📄 সফর সঙ্গী, হে আল্লাহর রাসূল
এক তীব্র গরমের দিনে সূর্য তাঁর তীব্র তাপ দিয়ে মক্কা নগরীকে উত্তপ্ত করছিল। মানুষ তাপের তীব্রতা নিয়ে বলাবলি করছিল। এ তীব্র গরমের দিনে ঠিক দুপুরে যখন উত্তপ্ত বালির চরেরা ঝলসায়ে পড়ছিল তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব দ্রুততার সাথে হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু-এর কাছে রওনা দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাভাবিকভাবে সকাল বা সন্ধ্যা ব্যতীত অন্য সময়ে আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু-এর কাছে যেতেন না। আল্লাহ হিজরতের অনুমতি দেওয়া পর্যন্ত এমনি চলছিল। হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু-এর দৃষ্টি যখন তাঁর প্রিয় বন্ধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর গিয়ে পড়ল, তিনি বুঝতে পারলেন যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ তীব্র গরমের ভেতরে তাঁর কাছে এসেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলে হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু তাঁকে বসতে দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তখন হযরত আয়েশা ও হযরত আসমা রাদিআল্লাহু আনহুমা ব্যতীত হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু-এর কাছে কেউ ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তোমার কাছে যারা আছে তাদেরকে আমার থেকে দূরে নিয়ে যাও।
তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এরা আমার কন্যা। আমার পিতা মাতা আপনার জন্যে উৎসর্গিত, কি হয়েছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তা'আলা আমাকে মক্কা থেকে বের হওয়ার ও হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন। তিনি তখন অশ্রু ভরা চোখে বললেন, সফর সঙ্গী....... হে আল্লাহর রাসূল! হিজরতে আপনার সফর সঙ্গী হতে চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, সফর সঙ্গী, আবূ বকর! হযরত আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা বললেন, সেদিন আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু-এর কান্না দেখব আশা জানতাম না যে, কেউ অধিক খুশিও কাঁদতে পারে। হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু তাঁর পূর্ব সম্পদ পাঁচ হাজার দিরহাম নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে হিজরতে রওনা দেন। তখন তাঁর বৃদ্ধ দুঃখিনী পিতা আবূ কুহাফা এসে উচ্চৈঃস্বরে বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি তাকে সব মাল নিয়ে যেতে দেখেছি। তাকে চুপ রাখতে আসমা রাদিআল্লাহু আনহা বললেন, না; বরং তিনি আমাদের জন্যে অনেক কল্যাণ রেখে গেছেন। হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু যে অর্থ সম্পদ রাখতেন সে ঘরে তিনি একটি ব্যাগ কিছু পাথর রেখে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলেন। তারপর তাঁর দাদাকে নিয়ে গিয়ে বললেন, দাদা! এ সম্পদের ওপর হাত রেখে দেখুন। তখন তাঁর দাদা তাতে হাত রেখে খুশি হয়ে বললেন, কোনো সমস্যা নেই, সে তোমাদের জন্য ভালো রেখে ভালো করেছে। এতে তোমাদের চলবে। হযরত আসমা রাদিআল্লাহু আনহা বললেন, আল্লাহর শপথ! তিনি কিছুই রাখেননি, কিন্তু বৃদ্ধ লোকটিকে চুপ রাখতে আমি এ কাজ করেছি।
টিকাঃ
১. আস সিরাতুন নববী লি ইবনি হিশাম, ২য় খণ্ড, ১০৬-১০৯, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, ১৭৯।
📄 রোম পরাজয় বরণ করেছে
তীব্র যুদ্ধ চলছিল, ঘোড়ার পদচারণাতে চারদিকে বালু উড়ছিল। চারদিকে তরবারির আঘাতে অনবরত ধ্বনি শুনা যাচ্ছিল। অন্যদিকে সূর্যের তাপে যেন হয় সব পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। এই মধ্যে মক্কায় উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার দিয়ে ঘোষিত হতে লাগল যে, পারস্যরা রোমের ওপর বিজয় লাভ করেছে। মুশরিকদের খুশির সীমা নেই। কেননা পারস্যরা কিতাবের অনুসারী নয়; বরং তাদের মতো মুশরিক। আর তাই মক্কার মুশরিকরা কামনা করত পারস্যরা বিজয় লাভ করুক। অন্যদিকে রোমরা আহলে কিতাব হওয়ার কারণে মুসলমানগণ চাইতেন রোম বিজয় লাভ করুক।
এ ঘটনার পর মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা দিতে আল্লাহু তা'আলা আয়াত নাযিল করলেন.......
الۤمّۤ غُلِبَتِ الرُّومُ فِىٓ أَدۡنَى ٱلۡأَرۡضِ وَهُم مِّنۢ بَعۡدِ غَلَبِهِمۡ سَيَغۡلِبُونَ فِى بِضۡعِ سِنِينَۗ لِلَّهِ ٱلۡأَمۡرُ مِن قَبۡلُ وَمِنۢ بَعۡدُۚ وَيَوۡمَئِذٍ يَفۡرَحُ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ
অর্থ : আলিফ-লাম-মীম। রোমেরা পরাজিত হয়েছে, নিকটবর্তী এলাকার আর তারা তাদের পরাজয়ের পর অচিরেই বিজয়ী হবে, কয়েক বছরের মধ্যেই। অগ্র-পশ্চাতের কাজ আল্লাহর হাতেই। সেদিন মুমিনগণ আনন্দিত হবে।
হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু এ আয়াত মক্কার ওলিগলিতে-গলিতে বার বার পাঠ করে শুনাচ্ছিলেন। আয়াত শুনে মুশরিকরা বলল, আবূ বকর! তোমার বন্ধু বলেছে, রোম কয়েক বছরের মধ্যে পারস্যের ওপর বিজয় লাভ করবে! হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, তিনি সত্য বলেছেন। তারা বলল, তুমি কি আমাদের সাথে বাজি ধরবে? তারা সাত বছরের চুক্তিতে চারটি শক্তিশালী উটের ওপর বাজি ধরে। (এটি বাজি হারাম হওয়ার পূর্বের ঘটনা)। ওদিকে সাত বছর চলে গেছে কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় মুশরিকরা খুব আনন্দিত হলো। বিষয়টি মুসলমানদের মনে খুবই আঘাত করল। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে (بِضۡعِ سِنِينَ) 'কয়েক বছর' সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, তোমাদের নিকট (بِضۡعِ سِنِينَ) কয় বছর? তিনি বললেন, দশ বছরের কম। তিনি বললেন, তোমরা তাদের কাছে গিয়ে আরো দু'বছর বৃদ্ধি করে নাও। (অর্থাৎ সাত বছরের সাথে দু'বছর মোট নয় বছর। যা দশ বছরের কম। কেননা আরবরা بِضۡعِ শব্দটি তিন থেকে নয় সংখ্যা বুঝাতে ব্যবহার করত।) হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু তাদের কাছে গিয়ে দু'বছর বৃদ্ধি করে নিলেন। এরপর দু'বছর পার না হতেই এক অশ্বারোহী এসে রোমের বিজয়ের সংবাদ দিল。
টিকাঃ
১. আবদুল মানসূর, ১ম খণ্ড, ২৬৯।
📄 আবু বকরের এক রাত ওমরের পরিবার-পরিজন থেকেও উত্তম
একদিন ভোরবেলা মানুষেরা বসে কথাবার্তা বলছিল। তারা হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু ও ওমর রাদিআল্লাহু আনহু কে নিয়ে বিতর্ক করছিল। তারা আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু-কে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করছিল আবার কেউ ওমর রাদিআল্লাহু আনহু-কে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করছিল। কথাটি নিয়ে অনেক বিতর্ক চলছিল। শেষ পর্যন্ত কথাটি হযরত ওমর রাদিআল্লাহু আনহু-এর কানে গেল। তিনি শুনে বললেন, আল্লাহর শপথ! আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু এক দিন ওমরের পুরো পরিবার থেকেও উত্তম। আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু এক রাত ওমরের পুরো পরিবারের থেকেও উত্তম। (অর্থাৎ আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু শুধু ওমরের থেকে উত্তম ই না; বরং আবূ বকরের একদিন ওমরের পুরো পরিবারের থেকেও উত্তম।) এ কথা বলার পর হযরত ওমর রাদিআল্লাহু আনহু এ প্রমাণে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন...... এক রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গারে হেরায়েতে রওনা করলেন। হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু তাঁর সাথে ছিলেন। চলার পথে তিনি কখনো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হাঁটছিলেন আবার কখনো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে হাঁটছিলেন। বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নজরে পড়ল। আর তাই তিনি বললেন, আবূ বকর! তোমার কি হয়েছে, তুমি কিছুক্ষণ আমার সাথে হাঁটছ আবার কিছুক্ষণ আমার পিছনে হাঁটছ? তখন হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু খুব চিন্তিত মনে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি দেখেছি কেউ আপনার পিছু নিচ্ছে কিনা তাই আপনার পিছনে পিছনে হাঁটছি। আবার দেখছি কেউ সম্মুখে আপনার জন্যে ফাঁদ পেতে রেখেছে কিনা তাই আপনার সাথে হাঁটছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি ক্ষতিকারক কিছু থেকে থাকে তাহলে তা আমাকে আক্রমণ না করে তোমাকে করুক, তুমি তাই চাচ্ছ? আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, হ্যাঁ, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করাতে তাঁর শপথ করে বলছি! যখন তারা গুহায় গিয়ে পৌঁছলেন তখন হযরত আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সতর্ক করে বললেন, আপনি দাঁড়ান! আমি গুহায় প্রথমে প্রবেশ করি, যদি সেখানে কোনো সাপ বা ক্ষতিকারক কিছু থাকে তাহলে তা আমাকে আক্রমণ করবে। এ কথা বলে আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু গুহায় প্রবেশ করলেন। তিনি তাঁর হাত দ্বারা স্পর্শ করে গুহার ভেতরে গর্তের মুখ খুঁজতে শুরু করলেন এবং গুহার ভেতরে যত গর্ত পেয়েছেন প্রতিটিকে তাঁর পরিহিত গায়ের কাপড় দিয়ে বন্ধ করে দিলেন, কিন্তু অবশেষে একটি গর্ত রয়ে গেল এবং সেটির মুখ বন্ধ করার জন্যে কোনো কাপড় পেলেন না। আর তাই তিনি নিজের পা দিয়ে সে গর্তের মুখ বন্ধ করে দিলেন। এরপর নবী করীম ﷺ প্রবেশ করলেন।
রাত কেটে যখন সকাল হলো এবং চারদিক ধীরে ধীরে আলোকিত হতে লাগল। রাসূল ﷺ আবূ বকরকে ডেকে ডাকিরে দেখলেন তাঁর পায়ে কোনো কাপড় নেই।
তিনি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন- তোমার কাপড় কোথায়?
তখন তিনি রাতের সে ঘটনা বর্ণনা করলেন।
ঘটনাটি শুনার পরে রাসূল হাত উঁচু করে দোয়া করলেন- হে আল্লাহ! আবূ বকরকে কিয়ামতের দিন আমার সাথে রেখো।
পরে আল্লাহ তাআলা রাসূল ﷺ-এর দোয়া কবুল করে ওহী নাযিল করে জানিয়ে দিলেন।
তারপর হযরত ওমর বিন খাত্তাব বললেন, যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ করে বলি, সে রাতটি ওমরের পরিবারের পরিজন থেকেও উত্তম।
📄 সাপের গর্ত
রাসূল ﷺ ও তাঁর হিজরতের সঙ্গী রাতের আঁধারে গুহার ভেতরে লুকিয়ে আছেন। ওদিকে দীর্ঘ মরু পথ পাড়ি দেওয়ার কারণে রাসূল ﷺ-এর ক্লান্তি চলে আসে। তাঁর চোখে ঘুমেরা জোয়ার নেমে আসে। তাই তিনি হযরত আবূ বকর -এর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। অন্যদিকে হযরত আবূ বকর ও যে পা দিয়ে গর্তের মুখ বন্ধ করে রেখেছিলেন সে পায়ে সাপে দর্শন করে। এতে তাঁর শরীরে সাপের বিষ ছড়িয়ে পড়ে। বিষের যন্ত্রণা ধীরে ধীরে তীব্র থেকে তীব্র হতে লাগল, কিন্তু রাসূল ﷺ-এর ঘুম ভেঙ্গে যাবে ও ভয়ে তিনি নড়াচড়া করছিলেন না। বাধায় তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। সে ঝরা অশ্রু এক ফোঁটা গিয়ে রাসূল ﷺ-এর পবিত্র চেহারার ওপর পড়ল। এতে তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেল।
তিনি বললেন, আবূ বকর! তোমার কি হয়েছে?
হযরত আবূ বকর ব্যথায় কাতর অবস্থায় বললেন, আমাকে সাপে দর্শন করেছে....... আপনার জন্য আমার পিতামাতা উৎসর্গিত হোক।
এ কথা শুনে রাসূল ﷺ তাঁর লালা মোবারক নিয়ে ক্ষতস্থানে মেখে দিলেন। এতে তাঁর ব্যথা এমনভাবে দূর হয়ে গেল মনে হয় যেন তাঁকে কখনো সাপে দর্শন করেনি।
রাসূল ﷺ-এর ইন্তেকালের পর হযরত আবূ বকর -এর পায়ে সেই বিষের ব্যথা পুনরায় শুরু হয়।
টিকাঃ
৯ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, ১৪৬পৃঃ।