📄 কুষ্ঠরোগী মহিলা
দলে দলে লোকজন কা'বাঘর তাওয়াফ করছিল। তাকবীরের তাহলিলের ধ্বনির সাথে সাথে খরছ হচ্ছে চোখের অশ্রু। ওমর ﷺ লক্ষ্য করে দেখলেন, ভীড়ের মাঝে এক কুষ্ঠরোগী মহিলা তাওয়াফ করছে। তিনি তাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আল্লাহ্ বান্দী! তুমি লোকেদেরকে কষ্ট দিও না। যদি তুমি তোমার ঘরে থাকতে (তবে তা ভালো হতো)। মহিলা ওমর ﷺ-এর কথায় সাড়া দিয়ে বাড়িতে অবস্থান করতে লাগল। এরপর একদিন ওমর ﷺ-ও ইন্তিকাল করেন। তাঁর ইন্তিকালের পর এক ব্যক্তি মহিলার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে বলল, যিনি তোমাকে বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করেছেন তিনি মারা গেছেন; সুতরাং তুমি এখন বের হতে পার। মহিলা বলল, আমি এমন নই যে, জীবিত অবস্থায় তাঁর আনুগত্য করব আর মৃত অবস্থায় অবাধ্য হব。
টিকাঃ
⁹⁷) কানযুল উম্মাল, ১খ খন্ড, ২৮৮ পৃঃ।
📄 ওমর রা.-এর আত্মমর্যাদা
স্থানান্তরিত ব্যক্তিদের রীতিতে রাসুল ﷺ মজলিসে বসেছিলেন। তাঁর পবিত্র জবান থেকে দাসবীয় তাহলীল উচ্চারিত হচ্ছিল এবং তিনি মাঝে মাঝে তাঁর সাহাবায়ে কেরামদেরকে হাদিস শুনাচ্ছিলেন। সাহাবায়ে কেরামের একটি দল তাঁকে ঘিরে বসে আছেন। তিনি তাঁদেরকে বললেন, আমি ঘুম থাকা অবস্থায় একদিন নিজেকে জান্নাতে দেখতে পেলাম। তখন দেখতে পেলাম এক মহিলা একটি প্রাসাদের পাশে অযু করছিল। আমি বললাম, এ প্রাসাদ কার জন্যে? কেউ একজন বলল, ওমরের জন্যে। তারপর তিনি বললেন, তখন ওমরের আত্মমর্যাদা কথা মনে পড়ে আমি প্রাসাদে প্রবেশ না করে ফিরে আসি। তখন ওমর ﷺ কান্না শুরু করলেন আর বলতে লাগলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ওপর আমার আত্মমর্যাদা?
টিকাঃ
⁹⁸) বুখারী শরীফ, হাদিস নং ৩৬৭৭।
📄 ওমর রা.-এর সাথে মিলে যাওয়া কোরআনের আয়াত
ওমর ﷺ-এর সাথে কোরআনের সম্পর্ক ছিল অন্য রকম। তিনি কোরআন তেলাওয়াত করতে ও শুনতে খুবই পছন্দ করতেন এবং কোরআনের দাবি অনুসারে তিনি নিজের জীবনকে পরিচালনা করতেন। তাঁর সাথে কোরআনের সম্পর্ক ছিল অতি আশ্চর্যজনক। রাসুল ﷺ তাঁকে তেইশ লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। রাসুল ﷺ-এর কাছে কোনো ওহী নাযিল হলে তিনি তা তেলাওয়াত করতেন আর হযরত ওমর ﷺ তা লিখে ফেলতেন। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে হযরত ওমর ﷺ-এর কথার সাথে কোরআনের অনেকগুলো আয়াত মিলে গেছে। যেগুলোকে মুওয়াফাকাতে ওমর বলে। আমরা সেগুলো নিচে উল্লেখ করলাম..........
প্রথমতঃ হযরত ওমর ﷺ মুসলমানদেরকে রাসুল ﷺ-এর সাথে হজ করতে দেখে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! যদি আমরা মাকামে ইবরাহিমকে নামাযের স্থান হিসেবে গ্রহণ করতাম। পরে আল্লাহ্ তা'আলা আয়াত নাযিল করলেন। وَإِذَا تَقُوْمُواْ مِنْ مَّقَامِ إِبْرَاهِيْمَ مُصَلًّى 'তোমরা ইবরাহিমের দাঁড়ানো জায়গাকে নামাযের জায়গা হিসেবে গ্রহণ কর।' (সূরা বাকারা : ১২৫)
মাকামে ইবরাহিম হচ্ছে এমন স্থান যেখানে হযরত ইবরাহিম দাঁড়িয়েছিলেন। সেখানে তাঁর পদচিহ্ন আজ পর্যন্ত বিদ্যমান রয়েছে। হযরত ওমর ﷺ মাকামে ইবরাহিমকে নামাযের স্থান হিসেবেই পছন্দ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত: মুসলমান, মুনাফিক ও কাফের সকলে আসা যাওয়ার পথে রাসুল ﷺ-এর স্ত্রীদেরকে দেখতে পেত। এ বিষয়টি নিয়ে ওমর ﷺ খুবই চিন্তিত ছিলেন। তিনি রাসুল ﷺ-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি যদি আপনার স্ত্রীদেরকে পর্দা করার নির্দেশ দিতেন। কেননা তাদের সাথে ভালো লোকেরাও কথা বলে আবার অনেক সময় খারাপ লোকেরাও কথা বলে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা পর্দার আয়াত নাযিল করলেন এবং রাসুল ﷺ-এর স্ত্রীদেরকে পর্দা করার নির্দেশ দিলেন।
তৃতীয়ত: একদিন রাসুল ﷺ তাঁর স্ত্রীদের ওপর রাগ করে তাঁদের সাথে থাকা ত্যাগ করলেন। ওমর ﷺ এ কথা জানার পর বললেন, عَسَى رَبُّهُ إِنْ طَلَّقَكُنَّ أَنْ يُبْدِلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِّنْكُنَّ مُسْلِمَاتٍ مُّؤْمِنَاتٍ قَانِتَاتٍ تَائِبَاتٍ عَابِدَاتٍ سَائِحَاتٍ ثَيِّبَاتٍ وَأَبْكَارًا 'যদি তিনি তোমাদের তালাক প্রদান করেন, তবে তার প্রতি প্রভু তাকে কুমারী ও অকুমারীসহ এমন উত্তম এমন স্ত্রী দান করবেন যারা মুসলিম, মু'মিনা, অনুগত, তাওবাকারী, সংযমী।'
তিনি যেভাবে বলেছেন আল্লাহ তা'আলা হুবহু সেভাবে আয়াত নাযিল করলেন। এটা এ কারণে যে হযরত ওমর ﷺ-এর সম্পর্ক আল্লাহ তা'আলা'র সাথে ছিল। তাঁর অন্তর পবিত্র ছিল। এ কারণেই তো রাসুল ﷺ তাঁকে 'ফারুক' উপাধি দিয়েছিলেন।
চতুর্থত: বদরের যুদ্ধে মুসলমানগণ সত্তরজন মুশরিককে বন্দি করেছিলেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে চল্লিশজন। রাসুল ﷺ এদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করলেন। আবু বকর ﷺ তাঁদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে বললেন। কিন্তু ওমর ﷺ তাঁদেরকে হত্যা করার কথা বললেন। কেননা তারা কাফের। রাসুল ﷺ আবু বকর ﷺ-এর পরামর্শ গ্রহণ করলেন। হযরত ওমর ﷺ-এর পরামর্শ অনুসারে তাঁদেরকে হত্যা করলে খুশি হতেন এ কথা জানিয়ে ওহী নাযিল করলেন। ওহী নাযিল হওয়ার পর রাসুল ﷺ ও আবু বকর ﷺ কেঁদে ফেললেন।
পঞ্চমত: মুনাফিকদের সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল মারা যাওয়ার পর রাসুল ﷺ তাঁর জানাযায় উপস্থিত হতে চাইলেন, কিন্তু ওমর ﷺ তাঁকে জানাযায় না যেতে অনুরোধ করলেন। রাসুল ﷺ হচ্ছে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমতস্বরূপ, তাই কেউ জানাযায়াম যাচেছ তিনি তা চাইলেন না। এ কারণে তিনি তার জানাযায় উপস্থিত হলেন। জানাযায় শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন নাযিল হয়ে গেল। আল্লাহ তা'আলা রাসূল ﷺ-কে সতর্ক করে দিলেন এই বলে...
وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَىٰ قَبْرِهِ ۖ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَاسِقُونَ
“আর তাদের মধ্য থেকে কারো মৃত্যু হলে তার জানাযা আপনি পড়বেন না এবং তার কবরেও দাঁড়াবেন না। তারা তো আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে। বস্তুত তারা পাপিষ্ঠ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে।” (সুরা আত্ তাওবা: ৮৪)
📄 সদকার উটের সেবায় ওমর রা.
গ্রীষ্মের একদিনে, চারিদিকে যখন উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। সূর্যের কিরণে মক্কর বলি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পরিশ্রুত হয়েছে। এমনি এক সময় আহনাফ বিন কায়সের নেতৃত্বে ইয়েমেনের এক প্রতিনিধি দল এসে মদিনায় উপস্থিত হলো। তারা এসে আমীরুল মুমিনীনকে খুঁজতে লাগল।
যখন ওমর (রাঃ) আহনাফকে দেখলেন তিনি তাকে বললেন, আহনাফ জামা খুলে এসো, উটের সেবায় আমীরুল মুমিনীনকে সহযোগিতা কর। এতে তো ইয়াতিম, মিসকীন ও বিধবাদের অধিকার রয়েছে।
উপস্থিত একজন বলল, আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, আপনি কোনো গোলামকে আদেশ দিলেই তো সে কাজটি করে দিত।
তখন ওমর (রাঃ) খুব সাধারণভাবে বললেন, আমার ও আহনাফের চেয়ে অধম গোলাম আর কে আছে, যে ব্যক্তিকে মুসলমানদের দায়িত্ব নিয়োগিত করা হলো সে তো মুসলমানদের দাস হয়ে গেল। গোলামের ওপর যেমন মালিকের কাজ করে দেওয়া আবশ্যক তেমনি গভর্নরদের ওপরও আবশ্যক মুসলমানদের কাজ করে দেওয়া。
টিকাঃ
১০৭ আল কানজ, হাদিস নং ১৪৩০৭ ও মাযাকিবে আমীরুল মুমিনীন ৬২।