📄 পারস্পরিক যুদ্ধ-সংঘাতের সময় সন্ধি ও তার পদ্ধতি
নেককার মুসলিমদের দুটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হলে করণীয় কী
যেসব ফিতনায় নিপতিত হয়ে মানুষ একে অপরের রক্তপিপাসু হয়ে ওঠে এবং পরস্পরের সম্ভ্রমহানিতে লিপ্ত হয়, সেসব ফিতনা সবচেয়ে জঘন্য ও গুরুতর অপরাধ। আল্লাহ বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ
'হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত, ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাকো। অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।' আলে ইমরান : ১০২
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا كَذلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
'আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ করো; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নিয়امতের কথা স্মরণ করো-যা আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুণ্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদের মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হতে পারো।' আলে ইমরান: ১০৩
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُوْنَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
'আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত, যারা আহ্বান জানাবে সৎ কর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর তারাই হলো সফলকাম।' আলে ইমরান: ১০৪
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ -
'আর তাদের মতো হয়ো না, যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং নিদর্শনসমূহ আসার পরও বিরোধিতা করতে শুরু করেছে। তাদের জন্য রয়েছে ভয়ংকর আজাব।' আলে ইমরান: ১০৫
يَوْمَ تَبْيَضُ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ فَأَمَّا الَّذِينَ اسْوَدَّتْ وُجُوهُهُمْ أَكَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ
'সেদিন কোনো কোনো মুখ উজ্জ্বল হবে, আর কোনো কোনো মুখ হবে কালো। বস্তুত যাদের মুখ কালো হবে, তাদের বলা হবে-“তোমরা কি ঈমান আনার পর কাফির হয়ে গিয়েছিলে? তাহলে এবার সেই কুফরির বিনিময়ে আজাবের আস্বাদন গ্রহণ করো।"' আলে ইমরান: ১০২-৬
মুসলিমদের দুই পক্ষ পরস্পরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে কুফরিতে লিপ্ত হয়েছে। কেননা, রাসূল বলেছেন-
'তোমরা আমার মৃত্যুর পর কাফির হয়ো না। তখন তোমরা একে অপরকে হত্যা করবে।'
অতএব, এটা একপ্রকারের কুফরি। তবে একজন মুসলিমকে গুনাহের কারণে কাফির আখ্যা দেওয়া যায় না। আল্লাহ বলেন-
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ - إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ-
'যদি মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধ করে, তাহলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একদল অন্যদলের ওপর বাড়াবাড়ি (বাগাওয়াত) করে, তাহলে যে দল বাড়াবাড়ি করবে, তোমরা তার বিরুদ্ধে লড়ো; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে (আল্লাহর নির্দেশ মেনে নেয়)। যদি ফিরে আসে, তাহলে উভয়ের মধ্যে ন্যায়ের সাথে মীমাংসা করো এবং সুবিচার করো। আল্লাহ তো সুবিচারকারীদেরই ভালোবাসেন। নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পরে ভাই। তাই তোমাদের ভাইদের মাঝে সন্ধি করে দাও। আল্লাহকে ভয় করো, অচিরেই তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হবে।' সূরা হুজুরাত: ৯-১০
পরস্পর যুদ্ধরত মুসলিমদের সম্পর্কে আল্লাহর হুকুম হলো- 'মুসলিম পরস্পরের ভাই।' তাদের মাঝে যুদ্ধ হলে প্রথম কর্তব্য হলো তাদের মাঝে সন্ধি করা। তবে তাদের কেউ যদি সন্ধিকে গ্রহণ না করে অপর দলের ওপর হামলা করে বসে কিংবা তাদের ওপর বাগাওয়াত করে বসে বা সীমালঙ্ঘন করে বসে, তাহলে এই সীমালঙ্ঘনকারীদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে, তাহলে তাদের মাঝে ইনসাফের সাথে সমাধান করে দিতে হবে।
সুতরাং আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসার পর তাদের মাঝে ইনসাফের সাথে নিষ্পত্তি বা সন্ধির আদেশ দেওয়া হচ্ছে। তাই কেউ যদি আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে, তাহলে তার এবং তার প্রতিপক্ষের মাঝে ইনসাফভিত্তিক ফয়সালা করা হবে। সীমালঙ্ঘনকারী দলটির সাথে যুদ্ধের পূর্বে এবং উভয়পক্ষের যুদ্ধের পরে সন্ধির আদেশ সর্বাগ্রে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা নির্মমভাবে নির্বিচারে কোনো দলের ওপর হত্যাযজ্ঞের আদেশ দেননি।
সন্ধির পদ্ধতি
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অদেশমতে, উপর্যুক্ত পরিস্থিতিতে পক্ষদ্বয়ের মাঝে সন্ধি ওয়াজিব। তাদের বলা হবে-'তোমরা একে অপরের থেকে কী বদলা নেবে?' যদি কোনো দলের হত্যা ও সম্পদ লুণ্ঠন জাতীয় অন্যায় প্রমাণিত হয়, তাহলে তার ওপর জরিমানা আরোপ করা হবে। আর প্রত্যেকেই যদি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়, তাহলে কিসাসের ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন: আল্লাহ বলেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنْثَى بِالْأُنْثَى
'তোমাদের ওপর হত্যার ক্ষেত্রে কিসাসকে ফরজ করা হয়েছে। স্বাধীন লোকের বিনিময়ে স্বাধীন লোক। দাসের বদলে দাস। নারীর বদলে নারী।' সূরা বাকারা : ১৭৮
সালাফদের একটি দল বর্ণনা করেছেন, এই আয়াতটি যুদ্ধমান দুটি দলের মধ্যে কিসাসের বিধানের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে।
فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَادَاءُ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ
'তবে কাউকে যদি তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে মাফ করে দেওয়া হয়, তাহলে ক্ষমা হলো মহানুভবতা।' সূরা বাকারা: ১৭৮
যদি কেউ আরেকজনের ওপর মহানুভবতা দেখায়, তাহলে যথাযথ বিধি অনুসরণ করা কর্তব্য। যার ওপর কারও হক আছে, তা দিয়ে দেওয়া কর্তব্য। কেউ হক দিতে অপারগ হলে তার পক্ষ থেকে অন্য কেউ তার দায়িত্ব পালন করতে পারে। পারস্পরিক সৌহার্দ্য ফিরিয়ে আনার জন্য এটা জায়েজ আছে। পরে সে তা মুসলিমদের জাকাত থেকে নিয়ে নেবে এবং সে ধনী হওয়া সত্ত্বেও মানুষের কাছে সহযোগিতার তলব করতে পারে। রাসূল কবিসা ইবনুল মুখারিককে বলেন-
'হে কবিসা! মনে রেখ, তিন ব্যক্তি ছাড়া কারও জন্য হাত পাতা বা সাহায্য প্রার্থনা করা হালাল নয়।
১. যে ব্যক্তি (কোনো ভালো কাজ করতে গিয়ে বা দেনার জামিন হয়ে) ঋণী হয়ে পড়েছে। ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সাহায্য প্রার্থনা করা তার জন্য হালাল। যখন দেনা পরিশোধ হয়ে যাবে, তখন সে এ থেকে বিরত থাকবে।
২. যে ব্যক্তি প্রাকৃতিক দুর্যোগে পতিত হয়েছে এবং এতে তার যাবতীয় সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। তার জন্য সাহায্য চাওয়া হালাল; যতক্ষণ না তার নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়।
৩. যে ব্যক্তি এমন অভাবগ্রস্ত হয়েছে যে, তার গোত্রের তিনজন জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোক সাক্ষ্য দেয় যে “সত্যিই অমুক অভাবে পড়েছে”, তার জন্য জীবিকা নির্বাহের পরিমাণ সম্পদ লাভ করার পূর্ব পর্যন্ত সাহায্য প্রার্থনা করা হালাল।'১১১
প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের দায়িত্ব হলো-যখনই সম্ভব হয়, মুসলিমদের মাঝে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা এবং আল্লাহর বিধানের নির্দেশ দেওয়া।
ধৈর্যধারণকারী মজলুমের ফজিলত
উভয়পক্ষের কেউ যদি মনে করে-সে মজলুম কিংবা তার ওপর অবিচার করা হচ্ছে, তবুও যদি সে ধৈর্যধারণ করে এবং ক্ষমা করে দেয়, তাহলে আল্লাহ তাকে সাহায্য ও সম্মানিত করবেন। সহিহ হাদিসে এসেছে-
'যে বান্দা ক্ষমা করে, আল্লাহ তার ইজ্জত বাড়িয়ে দেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়াবনত হয়, তার মর্যাদা আল্লাহ বৃদ্ধি করে দেন। আর সাদাকা মালকে বাড়িয়ে দেয়।'১১২
আল্লাহ বলেন-
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ -
'মন্দ কাজের অনুরূপ মন্দ ফল ভোগ করতে হবে। আর যে ক্ষমা করবে এবং সম্প্রীতি বজায় রাখবে, তার প্রতিদান আল্লাহর দায়িত্বে।' সূরা শূরা: ৪০
আল্লাহ আরও বলেন-
إِنَّمَا السَّبِيْلُ عَلَى الَّذِينَ يَظْلِمُونَ النَّاسَ وَيَبْغُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ - وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
'অভিযোগ কেবল তাদের বিরুদ্ধে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার চালায় এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর যে সবর করে এবং ক্ষমা করে, তা নিশ্চয় সাহসিকতার কাজ।' সূরা শূরা: ৪২-৪৩
বাগাওয়াতকারী নিজেই নিজের পরাজয় রচনা করে
জালিম বাগাওয়াতকারী থেকে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন-
'কোনো পাহাড়ও যদি আরেকটি পাহাড়ের ওপর জুলুম করে, তাহলে তাকেও অবশ্যই সমতল ভূমিতে রূপায়িত করা হবে।'
এক আরবি কবি বলেন-
'আল্লাহর বিধান হলো-বাগাওয়াত তার কর্তাকেও পরাস্ত করে। বাগির ওপর বিপদাপদের ঘনঘটা থাকে।'
কুরআনের আয়াতও একই কথা বলে-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا بَغْيُكُمْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ مَتَاعَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا
'তোমাদের অনাচার বা বাগাওয়াত কেবল তোমাদের নিজেদেরই ক্ষতি করবে। দুনিয়ার জীবনের আনন্দ ভোগ করে নাও।' সূরা ইউনুস: ২৩
রাসূল বলেন-
'সীমালঙ্ঘন বা বাগাওয়াত অপেক্ষা এমন বড়ো কোনো পাপ কাজ নেই-যেটার শাস্তি দুনিয়াতে এতটা দ্রুত আপতিত হয়।
আর আত্মীয়তা রক্ষা অপেক্ষা বড়ো কোনো সৎ কাজ নেই- যেটার প্রতিদান এতটা দ্রুত দুনিয়াতে দেওয়া হয়। '১১৩
বাগির করণীয় কী
উভয়পক্ষের বাগি ও জালিম ব্যক্তির কর্তব্য হলো আল্লাহকে ভয় করা এবং তওবা করা। আর যে মজলুম কিংবা বাগাওয়াতের শিকার হওয়া সত্ত্বেও ধৈর্যধারণ করে, তার জন্য সুসংবাদ রয়েছে। আল্লাহ নিজেই বলেছেন-
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
'ধৈর্যধারণকারীদের জন্য সুসংবাদ দাও।' সূরা বাকারা: ১৫৫
আমর ইবনে আউস (রা.) বলেন-
'যারা জুলুমের শিকার হওয়া সত্ত্বেও পালটা জুলুম করে না, তাদের মনে রাখা উচিত, মুমিনদের শত্রুদের সম্পর্কে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-
وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا-
'যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তাহলে তাদের কূটচাল তোমাদের কোনো ক্ষতি করবে না।' সূরা আলে ইমরান : ১২০
ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা যখন তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করল, তখন তিনি ধৈর্যধারণ করলেন এবং খোদাভীতি অবলম্বন করলেন। একপর্যায়ে আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করলেন। তিনি যখন ক্ষমতার মসনদে আসীন, তখন তাঁর ভাইয়েরা সামনে এসে হাজির হলেন। তারা বললেন-
إِنَّكَ لَأَنْتَ يُوسُفُ قَالَ أَنَا يُوسُفُ وَهُذَا أَخِي قَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا إِنَّهُ مَنْ يَتَّقِ وَيَصْبِرُ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ
'তুমিই কি ইউসুফ নও?' তিনি বললেন- 'আমি ইউসুফ। আর এ হচ্ছে আমার ভাই। আল্লাহ আমাদের ওপর দয়া করেছেন। যে আল্লাহকে ভয় করে এবং ধৈর্য ধরে, সে যেন জেনে রাখে- নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।' সূরা ইউসুফ: ৯০
মোটকথা, দুই পক্ষের কেউ যদি আল্লাহর বিধানাবলিকে লঙ্ঘন না করে, যথাযোগ্য ও ন্যায়সংগতভাবে তাঁকে ভয় করে এবং অপরের জুলুমের ওপর ধৈর্য ধরে, তাহলে কারও চক্রান্ত তার ক্ষতি করতে পারবে না; বরঞ্চ আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন।
ফিতনার কারণ গুনাহ ও পাপাচার
এ জাতীয় ফিতনার কারণ হলো-গুনাহ ও পাপাচার। দুই পক্ষেরই উচিত নিজেদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার ও তওবা করা, যা আজাবকে রহিত করে এবং রহমতকে অবারিত করে। আল্লাহ বলেন-
وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
'আপনি তাদের মাঝে থাকা অবস্থায় আল্লাহ তাদের আজাব দেবেন না এবং আল্লাহ তাদের তওবা অবস্থায় আজাব দেবেন না।' সূরা আনফাল : ৩৩
রাসূল বলেন-
'যে লোক বেশি বেশি ইস্তেগফার করে, আল্লাহ তার সকল দুশ্চিন্তা দূর করে দেন। সকল অভাব মোচন করে দেন। তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করেনি।'
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
الر كِتَبٌ أُحْكِمَتْ أَيْتُهُ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ - أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنَّنِي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُمْ مَّتَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى وَيُؤْتِ كُلَّ ذِي فَضْلٍ فَضْلَهُ وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ كَبِيرٍ -
‘আলিফ লা-ম র। এটি এমন এক কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত। অতঃপর সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে এক মহাজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ হতে, যেন তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও বন্দেগি না করো। নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ হতে সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা। আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তার সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা করো। তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ করো। তাহলে তিনি তোমাদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন এবং অধিক আমলকারীকে বেশি করে দেবেন।’ সূরা হুদ : ১-৩
সন্ধিতে অসম্মত দলটির সাথে করণীয়
দুটি দল-যারা নিজেদের উম্মতে মুহাম্মাদি হিসেবে দাবি করা সত্ত্বেও জাহেলি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় তথা প্রতিহিংসা ও খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়, মুমিনরা তাদের মাঝে সন্ধি ও সম্প্রীতি স্থাপন করতে গেলে তারা প্রত্যেকেই অপরপক্ষকে যদি দোষী সাব্যস্ত করে এবং বলে-বিপক্ষের লোকেরাই প্রকৃত বাগাওয়াতকারী, তাদের নিকট থেকে আমাদের বদলা নেওয়া ওয়াজিব। কারণ, আল্লাহ বলেছেন-
‘আমরা তাদের ওপর এ বিষয়ে ওয়াজিব করেছি যে, জানের বদলে জান...’১১৪
তাহলে মধ্যস্থতাকারী মুমিনদের করণীয় কী? হত্যা ও লুণ্ঠনের এই নৈরাজ্যকর অবস্থা তাদের কুফরের দিকে ধাবিত করবে। কারণ, তাদের দাবি হচ্ছে-‘বিপক্ষ দলের ওপর আমাদের হক আছে। তাই যতক্ষণ আমরা তরবারির মাধ্যমে বদলা আদায় না করব, ততক্ষণ ক্ষান্ত হব না!’ একপর্যায়ে দেখা গেল, একটি দল অপর দলের ওপর হামলা করে বসল। প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তারা বাগাওয়াত ও জুলুম করল এবং মানুষদের হত্যা করল। এভাবে তারা নৈরাজ্য ও অরাজকতা সৃষ্টি করল। এক্ষেত্রে বাগাওয়াতকারী দলটিকে উপযুক্ত উপদেশ দেওয়ার পর তাদের সাথে যুদ্ধ করা এবং তাদের হত্যা করা কি ওয়াজিব? কিংবা এক্ষেত্রে বাগাওয়াতকারী দলটির সাথে ইমামের করণীয় কী?
কিতাবুল্লাহ সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মতের ভিত্তিতে দুই দলের যুদ্ধ হারাম
রাসূল বলেন-
'দুজন মুসলিম পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হলে হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়ই জাহান্নামি।' রাসূলকে প্রশ্ন করা হলো- 'হত্যাকারীর বিষয়টা বুঝে এলো। কিন্তু নিহত ব্যক্তির নিয়তি এমন কেন?' তিনি বললেন-'কেননা, সেও তার ভাইকে হত্যার উদ্দেশ্যেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে।'"১১৫
অন্যত্র নবিজি বলেন-
'আমার পরে তোমরা কাফির হয়ো না। একে অপরের মুণ্ডুপাত করো না।' ১১৬
তিনি আরও বলেন-
'নিশ্চয়ই তোমাদের ওপর অপরের জান ও মালকে হারাম করা হয়েছে। তোমাদের আজকের এই দেশ, এই সময়, এই মাসের হারামের মতো হারাম করা হয়েছে। শোনো, তোমাদের মধ্যে উপস্থিত ব্যক্তিরা যেন অনুপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে আমার বার্তা পৌঁছে দেয়। হতে পারে যাদের কাছে তাবলিগ করবে, তারা অনেকে শ্রোতাদের চেয়েও অধিক ধীশক্তিসম্পন্ন থাকতে পারে।' ১১৭
দুই পক্ষের সন্ধির পদ্ধতি
দুই পক্ষের সন্ধি ওয়াজিব। সন্ধির অনেক পদ্ধতি রয়েছে। যেমন- জাকাত থেকে সম্পদ সংগ্রহ করবে। সন্ধি প্রতিষ্ঠার জন্য জরিমানার টাকা জাকাত সংশ্লিষ্ট সম্পদ থেকে আদায় করা বৈধ আছে। এমনটাই শাফেয়ি, হাম্বলি ও অন্যান্য মাজহাবের ফকিহগণ বলেছেন। রাসূল কবিসা ইবনুল মুখারিক (রা.)-কে বলেন-'হে কবিসা! মনে রেখ, তিন ব্যক্তি ছাড়া কারও জন্য হাত পাতা বা সাহায্য প্রার্থনা করা হালাল নয়।
১. যে ব্যক্তি (কোনো ভালো কাজ করতে গিয়ে বা দেনার জামিন হয়ে) ঋণী হয়ে পড়েছে। ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সাহায্য প্রার্থনা করা তার জন্য হালাল। যখন দেনা পরিশোধ হয়ে যাবে, তখন সে এ থেকে বিরত থাকবে।
২. যে ব্যক্তি প্রাকৃতিক দুর্যোগে পতিত হয়েছে এবং এতে তার যাবতীয় সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। তার জন্য সাহায্য চাওয়া হালাল, যতক্ষণ না তার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়।
৩. যে ব্যক্তি এমন অভাবগ্রস্ত হয়েছে যে, তার গোত্রের তিনজন জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোক সাক্ষ্য দেয়, “সত্যিই অমুক অভাবে পড়েছে”, তার জন্য জীবিকা নির্বাহের পরিমাণ সম্পদ লাভ করার পূর্ব পর্যন্ত সাহায্য প্রার্থনা করা হালাল। এ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ও কারণে যদি ভিক্ষা করে বা সাহায্য প্রার্থনা করে উপার্জন করে, তা হারাম হবে।'১১৮
উভয়পক্ষের লোকেরা একে অপরের রক্তপণ ও জরিমানা মওকুফ করে দেবে। আল্লাহ বলেন-
فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُه عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ
'যে ক্ষমা করে ও সন্ধি করে, তার প্রতিদান আল্লাহর দায়িত্বে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমকে পছন্দ করেন না।' সূরা শূরা: ৪০
উভয়পক্ষের সাথে ইনসাফের সাথে বিচার করা হবে। দেখা হবে, উভয়পক্ষের জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি কেমন হয়েছে। কিসাসের ভিত্তিতে স্বাধীনের বদলে স্বাধীন, দাসের বদলে দাস, নারীর বদলে নারীর বদলা নেওয়া হবে। আর কোনো পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি যদি বেশি হয়, তাহলে মহানুভবতার অনুসরণ করতে হবে এবং উত্তমরূপে তা আদায় করতে হবে। আর যদি নিহতের সংখ্যা কিংবা মালের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে জানা না যায়, তাহলে এই অজ্ঞাত ক্ষয়ক্ষতি ধরা যাবে না। তবে কোনো দল যদি অধিক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করে, তাহলে অপরপক্ষকে তা কসম করে অস্বীকার করতে হবে কিংবা অভিযোগকারী দল দাবির পক্ষে দলিল হাজির করবে। আর অভিযুক্ত দল যদি কসম করতে অসম্মতি জানায়, তাহলে কসম করতে অসম্মতি জানানোর কারণে তাদের বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
প্রতিশোধ গ্রহণ করা ওয়াজিব-কথাটি মিথ্যা
যে ব্যক্তি বলে-'আল্লাহ বদলা নেওয়াকে ওয়াজিব করেছেন', সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর ওপর মিথ্যারোপ করেছে। কেননা, কেউ তার মুসলিম ভাই কর্তৃক জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি কিংবা মানহানির শিকার হলে তার ওপর বদলা নেওয়াকে আল্লাহ ওয়াজিব করেননি। উপরন্তু আল্লাহ বান্দার হকের আলোচনায় সবখানেই ক্ষমা করাকে পছন্দনীয় পন্থা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেমন: আল্লাহ বলেন-
وَالْجُرُوحَ قِصَاصٌ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُ -
'আঘাতসমূহের কিসাস নেওয়া হবে। তবে যদি সাদাকা করে দেয়, তাহলে সেটা তার কাফফারা বিবেচিত হবে।' সূরা মায়েদা: ৪৫
তিনি আরও বলেন-
فَنِصْفُ مَا فَرَضْتُمْ إِلَّا أَنْ يَعْفُوْنَ أَوْ يَعْفُوَ الَّذِي بِيَدِهِ عُقْدَةُ النكاح
'ধার্যকৃত সম্পদের অর্ধেক দেবে। তবে যদি তারা ক্ষমা করে দেয় কিংবা যার হাতে বিয়ের বন্ধন-সে যদি ক্ষমা করে দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা।' সূরা বাকারা: ২৩৭
কিসাসের আয়াতের প্রকৃত ব্যাখ্যা
وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفَ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصُ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
'আমি এ গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময়ে চোখ, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং জখমসমূহের বিনিময়ে সমান জখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে গুনাহ থেকে পাক হয়ে যায়। যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদানুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই জালিম।' সূরা মায়েদা : ৪৫
এই আয়াতের বিধান বনি ইসরাইলের ওপর ফরজ করা হয়। আজও যেহেতু তা মানসুখ বা রহিত হয়নি, তাই আমরাও তা পালন করি। এর উদ্দেশ্য হলো- সকল মুসলিমের রক্তই সমান। যেমন: রাসূল বলেন-
'সকল মুসলিমের জীবনমূল্য সমান। অন্যদের বিরুদ্ধে তারা ঐক্যবদ্ধ শক্তি।'১১৯
সুতরাং চাই হত্যাকারী উঁচু বংশের নেতাগোছের হোক, আর নিহত ব্যক্তি দুর্বল ও নিম্ন শ্রেণির হোক কিংবা হত্যাকারী চাই হাশেমি আর নিহত ব্যক্তি কুরাইশের হোক-বিধান কখনোই পরিবর্তিত হবে না। সবার জীবনমূল্য সমান।
মূলত এর উদ্দেশ্য হলো-জাহেলি যুগে প্রচলিত বিধিকে রহিত করা। জাহেলি যুগে প্রথা ছিল-গোত্রের বড়ো কোনো ব্যক্তি যদি নিহত হয়, তাহলে হত্যাকারীর গোত্রের বদলে অন্য গোত্রের কয়েকজনকে হত্যা করা। আর যদি নিম্ন পর্যায়ের কোনো লোক নিহত হয় এবং হত্যাকারী গোত্রের উঁচু পর্যায়ের লোক হয়, তাহলে কোনো বদলা নিতে পারবে না। এসব প্রথাকে বাতিল করতে আল্লাহ বলেন-
'এ বিষয়ে আমরা তাদের ওপর জানের বদলে জান ফরজ করেছি।'
তাই দেখা যাচ্ছে, জানের বদলে জানের বিধান কার্যকর করে সমতা বজায়ের হুকুম দেওয়া হয়েছে। কারণ, কারও ওপর জুলুম করা সম্পূর্ণরূপে হারাম। আর হকদারের হক বুঝিয়ে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। যেমন: আল্লাহ বলেন-
وَمَنْ قُتِلَ مَظْلُومًا فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيِّهِ سُلْطَانًا فَلَا يُسْرِفْ فِي الْقَتْلِ
'আর যে নাহকভাবে নিহত হয়েছে, তার অভিভাবককে বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছি। তাই হত্যার বেলায় তোমরা বাড়াবাড়ি করো না।' সূরা বনি ইসরাইল: ৩৩
অর্থাৎ যে হত্যা করেনি, তাকে হত্যা করো না।
কোনো একটি দল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর হুকুমের সামনে আত্মসমর্পণ করার পর অপর দলটি যদি বলে- 'আমরা আমাদের হক নিজ হাতে আদায় করব', তাহলে এটা গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। যখন ক্ষমতাধর অপর দলটি আল্লাহ ও রাসূল -এর হুকুম পালনে অসম্মতি জানায়, তখন আমিরের ওপর ওয়াজিব হলো এদের হত্যা করা। তারা যদি ক্ষমতাধর না হয়, তাহলে তদন্ত করা হবে-কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর হুকুম মানতে অসম্মতি জানিয়েছে। অতঃপর তাকে ন্যায়বিচার মানতে বাধ্য করা হবে।
বহু বছরের পুরাতন বদলা বা হক কীভাবে আদায় করা হবে
কেউ যদি দাবি করে-প্রতিপক্ষের ওপর আমাদের বহু বছরের হক রয়েছে, তাহলে তাদের বলা হবে-আমরা তোমাদের মাঝে নতুন ও পুরাতন সব হকের বিষয়ে মীমাংসা করব। কারণ, আল্লাহর বিধান সব সময়ের জন্য পালন করা অপরিহার্য।
সন্ধির পর কাউকে হত্যা করা
সন্ধি ও সম্প্রীতি স্থাপিত হওয়ার পর যদি কেউ কাউকে হত্যা করে, তাহলে হত্যাকারীকেও হত্যা করা হবে। অধিকন্তু আলিমদের একটি দল বলেন-তাকে হত্যা করে হদ্দ কায়েম করা হবে এবং নিহত ব্যক্তির স্বজনদের জন্য এ লোককে ক্ষমা করা জায়েজ হবে না। অধিকাংশ আলিম বলেন-তাকে হত্যা করা হবে বটে, তবে স্বজনরা মাফ করার এখতিয়ার রাখবে।
তবে এরূপ কাজ যদি পুরো দল মিলে করে, তাহলে তাদের শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। তাদের হত্যা করা ব্যতীত যদি তারা না ফেরে, তাহলে তাদের হত্যা করা হবে। আর যদি হত্যা করা ছাড়াই তারা ফিরে আসে, তাহলে এমন শাস্তি দেওয়া হবে-যা তাদের সীমালঙ্ঘন ও শত্রুতা থেকে এবং চুক্তি ও ওয়াদা ভঙ্গ থেকে বিরত রাখে। রাসূল বলেছেন-
'কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের পশ্চাতে তার বিশ্বাসঘাতকতার পরিমাণমতো পতাকা স্থাপিত থাকবে। তারপর বলা হবে-“এটা অমুকের বিশ্বাসঘাতকতা।”'১২০
আল্লাহ বলেন-
فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءُ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ ذَلِكَ تَخْفِيفٌ مِنْ رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ -
'অতঃপর তার ভাইয়ের তরফ থেকে যদি কাউকে কিছুটা মাফ করে দেওয়া হয়, তবে প্রচলিত নিয়মের অনুসরণ করবে এবং ভালোভাবে তাকে তা প্রদান করতে হবে। এটা তোমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে সহজ ও বিশেষ অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করে, তার জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আজাব।' সূরা বাকারা: ১৭৮
আলিমদের একদল বলে-ক্ষমার পরে যে হত্যা করে, তাকে অবশ্যই হত্যা করা হবে। আরেক দল বলেন-তাকে এমন শাস্তি দেওয়া হবে, যার ফলে সে এ জাতীয় কাজ থেকে বিরত থাকে।
নামাজ-রোজা ইত্যাদি পরিত্যাগকারীর হদ কী
যারা নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না অথবা রোজা রাখে কিন্তু নামাজ পড়ে না, মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করে আবার প্রতিবেশী ও অসহায়দের সাহায্যও করে, তাদের ধর্ম নির্দিষ্ট করে শনাক্ত করা যায় না। তাহলে তাদের হুকুম কী?
তারা যদি কোনো শাসকের অধীনে থাকে, তাহলে শাসক তাদের নামাজ কায়েমের আদেশ দেবে। যদি না করে, তাহলে শাস্তি দেবে। রোজার ক্ষেত্রেও একই কথা। তবে এটা তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন তারা ফরজগুলোর ফরজিয়াত স্বীকার করবে। যদি স্বীকার না করে, তাহলে তারা কাফির। আর তারা যদি নামাজ-রোজা ইত্যাদির ফরজিয়াত স্বীকার করা সত্ত্বেও আদায় না করে, তাহলে তা আদায় করা পর্যন্ত তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। এতৎসত্ত্বেও যারা নামাজ পড়বে না, জমহুর আলিম তথা ইমাম মালেক, শাফেয়ি, আহমদ (রহ.) প্রমুখের মতানুযায়ী-তাদের হত্যা করা হবে। অনুরূপভাবে হদও কায়েম করা হবে।
যদি প্রভাবশালী সম্পূর্ণ একটি দল ফরজ বিধান পালন না করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে (যেমন: জাকাত দিতে অসম্মতি জানানো দলটির বিরুদ্ধে আবু বকর (রা.) যুদ্ধ করেছিলেন); যদি না তারা সুস্পষ্ট মুতাওয়াতির ওয়াজিবগুলো পালনে ব্রতী হয়। সুস্পষ্ট মুতাওয়াতির ওয়াজিবগুলো হলো-নামাজ, রোজা, জাকাত ইত্যাদি। যিনা, সুদ, ডাকাতি ইত্যাদি পরিত্যাগ করাও এ জাতীয় ওয়াজিবের অন্তর্গত।
যে ব্যক্তি নামাজ ও রোজাকে ফরজ মনে করবে না; অস্বীকার করবে, সে কাফির। তাকে তওবা করতে বলা হবে। তওবা না করলে হত্যা করা হবে। আর যে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান রাখে না, সে তো ইহুদি-নাসারাদের চেয়েও বড়ো কাফির।
পাপাচারী সম্প্রদায় যুদ্ধে নিহত হলে কি শহিদ হবেন?
সীমান্তে বসবাসকারী যেসব সম্প্রদায় শত্রুপক্ষ থেকে দেশকে রক্ষা করে এবং শরাব ও যিনায় নিজেদের অর্থ ব্যয় করে, তারা যদি মারা যায়, তাহলে কি শহিদ বিবেচিত হবে?
তারা যদি কাফির শত্রুপক্ষদের ওপর হামলা করে মারা যায়, তাহলে তাদের কাজের প্রতিদান নিয়্যাতের ভিত্তিতে পাবে। একবার সাহাবিরা রাসূল-কে জিজ্ঞেস করলেন-
'হে আল্লাহর রাসূল! মানুষ তো বীরত্ব প্রদর্শন, জাতিস্বার্থ ও লোক দেখানোর জন্যও যুদ্ধ করে, তাহলে শহিদ কে?'
রাসূল বললেন-
'যে আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত রাখার জন্য যুদ্ধ করে, সে-ই শহিদ।'১২১
তাই কেউ যদি অর্থোপার্জন এবং তা পাপ কাজে খরচ করার জন্য যুদ্ধ করে, তাহলে সে ফাসিক এবং তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত রাখতে এবং সর্বাত্মকভাবে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করে, তাহলে সে শহিদ হবে। যদি তাদের কবিরা গুনাহ থাকে, তাহলে পুণ্যও থাকবে। আর পাপ তো পুণ্যের দ্বারা বিমোচিত হয়ে যায়।
তবে তারা যদি সেখানকার মুসলিমদের হত্যা করে, তাহলে তারা জমিনে বিপর্যয়কারী ও ফিতনা সৃষ্টিকারী লোক গণ্য হবে। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে বলে তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
টিকাঃ
১১৪. প্রাগুক্ত
১১৫. প্রাগুক্ত
১১৬. প্রাগুক্ত
১১৭. বুখারি: ৬৮, মুসলিম: ১২১৮
১১৮. প্রাগুক্ত
১১৯. আবু দাউদ: ৪৫৩০
১২০. প্রাগুক্ত
১২১. বুখারি: ৭৪৫৮, মুসলিম: ১৫০
১১২. মুসলিম: ২৫৮৮
১১১. আবু দাউদ: ১৬৪০, মুসলিম: ১০৪৪
১১০. আবু দাউদ: ৪৯০২
📄 পাতানো ভ্রাতৃত্ব এবং আনসার-মুহাজিরদের ভ্রাতৃ-সম্পর্ক
পাতানো ভ্রাতৃত্ব
বর্তমানে অনেকেই ভাই পাতিয়ে একজন আরেকজনকে বলে—‘আমার সম্পদ তোমার সম্পদ এবং আমার আত্মীয় তোমার আত্মীয়। আমার সন্তান তোমার সন্তান।’ এই বলে একে অপরের রক্ত পান করে। এমনটা করা কি শরিয়তসম্মত? এটা কি মুবাহ? এতে করে রক্তসম্পর্কীয় ভাইয়ের বিধান প্রযোজ্য হবে? আর মুহাজির ও আনসারদের মাঝে রাসূল ﷺ যে ভাইয়ের সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, তা কেমন ছিল?
উল্লিখিত পদ্ধতিতে সর্বসম্মতিক্রমে ভাই পাতানো জায়েজ নেই। রাসূলের পদ্ধতিটি ছিল এমন— ‘রাসূল ﷺ আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বাড়িতে সাদ ইবনে রবিয়া ও আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর মাঝে ভ্রাতৃবন্ধন প্রতিষ্ঠা করে দেন। তখন সাদ (রা.) আবদুর রহমান (রা.)-কে বলেন- “তুমি আমার সম্পদের এক ভাগ নিয়ে যাও, আর আমার স্ত্রীদের কাউকে পছন্দ করো। তাঁকে আমি তালাক দেবো, তাহলে তুমি তাঁকে বিয়ে করতে পারবে।” তারপর আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বললেন- “আল্লাহ তোমার মাল ও পরিবারে বরকত দিক। আমাকে বাজার দেখিয়ে দাও।”’১২২
অনুরূপভাবে রাসূল সালমান ফারসি ও আবু দারদা (রা.)-এর মাঝেও ভাইয়ের সম্পর্ক গড়ে দিয়েছিলেন। এ সবই সহিহ হাদিসে এসেছে।
তবে কিছু কিছু সিরাতকার এক মুহাজিরের সাথে অন্য মুহাজিরের এবং এক আনসারের সাথে অন্য আনসারের ভাই সম্পর্কের যে বর্ণনা করেছেন, তা ভিত্তিহীন। সকল হাদিসবিশারদের মতেই তা অগ্রহণযোগ্য। মুহাজির ও আনসারদের মাঝে এই সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছিল।
وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ-
'বস্তুত আত্মীয়গণই পরস্পরের বেশি হকদার।' সূরা আনফাল : ৭৫
এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর আত্মীয়তা সম্পর্ককেই মিরাসের মাপদণ্ড মানা হয়। পাতানো ভাই সম্পর্কে কোনো মিরাস নির্ণীত হয় না।
উল্লেখ্য, এক্ষেত্রে একটি ইখতিলাফ রয়ে গেছে। আর সেটা হলো-যদি পাতানো সম্পর্ক ছাড়া আর কোনো আত্মীয় বেঁচে না থাকে, তাহলে মিরাস পাবে কি না? ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এবং আহমদ (রহ.)-এর এক বর্ণনামতে পাবে। কারণ, আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَالَّذِينَ عَقَدَتْ أَيْمَانُكُمْ فَأْتُوهُمْ نَصِيبَهُمْ-
'আর যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, তাদের হক তাদেরকে দিয়ে দাও।' সূরা নিসা: ৩৩
ইমাম মালেক ও শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে এবং আহমদ (রহ.)-এর যে মতটি তাঁর অনুসারীদের কাছে প্রসিদ্ধ, সে মত অনুযায়ী-পাতানো সম্পর্কের ভিত্তিতে কিছুতেই মিরাস পাবে না। তাঁরা বলেন-উপরিউক্ত আয়াতটি মানসুখ বা রহিত হয়ে গেছে।
আনসার ও মুহাজিরদের মতো সম্পর্ক পাতানো কি বৈধ
এক্ষেত্রেও ইখতিলাফ রয়েছে। একদল বলেন-এ জাতীয় সম্পর্ক রহিত হয়ে গেছে। তাঁদের প্রথম দলিল মুসলিম শরিফের হাদিস।
জাবির ১২৩ (রা.) বলেন-
'ইসলামে কোনো পাতানো সম্পর্কের অস্তিত্ব নেই। জাহেলিয়াতের সময় যা ছিল, তার ওপর ইসলাম কেবল কঠোরতাই আরোপ করেছে। '১২৪
তা ছাড়া আল্লাহ কুরআনে মুমিনদের পরস্পরের ভাই হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। হাদিসেও রাসূল বলেছেন-
'মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার ভাইয়ের ওপর জুলুম করবে না এবং তার ভাইয়ের ওপর জুলুম হলে সহ্যও করবে না।'১২৫
আরেক হাদিসে নবিজি বলেন-
'যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না-যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যে উত্তম বিষয় পছন্দ করে, অপর ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করবে। '১২৬
যে ঈমানের আবশ্যিক শর্ত পালন করবে, সে সকল মুমিনের ভাই। তাই কোনো প্রকার বিশেষ চুক্তি ছাড়াই তার হক আদায় করা প্রত্যক মুমিনের কর্তব্য। কেননা, আল্লাহ ও রাসূল মুমিনদের ভ্রাতৃত্ব ও পরস্পরে দায়বদ্ধতার কথা পূর্বনির্ধারিত করে রেখেছেন।
মুসলিমের ভালোবাসা, পছন্দ-অপছন্দ ও বন্ধুত্ব-শত্রুতার স্বরূপ
মুসলমানের ভালোবাসা, পছন্দ-অপছন্দ ও বন্ধুত্ব-শত্রুতা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশমাফিক হতে হবে। তাই আল্লাহ ও রাসূল যা পছন্দ করেন, তা পছন্দ করা আবশ্যক এবং যা অপছন্দ করেন, তা অপছন্দ করা আবশ্যক। একইভাবে যে আল্লাহ ও রাসূলের সাথে বন্ধুত্ব করে, তার সাথে বন্ধুত্ব রাখা এবং যে আল্লাহ ও রাসূলের সাথে শত্রুতা রাখে, তার সাথে শত্রুতা রাখাও কর্তব্য। আর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ভালো-মন্দ উভয় কাজেরই প্রতিদান দেওয়া হবে। যেমন: ফাসিকরা সওয়াব ও শাস্তি দুটোই পাবে। এজন্য তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা দুটোই আমলে নিতে হবে। আমলের ভেতরে থাকা সৎ কাজ ও অসৎ কাজের ভিত্তিতে তাদের পছন্দ-অপছন্দ দুটোই করতে হবে।
যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ - وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَّرَه
'যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করে, তাকে তা দেখানো হবে এবং যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, তাকে তা-ও দেখানো হবে।' সূরা জিলজাল: ৭-৮
এটাই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মত। খারেজি, মুতাজিলা, জাহমিয়্যাহ ও মুরজিয়াদের অবস্থান এর বিরুদ্ধে। তারা উভয়দলই এক্ষেত্রে দুটো পক্ষ নিয়ে আছে এবং তারা প্রান্তিকতার শিকার। আহলে সুন্নাহ এক্ষেত্রে মধ্যমপন্থি দল।
সম্পর্ক-চুক্তির মাধ্যমে কোনো পিতৃত্ব সাব্যস্ত হয় না
এক্ষেত্রে কোনো মতবিরোধ নেই যে যদি কোনো রক্তের সন্তান (জীবিত) থাকে, তাহলে অন্য কেউ কারও মিরাসি সন্তান হতে পারবে না। অর্থাৎ পাতানো সম্পর্কের ছেলে মিরাস পাবে না, যদি রক্তের সন্তান থাকে। আল্লাহ তায়ালা পালকপুত্রের জাহেলি নিয়মকে রহিত করেছেন-
مَا جَعَلَ اللَّهُ لِرَجُلٍ مِّنْ قَلْبَيْنِ فِي جَوْفِهِ وَمَا جَعَلَ أَزْوَاجَكُمُ اللَّائِي تُظَاهِرُونَ مِنْهُنَّ أُمَّهَاتِكُمْ وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَ كُمْ أَبْنَاءَكُمْ -
'আল্লাহ কোনো মানুষের মধ্যে দুটি হৃদয় স্থাপন করেননি। তোমাদের যে স্ত্রীদের সাথে তোমরা জিহার করো, তাদের তিনি তোমাদের জননী করেননি এবং তোমাদের পোষ্যপুত্রদের তোমাদের পুত্র করেননি।' সূরা আহজাব : ৪
মহান আল্লাহ আরও বলেন-
اُدْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللَّهِ فَإِنْ لَّمْ تَعْلَمُوا آبَاءَهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَمَوَالِيْكُمْ -
'তোমরা তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত। যদি তোমরা তাদের পিতৃপরিচয় না জানো, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও বন্ধুরূপে গণ্য হবে।' সূরা আহজাব : ৫
অনুরূপভাবে তারা একে অপরের উত্তরাধিকারী হবে না। কারণ, এটা দুই দিক থেকেই অসম্ভব। তবে তারা উভয়ে অপরের সম্মতি সাপেক্ষে সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে; যেমনটা সালাফগণ করতেন। তাঁরা একে অপরের অনুপস্থিতিতে ঘরে ঢুকে খাবার খেতেন। কারণ, সে জানতেন যে এতে তাঁর সম্মতি আছে। যেমনটা আল্লাহ তায়ালা সূরা নুরে বলেছেন-
أَوْ صَدِيقِكُمْ -
'অথবা তোমাদের বন্ধুগণ।' সূরা নুর: ৬১
চুক্তি কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হলে পূরণ করা আবশ্যক
সর্বোপরি সকল শর্ত, চুক্তি ও সম্পর্ক কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে যাচাই করা আবশ্যক। যদি এগুলো কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হয়, তাহলে তা পালন করতে হবে। রাসূল ﷺ বলেন-
'যে ব্যক্তি কুরআন-সুন্নাহবিরোধী শর্ত করল, তার শর্ত বাতিল বলে গণ্য হবে; যদি শর্ত ১০০টিও হয়। কেননা, আল্লাহর কিতাব সবচেয়ে সত্য এবং তার শর্ত অধিক পালনযোগ্য।' ১২৭
যেমন: কেউ অন্যের ছেলেকে নিজের ছেলে বলে শর্ত করল কিংবা অন্যের গোলাম আজাদ করে দিলো অথবা তার সন্তান ও আত্মীয়কে মিরাস না পাওয়ার শর্ত করল অথবা নাহকভাবে কাউকে সহযোগিতার শর্ত রাখল বা কথা দিলো-এ জাতীয় সকল শর্তের ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথাই পালনযোগ্য। আল্লাহ ও রাসূলের খেলাফ কোনো কথা বা শর্ত পূরণ করা যাবে না। এ ব্যাপারে সকল ইমাম একমত। তবে মুবাহ বিষয়াদি নিয়ে মতপার্থক্য আছে। সেই আলোচনার এটা উপযুক্ত স্থান নয়।
অনুরূপভাবে ব্যবসায়িক চুক্তি, হেবা, ওয়াকফ, মান্নত, ইমাম ও মাশায়েখদের কাছে বাইয়াত, ভাই চুক্তি, বংশীয় চুক্তি ইত্যাদি সকল চুক্তির ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা আবশ্যক। আর সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব। স্রষ্টার অবাধ্যতা হয়-এমন কাজে সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না। আর সবচেয়ে প্রিয় হওয়া চাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল। আল্লাহু আলাম!
সমাপ্ত
টিকাঃ
১২২. বুখারি: ২০৪৯, মুসলিম: ১৪২৭
১২৩. হাদিসটি মুসলিম শরিফে জুবাইর ইবনে মুতইম (রা.)-এর সূত্রে এসেছে। জাবির (রা.)-এর সূত্রে নয়; যেমনটা শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন。
১২৪. মুসলিম: ২৫৩০
১২৫. বুখারি: ২৪৪২
১২৬. বুখারি: ১৩
১২৭. বুখারি: ২৫৬১