📄 আল্লাহ তার চোখ অন্ধ করে দিয়েছেন
আবু বকর ﷺ রাসূল ﷺ-এর সাথে বসা ছিলেন। ঠিক সেই সময় আবূ লাহবের স্ত্রী উম্মে জামিল এক খণ্ড পাথর নিয়ে তাঁদের কাছে আসল। তার ইচ্ছা ছিল সে তা রাসূল ﷺ-কে মারবে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার চোখ অন্ধ করে দিলেন। সে রাসূল ﷺ-কে দেখতে পায়নি।
সে আবূ বকর ﷺ-এর কাছে এসে বলল, তোমার ওই সাথি কোথায়? সে নাকি আমাদের নামে দুর্নাম করে। আল্লাহ কসম, যদি আমি তাকে পাই তবে তাকে এ পাথর দ্বারা আঘাত করব। রাসূল ﷺ-কে দেখতে না পেরে যখন মহিলাটি চলে যেতে লাগল তখন আবূ বকর ﷺ রাসূল ﷺ-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল!
সে কি আপনাকে দেখতে পায়নি? রাসূল ﷺ বললেন, না, সে আমাকে দেখতে পায়নি।
টিকাঃ
³ সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড, ৩৬৫ পৃ.।
📄 তোমার বন্ধু আক্রান্ত হয়েছে
আবূ বকর! তোমার বন্ধু আক্রান্ত হয়েছে............।
এ কথা শুনার সাথে সাথে হযরত আবূ বকর ﷺ খালি মাথায় বায়তুল্লাহর দিকে ছুটে গেলেন। বাতাসে তাঁর চুলগুলো উড়ছিল। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পেলেন মুশরিকরা রাসূল ﷺ-কে মাটিতে ফেলে ঘুষি, লাথি মারছিল। তারা বলছিল, তুমি আমাদের বহু খোদাকে এক খোদার পরিণত করেছ।
এ অবস্থা দেখে হযরত আবূ বকর ﷺ রাসূল ﷺ-কে বাঁচাতে নিজেকে সঁপে দিলেন। তিনি তাদের আঘাতগুলো প্রতিহত করতে লাগলেন।
তিনি বললেন, তোমাদের জানো ধ্বংস! তোমরা কি এমন ব্যক্তিকে হত্যা করতে চাচ্ছ, যিনি বলছেন, তাঁর প্রভু আল্লাহ এবং তিনি তোমাদের জন্য এ ব্যাপারে প্রমাণও নিয়ে এসেছেন?
হযরত আলী এ ঘটনা বর্ণনা করার সময় তাঁর পাশে থাকা লোকদেরকে বললেন, তোমাদেরকে শপথ দিয়ে বলছি, ফেরাউনের পরিবারের কোনো ব্যক্তি উত্তম, না আবূ বকর উত্তম?
তাঁর প্রশ্নে সকলে চুপ করে রইল।
তিনি আবার বললেন, তোমরা উত্তর দিবে না? আল্লাহর শপথ! আবূ বকরের এক মুহূর্ত ফেরাউন পরিবারের কোনো মানুষের পূর্ণ পৃথিবীসুদ্ধ পুণ্যের থেকেও উত্তম। ওই লোক তো তাঁর ঈমানকে গোপনে রেখেছেন। আর এ লোক তো তাঁর ঈমানকে প্রকাশ করেছেন।
টিকাঃ
⁴ আল মাযমা, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৭৭ পৃ.।
⁷ আল মাযমা, ৯য় খণ্ড, ৭৭ পৃ.। ৬ কামী-৩
📄 ত্বালহার ইসলাম গ্রহণ ও হযরত আবু বকর
হযরত আবূ বকর ﷺ তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করার পর দারুন লজ্জায় কোরাইশের নেতারা একত্রিত হয়। তখন তারা বিষাক্ত বিচ্ছুর ন্যায় রাগে ফুঁসছিল। তারা হযরত আবূ বকর সিদ্দিকদের ব্যাপারে পরামর্শ করতে লাগল।
তারা বলল, তোমরা একজন লোক নির্ধারণ কর, যে তাকে আমাদের কাছে নিয়ে এসে আমাদের প্রভুদের দিকে আহ্বান করবে। সবার পরামর্শে তারা হযরত ত্বালহা বিন উবাইদুল্লাহকে তাঁর কাছে পাঠাল।
তিনি হযরত আবূ বকরের সভায় নিয়ে আসলেন।
হযরত ত্বালহা তাঁকে বললেন, আবূ বকর! আমাদের দলে আস। তিনি বললেন, তুমি আমাকে কোন দিকে আহ্বান করছ? হযরত ত্বালহা বললেন, আমি তোমাকে লাত ও উজ্জার ইবাদতের দিকে আহ্বান করছি। তিনি বললেন, লাত কে? হযরত ত্বালহা বললেন, আল্লাহর মেয়ে। তিনি বললেন, তাহলে তার মা কে?
এ প্রশ্নে হযরত ত্বালহা চুপ হয়ে গেলেন। তাঁর মুখ থেকে কোনো উত্তর আসল না।
হযরত ত্বালহার সাথে থাকা লোকদেরকে তিনি বললেন, তোমরা তোমাদের সাথীকে উত্তর দাও।
তারাও কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে চুপ হয়ে গেল।
হযরত ত্বালহা তাদের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ দীর্ঘ সময় করতে লাগলেন, কিন্তু তাদের থেকে কোনো উত্তর এলো না।
তখন তিনি আবার হযরত আবূ বকরকে ডেকে বললেন, আবূ বকর! দাঁড়াও, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ব্যতীত কোনো প্রভু নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।
এরপর হযরত আবূ বকর হযরত ত্বালহার হাত ধরে রাসূল ﷺ-এর কাছে নিয়ে গেলেন।
টিকাঃ
¹ উয়ুনুল আখবার, ২য় খণ্ড, ১১৪৮।
📄 হযরত আবু বকর অন্যের আশ্রয় ফিরিয়ে দিলেন
রাত কেটে সকাল হলো। ধীরে ধীরে চারিদিকে অন্ধকার কেটে আলোকিত হতে লাগল। অন্যাদিকে হযরত আবূ বকর ﷺ তাঁর আসবাবপত্র সব গুছিয়ে নিলেন। তারপর তা কাঁধে ফেলে রওনা দিলেন।
তিনি তাঁর ঈমান বাঁচানোর জন্য মক্কা ছেড়ে হাবশার উদ্দেশে রওনা দিলেন। এ দূরের পথে তাঁর সাথী ছিল পূর্ণ ঈমানে ভরপুর অন্তর। চলতে চলতে তিনি বারকুল গামাদ নামক স্থানে গিয়ে পৌঁছলেন। যেটি ইয়ামানের একটি অঞ্চল। সেখানে ইবনে দুগনাহর সাথে তাঁর দেখা হয়। ইবনে দুগনাহ সে সময়ের বিশিষ্ট নেতাদের একজন।
সে তাঁকে বলল, আবূ বকর! তুমি কোথায় যাচ্ছ? আবূ বকর ﷺ খুব নরম স্বরে বললেন, আমার গোত্রের লোকেরা আমাকে বের করে দিয়েছে। আর তাই আমি জমিনে মুসাফিরা করব আর আমার প্রতিপালকের ইবাদত করব।
তখন ইবনে দুগনাহ হতাশায় সাথে সাথে বলল, আবূ বকর! তোমার মতো লোক চলে যাওয়াও মেনেও নেওয়াও দেওয়ায়র মতো নয়! নিশ্চয়ই তুমি পরিবারদেরকে খাদ্য দাও, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা কর, অন্যের বোঝা বহন কর, দুর্বলদের সহযোগিতা কর এবং সত্যের পথে সহযোগিতা কর। আমি তোমাকে আশ্রয় দিলাম, যাও তোমার নিজের ভূমিতে গিয়ে তোমার প্রতিপালকের ইবাদত কর।
তার কথামতো হযরত আবূ বকর ﷺ আবার মক্কায় ফিরে আসেন।
আবূ দুগনাহ মক্কার বিশিষ্ট নেতাদের গিয়ে বলল, আবূ বকরের মতো লোক চলে যেতে পারে না, আর সে তাঁদের দেওয়ায়র মতো নয়। সে পরিবারদেরকে খাদ্য খেতে দেয়, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে, অন্যের বোঝা বহন করে, দুর্বলদের সহযোগিতা করে এবং সত্যের পথ সহযোগিতা করে।
তখন কোরাইশরা আবূ দুগনাহ কথা মেনে নিলেন।
তারা তাঁকে বলল, আবূ বকরকে বল, সে যেন তার ঘরে ইবাদত করে, সে সেখানে নামায আদায় করবে আর যত ইচ্ছে কোরআন পাঠ করবে। তবে এ ব্যাপারে আমাদেরকে কষ্ট দেবে না এবং এ কাজগুলো প্রকাশ করবে না। কেননা আমরা আমাদের নারী ও সন্তানদের ব্যাপারে তার ফেতনার আশঙ্কা করছি।
হযরত আবূ বকর ﷺ তাদের কথামতো নিজের ঘরে মহান প্রভুর ইবাদত করতে লাগলেন এবং ঘরের ভেতরে চুপিসারে নামায পড়তেন আর ঘরের বাইরে কোথাও কোরআন তেলাওয়াত করতেন না; কিন্তু তিনি গোপনে ইবাদত করে পারতেন না; বরং ইবাদতের আবেগ তাকে চালিত আলোকিত করতে চাইলন। তিনি তাঁর ঘরের আঙিনায় একটি নামাযের জায়গা তৈরি করলেন। সেখানে তিনি নামায আদায় করতেন ও কোরআন তেলাওয়াত করতেন। তাঁর ইবাদতের দৃশ্য দেখার জন্য মুশরিকদের মহিলা ও শিশুরা ভিড় করত। হযরত আবূ বকর ﷺ অধিক ক্রন্দনশীল ছিলেন। কোরআন তেলাওয়াতের সময় তিনি কান্না ধরে রাখতে পারতেন না। এ ব্যাপারটা কোরাইশদেরকে পুনরায় উদ্বিগ্ন করতে লাগল। তখন তারা এ সমাধানের জন্য ইবনে দুগনাহর কাছে লোক পাঠায়।
তারা বলল, আবূ বকরকে শুধু ঘরের ভেতরে ইবাদত করার শর্তে তোমার আশ্রয় সোপর্দ করেছিলাম, কিন্তু সে শর্ত ভঙ্গ করে নিজের আঙিনায় একটি নামাযের জায়গা বানিয়ে প্রকাশ্যে নামায ও কোরআন তেলাওয়াত করছে। আমরা আমাদের নারী ও সন্তানদের ব্যাপারে তার ফিতনার ভয় করছি। যদি তুমি পার তাকে নিয়ন্ত্রণ কর আর না হয় তার থেকে তোমার আশ্রয় ফিরিয়ে নাও।
ইবনে দুগনাহ হযরত আবূ বকর ﷺ-এর কাছে শান্তভাবে বলল। সে তাঁকে বলল, তুমি এ ব্যাপারে ভালোভাবে জান। যদি তুমি চাও শর্তের তে শর্তের অবস্থান কর আর না হয় আমার আশ্রয় ফিরিয়ে দাও। কেননা আমি শুনতে চাই না আরবরা যাকে যে, আমি এক লোককে আশ্রয় দিয়ে শর্ত ভঙ্গ করেছি।
তখন হযরত আবূ বকর ﷺ দৃঢ় মনোবল নিয়ে বললেন, আমি তোমাকে তোমার আশ্রয় ফিরিয়ে দিলাম এবং আল্লাহর আশ্রয় থাকার ওপর সন্তুষ্ট হলাম।
টিকাঃ
¹ আস সীরাতুন নববিয়্যাহ, ৩য় খণ্ড, ৮১।