📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় ওমর রা.

📄 ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় ওমর রা.


ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলাম গ্রহণ করার পর মক্কার মুশরিকদেরকে উত্তেজিত করতে চাইলেন। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন- কোরাইশদের মধ্যে কোন ব্যক্তির কাছে কিছু বললে গোপন থাকে না। তারা বলল, এক ব্যক্তি আছে, যার নাম- জামিল বিন মা’মার আল জুমাহী। ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, জামিল! আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং মুহাম্মাদের ধর্মে প্রবেশ করেছি। লোকটি হযরত ওমরকে তখন ভালোভাবে চিনত না। লোকটি তাঁর থেকে এ কথা শোনার সাথে সাথে মক্কার অলি-গলিতে হেঁটে বলতে লাগল, হে কোরাইশরা! ওমর ধর্ম ত্যাগ করেছে। ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পিনছনে ছিলেন, সে মিথ্যা বলছে; বরং আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি আর সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা শুনে কোরাইশরা তাঁর দিকে তেড়ে আসল। উদ্দেশ্য তাঁকে হত্যা করবে। তারা তাকে আঘাত করতে শুরু করল। তিনি তাদের আঘাতগুলো প্রতিরোধ করতে লাগলেন। অবশেষে আ’স বিন ওয়ায়েল আসসাহাবী এসে উপস্থিত হলেন। তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। যিনি আস বিন ওয়ায়েলের পিতা ছিলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, এর কী হয়েছে? তারা বলল, সে আমাদের বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করেছে। তখন তিনি বললেন, লোকটি তার নিজের জন্য যা ইচ্ছে পছন্দ করে নিয়েছে, এখন তোমরা কি করতে চাও? যদি তোমরা তাকে হত্যা কর বনু আদী গোত্র তোমাদেরকে ছাড়বে না। এ কথা শুনে তারা ও ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু -কে ছেড়ে নিজেদের কাজে চলে গেল। এরপর ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় কি আমরা সত্যের ওপর নই? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই, যার হাতে আমার প্রাণ নিশ্চয়ই তোমরা সত্যের ওপর আছ, চাই তোমরা মারা যাও অথবা বেঁচে থাক। তখন ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন, তাহলে আমরা কেন লুকিয়ে থাকব। যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আমরা প্রকাশ্যে বের হব। মুসলমানগণ দু’টি সারিতে বের হয়েছেন। তাদের এক সারিতে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর রাসূলের সিংহ হযরত হামযা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। তাঁরা একের পর এক কদম সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। মুশরিকগণ শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। তাদের চেহারায় কালো ছায়া নেমে আসে। তারা একবার হামযা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু -এর দিকে তাকায় আবার ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু-এর দিকে তাকায়। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেই দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে একটি উত্তম উপহার পেয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ‘ফারুক’ উপাধিতে ভূষিত করলেন। ফারুক অর্থ, পার্থক্যকারী। কেননা ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্য করেছেন। তিনি মক্কাবাসীর সামনে প্রকাশ্যে সত্যধর্ম ইসলামকে তুলে ধরেছেন। তখন তাঁকে ফারুক নামে ডাকলে তিনি খুশি হতেন। মুসলমানগণ তাঁকে আবু হাফস উপনামেও ডাকত। আবু হাফস অর্থ সিংহের বাবা। এ নামটি ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছিলেন। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলাম গ্রহণ করার পর মক্কায় খুবোই খুশি হয়েছিলেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের মধ্যে দিয়ে তাঁদের মনে প্রশান্তি আসে। হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে আমরা শক্তিশালী হয়েছি। হযরত সুহাইব ইবনুল আরকুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে আমরা কা’বার চত্বরে প্রকাশ্যে বসতাম।

📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 হিজরতের পথে ওমর রা.

📄 হিজরতের পথে ওমর রা.


নবুয়াতের তেরো বছর পার হয়ে গেল। রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবীদেরকে এ তেরো বছরে কোরাইশদের থেকে অনেক নির্যাতন ও কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে। নবুয়াতের তেরো বছর পর আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবীকে ইশারদিয়ে হিজরতের অনুমতি দিলেন। রাসূল ﷺ হিজরতের অনুমতি পেয়ে তাঁর সাহাবীদেরকে গোপনে গোপনে মদিনার দিকে রওনা দিতে নির্দেশ দিলেন। রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবিগণ গোপনে গোপনে মদিনায় হিজরত করলেন, কিন্তু হযরত ওমর ﷺ প্রকাশ্যে কোরাইশদের চোখের সামনে দিয়ে মদিনায় হিজরত করলেন। তাঁর হিজরত কেমন ছিল?......
ওমর ﷺ তাঁর তলোয়ার তরবারি ঝুলিয়ে নিলেন, তীর, ধনুকও সাথে নিলেন এবং হাতে লাঠি নিলেন। এরপর তিনি কা'বার প্রাঙ্গণে গেলেন। সেখানে তিনি তাওয়াফ করলেন। তাওয়াফ শেষে মাকামে ইবরাহিমে দু রাকাত নামায আদায় করলেন।
এরপর তিনি কা'বার পাশে বসা কোরাইশদের সকল বৈঠকখানায় গিয়ে বললেন, চেহারাগুলো ছাইবর্ণ হয়েছে, আল্লাহ তা’আলা ও লাজমা ছাড়া আর কিছুই দিলেন না, তোমাদের মধ্যে কে চাও তাঁর মা তাকে হারিয়ে ফেলুক, তাঁর সন্তানরা ইয়াতিম হয়ে যাক, তাঁর স্ত্রী বিধবা হয়ে যাক সে যেন এ উপত্যকার পেছনে আমার সাথে লড়তে আসে। তাঁর এমন কথা শুনার পর কেউ তাঁর বাধা দিতে সাহস করেনি। তাঁর সাথে অন্যান্য দুর্বল মুসলমানগণও হিজরত করতে রওনা দিলেন। তিনি তাঁদেরকেসহ মদিনায় হিজরত করলেন。

টিকাঃ
১৭৯ বুখারী: হাদীস লিগ আহফাল।
১৮০ বুখারী: হাদীস লিগ আহফাল।
১৮۱ বুখারী: হাদীস লিগ আহফাল।

📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 আল্লাহ তা'আলা যে মহিলার কথা শুনেছেন

📄 আল্লাহ তা'আলা যে মহিলার কথা শুনেছেন


বয়োবৃদ্ধ একজন অন্ধ মহিলা লাঠি দ্বারা খুঁজে খুঁজে পথ চলছেন। বয়সের চাপে আজ তাঁর পিঠে কুঁজ ধরেছে। তাঁর শরীরের ভারে নুয়ে পড়েছেন। এর পাশেই ওমর ﷺ লোকজনেরা পথে বসে ছিলেন।
ওমর ﷺ এর সাথে থাকা সাহাবীদের মধ্যে থেকে কয়েকজন লোক তাঁর কাছে আসলেন। তিনি তাঁর কাছে হাত রাখলেন এবং তাঁর কথা শুনার জন্য মাথা নিচু করে মহিলার মুখ বরাবর কান নিয়ে আসলেন। মহিলাটি এত ক্ষীণ আওয়াজে কথা বলছিলেন যে, ওমর ﷺ তাঁর মুখ বরাবর কান দেওয়ার পরও সাহাবীরাই শুনতে পাচ্ছিলেন না। মহিলাটি তাঁর কথা শেষ না করা পর্যন্ত ওমর ﷺ দাঁড়িয়ে থেকে তাঁর কথা শুনলেন। মহিলাটি কথা শেষ হওয়ার পর ওমর ﷺ তাঁর সাহাবীদের কাছে ফিরে এলেন, যারা দীর্ঘক্ষণ যাবত তাঁর অপেক্ষায় বসেছিলেন।
তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল, আমীরুল মুমিনীন! আপনি একজন বৃদ্ধার সাথে কথা বলতে গিয়ে কুরাইশ নেতাদেরকে এভাবে বসিয়ে রাখলেন?
ওমর ﷺ বললেন, দূরর্ভাগা! তুমি কি জান মহিলাটি কে?
লোকটি বলল, না তো!
তিনি বললেন, তিনি তো সেই মহিলা যার অভিযোগ আল্লাহ তা’আলা সাত আকাশের ওপরে থেকে শুনেছেন। ইনি তো যাওয়াতো বিনতে ছালাবা। আল্লাহর শপথ! তিনি যদি রাত পর্যন্তও কথা বলে যেতেন তবুও তাঁর কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি ফিরতাম না。

টিকাঃ
২২২ আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, আল-কামিল ফি-তারিখ, ২য় খণ্ড, ৭২ পৃ.

📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 বৃদ্ধা কবি

📄 বৃদ্ধা কবি


মদিনার উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি কুটিরের। ঘরটির ভেতরে মিট মিট করে একটি প্রদীপ জ্বলছে। সে রাতে ওমর ﷺ সে পথ ধরে হাঁটছিলেন। ওমর ﷺ আলো দেখতে পেয়ে কুঁড়েঘরটির কাছে গেলেন। তিনি দেখতে পেলেন এক বৃদ্ধা মহিলা দরজার চৌকাঠে বসে বসে গুন গুন করে কবিতা আবৃত্তি করছে।
صَلّ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَاةَ الْأَبْرَارِ عَلَّ كُنْتَ فَيْ قَبْلِ الْأَخْيَارِ يَا لَيْتَ حِفْرِي وَالْبَاقِ الْأَنْوَارِ فَنَ تَخْفِفِي وَخَوُبِي الْأَنْوَارِ
পুণ্যবানদের দু'কান সুহাদরেন ওপর তোমার ওপরে প্রেরণাটা দু'কান পাট করে মুহাম্মদের জন্য কেঁদ কেঁদ কত সকাল কাটিয়েছিলাম।
ওমর ﷺ এর কবিতা ও আমার স্বপ্ন
তুমি কি আমাকে ও আমার বন্ধুকে এক ঘরে একত্রিত করতে পারবে?
মহিলার কবিতা শুনে ওমর ইবনুল খাত্তাব ﷺ এর অন্তরে পুরানো দিনের স্মৃতিগুলো মনে পড়ে গেল। দুই চোখের অশ্রু ছেড়ে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তিনি দরজাটা টুকা দিলেন। তখন মহিলা বলল, কে? তিনি কান্না জড়িত স্বরে বললেন, ওমর বিন খাত্তাব। মহিলা বলল, আমার কাছে ওমরের কি প্রয়োজন? তিনি এ সময়ে কেন আসবেন?
তিনি বললেন, তুমি দরজাটা খোল, আল্লাহ তা’আলা ওমর রহম করুন। তোমার কোনো সমস্যা হবে না। তখন মহিলাটি দরজাটা খুলল। ওমর ﷺ ঘরে প্রবেশ করে বসলেন, তোমার কবিতাটি পুনরায় আবৃত্তি করে আমাকে শুনাও। মহিলাটি কবিতাটি আবার আবৃত্তি করল। মহিলাটি আবৃত্তি শেষ হলে তিনি বললেন, আমি তোমার কাছে চাচ্ছি- তুমি তোমার রাসূল ﷺ -এর মাঝে আমাকে রাখ।
তখন মহিলা কবিতার শেষ আরেকটি লাইন যোগ করে নিল, يَا لَاغِيْ حِفْرِي وَالْبَاقِيْ الْأَنْوَارِ فَنَ تَخْفِفِي وَخَوُبِي الْأَنْوَارِ غِفَارٌ – ‘এরপর ওমরও, আপনি তাকে ক্ষমা করুন, হে গাফফার’

টিকাঃ
২২৬ মুসনাদে কানযুল উম্মাল, ৪র্থ খণ্ড, ৩৬১ পৃ.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00