আগুনের তেজে টগবগ করতে লাগল। এরপর সম্রাট মুসলিম বন্দিদের থেকে দুই জন বন্দিকে নিয়ে আসার নির্দেশ দিল। তাদের একজনকে গরম তেলে নিক্ষেপ করল। নিক্ষেপ করার সাথে সাথে তার গোশতগুলো গলে হাড়ও থেকে আলাদা হয়ে গেল এবং খালি হাড়গুলো ভেসে উঠল। এরপর সম্রাট আব্দুল্লাহ বিন হুজাফাকে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার আহ্বান করে। এবার তিনি আগের থেকেও জোর গলায় তা প্রত্যাখ্যান করেন।
সম্রাট যখন হতাশ হয়ে গেল তখন তাকেও তার সঙ্গীদের মতো গরম তেলে নিক্ষেপ করার আদেশ দিয়ে চলে গেল। সম্রাট চলে যাওয়ার পর হযরত হুজাফা কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁর কান্না দেখে তারা সম্রাটকে গিয়ে বলল, সে তো কাঁদছে.....
সম্রাট ধারণা করল তিনি জয় পেয়েছেন। আর তাই সে তাদেরেক বলল, তাকে আমার কাছে নিয়ে আস। তারা তাকে নিয়ে আসলে সম্রাট আবারও খ্রিস্টান হওয়ার প্রস্তাব দিল, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন।
সম্রাট বলল, তোমার ধ্বংস হওয়া কে দেখবে? তিনি বললেন, আমি এই ভেবে কেঁদেছিলাম যে, আমাকে এখন ভেসে নিক্ষেপ করা হলে তো আমি মাত্র একবার মারা যাব, কিন্তু আমার তো ইচ্ছা আমার শরীরে যত পশম আছে তত সমপরিমাণ যদি আমার আত্মা থাকত তাহলে আমাকে ততবার এ পাত্রে নিক্ষেপ করা হতো। আর আমি ততবার আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হতাম।
সম্রাট বলল, তুমি কি আমার কপালে চুমু খাবে? তাহলে আমি তোমাকে ছেড়ে দিব। তিনি তাকে বললেন, সকল মুসলমান বন্দিকে ছেড়ে দিবে? সম্রাট বলল, হ্যাঁ, সকল মুসলমান বন্দিকে ছেড়ে দিব। তিনি বললেন,
আমি মনে মনে লাগলাম- সে আল্লাহর শকে, আমি তার মাথায় চুমু খাব আর এতে সে আমাকে ও মুসলিম বন্দিদের ছেড়ে দিবে তাতে কোনো ক্ষতি নেই।
এ কথা উবে তিনি তার কপালে চুমু দিলেন এবং তার কপালে চুমু খেলেন। তারপর রোমের সম্রাট তাঁকে সকল মুসলিম বন্দিকে হস্তান্তর করার নির্দেশ দিল।
তিনি খলিফা ওমর (রা.)-এর কাছে ফিরে এসে তার সাথে ঘটে যাওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিলেন। ঘটনাটি শুনে হযরত ওমর (রা.) অনেক বেশি খুশি হলেন।
আর বললেন, "প্রত্যেক মুসলমানের উচিত আব্দুল্লাহ বিন হুজাফার কপালে চুমু খাওয়া, আর আমি নিজেই সর্বপ্রথম তা শুরু করেছি।"

টিকাঃ
১১০ কানযুল উম্মাল, ১৩তম খণ্ড, ৪৫০-৪৫১ পৃ.

📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 ইবনে ওমর রা. ও গোস্ত

📄 ইবনে ওমর রা. ও গোস্ত


একদিন ওমর (রা.) তার ছেলে আব্দুল্লাহর কাছে আসলেন। তিনি এসে তাঁর কাছে গোস্ত দেখতে পেলেন।
তিনি তখন বললেন, এ গোস্ত কেন আনা হয়েছে? তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ বললেন, এটা আমার খেতে মন চেয়েছে। তিনি বললেন, তুমি যা খেতে চাইবে তাই খাবে। কোনো ব্যক্তির অপচয়কারী হওয়ার জন্য এটি যথেষ্ট যে, তার যা মন চাইবে তাই খাবে。

টিকাঃ
১১২ আসসুনানুল কুবরা ইবনুল আয়েম, ১৫৬ পৃ.

📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 অশ্বারোহী ও গনিমত

📄 অশ্বারোহী ও গনিমত


যুদ্ধ থেমে গেল, তরবারি খুব মন্থর আওয়াজও ধীরে ধীরে কমে আসল। মুসলমানদের বিজয়ের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল। মুসলমানগণ যুদ্ধের গণিমত জমা করতে লাগলেন। একে একে সকলের গণিমত তাপ করে দেওয়া হলো।
এইসব যুদ্ধে এক দুঃখভারী অশ্বারোহী যোদ্ধা যার গায়ে কোনো কষ্ট-ক্লেশের চিহ্ন নেই যদিও সে অনেক কাফেরের মোকাবিলা করেছে। আবু মূসা আশআরী তাকে তার অংশ নির্ধারণ করে দিলেন, কিন্তু সম্পূর্ণ অংশ পরিশোধ করে দেননি। তখন লোকটি তার পুরো প্রাপ্য নেওয়া ব্যতীত যেতে অস্বীকার করল। এতে আবু মূসা রেগে তাকে বিশটি বেত্রাঘাত করল এবং তার চুল কেটে দিলেন। লোকটি চুলগুলো জমা করে একটি ব্যাগে নিল তারপর মদিনার দিকে রওনা দিল। মদিনা এসে সে ভুলতো ওমর (রা)-এর বুকে নিক্ষেপ করল। ওমর (রা) বললেন, তোমার কি হয়েছে? লোকটি তার ঘটনা বলল, তখন রাগে ওমর (রা)-এর বুকের ভেতরে আগুন জ্বলে উঠল। তিনি সাথে সাথে আবু মূসা আশআরী (রা)-এর কাছে লিখে পাঠালেন, তোমার ওপর শাস্তি বর্ষিত হোক, পরকথা....... আমাকে একজন এমন অমুখ্যকে এমন সংবাদ দিয়েছো। আমি তোমাকে শপথ দিয়ে বলছি, যদি তুমি লোক সমাগমে এমনটি করে থাক তবে তুমিও লোক সমাগমে বসবে আর সে তোমার থেকে প্রতিশোধ নিবে। আর যদি নির্জনে এমনটি করে থাক তবে তুমিও নির্জনে গিয়ে বসবে আর সে তোমার থেকে প্রতিশোধ নিবে。

টিকাঃ
১৯৫ কানযুল উম্মাল, ১৬তম খণ্ড, ৭৬ পৃ।

📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 আপনার সাথের লোককে ছেলের সুসংবাদ দিন

📄 আপনার সাথের লোককে ছেলের সুসংবাদ দিন


ওমর (রা) গায়ের কাঁথা সরিয়ে উঠে পড়লেন এবং অন্ধকারের মাঝে হাঁটা শুরু করলেন। চলতে চলতে তিনি একটি তাঁবু থেকে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন, কিন্তু গতকালও এখানে কোনো তাঁবু ছিল না। ওমর (রা) কাছে গিয়ে দেখলেন, দরজার কাছে এক লোক বসে আছে। ওমর (রা) তাঁকে সালাম দিয়ে বললেন, তুমি কে? সে বলল, আমি একজন বেদুইন। আমি আমীরুল মু'মিনিনের কাছে এসেছি তাঁর অনুগ্রহ পাওয়ার আশায়। [লোকটি ওমর (রা)-কে আগে কখনো দেখেনি] তিনি বললেন, ঘরের ভেতর থেকে কিসের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছো? লোকটি বলল, আল্লাহ্ তোমায় প্রতি রহম করুন, তুমি তোমার কাছে যাও।
তিনি বললেন, আমাকে এটা জানতেই হবে...,এটি কিসের আওয়াজ? লোকটি বলল, এক মহিলা সন্তান প্রসব করছে। তিনি বললেন, তার কাছে কি কেউ আছে? লোকটি বলল, না। ওমর (রা) দ্রুত বাড়িতে ফিরে এসে তাঁর স্ত্রী উম্মে কুলসুম বিনতে আলী (রা)-কে বললেন, তোমার কি কোনো ছাওয়াব অর্জন করার ইচ্ছা আছে? যে ছাওয়াব আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী বললেন, কি তা? তিনি বললেন, সন্তান জন্মগ্রহণ করতে যা যা প্রয়োজন তা নিয়ে এসো। ওমর (রা) নিজেই এগুলো বহন করে নিয়ে আসতে লাগলেন। আর তাঁর স্ত্রীকে বললেন, তুমি আমার সাথে চল্...........তাঁর স্ত্রী তাঁর সাথে সাথে চলতে লাগল। চলতে চলতে তারা ওই তাঁবুর কাছে গিয়ে পৌঁছলেন। তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, তুমি মহিলার কাছে যাও। এদিকে ওমর (রা) লোকটির কাছে এসে বসলেন। তিনি পাতিলের আগুন দিতে লাগলেন। আগুনের ধোঁয়া তাঁর দাড়ি স্পর্শ করছিল। এদিকে মহিলাটি সন্তান প্রসব করার সাথে সাথে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসল। তাঁর স্ত্রী উম্মুল কুলসুম (রা) বললেন, আমীরুল মু'মিনিন! আপনার সাথে থাকা লোককে ছেলের সুসংবাদ দিন। লোকটি যখন আমীরুল মু'মিনিন শব্দটি শুনল সে ভয়ে পেয়ে গেল এবং ওমর (রা)-এর থেকে দূরে সরে বসতে চাইল। ওমর (রা) বললেন, তুমি তোমার জায়গায় বসে থাক। তিনি পাতিলটি দরজার কাছে নিয়ে গেলেন। তারপর তিনি বললেন, মহিলাটিকে এগুলো খাইয়ে পরিতৃপ্ত কর। তখন তাঁর স্ত্রী তা করল। এরপর সে পাতিলটি এনে দরজা রাখল। ওমর (রা) পাতিলটি নিয়ে লোকটির সামনে রেখে বললেন, খাও, খাও, তুমিও তো সারা রাত জেগেছিলে। তারপর তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, চল। আর লোকটিকে বললেন, তুমি কালকে আমাদের কাছে যেয়ো আমরা তোমার প্রয়োজন মিটিয়ে দিব। লোকটি পরের দিন তাঁর কাছে গেল তিনি তাকে তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী সবকিছু দিয়ে দিলেন。

টিকাঃ
১৯৬ আল মা'ফাকির, লি ইবনিল জাওযী, ৮৫ পৃ.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00