📘 খৃষ্টধর্ম, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি 📄 চার ইঞ্জীলের বিস্তারিত বিবরণ

📄 চার ইঞ্জীলের বিস্তারিত বিবরণ


১. ইঞ্জীলে মার্ক : চার ইঞ্জীলের মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন হচ্ছে এটি। অন্যান্য ইঞ্জীলগুলোর মধ্য হতে এর একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। এর লেখক হলেন মার্কাস। তিনি গ্রীকে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বংশগতভাবে ইহুদী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাস করতে থাকেন। প্রথম প্রথম তিনি খ্রিস্টানদের পণ্ডিত পল ও বারনাবাসের সাথে বেশি থাকতেন। এরপর পাতরাসের সাথে থাকতে শুরু করেন। যখন রোমান সম্রাট নিরো খৃস্টানদের ব্যাপকভাবে হত্যা করতে লাগলো, এবং তার নির্যাতনে পাতরাসও শহীদ হয়ে যান, তখন মার্ক তাঁর এ ইঞ্জীল লিপিবদ্ধ করেন।
খ্রিস্টান পণ্ডিতরা এ কথার উপর একমত, মার্ক হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের হাওয়ারী ছিলেন না; কিন্তু তিনি হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এর বাণীসমূহ যেগুলো তিনি ওস্তাদ পাতরাসের কাছ থেকে শুনেছেন তা সব তাঁর ইঞ্জীলে লিখে দিয়েছেন।
কোন কোন ঐতিহাসিক বলেন তাঁর ইঞ্জীল ল্যাটিন বা আরামী (আরামাইক) ভাষায় লেখা হয়েছিল। কিন্তু এর কোন প্রমাণ তাদের কাছে নেই। এটা তাদের দাবী মাত্র । তবে এই ইঞ্জীলের সবচে' পুরাতন কপি গ্রীক ভাষায় পাওয়া যায়। যা দেখে তাদের গবেষকরা বলে, হয়তবা কিতাবটি খৃস্টপূর্ব ৭০-৫৬ এর মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে লেখা হয়েছে।

২. ইঞ্জীলে মাত্তা : সবচেয়ে বড় ইঞ্জীলের লেখক হলেন "মাত্তা"। তাঁর জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। বলা হয়, ইনি ছাড়া মাত্তা নামী আরেকজন ছিলেন, যিনি হযরত ঈসা আ. এর হাওয়ারী। কিন্তু তিনি কোন কিতাব লিখেননি। ইঞ্জীলে মাত্তা অন্যান্য ইঞ্জীল থেকে এ জন্য একটু আলাদা যে, তা গ্রীক ভাষার পরিবর্তে ইবরানী ভাষায় লেখা হয়েছিল । প্রফেসর বানীক তার কিতাব " What is Christianity " এ ইঞ্জীলে মাত্তা লেখার সময় ৮০- ১০০ খৃস্টপূর্ব বর্ণনা করেছেন। এ বর্ণনা অন্যান্য আলামত অনুযায়ী অনেকটা সঠিক বলে মনে করা হয়।

৩. ইঞ্জীলে লুক : লুক ছিলেন আনতাকার বাসিন্দা। তিনি একজন ডাক্তার ও ঐতিহাসিক ছিলেন। খৃস্টানধর্মে বিশ্বাস করতেন। তিনি বেশ কয়েকবার পলের সাথে দাওয়াতী সফরে বের হয়েছিলেন। তাঁর দিকে দু' টি কিতাব নিসবত করা হয় : ১. ইঞ্জীলে লুকা, ২. রাসূলগণের আমলসমূহ।
তিনি হযরত ঈসা আ. এর হাওয়ারী নন। তিনি তাঁর ইঞ্জীলের শুরুতে লিখেছেন, এ গ্রন্থ তিনি হযরত ঈসা আ. এর খেদমতে থাকা লোকদের মুখ থেকে শুনে শুনে একজন গ্রীক বাসিন্দা থিওফিলাসের অনুরোধে লিপিবদ্ধ করেছেন।

৪. ইঞ্জীলে ইউহান্না: চতুর্থ ইঞ্জীল লিখেছেন ইউহান্না, তাকে ইংরেজিতে john (জোহন) ও বলে। ইঞ্জীলে ইউহান্না নিজস্ব বিন্যাস ও বিষয়াবলীর দিক থেকে অন্যান্য ইঞ্জীল থেকে অনেকটা ভিন্ন। এর ভঙ্গি অনেকটা দর্শন বিদ্যার মত। যার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে গ্রন্থের প্রথম পংক্তি থেকেই।
ইঞ্জীলে ইউহান্নাতে হযরত ঈসা আ. কে প্রভু বানানোর দিকে বেশি জোর দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে অন্যান্য ইঞ্জীলে হযরত ঈসা আ. কে ইশ্বরের সেবক ও খোদার ছেলে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
ইঞ্জীলে ইউহান্নার রচয়িতা কোন ইউহান্না এ নিয়েও ঐতিহাসিকদের মতানৈক্য রয়েছে। কারো কারো মতে তিনি হযরত ঈসা আ. এর হাওয়ারী ছিলেন। আর কারো মতে তিনি অন্য কেউ ছিলেন, তিনি মূলত তুরস্কে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। এবং খৃস্টীয় প্রথম শতাব্দীর শুরুর দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। "মুকাশাফাতে ইউহান্না" নামেও তাঁর একটি গ্রন্থ পাওয়া যায়। বলা হয়, এর রচনাকাল হযরত ঈসা আ. এর মৃত্যুর ৯০ বছর পরের কোন এক সময়।

খৃস্টানরা বলে, এ চার ইঞ্জীল ছাড়াও প্রথম শতাব্দীতে আরো অনেক ইঞ্জীল লেখা হয়েছিল। কিন্তু এগুলোর উপর ভরসা করা যায় না। খৃস্টান ধর্মের প্রত্যেক গোষ্ঠীর পৃথক পৃথক ইঞ্জীল থাকে৷ যার উপর তারা পরিপূর্ণ বিশ্বাস করে। আর অন্যসব ইঞ্জীল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

এ চার ইঞ্জীল ছাড়াও আরো অনেকেই ইঞ্জীল লিখেছেন। যেমন, ইয়াকুবের দিকে এক ইঞ্জীলের নিসবত করা হয়, এমনিভাবে টোমাস এর লেখা ইঞ্জীল রয়েছে। এসব ইঞ্জীলে হযরত ঈসা আ. ও তাঁর মাতা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো উপরোল্লেখিত চার ইঞ্জীলেও নেই। পাদ্রি নেকোদীমের লেখা এক ইঞ্জীলও রয়েছে, তিনি হযরত ঈসা আ. এর উপর ঈমান আনার পর তাঁর এ ইঞ্জীল গ্রীক ভাষায় লিখেছেন। তাতে হযরত ঈসা আ.'র মৃত্যু ও তাঁর পুনরায় অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে এমন এমন কথা লেখা আছে যা অন্যান্য ইঞ্জীলে পাওয়া যায় না।

এভাবে আরো অনেকেই ইঞ্জীল লিখেছেন, খৃস্টানদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ আরো কিছু ইঞ্জীলের নাম এখানে পেশ করা হলো, ১. ইঞ্জীলে সাবঈন, যা মূলত থ্যালামসের দিকে নিসবত করা হয় ২. ইঞ্জীলে ইছনা আশারা ৩. ইঞ্জীলে তাযকিরা ৪. ইঞ্জীলে ইবরানিয়্যীন ৫. ইঞ্জীলে নাসিরিয়ীন ৬. ইঞ্জীলে মিসরিয়ীন
এমনিভাবে প্রসিদ্ধ খৃস্টান পণ্ডিতগণ যেমন, দীচান, মানি ও মরসির অনুসরণকারীদেরও সতন্ত্র ইঞ্জীল ছিল। ইবয়ূনের অনুসারীদের আলাদা একটি ইঞ্জীল ছিল যা অন্যগুলোর সাথে মিলতো না। এছাড়া এমন আরো অনেক ইঞ্জীল অনেকেই লিখেছে, যেগুলো কালের বিবর্তনে অজানা দেশের অতল গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছে।

📘 খৃষ্টধর্ম, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি 📄 ইঞ্জীলে ইবিউনিউ এর বর্ণনা

📄 ইঞ্জীলে ইবিউনিউ এর বর্ণনা


এটা মূলত আরামী ভাষায় লেখা হয়েছে। খৃস্টানদের একটি গ্রুপ এই ইঞ্জীলের উপর খুব মজবুতভাবে আমল করত। ফলে তাদেরকে এ কিতাবের দিকে সম্বন্ধ করেই " ইভিনিয়ো " নামকরণ করা হয়। ইবিয়োন তাদের নেতার নাম ছিল। তাদের অস্তিত্ব চতুর্থ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত ছিল। এরপর তাদের অস্তিত্ব মিটে যায়। তারা হযরত মূসা আ. এর শরীয়তকেও সমর্থন করত এবং ঈসা আ. কে প্রতিশ্রুত মাসীহ মনে করত। তবে, তাঁকে খোদা মানত না। শুধু একজন মানুষ ও নবী মনে করত, যেমনটি ইসলামের বিশ্বাস। ঈসা আ. সম্পর্কিত তাদের আকীদাগুলো ইসলামের সাথে মিলে যায়।

📘 খৃষ্টধর্ম, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি 📄 ইঞ্জীলে বারনাবা

📄 ইঞ্জীলে বারনাবা


বারনাবা পাদ্রির নামে এ ইঞ্জীলের নামকরণ করা হয়েছে। এটা অনেক আগ থেকেই প্রসিদ্ধ একটি ইঞ্জীল। এর বিবরণ পূর্ববর্তী চার্চ ও গির্জার পাদ্রিদের গবেষণা ও বিভিন্ন বক্তব্যেও পাওয়া যায়। এমনি একটি বক্তব্য বাবা প্রথম জিলাসিয়াস ঐসময়ে দিয়েছিলেন যখন তিনি ৪৯২ ঈসায়ী থেকে ৪৯৬ পর্যন্ত রোমের ক্যাথলিক খৃস্টান চার্চের বাবা পদের দায়িত্ব পান। তিনি তার বক্তব্যে নিষিদ্ধ কিতাবসমূহের লিস্ট প্রকাশ করেন । এবং ইঞ্জীলে বারনাবা পড়তে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

নিষিদ্ধ কিতাবগুলোর মধ্যে বারনাবার কথাও তিনি বলেছেন। এ থেকে এটা বুঝা যায়, বারনাবার কিতাব হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্মের দু' শত বছর আগ পর্যন্ত প্রসিদ্ধ ছিল। অত:পর এর কপিগুলো হারিয়ে যায় কিংবা গুম করে দেওয়া হয় । তবে, এর পুরাতন একটি কপি রোমের পাদ্রি পঞ্চম স্কটসের লাইব্রেরীতে পাওয়া গেছে। এরপর খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে সে কপিও পাদ্রির লাইব্রেরী থেকে উধাও হয়ে যায়। এর অনেক দিন পর হারিয়ে যাওয়া কপি বা এর মত আরেকটি কপি আমস্টারডামের এক সম্মানিত ব্যক্তির লাইব্রেরীতে পাওয়া যায়। সেখানে তা আঠারো শতাব্দীর শেষ অবধি সংরক্ষিত ছিল। কিছু ঐতিহাসিকগণের সনদে বর্ণিত রয়েছে, এটি একজন ইহুদী লিখেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। যেহেতু খৃস্টধর্ম ও ইসলামের মাঝে বেশ কিছু জিনিসের মিল রয়েছে, তাছাড়া এ কিতাবে উল্লেখিত খৃস্টধর্মে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমনের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে; তাই তিনি এসব অনুধাবন করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

রাশিয়ান এক বাদশাহ'র কোন একজন পরামর্শদাতা এ ইঞ্জীলের অনেক প্রশংসা করে এবং তা ধার করে লাইব্রেরী থেকে নিয়ে আসে। কিন্তু তখন সে কপি ফিনার ?? লাইব্রেরীতে স্থানান্তর করা হয়। ফিনার এই লাইব্রেরীতে আজও তা সংরক্ষিত রয়েছে। বারনাবার এ ইঞ্জীল ইটালী ভাষায় লেখা হয়েছে। আর প্রতি পৃষ্ঠার চার পাশে অশুদ্ধ আরবীতে টিকা সংযোজন করা হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায় টিকার লেখক একজন অনারবী ছিলেন।

এর আরেকটি কপি স্পেনীয় ভাষায় ১৭৮৪ খ্রীস্টাব্দে জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়। কিন্তু অল্প কিছু দিনের মধ্যেই এটাও উধাও হয়ে যায়। অত:পর এক মুসলিম মনীষী আল্লামা রশীদ রেযা মিসরী রহ. এর একটি কপি বহু চেষ্টার পর খুঁজে পেয়ে প্রকাশিত করেন এবং এর শুরুতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা লিখে দেন। এ কিতাবের মাধ্যমেই খৃস্টান ধর্মে সংঘটিত পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের দলীল পাওয়া যায়। এর সাথে অন্যান্য গ্রন্থ তুলনা করলেই বিজ্ঞরা বুঝতে পারবেন, খৃস্টধর্মে কী পরিমাণ উলটপালট করা হয়েছে।

📘 খৃষ্টধর্ম, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি 📄 ইউহান্নার চিঠিসমূহ ও তার বই মুকাশিফাত

📄 ইউহান্নার চিঠিসমূহ ও তার বই মুকাশিফাত


ইউহান্নার মুকাশিফাত (The Book of Revelation) হলো, নিউ টেস্টামেন্টের শেষ কিতাব। এর সাথে তার লিখিত তিনটি চিঠিও নিউ টেস্টামেন্টে শামিল করা হয়েছে। খৃস্টানদের বিশ্বাস, ইউহান্না খৃস্টধর্ম গ্রহণের কারণে তাকে ব্রিটেন ও তুরকিস্তানের মধ্যবর্তী অবস্থিত প্যাটমাস দ্বীপে দেশান্তর করা হয়। এরপর সেখানেই তিনি জীবন যাপন করতে থাকেন। এ দ্বীপে থাকাকালীন তিনি সত্য কিছু স্বপ্ন দেখেন এবং সেগুলো তার গ্রন্থে লিখে দেন। এটিই "মুকাশিফাত" নামে প্রসিদ্ধ। এটিও তার ইঞ্জীলের মত ৯৬- ৯০ খৃস্টপূর্বাব্দের কোন এক সময় গ্রীক ভাষায় লেখা হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px