📄 আল্লাহ তা'আলা যে মহিলার কথা শুনেছেন
বয়োবৃদ্ধ একজন অন্ধ মহিলা লাঠি দ্বারা খুঁজে খুঁজে পথ চলছেন। বয়সের চাপে আজ তাঁর পিঠে কুঁজ ধরেছে। তাঁর শরীরের ভারে নুয়ে পড়েছেন। এর পাশেই ওমর ﷺ লোকজনেরা পথে বসে ছিলেন।
ওমর ﷺ এর সাথে থাকা সাহাবীদের মধ্যে থেকে কয়েকজন লোক তাঁর কাছে আসলেন। তিনি তাঁর কাছে হাত রাখলেন এবং তাঁর কথা শুনার জন্য মাথা নিচু করে মহিলার মুখ বরাবর কান নিয়ে আসলেন। মহিলাটি এত ক্ষীণ আওয়াজে কথা বলছিলেন যে, ওমর ﷺ তাঁর মুখ বরাবর কান দেওয়ার পরও সাহাবীরাই শুনতে পাচ্ছিলেন না। মহিলাটি তাঁর কথা শেষ না করা পর্যন্ত ওমর ﷺ দাঁড়িয়ে থেকে তাঁর কথা শুনলেন। মহিলাটি কথা শেষ হওয়ার পর ওমর ﷺ তাঁর সাহাবীদের কাছে ফিরে এলেন, যারা দীর্ঘক্ষণ যাবত তাঁর অপেক্ষায় বসেছিলেন।
তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল, আমীরুল মুমিনীন! আপনি একজন বৃদ্ধার সাথে কথা বলতে গিয়ে কুরাইশ নেতাদেরকে এভাবে বসিয়ে রাখলেন?
ওমর ﷺ বললেন, দূরর্ভাগা! তুমি কি জান মহিলাটি কে?
লোকটি বলল, না তো!
তিনি বললেন, তিনি তো সেই মহিলা যার অভিযোগ আল্লাহ তা’আলা সাত আকাশের ওপরে থেকে শুনেছেন। ইনি তো যাওয়াতো বিনতে ছালাবা। আল্লাহর শপথ! তিনি যদি রাত পর্যন্তও কথা বলে যেতেন তবুও তাঁর কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি ফিরতাম না。
টিকাঃ
২২২ আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, আল-কামিল ফি-তারিখ, ২য় খণ্ড, ৭২ পৃ.
📄 বৃদ্ধা কবি
মদিনার উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি কুটিরের। ঘরটির ভেতরে মিট মিট করে একটি প্রদীপ জ্বলছে। সে রাতে ওমর ﷺ সে পথ ধরে হাঁটছিলেন। ওমর ﷺ আলো দেখতে পেয়ে কুঁড়েঘরটির কাছে গেলেন। তিনি দেখতে পেলেন এক বৃদ্ধা মহিলা দরজার চৌকাঠে বসে বসে গুন গুন করে কবিতা আবৃত্তি করছে।
صَلّ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَاةَ الْأَبْرَارِ عَلَّ كُنْتَ فَيْ قَبْلِ الْأَخْيَارِ يَا لَيْتَ حِفْرِي وَالْبَاقِ الْأَنْوَارِ فَنَ تَخْفِفِي وَخَوُبِي الْأَنْوَارِ
পুণ্যবানদের দু'কান সুহাদরেন ওপর তোমার ওপরে প্রেরণাটা দু'কান পাট করে মুহাম্মদের জন্য কেঁদ কেঁদ কত সকাল কাটিয়েছিলাম।
ওমর ﷺ এর কবিতা ও আমার স্বপ্ন
তুমি কি আমাকে ও আমার বন্ধুকে এক ঘরে একত্রিত করতে পারবে?
মহিলার কবিতা শুনে ওমর ইবনুল খাত্তাব ﷺ এর অন্তরে পুরানো দিনের স্মৃতিগুলো মনে পড়ে গেল। দুই চোখের অশ্রু ছেড়ে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তিনি দরজাটা টুকা দিলেন। তখন মহিলা বলল, কে? তিনি কান্না জড়িত স্বরে বললেন, ওমর বিন খাত্তাব। মহিলা বলল, আমার কাছে ওমরের কি প্রয়োজন? তিনি এ সময়ে কেন আসবেন?
তিনি বললেন, তুমি দরজাটা খোল, আল্লাহ তা’আলা ওমর রহম করুন। তোমার কোনো সমস্যা হবে না। তখন মহিলাটি দরজাটা খুলল। ওমর ﷺ ঘরে প্রবেশ করে বসলেন, তোমার কবিতাটি পুনরায় আবৃত্তি করে আমাকে শুনাও। মহিলাটি কবিতাটি আবার আবৃত্তি করল। মহিলাটি আবৃত্তি শেষ হলে তিনি বললেন, আমি তোমার কাছে চাচ্ছি- তুমি তোমার রাসূল ﷺ -এর মাঝে আমাকে রাখ।
তখন মহিলা কবিতার শেষ আরেকটি লাইন যোগ করে নিল, يَا لَاغِيْ حِفْرِي وَالْبَاقِيْ الْأَنْوَارِ فَنَ تَخْفِفِي وَخَوُبِي الْأَنْوَارِ غِفَارٌ – ‘এরপর ওমরও, আপনি তাকে ক্ষমা করুন, হে গাফফার’
টিকাঃ
২২৬ মুসনাদে কানযুল উম্মাল, ৪র্থ খণ্ড, ৩৬১ পৃ.
📄 ক্ষুধার্ত শিশু
মদিনার চারদিকে কোলাহল, নানান দেশের পসরাখাময় মুখরিত প্রুড়াগামি মদিনা নগরী। ওমর ﷺ তাঁর সঙ্গী আব্দুর রহমান বিন আওফ ﷺ -কে বললেন, আজ রাতে আমরা ব্যবসায়ীদের মালামাল পাহারা দিব এতে তোমার কোনো আপত্তি আছে?
এরপর তারা দুইজনে মিলে পাহারা দিতে লাগলেন এবং সাথে সাথে নামাযও পড়ছিলেন। এভাবেই তাঁদের দুইজনের রাত কাটছিল। এমন সময় ওমর ﷺ একটি শিশুর কান্না শুনতে পেলেন। কান্নায় আওয়াজটি যেদিক থেকে আসছিল ওমনি সেদিকে গেলেন। তিনি গিয়ে দেখলেন, একটি শিশু কাঁদছে। তখন তিনি শিশুর কান্না বন্ধ করার চেষ্টা করছিল, তাঁকে বললেন, আল্লাহকে ভয় কর, শিশুটির প্রতি সদয়?
কথাগুলো বলে তিনি তাঁর দাওয়াতের জায়গায় চলে এসেছেন। হঠাৎ করে কথাগুলো আবারো শিশুর আওয়াজ শুনা গেল। ওমর ﷺ পুনরায় গিয়ে শিশুটির মাকে কথাগুলো আবার বললেন, কিন্তু শেষ রাতেও তিনি শিশুটির কান্না শুনতে পেলেন। তখন তিনি আবারো মহিলাটির কাছে গিয়ে রেগে বললেন, তোমার জননী ধ্বংস! আমি দেখছি তুমি একজন নিষ্ঠুর মা। কি হয়েছে, শিশুটি কেন সারারাত রাত কাঁদছে।
মহিলা দুঃখভরা কন্ঠে বলল, হে আল্লাহ! বান্দা, এ রাতে তুমি আমাকে খুবই বিরক্ত করেছ, আমি তো তাকে দুধ ছাডাতে চাচ্ছি।
ওমর ﷺ বললেন, কিন্তু কেমন?
মহিলা ওমর ﷺ কে বলল, ওঁর তো দুগ্ধপোষাদের জন্য ভাত দেয় না।
কথাটি ওমর ﷺ -এর আত্মা কেঁপে উঠল। তিনি কেঁপা কেঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, শিশুটির বয়স কত? মহিলা বলল, এ মাস।
তিনি বললেন, আফসোস! তুমি তাঁর দুগ্ধ ছাড়াতে তাড়াতাড়ি করো না। পাহারা দেওয়া শেষ করে তিনি ফজরের নামাযে দাঁড়ালেন। নামাযে কিরাত পড়তে গিয়ে তিনি এমনভাবে কাঁদছিলেন যে, লোকজন তাঁর কিরাত স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছিল। নামায শেষ করে তিনি বললেন, আহা! ওমরের খারাপি! সে মুসলমানদের কত সন্তানদেরকে হত্যা করেছে!
এরপর ওমর ﷺ দুগ্ধপোষ্য শিশুদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দিলেন。
টিকাঃ
২২৭ তাবাকাত ইবনে সা'দ, ৩য় খণ্ড, ৩৩১ পৃ.
📄 অন্ধ বৃদ্ধা মহিলা
মদিনা নগরীর উপকণ্ঠে এক বৃদ্ধা মহিলা বসবাস করতেন। সম্পদ বলতে তাঁর ছিল একটি ছাগল, একটি বালতি ও পুরনো ছেঁড়া একটি মাদুর। ওমর ﷺ প্রতিরাতেও সেখানে গমন করে মহিলাটির পরিচর্যা করতেন। তিনি মহিলার পানি এনে দেওয়াসহ অন্য সব কাজ করে দিয়ে যেতেন।
একদিন ওমর ﷺ মহিলাটি সেবা করে গিয়ে দেখলেন- ঘরের সবকিছু সাজানো-গোছানো। তখন তিনি তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন একজন একজন লোক তাঁর পূর্বে এসে সবকাজ করে দিয়েছে।
এরপর ওমর ﷺ প্রতিদিনই এসে দেখতেন তাঁর পূর্বে কেউ একজন এসে মহিলাটির সব কাজ করে দিত।
একদিন ওমর ﷺ লোককে দেখাবার জন্য তিনি ঘরের কাছে এক জায়গায় লুকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। তাঁকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। এরই মধ্যে তিনি লোককে মহিলাটির ঘরে দিকে আসতে দেখলেন। লোকটি ঘরে এসে দরজার টুকা দিতে ভেতরে প্রবেশ করল, ............। লোকটি অন্য কেউ নন, তিনি বরং আবু বকর ﷺ , যিনি তখন মুসলিম জাহানের খলিফা ছিলেন। ওমর ﷺ -এর কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর তিনি আড়াল থেকে বের হয়ে এসে অবাক হয়ে বললেন, আপনি! আমার জীবনের শপথ, ........আপনি! আমার জীবনের শপথ。
টিকাঃ
২২৮ তাবাকাত ইবনে সা'দ, ৩য় খণ্ড, ৩৩১ পৃ.