📘 খিলাফত ও রাজতন্ত্র ইতিহাস ও পর্যালোচনা > 📄 পাতানো ভ্রাতৃত্ব এবং আনসার-মুহাজিরদের ভ্রাতৃ-সম্পর্ক

📄 পাতানো ভ্রাতৃত্ব এবং আনসার-মুহাজিরদের ভ্রাতৃ-সম্পর্ক


পাতানো ভ্রাতৃত্ব
বর্তমানে অনেকেই ভাই পাতিয়ে একজন আরেকজনকে বলে—‘আমার সম্পদ তোমার সম্পদ এবং আমার আত্মীয় তোমার আত্মীয়। আমার সন্তান তোমার সন্তান।’ এই বলে একে অপরের রক্ত পান করে। এমনটা করা কি শরিয়তসম্মত? এটা কি মুবাহ? এতে করে রক্তসম্পর্কীয় ভাইয়ের বিধান প্রযোজ্য হবে? আর মুহাজির ও আনসারদের মাঝে রাসূল ﷺ যে ভাইয়ের সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, তা কেমন ছিল?

উল্লিখিত পদ্ধতিতে সর্বসম্মতিক্রমে ভাই পাতানো জায়েজ নেই। রাসূলের পদ্ধতিটি ছিল এমন— ‘রাসূল ﷺ আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বাড়িতে সাদ ইবনে রবিয়া ও আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর মাঝে ভ্রাতৃবন্ধন প্রতিষ্ঠা করে দেন। তখন সাদ (রা.) আবদুর রহমান (রা.)-কে বলেন- “তুমি আমার সম্পদের এক ভাগ নিয়ে যাও, আর আমার স্ত্রীদের কাউকে পছন্দ করো। তাঁকে আমি তালাক দেবো, তাহলে তুমি তাঁকে বিয়ে করতে পারবে।” তারপর আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বললেন- “আল্লাহ তোমার মাল ও পরিবারে বরকত দিক। আমাকে বাজার দেখিয়ে দাও।”’১২২

অনুরূপভাবে রাসূল সালমান ফারসি ও আবু দারদা (রা.)-এর মাঝেও ভাইয়ের সম্পর্ক গড়ে দিয়েছিলেন। এ সবই সহিহ হাদিসে এসেছে।

তবে কিছু কিছু সিরাতকার এক মুহাজিরের সাথে অন্য মুহাজিরের এবং এক আনসারের সাথে অন্য আনসারের ভাই সম্পর্কের যে বর্ণনা করেছেন, তা ভিত্তিহীন। সকল হাদিসবিশারদের মতেই তা অগ্রহণযোগ্য। মুহাজির ও আনসারদের মাঝে এই সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছিল।

وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ-
'বস্তুত আত্মীয়গণই পরস্পরের বেশি হকদার।' সূরা আনফাল : ৭৫

এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর আত্মীয়তা সম্পর্ককেই মিরাসের মাপদণ্ড মানা হয়। পাতানো ভাই সম্পর্কে কোনো মিরাস নির্ণীত হয় না।

উল্লেখ্য, এক্ষেত্রে একটি ইখতিলাফ রয়ে গেছে। আর সেটা হলো-যদি পাতানো সম্পর্ক ছাড়া আর কোনো আত্মীয় বেঁচে না থাকে, তাহলে মিরাস পাবে কি না? ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এবং আহমদ (রহ.)-এর এক বর্ণনামতে পাবে। কারণ, আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِينَ عَقَدَتْ أَيْمَانُكُمْ فَأْتُوهُمْ نَصِيبَهُمْ-

'আর যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, তাদের হক তাদেরকে দিয়ে দাও।' সূরা নিসা: ৩৩

ইমাম মালেক ও শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে এবং আহমদ (রহ.)-এর যে মতটি তাঁর অনুসারীদের কাছে প্রসিদ্ধ, সে মত অনুযায়ী-পাতানো সম্পর্কের ভিত্তিতে কিছুতেই মিরাস পাবে না। তাঁরা বলেন-উপরিউক্ত আয়াতটি মানসুখ বা রহিত হয়ে গেছে।

আনসার ও মুহাজিরদের মতো সম্পর্ক পাতানো কি বৈধ
এক্ষেত্রেও ইখতিলাফ রয়েছে। একদল বলেন-এ জাতীয় সম্পর্ক রহিত হয়ে গেছে। তাঁদের প্রথম দলিল মুসলিম শরিফের হাদিস।

জাবির ১২৩ (রা.) বলেন-
'ইসলামে কোনো পাতানো সম্পর্কের অস্তিত্ব নেই। জাহেলিয়াতের সময় যা ছিল, তার ওপর ইসলাম কেবল কঠোরতাই আরোপ করেছে। '১২৪

তা ছাড়া আল্লাহ কুরআনে মুমিনদের পরস্পরের ভাই হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। হাদিসেও রাসূল বলেছেন-
'মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার ভাইয়ের ওপর জুলুম করবে না এবং তার ভাইয়ের ওপর জুলুম হলে সহ্যও করবে না।'১২৫

আরেক হাদিসে নবিজি বলেন-
'যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না-যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যে উত্তম বিষয় পছন্দ করে, অপর ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করবে। '১২৬

যে ঈমানের আবশ্যিক শর্ত পালন করবে, সে সকল মুমিনের ভাই। তাই কোনো প্রকার বিশেষ চুক্তি ছাড়াই তার হক আদায় করা প্রত্যক মুমিনের কর্তব্য। কেননা, আল্লাহ ও রাসূল মুমিনদের ভ্রাতৃত্ব ও পরস্পরে দায়বদ্ধতার কথা পূর্বনির্ধারিত করে রেখেছেন।

মুসলিমের ভালোবাসা, পছন্দ-অপছন্দ ও বন্ধুত্ব-শত্রুতার স্বরূপ
মুসলমানের ভালোবাসা, পছন্দ-অপছন্দ ও বন্ধুত্ব-শত্রুতা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশমাফিক হতে হবে। তাই আল্লাহ ও রাসূল যা পছন্দ করেন, তা পছন্দ করা আবশ্যক এবং যা অপছন্দ করেন, তা অপছন্দ করা আবশ্যক। একইভাবে যে আল্লাহ ও রাসূলের সাথে বন্ধুত্ব করে, তার সাথে বন্ধুত্ব রাখা এবং যে আল্লাহ ও রাসূলের সাথে শত্রুতা রাখে, তার সাথে শত্রুতা রাখাও কর্তব্য। আর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ভালো-মন্দ উভয় কাজেরই প্রতিদান দেওয়া হবে। যেমন: ফাসিকরা সওয়াব ও শাস্তি দুটোই পাবে। এজন্য তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা দুটোই আমলে নিতে হবে। আমলের ভেতরে থাকা সৎ কাজ ও অসৎ কাজের ভিত্তিতে তাদের পছন্দ-অপছন্দ দুটোই করতে হবে।

যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ - وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَّرَه
'যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করে, তাকে তা দেখানো হবে এবং যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, তাকে তা-ও দেখানো হবে।' সূরা জিলজাল: ৭-৮

এটাই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মত। খারেজি, মুতাজিলা, জাহমিয়্যাহ ও মুরজিয়াদের অবস্থান এর বিরুদ্ধে। তারা উভয়দলই এক্ষেত্রে দুটো পক্ষ নিয়ে আছে এবং তারা প্রান্তিকতার শিকার। আহলে সুন্নাহ এক্ষেত্রে মধ্যমপন্থি দল।

সম্পর্ক-চুক্তির মাধ্যমে কোনো পিতৃত্ব সাব্যস্ত হয় না
এক্ষেত্রে কোনো মতবিরোধ নেই যে যদি কোনো রক্তের সন্তান (জীবিত) থাকে, তাহলে অন্য কেউ কারও মিরাসি সন্তান হতে পারবে না। অর্থাৎ পাতানো সম্পর্কের ছেলে মিরাস পাবে না, যদি রক্তের সন্তান থাকে। আল্লাহ তায়ালা পালকপুত্রের জাহেলি নিয়মকে রহিত করেছেন-
مَا جَعَلَ اللَّهُ لِرَجُلٍ مِّنْ قَلْبَيْنِ فِي جَوْفِهِ وَمَا جَعَلَ أَزْوَاجَكُمُ اللَّائِي تُظَاهِرُونَ مِنْهُنَّ أُمَّهَاتِكُمْ وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَ كُمْ أَبْنَاءَكُمْ -

'আল্লাহ কোনো মানুষের মধ্যে দুটি হৃদয় স্থাপন করেননি। তোমাদের যে স্ত্রীদের সাথে তোমরা জিহার করো, তাদের তিনি তোমাদের জননী করেননি এবং তোমাদের পোষ্যপুত্রদের তোমাদের পুত্র করেননি।' সূরা আহজাব : ৪

মহান আল্লাহ আরও বলেন-

اُدْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللَّهِ فَإِنْ لَّمْ تَعْلَمُوا آبَاءَهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَمَوَالِيْكُمْ -

'তোমরা তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত। যদি তোমরা তাদের পিতৃপরিচয় না জানো, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও বন্ধুরূপে গণ্য হবে।' সূরা আহজাব : ৫

অনুরূপভাবে তারা একে অপরের উত্তরাধিকারী হবে না। কারণ, এটা দুই দিক থেকেই অসম্ভব। তবে তারা উভয়ে অপরের সম্মতি সাপেক্ষে সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে; যেমনটা সালাফগণ করতেন। তাঁরা একে অপরের অনুপস্থিতিতে ঘরে ঢুকে খাবার খেতেন। কারণ, সে জানতেন যে এতে তাঁর সম্মতি আছে। যেমনটা আল্লাহ তায়ালা সূরা নুরে বলেছেন-

أَوْ صَدِيقِكُمْ -

'অথবা তোমাদের বন্ধুগণ।' সূরা নুর: ৬১

চুক্তি কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হলে পূরণ করা আবশ্যক
সর্বোপরি সকল শর্ত, চুক্তি ও সম্পর্ক কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে যাচাই করা আবশ্যক। যদি এগুলো কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হয়, তাহলে তা পালন করতে হবে। রাসূল ﷺ বলেন-
'যে ব্যক্তি কুরআন-সুন্নাহবিরোধী শর্ত করল, তার শর্ত বাতিল বলে গণ্য হবে; যদি শর্ত ১০০টিও হয়। কেননা, আল্লাহর কিতাব সবচেয়ে সত্য এবং তার শর্ত অধিক পালনযোগ্য।' ১২৭

যেমন: কেউ অন্যের ছেলেকে নিজের ছেলে বলে শর্ত করল কিংবা অন্যের গোলাম আজাদ করে দিলো অথবা তার সন্তান ও আত্মীয়কে মিরাস না পাওয়ার শর্ত করল অথবা নাহকভাবে কাউকে সহযোগিতার শর্ত রাখল বা কথা দিলো-এ জাতীয় সকল শর্তের ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথাই পালনযোগ্য। আল্লাহ ও রাসূলের খেলাফ কোনো কথা বা শর্ত পূরণ করা যাবে না। এ ব্যাপারে সকল ইমাম একমত। তবে মুবাহ বিষয়াদি নিয়ে মতপার্থক্য আছে। সেই আলোচনার এটা উপযুক্ত স্থান নয়।

অনুরূপভাবে ব্যবসায়িক চুক্তি, হেবা, ওয়াকফ, মান্নত, ইমাম ও মাশায়েখদের কাছে বাইয়াত, ভাই চুক্তি, বংশীয় চুক্তি ইত্যাদি সকল চুক্তির ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা আবশ্যক। আর সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব। স্রষ্টার অবাধ্যতা হয়-এমন কাজে সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না। আর সবচেয়ে প্রিয় হওয়া চাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল। আল্লাহু আলাম!

সমাপ্ত

টিকাঃ
১২২. বুখারি: ২০৪৯, মুসলিম: ১৪২৭
১২৩. হাদিসটি মুসলিম শরিফে জুবাইর ইবনে মুতইম (রা.)-এর সূত্রে এসেছে। জাবির (রা.)-এর সূত্রে নয়; যেমনটা শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন。
১২৪. মুসলিম: ২৫৩০
১২৫. বুখারি: ২৪৪২
১২৬. বুখারি: ১৩
১২৭. বুখারি: ২৫৬১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00