📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 ক্ষুধা-ই আমাদেরকে বের করেছে

📄 ক্ষুধা-ই আমাদেরকে বের করেছে


আকাশের উপরিভাগে সূর্য। উত্তপ্ত মরুভূমিতে বাতুলগুলো যেন আগুনের কয়লা থেকে বসে পড়া অগ্নিকণা। এ কঠিন গরমে হযরত আবু বকর رضي الله عنه ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদের দিকে এসে দেখলেন হযরত ওমর رضي الله عنه ও সেখনে......। হযরত ওমর رضي الله عنه বললেন, হে আবু বকর! এ সময়ে আপনি কেন বের হলেন? হযরত আবু বকর رضي الله عنه বললেন, আমি প্রচন্ড ক্ষুধার জ্বালায় বের হয়েছি। হযরত ওমর رضي الله عنه বললেন, আল্লাহ্র শপথ! আমিও একই কারণে বের হয়েছি। তাঁদের কথোপকথনের মাঝে রাসূল ﷺ-ও সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। রাসূল ﷺ তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করলেন- এ অসময়ে তোমরা কেন বের হয়েছ? তাঁরা বললেন, আল্লাহ্র শপথ! আমরা পেটে প্রচন্ড ক্ষুধার জ্বালা অনুভব করার কারণে বের হয়েছি। রাসূল ﷺ বললেন, যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! আমিও এ একই কারণে বের হয়েছি......। সুতরাং তোমরা আমার সাথে চল। তাঁরা চলতে চলতে হযরত আবু আইয়ুব আল আনসারী রضي الله عنه-এর বাড়িতে আসলেন। তিনি প্রতিদিন রাসূল ﷺ-এর জন্যে খাবার তৈরি করতেন। খাবারের নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরেও যদি রাসূল ﷺ না আসতেন, তখন তিনি খাবারগুলো তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকে খেতে দিতেন।
রাসূল ﷺ ও তাঁর দুই সাহাবী আবু বকর ও ওমর رضي الله عنه আবু আইয়ুব আল আনসারীর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলে তাঁর স্ত্রী তাদেরকে দেখে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ্র নবীকে স্বাগতম আর যাঁরা তাঁর সাথে আগমন করেছেন তাঁদেরকেও স্বাগতম। রাসূল ﷺ তাঁর স্ত্রীকে বললেন, আবু আইয়ুব কোথায়? হযরত আবু আইয়ুব আল আনসারী পাশে একটি খেজুর গাছে কাজ করতো ছিলেন। তিনি রাসূল ﷺ-এর কথা শুনতে পেয়ে তাড়াতাড়ি ছুটে এসে বললেন, আল্লাহ্র রাসূলকে স্বাগতম, আর যাঁরা তাঁর সাথে আগমন করেছেন তাঁদেরকেও স্বাগতম। তারপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনারা স্বাভাবিকভাবে এ সময়ে আসেন না। রাসূল ﷺ বললেন, ঠিক বলেছ। তারপর তিনি খেজুর গাছের দিকে ছুটে গিয়ে একটি খেজুরের কাঁদি কেটে নিয়ে আসলেন। তাতে পাকা, কাঁচা ও শুকনো তিন প্রকারের খেজুরই ছিল। রাসূল ﷺ বললেন, তুমি খেজুরের পুরো কাঁদিটি কেটে আনবে তা আমার ইচ্ছে ছিল না। সেখান থেকে কয়েকটি খেজুর নিয়ে আসলে কি হতো না? তিনি বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি পছন্দ করি, আপনি কাঁচা, পাকা ও শুকনো সব রকমের খেজুর খাবেন। আর অবশ্যই আমি আপনার জন্যে পশু জবাই করব। হযরত আবু আইয়ুব আল আনসারী একটি বকরি ধরে জবাই করে দিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, তুমি ময়দা ভিজাও এবং আমাদের জন্যে রুটি বানাও। কেননা তুমি রুটি ভালো বানাতে পার। তিনি বকরীর অর্ধেক নিয়ে রান্না করেন আর অর্ধেককে কাবাব করেন। যখন রান্না প্রস্তুত হলো তিনি তা রাসূল ﷺ- এর সামনে পেশ করলেন। রাসূল ﷺ বকরীর একটি অংশ নিয়ে রুটিকে রেখে বললেন, হে আবু আইয়ুব আল আনসারী! তুমি এটি ফাতেমাকে দিয়ে আস কেননা সে অনেক দিন যাবত এর মতো খাবার খেতে পায়নি। যখন রাসূল ﷺ খানা খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে বললেন, রুটি, গোশত, শুকনো, পাকা ও কাঁচা খেজুর একথা বলার পর তাঁর দু চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে। এরপর তিনি বললেন, আমার প্রাণ যার হাতে তার শপথ! এ সেই নেয়ামত যার সম্পর্কে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করা হবে। যখন তোমরা তা খেতে হাত বাড়াবে তখন তোমরা বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু কর। আর যখন খেয়ে পরিতৃপ্ত হবে তখন আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করে বল......
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هُوَ أَطْعَمَنَا وَأَسْقَانَا وَفَضَّلَنَا অর্থ- সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ্র জন্য যিনি আমাদেরকে পরিতৃপ্ত করেছেন এবং উৎকৃষ্ট ও উত্তম নেয়ামত দান করেছেন।

টিকাঃ
২৩ আল ইহসান ফি তাফসিরে সহীহ ইবনি হিব্বান, ৫২৩৮।

📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 আবু বকর! তাদেরকে ছেড়ে দাও

📄 আবু বকর! তাদেরকে ছেড়ে দাও


ঈদের দিনে হঠাৎ করে হযরত আবু বকর رضي الله عنه তাঁর কন্যা আয়েশা رضي الله عنها-এর ঘরে আসলেন। এমন সময় তাঁর কানে আওয়াজ ও সঙ্গীতের সুর বেজে উঠল। আওয়াজ শুনে তা বন্ধ করার জন্যে তিনি দ্রুত বাড়ির আঙ্গিনার দিকে ছুটে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন আনসারদের ছোট ছোট দু'টি মেয়ে গান গাইছিলো। অন্যদিকে রাসূল ﷺ বিছানায় শুয়ে ছিলেন। হযরত আবু বকর رضي الله عنه এ দৃশ্য দেখে ধমকের সুরে তাঁদেরকে বললেন, আল্লাহ্র রাসূলের বাড়িতে শয়তানের বাজনা! তখন রাসূল ﷺ বললেন, আবু বকর! এদেরকে ছেড়ে দাও, কেননা প্রত্যেক জাতির উৎসবের দিন রয়েছে, আর এটি হচ্ছে আমাদের উৎসবের দিন। রাসূল ﷺ-এর চোখে ঘুম নেমে আসলে হযরত আয়েশা رضي الله عنها দু'টিকে ইশারা দিলেন। তখন তারা চলে গেল।

📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 আমার আগেই তিনি সুসংবাদ দিয়ে ফেলেছেন

📄 আমার আগেই তিনি সুসংবাদ দিয়ে ফেলেছেন


মদীনার আকাশে তারকারাজি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন, তারা লাজুকের মতো নিজের সামান্য আলো দিয়ে অন্ধকারকে একটু হালকা করার চেষ্টা করছে। ঠিক সে সময়ে রাসূল ﷺ হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর رضي الله عنه-এর সাথে মুসলমানদের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা শেষ করে ফিরছিলেন। মদীনার পথ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাঁরা দেখলেন এক ব্যক্তি নামায পড়ছে, কিন্তু তাঁকে তাঁরা চিনতে পারেননি। রাসূল ﷺ দাঁড়িয়ে তাঁর কেয়াত শুনতে লাগলেন। এরপর বললেন, কোরআন যেভাবে ঠিক সবুজ নাযিল হয়েছে যার ইচ্ছা সেভাবে পড়লে সে যেন উম্মু আব্দ (আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ)-এর মতো করে পড়ে।
তারপর আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ رضي الله عنه বললেন, রাসূল ﷺ বললেন, তুমি চাও, তুমি যা চাইবে তা তোমাকে দেওয়া হবে.......। তুমি চাও, তুমি যা চাইবে তা তোমাকে দেওয়া হবে। হযরত ওমর رضي الله عنه বললেন, আমি মনে করলাম, রাসূল ﷺ তাঁর দোয়ার সাথে আমীন বলেছেন এ সুসংবাদটি কাল সকালে অবশ্যই আমি তাঁকে দিব। আমি তাঁকে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য সকালে গেলাম। গিয়ে দেখি আবু বকর আমার আগে তাকে সুসংবাদ দিয়ে দিয়েছেন। ওহ্ তাই নয়...... আল্লাহ্র কসম করে বলি, আমি কখনো কোনো ভালো কাজে আবু বকরকে পেছনে ফেলতে পারিনি।

টিকাঃ
২৪ মুসনাদে আবু ইয়া'লা (১৪৪) (১ম খন্ড, ৯৭৩) ফর্মা--৪

📘 খোলাফায়ে রাশেদীনের ৬০০ শিক্ষণীয় ঘটনাবলী > 📄 আবু বকরের পক্ষে আল্লাহর সাক্ষী

📄 আবু বকরের পক্ষে আল্লাহর সাক্ষী


শয়তানের চটক....... ইহুদি নামক হিংস্র জানোয়ারগুলো একত্রে বসে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে বিভিন্ন পরিকল্পনা করছিল। তাঁরা আল্লাহ ও রাসূল (স)-এর বিরুদ্ধে এমন এমন কথা বলছিল যা যেকোনো মুসলমানের কানে গেলে তা অন্তরে গিয়ে আঘাত করবে। ইহাছ করে এ চক্রান্তকারীদের মাঝে হযরত আবু বকর رضي الله عنه উপস্থিত হলেন। তিনি গিয়ে দেখলেন তারা ফিনহাস নামক এক লোকের কাছে জড়ো হয়ে আছে। লোকটি ইহুদিদের বিশিষ্ট আলেম ছিল। তাঁকে লক্ষ্য করে আবু বকর رضي الله عنه বললেন, ফিনহাস তোমার জন্যে আফসোস! আল্লাহকে ভয় কর এবং ইসলাম গ্রহণ কর। আল্লাহ্র শপথ! মুহাম্মাদ যে আল্লাহ্র রাসূল তা তুমি ভালোবাসতেই জানো। তিনি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে সত্য নিয়ে তোমাদের কাছে আগমন করেছেন। যা তোমরা তাওরাত ও ইঞ্জিল কিতাবে পেয়েছ। তখন ফিনহাস বলল, আবু বকর! আল্লাহ্র শপথ! আল্লাহ্র প্রতি আমাদের কোনো মুখাপেক্ষিতা নেই; বরং আল্লাহ্ই আমাদের মুখাপেক্ষী। তিনি যেভাবে অনুনয় বিনয় করে আমাদের কাছে চাচ্ছেন আমরা তেমন অনুনয় বিনয় করে তার কাছে চাই না। আমরা তাঁর মুখাপেক্ষী নই; বরং তিনি আমাদের মুখাপেক্ষী। যদি আমাদের মুখাপেক্ষী না হতেন তাহলে আমাদের নিকট তিনি চাইতেন না, যেমনভাবে তোমাদের রাসূল বলেছেন। তিনি আমাদেরকে সুদ খেতে নিষেধ করেছেন আবার নিজেই সুদ দিয়েছেন। যদি তিনি আমাদের থেকে মুখাপেক্ষীহীন হতেন তাহলে আমাদেরকে সুদ দিতেন না।
এ কথাগুলো শুনে হযরত আবু বকর রضي الله عنه প্রচণ্ড রাগান্বিত হয়ে তাকে ধরলেন এবং তার গালে কষে কয়েকটি চড় বসিয়ে দিলেন। তারপর তিনি সিংহের মতো হুংকার দিয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র শপথ! যদি তোমাদের সাথে আমাদের চুক্তি না থাকত তাহলে আমি তোমার মাথায় আঘাত করতাম। ফিনহাস রাসূল ﷺ-এর কাছে গিয়ে অশ্রুঝরা চোখে, কান্না স্বরে বলল, হে মুহাম্মাদ! তোমার সাথী আমার কি করেছে দেখ? রাসূল ﷺ আবু বকর রضي الله عنه-কে বললেন, তুমি কেন এরূপ করেছ? হযরত আবু বকর বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আল্লাহ্র শত্রু জঘন্য কথা বলেছে......... সে বলে আল্লাহ্ই গরিব আর তারা ধনী। যখন সে এ কথা বলেছে তখন আমি আল্লাহ্র জন্যে তার ওপর রাগান্বিত হয়ে তার গালে আঘাত করি। তখন ফিনহাস চিৎকার দিয়ে বলল, মুহাম্মাদ! আবু বকর মিথ্যা বলছে, আমরা এরূপ বলিনি। তখন আল্লাহ্ তা'আলা ফিনহাসের মিথ্যা উন্মোচন ও আবু বকর رضي الله عنه-কে সত্যায়িত করে আয়াত নাযিল করেন। لَّقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ ۘ سَنَكْتُبُ مَا قَالُوا وَقَتْلَهُمُ الْأَنبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَنَقُولُ ذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ অর্থ: নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তাদের কথা শুনেছেন, যারা বলেছে যে, আল্লাহ্ অভাবগ্রস্ত আর আমরা বিত্তবান! তারা যা বলেছে ও যেসব নবীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে এখন তা আমি লিখে রাখব, অতঃপর বলব, জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি আস্বাদন কর। (আলে ইমরান: ১৮১)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00