📄 নাস্তোরিয়ীন ( নাসতোর গ্রুপ )
এটি মূলত কনস্টান্টিনোপলের এক পাদ্রির দল। তারাও মারয়াম আ. ও ঈসা আ. কে খোদা মানত না। বরং তাদের মতে, হযরত মারয়াম আ.'র গর্ভ থেকে একজন মানুষেরই জন্ম হয়েছে।
তবে, ত্রিত্ববাদের আকীদায় তারা ব্যাখ্যা করে বলত, রব, রুহুল কুদস আর ছেলে মিলেই হলো সৃষ্টিকর্তা। তবে, ছেলে বলতে মারয়ামপুত্র নয়; বরং এমন সত্তা যার কোন শারীরিক আকৃতি নাই, হযরত মারয়াম তাকে জন্ম দেননি। মারয়াম তো শুধু একজন মানুষকেই জন্ম দিয়েছেন। তবে, সে তার জন্মের পর দ্বিতীয় খোদার সাথে মিশে গিয়েছিল।
এই মিশে যাওয়াটা কোনো বাস্তবিক অর্থে নয় বরং রূপক অর্থে মিশে যাওয়া। কেননা আল্লাহ তাআলা তাঁকে ভালবাসার নিদর্শন দিয়েছেন, এবং বিভিন্ন নিয়ামত প্রদানের মাধ্যমে তাঁকে পুরস্কৃত করেছেন। এভাবে তিনি ছেলের মর্যাদায় পৌঁছে গিয়েছেন।
নাসতুর তার আকীদা মোতাবেক বলেন, হযরত মাসীহা মানুষের সাথে কথা বলেছেন, চলাফেরা করেছেন। তবে, তাঁর ব্যাপারে লোকেরা ভুল ফায়সালা করেছে এবং তাঁকে শূলিতে চড়িয়ে শাস্তি দিয়েছে। এসব ঘটনা থেকে বুঝা যায়, তাঁর মাঝে ইশ্বর হওয়ার কোন যোগ্যতাই ছিল না। তিনি না কোন খোদা ছিলেন, না তিনি খোদার ছেলে। নাসতুর এসব কথা বললে তাকে মানুষেরা ভুল সাব্যস্ত করতে চাইল। কিন্তু তিনি মানুষের শত বাধা সত্ত্বেও আপন বিশ্বাসে অটুট ছিলেন। এবং নিজের মত থেকে ফিরে আসতে অসম্মতি প্রকাশ করেন।
এরপর ৪৩১ খৃস্টাব্দে অফসেস বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর সর্বশেষ ফায়সালায় নাসতুরের উপর অভিশাপ দেয়া হয়। তার বিরোধিতা করা হয়। এবং ফায়সালা করা হয়, হযরত মারয়ম আ. একজন মানুষ হয়েও আল্লাহর পুত্রকে জন্ম দিয়েছেন, এ বিশ্বাসই পোষণ করতে হবে। এর সাথে নাসতুরকে তার পাদ্রি পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তাকে দেশান্তরিত করা হয়। ফলে বাধ্য হয়ে তিনি মিসরে চলে যান। এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
ইবনে বাতরিক বর্ণনা করেন, ছাত্র ও অনুসারীর অভাবে নাসতোরের মৃত্যুর পর তার দাওয়াত একেবারে মিটে যায়। তবে তার মৃত্যুর বহুকাল পর পারস্যের বাদশাহ কুব্বাদ বিন ফাইরোজের সময়কালে বারসোমা নামী একজন ব্যক্তি তার দাওয়াতকে পুনরায় জীবিত করেন। পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোতে বিশেষকরে পারস্যে তার দাওয়াত ব্যাপকভাবে প্রচার প্রসার করেন। এর ফলস্বরূপ প্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইরাক, মসেল, আলজেরিয়ায় তাদের সংখ্যা বহু গুণ বেড়ে যায়। তারা আজও এসব অঞ্চলে বিদ্যমান। তাদের একটি গ্রুপ এখন ইন্ডিয়াতেও বসবাস করে। অন্যান্য অনারব দেশগুলোতেও তাদের বসবাস রয়েছে।
নাসতোরী খৃস্টানরা এক সময় তাদের আকীদা থেকে দূরে সরে যায়। এখন তারাও বিশ্বাস করে যে হযরত ঈসা আ.'র মধ্যে এমন দুটি প্রকৃতি বিদ্যমান রয়েছে, যেগুলোর একটি অপরটির সাথে মিশে গিয়েছে, অর্থাৎ বান্দা ও খোদা এবং সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তা এক হয়ে গেছে। এ সংমিশ্রণে একটি একক সত্তা তৈরি হয়ে গেছে।
অথচ পূর্বের নাসতোরীদের বিশ্বাস ছিল, হযরত মাসীহাকে ইবনুল্লাহ বলা, তবে, বাস্তব অর্থে নয়, বরং এ অর্থে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে ভালবাসার প্রিয়পাত্র বানিয়েছেন, তাঁকে প্রকৃত প্রভুর রূপ দেননি।
রোমের গির্জার পণ্ডিতরা যুগ যুগ ধরে নিজেদের বিরোধিদের আকীদা- বিশ্বাসের বিরোধিতা করে আসছিল। তারা তাদের বিরোধিদেরকে এ বলে কাফের বলে সম্বোধন করত যে, এদের অন্তরে ঈমানের প্রবেশ হয়নি!
নাসতোরীদের একত্ববাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার লোকেরা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থের জন্য কঠোরতা করে। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক পলিসিকে সামনে রেখে নম্রতা অবলম্বন শুরু করে। দুশমনদের জন্য নিজেদের দোয়ার খুলে দেয়, এবং তাদের পক্ষ হয়ে তাদের মতাদর্শের বিভিন্ন ব্যাখ্যা করতে থাকে। যাতে তারা গির্জার পক্ষ থেকে দেওয়া পুরোনো অভিশাপগুলো ভুলে যায়। অন্যান্যদের মত গির্জার লোকদের সাথে তাদের কাজে অংশগ্রহণ করে। এবং এভাবে ধীরে ধীরে ক্ষমতাশীল গির্জা ও চার্চকে তাদের বন্ধু ভেবে এক সময় তাদের দলভুক্ত হয়ে যায়। আর বাস্তবেও তাই ঘটেছে।
📄 খৃস্টানদের মাঝে মতপার্থক্যের মূল কারণ
মূল আকীদা- বিশ্বাসের ক্ষেত্রে খৃস্টানরা এক হওয়ার পরেও তাদের মাঝে মতানৈক্যর মূল কারণ হলো হযরত ঈসা আ.'র ব্যক্তিত্বকে নিয়ে। এ নিয়ে তাদের মাঝে অনেক ধরণের মতাদর্শ পাওয়া যায়। যেমন,
১. হযরত ঈসা আ. দু'টি প্রকৃতির মালিক।
২. অথবা তিনি দুই সত্তার অধিকারী। মানে, মানবীয় গুণাবলী থাকার পরেও তাঁর মাঝে ইলাহী গুণও রয়েছে, যে গুণের সুবাদে তিনি বিভিন্ন বিষয়ের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় করার ক্ষমতা রাখেন।
দ্বিতীয় আরেকটি কারণ হচ্ছে, রুহুল কুদসের অস্তিত্ব নিয়ে। রুহুল কুদস মূলত কোত্থেকে এসেছে, কী এর রূপ, এ বিষয়েও রয়েছে তাদের অনেক মতপার্থক্য। যেমন,
১. তাদের কেউ কেউ বলে, রুহুল কুদসের অস্তিত্ব শুধু পিতা থেকে এসেছে।
২. কেউ আবার বলে পিতা, পুত্র দুইটা থেকেই এসেছে।
তাদের মাঝে মতবিরোধ তৈরির তৃতীয় আরেকটি মৌলিক দিক হলো, গির্জা এবং ধর্মীয় গুরুদের বিভিন্ন ব্যক্তিগত মতামত ও মনোবৃত্তির ইচ্ছাগুলোকে পবিত্র গ্রন্থের তাফসীর ও ব্যাখ্যা ধরা হবে কিনা, এ নিয়েও রয়েছে তাদের বিভিন্ন অভিমত। যা ধীরে ধীরে তাদের ধর্মীয় বিষয় হিসেবে স্থান পেয়ে গেছে!