📄 সাহাবিদের পারস্পরিক যুদ্ধের ইতিহাস এবং আহলে সুন্নাহর অভিমত
সাহাবিদের পারস্পরিক যুদ্ধ সর্ম্পকে ভ্রান্ত ধারণাসমূহ
খারেজিরা আলি (রা.) এবং যারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, তাদের সবাইকে কাফির মনে করে। আর রাফেজিরা মনে করে-যারা আলি (রা.)-এর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, তারা কাফির। অথচ রাসূল থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রাসূল তাদের মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং কাফির না বলার আদেশ দিয়েছেন।
আয়িশা (রা.), জুবাইর (রা.) ও তালহা (রা.)-এর যুদ্ধের ব্যাপারে ভ্রান্ত আকিদার অনুসারীদের তিন রকমের মতামত পাওয়া যায়। একদল মনে করে, যুদ্ধকারী উভয়পক্ষের একপক্ষ ফাসিক; সবাই না। এ দলে আছে আমর ইবনে উবাইদ ও তাঁর অনুসারীগণ।
আরেক দল মনে করে-যে দল যুদ্ধ বাধিয়েছে, তারা ফাসিক। তবে কেউ যদি তওবা করে, তাহলে সে ফাসিক হবে না। তারা মনে করে, আয়িশা (রা.), জুবায়ের (রা.) ও তালহা (রা.) তওবা করেছিলেন। এটাই তাঁদের জমহুর তথা আবুল হুজাইল ও তাঁর অনুসারী এবং আবুল হুসাইন প্রমুখের বক্তব্যের সারবস্তু।
আরেকদল মনে করে, জুবায়ের (রা.) ও তালহা (রা.)-এর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়াটা ভুল ছিল। তবে শামবাসীদের সাথে যুদ্ধটাকে তাঁরা ভুল সিদ্ধান্ত মনে করে না।
মোটকথা, খারেজি রাফেজি ও মুতাজিলারা মুসলমানদের পারস্পরিক যুদ্ধকে কুফর ও ফাসিকির কারণ মনে করে।
সাহাবিদের পারস্পরিক লড়াই সম্পর্কে আহলে সুন্নাহর অভিমত
আহলে সুন্নাহর সবাই সাহাবিদের 'আদালত' তথা ন্যায়নিষ্ঠতায় বিশ্বাসী। তবে সাহাবিদের ভেতর কার ইজতিহাদ সঠিক বা ভুল ছিল-এ নিয়ে বিভিন্ন মাজহাবের ইমামের বিভিন্ন মতামত রয়েছে।
প্রথমপক্ষ মনে করে, আলি (রা.)-এর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।
দ্বিতীয়পক্ষ মনে করে, সবার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল।
তৃতীয়পক্ষ মনে করে, সবার মত সঠিক নয়; কোনো একটি দলের মত সঠিক।
চতুর্থপক্ষ মনে করে, তাঁদের ভেতরকার বিবাদকে মোটেই গ্রহণ করা যাবে না; অর্থাৎ এ বিষয়ে আলোচনা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এটা সর্বজনবিদিত যে, আলি (রা.) ও তাঁর অনুসারীগণ সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী ছিলেন। যেমনটা আবু সাইদ (রা.)-এর হাদিসে এসেছে-
'একদল ইসলাম থেকে একসময় বের হয়ে যাবে। তাদের এমন একটি দল হত্যা করবে, যারা সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী। ৭৭
এই হাদিসটি মূলত শামবাসীদের সাথে যুদ্ধবিষয়ক। এ ছাড়া আরও বহু হাদিস এটাই প্রমাণ করছে যে, জঙ্গে জামাল মূলত একপ্রকার 'ফিতনা' ছিল। আর ফিতনার সময় যুদ্ধ এড়িয়ে চলাটাই উত্তম। এই মতামতটিই ইমাম আহমদ (রহ.) সহ অধিকাংশ আহলে সুন্নাহর বক্তব্য দ্বারা সমর্থিত। এই ঘটনার পর উম্মতের মধ্যে দিন ও দুনিয়ার বিষয়ে যত বিবাদ হয়েছে, তার মূল হলো-মানুষের কথা ও অসংযত কাজ (মুখ ও হাত)। এখান থেকে প্রতিটি বুদ্ধিমান লোকের শিক্ষা নেওয়া উচিত। ফিতনার সময় যুদ্ধ-সংঘাত এড়িয়ে চলাটাই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মাজহাব বা আমল।
মুসলিমদের পারস্পরিক লড়াইয়ে নিহত ব্যক্তি কি জান্নাতি
মুসলিমদের দুটি দল যদি একটির ওপর আরেকটি হামলা করে। যাদের ওপর হামলা চালানো হয়, তারা যদি পরাজিত হয় এবং পরাজয়ের পর তাদের হত্যা করা হয়, তাহলে পরাজিত দলটির নিহত লোকদের কি জাহান্নামি বলা যাবে? তারা কি রাসূলের হাদিস '(মুসলিমদের পারস্পরিক লড়াইয়ে) হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামে যাবে'-এর অন্তর্ভুক্ত হবে? আর পরাজিতদের মধ্যে যারা জীবিত রয়ে যাবে, তারা কি যুদ্ধে নিহত লোকদের মতোই জাহান্নামি হবে?
যদি পরাজিত লোকটি হারাম যুদ্ধ থেকে তওবার নিয়্যাতে পরাজিত হয়, তাহলে তাকে জাহান্নামি বলা যাবে না। কেননা, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং গুনাহ মাফ করেন। তবে যদি তার পরাজয়টা নিছক অক্ষমতার দরুন হয়; তথা সুযোগ পেলে সে অবশ্যই তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করত, তাহলে অবশ্যই সে জাহান্নামে যাবে। যেমন: রাসূল বলেছেন-
'যখন দুজন মুসলিম তরবারিসমেত ময়দানে মিলিত হয়, তখন হত্যাকারী ও হত্যাকৃত উভয় ব্যক্তিই জাহান্নামে যাবে।' বলা হলো-'হে রাসূল! হত্যাকারীর বিষয়টা বোধগম্য, তবে হত্যাকৃত বা নিহত ব্যক্তির জাহান্নামে যাওয়াটা বোধগম্য নয়।' রাসূল বললেন-'নিশ্চয়ই সেও হত্যার ইচ্ছাতেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল।'৭৮
তাই নিহত ব্যক্তি যেহেতু জাহান্নামে যাবে, সেহেতু পরাজিত লোকটির জাহান্নামে যাওয়াটাও সুস্পষ্ট। কেননা, বিজয়ী-পরাজিত উভয়েরই ইচ্ছা ও কাজ একই ছিল। তা ছাড়া নিহত ব্যক্তিটির ওপর মৃত্যুর যে দুর্বিপাক নেমে এলো, তা পরাজিত ব্যক্তিটিকে ভোগ করতে হয়নি। (কারণ, সে জীবিত ও অক্ষত অবস্থাতেই পরাজয় বরণ করেছে)। তাই এই মৃত্যুর দুর্বিপাক যেহেতু নিহত ব্যক্তিটির পাপ মোচন করতে পারেনি বা তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করতে পারেনি, তাহলে সামান্য পরাজয়ের দুর্বিপাক বা গ্লানি তার মুসলিম ভাইকে হত্যায় অবতীর্ণ হওয়ার মতো জঘন্য পাপকে কী করে মোচন করবে? বরং তা কখনোই সম্ভব না। উপরন্তু পরাজিত ব্যক্তিটি যদি এরূপ যুদ্ধে অবিচল থাকে, তাহলে তার পাপ ময়দানে নিহত ব্যক্তিটির অপেক্ষায় নিঃসন্দেহে গুরুতর হবে এবং এ কারণে সে জাহান্নামে যাওয়ার অধিক হকদার। কারণ, যে লোকটি ময়দানে মারা গেল, তার পাপ তো মৃত্যুর সাথেই বন্ধ হয়ে গেল। পক্ষান্তরে অন্য লোকটি তওবা না করে তার এই জঘন্য পাপে অবিচল রইল।
এজন্যই ফুকাহাদের একটি দল বলেন-যদি এই সব স্বেচ্ছাচারী পরাজিত ব্যক্তিদের পুনর্বার সংগঠিত হয়ে আক্রমণ করার ক্ষমতা থাকে বা সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তাদের সবাইকে হত্যা করা হবে। তবে যে পরাজিত ব্যক্তি আঘাতের দরুন দুর্বল হয়ে গেছে, তার কথা ভিন্ন। কারণ, তার পুনরায় হামলা করার শক্তি নেই।
উল্লেখ্য, নিহত ব্যক্তি সম্পর্কে কথিত আছে-সে জাহান্নামি হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর কারণে হয়তো তার আজাব কমতে পারে। আর পরাজয়ের গ্লানি অপেক্ষা মৃত্যু গুরুতর। অতএব এটা সুস্পষ্ট যে, পরাজিত ব্যক্তিটি যদি তওবা না করে তার ভাইয়ের হত্যায় অবিচল থাকে, তাহলে সে নিহত ব্যক্তিটির চেয়ে জঘন্যতম। তবে সে তওবা করলে অবশ্যই আল্লাহ তার প্রতি দয়া ও মাফ করবেন।
বাগি ও খারেজি কি অভিন্ন
বাগি ও খারেজি কি সমার্থক, নাকি এ দুটোতে পার্থক্য আছে? শরিয়ত কি এই দুই দলের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন বিধান আরোপ করেছে, নাকি একই? আর কেউ যদি দাবি করে-ইমামরা এক্ষেত্রে একমত (ইজমা) যে, এদের বিধান একই; পার্থক্য শুধু নামে। অপরপক্ষে কেউ যদি এর বিরোধিতা করে বলে যে, আলি (রা.) শাম ও নাহরাওয়ানের অধিবাসীদের মধ্যে পার্থক্য করেছেন, তাহলে কোনটা সঠিক হবে?
প্রথমত, 'এই দুই দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; স্রেফ নামের পার্থক্য'-কথাটি মোটেও ইমামদের ইজমা (সর্বসম্মতি) দ্বারা সমর্থিত নয়। এটা সম্পূর্ণ ভুল। মূলত বাগিদের বিষয়ে অনেক গবেষকদের মতো হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি, হাম্বলিসহ অন্যান্য মাজহাবের একদল আলিমও মনে করেন, এই দুই দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাঁরা মনে করেন- আবু বকর (রা.) জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করেছিলেন, তা ছিল 'বাগিদের' বিরুদ্ধে যুদ্ধ। খারেজিদের বিরুদ্ধে আলি (রা.)-এর যুদ্ধও এই পর্যায়ের। এমনকী তাঁরা মনে করেন, জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফিনসহ যত যুদ্ধ মুসলিম নামধেয় সম্প্রদায়ের সাথে হয়েছে, সবই ছিল বাগিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এর পাশাপাশি তাঁরা এও বিশ্বাস করেন যে, তালহা (রা.), জুবায়ের (রা.) এবং তাঁদের সমমনা সাহাবিরা সকলেই সত্যের ওপর আছেন। তাঁদের কাউকেই কাফির বা ফাসিক বলা যাবে না। কেননা, তাঁরা সকলেই মুজতাহিদ ছিলেন। আর একজন মুজতাহিদের মতের ক্ষেত্রে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ দুটোরই সম্ভাবনা থাকে। ভুল হলে তা ক্ষমাযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তাই তাঁরা ব্যাপকভাবে বলে দেন, বাগিরা ফাসিক নন।
কথা হচ্ছে-যখন তাঁরা উভয় দলকে অভিন্ন মনে করেন, তখন অনিবার্যভাবেই খারেজি এবং যেসব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহাবিরা সত্যের ওপর থেকে ইজতিহাদ করে যুদ্ধ করেছেন, উভয়েই এক কাতারে শামিল হয়ে যায়। তাই একদল বাগিদের ফাসিক বলেছেন। তবে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদা হলো-সাহাবিগণ সত্যনিষ্ঠ। আদালাত বা বিশ্বাসযোগ্যতায় তাঁরা সর্বজনস্বীকৃত।
জমহুরের মতামত
জমহুর বা সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামগণ খারেজি বাগিদের, জঙ্গে জামাল-জঙ্গে সিফফিনের অংশগ্রহণকারী 'বাগিদের' এবং তারা ব্যতীত অন্য বাগি তথা যাদের ব্যাখ্যা সাপেক্ষে বাগি বলা হয়, তাদের মাঝে পার্থক্য করে থাকেন। সাহাবিদের এটাই প্রসিদ্ধ মত। জমহুর মুহাদ্দিসিন, ফুকাহা মুতাকাল্লিমিন এবং ইমাম মালেক, শাফেয়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ বহু ইমাম এবং তাঁদের অনুসারীগণও এই মতটিকেই গ্রহণ করেছেন।
খারেজিদের হত্যা করা যাবে কি
সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল বলেছেন-
'একটি দল ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে, যখন মুসলিমদের দুটি দলের মধ্যে অধিক সত্যনিষ্ঠ দলটি তাদের হত্যা করবে।'৭৯
এই হাদিসটি তিনটি দলের কথা বলছে। ইসলাম থেকে বের হবে তৃতীয় দলটি। যে দলটি যুদ্ধরত মুসলিম দুটি দল থেকে ভিন্ন আরেকটি দল। সে দুটি দলের একটি হলো মুয়াবিয়া (রা.)-এর এবং অপরটি আলি (রা.)-এর। আর আলি (রা.)-এর দলটিই হলো অধিক সত্যনিষ্ঠ।
খারেজিদের সম্পর্কে আরেকটি হাদিসে এসেছে—
‘তোমাদের মধ্যে এমন লোক হবে, যারা তোমাদের সাথে নামাজ-রোজা আদায় করা এবং কুরআন তিলাওয়াত করাকে অপমানজনক মনে করবে। কুরআন তাদের গলা দিয়ে নামবে না। তির যেভাবে ধনুক থেকে বের হয়, ইসলাম থেকে তারা সেভাবে বের হয়ে যাবে। তাদের তোমরা যেখানেই পাবে হত্যা করবে। কেননা, যারা তাদের হত্যা করবে, তারা কিয়ামতের দিন এই হত্যার জন্য আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাবে।’৮০
অন্যত্র এসেছে—
‘যারা খারেজিদের হত্যা করবে, তারা যদি নবির কৃত প্রতিশ্রুতির কথা জানত, তাহলে তারা এই আমল (হত্যা) থেকে বিরত থাকত না; এ কাজেই নিরত থাকত। ’৮১
ইমাম মুসলিম (রহ.) খারেজিদের বিষয়ক হাদিস ১০টি সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারি (রহ.) একাধিক সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়াও সুনান ও মুসনাদসমূহেও এই হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ এ সংক্রান্ত হাদিস বহুল বর্ণিত ও বহুল প্রচলিত। সবার কাছেই গ্রহণীয়। তাই খারেজিদের হত্যার ব্যাপারে সাহাবিরা সবাই একমত এবং সাহাবিদের অনুসারী উম্মতের আলিমগণও একমত।
অধিকাংশ সাহাবি জঙ্গে জামালে শরিক হননি
জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফিনে একদল সাহাবি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন বটে, তবে অধিকাংশ প্রবীণ ও বিজ্ঞ সাহাবি কোনো পক্ষেই লড়েননি।
তাঁরা রাসুল ﷺ থেকে বর্ণিত বহু হাদিস দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং এ যুদ্ধকে ফিতনা হিসেবে আখ্যা দেন। আর ফিতনার সময় যুদ্ধ পরিহার করার সিদ্ধান্ত নেন।
খারেজিদের হত্যার ব্যাপারে আলি (রা.) উৎসাহী ছিলেন। তাদের হত্যার বিষয়ে হাদিসও বর্ণনা করেছেন। পক্ষান্তরে সিফ্ফিনের যুদ্ধের সমর্থনে তাঁর পক্ষে কোনো দলিল পাওয়া যায় না। এটা নিছক তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা ইজতিহাদ; বরং তিনি যুদ্ধের বিপক্ষে মতামত দাতাদের কখনো কখনো প্রসংশাও করেছেন।
সহিহ হাদিসে এসেছে, রাসুল ﷺ হাসান (রা.) সম্পর্কে বলেছেন—
‘নিশ্চয়ই আমার এই বংশের একজন নেতা। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের দুটি বিরাট জামায়াতের মাঝে সন্ধি করাবেন।’৪২
রাসুল ﷺ আলি (রা.)-এর দল ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর দলের মাঝে সন্ধি সম্পাদনের জন্য হাসান (রা.)-এর প্রশংসা করেছেন। আর এটা এ কথাই বোঝাচ্ছে যে, এই দুই দলের মধ্যকার যুদ্ধটি পরিহার করাটাই উত্তম ছিল। এই যুদ্ধটি মোটেই কোনো ওয়াজিব কিংবা মুস্তাহাব যুদ্ধ ছিল না।
সুতরাং রাসুল ﷺ খারেজিদের হত্যার আদেশ দিয়েছেন এবং উৎসাহিত করেছেন—এটা প্রমাণিত। তাই রাসুল ﷺ যে দলকে হত্যা করতে আদেশ ও উৎসাহ দিয়েছেন এবং যে দলের সাথে যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন, সেই দুই দল কি সমান হতে পারে? সাহাবিদের সিফফিন ও জামালের যুদ্ধ এবং খারেজি গোষ্ঠীর জুল খুওয়াইসারাহসহ অন্যান্য ও হারক্বিয়া গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধকে যারা অভিন্ন মনে করে, তারা নিশ্চিত গোমরাহি ও অন্ধকারে নিমজ্জিত আছে। মূলত তারা রাফেজি ও মুতাজিলা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তারা খারেজিদের সাথে সাথে জামাল ও সিফ্ফিনের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবিদেরও ফাসিক ও কাফির মনে করে। তাই এই সম্প্রদায়ের কুফরির বিষয়ে ইমামদের ভেতরে প্রসিদ্ধ দুটি মতামতও রয়েছে। তবুও সকল সালাফ ও ইমাম সাহাবিদের বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবে স্থির এবং তাঁদের মধ্যকার বিবাদিত বিষয়ে নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করেন এবং এই বিষয়ে বিতর্ককে তাঁরা এড়িয়ে চলেন। অতএব, এতদুভয়ের মধ্যে তুলনা নিতান্তই বাতুলতা।
তা ছাড়া রাসূল খারেজিদের দ্বারা নিহত হওয়ার পূর্বে তাদের হত্যা করার জন্য মুসলিমদের আদেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে বাগিদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন-
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
'যদি মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তাদের মাঝে সন্ধি স্থাপন করো। একটি দল যদি অন্য দলের ওপর বাগাওয়াত (বাড়াবাড়ি) করে ফেলে, তাহলে বাগাওয়াতকারী বা বাগিদের সাথে যুদ্ধ করো; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর আদেশের দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে, তাহলে দলদ্বয়ের মাঝে সন্ধি স্থাপন করো ইনসাফপূর্ণভাবে। ইনসাফ করো। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন।' সূরা হুজুরাত : ৯
এখানে বাগিদের দলকে শুরুতেই হত্যা করতে বলা হয়নি। তাই হত্যা করাটা প্রাথমিক আদিষ্ট বিষয় নয়; বরং তারা যুদ্ধে লিপ্ত হলে প্রথমে তাদের মাঝে সন্ধি কর্তব্য। তারপর একটি দল যদি অবাধ্যাচরণ করে (অর্থাৎ বাগাওয়াত করে), তাহলে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। তাই একদল ফুকাহা বলেন-অবাধ্যাচারী বা বাগিদের সাথে শুরুতেই যুদ্ধ কাম্য নয়; বরং তারা যুদ্ধের ইচ্ছা করলে যুদ্ধ করতে হবে।
খারেজিদের সম্পর্কে রাসূল বলেছেন-
'খারেজিদের তোমরা যেখানেই পাও, হত্যা করো। তাদের হত্যাকারীদের জন্য আল্লাহর নিকট প্রতিদান রয়েছে। '৮৩
অন্যত্র বলেন-
'আমি যদি তাদের পেতাম, তাহলে আদ জাতির মতো তাদের হত্যা করতাম।'৮৪
খারেজি ও জাকাত অস্বীকারকারীরা কি এক
যারা জাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের বিষয়টাও অনুরূপ। কেননা, আবু বকর (রা.) ও সাহাবিগণের এক্ষেত্রে প্রাথমিক আমল ছিল তাদের হত্যা করা। আবু বকর (রা.) বলেন-
'আল্লাহর কসম! উটের যে রশিটি তারা রাসূলকে দিত, তা যদি আমাকে দিতে অসম্মতি জানায়, তাহলেও তা আদায়ের জন্য তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামব।'৮৫
জাকাতের ওয়াজিব হওয়াকে মান্য করা সত্ত্বেও শুধু জাকাত না দেওয়ার কারণে সাহাবিরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।
জাকাত অস্বীকারকারীরা কি কাফির
যারা জাকাত দিতে অসম্মত হয়েছিল, তারা কাফির কি না এবং তাদের সাথে শাসক যুদ্ধ করবেন কি না-এ নিয়ে ফুকাহাদের মধ্যে দুই ধরনের মত রয়েছে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর দুটি মত পাওয়া যায় এদের তাকফিরের ব্যাপারে। যেমন : খারেজিদের ব্যাপারেও তাঁর দুটি মত রয়েছে।
নিছক অবাধ্যাচারী কাফির নয়
সর্বসম্মতভাবে 'নিছক বাগি' কাফির নয়। কেননা, তারা যুদ্ধে জড়িত ও অবাধ্য হওয়ার পরও কুরআন তাদের 'মুমিন ও পরস্পরে ভাই' বলে উল্লেখ করেছে; তবে আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
টিকাঃ
৭৭. মুসলিম: ১০৬৪
৭৮. বুখারি: ৬৮৭৫
৭৯. মুসলিম: ১০৬৪
৮০. বুখারি: ৩৬১১, মুসলিম: ১০৬৬
৮১. মুসলিম: ১০৬৬, আবু দাউদ: ৪৭৬৮
৮২. বুখারি: ২৭০৪, আবু দাউদ: ৪৬৬২
৮৩. বুখারি: ৩৬১১, মুসলিম: ১০৬৬
৮৪. বুখারি : ৩৩৪৪, মুসলিম : ১০৬৪
৮৫. বুখারি : ৬৯২৪
📄 সাহাবিগণ সর্বোত্তম মানুষ এবং তাঁদের গালমন্দ করা গুনাহ
যারা মুয়াবিয়া (রা.)-কে অভিশাপ দেয়, তাদের পরিণাম কী? আর রাসূল ﷺ কি এই হাদিসটি বলেছেন- 'যখন দুজন খলিফা যুদ্ধ করে, তখন একজন অভিশপ্ত বিবেচিত হবে?' আর এটাও কি রাসূল বলেছেন- 'আম্মার (রা.)-কে হত্যা করবে একদল বাগি?'
আম্মার (রা.)-কে কি হত্যা করেছে মুয়াবিয়া (রা.)-এর সৈন্যদল? এরা কি নবিপরিবারকে গালি দিত? হাজ্জাজ কি অভিজাত কাউকে হত্যা করেছে?
সাহাবিদের গালমন্দ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ
সাহাবিদের অভিসম্পাতকারী শাস্তির উপযুক্ত। তাঁদের অভিশাপ বা বদদুআ দেওয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেই সাহাবি যে-ই হোক না কেন; চাই তিনি মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.)-এর সমমর্যাদার হোক কিংবা হোক তাঁদের চেয়েও অধিক মর্যাদার। যেমন: আবু মুসা আশআরি ও আবু হুরায়রা (রা.)-এর সমপর্যায়ের হোক অথবা তাঁদের চেয়েও অধিক মর্যাদার। যেমন: তালহা, জুবায়ের, উসমান, আলি, আবু বকর, উমর, আয়িশা (রা.) প্রমুখ সাহাবিদের সমপর্যায়ের।
মোটকথা যাকেই গালি দিক, গালিদাতা কঠিন শাস্তি পাবে-এটা ইমামদের সর্বসম্মত অভিমত। তবে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে তার শাস্তির ধরন নিয়ে।
তাকে কি হত্যা করা হবে, নাকি হত্যার চেয়ে লঘুদণ্ড দেওয়া হবে? এ ব্যাপারে আমি অন্যত্র সবিস্তার আলোচনা করেছি।
সাহাবিদের গালি দেওয়া হারাম। দলিল হলো আবু সাইদ খুদরি (রা.)- এর হাদিস। রাসূল বলেন-
'তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিয়ো না। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পরিমাণ স্বর্ণ দান করে, তবুও সে তাঁদের এক মুদ পরিমাণ বা তার অর্ধেক (সাদাকার) পুণ্য অর্জন করতে পারবে না।'৮৬
আর অভিশাপ গালির চেয়ে নিকৃষ্টতর। সহিহ হাদিসে এসেছে-
'মুমিনকে অভিশাপ দেওয়া তাঁকে হত্যার সমতুল্য।'৮৭
রাসূল কোনো মুমিনকে অভিশাপ দেওয়াকে হত্যার সমতুল্য গণ্য করেছেন।
মুমিনদের সর্বোত্তম দল সাহাবিদের দল
রাসূল বলেন-
'সর্বোত্তম সহচর হলো-যাদের মাঝে আমি প্রেরিত হয়েছি। এদের পর যারা আসবে, তাঁদের মর্যাদা। এদের পর তাঁরা শ্রেষ্ঠ, যারা এদের পরবর্তী সময়ে আসবে।'৮৮
সাহাবিদের ভেতর মুমিন অবস্থায় যে যতটুকু রাসূলকে দেখেছে, সে ততটুকুই রাসূলের সাহচর্য পেয়েছে। যেমনটা সহিহ হাদিসে এসেছে-
'একটি দল যুদ্ধ করতে থাকবে। তাদের জিজ্ঞেস করা হবে- “তোমাদের ভেতর এমন কেউ কি আছে, যে রাসূলের সান্নিধ্য পেয়েছে? তাঁরা বলবে-“হ্যাঁ।” তাঁরা তখন বিজয়ী হবে। তারপর আরেকটি দল যুদ্ধ করবে। তাঁদের বলা হবে- “তোমাদের কেউ কি রাসূল -কে দেখেছ?” তাঁরা বলবে- “হ্যাঁ।” তাঁরা তখন বিজয়ী হবে। তারপর তৃতীয় দলটির কথা উল্লেখ করা হলো। '৮৯
এই হাদিসে আমরা দেখতে পাচ্ছি-যে রাসূলের সাহচর্য পেয়েছে আর যে রাসূলকে দেখেছে, তাঁকে একই দলভুক্ত করা হচ্ছে।
রাসূলের সোহবত বা সাহচর্য শব্দ নিয়ে কিছু কথা
রাসূলের সাহচর্যের কিছু স্তরভেদ রয়েছে। যে সাহাবি তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা কৃতিত্বের জন্য অনন্য, তাঁকে সোহবত বা সাহচর্যের সেই বিশেষণেই অভিহিত করা হয়। যেমন: আবু সাইদ (রা.)-এর পূর্বোল্লিখিত হাদিসে আছে, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) যখন আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর সাথে বিতণ্ডা করছিলেন, তখন রাসূল খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-কে বলেন-
'হে খালিদ! তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিয়ো না। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পরিমাণ স্বর্ণ দান করে, তবুও সে তাঁদের এক মুদ পরিমাণ বা তার অর্ধেক পুণ্যও অর্জন করতে পারবে না।'
কারণ, আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ও তাঁর সমপর্যায়ের সাহাবিদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাঁরা ইসলামের প্রথম দিকের অগ্রবর্তী দল-যারা ইসলামের বিজয় তথা হুদাইবিয়ার বিজয়ের পূর্বে ধন-সম্পদ উৎসর্গ করেছে। আর খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর সমপর্যায়ের সাহাবিরা হুদাইবিয়ার বিজয়ের পরে জান ও মাল উৎসর্গ করতে সচেষ্ট হয়েছেন এবং যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ বলেন-
لَا يَسْتَوِي مِنْكُمْ مَنْ أَنْفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُولَئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِنَ الَّذِينَ أَنْفَقُوا مِنْ بَعْدُ وَقَاتَلُوا وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ -
'তোমাদের মধ্যকার ওইসব লোক (মর্যাদার দিক থেকে) ভিন্ন, যারা (হুদাইবিয়ার) বিজয়ের পূর্বে সম্পদ উৎসর্গ করেছে এবং যুদ্ধ করেছে। এরা তাঁদের চেয়ে উত্তম, যারা তাঁদের পরে সম্পদ উৎসর্গ করেছে এবং যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ প্রত্যেকের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন।' সূরা হাদিদ: ১০
আর এখানে বিজয় দ্বারা হুদাইবিয়ার বিজয় উদ্দেশ্য। যখন রাসূল গাছের নিচে বাইয়াত নিয়েছেন, তখন চৌদ্দশোর অধিক সাহাবি বাইয়াতবদ্ধ হন। এরা পরবর্তী সময়ে খায়বার জয় করেন। এদের সম্পর্কে নবিজি বলেন-
'যে গাছের নিচে বাইয়াতবদ্ধ হয়েছে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।'৯০
উল্লেখ্য, সূরা ফাতহে যে বাইয়াতের কথা বলা হয়েছে, তা মক্কা বিজয়ের পূর্বে সংঘটিত হয়েছে; বরঞ্চ তা রাসূল -এর উমরাহেরও আগে হয়েছে। রাসূল তাঁর সাহাবিদের নিকট থেকে বাইয়াত নিয়েছিলেন ষষ্ঠ হিজরিতে একটি গাছের নিচে। সে বছরই মুশরিকদের সাথে সুপ্রসিদ্ধ হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়। এই সন্ধির মাধ্যমে মুসলমানদের বিশাল বিজয় সাধিত হয়। যে বিজয় সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই অবগত ছিলেন; যদিও অনেক মুসলিম এই সন্ধিকে পছন্দ করেননি। এমনকী এটা তাঁদের জন্য কী শুভ পরিণাম বয়ে আনতে যাচ্ছে, তা আঁচও করতে পারেননি। তাই সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.) বলে বসেন-
'হে লোক সকল! তোমাদের বুদ্ধিকে অভিযুক্ত মনে করো। আল্লাহর কসম! আমি আবু জানদালের সে দিনটি দেখেছি। আমার যদি রাসূল -এর আদেশ প্রত্যাখ্যান করার সাধ্য থাকত, তাহলে অবশ্যই তা করতাম।'৯১
এর পরের বছর রাসূল ও তাঁর সাহাবিগণ উমরাহ করার জন্য মক্কায় প্রবেশ করেন। মক্কার অধিবাসীরা তখন মুশরিকদের পক্ষে ছিল। তারপর অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয় হয়। আল্লাহ সূরা ফাতহের আয়াত নাজিল করেন-
لَقَدْ صَدَقَ اللهُ رَسُولَهُ الرُّؤْيَا بِالْحَقِّ لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِنْ شَاءَ اللَّهُ أَمِنِيْنَ مُحَلِّقِينَ رُءُوسَكُمْ وَمُقَصِّرِيْنَ لَا تَخَافُوْنَ فَعَلِمَ مَا لَمْ تَعْلَمُوا فَجَعَلَ مِنْ دُوْنِ ذَلِكَ فَتْحًا قَرِيبًا -
'নিশ্চয়ই আল্লাহ চাহে তো তোমরা মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদ হয়ে, নিজদের মাথা মুণ্ডন করে, কেশ কর্তিত অবস্থায়, নির্ভয়ে। যেহেতু আল্লাহ তা জানেন, যা তোমরা জানতে পারোনি। এ ছাড়াও তোমাদের জন্য রেখেছেন আসন্ন বিজয়।' সূরা ফাতহ: ২৭
আল্লাহ সূরা ফাতহে মুসলিমদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁরা নিরাপদে মক্কায় প্রবেশ করবেন। আর সে প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন দুই বছর পরেই। এ সম্পর্কে আয়াত নাজিল করেন-
الشَّهْرُ الْحَرَامُ بِالشَّهْرِ الْحَرَامِ وَالْحُرُمَاتُ قِصَاصُ
'সম্মানিত মাস সম্মানিত মাসের বিনিময়ে এবং সমস্ত নিষিদ্ধ বিষয় কিসাসভুক্ত।' সূরা বাকারা: ১৯৪
এ সবই মক্কা বিজয়ের পূর্বে। তাই যারা ধারণা করে থাকে যে সূরা ফাতহ মক্কা বিজয়ের পর নাজিল হয়েছে, তারা নিতান্তই ভুল ধারণায় ডুবে আছে। এই দীর্ঘ আলোচনার উদ্দেশ্য হলো-যেসব সাহাবি হুদাইবিয়ার বিজয়ের পূর্বে রাসূলের সাহচর্য পেয়েছেন, তাঁরা বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তাই তাঁদের পরে যারা সাহচর্য পেয়েছেন, তাঁদের চেয়ে তাঁরা বেশি মর্যাদার দাবিদার। এ কারণেই রাসূল খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-কে বলেছেন, 'তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিয়ো না।' খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) ও তাঁর সমপর্যায়ের সাহাবিরা আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর পরে রাসূলের সান্নিধ্যে এসেছেন।
মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.) নিফাকমুক্ত
মুয়াবিয়া (রা.) ও আমর ইবনুল আস (রা.)-এর সমমতের সাহাবিদের সম্পর্কে কোনো সালাফই নিফাক বা মুনাফিক হওয়ার অভিযোগ আরোপ করেননি। সহিহ হাদিসে এসেছে-
'আমর ইবনুল আস (রা.) যখন রাসূলের হাতে বাইয়াতবদ্ধ হন, তখন শর্তজুড়ে দেন, "আমার পূর্বের সমস্ত পাপ মাফ হবে তো?" রাসূল বলেন-"হে আমর! তুমি কি জানো না, ইসলাম ব্যক্তির পূর্বের সমস্ত কিছু মিটিয়ে দেয়?"'৯২
আর এটা সকলেই জানে-যে ইসলাম সবকিছু মিটিয়ে দেয় বা মুছে দেয়, তা মুমিনের ইসলাম। মুনাফিকের ইসলাম গ্রহণ কিছুই মেটাতে পারে না। তা ছাড়া আমর ইবনুল আস (রা.) ও তাঁর সমতুল্য অনেক সাহাবিই হুদাইবিয়ার পরে নিজ দেশ থেকে হিজরত করে রাসূলের কাছে চলে এসেছিলেন সাগ্রহে ও স্বেচ্ছায়; কোনো প্রকার জবরদস্তির শিকার না হয়ে। আর মুহাজিরদের ভেতর কেউ-ই মুনাফিক ছিল না।
কতিপয় মুনাফিক আনসারের মুনাফিকির কারণ
কতিপয় আনসারের ভেতর নিফাক ছিল। এর কারণ হলো-সকল আনসার মদিনাবাসী হওয়ার কারণে মদিনার অভিজাত ও মান্যবর ব্যক্তিগণ যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন অন্যরাও কপটতা ও মুনাফিকির আশ্রয় নিয়ে নিজেদের মুসলিম হিসেবে উপস্থাপন করার প্রয়োজন বোধ করে। কারণ, ইসলাম তখন সম্মানের প্রতীক এবং তাদের গোত্রের সবাই তা গ্রহণ করে নিয়েছে। পক্ষান্তরে মক্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ ও অভিজাত লোকই ছিল কাফির। তাই ইসলামের প্রকাশ ওই ব্যক্তিই করেছে, যে ভেতরে ও বাইরে সমানভাবে মুসলিম ছিল। তখন যে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করত, তাকেই নির্যাতন করা হতো এবং বয়কট করা হতো। অন্যদিকে মদিনার মুনাফিকরা ইসলামের কথা বলত দুনিয়াবি সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য। আর মক্কায় ইসলামের কথা প্রকাশ করলে দুনিয়ার সুযোগ-সুবিধা বন্ধ হয়ে যেত। জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠত।
তারপর রাসূল যখন মদিনায় হিজরত করলেন, তখন তাঁর সাথে অধিকাংশ মুসলিমই হিজরত করলেন। কিছু লোককে হিজরত করতে বাধা দেওয়া হলো। এদের মধ্যে বনি মাখজুমের খালিদ বিন ওয়ালিদ-এর ভাই ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা (রা.)ও ছিলেন (এখানে পিতা ও পুত্রের নাম একই)। রাসূল তাঁদের জন্য কুনুত পড়তেন-
'হে আল্লাহ! তুমি ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদকে এবং সালামা ইবনে হিশামকে মুক্ত করো। মুদার গোত্রের ওপর তোমার পাকড়াও মজবুত করো...'৯৪
তাই মুহাজিরদের ভেতর সবাই নিফাকের অভিযোগমুক্ত। তাঁদের কারও সম্পর্কে কেউ নিফাকের অভিযোগ করেননি; বরং প্রত্যেকেই মুমিন হিসেবে সনদপ্রাপ্ত।
ওহির লিপিকার মুয়াবিয়া (রা.) সম্পর্কে রাসূলের দুআ
স্বাধীন লোকদের মধ্যে মুয়াবিয়া (রা.) সহ আরও কিছু সাহাবি মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেছেন। যেমন: ইকরামা ইবনে আবু জাহেল, হারিস ইবনে হিশাম, সুহাইল ইবনে আমর, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, আবু সুফিয়ান (রা.) প্রমুখ সাহাবি। তাঁদের ইসলাম সকল মুসলিমদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে কলুষমুক্ত। মুয়াবিয়া (রা.)-কে দিয়ে রাসূল ওহি অনুলিখন করিয়েছেন এবং তাঁর জন্য দুআ করেছেন-
'হে আল্লাহ! তুমি তাঁকে কুরআনের জ্ঞান ও হিসাববিদ্যার জ্ঞান দান করো এবং তাঁকে আজাব থেকে নাজাত দান করো।'৯৫
তাঁর ভাই ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) ছিলেন তাঁর চেয়েও মহত্তম। আবু বকর (রা.) যেসব আমিরকে শাম বিজয়ের জন্য পাঠিয়েছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)। একবার আবু বকর (রা.) পায়ে হেঁটে এবং ইয়াজিদ ইবনে সুফিয়ান আরোহী হয়ে যাচ্ছিলেন। ইয়াজিদ (রা.) আবু বকর (রা.)-কে বলেছিলেন-
'হে আল্লাহর রাসূলের খলিফা! হয়তো আপনি সওয়ারি হন, নয়তো আমি আপনার সাথে হাঁটি।' আবু বকর (রা.) বলেছিলেন-
'আমি সওয়ারি হব না, আর তুমিও নামবে না। কারণ, আমি আল্লাহর রাস্তায় আমার পদক্ষেপগুলো গুনছি। '৯৬
অপর আমির ছিলেন আমর ইবনুল আস (রা.)। তৃতীয়জন ছিলেন শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ (রা.)। চতুর্থজন ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)। তিনি ছিলেন সাধারণ আমির। পরবর্তী সময়ে উমর (রা.) তাঁকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন। তাঁর স্থানে নিযুক্ত করেছিলেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.)-কে, যার সম্পর্কে খোদ রাসূল বলেন-
'সে হলো এই উম্মতের আস্থার আধার। '৯৭
শাম বিজয় হয়েছিল তাঁর হাতেই। আর ইরাক বিজয় হয়েছে আমর ইবনুল আস (রা.)-এর হাতে।
উমর (রা.) কর্তৃক মুয়াবিয়া (রা.)-কে গভর্নর নিয়োগ
উমর (রা.)-এর শাসনামলে যখন ইয়াজিদ ইবনে সুফিয়ান (রা.) ইন্তেকাল করেন, তখন তাঁর ভাই মুয়াবিয়া (রা.)-কে গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। আর এটা সর্বজনবিদিত যে, উমর (রা.) সর্বাপেক্ষা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং মানুষ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি ছিলেন সত্য সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশি নিবেদিতপ্রাণ। তাই তো আলি (রা.) বলেন-'আমরা পরস্পরে আলোচনা করতাম, “প্রশান্তি” উমর (রা.)-এর ভাষায় কথা বলে।'
রাসূল বলেন-
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সত্যকে উমরের মুখে ও অন্তরে স্থাপিত করেছেন। '৯৮
রাসূল আরও বলেন-
'আমি যদি তোমাদের মাঝে প্রেরিত না হতাম, তাহলে উমর প্রেরিত হতো।'৯৯
ইবনে উমর (রা.) বলেন-
'আমি উমর (রা.)-কে কোনো বিষয়ে সন্দেহ ও দ্বিধান্বিত হয়ে কথা বলতে দেখিনি। যা বলতেন, দৃঢ়তার সাথে বলতেন।'
রাসূল আরও বলেছেন-
'তুমি যে রাস্তায় চলেছ, সে রাস্তায় শয়তানকে চলতে দেখিনি।'১০০
আবু বকর ও উমর (রা.) নিজ আত্মীয় ও মুনাফিকদের কখনোই নিয়োগ দেননি
আবু বকর ও উমর (রা.) মুসলিমদের প্রশাসক হিসেবে কখনোই নিজেদের আত্মীয় ও মুনাফিকদের নিয়োগ করেননি। আল্লাহর জন্য তাঁরা কখনোই কোনো নিন্দার তোয়াক্কা করেননি; বরং তাঁরা যখন ধর্মান্তরীদের (মুরতাদ) সাথে যুদ্ধ করছিলেন এবং তাদের ইসলামে ফিরিয়ে এনেছিলেন, তখন তাদের পশুর ওপর সওয়ার হয়ে অস্ত্র বহন করতে নিষেধ করেছিলেন, যেন তাদের তওবা সঠিকভাবে হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। উমর (রা.) সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-কে ইরাকের প্রশাসক থাকাকালে বলেছিলেন, 'ধর্মান্তরীদের কাউকে কোনো প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেবে না। তাদের সাথে যুদ্ধসংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ করবে না।'
সুতরাং এই আলোচনা থেকে এটা প্রমাণিত যে, উমর (রা.) ও আবু বকর (রা.) যখন কারও থেকে কোনো রকম নিফাকির আশঙ্কা বোধ করেছেন, তাকে আর প্রশাসনিক পদে নিযুক্ত করেননি।
আবু সুফিয়ান ও আমর ইবনুল আস (রা.)-কে আমির নিযুক্তি
আমর ইবনুল আস (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.) প্রমুখ সাহাবিদের থেকে যদি নিফাকির বা মুনাফিকির আশঙ্কা থাকত, তাহলে তাঁদের কখনোই মুসলিমদের শাসক বানানো হতো না। রাসূল আমর ইবনুল আস (রা.)-কে গাজওয়ায়ে জাতুস-সালাসিলে আমির নিযুক্ত করেছিলেন। আর নবি কখনোই একজন মুনাফিককে আমির বানাতে পারেন না। রাসূল মুয়াবিয়া (রা.)-এর পিতা আবু সুফিয়ান (রা.)-কেও নাজরানের শাসক বানিয়েছিলেন। রাসূলের মৃত্যু পর্যন্ত আবু সুফিয়ান (রা.) নাজরানে রাসূলের প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আর সকল মুসলিমই একমত যে, মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইসলাম ছিল তাঁর বাবার ইসলামের অপেক্ষায় শ্রেষ্ঠতর।
তাই তাঁরা যদি মুনাফিক হতেন, তাহলে রাসূল কী করে তাঁদের ওপর মুসলমানদের ইলম ও আমলের দায়িত্বভার আরোপ করতেন কিংবা তাঁদের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত করে নিরাপদ থাকতেন?
হাদিস বর্ণনায় মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.)-এর গ্রহণযোগ্যতা
এটা সকলেই জানে যে, মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.) প্রমুখ সাহাবিদের মাঝে ফিতনার দরুন অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল। তদুপরি তাঁদের পক্ষের, বিপক্ষের কিংবা নিরেপক্ষ কেউ-ই তাঁদের বিরুদ্ধে রাসূলের নামে মিথ্যাচারের অভিযোগ দেননি; বরং সাহাবি ও তাবেয়িদের মধ্য হতে সকল আলিম এক্ষেত্রে একমত যে, তাঁরা সকলেই রাসূলের কথা সত্য সত্যই মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। আস্থা ও বিশ্বস্ততার সাথে রাসূলের বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে রাসূলের হাদিসের ব্যাপারে মুনাফিকের ওপর আস্থা রাখা যায় না; বরং সে রাসূলের নামে মিথ্যাচার করে বেড়ায় এবং রাসূলকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে।
মুয়াবিয়া (রা.) ও অন্যান্য সাহাবিদের অভিশাপকারীর পরিণাম
সাহাবিগণ যেহেতু মুমিন ছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর ভালোবাসায় মত্ত ছিলেন, তাই যে ব্যক্তি তাঁদের অভিশাপ দেবে, সে আল্লাহ ও রাসূলের অবাধ্যাচরণ করবে। বুখারিতে এসেছে—
'এক ব্যক্তির ডাকনাম ছিল গাধা। সে মদ পান করত। ফলে তাকে বারবার রাসূলের কাছে হাজির করা হতো দোররা মারার জন্য। একবার তাকে নিয়ে আসা হলে এক লোক বলল- "আল্লাহ তার ওপর অভিশাপ দিক! আর কত বার একে শাস্তি দিতে হবে?" রাসূল বললেন-"তোমরা তাকে অভিশাপ দিয়ো না। কেননা, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে।””১০১
প্রত্যেক মুমিনই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -কে ভালোবাসে। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে না, সে মুমিন নয়। ঈমান ও ঈমানের গভীরতা সাপেক্ষে মুমিনদের বহু স্তরভেদ থাকা সত্ত্বেও রাসূল মদ পানকারীকে লানত করতে নিষেধ করেছেন। যদিও তিনি মদ তৈরিকারী, মদের ফরমায়েশকারী, মদ পানকারী, মদ বহনকারী, যার জন্য মদ বহন করা হয়, মদ পরিবেশনকারী, মদ বিক্রয়কারী, এর মূল্য ভোগকারী, মদ ক্রেতা এবং যার জন্য মদ ক্রয় করা হয়১০২-এদের সবাইকে অভিশপ্ত ঘোষণা করেছেন, তবুও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লানত করতে নিষেধ করেছেন।
কেননা, অভিশাপ একপ্রকার সতর্ককরণ কিংবা ভীতিপ্রদর্শন-যা প্রায়শই প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এই নির্দিষ্ট ব্যক্তিটি খাঁটি তওবার মাধ্যমে এই সতর্কীকরণ কিংবা শাস্তির প্রকোপ থেকে মুক্তি পেতে পারে। আবার গুনাহ মোচনকারী নেক কাজের মাধ্যমে, বিপদাপদের মাধ্যমে কিংবা মকবুল শাফায়াত-যা শাস্তি থেকে বান্দাকে মুক্তি দিতে পারে ইত্যাদির মাধ্যমেও সে মুক্তি পেতে পারে।
নেক কাজের মাধ্যমে সাহাবিদের বড়ো ভুলগুলোও আল্লাহ ক্ষমা করেন
হাতিব ইবনে আবি বালতায়া (রা.) তাঁর দাসদের সাথে রূঢ় আচরণ করত। সহিহ হাদিসে এসেছে-
'তাঁর এক দাস তাঁর সম্পর্কে রাসূল -এর কাছে বললেন- “হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম! নিশ্চয়ই হাতিব ইবনে আবি বালতায়া জাহান্নামে যাবে।" রাসূল বললেন-"তুমি মিথ্যা বলছ। কারণ, সে বদর ও হুদাইবিয়ায় অংশগ্রহণ করেছে। "'১০০
সহিহ হাদিসে এসেছে-
'রাসূল আলি ও জুবায়ের ইবনুল আওয়ام (রা.)-কে বললেন-'তোমরা দুজন রওজাতু খাখে যাও, সেখানে একজন দাসীকে পাবে। তার কাছে একটি চিঠি আছে।” আলি (রা.) বলেন-"আমরা ঘোড়া ছুটিয়ে রওয়ানা হলাম। একসময় সেই দাসীর দেখা পেয়ে বললাম- “চিঠি কোথায়?” সে বলল- "আমার কাছে কোনো চিঠি নেই।" আমরা তাকে বললাম- “তুমি চিঠি বের করবে, নাকি আমরা তোমার কাপড় খুলে বের করব?"
আলি (রা.) বলেন-“তারপর সে তার চুলের খোঁপা থেকে চিঠিটি বের করে দিলো। আমরা সেটা নিয়ে রাসূল -এর কাছে এলাম। চিঠিটা ছিল হাতিব ইবনে বালতায়ার। সে তাতে মক্কার মুশরিকদের কাছে রাসূলের বিভিন্ন গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য পাচার করছিল।" রাসূল তাঁকে বললেন- “এটা কী হাতিব?" তিনি বললেন-"আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুরতাদ হয়ে এটা করিনি। ইসলাম ছেড়ে কুফরির প্রতি সন্তুষ্ট হয়েও করিনি। আমি কুরাইশ বংশোদ্ভূত নই। তাদের সাথে আমার সম্পর্ক রয়েছে বটে। আর আপনার সাথে যেসব মুহাজির সাহাবি রয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকেই কুরাইশের সাথে আত্মীয়তাসূত্রে আবদ্ধ। তাঁদের পরিবার মক্কাতে নিরাপদে থাকবে। তাই আমার যখন এই সুবিধাটি নেই, আমি চাইলাম তাদের একটু সহযোগিতা করতে, যেন তারা আমার পরিবারকে হেফাজত করে।"'১০৪
অন্য বর্ণনায় এসেছে, হাতিব ইবনে আবি বালতায়া (রা.) তারপর বলেছিলেন-
'আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, এটা আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর রাসূল ও মুমিনদের সাহায্য করবেন।'
এ কথা শুনে উমর (রা.) বলেন- 'অনুমতি দিন! এই মুনাফিকের গরদান উড়িয়ে দিই।'
রাসূল ﷺ বলেন-'সে বদর যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তুমি কি জানো না, বদরে অংশগ্রহণকারীদের বিষয়ে আল্লাহ অবগত রয়েছেন? তিনি বলেছেন-“জেনো রাখো! তোমরা যা-ই করো, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন।””১০৫
আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি, বদরে অংশ নেওয়ার কারণে আল্লাহ তায়ালা এই মহাগর্হিত কাজটিও ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং এই হাদিসটি দ্বারা বোঝা গেল, বড়ো কোনো ভালো কাজের দ্বারা আল্লাহ বড়ো খারাপ কাজকে মিটিয়ে দেন, মাফ করে দেন। আর মুমিনগণ প্রতিশ্রুতি ও সতর্কবাণীতে বিশ্বাস করে। কেননা, রাসূল ﷺ বলেছেন- 'যার শেষ কথা হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতে যাবে। '১০৬
যদিও পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালা এটাও বলেছেন-
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا -
'নিশ্চয়ই যারা ইয়াতিমদের সম্পদ জুলুম করে কুক্ষিগত করে নেয়, তারা তো কেবল আগুনই উদরস্থ করে। অচিরেই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।' সূরা নিসা: ১০
অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে জাহান্নামি কিংবা জান্নাতি না বলা
সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট কাউকে জাহান্নামি অথবা জান্নাতি বলা যাবে না।
'যে অণু পরিমাণ কল্যাণ করবে, তা সে দেখতে পাবে এবং যে অণু পরিমাণ অকল্যাণ করবে, তাও সে দেখতে পাবে।' উল্লিখিত আয়াতের ব্যাপকতার ওপর ভর করে বলা যাবে না যে, গুনাহকারী শাস্তি পাবেই। কোনো বান্দার আমলনামায় যখন গুনাহ ও নেকি একসঙ্গে জমা হয়, তখন সে গুনাহর কারণে শাস্তির উপযুক্ত বিবেচিত হলেও পুণ্যের বিনিময় পাবেই। মুমিনের সওয়াব তার গুনাহর কারণে নষ্ট হবে না। এটা খারেজি ও মুতাজিলাদের বিশ্বাস যে, কবিরা গুনাহর কারণে বান্দার সকল সওয়াব নষ্ট হয়ে যাবে এবং কবিরা গুনাহকারীগণ অনন্তকাল জাহান্নামে থাকবে। তারা কারও শাফায়াতের বিনিময়ে জাহান্নام থেকে বের হতে পারবে না। কবিরা গুনাহকারীর ঈমান থাকবে না। এই সব ভ্রান্ত মতামত। কুরআন ও হাদিসে মুতাওয়াতিরের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। ইজমায়ে সাহাবি তথা সাহাবিদের সর্বসম্মতিক্রমে এই মতামত ভ্রান্ত।
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের দৃষ্টিতে ব্যক্তির নিষ্পাপতা
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের সকল ইমাম একমত যে, কোনো সাহাবি কিংবা আল্লাহর নৈকট্যধন্য ও ইসলামে অগ্রবর্তী কোনো ব্যক্তি-কেউ-ই নিষ্পাপ নয়; বরং তাঁরা মনে করেন, এসব লোকেরাও পাপ করে ফেলতে পারেন। আল্লাহ তাঁদের তওবার বিনিময়ে ক্ষমা করে দেবেন। তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। গুনাহ মোচনকারী নেক কাজের ওসিলায় আল্লাহর তাঁদের গুনাহ মাফ করবেন।
আল্লাহ বলেন-
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ أُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ لَهُمْ مَا يَشَاءُونَ عِنْدَ رَبِّهِمْ ذُلِكَ جَزَاءُ الْمُحْسِنِينَ لِيُكَفِّرَ اللَّهُ عَنْهُمُ أَسْوَا الَّذِي عَمِلُوا وَيَجْزِيَهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ الَّذِي كَانُوا يَعْمَلُونَ
'যে সত্য নিয়ে এসেছে এবং যে তা সত্যায়ন করেছে, তারাই মুত্তাকি। তারা যা চাইবে, আল্লাহর তরফ থেকে তা-ই তাদের জন্য রয়েছে। এটা সৎকর্মপরায়ণদের প্রতিদান-যাতে করে তাদের কৃত মন্দ কাজ আল্লাহ মাফ করে দেন এবং তারা যে উত্তম কাজ করত, তার প্রতিদান দেন।' সূরা জুমার: ৩৩-৩৫
আল্লাহ অন্যত্র বলেন-
حَتَّى إِذَا بَلَغَ أَشُدَّه وَبَلَغَ أَرْبَعِينَ سَنَةً قَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحُ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
'যখন পরিণত বয়সে উপনীত হয় এবং চল্লিশ বছরে উপনীত হয়, তখন সে বলে-“হে আমার রব! আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন, যাতে আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি। আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি আপনি যে অনুগ্রহ করেছেন, তার জন্য এবং যাতে আমি এমন সৎ কাজ করতে পারি-যা আপনি পছন্দ করেন। আর আমার জন্য আমার সন্তান-সন্ততিদের সংশোধন করে দিন। নিশ্চয় আমি আপনারই অভিমুখী হলাম এবং নিশ্চয়ই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।"' সূরা আহকাফ: ১৫
أُولَئِكَ الَّذِينَ نَتَقَبَّلَ عَنْهُمْ أَحْسَنَ مَا عَمِلُوا وَنَتَجَاوَزُ عَنْ سَيِّئَاتِهِمْ فِي أَصْحَابِ الْجَنَّةِ
'ওরাই তারা, আমি যাদের সৎ আমলগুলো কবুল করি এবং মন্দ কাজগুলো ক্ষমা করি। তারা জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।' সূরা আহকাফ: ১৬
নবিগণ পাপ থেকে মুক্ত
নবিদের সম্পর্কে আলিমগণ বলেন-'তাঁরা পাপ থেকে মুক্ত।' আর নিশ্চিত পাপ থেকে সিদ্দিকিন, শুহাদা, সালেহিন মুক্ত নন। তবে ইজতিহাদি বিষয়গুলোতে তাঁরা কখনো সঠিক সিদ্ধান্ত নেন, কখনো-বা ভুল সিদ্ধান্ত নেন।
ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে তার জন্য দুটি প্রতিদান, আর ভুল হলে ইজতিহাদ করার জন্য একটি প্রতিদান পাবেন। তাঁদের ভুলটি ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
পথভ্রষ্ট লোকেরা ভুল করা মানেই পাপ মনে করে। কখনো এই বলে বাড়াবাড়ি করে বসে যে, সাহাবি ও ইমামগণ পাপমুক্ত বা মাসুম। আবার কখনো তাঁদের ওপর জুলুম করে বলে, তাঁরা ভুল করে বাগিতে পরিণত হয়েছেন। তবে জ্ঞানীগণ তাঁদের নিষ্পাপও মনে করেন না, আবার পাপিষ্ঠও মনে করেন না।
বিদআতি ও পথভ্রষ্টরা কেন সালাফদের ফাসিক মনে করে
উল্লিখিত বিষয়টিকে কেন্দ্র করে অনেক বিদআতি ও পথভ্রষ্ট ফেরকা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ সালাফদের গালি দেয় এবং লানত করে। কারণ, তারা বিশ্বাস করে, সালাফগণ গুনাহ করেছেন। আর যে গুনাহ করে, সে লানতের যোগ্য। তাদের কেউ কেউ তো সালাফদের ফাসিক কিংবা কাফিরও মনে করে; যেমনটা খারেজিরা করে। তারা আলি (রা.) ও উসমান (রা.)-কে কাফির মনে করে এবং এই দুজন যাদের নিযুক্ত করেছেন, তাঁদেরও কাফির মনে করে। তাঁদের সবাইকে খারেজিরা লানত করে, গালি দেয় এবং তাঁদের হত্যা করা বৈধ মনে করে। নাউজুবিল্লাহ!
খারেজিদের সম্পর্কে কতিপয় হাদিস
এরাই সেই লোক, যাদের সম্পর্কে রাসূল বলেন-
'তোমাদের মধ্যে এমন লোক হবে, যারা তোমাদের সাথে নামাজ-রোজা আদায় করা এবং কুরআন তিলাওয়াত করাকে অপমানজনক মনে করবে। কুরআন তাদের গলা দিয়ে নামবে না। তির যেভাবে ধনুক থেকে বের হয়, ইসলাম থেকে তারা সেভাবে বের হয়ে যাবে।'
রাসূল আরও বলেন-
'মুসলমানদের একটি দল বের হয়ে মুসলমানদের একটি দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। তাদের হক বা সত্যের খাতিরে হত্যা করবে দুই দল থেকে উত্তম একটি দল।'
এরাই সেই খারেজি, যারা আলি (রা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং তাঁকে ও তাঁর নিযুক্ত সকল প্রশাসককে কাফির মনে করত।
দুজন খলিফা যখন যুদ্ধ করে, তখন একটি অভিশপ্ত
প্রকৃত অর্থে এটা বানোয়াট, মিথ্যা কথা। এমন কোনো হাদিস ইলমে হাদিসের কোনো পণ্ডিত ব্যক্তিই বর্ণনা করেন না। ইসলামের নির্ভরযোগ্য কোনো গ্রন্থেও এটা বর্ণিত হয়নি।
মুয়াবিয়া (রা.) খিলাফতের দাবিতে আলি (রা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি
মুয়াবিয়া (রা.) খিলাফতের দাবি করেননি এবং আলি (রা.)-এর সাথে যুদ্ধের সময় তিনি খিলাফতের জন্য জনগণের নিকট থেকে বাইয়াতও গ্রহণ করেননি। নিজেকে খলিফা মনে করে তিনি এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হননি। তিনি নিজেকে খিলাফতের হকদারও মনে করতেন না। মুয়াবিয়া (রা.)-কে কেউ এ কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি তা অকপটেই স্বীকার করতেন। এমনকী মুয়াবিয়া (রা.) ও তাঁর সাথিবর্গ কখনোই এমনটা ভাবেননি যে, তাঁরা আলি (রা.)-এর সাথে যুদ্ধ করবেন এবং জয় করবেন।
বরং আলি (রা.) ও তাঁর সাথিবর্গ মনে করতেন, আলি (রা.)-এর হাতে বাইয়াত নেওয়া এখন ওয়াজিব। কেননা, মুসলিমদের দুজন খলিফা থাকাটা কিছুতেই কাম্য নয়। মুয়াবিয়া (রা.)-এর সমর্থকগণ আলি (রা.)-এর আনুগত্য থেকে বের হয়ে একটি ওয়াজিব পালন থেকে নিজেদের বিরত রেখেছে। আর অপরপক্ষের লোকেরা ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার দরুন তাঁদের বিপক্ষে যুদ্ধ করে এই ওয়াজিব পালনের প্রতি আগ্রহী করে তোলাকে উপযুক্ত কৌশল বলে মনে করেছেন-যাতে করে 'ইতায়াত' ও 'জামায়াত' তথা আনুগত্য ও একতা ফিরে আসে।
মুয়াবিয়া (রা.)-এর সমর্থকগোষ্ঠীর বক্তব্য হলো-আলি (রা.)-এর আনুগত্য তাঁদের জন্য ওয়াজিব নয়। তাঁদের ওপর যখন হামলা করা হয়, তখন তাঁরা মজলুম ছিল। অর্থাৎ তাঁদের ওপর হামলাটি ছিল নিতান্তই জুলুম। কারণ, উসমান (রা.)-এর হত্যাটা সকল মুসলিমের মতেই একটা জুলুম ছিল। আর আলি (রা.)-এর সৈন্যদল যখন অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল, তখন তাঁদের লোকেরাই এই হত্যাটা করেছে। আমরা যখন আলি (রা.)- এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করলাম, তখন হামলাকারীরা আমাদের ওপর জুলুম ও অবিচার করেছে। আলি (রা.)-এর পক্ষে তাদের দমন করা সম্ভব হয়নি। যেমনিভাবে উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের দমন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই আমাদের উচিত এমন একজন খলিফার কাছে বাইয়াত নেওয়া, যে আমাদের ওপর ইনসাফ করার সক্ষমতা রাখে।
আলি (রা.) ও উসমান (রা.) সম্পর্কে কিছু মিথ্যা ধারণা
উভয়পক্ষের কিছু জাহেল উসমান ও আলি (রা.) সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা পোষণ করেছে। (আল্লাহ তাঁদের দুজনকে সেই মিথ্যা থেকে বাঁচান)। তারা বলে-'আলি (রা.) উসমান (রা.)-কে হত্যার আদেশ দিয়েছেন।' আলি (রা.) যদিও কোনো প্রকার কসম খাওয়া ব্যতীতই সত্যবাদী, তবুও তিনি কসম খেয়ে বলতেন, তিনি এই হত্যা করেননি এবং এই হত্যায় তাঁর কোনো মত ছিল না এবং এই হত্যায় তাঁর কোনো সহযোগিতাও ছিল না।
নিঃসন্দেহে এটা আলি (রা.)-এর বহুল প্রচলিত একটি উক্তি। এই কথার ওপর তাঁর অনুসারী ও শত্রুগণ দুই দলে ভাগ হয়ে যায়। তাঁর ভক্তরা এ থেকে প্রেরণা পায় উসমান (রা.)-কে কলুষিত করার। তাঁরা মনে করে, তিনি হত্যাযোগ্য। তাঁকে হত্যা করা উচিত। আলি (রা.) তাঁকে হত্যার আদেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে আলি (রা.)-এর শত্রুরা তাঁকে এই বলে দোষারোপ করে যে, তিনি নির্যাতিত খলিফা উসমান (রা.)-কে হত্যার আদেশ দিয়েছেন। উসমান (রা.) আত্মসংবরণ করেছেন। নিজেকে বাঁচাতে তিনি কোনো মুসলিমকে হত্যা করেননি। অতএব, আলি (রা.)-এর আনুগত্যের কোনো প্রশ্নই আসে না।
এ জাতীয় বহু বিষয় তাঁদেরকে উসমানিয়া ও আলাওইয়্যা সম্প্রদায়ে বিভক্ত হতে প্ররোচিত করেছে।
সর্বসম্মতভাবে মুয়াবিয়া (রা.) আলি (রা.)-এর সমকক্ষ নন
এ দলগুলোর সবাই একটি বিষয়ে একমত যে, মুয়াবিয়া (রা.) খিলাফতের ক্ষেত্রে আলি (রা.)-এর সমকক্ষ নন। তাহলে আলি (রা.)-এর খলিফা হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আরেকজন খলিফা নির্বাচন করা জায়েজ হয় কীভাবে? কেননা, আলি (রা.)-এর বিদ্যা-বুদ্ধি, সাবিকিয়্যাত (ইসলাম গ্রহণে অগ্রবর্তিতা) পরহেজগারিতা ও সাহসিকতাসহ তাঁর যাবতীয় শ্রেষ্ঠত্ব তাঁদের কাছে স্পষ্ট ছিল; যেমনিভাবে আবু বকর, উমর, উসমান (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব সর্বজনবিদিত ছিল।
তিনি ও সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) ছাড়া আহলে শূরার আর কেউ জীবিত ছিলেন না। সাদ (রা.) এসব বিষয় থেকে নিজেকে সব সময় দূরে রাখতেন। তাই অবধারিতভাবেই উসমান ও আলি (রা.)-এর ওপর এই গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়। উসমান (রা.)-এর ইন্তেকালের পর খিলাফতের একমাত্র যোগ্য উত্তরাধিকারী বা সহযোগী রয়ে গেলেন আলি (রা.)। তবে বিপত্তির উদয় হলো তখনই, যখন উসমান (রা.)-কে হত্যা করা হলো। তাঁর মৃত্যুতে জালিম ও শত্রুশিবিরের লোকেরা শক্তিশালী হয়ে উঠল। জ্ঞানী ও ঈমানদার লোকেরা দুর্বল হয়ে পড়ল। পরস্পরে বিভেদ-বিভাজন দেখা দিলো। যার ফলে দেখা গেল, লোকেরা যোগ্য লোকের বদলে অযোগ্য লোকের কথা শুনতে লাগল।
এজন্য আল্লাহ একতা ও সম্প্রীতির প্রতি খুব জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিভেদ-বিভাজন থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। তাই বলা হয়, বিভেদমূলক কাজে একমত হওয়ার চেয়ে দলবদ্ধভাবে অপছন্দনীয় কাজ করাও শ্রেয়।
আম্মার (রা.)-কে হত্যাসংক্রান্ত বুখারির হাদিসটি কি সহিহ
'নিশ্চয়ই আম্মারকে একদল বাগি হত্যা করবে'-হাদিসটি যদিও ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর সহিহ মুসলিমে এনেছেন, তবুও একদল এর ওপর আপত্তি উত্থাপন করেছেন। উক্ত হাদিসটি বুখারিতেও এসেছে। ১০৭
কেউ কেউ এই হাদিসটির ভিন্ন ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এখানে বাগি দ্বারা মূলত সেসব বাগি উদ্দেশ্য, যারা উসমান (রা.)-এর রক্তপিপাসু হয়ে উঠেছিল। যেমন: তারা উসমান (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলত-
'আমরা আফফানের বেটাকে আমাদের বর্শার অগ্রভাগে দেখতে চাই।'
যাহোক, এসব অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেননা, রাসূল যা বলেছেন, তা যথার্থই সত্য। আর 'আম্মারকে একদল (অবাধ্যাচারী বিদ্রোহী) বাগি দল হত্যা করবে'- কথাটা দ্বারা আমরা ইতঃপূর্বে যা প্রমাণ করেছি (তথা উভয়পক্ষের লোকেরাই মুমিন ছিলেন), তা মিথ্যা কিংবা অসত্য প্রমাণিত হয় না। কারণ, আল্লাহ নিজেই বলেছেন-
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
'যদি মুমিনদের দুটি দল মারামারি করে, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একদল অন্য দলের ওপর বাড়াবাড়ি (বাগাওয়াত) করে, তাহলে যে দল বাড়াবাড়ি (বাগাওয়াত) করবে, তোমরা তার বিরুদ্ধে লড়বে; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে (আল্লাহর নির্দেশ মেনে নেয়)। যদি ফিরে আসে, তাহলে তোমরা উভয়ের মধ্যে ন্যায়ের সাথে মীমাংসা করে দেবে এবং সুবিচার করবে। আল্লাহ تو সুবিচারকারীদেরই ভালোবাসেন।' সূরা হুজুরাত : ৯
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ -
'নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পরে ভাই। তাই তোমাদের ভাইদের মাঝে তোমরা সন্ধি করে দাও।' সূরা হুজুরাত : ১০
এখানে পরস্পরে হত্যা ও বাগাওয়াত বা বাড়াবাড়ির উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও তাদের সকলকে মুমিন ও ভাইরূপে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। আল্লাহ বাগি বা বাগাওয়াতকারী দলের সাথে যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও তাদের মুমিন হিসেবে গণ্য করেছেন। সর্বোপরি একজন সাধারণ মানুষের অবাধ্যতা, বাগাওয়াত, জুলুম ও শত্রুতা যখন তাকে ঈমানের গণ্ডি থেকে বের করে দেয় না এবং তার ওপর লানত বর্ষণ করাকে ওয়াজিব করে না, তখন কীভাবে একজন 'খাইরুল কুরুন' তথা 'সর্বোত্তম সময়ের মানুষকে ঈমানের গণ্ডি থেকে বের করে দেবে এবং তার ওপর লানত করাকে আবশ্যক করবে?
বাগির প্রকারভেদ
এখানে একটা বিষয় জানা দরকার যে জালিম, বাগি, অতিরঞ্জনকারী কিংবা পাপাচারী-এরা প্রত্যেকেই দুই ভাগে বিভক্ত।
এক. ব্যাখ্যা সাপেক্ষ এবং
দুই. ব্যাখ্যাহীন।
যাদের অসংগত আমলের ব্যাখ্যা রয়েছে, তারা হলেন মুজতাহিদ। ইলম ও দ্বীনের বিষয়ে আন্তরিক যে বিশেষজ্ঞগণ ইজতিহাদ করেছেন, তাদের একদল কিছু জিনিসকে হালাল মনে করেছেন, অপরদল সে জিনিসগুলোকে হারাম মনে করেছেন। যেমন: কতিপয় মুজতাহিদ মদের কিছু প্রকারকে হালাল বলেছেন। আবার কতিপয় মুজতাহিদ কিছু সুদি কারবারকে বৈধ জ্ঞান করেছেন। এ জাতীয় কাজ বড়ো বড়ো সালাফদের নিকট থেকেও প্রকাশিত হয়েছে। এরা হলেন ব্যাখ্যা সাপেক্ষে বাগি। তারা নিজেদের সিদ্ধান্তে ভুলের শিকার হয়েছেন। আর কুরআনে এসেছে-
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا -
'হে আল্লাহ! আমরা যদি ভুলে যাই অথবা ভুল করে বসি, তাহলে আমাদের পাকড়াও কোরো না।' সূরা বাকারা: ২৮৬
সহিহ হাদিসে এই দুআটির কবুল হওয়ার ব্যাপারে প্রমাণ পাওয়া যায়। ১০৮
এক্ষেত্রে সোলাইমান (আ.) ও দাউদ (আ.) সম্পর্কে বর্ণিত একটি শস্যক্ষেত্র নিয়ে বিচারের বিখ্যাত ঘটনাটি প্রণিধানযোগ্য। তাঁদের দুজনের প্রজ্ঞা ও জ্ঞান সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা যদিও প্রশংসা করেছেন, তবুও একজনকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞানে বিশেষত্ব দান করেছেন। আলিমদের বিষয়টিও অনুরূপ। কারণ, তাঁরা নবিদের উত্তরসূরি। তাই তাঁরা একজন একটি মাসয়ালায় যা বুঝেছেন, অপরজন তা বোঝেননি। এতে তাঁদের নিন্দা করা যাবে না এবং তাঁদের বিদ্যা-বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও একনিষ্ঠতায় এটা কোনো প্রভাব ফেলবে না।
তবে গুনাহ জেনেও কেউ যদি ভিন্ন হুকুম দেয়, তাহলে সে গুনাহের শিকার হবে এবং জালিম বলে বিবেচিত হবে। আর এর ওপর লাগাতার আমল করে ফাসিক বিবেচিত হবে। অধিকন্তু কেউ যদি কোনো আমলকে নিশ্চিত গুনাহ জেনেও তাকে হালাল মনে করে, তাহলে তা কুফরি কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে।
বাগির গুনাহ মাফ হয়
বাগি যদি মুজতাহিদ হয় এবং সে নিজেকে বাগি মনে না করে; বরং হকের অনুসারী মনে করে (aunque তার এই মনে করাটা ভুল হয়), তবে তাকে 'গুনাহকারী বাগি' বলে আখ্যায়িত করা হবে না। তাই তার ফাসিক হওয়াটা কখনো সম্ভব না।
'ব্যাখ্যা সাপেক্ষে বাগিদের সাথে যুদ্ধের কথা যারা বলেন, তাদের বক্তব্য হলো-'আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করার আদেশ দিই, যাতে তাদের বাগাওয়াত বা অবাধ্যতা সমাজে বিশৃঙ্খলা বা ব্যাপক ক্ষতির প্রাদুর্ভাব ঘটাতে না পারে। তাদের কৃত কাজকে অপরাধ মনে করে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না; বরং (তাদের কাজের অনিবার্য বিরূপ প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে কিংবা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায়) শত্রুপক্ষ যেন রাষ্ট্রের শান্তি ও সংহতি নষ্ট করার সুযোগ না পায়, সেজন্যই যুদ্ধ করা হচ্ছে।'
তাঁরা আরও বলেন-'এই প্রকার বাগিদের 'আদালত' বা সত্যনিষ্ঠতা অক্ষত থাকবে। তাদের চরিত্রে এই কাজের জন্য কোনো প্রকার অভিযোগ আরোপ করা হবে না। তারা ফাসিক নন। তারা 'গাইরে মুকাল্লাফদের' (যাদের ওপর শরিয়তের হুকুম আরোপ হয় না।) অনুরূপ। অর্থাৎ শিশু, উন্মাদ, বিস্মৃতিপরায়ণ, বেহুঁশ ও ঘুমন্ত ব্যক্তির মতো গাইরে মুকাল্লাফদের যেমন অরাজক কর্মকাণ্ড করতে বাধা দেওয়া হয়ে থাকে, তেমনি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বাগিদের অরাজক কাজেও বাধা দিতে হবে। এমনকী চতুষ্পদ প্রাণীকেও বাধা দিতে হবে। কুরআনের আয়াত অনুযায়ী-কেউ যদি ভুলবশত কাউকে হত্যা করে ফেলে, তাহলে তার ওপর দিয়াত ওয়াজিব হবে; যদিও হত্যাকারী গুনাহগার হবে না। আবার হদ্দ তথা দণ্ডপ্রাপ্য ব্যক্তি যদি তওবা করে, হাদিস অনুযায়ী তার তওবা আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে।
প্রসঙ্গত 'ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বাগি'-কে ইমাম মালেক, শাফেয়ি ও আহমদ (রহ.)-এর মতে দোররা মারা হবে।
আর বাগি যদি 'ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বাগি' না হয় তথা নিরেট বাগি হয়, তাহলে সে গুনাহগার বিবেচিত হবে। আর গুনাহ বিভিন্ন ওসিলার মাধ্যমে মাফ হয়ে যায়। ভালো কাজ ও বিপদাপদের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের গুনাহকে মাফ করে দেন।
আম্মার (রা.) সম্পর্কিত হাদিসে মুয়াবিয়া (রা.)-এর নাম নেই
আম্মার (রা.)-এর হত্যা সম্পর্কিত আলোচ্য হাদিসটিতে মুয়াবিয়া (রা.) ও তাঁর অনুসারীদের কোনো উল্লেখ নেই। এই হাদিসে সম্ভবত ওই গোষ্ঠীটির কথা বলা হয়েছে, যারা আম্মার (রা.)-কে হত্যার জন্য প্রলুব্ধ হয়েছে এবং তাঁকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়েছে। এরা হচ্ছে সেনাবাহিনীর ক্ষুদ্র একটি দল। যারা আম্মার (রা.)-এর হত্যাকে সমর্থন করে, তারাও ওই ক্ষুদ্র সেনাদলটির পরিণাম ভোগ করবে। আর এটা জানা কথা, পুরো বাহিনীতে এমন সদস্য অনেক ছিল, যারা এই হত্যাকে মোটেই সমর্থন করেনি। যেমন: আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) সহ কিছু সাহাবি; বরং বলা ভালো, সবাই আম্মার (রা.)-এর হত্যায় অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এমনকী মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.)ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
বর্ণিত আছে, আম্মার (রা.)-কে যারা হত্যা করেছেন, তাদের বদলে যারা তাঁকে যুদ্ধের ময়দানে হাজির করেছেন, তাদেরই মুয়াবিয়া (রা.) তাঁর হত্যার জন্য দায়ী করেছেন। মুয়াবিয়া (রা.)-এর বক্তব্যকে আলি (রা.) প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন- 'তাহলে তো হামজা (রা.)-এর হত্যাকারী আমরা সবাই! 'কারণ, তাঁকে তো মক্কার কাফিরদের বিরুদ্ধে সকল মুসলিমই হাজির করেছিলেন।'
এখানে আলি (রা.)-এর বক্তব্য নিঃসন্দেহে সঠিক। তবে কেউ যদি ওইসব বাহাসকারী আলিম-যাদের মাঝে যুদ্ধ ও রাজত্বের বিষয় নিয়ে কোনো বিরোধ নেই, তাদের বক্তব্যের ওপর নজর দেয়, তাহলে দেখা যাবে- মুয়াবিয়া (রা.)-এর চেয়ে ঢের দুর্বল মতামত ও ব্যাখ্যা তাদের রয়েছে। তা ছাড়া এমন ব্যাখ্যা (মুয়াবিয়া রা.-এর ব্যাখ্যাটি) যিনি করেছেন, তিনি নিজেকে আম্মার (রা.)-এর হত্যাকারী মনে করবেন না। তাই সে কিছুতেই নিজেকে বাগি হিসেবে বিশ্বাস করবে না। আর যে নিজের বাগি হওয়ার বিষয়টি অবিশ্বাস করে, সে কার্যত বাগি হলেও তাকে ব্যাখ্যাগত ভুলের শিকার বা ভুল ইজতিহাদ করেছেন বলে ধরা হবে।
জ্যেষ্ঠ সাহাবি ও ফুকাহাদের অভিমত
সাহাবি ও ফুকাহাদের কেউ-ই আম্মার (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কথা বলেন না। এ ব্যাপারে জ্যেষ্ঠ সাহাবিদের দুটো প্রসিদ্ধ মত পাওয়া যায়। একদল আম্মার ও তাঁর দলের সাথে যুদ্ধে শরিক হওয়ার কথা বলেন। আরেক দল এরূপ যুদ্ধের সর্বত বিপক্ষে। এই দুই দলেই বড়ো বড়ো অগ্রগণ্য সাহাবি রয়েছেন। তাই দেখা যাচ্ছে, প্রথম দলে রয়েছেন আম্মার, সাহল ইবনে হুনাইফ ও আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)। আর দ্বিতীয় দলে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা, উসামা ইবনে জায়েদ ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর মতো বড়ো বড়ো সাহাবিগণ। খুব সম্ভবত বড়ো বড়ো সাহাবিদের অধিকাংশই ছিলেন এই দলে; অর্থাৎ এই যুদ্ধের বিপক্ষে। উভয় দলে আলি (রা.)-এর পর সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ সাহাবি আর কেউ ছিলেন না। আর তিনি ছিলেন যুদ্ধের বিপক্ষে।
আম্মার (রা.)-এর হাদিস দিয়ে ভুল দলিল প্রদান
আম্মার (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসটি যুদ্ধের সপক্ষের লোকেরা নিজেদের পক্ষে দলিল দিয়ে থাকে। কারণ, যদি আম্মার (রা.)-কে একদল বাগি হত্যা করে, তাহলে আল্লাহর কথা- 'যারা বাগাওয়াত করে, তাদের হত্যা করো' (সূরা হুজুরাত: ৯)-এর ওপর আমল করা সহজ হয়ে যাচ্ছে। আর যারা যুদ্ধ থেকে বিরত ছিল, তাঁদের দলিল হলো রাসূলের সহিহ হাদিস- 'ফিতনার সময় যুদ্ধের চেয়ে উত্তম হলো যুদ্ধ না করে ফিতনা থেকে দূরে থাকা। '১০৯
আর তাঁরা মনে করতেন, এটা ফিতনার যুদ্ধ। কেননা, এ ব্যাপারে বহু সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসূল এই ফিতনার মুহূর্তে যুদ্ধ করার আদেশ দেননি এবং পছন্দও করেননি; বরং তিনি এই মুহূর্তে সন্ধি করাকেই পছন্দ করেছেন। আল্লাহ তায়ালাও এই মুহূর্তে যুদ্ধ করার কোনো আদেশ দেননি; বরং তিনি আদেশ দিয়েছেন-মুসলিমদের দুপক্ষের মাঝে যারা বাগাওয়াত করবে এবং সন্ধি করতে সম্মত হবে না, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। যেমন: আল্লাহ বলেন-
'যদি মুমিনদের দুটি দল মারামারি করে, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একদল অন্যদলের ওপর বাড়াবাড়ি (বাগাওয়াত) করে, তাহলে যে দল বাড়াবাড়ি করবে, তোমরা তার বিরুদ্ধে লড়বে; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে (আল্লাহর নির্দেশ মেনে নেয়)। যদি ফিরে আসে, তাহলে তোমরা উভয়ের মধ্যে ন্যায়ের সাথে মীমাংসা করে দেবে এবং সুবিচার করবে। আল্লাহ তো সুবিচারকারীদেরই ভালোবাসেন।' সূরা হুজুরাত : ৯
সুতরাং প্রথম যারা যুদ্ধ শুরু করেছে, তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছে। অর্থাৎ প্রথম আক্রমণের ব্যাপারে আল্লাহর অনুমোদন নেই। এমনকী আল্লাহ বাগাওয়াতের (জুলুমের) শিকার সকল ব্যক্তিকে অনুমোদন দেন না বাগাওয়াতকারীকে হত্যা করার। কেননা, যেকোনো বাগাওয়াতকারীকেই হত্যা করাটা কুফরি। প্রকৃত অর্থে, অধিকাংশ মুমিনই বাগাওয়াত করে থাকে; বরং অধিকাংশ মানুষই কোনো না কোনো অনাচার ও বাগাওয়াতে লিপ্ত। কিন্তু যখন মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হবে, তখন আবশ্যক হলো তাদের মাঝে সন্ধি করে দেওয়া। আর যদি দুটি দলের একটিকেও যুদ্ধের আদেশ দেওয়া না হয়, তখন আক্রমণকারী দলটি বাগি সাব্যস্ত হবে এবং তাদের হত্যা করা হবে। কেননা, আক্রমণকারী দলটি যুদ্ধ প্রত্যাখ্যান করে সন্ধির পথ অবলম্বন করেনি। সুতরাং বাগি দলটির ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচার একটিই উপায়-তাদের সাথে যুদ্ধ করা, তাদের হত্যা করা। তাই এই দলটিকে হত্যা করা দ্বিতীয় দলের জন্য কোনো আক্রমণকারীকে হত্যার অনুরূপ হবে, তথা আত্মরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে। কেননা, এখানে আক্রমণ বা জুলুম থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো হত্যা করা। যেমনটা রাসূল বলেছেন—
'যে লোক নিজের সম্পদ বাঁচাতে গিয়ে নিহত হয়েছে, সে শহিদ। যে নিজেকে বাঁচানোর জন্য নিহতে হয়েছে, সেও শহিদ। যে ব্যক্তি দ্বীনের জন্য নিহত হয়েছে, সেও শহিদ এবং যে নিজের সম্মান রক্ষার জন্য নিহত হয়েছে, সেও শহিদ।'১১০
অতএব, আলি ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যকার যুদ্ধের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সেনাদলকে যখন বাগি সাব্যস্ত করা হচ্ছে, তখনও যুদ্ধ ও হত্যার বদলে প্রথমে সন্ধির বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিতে হবে। তবে 'তাঁরা আগে হামলা করেছে'-এই অজুহাতেও আলি (রা.)-এর পক্ষের লোকদের হত্যা করা জায়েজ নেই। কারণ, আলি (রা.)-এর সাথে যুদ্ধ থেকে পলায়নকারী লোকও ছিল, যারা আলি (রা.)-এর বেশি বিরোধিতা করত; এরা দুর্বল অনুসারী ছিল।
মোটকথা, এই হাদিসটি কিছুতেই কোনো সাহাবিকে অভিশাপ ও লানত করার বৈধতা দেয় না। এমনকী কাউকে ফাসিক সাব্যস্ত করারও বৈধতা দেয় না।
আহলে বাইত বা নবিপরিবারের কেউ কখনো গালি দেয়নি, আলহামদুলিল্লাহ!
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বনু হাশিমের কাউকে হত্যা করেনি
হাজ্জাজ বনু হাশিমের কাউকে হত্যা করেনি। তবে সে আরবের অভিজাত লোকদের হত্যা করেছে। সে আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা.)-এর মেয়েকে বিয়ে করেছিল। তা বনু হাশিম, বনু আবদে মানাফ ও বনু উমাইয়ার লোকেরা পছন্দ করেনি। এমনকী তাঁরা তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদও ঘটিয়েছিল। কেননা, তাঁরা হাজ্জাজকে নিজেদের 'কুফু' বা সমকক্ষ মনে করেনি। এই ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন!
টিকাঃ
৮৬. বুখারি: ৩৬৭৩, মুসলিম: ২৫৪০
৮৭. বুখারি: ৬০৪৭
৮৮. বুখারি: ২৬৫১, মুসলিম: ১৭৬
৮৯. বুখারি: ২৮৯৭, মুসলিম: ২০৮
৯০. মুসলিম: ২৪৯৬, ৬২৯৮
৯১. বুখারি: ৩১৮১
৯২. মুসলিম: ১২১
১০০. আমর ইবনুল আস (রা.) যেমন ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে সকল গুনাহ থেকে মুক্ত হয়েছেন, একইভাবে মুয়াবিয়া (রা.) ও ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে সকল পাপ থেকে মুক্ত হয়েছেন।- অনুবাদক
৯৪. বুখারি: ৮০৪
৯৫. আহমাদ: ১৭১৫২
৯৬. মুয়াত্তা ইমাম মালেক: ১০
৯৭. বুখারি: ৭২৫৫
৯৮. তিরমিজি: ৩৬৮২
৯৯. ভিন্ন শব্দে তিরমিজিতে এসেছে: ৩৬৮৬
১০০. বুখারি: ৩৬৮৩
১০১. বুখারি: ৬৭৮০
১০২. তিরমিজি: ১২৯৫
১০০. মুসলিম: ২৪৯৫
১০৪. বুখারি: ৩০০৮, মুসলিম: ১৬১
১০৫. বাজ্জার: ২৬৯৫, মাজমাউজ জাওয়াইদ: ৯/৩০৪
১০৬. আবু দাউদ: ৩১১৬
১০৭. বুখারি শরিফে বর্ণিত হাদিসটি সম্পর্কে এখানে কিছু কথা বলা খুবই জরুরি।
ক. ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এখানে হাদিসটির একটি অংশ উল্লেখ করে বিপক্ষের মতাদশর্কে খণ্ডন করেছেন। তবে হাদিসটির পরবর্তী অংশটিও আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মতার্দশকে মজবুতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পরবর্তী অংশটি হলো-'আম্মার (রা.) তাদের জান্নাতের প্রতি আহ্বান করবে, আর তারা (বাগিরা) আম্মার (রা.)-কে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করবে।' স্বভাবতই এখানে প্রশ্ন ওঠে-যারা আম্মার (রা.)-কে হত্যা করেছে, তারা কি তাহলে জাহান্নামি? নচেৎ তারা আম্মার (রা.)-কে কেন জান্নাতের বদলে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করবে?
এর উত্তরে ইবনে কাসির (রহ.) বলেন- 'এখানে জান্নাত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, উম্মাহর ঐক্য। আর জাহান্নাম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, উম্মাহর বিভাজন (আল বিদাআ ওয়ান নিহায়া : ৪/৫৩৮)।' অর্থাৎ আম্মার (রা.) তাদের ঐক্যের (আলি রা.-এর আনুগত্য করার) প্রতি আহ্বান করবেন, আর তারা আম্মার (রা.)-কে বিভাজনের প্রতি তথা ইমামের আনুগত্য না করার প্রতি আহ্বান করবেন। আর এটা তারা করেছিলেন নিজস্ব ইজতিহাদের আলোকে। ইসলামে ইজতিহাদ বৈধ। সেই বিবেচনায় সাহাবিদের একটি দলের সম্মিলিত ইজতিহাদ নিয়ে তো সন্দেহ পোষণের কোনো অবকাশই নেই। তা ছাড়া কুরআন মাজিদেও বিভাজনের ফলাফলকে জাহান্নام বা অগ্নিকুণ্ডের সাথে তুল্য বিবেচনা করা হয়েছে। (দ্রষ্টব্য আলে ইমরান : ১০২-৬) যাই হোক, এই হাদিসের মাধ্যমে রাসূল যেন কিছুটা স্পষ্টভাবেই বলে দিলেন, কোন দলটি বেশি সঠিক।
খ. 'নিশ্চয়ই আম্মারকে একদল বাগি হত্যা করবে'-বুখারি শরিফে বর্ণিত হাদিসের এই অংশটি সম্পর্কে বড়ো বড়ো মুহাদ্দিসিন ও ইমামগণের আপত্তি রয়েছে। ইমাম হামিদি (মৃ.-৪৮৮ হি.) তাঁর আল জামউ বইনাস সাহিহাইন গ্রন্থে (২/৪৬২), ইমাম বাইহাকি (মৃ.-৪৮৮ হি.) তাঁর দালাইলুন নবুওয়াহ গ্রন্থে (২/৫৪৬), ইমাম ইবনুল আসির (মৃ. ৬০৬ হি.) তাঁর জামিউল উসুল গ্রন্থে (৯/৪৩), ইমাম মিজ্জি (মৃ-৭৪২ হি.) তাঁর তুহফাতুল আশরাফ গ্রন্থে (৩/৪২৭), ইমাম জাহাবি (মৃ.-৭৪৮ হি.) তাঁর তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে (২/৯), ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (মৃ.-৮৫২ হি.) তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে (১/৫৪২) বলেছেন, হাদিসের এই অংশটি বুখারির মূল নুসখায় নেই। ইবনে হাজার বলেন- 'কতিপয় মুহাদ্দিস মনে করেন, এই অংশটিকে ইমাম বুখারি (রহ.) লেখার পর মুছে দিয়েছেন। কারণ, এই অংশটুকু তাঁর হাদিস গ্রহণের শর্তমতে সিদ্ধ নয়।' ইমাম জাহাবি বলেছেন-'এই অংশটি বুখারিতে যদিও নেই, তবুও তা প্রমাণসিদ্ধ।'
১০৮. মুসলিম: ১২৫
১০৯. বুখারি: ৭০৮১
১১০. আবু দাউদ: ৪৭৭২, তিরমিজি: ১৪২১
📄 পারস্পরিক যুদ্ধ-সংঘাতের সময় সন্ধি ও তার পদ্ধতি
নেককার মুসলিমদের দুটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হলে করণীয় কী
যেসব ফিতনায় নিপতিত হয়ে মানুষ একে অপরের রক্তপিপাসু হয়ে ওঠে এবং পরস্পরের সম্ভ্রমহানিতে লিপ্ত হয়, সেসব ফিতনা সবচেয়ে জঘন্য ও গুরুতর অপরাধ। আল্লাহ বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ
'হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত, ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাকো। অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।' আলে ইমরান : ১০২
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا كَذلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
'আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ করো; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নিয়امতের কথা স্মরণ করো-যা আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুণ্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদের মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হতে পারো।' আলে ইমরান: ১০৩
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُوْنَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
'আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত, যারা আহ্বান জানাবে সৎ কর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর তারাই হলো সফলকাম।' আলে ইমরান: ১০৪
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ -
'আর তাদের মতো হয়ো না, যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং নিদর্শনসমূহ আসার পরও বিরোধিতা করতে শুরু করেছে। তাদের জন্য রয়েছে ভয়ংকর আজাব।' আলে ইমরান: ১০৫
يَوْمَ تَبْيَضُ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ فَأَمَّا الَّذِينَ اسْوَدَّتْ وُجُوهُهُمْ أَكَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ
'সেদিন কোনো কোনো মুখ উজ্জ্বল হবে, আর কোনো কোনো মুখ হবে কালো। বস্তুত যাদের মুখ কালো হবে, তাদের বলা হবে-“তোমরা কি ঈমান আনার পর কাফির হয়ে গিয়েছিলে? তাহলে এবার সেই কুফরির বিনিময়ে আজাবের আস্বাদন গ্রহণ করো।"' আলে ইমরান: ১০২-৬
মুসলিমদের দুই পক্ষ পরস্পরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে কুফরিতে লিপ্ত হয়েছে। কেননা, রাসূল বলেছেন-
'তোমরা আমার মৃত্যুর পর কাফির হয়ো না। তখন তোমরা একে অপরকে হত্যা করবে।'
অতএব, এটা একপ্রকারের কুফরি। তবে একজন মুসলিমকে গুনাহের কারণে কাফির আখ্যা দেওয়া যায় না। আল্লাহ বলেন-
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ - إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ-
'যদি মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধ করে, তাহলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একদল অন্যদলের ওপর বাড়াবাড়ি (বাগাওয়াত) করে, তাহলে যে দল বাড়াবাড়ি করবে, তোমরা তার বিরুদ্ধে লড়ো; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে (আল্লাহর নির্দেশ মেনে নেয়)। যদি ফিরে আসে, তাহলে উভয়ের মধ্যে ন্যায়ের সাথে মীমাংসা করো এবং সুবিচার করো। আল্লাহ তো সুবিচারকারীদেরই ভালোবাসেন। নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পরে ভাই। তাই তোমাদের ভাইদের মাঝে সন্ধি করে দাও। আল্লাহকে ভয় করো, অচিরেই তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হবে।' সূরা হুজুরাত: ৯-১০
পরস্পর যুদ্ধরত মুসলিমদের সম্পর্কে আল্লাহর হুকুম হলো- 'মুসলিম পরস্পরের ভাই।' তাদের মাঝে যুদ্ধ হলে প্রথম কর্তব্য হলো তাদের মাঝে সন্ধি করা। তবে তাদের কেউ যদি সন্ধিকে গ্রহণ না করে অপর দলের ওপর হামলা করে বসে কিংবা তাদের ওপর বাগাওয়াত করে বসে বা সীমালঙ্ঘন করে বসে, তাহলে এই সীমালঙ্ঘনকারীদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে, তাহলে তাদের মাঝে ইনসাফের সাথে সমাধান করে দিতে হবে।
সুতরাং আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসার পর তাদের মাঝে ইনসাফের সাথে নিষ্পত্তি বা সন্ধির আদেশ দেওয়া হচ্ছে। তাই কেউ যদি আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে, তাহলে তার এবং তার প্রতিপক্ষের মাঝে ইনসাফভিত্তিক ফয়সালা করা হবে। সীমালঙ্ঘনকারী দলটির সাথে যুদ্ধের পূর্বে এবং উভয়পক্ষের যুদ্ধের পরে সন্ধির আদেশ সর্বাগ্রে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা নির্মমভাবে নির্বিচারে কোনো দলের ওপর হত্যাযজ্ঞের আদেশ দেননি।
সন্ধির পদ্ধতি
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অদেশমতে, উপর্যুক্ত পরিস্থিতিতে পক্ষদ্বয়ের মাঝে সন্ধি ওয়াজিব। তাদের বলা হবে-'তোমরা একে অপরের থেকে কী বদলা নেবে?' যদি কোনো দলের হত্যা ও সম্পদ লুণ্ঠন জাতীয় অন্যায় প্রমাণিত হয়, তাহলে তার ওপর জরিমানা আরোপ করা হবে। আর প্রত্যেকেই যদি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়, তাহলে কিসাসের ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন: আল্লাহ বলেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنْثَى بِالْأُنْثَى
'তোমাদের ওপর হত্যার ক্ষেত্রে কিসাসকে ফরজ করা হয়েছে। স্বাধীন লোকের বিনিময়ে স্বাধীন লোক। দাসের বদলে দাস। নারীর বদলে নারী।' সূরা বাকারা : ১৭৮
সালাফদের একটি দল বর্ণনা করেছেন, এই আয়াতটি যুদ্ধমান দুটি দলের মধ্যে কিসাসের বিধানের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে।
فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَادَاءُ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ
'তবে কাউকে যদি তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে মাফ করে দেওয়া হয়, তাহলে ক্ষমা হলো মহানুভবতা।' সূরা বাকারা: ১৭৮
যদি কেউ আরেকজনের ওপর মহানুভবতা দেখায়, তাহলে যথাযথ বিধি অনুসরণ করা কর্তব্য। যার ওপর কারও হক আছে, তা দিয়ে দেওয়া কর্তব্য। কেউ হক দিতে অপারগ হলে তার পক্ষ থেকে অন্য কেউ তার দায়িত্ব পালন করতে পারে। পারস্পরিক সৌহার্দ্য ফিরিয়ে আনার জন্য এটা জায়েজ আছে। পরে সে তা মুসলিমদের জাকাত থেকে নিয়ে নেবে এবং সে ধনী হওয়া সত্ত্বেও মানুষের কাছে সহযোগিতার তলব করতে পারে। রাসূল কবিসা ইবনুল মুখারিককে বলেন-
'হে কবিসা! মনে রেখ, তিন ব্যক্তি ছাড়া কারও জন্য হাত পাতা বা সাহায্য প্রার্থনা করা হালাল নয়।
১. যে ব্যক্তি (কোনো ভালো কাজ করতে গিয়ে বা দেনার জামিন হয়ে) ঋণী হয়ে পড়েছে। ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সাহায্য প্রার্থনা করা তার জন্য হালাল। যখন দেনা পরিশোধ হয়ে যাবে, তখন সে এ থেকে বিরত থাকবে।
২. যে ব্যক্তি প্রাকৃতিক দুর্যোগে পতিত হয়েছে এবং এতে তার যাবতীয় সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। তার জন্য সাহায্য চাওয়া হালাল; যতক্ষণ না তার নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়।
৩. যে ব্যক্তি এমন অভাবগ্রস্ত হয়েছে যে, তার গোত্রের তিনজন জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোক সাক্ষ্য দেয় যে “সত্যিই অমুক অভাবে পড়েছে”, তার জন্য জীবিকা নির্বাহের পরিমাণ সম্পদ লাভ করার পূর্ব পর্যন্ত সাহায্য প্রার্থনা করা হালাল।'১১১
প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের দায়িত্ব হলো-যখনই সম্ভব হয়, মুসলিমদের মাঝে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা এবং আল্লাহর বিধানের নির্দেশ দেওয়া।
ধৈর্যধারণকারী মজলুমের ফজিলত
উভয়পক্ষের কেউ যদি মনে করে-সে মজলুম কিংবা তার ওপর অবিচার করা হচ্ছে, তবুও যদি সে ধৈর্যধারণ করে এবং ক্ষমা করে দেয়, তাহলে আল্লাহ তাকে সাহায্য ও সম্মানিত করবেন। সহিহ হাদিসে এসেছে-
'যে বান্দা ক্ষমা করে, আল্লাহ তার ইজ্জত বাড়িয়ে দেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়াবনত হয়, তার মর্যাদা আল্লাহ বৃদ্ধি করে দেন। আর সাদাকা মালকে বাড়িয়ে দেয়।'১১২
আল্লাহ বলেন-
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ -
'মন্দ কাজের অনুরূপ মন্দ ফল ভোগ করতে হবে। আর যে ক্ষমা করবে এবং সম্প্রীতি বজায় রাখবে, তার প্রতিদান আল্লাহর দায়িত্বে।' সূরা শূরা: ৪০
আল্লাহ আরও বলেন-
إِنَّمَا السَّبِيْلُ عَلَى الَّذِينَ يَظْلِمُونَ النَّاسَ وَيَبْغُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ - وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
'অভিযোগ কেবল তাদের বিরুদ্ধে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার চালায় এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর যে সবর করে এবং ক্ষমা করে, তা নিশ্চয় সাহসিকতার কাজ।' সূরা শূরা: ৪২-৪৩
বাগাওয়াতকারী নিজেই নিজের পরাজয় রচনা করে
জালিম বাগাওয়াতকারী থেকে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন-
'কোনো পাহাড়ও যদি আরেকটি পাহাড়ের ওপর জুলুম করে, তাহলে তাকেও অবশ্যই সমতল ভূমিতে রূপায়িত করা হবে।'
এক আরবি কবি বলেন-
'আল্লাহর বিধান হলো-বাগাওয়াত তার কর্তাকেও পরাস্ত করে। বাগির ওপর বিপদাপদের ঘনঘটা থাকে।'
কুরআনের আয়াতও একই কথা বলে-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا بَغْيُكُمْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ مَتَاعَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا
'তোমাদের অনাচার বা বাগাওয়াত কেবল তোমাদের নিজেদেরই ক্ষতি করবে। দুনিয়ার জীবনের আনন্দ ভোগ করে নাও।' সূরা ইউনুস: ২৩
রাসূল বলেন-
'সীমালঙ্ঘন বা বাগাওয়াত অপেক্ষা এমন বড়ো কোনো পাপ কাজ নেই-যেটার শাস্তি দুনিয়াতে এতটা দ্রুত আপতিত হয়।
আর আত্মীয়তা রক্ষা অপেক্ষা বড়ো কোনো সৎ কাজ নেই- যেটার প্রতিদান এতটা দ্রুত দুনিয়াতে দেওয়া হয়। '১১৩
বাগির করণীয় কী
উভয়পক্ষের বাগি ও জালিম ব্যক্তির কর্তব্য হলো আল্লাহকে ভয় করা এবং তওবা করা। আর যে মজলুম কিংবা বাগাওয়াতের শিকার হওয়া সত্ত্বেও ধৈর্যধারণ করে, তার জন্য সুসংবাদ রয়েছে। আল্লাহ নিজেই বলেছেন-
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
'ধৈর্যধারণকারীদের জন্য সুসংবাদ দাও।' সূরা বাকারা: ১৫৫
আমর ইবনে আউস (রা.) বলেন-
'যারা জুলুমের শিকার হওয়া সত্ত্বেও পালটা জুলুম করে না, তাদের মনে রাখা উচিত, মুমিনদের শত্রুদের সম্পর্কে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-
وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا-
'যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তাহলে তাদের কূটচাল তোমাদের কোনো ক্ষতি করবে না।' সূরা আলে ইমরান : ১২০
ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা যখন তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করল, তখন তিনি ধৈর্যধারণ করলেন এবং খোদাভীতি অবলম্বন করলেন। একপর্যায়ে আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করলেন। তিনি যখন ক্ষমতার মসনদে আসীন, তখন তাঁর ভাইয়েরা সামনে এসে হাজির হলেন। তারা বললেন-
إِنَّكَ لَأَنْتَ يُوسُفُ قَالَ أَنَا يُوسُفُ وَهُذَا أَخِي قَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا إِنَّهُ مَنْ يَتَّقِ وَيَصْبِرُ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ
'তুমিই কি ইউসুফ নও?' তিনি বললেন- 'আমি ইউসুফ। আর এ হচ্ছে আমার ভাই। আল্লাহ আমাদের ওপর দয়া করেছেন। যে আল্লাহকে ভয় করে এবং ধৈর্য ধরে, সে যেন জেনে রাখে- নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।' সূরা ইউসুফ: ৯০
মোটকথা, দুই পক্ষের কেউ যদি আল্লাহর বিধানাবলিকে লঙ্ঘন না করে, যথাযোগ্য ও ন্যায়সংগতভাবে তাঁকে ভয় করে এবং অপরের জুলুমের ওপর ধৈর্য ধরে, তাহলে কারও চক্রান্ত তার ক্ষতি করতে পারবে না; বরঞ্চ আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন।
ফিতনার কারণ গুনাহ ও পাপাচার
এ জাতীয় ফিতনার কারণ হলো-গুনাহ ও পাপাচার। দুই পক্ষেরই উচিত নিজেদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার ও তওবা করা, যা আজাবকে রহিত করে এবং রহমতকে অবারিত করে। আল্লাহ বলেন-
وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
'আপনি তাদের মাঝে থাকা অবস্থায় আল্লাহ তাদের আজাব দেবেন না এবং আল্লাহ তাদের তওবা অবস্থায় আজাব দেবেন না।' সূরা আনফাল : ৩৩
রাসূল বলেন-
'যে লোক বেশি বেশি ইস্তেগফার করে, আল্লাহ তার সকল দুশ্চিন্তা দূর করে দেন। সকল অভাব মোচন করে দেন। তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করেনি।'
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
الر كِتَبٌ أُحْكِمَتْ أَيْتُهُ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ - أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنَّنِي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُمْ مَّتَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى وَيُؤْتِ كُلَّ ذِي فَضْلٍ فَضْلَهُ وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ كَبِيرٍ -
‘আলিফ লা-ম র। এটি এমন এক কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত। অতঃপর সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে এক মহাজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ হতে, যেন তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও বন্দেগি না করো। নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ হতে সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা। আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তার সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা করো। তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ করো। তাহলে তিনি তোমাদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন এবং অধিক আমলকারীকে বেশি করে দেবেন।’ সূরা হুদ : ১-৩
সন্ধিতে অসম্মত দলটির সাথে করণীয়
দুটি দল-যারা নিজেদের উম্মতে মুহাম্মাদি হিসেবে দাবি করা সত্ত্বেও জাহেলি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় তথা প্রতিহিংসা ও খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়, মুমিনরা তাদের মাঝে সন্ধি ও সম্প্রীতি স্থাপন করতে গেলে তারা প্রত্যেকেই অপরপক্ষকে যদি দোষী সাব্যস্ত করে এবং বলে-বিপক্ষের লোকেরাই প্রকৃত বাগাওয়াতকারী, তাদের নিকট থেকে আমাদের বদলা নেওয়া ওয়াজিব। কারণ, আল্লাহ বলেছেন-
‘আমরা তাদের ওপর এ বিষয়ে ওয়াজিব করেছি যে, জানের বদলে জান...’১১৪
তাহলে মধ্যস্থতাকারী মুমিনদের করণীয় কী? হত্যা ও লুণ্ঠনের এই নৈরাজ্যকর অবস্থা তাদের কুফরের দিকে ধাবিত করবে। কারণ, তাদের দাবি হচ্ছে-‘বিপক্ষ দলের ওপর আমাদের হক আছে। তাই যতক্ষণ আমরা তরবারির মাধ্যমে বদলা আদায় না করব, ততক্ষণ ক্ষান্ত হব না!’ একপর্যায়ে দেখা গেল, একটি দল অপর দলের ওপর হামলা করে বসল। প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তারা বাগাওয়াত ও জুলুম করল এবং মানুষদের হত্যা করল। এভাবে তারা নৈরাজ্য ও অরাজকতা সৃষ্টি করল। এক্ষেত্রে বাগাওয়াতকারী দলটিকে উপযুক্ত উপদেশ দেওয়ার পর তাদের সাথে যুদ্ধ করা এবং তাদের হত্যা করা কি ওয়াজিব? কিংবা এক্ষেত্রে বাগাওয়াতকারী দলটির সাথে ইমামের করণীয় কী?
কিতাবুল্লাহ সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মতের ভিত্তিতে দুই দলের যুদ্ধ হারাম
রাসূল বলেন-
'দুজন মুসলিম পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হলে হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়ই জাহান্নামি।' রাসূলকে প্রশ্ন করা হলো- 'হত্যাকারীর বিষয়টা বুঝে এলো। কিন্তু নিহত ব্যক্তির নিয়তি এমন কেন?' তিনি বললেন-'কেননা, সেও তার ভাইকে হত্যার উদ্দেশ্যেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে।'"১১৫
অন্যত্র নবিজি বলেন-
'আমার পরে তোমরা কাফির হয়ো না। একে অপরের মুণ্ডুপাত করো না।' ১১৬
তিনি আরও বলেন-
'নিশ্চয়ই তোমাদের ওপর অপরের জান ও মালকে হারাম করা হয়েছে। তোমাদের আজকের এই দেশ, এই সময়, এই মাসের হারামের মতো হারাম করা হয়েছে। শোনো, তোমাদের মধ্যে উপস্থিত ব্যক্তিরা যেন অনুপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে আমার বার্তা পৌঁছে দেয়। হতে পারে যাদের কাছে তাবলিগ করবে, তারা অনেকে শ্রোতাদের চেয়েও অধিক ধীশক্তিসম্পন্ন থাকতে পারে।' ১১৭
দুই পক্ষের সন্ধির পদ্ধতি
দুই পক্ষের সন্ধি ওয়াজিব। সন্ধির অনেক পদ্ধতি রয়েছে। যেমন- জাকাত থেকে সম্পদ সংগ্রহ করবে। সন্ধি প্রতিষ্ঠার জন্য জরিমানার টাকা জাকাত সংশ্লিষ্ট সম্পদ থেকে আদায় করা বৈধ আছে। এমনটাই শাফেয়ি, হাম্বলি ও অন্যান্য মাজহাবের ফকিহগণ বলেছেন। রাসূল কবিসা ইবনুল মুখারিক (রা.)-কে বলেন-'হে কবিসা! মনে রেখ, তিন ব্যক্তি ছাড়া কারও জন্য হাত পাতা বা সাহায্য প্রার্থনা করা হালাল নয়।
১. যে ব্যক্তি (কোনো ভালো কাজ করতে গিয়ে বা দেনার জামিন হয়ে) ঋণী হয়ে পড়েছে। ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সাহায্য প্রার্থনা করা তার জন্য হালাল। যখন দেনা পরিশোধ হয়ে যাবে, তখন সে এ থেকে বিরত থাকবে।
২. যে ব্যক্তি প্রাকৃতিক দুর্যোগে পতিত হয়েছে এবং এতে তার যাবতীয় সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। তার জন্য সাহায্য চাওয়া হালাল, যতক্ষণ না তার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়।
৩. যে ব্যক্তি এমন অভাবগ্রস্ত হয়েছে যে, তার গোত্রের তিনজন জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোক সাক্ষ্য দেয়, “সত্যিই অমুক অভাবে পড়েছে”, তার জন্য জীবিকা নির্বাহের পরিমাণ সম্পদ লাভ করার পূর্ব পর্যন্ত সাহায্য প্রার্থনা করা হালাল। এ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ও কারণে যদি ভিক্ষা করে বা সাহায্য প্রার্থনা করে উপার্জন করে, তা হারাম হবে।'১১৮
উভয়পক্ষের লোকেরা একে অপরের রক্তপণ ও জরিমানা মওকুফ করে দেবে। আল্লাহ বলেন-
فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُه عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ
'যে ক্ষমা করে ও সন্ধি করে, তার প্রতিদান আল্লাহর দায়িত্বে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমকে পছন্দ করেন না।' সূরা শূরা: ৪০
উভয়পক্ষের সাথে ইনসাফের সাথে বিচার করা হবে। দেখা হবে, উভয়পক্ষের জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি কেমন হয়েছে। কিসাসের ভিত্তিতে স্বাধীনের বদলে স্বাধীন, দাসের বদলে দাস, নারীর বদলে নারীর বদলা নেওয়া হবে। আর কোনো পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি যদি বেশি হয়, তাহলে মহানুভবতার অনুসরণ করতে হবে এবং উত্তমরূপে তা আদায় করতে হবে। আর যদি নিহতের সংখ্যা কিংবা মালের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে জানা না যায়, তাহলে এই অজ্ঞাত ক্ষয়ক্ষতি ধরা যাবে না। তবে কোনো দল যদি অধিক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করে, তাহলে অপরপক্ষকে তা কসম করে অস্বীকার করতে হবে কিংবা অভিযোগকারী দল দাবির পক্ষে দলিল হাজির করবে। আর অভিযুক্ত দল যদি কসম করতে অসম্মতি জানায়, তাহলে কসম করতে অসম্মতি জানানোর কারণে তাদের বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
প্রতিশোধ গ্রহণ করা ওয়াজিব-কথাটি মিথ্যা
যে ব্যক্তি বলে-'আল্লাহ বদলা নেওয়াকে ওয়াজিব করেছেন', সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর ওপর মিথ্যারোপ করেছে। কেননা, কেউ তার মুসলিম ভাই কর্তৃক জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি কিংবা মানহানির শিকার হলে তার ওপর বদলা নেওয়াকে আল্লাহ ওয়াজিব করেননি। উপরন্তু আল্লাহ বান্দার হকের আলোচনায় সবখানেই ক্ষমা করাকে পছন্দনীয় পন্থা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেমন: আল্লাহ বলেন-
وَالْجُرُوحَ قِصَاصٌ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُ -
'আঘাতসমূহের কিসাস নেওয়া হবে। তবে যদি সাদাকা করে দেয়, তাহলে সেটা তার কাফফারা বিবেচিত হবে।' সূরা মায়েদা: ৪৫
তিনি আরও বলেন-
فَنِصْفُ مَا فَرَضْتُمْ إِلَّا أَنْ يَعْفُوْنَ أَوْ يَعْفُوَ الَّذِي بِيَدِهِ عُقْدَةُ النكاح
'ধার্যকৃত সম্পদের অর্ধেক দেবে। তবে যদি তারা ক্ষমা করে দেয় কিংবা যার হাতে বিয়ের বন্ধন-সে যদি ক্ষমা করে দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা।' সূরা বাকারা: ২৩৭
কিসাসের আয়াতের প্রকৃত ব্যাখ্যা
وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفَ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصُ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
'আমি এ গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময়ে চোখ, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং জখমসমূহের বিনিময়ে সমান জখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে গুনাহ থেকে পাক হয়ে যায়। যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদানুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই জালিম।' সূরা মায়েদা : ৪৫
এই আয়াতের বিধান বনি ইসরাইলের ওপর ফরজ করা হয়। আজও যেহেতু তা মানসুখ বা রহিত হয়নি, তাই আমরাও তা পালন করি। এর উদ্দেশ্য হলো- সকল মুসলিমের রক্তই সমান। যেমন: রাসূল বলেন-
'সকল মুসলিমের জীবনমূল্য সমান। অন্যদের বিরুদ্ধে তারা ঐক্যবদ্ধ শক্তি।'১১৯
সুতরাং চাই হত্যাকারী উঁচু বংশের নেতাগোছের হোক, আর নিহত ব্যক্তি দুর্বল ও নিম্ন শ্রেণির হোক কিংবা হত্যাকারী চাই হাশেমি আর নিহত ব্যক্তি কুরাইশের হোক-বিধান কখনোই পরিবর্তিত হবে না। সবার জীবনমূল্য সমান।
মূলত এর উদ্দেশ্য হলো-জাহেলি যুগে প্রচলিত বিধিকে রহিত করা। জাহেলি যুগে প্রথা ছিল-গোত্রের বড়ো কোনো ব্যক্তি যদি নিহত হয়, তাহলে হত্যাকারীর গোত্রের বদলে অন্য গোত্রের কয়েকজনকে হত্যা করা। আর যদি নিম্ন পর্যায়ের কোনো লোক নিহত হয় এবং হত্যাকারী গোত্রের উঁচু পর্যায়ের লোক হয়, তাহলে কোনো বদলা নিতে পারবে না। এসব প্রথাকে বাতিল করতে আল্লাহ বলেন-
'এ বিষয়ে আমরা তাদের ওপর জানের বদলে জান ফরজ করেছি।'
তাই দেখা যাচ্ছে, জানের বদলে জানের বিধান কার্যকর করে সমতা বজায়ের হুকুম দেওয়া হয়েছে। কারণ, কারও ওপর জুলুম করা সম্পূর্ণরূপে হারাম। আর হকদারের হক বুঝিয়ে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। যেমন: আল্লাহ বলেন-
وَمَنْ قُتِلَ مَظْلُومًا فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيِّهِ سُلْطَانًا فَلَا يُسْرِفْ فِي الْقَتْلِ
'আর যে নাহকভাবে নিহত হয়েছে, তার অভিভাবককে বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছি। তাই হত্যার বেলায় তোমরা বাড়াবাড়ি করো না।' সূরা বনি ইসরাইল: ৩৩
অর্থাৎ যে হত্যা করেনি, তাকে হত্যা করো না।
কোনো একটি দল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর হুকুমের সামনে আত্মসমর্পণ করার পর অপর দলটি যদি বলে- 'আমরা আমাদের হক নিজ হাতে আদায় করব', তাহলে এটা গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। যখন ক্ষমতাধর অপর দলটি আল্লাহ ও রাসূল -এর হুকুম পালনে অসম্মতি জানায়, তখন আমিরের ওপর ওয়াজিব হলো এদের হত্যা করা। তারা যদি ক্ষমতাধর না হয়, তাহলে তদন্ত করা হবে-কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর হুকুম মানতে অসম্মতি জানিয়েছে। অতঃপর তাকে ন্যায়বিচার মানতে বাধ্য করা হবে।
বহু বছরের পুরাতন বদলা বা হক কীভাবে আদায় করা হবে
কেউ যদি দাবি করে-প্রতিপক্ষের ওপর আমাদের বহু বছরের হক রয়েছে, তাহলে তাদের বলা হবে-আমরা তোমাদের মাঝে নতুন ও পুরাতন সব হকের বিষয়ে মীমাংসা করব। কারণ, আল্লাহর বিধান সব সময়ের জন্য পালন করা অপরিহার্য।
সন্ধির পর কাউকে হত্যা করা
সন্ধি ও সম্প্রীতি স্থাপিত হওয়ার পর যদি কেউ কাউকে হত্যা করে, তাহলে হত্যাকারীকেও হত্যা করা হবে। অধিকন্তু আলিমদের একটি দল বলেন-তাকে হত্যা করে হদ্দ কায়েম করা হবে এবং নিহত ব্যক্তির স্বজনদের জন্য এ লোককে ক্ষমা করা জায়েজ হবে না। অধিকাংশ আলিম বলেন-তাকে হত্যা করা হবে বটে, তবে স্বজনরা মাফ করার এখতিয়ার রাখবে।
তবে এরূপ কাজ যদি পুরো দল মিলে করে, তাহলে তাদের শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। তাদের হত্যা করা ব্যতীত যদি তারা না ফেরে, তাহলে তাদের হত্যা করা হবে। আর যদি হত্যা করা ছাড়াই তারা ফিরে আসে, তাহলে এমন শাস্তি দেওয়া হবে-যা তাদের সীমালঙ্ঘন ও শত্রুতা থেকে এবং চুক্তি ও ওয়াদা ভঙ্গ থেকে বিরত রাখে। রাসূল বলেছেন-
'কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের পশ্চাতে তার বিশ্বাসঘাতকতার পরিমাণমতো পতাকা স্থাপিত থাকবে। তারপর বলা হবে-“এটা অমুকের বিশ্বাসঘাতকতা।”'১২০
আল্লাহ বলেন-
فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءُ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ ذَلِكَ تَخْفِيفٌ مِنْ رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ -
'অতঃপর তার ভাইয়ের তরফ থেকে যদি কাউকে কিছুটা মাফ করে দেওয়া হয়, তবে প্রচলিত নিয়মের অনুসরণ করবে এবং ভালোভাবে তাকে তা প্রদান করতে হবে। এটা তোমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে সহজ ও বিশেষ অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করে, তার জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আজাব।' সূরা বাকারা: ১৭৮
আলিমদের একদল বলে-ক্ষমার পরে যে হত্যা করে, তাকে অবশ্যই হত্যা করা হবে। আরেক দল বলেন-তাকে এমন শাস্তি দেওয়া হবে, যার ফলে সে এ জাতীয় কাজ থেকে বিরত থাকে।
নামাজ-রোজা ইত্যাদি পরিত্যাগকারীর হদ কী
যারা নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না অথবা রোজা রাখে কিন্তু নামাজ পড়ে না, মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করে আবার প্রতিবেশী ও অসহায়দের সাহায্যও করে, তাদের ধর্ম নির্দিষ্ট করে শনাক্ত করা যায় না। তাহলে তাদের হুকুম কী?
তারা যদি কোনো শাসকের অধীনে থাকে, তাহলে শাসক তাদের নামাজ কায়েমের আদেশ দেবে। যদি না করে, তাহলে শাস্তি দেবে। রোজার ক্ষেত্রেও একই কথা। তবে এটা তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন তারা ফরজগুলোর ফরজিয়াত স্বীকার করবে। যদি স্বীকার না করে, তাহলে তারা কাফির। আর তারা যদি নামাজ-রোজা ইত্যাদির ফরজিয়াত স্বীকার করা সত্ত্বেও আদায় না করে, তাহলে তা আদায় করা পর্যন্ত তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। এতৎসত্ত্বেও যারা নামাজ পড়বে না, জমহুর আলিম তথা ইমাম মালেক, শাফেয়ি, আহমদ (রহ.) প্রমুখের মতানুযায়ী-তাদের হত্যা করা হবে। অনুরূপভাবে হদও কায়েম করা হবে।
যদি প্রভাবশালী সম্পূর্ণ একটি দল ফরজ বিধান পালন না করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে (যেমন: জাকাত দিতে অসম্মতি জানানো দলটির বিরুদ্ধে আবু বকর (রা.) যুদ্ধ করেছিলেন); যদি না তারা সুস্পষ্ট মুতাওয়াতির ওয়াজিবগুলো পালনে ব্রতী হয়। সুস্পষ্ট মুতাওয়াতির ওয়াজিবগুলো হলো-নামাজ, রোজা, জাকাত ইত্যাদি। যিনা, সুদ, ডাকাতি ইত্যাদি পরিত্যাগ করাও এ জাতীয় ওয়াজিবের অন্তর্গত।
যে ব্যক্তি নামাজ ও রোজাকে ফরজ মনে করবে না; অস্বীকার করবে, সে কাফির। তাকে তওবা করতে বলা হবে। তওবা না করলে হত্যা করা হবে। আর যে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান রাখে না, সে তো ইহুদি-নাসারাদের চেয়েও বড়ো কাফির।
পাপাচারী সম্প্রদায় যুদ্ধে নিহত হলে কি শহিদ হবেন?
সীমান্তে বসবাসকারী যেসব সম্প্রদায় শত্রুপক্ষ থেকে দেশকে রক্ষা করে এবং শরাব ও যিনায় নিজেদের অর্থ ব্যয় করে, তারা যদি মারা যায়, তাহলে কি শহিদ বিবেচিত হবে?
তারা যদি কাফির শত্রুপক্ষদের ওপর হামলা করে মারা যায়, তাহলে তাদের কাজের প্রতিদান নিয়্যাতের ভিত্তিতে পাবে। একবার সাহাবিরা রাসূল-কে জিজ্ঞেস করলেন-
'হে আল্লাহর রাসূল! মানুষ তো বীরত্ব প্রদর্শন, জাতিস্বার্থ ও লোক দেখানোর জন্যও যুদ্ধ করে, তাহলে শহিদ কে?'
রাসূল বললেন-
'যে আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত রাখার জন্য যুদ্ধ করে, সে-ই শহিদ।'১২১
তাই কেউ যদি অর্থোপার্জন এবং তা পাপ কাজে খরচ করার জন্য যুদ্ধ করে, তাহলে সে ফাসিক এবং তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত রাখতে এবং সর্বাত্মকভাবে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করে, তাহলে সে শহিদ হবে। যদি তাদের কবিরা গুনাহ থাকে, তাহলে পুণ্যও থাকবে। আর পাপ তো পুণ্যের দ্বারা বিমোচিত হয়ে যায়।
তবে তারা যদি সেখানকার মুসলিমদের হত্যা করে, তাহলে তারা জমিনে বিপর্যয়কারী ও ফিতনা সৃষ্টিকারী লোক গণ্য হবে। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে বলে তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
টিকাঃ
১১৪. প্রাগুক্ত
১১৫. প্রাগুক্ত
১১৬. প্রাগুক্ত
১১৭. বুখারি: ৬৮, মুসলিম: ১২১৮
১১৮. প্রাগুক্ত
১১৯. আবু দাউদ: ৪৫৩০
১২০. প্রাগুক্ত
১২১. বুখারি: ৭৪৫৮, মুসলিম: ১৫০
১১২. মুসলিম: ২৫৮৮
১১১. আবু দাউদ: ১৬৪০, মুসলিম: ১০৪৪
১১০. আবু দাউদ: ৪৯০২
📄 পাতানো ভ্রাতৃত্ব এবং আনসার-মুহাজিরদের ভ্রাতৃ-সম্পর্ক
পাতানো ভ্রাতৃত্ব
বর্তমানে অনেকেই ভাই পাতিয়ে একজন আরেকজনকে বলে—‘আমার সম্পদ তোমার সম্পদ এবং আমার আত্মীয় তোমার আত্মীয়। আমার সন্তান তোমার সন্তান।’ এই বলে একে অপরের রক্ত পান করে। এমনটা করা কি শরিয়তসম্মত? এটা কি মুবাহ? এতে করে রক্তসম্পর্কীয় ভাইয়ের বিধান প্রযোজ্য হবে? আর মুহাজির ও আনসারদের মাঝে রাসূল ﷺ যে ভাইয়ের সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, তা কেমন ছিল?
উল্লিখিত পদ্ধতিতে সর্বসম্মতিক্রমে ভাই পাতানো জায়েজ নেই। রাসূলের পদ্ধতিটি ছিল এমন— ‘রাসূল ﷺ আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বাড়িতে সাদ ইবনে রবিয়া ও আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর মাঝে ভ্রাতৃবন্ধন প্রতিষ্ঠা করে দেন। তখন সাদ (রা.) আবদুর রহমান (রা.)-কে বলেন- “তুমি আমার সম্পদের এক ভাগ নিয়ে যাও, আর আমার স্ত্রীদের কাউকে পছন্দ করো। তাঁকে আমি তালাক দেবো, তাহলে তুমি তাঁকে বিয়ে করতে পারবে।” তারপর আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বললেন- “আল্লাহ তোমার মাল ও পরিবারে বরকত দিক। আমাকে বাজার দেখিয়ে দাও।”’১২২
অনুরূপভাবে রাসূল সালমান ফারসি ও আবু দারদা (রা.)-এর মাঝেও ভাইয়ের সম্পর্ক গড়ে দিয়েছিলেন। এ সবই সহিহ হাদিসে এসেছে।
তবে কিছু কিছু সিরাতকার এক মুহাজিরের সাথে অন্য মুহাজিরের এবং এক আনসারের সাথে অন্য আনসারের ভাই সম্পর্কের যে বর্ণনা করেছেন, তা ভিত্তিহীন। সকল হাদিসবিশারদের মতেই তা অগ্রহণযোগ্য। মুহাজির ও আনসারদের মাঝে এই সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছিল।
وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ-
'বস্তুত আত্মীয়গণই পরস্পরের বেশি হকদার।' সূরা আনফাল : ৭৫
এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর আত্মীয়তা সম্পর্ককেই মিরাসের মাপদণ্ড মানা হয়। পাতানো ভাই সম্পর্কে কোনো মিরাস নির্ণীত হয় না।
উল্লেখ্য, এক্ষেত্রে একটি ইখতিলাফ রয়ে গেছে। আর সেটা হলো-যদি পাতানো সম্পর্ক ছাড়া আর কোনো আত্মীয় বেঁচে না থাকে, তাহলে মিরাস পাবে কি না? ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এবং আহমদ (রহ.)-এর এক বর্ণনামতে পাবে। কারণ, আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَالَّذِينَ عَقَدَتْ أَيْمَانُكُمْ فَأْتُوهُمْ نَصِيبَهُمْ-
'আর যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, তাদের হক তাদেরকে দিয়ে দাও।' সূরা নিসা: ৩৩
ইমাম মালেক ও শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে এবং আহমদ (রহ.)-এর যে মতটি তাঁর অনুসারীদের কাছে প্রসিদ্ধ, সে মত অনুযায়ী-পাতানো সম্পর্কের ভিত্তিতে কিছুতেই মিরাস পাবে না। তাঁরা বলেন-উপরিউক্ত আয়াতটি মানসুখ বা রহিত হয়ে গেছে।
আনসার ও মুহাজিরদের মতো সম্পর্ক পাতানো কি বৈধ
এক্ষেত্রেও ইখতিলাফ রয়েছে। একদল বলেন-এ জাতীয় সম্পর্ক রহিত হয়ে গেছে। তাঁদের প্রথম দলিল মুসলিম শরিফের হাদিস।
জাবির ১২৩ (রা.) বলেন-
'ইসলামে কোনো পাতানো সম্পর্কের অস্তিত্ব নেই। জাহেলিয়াতের সময় যা ছিল, তার ওপর ইসলাম কেবল কঠোরতাই আরোপ করেছে। '১২৪
তা ছাড়া আল্লাহ কুরআনে মুমিনদের পরস্পরের ভাই হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। হাদিসেও রাসূল বলেছেন-
'মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার ভাইয়ের ওপর জুলুম করবে না এবং তার ভাইয়ের ওপর জুলুম হলে সহ্যও করবে না।'১২৫
আরেক হাদিসে নবিজি বলেন-
'যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না-যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যে উত্তম বিষয় পছন্দ করে, অপর ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করবে। '১২৬
যে ঈমানের আবশ্যিক শর্ত পালন করবে, সে সকল মুমিনের ভাই। তাই কোনো প্রকার বিশেষ চুক্তি ছাড়াই তার হক আদায় করা প্রত্যক মুমিনের কর্তব্য। কেননা, আল্লাহ ও রাসূল মুমিনদের ভ্রাতৃত্ব ও পরস্পরে দায়বদ্ধতার কথা পূর্বনির্ধারিত করে রেখেছেন।
মুসলিমের ভালোবাসা, পছন্দ-অপছন্দ ও বন্ধুত্ব-শত্রুতার স্বরূপ
মুসলমানের ভালোবাসা, পছন্দ-অপছন্দ ও বন্ধুত্ব-শত্রুতা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশমাফিক হতে হবে। তাই আল্লাহ ও রাসূল যা পছন্দ করেন, তা পছন্দ করা আবশ্যক এবং যা অপছন্দ করেন, তা অপছন্দ করা আবশ্যক। একইভাবে যে আল্লাহ ও রাসূলের সাথে বন্ধুত্ব করে, তার সাথে বন্ধুত্ব রাখা এবং যে আল্লাহ ও রাসূলের সাথে শত্রুতা রাখে, তার সাথে শত্রুতা রাখাও কর্তব্য। আর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ভালো-মন্দ উভয় কাজেরই প্রতিদান দেওয়া হবে। যেমন: ফাসিকরা সওয়াব ও শাস্তি দুটোই পাবে। এজন্য তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা দুটোই আমলে নিতে হবে। আমলের ভেতরে থাকা সৎ কাজ ও অসৎ কাজের ভিত্তিতে তাদের পছন্দ-অপছন্দ দুটোই করতে হবে।
যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ - وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَّرَه
'যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করে, তাকে তা দেখানো হবে এবং যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, তাকে তা-ও দেখানো হবে।' সূরা জিলজাল: ৭-৮
এটাই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মত। খারেজি, মুতাজিলা, জাহমিয়্যাহ ও মুরজিয়াদের অবস্থান এর বিরুদ্ধে। তারা উভয়দলই এক্ষেত্রে দুটো পক্ষ নিয়ে আছে এবং তারা প্রান্তিকতার শিকার। আহলে সুন্নাহ এক্ষেত্রে মধ্যমপন্থি দল।
সম্পর্ক-চুক্তির মাধ্যমে কোনো পিতৃত্ব সাব্যস্ত হয় না
এক্ষেত্রে কোনো মতবিরোধ নেই যে যদি কোনো রক্তের সন্তান (জীবিত) থাকে, তাহলে অন্য কেউ কারও মিরাসি সন্তান হতে পারবে না। অর্থাৎ পাতানো সম্পর্কের ছেলে মিরাস পাবে না, যদি রক্তের সন্তান থাকে। আল্লাহ তায়ালা পালকপুত্রের জাহেলি নিয়মকে রহিত করেছেন-
مَا جَعَلَ اللَّهُ لِرَجُلٍ مِّنْ قَلْبَيْنِ فِي جَوْفِهِ وَمَا جَعَلَ أَزْوَاجَكُمُ اللَّائِي تُظَاهِرُونَ مِنْهُنَّ أُمَّهَاتِكُمْ وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَ كُمْ أَبْنَاءَكُمْ -
'আল্লাহ কোনো মানুষের মধ্যে দুটি হৃদয় স্থাপন করেননি। তোমাদের যে স্ত্রীদের সাথে তোমরা জিহার করো, তাদের তিনি তোমাদের জননী করেননি এবং তোমাদের পোষ্যপুত্রদের তোমাদের পুত্র করেননি।' সূরা আহজাব : ৪
মহান আল্লাহ আরও বলেন-
اُدْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللَّهِ فَإِنْ لَّمْ تَعْلَمُوا آبَاءَهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَمَوَالِيْكُمْ -
'তোমরা তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত। যদি তোমরা তাদের পিতৃপরিচয় না জানো, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও বন্ধুরূপে গণ্য হবে।' সূরা আহজাব : ৫
অনুরূপভাবে তারা একে অপরের উত্তরাধিকারী হবে না। কারণ, এটা দুই দিক থেকেই অসম্ভব। তবে তারা উভয়ে অপরের সম্মতি সাপেক্ষে সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে; যেমনটা সালাফগণ করতেন। তাঁরা একে অপরের অনুপস্থিতিতে ঘরে ঢুকে খাবার খেতেন। কারণ, সে জানতেন যে এতে তাঁর সম্মতি আছে। যেমনটা আল্লাহ তায়ালা সূরা নুরে বলেছেন-
أَوْ صَدِيقِكُمْ -
'অথবা তোমাদের বন্ধুগণ।' সূরা নুর: ৬১
চুক্তি কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হলে পূরণ করা আবশ্যক
সর্বোপরি সকল শর্ত, চুক্তি ও সম্পর্ক কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে যাচাই করা আবশ্যক। যদি এগুলো কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হয়, তাহলে তা পালন করতে হবে। রাসূল ﷺ বলেন-
'যে ব্যক্তি কুরআন-সুন্নাহবিরোধী শর্ত করল, তার শর্ত বাতিল বলে গণ্য হবে; যদি শর্ত ১০০টিও হয়। কেননা, আল্লাহর কিতাব সবচেয়ে সত্য এবং তার শর্ত অধিক পালনযোগ্য।' ১২৭
যেমন: কেউ অন্যের ছেলেকে নিজের ছেলে বলে শর্ত করল কিংবা অন্যের গোলাম আজাদ করে দিলো অথবা তার সন্তান ও আত্মীয়কে মিরাস না পাওয়ার শর্ত করল অথবা নাহকভাবে কাউকে সহযোগিতার শর্ত রাখল বা কথা দিলো-এ জাতীয় সকল শর্তের ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথাই পালনযোগ্য। আল্লাহ ও রাসূলের খেলাফ কোনো কথা বা শর্ত পূরণ করা যাবে না। এ ব্যাপারে সকল ইমাম একমত। তবে মুবাহ বিষয়াদি নিয়ে মতপার্থক্য আছে। সেই আলোচনার এটা উপযুক্ত স্থান নয়।
অনুরূপভাবে ব্যবসায়িক চুক্তি, হেবা, ওয়াকফ, মান্নত, ইমাম ও মাশায়েখদের কাছে বাইয়াত, ভাই চুক্তি, বংশীয় চুক্তি ইত্যাদি সকল চুক্তির ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা আবশ্যক। আর সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব। স্রষ্টার অবাধ্যতা হয়-এমন কাজে সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না। আর সবচেয়ে প্রিয় হওয়া চাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল। আল্লাহু আলাম!
সমাপ্ত
টিকাঃ
১২২. বুখারি: ২০৪৯, মুসলিম: ১৪২৭
১২৩. হাদিসটি মুসলিম শরিফে জুবাইর ইবনে মুতইম (রা.)-এর সূত্রে এসেছে। জাবির (রা.)-এর সূত্রে নয়; যেমনটা শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন。
১২৪. মুসলিম: ২৫৩০
১২৫. বুখারি: ২৪৪২
১২৬. বুখারি: ১৩
১২৭. বুখারি: ২৫৬১