📄 জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় আপনি কতই না উত্তম
মদিনার প্রান্তসীমার উঁচু ভূমিতে হযরত আবু বকর রা নিজ বাড়িতে গেলেন। উদ্দেশ্য ক্লান্তি দূর করতে সামান্য সময় বিশ্রাম নিবেন। কিন্তু কিছুক্ষণ না যেতেই এক ঘোষকাকারী মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণা করতে দ্রুত দৌড়ে এসেছিল। সে হযরত আবু বকর রা-এর বাড়ির সামনে এসে চিৎকার দিয়ে বলল, হে আবু বকর......... হে আবু কুহাফার ছেলে! হযরত আবু বকর রা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বের হয়ে এলেন। তিনি ওই লোকটির দিকে তাকালে লোকটি তাঁর দুঃখভরা মন নিয়ে দু'ঠোঁট নাড়িয়ে বলল, আল্লাহ্র রাসূল ইন্তিকাল করেছেন। এ কথা শুনে হযরত আবু বকর রা-এর অন্তর কেঁপে উঠল। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝর ঝর করে পড়তে লাগল। তিনি দ্রুত রাসূল সা-এর বাড়ির দিকে ছুটলেন। হযরত আবু বকর রাসূল সা-এর বাড়িতে এসে দেখতে পেলেন মানুষের বিষণ্ণ মনে কেউ বসে আছে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখ দিয়ে অশ্রুর বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। তখন সকলের হৃদয়ে কান্নার রুদ্ধ স্মরণ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল দুঃখে মনের আকাশ ভেঙে যাবে। এমনকি হযরত ওমর রা তাঁর তরবারি উন্মুক্ত করে চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলেন, যে বলবে মুহাম্মদ মারা গেছেন আমি তার ধড়ে এ তরবারি দিয়ে আঘাত করব। হযরত আবু বকর রা মানুষকে রেখে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন। তিনি গিয়ে দেখলেন রাসূল সা-কে দেওয়ালের পাশে চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। হযরত আবু বকর রা তাঁর সাথে মুখে থেকে চাদর সরিয়ে তাঁর কপালে বিদায়ী চুমু দিলেন। আর তখন রাসূল সা-এর মোবারকময় সুগন্ধি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এতে হযরত আবু বকর রা বললেন, জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় আপনি কতই না উত্তম। তারপর হযরত আবু বকর রা উঠে আসতে লাগলেন যদিও দুঃখ-বেদনায় তাঁর ইষ্ট দাঁড়ানোর শক্তি পাচ্ছিল না। তিনি ঘরের বাইরে এসে মানুষদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, যে লোক সকল! যা ব্যক্তি মুহাম্মদের ইবাদাত করেছ, তবে মুহাম্মদ মারা গেছেন আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্র ইবাদাত করেছ, তবে আল্লাহ্ তা'আলা জীবিত, তিনি কখনো মারা যাবেন না। তারপর তিনি তেলাওয়াত করলেন............ وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ অর্থ- আর মুহাম্মদ রাসূল ব্যতীত অন্য কিছু নন। তাঁর পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। যদি তিনি মারা যান অথবা নিহত হন তবে কি তোমরা পিছু হটে যাবে? বস্তুত যে পিছু হটবে, সে আল্লাহ্র সামান্য ক্ষতিও করতে পারবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, অচিরেই আল্লাহ্ তাদেরকে প্রতিদান দিবেন। (সূরা আলে ইমরান: ১৪৪)
টিকাঃ
৯৪ আল বিদায়া, ৫ ম খণ্ড, (২৮০-২৪৪)
📄 বিষাক্ত মহিলা
রাসূল সা-এর ওফাতের সংবাদ মুখে মুখে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি হাজরামাউত পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তখন মুনাফিকদের কণ্ঠস্বর উচ্চ হয়ে উঠল। আর মুনাফিক নামের সাপগুলো গর্ত থেকে বের হয়ে এল। তাদের মধ্যে কিছু মহিলা নিজের হাত রাঙিয়ে অলিতে-গলিতে ঘুরে নাচের তালে দাফ বাজাতে লাগলেন। এ দৃশ্য দেখে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট এক ব্যক্তি হযরত আবু বকর রা-এর নিকটে চিঠি লিখে জানালেন............... “বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। রাসূল সা-এর ইন্তিকালের খবর শুনে মুসিলমতে একদল মহিলা তাদের হাত রাঙিয়ে অলিতে গলিতে ঘুরে দাফ বাজাতে।" চিঠিটি হযরত আবু বকর রা-এর মাথায় বজ্রের ন্যায় আঘাত করে। তিনি একটি বাহিনী প্রেরণ করেন ওই সকল মহিলাকে একত্রিত করে তাদের হাত কেটে দিলেন。
টিকাঃ
৯৫ আল বিদায়া,
📄 এ তিনটি মর্যাদা কার?
সাকিফায়ে বনী সায়েদায় যখন মানুষের মধ্যে খলিফা নির্বাচন নিয়ে তর্কবিতর্ক চলছিল। তাদের প্রত্যেক নিজেদের নেতাদের প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন। আনসারগণ বললেন, তোমাদের থেকে একজন আমির হবেন আর আমাদের থেকে একজন হবেন। তখন হযরত ওমর রা বললেন, এক খাপে দুই তরবারি থাকতে পারে না। তারপর তিনি হযরত আবু বকর রা-এর কাছে এসে তাঁর হাত ধরে চিৎকার করে বললেন, এ তিনটি মর্যাদা কার? وَنَأْلَفَ لِمَنْ يُفَوِّضُ لِمَجِدٍ "যখন তিনি তাঁর সাহাবীকে বললেন" আল্লাহ্র বাণীতে এ সাহাবী কে? তাঁরা বললেন, আবু বকর। ওমর রা বললেন, إِنَّمَا فِي الْمَارِ যখন তারা তথা.......। এখানে তাঁরা কে? তাঁরা বললেন, নবী সা ও আবু বকর। ওমর রা বললেন, إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا "আল্লাহ্ আমাদের সাথে আছেন.........? কার সাথে আছেন? তাঁরা বললেন, নবী সা ও আবু বকর সাথে। তারপর তিনি বললেন, তাহলে তোমাদের কে আছ যে নিজেকে আবু বকরের থেকে পবিত্র মনে করে তাঁর সম্মুখে যাবে। তাঁরা বললেন, আবু বকরের সম্মুখে এগিয়ে যাওয়া থেকে আমরা আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় চাই। এরপর হযরত ওমর রা এগিয়ে হযরত আবু বকর রা-এর হাত ধরে বললেন, আপনার হাত প্রসারিত করুন, আমি আপনার হাতে বাইয়াতও হব। এ কথা বলে হযরত ওমর রা তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করলেন এবং অন্য মানুষও তাঁর সাথে বাইয়াত গ্রহণ করলেন。
টিকাঃ
৯৬ ফাতহুলুস সাহাবা,
📄 প্রথম ভাষণ
অনেক লজ্জা ও ভয়ে হযরত আবু বকর রা রাসূল সা-এর মিম্বরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি পা সামনে দিছেন আবার এক পা পিছনে দিচ্ছেন। মিম্বরের প্রথম সিঁড়িতে পা রেখে দ্বিতীয় সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন, কিন্তু দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখার পর আর তৃতীয় সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন না। কেননা সেই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে রাসূল সা খুত্বা দিতেন। আর তাই তিনি নিজেকে রাসূল সা-এর স্থানে দাঁড়ান না। এরপর ভাষ্য খিলাফতের দায়িত্ব মাথায় নিয়ে মানুষের উদ্দেশ্যে প্রথম ভাষণ দিতে গিয়ে বললেন, হে লোক সকল!.......আমি তোমাদের আমির নিযুক্ত হয়েছি, তবে আমি তোমাদের থেকে সেরা নই। যদি আমি ভালো কাজ করি তবে তোমরা আমাকে সাহায্য করবে....... আর যদি আমি খারাপ করি তাহলে আমাকে সঠিক পথে নিয়ে আসবে। জেনে রাখ! নিজের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে তোমাদের দুর্বল লোক আমার কাছে অনেক শক্তিশালী। আর অন্যের অধিকার আদায় করে দেওয়ার ক্ষেত্রে অধিকার বণ্টনকারী শক্তিশালী ব্যক্তি আমার নিকট অনেক দুর্বল। আমি যে কাজ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল সা-এর আনুগত্য করব সে কাজে তোমরা আমার আনুগত্য করবে। আর যদি আমি তাঁদের অবাধ্য হই তাহলে আমার আনুগত্য করা তোমাদের জন্য আবশ্যক নয়।