📄 অনুবাদকের কথা
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
ইসলামের মূল শিক্ষা হলো, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন স্রষ্টা নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী ও রাসূল । ইসলাম ধর্মের গ্রন্থানুযায়ী, এটি আল্লাহর নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা । সুখ- শান্তি আর নিরাপত্তায় ইসলাম একটি সর্বজনীন ধর্ম। কুরআনে কারীমে বর্ণিত হয়েছে, " و من يبتغ غير الإسلام دينا فلن يقبل منه ، وهو في الآخرة من الخاسرين "
অর্থ : আর ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্মই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। যে ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করবে, পরকালে নিশ্চয় সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৫
ইসলাম শুধু মক্কা- মদীনা কিংবা আরবের জন্যই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পৃথিবীর সকল বর্ণ, গোত্র, জাতি, ধনী- গরীব, সাদা- কালো ও আরব- অনারব সকল মানুষের জন্যই আল্লাহপ্রদত্ত একমাত্র সঠিক ধর্ম। ইসলাম ব্যতীত অন্যান্য ধর্ম প্রথমে আল্লাহর প্রেরিত বিধান হিসেবে অবতীর্ণ হলেও ধর্মের লোকেরা তাতে নানাবিধ পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে ফেলেছে। ফলে সেগুলো আল্লাহর মনোনিত ধর্ম হওয়ার অধিকার হারিয়েছে।
কিন্তু ইসলামই এমন ধর্ম যাকে সকল প্রকার পরিবর্তন থেকে পরিপূর্ণরূপে সংরক্ষণের ওয়াদা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ,
إنا نحن نزلنا الذكر وإنا له لحافظون - سورة الحجر : ৯
অর্থ, আমিই এ কুরআন অবতীর্ণ করেছি, আর আমিই (তা কেয়ামত) অবধি সংরক্ষণ করবো।
বর্তমান পৃথিবীতে ইসলাম ছাড়াও আরো অনেক ধর্মই রয়েছে, ইহুদী, খৃস্টান, বৌদ্ধ, হিন্দু, শিখ ইত্যাদি। তন্মধ্যে খৃস্টান ধর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিবেচনায় পৃথিবীর সবচে' বড় ধর্ম হিসেবে বিবেচিত।
খৃস্টানরা যুগ যুগ ধরে ধর্মের প্রচার, প্রসারের লক্ষ্যে অনেক ধরনের চেষ্টা চালিয়েছে। কখনো তারা বিভিন্ন জাতিকে বল প্রয়োগের মাধ্যমেও খৃস্টান বানিয়েছে। আর বলপ্রয়োগ করা সম্ভব না হলে সেখানে বিভিন্ন কলাকৌশলের মাধ্যমে টাকা- পয়সার লোভ দেখিয়ে মানুষকে ধর্মান্তরিত করেছে।
বিশেষকরে বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকাগুলোতে এসব ঘটনা অহরহ ঘটে চলছে। আমরা মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, জনসাধারণকে মিশনারীদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করা। এবং খৃস্টানদের ধর্ম সম্পর্কে ভালোভাবে অবগতি লাভ করে দাওয়াতের ময়দানে তাদেরকে জোয়াব দেওয়া।
এ লক্ষ্যে খৃস্টান ধর্ম সম্পর্কে মৌলিক ধারণার জন্যে হযরত মাওলানা মুফতি সারওয়ার ফারুকী নদভী সাহেবের " عیسائی اور ان کے فرقوں کا تعارف مذہب " কিতাবটি সংক্ষিপ্ততার বিবেচনায় খুবই উপযোগী মনে হয়েছে। মুফতী মুহাম্মাদ সারওয়ার ফারুকী নদভী দা.বা. হিন্দুস্তানে দাওয়াতের ময়দানের এক শাহসোয়ার। তাঁর অনেকগুলো কিতাবই বাংলায় অনুবাদ হয়ে পাঠক মহলের মন জয় করেছে। যে অনুবাদের ধারা শুরু করেছেন বন্ধুবর মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান নদভী।
সময়ের চাহিদায় বইটির বাংলা অনুবাদ করা প্রয়োজন ছিল। বাংলাভাষী দাঈগণ এর মাধ্যমে খৃস্টান ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো জানতে পারবেন। এবং সুচারুরূপে দাওয়াতের কাজ আঞ্জাম দিতে পারবেন। মানুষকে গোমরাহী থেকে বাঁচিয়ে মুক্তির পথ দেখাতে পারবেন। আল্লাহ তায়ালা যেন আমার ক্ষুদ্র এই মেহনতকে কবুল করেন। এর মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের ফায়েদা পৌঁছান, সে কামনাই করি।
কিতাবটি লেখার পেছনে প্রিয় মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান নদভীর উৎসাহ ও প্রেরণাই মূলত আমাকে এগিয়ে দিয়েছে। অনুবাদের শুরু থেকে নিয়ে প্রকাশের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত - সম্পাদনা, সেটিং ও বিভিন্ন তথ্য সংযোজন করা - মোটকথা তিনি এ কিতাবটির পেছনে অনেক সময় ব্যয় করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর ইলম ও আমলে বরকত দিন এবং তাঁকে একটি উজ্জল ভবিষ্যত দান করুন!
সবশেষে, পৃথিবীর কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। সংশোধনের শত চেষ্টার পরও কোন ভুল পাঠক মহোদয়ের দৃষ্টিগোচর হলে আমাদের অবগতি করবেন, আশা করি। ইনশা আল্লাহ পরবর্তী এ্যাডিশনে তা বিশুদ্ধ করে নিব।
ক্ষুদ্র এ প্রয়াসকে আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীনের জন্য কবুল করে নিন। আমীন!
মিজানুর রহমান কাসেমী নদভী
আল মাহাদুল আলী আল ইসলামী, হায়দারাবাদ, ইন্ডিয়া
৩০-১১- ২০২১ ইং
📄 লেখকের ভূমিকা
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين
বর্তমান পৃথিবীতে খৃস্টান ধর্ম অনুসারীদের সংখ্যা হিসেবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্ম হিসেবে বিবেচিত। "Colonialism" (উপনিবেশবাদ) এর মূলনীতি কারণেই আজ এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকায় খৃস্টান ধর্ম ব্যাপক প্রচার- প্রসার লাভ করেছে। "Colonialism " এর অর্থ হচ্ছে, এক এলাকার মানুষ অন্য এলাকায় গিয়ে নিজস্ব বসতি স্থাপন করা এবং সে এলাকা দখল করে নেয়া। সাধারণত যে এলাকায় নতুন বসতি স্থাপন করা হয় সেখানের লোকজনকে নিজেদের আওতায় এনে তাদের উপর নিজস্ব কালচার, সংস্কৃতি, স্বভাব- চরিত্র ও ক্ষমতা চাপিয়ে দেয়া হয়।
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এক সময় অন্য গোত্রের উপর চড়াও হয়ে তাদেরকে দাস বানানোর প্রথা চালু ছিল। বর্তমানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অন্য দল বা গোষ্ঠীর উপর চড়াও হওয়ার ধারাবাহিকতা রোমীয় বাদশাহদের মাধ্যমেই হয়েছে। কেননা এ যুগে সর্ব প্রথম ইউরোপীয় খৃস্টানরাই আফ্রিকা ও আমেরিকার উপর নিজেদের শাসন ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছিল। নতুন নতুন এলাকা দখল করার এ পদ্ধতি ইউরোপিয়ানদের শুধু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নতিই সাধন করেনি; বরং এ বিষয়টি তাদের ধর্মের প্রচারেও অনেক ভূমিকা পালন করেছে। এর মাধ্যমে তাদের ধর্মের প্রচার- প্রসারও বহুগুণে বেড়েছে। তাদের এ মিশনে অনেক মিশনারীও থাকত, যারা ক্ষমতার ইশারায় দখলকৃত এলাকায় খুব ব্যাপকভাবে তাদের ধর্মের প্রচার করে বেড়াত।
উপমহাদেশে খৃস্টান ধর্মের প্রচার ১৬০০ খৃস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আগমনের মাধ্যমে শুরু হয় । এরপর কালপরিক্রমায় তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হলে তখন খৃস্টধর্ম আরো বিস্তৃতি লাভ করে।
১৮০০ শো শতাব্দীর শেষদিকে প্রোটেস্ট্যান্ট খৃস্টান বাহিনী দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস শুরু করে। এবং সেখানে তাদের ধর্মের প্রচার শুরু করে। এশিয়া ও আফ্রিকায় ধর্মের প্রচার, প্রসারের লক্ষ্যে তারা যেন ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে । সামাজসেবা, শিক্ষাসেবা, বয়ান - বক্তৃতা, তর্কবিতর্ক- মোনাযারা সহ সব রকমের চেষ্টা, প্রচেষ্টার মাধ্যমে ধর্মপ্রচার চালিয়ে যায়। এর ফলশ্রুতিতে বিশাল একটি দল তাদের খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে নেয় ।
এ যুগে খৃস্টান ধর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিবেচনায় বর্তমান বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম । তাই মুসলিম দাঈগণের জন্য উচিত হলো এ ধর্মের পরিচিতি ও আকীদা সম্পর্কে জ্ঞান রাখা। এতে খৃস্টানদের মাঝে দাওয়াতের কাজ সহজ হবে ইনশা আল্লাহ। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই বক্ষমান বইয়ে খৃস্টান ধর্মের পরিচিতি পেশ করা হয়েছে। এতে তাদের আকীদা- বিশ্বাস, উপাসনা পদ্ধতি, সামাজিক জীবন- যাপন ব্যবস্থা, রসম- রেওয়াজ, ধর্মীয় গ্রন্থসমূহ ও তাদের বিভিন্ন ফিরকার পরিচয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এগুলো জেনে ভিন্নধর্মীদের মাঝে দাওয়াতের পথকে সুগম দিন! গোটা মানবজাতিকে হেদায়েতের ছায়াতলে আশ্রয় দান করুন! আমীন!
মুফতী সারওয়ার ফারুকী নদভী
দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা, লাখনৌ, ইন্ডিয়া
২- ১- ২০১৯ ইং