📄 খৃস্টানদের উপর জুলুম- নির্যাতন
চতুর্থ শতাব্দীর শুরু অবধি ঈসায়ী সম্প্রদায়কে বিভিন্ন কঠিন অবস্থার মোকাবেলা করতে হয়েছে। এর বড় কারণ হলো, তাদের উপর রোমদের কর্তৃত্ব ছিল। রোমানরা তাদের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করত, যেমন ইহুদীরা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করত। ওই সময় খৃস্টান ধর্ম নিয়মতান্ত্রিকভাবে গোছালো ছিল না। খৃস্টানদের সংখ্যাও খুব অল্পই ছিল। তা সত্ত্বেও অত্যন্ত কষ্ট-সাধনার মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকাতে তারা নিজেদের আস্তানা গড়ে তোলে। এভাবে সময়ের সাথে সাথে খৃধর্ম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কখনো তাদের উপর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জুলুম-নির্যাতন চালানো হত। ইসরাঈলী তথা ইহুদীরা তাদেরকে নির্যাতন করত। আবার কখনো তাদেরকে আপন গতিতে ছেড়ে দেয়া হত। নির্যাতনের কারণে দুর্বল ঈমানের লোকেরা খৃস্টান ধর্ম পরিত্যাগ করত। আবার যখন অবস্থা ভালো হত তখন আপন ধর্মে ফিরে আসত। তাদেরকে কবুল করা হবে কিনা, তাদের তাওবা গ্রহণীয় হবে কিনা? এটাই তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বিষয় হয়ে দাঁড়াত।
📄 নতুন যুগে খৃস্টান ধর্মের প্রচার- প্রসার
এ যুগে খৃস্টান ধর্মের ব্যাপক প্রচার- প্রসারের কারণ হলো "কলোনেলিজম " বা খৃস্টানদের উপনিবেশবাদের উত্থান। অর্থাৎ নতুন জীবন- ব্যবস্থা ও নিয়ম- নীতি। এর অর্থ হচ্ছে, কোন এলাকার লোকজন এক এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় গিয়ে বসবাস শুরু করা এবং সেখানে নিজেদের কব্জা প্রতিষ্ঠা করা। সাধারণত কোথাও নতুন আবাদি শুরু করা হলে সেখানকার লোকদেরকে নিজেদের কন্ট্রোলে এনে তাদের উপর শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং নিজেদের হুকুম চাপিয়ে দেয়াকে বুঝায়। ইতিহাসে এর অনেক দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু প্ল্যান করে কোন এক জাতির উপর অন্য জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা করার সূচনা করে চৌদ্দশত শতাব্দীতে রোমের বাদশাহরা। এ নীতি ফলো করেই ইউরোপে বসবাসরত খৃস্টানরা নিজেদের আবাদি বাড়িয়ে ধীরে ধীরে আফ্রিকা, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বাসস্থান বানিয়ে নিয়েছে।
এই নিয়ম তাদের শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপকারই করেনি; বরং তাদের ধর্মের ব্যাপক প্রচার- প্রসারও করেছে। নতুন নতুন বস্তি গঠন করে গোত্রের পণ্ডিতরা দখলকৃত এলাকায় ব্যাপকভাবে নিজেদের ধর্মের প্রচার- প্রসার করে বেড়াত। ইন্ডিয়াতে ষোলশো শতাব্দী থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমনের মাধ্যমে খৃস্টধর্মের প্রচার- প্রসার শুরু হয়। এরপর উপমহাদেশের ক্ষমতা দখল করে তারা পাদ্রিদেরকে বিভিন্ন সরকারী পর্যায়ের প্রধান নিযুক্ত করত। এবং তাদের মাধ্যমে নিজেদের ধর্ম প্রচার করত।
📄 ধর্মপ্রচারক ও ধার্মিকদের ব্যাপারে খৃস্টানদের ধারণা
ধর্ম প্রচারকদের ব্যাপারে তাদের ধারণা ছিল, একজন ধর্ম প্রচারক তিনি সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তার মধ্যকার সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম হন । বাস্তবিকপক্ষে যদিও তারা মানুষ হয়ে থাকেন; আল্লাহ তাআলা তাদেরকেও সে বস্তু দিয়েই সৃষ্টি করেছেন যেগুলো দিয়ে অন্যান্য মানুষ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এরা মূলত সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর সৃষ্টির মাঝে সুসম্পর্কের মাধ্যম হয়ে থাকেন। এ বিশ্বাস খৃস্টানদের বড় গোমরাহী ও ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত করেছে৷ ফলে তারা পোপদেরকে এত অধিকার দিয়েছে যা তাদের ক্ষমতাবান বাদশাহকেও দেয়া হয়নি। মোটকথা পোপদেরকে তারা ধর্মীয় নিয়ম- নীতি নির্ধারক বলে মনে করে।
তাদের ধারণা হলো, হযরত ঈসা আ. পাতরাসকে নিজের জানেশীন ও উত্তরাধিকারী বানিয়েছেন, যাতে পাতরাস হাওয়ারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা পান। তাদের দেখাশোনা ও খোঁজ-খবর নেন। পাতরাস রোমে যাওয়ার পর একটি ঘর বানান। এবং বাবা গোয়াকে রোমের সমস্ত গির্জায় নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন। আর এভাবেই গোয়া বাবা হযরত ঈসা আ.'র খলীফা হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়ে যায়।
খৃস্টধর্মের পণ্ডিতরা নিজেদের প্রবৃত্তি অনুযায়ী ধর্মীয় অনুশাসন পালন করতে করতে এতটাই নিম্ন স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা গোনাহ মাফ করার জন্যেও চেক বানিয়ে বিক্রি করত। নিজেদের নিকৃষ্ট মনোবৃত্তির ফলে বাদশাহগণ ও ক্ষমতাবান লোকেরা জনগণকে বুঝাতে লাগল, গির্জার পাদ্রিগণই কেবল পবিত্র গ্রন্থের মর্ম বুঝতে পারেন। এবং পাদ্রিগণই পবিত্র গ্রন্থের অভিভাবক ও রক্ষণাবেক্ষণকারী। এভাবে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা পেয়ে পাদ্রিরা নিজেদেরকে পৃথিবীর বুকে ইশ্বরের উত্তরসূরি মনে করতে লাগল।
তারা জনগণকে বুঝাল, গির্জা থেকে যে কথা বলা হবে এর বিরোধিতা করা যাবে না। এর বিরুদ্ধে কোন রকমের প্রশ্ন করা যাবে না। পাদ্রিরা যা বলবে তাই সত্য ও সঠিক। এবং তা মেনে নেয়া আবশ্যক। চাই তা বিবেকে ধরুক বা না ধরুক। মোটকথা, চাই তা বুঝে আসুক বা বুঝে না আসুক বিনাবাক্যে মেনে নিতে হবে।
প্রতিটি সাধারণ মানুষের উপর পাদ্রিদের কথা মান্য করা আবশ্যক। যদি তাদের কথা কারো বুঝে না ধরে তাহলে মনে করতে হবে, তার নিজেরই মধ্যে সমস্যা আছে। এখানে গির্জা বা পোপের কোন ভুল নেই। তাদের ভুল হতে পারে না। কোন কথা মনোপুত না হলে বুঝতে হবে, নিজের বিবেকেই সমস্যা; কারণ গির্জা ও পোপের কথা তার বুঝে আসছে না! খৃস্টানরা গির্জা ও বাবার ব্যাপারে "ইস্তেহালা" 'র আক্বীদা রাখত। এর মানে, পোপ ও গির্জার ভুল হওয়া সম্ভবই না। খৃস্টানদের বিশ্বাস, ইশ্বরের পক্ষ থেকে দাওয়াতের দিন তারা যে রুটি ও মদ পান করে, সে রুটি হযরত ঈসা আ.'র গোশতে আর মদ হযরত ঈসা আ.'র রক্তে পরিণত হয়ে যায়। সেদিন যে ব্যক্তি রুটি ও গোশত খায় হযরত ঈসা আ. তার ভেতরে ঢুকে পড়ে। এবং তার রুহ ও শিক্ষার মাঝে একাকার হয়ে যায়।²
টিকাঃ
২ (ইঞ্জীলে মাত্তা, লুকা ও মার্ক)
📄 পাপমোচন
পোপের কোনো গির্জা বানানো কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রয়োজন হলে টাকা- পয়সার জন্যে তিনি ক্ষমার চেক লিখেন। এবং তার অনুসারীদেরকে এগুলো বিক্রি করে টাকা আনতে বলেন। তখন তারা এ চেকগুলোকে কম্পানির শেয়ার বিক্রির মত শেয়ার বাজারে বিক্রি করে। চেকের মাঝে নাম লেখার যায়গা খালি থাকে, যেখানে গুনাহ ক্ষমাপ্রার্থীর নাম লেখা হয়। এরচে' মজার বিষয় হলো, তাদের ধারণা, এই চেক কিনলে আগের এবং পরের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। যেনো চেকের বিনিময়ে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ যেনো তাদের জান্নাতের গ্যারান্টিময় টিকেট।
খৃস্টধর্মের পণ্ডিত ও প্রচারকগণ সব সময় গির্জায় থাকেন । এবং তাদের জীবন গির্জার জন্যই ওয়াকফ করে দেন। গির্জার দেখাশোনা ছাড়া তাদের অন্য কোন দায়িতই দেয়া হয় না। খৃস্টানদের পোপকে ধর্মগুরু বা যাজক বলা হয়। আর সবচে' বড় পোপকে বিশপ বা মেট্রোপলিটন, এবং আরবিতে আসকাফ বা মাতরান বলা হয়। এরপর সর্বোচ্চ পর্যায় হলো বেতরিকের। " বেতরিক " মূলত বিভিন্ন শহরের পোপদের হেড হয়ে থাকেন৷ এবং তাকে " কার্ডিনাল " ও বলা হয়। ১১ শতাব্দীর পূর্বে রোমের গির্জাসম্মূহের পোপদের " বাবা " উপাধি দেয়া হত । এখন তাদের ক্ষমতা আরো বেড়েছে। এখন পৃথিবীর সকল গির্জার প্রধান তারাই হয়ে থাকে। নিজেদেরকে তারা খৃস্টানদের প্রধান নেতা ও বাদশাহ বলে মনে করে । বরং তাদের মর্যাদা ও ক্ষমতা রাজা, বাদশাহদের চেয়েও বেশি। বাবাদের একক ক্ষমতা হয়ে থাকে। কারণ, তারাই নিয়ম- কানুন প্রণেতা। আবার তা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতাও তাদের হাতেই। পবিত্র গ্রন্থ ইঞ্জীলের ব্যাখ্যা এরাই করে। খৃস্টানরা বাবাদেরকে রহমতের খাজানা ও আসমানের দরজাসম্মূহের মালিক মনে করে। বাবারা এক সময় গির্জায় টেক্স দেয়া আবশ্যক করে দেয়। এজন্য গির্জাগুলোতে কোন রকমের অভাব ছিল না। ধন, সম্পদে গির্জাগুলো ভরপূর ছিল। সম্পদের আধিক্যের ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী গির্জাগুলোতে এক সময় চরম বিভেদ দেখা দেয়। যার ফলস্বরূপ গির্জাকে কেন্দ্র করে খৃস্টানরা দুইটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে :
১. প্রোটেস্টেন্ট ২. ক্যাথোলিক