📘 খৃষ্টধর্ম, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি 📄 আহাদ নামা জাদীদ বা নিউ টেস্টামেন্ট

📄 আহাদ নামা জাদীদ বা নিউ টেস্টামেন্ট


নিউ টেস্টামেন্টকে ইঞ্জীলও বলা হয়। যা মূলত হযরত ঈসা আলাইহিস সাল্লাম এর উপর অবতীর্ণকৃত আকিদা এবং তাঁর পূর্ববর্তি বিভিন্ন ঘটনার বিবরণসমূহ সংবলিত গ্রন্থের নাম। সামষ্টিকভাবে এতে এমন সাতাশটি কিতাব (অধ্যায়) রয়েছে যেগুলো বিশুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে খ্রিস্টান পণ্ডিতরা একমত পোষণ করে। এগুলোর মধ্যে চার ইঞ্জীলও অন্তর্ভুক্ত : ১- ইঞ্জীলে মাত্তা, ২- ইঞ্জীলে মার্কাস, ৩- ইঞ্জীলে লুকা, এবং ৪- ইঞ্জীলে ইউহান্না। এছাড়া নবীগণের আমলসমূহ সংবলিত খৃস্টানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিতাবও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাছাড়া কিছু চিঠিও শামিল করা হয়েছে, যেগুলো প্রসিদ্ধ খৃস্টান পণ্ডিত পল ও অন্যান্য খৃস্টান লেখকরা লিখেছিলেন। এগুলো ব্যতীত তাতে ১১৪ টি অধ্যায়ও রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে তাদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে।

📘 খৃষ্টধর্ম, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি 📄 চার ইঞ্জিল

📄 চার ইঞ্জিল


ইঞ্জীল শব্দটি গ্রিক ভাষার শব্দ। এর মূল হচ্ছে " ইউনজিলিযোঁ "। যার অর্থ হচ্ছে ঐ সমস্ত পুরস্কার যেগুলো সুসংবাদ প্রদানে দেওয়া হয়। ইঞ্জীলসমূহে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এর জীবনী ও তাঁর বিভিন্ন ঘটনা বর্ণিত আছে। এ ইঞ্জীলসমূহ হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের মৃত্যুর পর তাঁর হাওয়ারীগণ এবং তাদের ছাত্ররা লিপিবদ্ধ করেন।

লুকা তাঁর লিখিত ইঞ্জীলের শুরুতে একথা স্পষ্ট ব্যক্ত করেছেন, তিনি ছাড়াও আরো অনেকে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের বিভিন্ন ঘটনা ও কাজকর্ম নোট করেছেন। খ্রিস্টান পণ্ডিতরা ১৫৮ কিতাবের কথা বলে থাকে, যেগুলো মূলত হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জীবনী সম্পর্কে লেখা হয়েছে। তম্মধ্যে অল্প সংখ্যক কিতাবেরই গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আর বাকিগুলোর কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। এ ইঞ্জীলসমূহের মধ্য হতে মাত্তা এবং ইউহান্না ছাড়া বাকি দু' জন (লুকা ও মার্ক) হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের সরাসরি হাওয়ারী ছিলেন না; বরং তারা ছিলেন হাওয়ারীদের ছাত্র।

ইঞ্জীল লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে একটি কথা স্পষ্ট থাকা জরুরী। তা হলো, হযরত ঈসা আলাইহিস সাল্লাম ও তাঁর হাওয়ারীদের ভাষা ছিল " আরামী " ( আরামাইক ) ভাষা। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত ইঞ্জীলসমূহের মূল উৎস ইবরানী ও গ্রিক ভাষার অনুবাদই বলা চলে। ইঞ্জীলের সবচেয়ে পুরোনো তিনটি নুসখা বা কপি চতুর্থ শতাব্দীতেই সর্বপ্রথম পাওয়া যায়।

পঞ্চম শতাব্দীতে খৃস্টানরা তাদের কাছে থাকা তাওরাতের সাতাশটি অংশ বা অধ্যায়কে গ্রহণযোগ্য সাব্যস্ত করে। তারা এটাও স্বীকার করে, এগুলো আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত পবিত্র আছফার বা অধ্যায়সমূহ। যেগুলো হাওয়ারীগণ হযরত ঈসা আ. থেকে গুনাহসমূহের ক্ষমা প্রার্থনা করে পেয়েছিলেন।

চার ইঞ্জীলের প্রত্যেকটির লেখকই ঈসা আ. কে কেন্দ্র করেই তাদের ইঞ্জীলগুলো রচনা করেছেন। চাই তারা হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের সরাসরি হাওয়ারীদের অন্তর্ভুক্ত হোক কিংবা হাওয়ারীদের ছাত্র হোক!

আহদে জাদীদ তথা নিউ টেস্টামেন্টের সামষ্টিক পৃষ্ঠা সংখ্যা সর্বোচ্চ ১১০ থেকে নিয়ে ২৫০ হবে।

📘 খৃষ্টধর্ম, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি 📄 চার ইঞ্জীলের বিস্তারিত বিবরণ

📄 চার ইঞ্জীলের বিস্তারিত বিবরণ


১. ইঞ্জীলে মার্ক : চার ইঞ্জীলের মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন হচ্ছে এটি। অন্যান্য ইঞ্জীলগুলোর মধ্য হতে এর একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। এর লেখক হলেন মার্কাস। তিনি গ্রীকে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বংশগতভাবে ইহুদী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাস করতে থাকেন। প্রথম প্রথম তিনি খ্রিস্টানদের পণ্ডিত পল ও বারনাবাসের সাথে বেশি থাকতেন। এরপর পাতরাসের সাথে থাকতে শুরু করেন। যখন রোমান সম্রাট নিরো খৃস্টানদের ব্যাপকভাবে হত্যা করতে লাগলো, এবং তার নির্যাতনে পাতরাসও শহীদ হয়ে যান, তখন মার্ক তাঁর এ ইঞ্জীল লিপিবদ্ধ করেন।
খ্রিস্টান পণ্ডিতরা এ কথার উপর একমত, মার্ক হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের হাওয়ারী ছিলেন না; কিন্তু তিনি হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এর বাণীসমূহ যেগুলো তিনি ওস্তাদ পাতরাসের কাছ থেকে শুনেছেন তা সব তাঁর ইঞ্জীলে লিখে দিয়েছেন।
কোন কোন ঐতিহাসিক বলেন তাঁর ইঞ্জীল ল্যাটিন বা আরামী (আরামাইক) ভাষায় লেখা হয়েছিল। কিন্তু এর কোন প্রমাণ তাদের কাছে নেই। এটা তাদের দাবী মাত্র । তবে এই ইঞ্জীলের সবচে' পুরাতন কপি গ্রীক ভাষায় পাওয়া যায়। যা দেখে তাদের গবেষকরা বলে, হয়তবা কিতাবটি খৃস্টপূর্ব ৭০-৫৬ এর মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে লেখা হয়েছে।

২. ইঞ্জীলে মাত্তা : সবচেয়ে বড় ইঞ্জীলের লেখক হলেন "মাত্তা"। তাঁর জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। বলা হয়, ইনি ছাড়া মাত্তা নামী আরেকজন ছিলেন, যিনি হযরত ঈসা আ. এর হাওয়ারী। কিন্তু তিনি কোন কিতাব লিখেননি। ইঞ্জীলে মাত্তা অন্যান্য ইঞ্জীল থেকে এ জন্য একটু আলাদা যে, তা গ্রীক ভাষার পরিবর্তে ইবরানী ভাষায় লেখা হয়েছিল । প্রফেসর বানীক তার কিতাব " What is Christianity " এ ইঞ্জীলে মাত্তা লেখার সময় ৮০- ১০০ খৃস্টপূর্ব বর্ণনা করেছেন। এ বর্ণনা অন্যান্য আলামত অনুযায়ী অনেকটা সঠিক বলে মনে করা হয়।

৩. ইঞ্জীলে লুক : লুক ছিলেন আনতাকার বাসিন্দা। তিনি একজন ডাক্তার ও ঐতিহাসিক ছিলেন। খৃস্টানধর্মে বিশ্বাস করতেন। তিনি বেশ কয়েকবার পলের সাথে দাওয়াতী সফরে বের হয়েছিলেন। তাঁর দিকে দু' টি কিতাব নিসবত করা হয় : ১. ইঞ্জীলে লুকা, ২. রাসূলগণের আমলসমূহ।
তিনি হযরত ঈসা আ. এর হাওয়ারী নন। তিনি তাঁর ইঞ্জীলের শুরুতে লিখেছেন, এ গ্রন্থ তিনি হযরত ঈসা আ. এর খেদমতে থাকা লোকদের মুখ থেকে শুনে শুনে একজন গ্রীক বাসিন্দা থিওফিলাসের অনুরোধে লিপিবদ্ধ করেছেন।

৪. ইঞ্জীলে ইউহান্না: চতুর্থ ইঞ্জীল লিখেছেন ইউহান্না, তাকে ইংরেজিতে john (জোহন) ও বলে। ইঞ্জীলে ইউহান্না নিজস্ব বিন্যাস ও বিষয়াবলীর দিক থেকে অন্যান্য ইঞ্জীল থেকে অনেকটা ভিন্ন। এর ভঙ্গি অনেকটা দর্শন বিদ্যার মত। যার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে গ্রন্থের প্রথম পংক্তি থেকেই।
ইঞ্জীলে ইউহান্নাতে হযরত ঈসা আ. কে প্রভু বানানোর দিকে বেশি জোর দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে অন্যান্য ইঞ্জীলে হযরত ঈসা আ. কে ইশ্বরের সেবক ও খোদার ছেলে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
ইঞ্জীলে ইউহান্নার রচয়িতা কোন ইউহান্না এ নিয়েও ঐতিহাসিকদের মতানৈক্য রয়েছে। কারো কারো মতে তিনি হযরত ঈসা আ. এর হাওয়ারী ছিলেন। আর কারো মতে তিনি অন্য কেউ ছিলেন, তিনি মূলত তুরস্কে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। এবং খৃস্টীয় প্রথম শতাব্দীর শুরুর দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। "মুকাশাফাতে ইউহান্না" নামেও তাঁর একটি গ্রন্থ পাওয়া যায়। বলা হয়, এর রচনাকাল হযরত ঈসা আ. এর মৃত্যুর ৯০ বছর পরের কোন এক সময়।

খৃস্টানরা বলে, এ চার ইঞ্জীল ছাড়াও প্রথম শতাব্দীতে আরো অনেক ইঞ্জীল লেখা হয়েছিল। কিন্তু এগুলোর উপর ভরসা করা যায় না। খৃস্টান ধর্মের প্রত্যেক গোষ্ঠীর পৃথক পৃথক ইঞ্জীল থাকে৷ যার উপর তারা পরিপূর্ণ বিশ্বাস করে। আর অন্যসব ইঞ্জীল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

এ চার ইঞ্জীল ছাড়াও আরো অনেকেই ইঞ্জীল লিখেছেন। যেমন, ইয়াকুবের দিকে এক ইঞ্জীলের নিসবত করা হয়, এমনিভাবে টোমাস এর লেখা ইঞ্জীল রয়েছে। এসব ইঞ্জীলে হযরত ঈসা আ. ও তাঁর মাতা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো উপরোল্লেখিত চার ইঞ্জীলেও নেই। পাদ্রি নেকোদীমের লেখা এক ইঞ্জীলও রয়েছে, তিনি হযরত ঈসা আ. এর উপর ঈমান আনার পর তাঁর এ ইঞ্জীল গ্রীক ভাষায় লিখেছেন। তাতে হযরত ঈসা আ.'র মৃত্যু ও তাঁর পুনরায় অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে এমন এমন কথা লেখা আছে যা অন্যান্য ইঞ্জীলে পাওয়া যায় না।

এভাবে আরো অনেকেই ইঞ্জীল লিখেছেন, খৃস্টানদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ আরো কিছু ইঞ্জীলের নাম এখানে পেশ করা হলো, ১. ইঞ্জীলে সাবঈন, যা মূলত থ্যালামসের দিকে নিসবত করা হয় ২. ইঞ্জীলে ইছনা আশারা ৩. ইঞ্জীলে তাযকিরা ৪. ইঞ্জীলে ইবরানিয়্যীন ৫. ইঞ্জীলে নাসিরিয়ীন ৬. ইঞ্জীলে মিসরিয়ীন
এমনিভাবে প্রসিদ্ধ খৃস্টান পণ্ডিতগণ যেমন, দীচান, মানি ও মরসির অনুসরণকারীদেরও সতন্ত্র ইঞ্জীল ছিল। ইবয়ূনের অনুসারীদের আলাদা একটি ইঞ্জীল ছিল যা অন্যগুলোর সাথে মিলতো না। এছাড়া এমন আরো অনেক ইঞ্জীল অনেকেই লিখেছে, যেগুলো কালের বিবর্তনে অজানা দেশের অতল গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছে।

📘 খৃষ্টধর্ম, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি 📄 ইঞ্জীলে ইবিউনিউ এর বর্ণনা

📄 ইঞ্জীলে ইবিউনিউ এর বর্ণনা


এটা মূলত আরামী ভাষায় লেখা হয়েছে। খৃস্টানদের একটি গ্রুপ এই ইঞ্জীলের উপর খুব মজবুতভাবে আমল করত। ফলে তাদেরকে এ কিতাবের দিকে সম্বন্ধ করেই " ইভিনিয়ো " নামকরণ করা হয়। ইবিয়োন তাদের নেতার নাম ছিল। তাদের অস্তিত্ব চতুর্থ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত ছিল। এরপর তাদের অস্তিত্ব মিটে যায়। তারা হযরত মূসা আ. এর শরীয়তকেও সমর্থন করত এবং ঈসা আ. কে প্রতিশ্রুত মাসীহ মনে করত। তবে, তাঁকে খোদা মানত না। শুধু একজন মানুষ ও নবী মনে করত, যেমনটি ইসলামের বিশ্বাস। ঈসা আ. সম্পর্কিত তাদের আকীদাগুলো ইসলামের সাথে মিলে যায়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px