📄 ইসলামী দৃষ্টিকোণ
উপরোল্লেখিত বিষয়ে মুসলমানদের বিশ্বাস হলো আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ.'র তাওবা কবুল করেছেন। ফলে হযরত আদম আ. সে অপরাধ থেকে চির মুক্তি লাভ করেছেন। হযরত ঈসা আ. ' র ব্যাপারে ইসলামের আকীদা হলো, শূলিতে চড়ানোর আগেই আল্লাহ তাআলা তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। এবং ঈসা আ.' র পরিবর্তে যে ব্যক্তি তাঁর খোঁজ ইহুদীদের দিয়েছিল তাকে হত্যা করা হয় । ঘটনা হলো, ইহুদীরা হযরত ঈসাকে হত্যার পরিকল্পনা করলে আল্লাহ তাআলার কুদরতে এ লোকটাকে ইহুদীরা হযরত ঈসা মনে করে বসে। এবং তাকেই শূলিতে চড়িয়ে দেয়। কারণ, তার আকৃতি ছিল হযরত ঈসার মত দেখতে।
আর পূর্ববর্তীদের গোনাহের প্রায়শ্চিত্ত হওয়ার বিষয়ে এটা সুস্পষ্ট ও চিরসত্য যে, আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ. ও তাঁর বিবি হাওয়া আ. থেকে সংঘটিত অপরাধ ক্ষমা করে তাওবা কবুল করে নিয়েছেন। তো তাওবা কবুল হওয়ার পরও প্রত্যেক মানুষকে এ গোনাহের বোঝা নিয়ে জন্ম লাভের বিষয়টি খুবই মূর্খতাসূলভ কথা৷
📄 খৃস্টানদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ
ঈসায়ী ধর্মের প্রথম যুগে যে সমস্ত লোকদেরকে খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব মনে করা হত তারা হলেন,
১. পাতরাস: হযরত ঈসা আ.'র ছাত্রদের মধ্যে পাতরাস অন্যতম। তিনি ছিলেন একজন ফিলিস্তিনী ইহুদী। তাঁর আসল নাম ছিল শামউন। কিন্তু হযরত ঈসা আ. তাঁকে ভালোবেসে সীপাস বলে ডাকতেন। সীপাসের অর্থ অভিধানে পাওয়া যায়, মজবুত ও শক্ত পাথর । তাঁর সম্পর্কে খৃস্টানদের ধারণা, তিনি একজন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন । তাঁর কারণেই অনেক লোক খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। খৃস্টানদের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ইঞ্জীল শরীফের একটি নোসখা যা " ইঞ্জীলে মারকাস " নামে পরিচিত, এর প্রণেতা মার্কাস তাঁরই শিষ্য ছিলেন। সে মূলত পাতরাস থেকেই ইঞ্জীলের বর্ণনা শুনে ঐতিহাসিক " ইঞ্জীলে মারকাস " রচনা করেছেন বলে ধারণা করা হয়।
২. শৌল পল। তিনি মূলত তারতুস এলাকার একজন ইহুদী ছিলেন। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের পবিত্র গ্রন্থগুলো গভীরভাবে পড়েন। হযরত ঈসা আ. এর যুগে জীবিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর সাথে সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ হয়নি। শুরুতে তিনি হযরত ঈসা আ. এর বিরোধিতা করতেন এবং অনেক খৃস্টানদের তিনি হত্যাও করেছেন। পরবর্তিতে তিনি ঈসা আ.'র ধর্ম কবুল করে ঈসায়ী হয়ে যান। এবং খৃস্টান ধর্মের বড় দাঈ হয়ে যান। তিনি ঈসায়ী শিক্ষা- দীক্ষার মাধ্যমে পুরা ইউরোপকে আলোকিত করেছিলেন।
৩. ইউসুফ বারনাবাস। তিনি হযরত ঈসা আ.'র বিশেষ অনুসারীদের একজন। 'ইঞ্জীলে লুকা''র বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর আসল নাম ছিল ইউসুফ। বরনাবাস তাঁর উপাধি। এ উপাধি তাঁকে হাওয়ারী সাথীরা দিয়েছিল তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও একনিষ্ঠতার কারণে।¹
বারনাবাস 'র অর্থ, উপদেশের ছেলে। তিনি খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করলে হযরত ঈসা আ. তাঁর ব্যাপারে সবাইকে জানান। ইউসুফ শৌল পলের সাথে বিভিন্ন দ্বীনী সফরে বের হতেন। ইঞ্জীলের একটি নুসখা তাঁর দিকেও নিসবত করা হয়। যেটাকে " ইঞ্জীলে বারনাবাস " বলা হয়।
তবে বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, ইউসুফ ও পলের মধ্যকার কিছু মতবিরোধ তৈরি হয়। ফলে ইউসুফ পৃথক হয়ে যান। এ মতপার্থক্য সম্পর্কে বাইবেলের বর্ণনা হলো, বারনাবাস ইউহান্নাকে সফরসঙ্গী বানাতে চাইলেন আর পল সীলাসকে। মতপার্থক্যের এ কাহিনীর বিস্তারিত বিবরণ বাইবেলের " কিতাবুল আমাল "'র ৫১ - ৫৩, ১৪ নং আয়াতে পাওয়া যায়।
টিকাঃ
১ (লুকা, আমাল, ৪: ৬৩: ৭৩)
📄 খৃস্টান ও অন্যান্য ধর্ম
জেরুজালেমের অধিকাংশ মানুষ ইহুদী ছিল। তারা পরবর্তীতে খৃস্টধর্মে দীক্ষিত হয়। আনতাকিয়াতে কিছু লোক মূর্তিপূজারি ছিল আর কিছু ছিল অগ্নিপূজারি। যারা মূর্তিপূজারি ছিল বাইবেলে তাদেরকে খৃস্টান ধর্মের লোক বলা হয়েছে৷ আর অগ্নিপূজারিদেরকে অন্যজাতি বলা হয়েছে । ইহুদী মাসীহীরা খৎনা করা এবং ইহুদী ধর্মের সমস্ত রীতিনীতি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরী মনে করত। এজন্য তাদেরকে 'মাখতুন' বলা হত। তবে, অগ্নিপূজারিরা খত্না করাকে আবশ্যক মনে করত না। তাই তাদেরকে " গাইরে মাখতুন " বলা হত।
বাইবেলের এসব বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়, তাদের মাঝে দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধ ছিল। খৃস্টানদের বিবরণ অনুযায়ী বারনাবাস শৌলপল থেকে পৃথক হয়ে যাবার পর তাঁর এলাকা ক্যাপরাসে চলে যান এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু ও দাফনের কাজ সম্পাদন করা হয়।
৪৭৮ ঈসায়ীতে বারনাবাসের কবর থেকে তাঁর লিখিত ইঞ্জীলের খোঁজ পাওয়া যায়। এরপর ৪৯৬ ঈ. পর্যন্ত বিভিন্ন গির্জায় এ কিতাব পড়া হত । কিন্তু এরপর কিছু কিছু খৃস্টান পণ্ডিত বারনাবাসের ইঞ্জীল পড়তে নিষেধ করে। তখন সেটি পোপ স্যাকসটোসের (১৫৯০- ১৫২১) লাইব্রেরীতে রেখে দেওয়া হয়। এভাবে এক হাজার বছর তা লাইব্রেরীর শোভা হিসেবেই সাজিয়ে রাখা হয়। এরপর পাদ্রি ফ্রামারিনো ১৫৮৫- সনে এটি সংগ্রহ করেন। তখন থেকেই এটি ব্যাপকভাবে মানুষের হাতে হাতে চলে আসে৷
📄 খৃস্টধর্ম প্রচার
বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, ইহুদীদেরকে সত্যের পথে আহ্বান করতে হযরত ঈসা আ. তাঁর হাওয়ারীদের বিভিন্ন পাহাড়ের চূড়ায় পাঠাতেন। অনেক ইতিহাসবিদগণ এটাও বলেছেন, তিনি ভারতের কাশ্মীর ও তিব্বত এলাকাতেও এসেছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে পবিত্র গ্রন্থসমূহে কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। হযরত ঈসা আ.'র পরে তাঁর সাথীগণ এ দাওয়াতের কাজ অব্যাহত রাখেন। এবং বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মানুষকে আল্লাহ তাআলার দ্বীনের পথে ডাকতে থাকেন।