📄 আবু বকর! তাদেরকে ছেড়ে দাও
ঈদের দিনে হঠাৎ করে হযরত আবু বকর رضي الله عنه তাঁর কন্যা আয়েশা رضي الله عنها-এর ঘরে আসলেন। এমন সময় তাঁর কানে আওয়াজ ও সঙ্গীতের সুর বেজে উঠল। আওয়াজ শুনে তা বন্ধ করার জন্যে তিনি দ্রুত বাড়ির আঙ্গিনার দিকে ছুটে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন আনসারদের ছোট ছোট দু'টি মেয়ে গান গাইছিলো। অন্যদিকে রাসূল ﷺ বিছানায় শুয়ে ছিলেন। হযরত আবু বকর رضي الله عنه এ দৃশ্য দেখে ধমকের সুরে তাঁদেরকে বললেন, আল্লাহ্র রাসূলের বাড়িতে শয়তানের বাজনা! তখন রাসূল ﷺ বললেন, আবু বকর! এদেরকে ছেড়ে দাও, কেননা প্রত্যেক জাতির উৎসবের দিন রয়েছে, আর এটি হচ্ছে আমাদের উৎসবের দিন। রাসূল ﷺ-এর চোখে ঘুম নেমে আসলে হযরত আয়েশা رضي الله عنها দু'টিকে ইশারা দিলেন। তখন তারা চলে গেল।
📄 আমার আগেই তিনি সুসংবাদ দিয়ে ফেলেছেন
মদীনার আকাশে তারকারাজি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন, তারা লাজুকের মতো নিজের সামান্য আলো দিয়ে অন্ধকারকে একটু হালকা করার চেষ্টা করছে। ঠিক সে সময়ে রাসূল ﷺ হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর رضي الله عنه-এর সাথে মুসলমানদের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা শেষ করে ফিরছিলেন। মদীনার পথ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাঁরা দেখলেন এক ব্যক্তি নামায পড়ছে, কিন্তু তাঁকে তাঁরা চিনতে পারেননি। রাসূল ﷺ দাঁড়িয়ে তাঁর কেয়াত শুনতে লাগলেন। এরপর বললেন, কোরআন যেভাবে ঠিক সবুজ নাযিল হয়েছে যার ইচ্ছা সেভাবে পড়লে সে যেন উম্মু আব্দ (আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ)-এর মতো করে পড়ে।
তারপর আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ رضي الله عنه বললেন, রাসূল ﷺ বললেন, তুমি চাও, তুমি যা চাইবে তা তোমাকে দেওয়া হবে.......। তুমি চাও, তুমি যা চাইবে তা তোমাকে দেওয়া হবে। হযরত ওমর رضي الله عنه বললেন, আমি মনে করলাম, রাসূল ﷺ তাঁর দোয়ার সাথে আমীন বলেছেন এ সুসংবাদটি কাল সকালে অবশ্যই আমি তাঁকে দিব। আমি তাঁকে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য সকালে গেলাম। গিয়ে দেখি আবু বকর আমার আগে তাকে সুসংবাদ দিয়ে দিয়েছেন। ওহ্ তাই নয়...... আল্লাহ্র কসম করে বলি, আমি কখনো কোনো ভালো কাজে আবু বকরকে পেছনে ফেলতে পারিনি।
টিকাঃ
২৪ মুসনাদে আবু ইয়া'লা (১৪৪) (১ম খন্ড, ৯৭৩) ফর্মা--৪
📄 আবু বকরের পক্ষে আল্লাহর সাক্ষী
শয়তানের চটক....... ইহুদি নামক হিংস্র জানোয়ারগুলো একত্রে বসে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে বিভিন্ন পরিকল্পনা করছিল। তাঁরা আল্লাহ ও রাসূল (স)-এর বিরুদ্ধে এমন এমন কথা বলছিল যা যেকোনো মুসলমানের কানে গেলে তা অন্তরে গিয়ে আঘাত করবে। ইহাছ করে এ চক্রান্তকারীদের মাঝে হযরত আবু বকর رضي الله عنه উপস্থিত হলেন। তিনি গিয়ে দেখলেন তারা ফিনহাস নামক এক লোকের কাছে জড়ো হয়ে আছে। লোকটি ইহুদিদের বিশিষ্ট আলেম ছিল। তাঁকে লক্ষ্য করে আবু বকর رضي الله عنه বললেন, ফিনহাস তোমার জন্যে আফসোস! আল্লাহকে ভয় কর এবং ইসলাম গ্রহণ কর। আল্লাহ্র শপথ! মুহাম্মাদ যে আল্লাহ্র রাসূল তা তুমি ভালোবাসতেই জানো। তিনি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে সত্য নিয়ে তোমাদের কাছে আগমন করেছেন। যা তোমরা তাওরাত ও ইঞ্জিল কিতাবে পেয়েছ। তখন ফিনহাস বলল, আবু বকর! আল্লাহ্র শপথ! আল্লাহ্র প্রতি আমাদের কোনো মুখাপেক্ষিতা নেই; বরং আল্লাহ্ই আমাদের মুখাপেক্ষী। তিনি যেভাবে অনুনয় বিনয় করে আমাদের কাছে চাচ্ছেন আমরা তেমন অনুনয় বিনয় করে তার কাছে চাই না। আমরা তাঁর মুখাপেক্ষী নই; বরং তিনি আমাদের মুখাপেক্ষী। যদি আমাদের মুখাপেক্ষী না হতেন তাহলে আমাদের নিকট তিনি চাইতেন না, যেমনভাবে তোমাদের রাসূল বলেছেন। তিনি আমাদেরকে সুদ খেতে নিষেধ করেছেন আবার নিজেই সুদ দিয়েছেন। যদি তিনি আমাদের থেকে মুখাপেক্ষীহীন হতেন তাহলে আমাদেরকে সুদ দিতেন না।
এ কথাগুলো শুনে হযরত আবু বকর রضي الله عنه প্রচণ্ড রাগান্বিত হয়ে তাকে ধরলেন এবং তার গালে কষে কয়েকটি চড় বসিয়ে দিলেন। তারপর তিনি সিংহের মতো হুংকার দিয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র শপথ! যদি তোমাদের সাথে আমাদের চুক্তি না থাকত তাহলে আমি তোমার মাথায় আঘাত করতাম। ফিনহাস রাসূল ﷺ-এর কাছে গিয়ে অশ্রুঝরা চোখে, কান্না স্বরে বলল, হে মুহাম্মাদ! তোমার সাথী আমার কি করেছে দেখ? রাসূল ﷺ আবু বকর রضي الله عنه-কে বললেন, তুমি কেন এরূপ করেছ? হযরত আবু বকর বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আল্লাহ্র শত্রু জঘন্য কথা বলেছে......... সে বলে আল্লাহ্ই গরিব আর তারা ধনী। যখন সে এ কথা বলেছে তখন আমি আল্লাহ্র জন্যে তার ওপর রাগান্বিত হয়ে তার গালে আঘাত করি। তখন ফিনহাস চিৎকার দিয়ে বলল, মুহাম্মাদ! আবু বকর মিথ্যা বলছে, আমরা এরূপ বলিনি। তখন আল্লাহ্ তা'আলা ফিনহাসের মিথ্যা উন্মোচন ও আবু বকর رضي الله عنه-কে সত্যায়িত করে আয়াত নাযিল করেন। لَّقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ ۘ سَنَكْتُبُ مَا قَالُوا وَقَتْلَهُمُ الْأَنبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَنَقُولُ ذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ অর্থ: নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তাদের কথা শুনেছেন, যারা বলেছে যে, আল্লাহ্ অভাবগ্রস্ত আর আমরা বিত্তবান! তারা যা বলেছে ও যেসব নবীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে এখন তা আমি লিখে রাখব, অতঃপর বলব, জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি আস্বাদন কর। (আলে ইমরান: ১৮১)
📄 আবু কুহাফার ইসলাম গ্রহণ
মক্কা বিজয়ের হেরেমে শরীফে রাসূল ﷺ-এর প্রবেশ ও মূর্তি ভাঙার পর বেশি সময় পার হয়নি। এরই মধ্যে হযরত আবু বকর তাঁর পিতা আবু কুহাফাকে রাসূল ﷺ-এর কাছে নিয়ে আসলেন। রাসূল ﷺ পিতাকে দেখে আফসোসের সাথে বলতে লাগলেন, তুমি কি তোমার বাবাকে ঘরে রেখে আসতে পারনি? আমি নিজেই তাঁর কাছে যেতাম। তখন আবু বকর رضي الله عنه বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি তাঁর কাছে যাওয়ার চেয়ে তিনি আপনার কাছে আসাই অধিক উপযুক্ত।
তারপর আবু কুহাফা রাসূল (ﷺ)-এর সামনে গিয়ে বসলেন। রাসূল (ﷺ) তাঁর বুকে নিজের পবিত্র হাত দ্বারা বুলিয়ে দিলেন যাতে তাঁর অন্তর থেকে কুফরী অন্ধকার দূর হয়ে যায়। তারপর তিনি বললেন, ইসলাম গ্রহণ করুন... রাসূল (ﷺ)-এর কথা মতো তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন।.........আল্লাহ রাসূলের হাতে তাঁকে হেদায়াত দান করলেন।
টিকাঃ
২ মুসনাদে ইমাম আহমদ, ১ম খণ্ড, ৪৬৬ পৃ।