📄 সমাজে ইমাম বা শাসকদের অবস্থান
কুরআন, ইনসাফ ও তরবারি দিয়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠা
আল্লাহ রাসূল -কে পাঠিয়েছেন হিদায়াত ও সত্য ধর্ম দিয়ে, যাতে তিনি এই ধর্মকে সমস্ত ধর্মের ওপর বিজয় লাভ করাতে পারেন। তাই আল্লাহ এই উম্মতের জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন এবং নিয়ামতে পূর্ণ করেছেন। তিনি শাসনের জন্য একটি বিধান দিয়ে তা অনুসরণের আদেশ দিয়েছেন। আর জ্ঞানহীনদের অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। মুহাম্মাদ -এর ওপর অবতীর্ণ কিতাবকে অপরাপর কিতাবের ওপর প্রভুত্বকারী ও সত্যায়ক বানিয়েছেন। তাঁর জন্য আরও দিয়েছেন শরিয়ত ও জীবনবিধান। তাঁর উম্মতের জন্য দিয়েছেন হিদায়াতের বহুবিধ পন্থা।
দ্বীন কায়েম হবে কেবল কিতাব, ইনসাফ ও তরবারির মাধ্যমে। কিতাব পথপ্রদর্শন করবে। তরবারি তাকে সহযোগিতা করবে। আল্লাহ বলেন-
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَاَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيْهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ
'নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদের প্রেরণ করেছি প্রমাণাদি দিয়ে এবং তাঁদের সাথে দিয়েছি কিতাব ও ইনসাফ-যাতে মানুষ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আর দিয়েছি তরবারি, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য প্রচুর ক্ষমতা ও উপকার।' সূরা হাদিদ : ২৫
সুতরাং কিতাব দিয়ে জ্ঞান ও দ্বীন প্রতিষ্ঠা পায়। মিজান বা ইনসাফ দিয়ে অর্থনৈতিক চুক্তি ও অধিগ্রহণের অধিকার সাব্যস্ত হয়। আর তরবারি দিয়ে হুদুদ কায়েম হয় কাফির ও মুনাফিকদের ওপর।
তাই পরবর্তী যুগে কিতাব ছিল আলিম ও আবেদগণের চর্চায়। মিজান ছিল মন্ত্রী, আমলা, দাপ্তরিকদের চর্চায়। আর তরবারি ছিল শাসক ও সৈন্যদের চর্চায়। ভিন্ন ভাষায়-নামাজে কিতাব আর জিহাদে তরবারি।
সবচেয়ে বেশি আয়াত ও হাদিস নামাজ ও জিহাদ সম্পর্কে
তাই রাসূল যখনই কোনো রোগীকে দেখতে যেতেন, বলতেন- 'হে আল্লাহ! তোমার বান্দাকে তুমি সুস্থ করে দাও। (সুস্থ হয়ে) তোমার জন্য নামাজে সে হাজির হবে এবং তোমার শত্রুকে আঘাত করবে। '৫৪
রাসূল আরও বলেন- 'সবকিছুর মূল ইসলাম। ইসলামের মূল নামাজ। আর এর সর্বোচ্চ শিখর হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। '৫৫
তাই কুরআনে এই দুটোকে (নামাজ ও জিহাদ) অনেক জায়গায় একসঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ -
'তাঁরাই হলো মুমিন, যারা আল্লাহ ও রাসূলের ওপর ঈমান আনার পর সন্দেহ করেনি এবং তাঁদের জান-মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে।' সূরা হুজুরাত: ১৫
নামাজ হলো ইসলামের অগ্রগণ্য আমল এবং ঈমানি আমলের মূল। তাই কুরআনে একে ঈমান শব্দ দিয়ে ব্যক্ত করা হয়েছে-৫৬
وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ إِيْمَانَكُمْ -
'আর আল্লাহ এরূপ নন যে তোমাদের ঈমান বিনষ্ট করবেন।' সূরা বাকারা: ১৪৩
সালাফদের মতে, এখানে ঈমান অর্থ নামাজ। অর্থাৎ বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখী তোমাদের নামাজ। আল্লাহ বলেন-
اجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللهِ لَا يَسْتَوُونَ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
'হাজিদের পানি পান করানো আর মসজিদে হারামের আবাদ করাকে তোমরা কি তাঁদের কাজের সমান মনে করো, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করে? আল্লাহর দৃষ্টিতে এরা সমান নয়। (যারা ভ্রান্ত পথে আল্লাহর সন্তুষ্টি) খোঁজে এমন জালিম সম্প্রদায়কে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন না।' সূরা তাওবা: ১৯
তিনি আরও বলেন-
فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ اعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائم -
'অচিরেই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় প্রেরণ করবেন, যাদের তিনি ভালোবাসবেন। তাঁকেও তাঁরা ভালোবাসবে। তাঁরা মুমিনদের ওপর নমনীয়, কাফিরদের বেলায় কঠোর হবে। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ক্ষেত্রে তাঁরা কোনো নিন্দুকের নিন্দার তোয়াক্কা করবে না।' সূরা মায়েদা : ৫৪
তাঁদের গুণ বর্ণনায় 'ভালোবাসা' শব্দটিকে ব্যবহার করেছেন, যেটা নামাজের প্রকৃত গূঢ়ার্থ। যেমনটা তিনি বলেছেন-
مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللَّهِ وَ الَّذِيْنَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَعًا سُجَّدًا يَبْتَغُوْنَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا-
'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর যারা তাঁর সাথে ঈমান এনেছে, তাঁরা পরস্পরে নম্র এবং কাফিরদের বেলায় কঠোর। তাঁদের তুমি দেখবে রুকুকারীরূপে, সিজদারত হয়ে আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করছে।' সূরা ফাতহ : ২৯
এখানে তাঁদের গুণ বলতে গিয়ে কুফর ও গোমরাহির ক্ষেত্রে কঠোরতার কথা বলেছেন। সহিহ হাদিসে এসেছে-
'নবি -কে জিজ্ঞেস করা হলো-“কোন আমলটি উত্তম?” তিনি বললেন-"আল্লাহর ওপর ঈমান আনা এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।" তারপর জিজ্ঞেস করা হলো, "এরপর কোন কাজ উত্তম?” "মকবুল হজ।””৫৭
অথচ অন্য একটি সহিহ হাদিসে এসেছে, ইবনে মাসউদ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন-
'কোন আমল উত্তম?' নবিজি বললেন, 'ওয়াক্তমতো নামাজ।' ইবনে মাসউদ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন-'তারপর কোনটা?' তিনি বললেন, 'পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার।' আবার জিজ্ঞেস করলেন-'তারপর কোনটা?' নবিজি বললেন- 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। '৫৮
প্রথম হাদিসে 'আল্লাহর ওপর ঈমান' কথাটিতে নামাজও অন্তর্গত। তবে প্রথম হাদিসটিতে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার কথাটি নেই। কারণ, পিতা-মাতা তো সবার থাকে না। তাই প্রথমটি ব্যাপক এবং দ্বিতীয়টি যার পিতা-মাতা আছে তার জন্য নির্দিষ্ট।
জিহাদ ও নামাজে নেতৃত্ব দেবেন শাসক
রাসূলের যুগে, চার খলিফার আমলে এবং তাঁদের পথানুসারী আব্বাসি ও উমাইয়া শাসকদের যুগে নামাজ ও জিহাদ-এই মৌলিক দুই বিষয়ে নেতৃত্বে থাকতেন শাসকরাই। তাই যিনি নামাজের ইমাম, তিনিই জিহাদের ইমাম। রাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে জিহাদ ও নামাজের আদেশ অভিন্ন। তাই রাসূল যখন আত্তাব ইবনে উসাইদ (রা.)-কে মক্কায় এবং তায়েফে উসমান ইবনে আবুল আস (রা.)-কে গভর্নর নিযুক্ত করেন, তখন তাঁরাই নামাজে ইমামতি করতেন এবং হুদুদ কায়েম করতেন। একইভাবে রাসূল যখন কাউকে কোনো গাজওয়ার আমির নিযুক্ত করতেন-যেমন: জায়েদ ইবনে হারিসা, উসামা ইবনে জায়েদ ও আমর ইবনুল আস (রা.) প্রমুখ সাহাবিকে করেছিলেন-তখন যুদ্ধের আমিরই নামাজ পড়াতেন। এজন্যই আবু বকর (রা.)-কে যেহেতু রাসূল নামাজে ইমামতির ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য করেছেন, তাই অপরাপর সকল বিষয়েও তাঁর অগ্রগণ্যতা বা ইমামতির প্রমাণ পাওয়া যায়।
অনুরূপভাবে আবু বকর (রা.)-এর যুগে যারা যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন, তাঁরাই নামাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যেমন: ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ, আমর ইবনুল আস (রা.) প্রমুখ সাহাবিগণ।
উমর (রা.)-এর সময়েও কুফার প্রতিনিধিরা নিয়োগ অনুযায়ী কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) যুদ্ধ ও নামাজের দায়িত্বে ছিলেন। ইবনে মাসউদ (রা.) কাজি ও বাইতুলমালের দায়িত্বে ছিলেন। উসমান ইবনে হুনাইফ (রা.) ছিলেন খারাজের পদে।
সেনাপতি, কালেক্টর ও বিচারকের পদের সূচনা
এরপর থেকেই সেনাপতি, কালেক্টর ও বিচারকের পদের সূচনা হয়। কারণ, উমর (রা.)-এর যুগে যখন ইসলামের ভূখণ্ড বিস্তার লাভ করে, তখন বিভিন্ন নতুন নতুন প্রশাসনিক বিভাগ বা দপ্তর খোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যেমন: ভূমিকর অধিদপ্তর, সহায়তা অধিদপ্তর বা দিওয়ানুল আতা। অনেক শহর গড়ে তোলেন। মিশর, বসরা, ফুসতাতের মতো শহর আবাদ হয়।
এমনভাবে শহরগুলো গড়ে তোলা হয়-দজলা, ফোরাত, নীল-এর মতো বিশাল বিশাল নদীও শহর ও সেনাবাহিনীর মাঝে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারেনি।
মসজিদ ছিল শাসকদের কার্যালয়
মসজিদ ছিল শাসক ও জনগণের সমবেত হওয়ার জায়গা। কেননা, নবিজি মসজিদকে তাকওয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাই তাতে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, শিক্ষা কার্যক্রম ও ওয়াজ-নসিহতের মতো ব্যক্তিগত বিষয় যেমন ছিল, তেমনি সেনাপতি, আমির ও গুপ্তচর নির্ধারণের মতো রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ও সমাধা করা হতো। এছাড়াও মুসলিমদের আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ মসজিদে সম্পন্ন হতো। একইভাবে মক্কা, তায়েফ, ইয়ামান ইত্যাদি শহর, সাধারণ জনপদ ও প্রত্যন্ত গ্রামে উমর (রা.)-এর কর্মকর্তাগণ মসজিদে জমায়েত হয়েই রাজনৈতিক কার্যাদি সম্পাদন করতেন। কেননা, রাসূল বলেছেন-
'বনি ইসরাইলদের শাসন করতেন নবিরা। যখনই কোনো নবি ইন্তেকাল করতেন, তাঁর স্থানে অপর একজন নবি আসতেন। আর আমার পরে যেহেতু আর কোনো নবি নেই, তাই আমার পরে খলিফাগণ শাসক হবেন। যাদের কাউকে তোমরা গ্রহণ করবে এবং বর্জন করবে।' সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, 'সে অবস্থায় আপনি আমাদের কী আদেশ করবেন?' রাসূল বললেন- 'তোমরা যে আগে বাইয়াত নেবে, তাঁর হাতেই বাইয়াত গ্রহণ করবে। আর আল্লাহর কাছে তোমাদের হিতকামী শাসকের জন্য দুআ করবে। কারণ, নিশ্চয়ই শাসকগণ অর্পিত দায়িত্ব বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবেন। '৫৯
খলিফা ও আমিরগণ তাঁদের বাসস্থানেই বসবাস করতেন
অপরাপর মুসলিমদের মতো খলিফা ও আমিরগণও নিজ বাসস্থানেই বসবাস করতেন। তবে তাঁদের মজলিশ বসত জামে মসজিদে।
সাদ (রা.)-এর রাজমহল জ্বালানোর হুকুম দিয়েছিলেন উমর (রা.)
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) কুফাতে একটি রাজমহল নির্মাণ করেন এবং বলেন-'আমি সাধারণ মানুষ থেকে দূরে থাকতে চাই।' উমর (রা.) মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাকে তাঁর রাজমহল জ্বালানোর ফরমান দিয়ে পাঠালেন। বলে দিলেন, 'সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) যেন নাবতি কাঠের আঁটি কিনে তাঁর মহল পর্যন্ত নিয়ে যায় এবং মহল জ্বালিয়ে দেন। উমর (রা.) তাঁর শাসক ও জনগণের মাঝে কোনোরূপ অন্তরায় বরদাশত করতেন না। তবুও কয়েকজন আমিরের ব্যক্তিগত প্রাসাদ নির্মিত হয়েছিল!
মুয়াবিয়া (রা.) জনগণ থেকে দূরে থাকতেন
আলি (রা.)-এর ওপর অতর্কিত হামলা হওয়ার পর মুয়াবিয়া (রা.) নিজের ওপর হামলার আশঙ্কা করতেন। তাই মসজিদের এক নিরাপদ প্রকোষ্ঠে তিনি ও তাঁর অমাত্যবর্গ নামাজ আদায় করতেন। বাইরে বের হলে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে বের হতেন। তাঁকে দেখে পরবর্তী রাজতান্ত্রিক খলিফাগণও এই প্রটোকলে উদ্বুদ্ধ হন এবং তাঁকে অনুসরণ করেন। তাঁরা জুমা ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মানুষের সম্মুখে আসতেন এবং নামাজ পড়াতেন। এর বাইরে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া ও হুদুদ কায়েমের সময় তাঁরা জনসম্মুখে আসতেন। এ ছাড়া বাকি সময় তাঁরা মহলে বাস করতেন এবং জনসাধারণ থেকে দূরে থাকতেন। এমনই একটি মহল হলো বনু উমাইয়ার 'আল খাদ্রা' প্রাসাদ-যা জামে মসজিদের সামনে অবস্থিত ছিল।
রাজা ও আমিরদের কেল্লা ও দুর্গ নির্মাণ
সময় যতই অতিবাহিত হতে লাগল, মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি ততই বাড়তে থাকল। প্রতিটি সম্প্রদায় ইসলামের সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরল এবং তাতে নিজেদের মনমতো বাড়াবাড়ি করে অপর সম্প্রদায় থেকে বিমুখ হয়ে গেল। ভুলে গেল ইসলামের ব্যাপকতা ও উদারতার কথা। আমির ও শাসকগণ কেল্লা ও দুর্গ নির্মাণ করতে শুরু করলেন। ইতঃপূর্বেও কেল্লা ও দুর্গ নির্মিত হয়েছে, তবে দেশের সীমানাগুলোতে; যেন শত্রুর হামলা থেকে দেশকে রক্ষা করা যায়।
কেননা, সে যুগে সীমান্তরক্ষী বাহিনী তখনও তৈরি হয়নি। তখন শাম অঞ্চলের সীমান্তকে বলা হতো 'আল আওয়াসিম' অর্থাৎ কিন্নাসরিন ও হালাব (আলেপ্পো)।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খানকাহ ও আস্তাবল নির্মাণ
বিদ্যোৎসাহীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইবাদতকারীদের জন্য খানকাহ এবং তাদের বাহনের জন্য ঘোড়াশাল তৈরি করা হয়। সম্ভবত এর ব্যাপক প্রসার শুরু হয় সেলজুক আমলে। প্রথম দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরাইখানা নির্মাণ করা হয় গরিবদের জন্য। নিজামুল মুলকের সময়ে এসব সরাইখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উপযুক্ত গরিবদের জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং ওয়াকফকৃত সম্পদ থেকে এর ব্যয় নির্বাহ করা হতো। এর আগে সরাইখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেলেও আমার মনে হয় না তা ওয়াকফ ছিল। তবে বিশেষ কিছু স্থাপনা ছিল।
ইমাম ওয়াহিদি (রহ.)-এর ছাত্র ইমাম মামার ইবনে জিয়াদ আখবারুস সুফিয়াহ গ্রন্থে বলেন-'সুফিদের জন্য প্রথম ঘর নির্মাণ করা হয় বসরায়।' তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উল্লেখ সেলজুক আমলের পূর্বেও পাওয়া যায়; হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। আর সেলজুক আমলের সময়কাল হচ্ছে হিজরি পঞ্চম শতাব্দী। অনুরূপভাবে শামের বেশিরভাগ কেল্লা ও দুর্গই নবনির্মিত। যেমনিভাবে আল আদিল দামেশক, বসরা ও হারানে কেল্লা নির্মাণ করেছিলেন। কারণ, খ্রিষ্টানরা তাদের ওপর ক্রমাগতভাবে আক্রমণ করত। তৃতীয় শতকের পর মুসলিমরা সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে খ্রিষ্টানদের প্রতিহত করতে অক্ষম হতে শুরু করে। একপর্যায়ে তারা শামের তীরবর্তী সীমান্তগুলো দখল করে নেয়।
টিকাঃ
৫৩. কুরআনে মূল শব্দ الْحَدِيدَ লোহা রয়েছে, যা দ্বারা রূপক অর্থে তরবারিকে নির্দেশ করে।
৫৪. আবু দাউদ: ৩১০৭, আহমাদ: ৬৬০০
৫৫. তিরমিজি: ২৬১৬, আহমাদ: ২২০১৬, ইবনে মাজাহ : ৩৯৭৩
৫৬. ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মতে-ওপরের আয়াতটিতেও (হুজুরাত: ১৫) ঈমান শব্দ দিয়ে অপরাপর ঈমানি আমলের সাথে সাথে নামাজকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
৫৭. বুখারি: ১৫১৯, মুসলিম: ৮৩
৫৮. বুখারি: ৫২৭
৫৯. প্রাগুক্ত
📄 খিলাফতসংক্রান্ত কিছু ভ্রান্ত আকিদা
কুরআনে খলিফা শব্দের প্রয়োগ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-
وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً
'স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন- নিশ্চয়ই আমি জমিনে আমার প্রতিনিধি প্রেরণ করব।' সূরা বাকারা : ৩০
আল্লাহ আরও বলেন-
يَا دَاوُوُدُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ
'হে দাউদ! আমি তোমাকে জমিনে আমার প্রতিনিধি বানাব। অতএব, মানুষের মাঝে হকভাবে বিচার করো আর প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। তা না হলে সে (প্রবৃত্তি) তোমাকে পথভ্রষ্ট করে ছাড়বে।' সূরা সোয়াদ: ২৬
'আমি জমিনে প্রতিনিধি প্রেরণ করব' কথাটি দ্বারা আদম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের বোঝানো হয়েছে। তবে নাম নিয়েছেন শুধু আদম (আ.)- এর। (আবার কখনো কখনো তাঁর বংশধর বোঝাতে 'মানুষ' শব্দ ব্যবহার করে আদম (আ.)-কেও বক্তব্যের মধ্যে শামিল করা হয়েছে।) যেমন: আল্লাহ বলেন-
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ -
'নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছি।' সূরা তিন: ৪
خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ صَلْصَالٍ كَالْفَخَارِ وَخَلَقَ الْجَانَّ مِنْ مَّارِجٍ مِنْ نَارٍ -
'মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন শুষ্ক ঠনঠনে মাটি থেকে, যা পোড়ামাটির মতো। আর জিনকে সৃষ্টি করেছেন ধোঁয়াহীন অগ্নি থেকে।' সূরা আর-রাহমান: ১৪, ১৫
الَّذِي أَحْسَنَ كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ وَبَدَا خَلْقَ الْإِنْسَانِ مِنْ طِينٍ ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهُ مِنْ سُلَالَةٍ مِّنْ مَّاءٍ مَّهِينٍ
'কাদা হতে তিনি মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। তারপর তিনি তাঁর বংশ উৎপন্ন করেন তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস থেকে।' সূরা আস-সাজদা: ৭-৮
ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ
'তারপর তাকে নুতফারূপে স্থাপন করেছি নিরাপদ স্থানে।' সূরা মুমিনুন: ১৩
হাদিসে খলিফা শব্দের প্রয়োগ
খলিফা অর্থ হলো-যে অপরের স্থলাভিষিক্ত হয় বা যে পেছনে রয়ে যায়। যেমন: রাসূল বলতেন-
اللَّهُمَّ انْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي أَهْلِي
'হে আল্লাহ! আপনি আমার সফরের সঙ্গী। আমি চলে যাওয়ার পর আপনিই আমার পরিবারের নিরাপত্তার "খলিফা”। ৬০
জায়েদ ইবনে খালিদ জুহানি (রহ.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন-
مَنْ جَهَزَ غَازِيًا فَقَدْ غَزَا وَمَنْ خَلَفَهُ فِي أَهْلِهِ فَقَدْ غَزَا -
'যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে কোনো মুজাহিদকে যুদ্ধসাজে সজ্জিত করে দিলো, সেও জিহাদ করল। যে ব্যক্তি কোনো মুজাহিদের অনুপস্থিতিতে তাঁর পরিবারবর্গের দেখাশোনার জন্য তার স্থলাভিষিক্ত হলো, সেও জিহাদ করল। (অর্থাৎ সেও জিহাদকারীর সমান সওয়াব লাভ করবে)। '৬১
أَوْ كُلَّمَا خَرَجْنَا فِي الْغَزْوِ خَلْفَ أَحَدُهُمْ وَلَهُ نَبِيْبٌ كَنَبِيْبِ التَّيْسِ يَمْنَحُ إِحْدَاهُنَ اللَّبَنَةِ مِنَ اللَّبَنِ لَئِنْ أَظْفَرَنِي اللَّهُ بِأَحَدٍ مِنْهُمْ لَاجْعَلْتُهُ نَكَالًا -
'আমরা যখন জিহাদে বের হই, তাদের কেউ পেছনে রয়ে যায় এবং ছাগলের মতো আওয়াজ করে (অর্থাৎ প্রচণ্ড যৌনাকাঙ্ক্ষা দেখা দেয়) এবং মুমিনপত্নীদের অল্প দুধ প্রদান করে (অর্থাৎ ব্যভিচার করে)। আল্লাহ যদি তাদের কাউকে পাকড়াও করার ক্ষমতা আমাকে দান করে, তাহলে তাদের এমন শাস্তি দেবো-যা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।'
একইভাবে কুরআনেও এই শব্দমূল দ্বারা 'পেছনে রয়ে যাওয়া' বোঝানো হয়েছে। যেমন-
سَيَقُولُ لَكَ الْمُخَلَّفُونَ مِنَ الْأَعْرَابِ
'অচিরেই বেদুইনদের যারা পেছনে রয়ে যাবে তারা বলবে...' সূরা ফাতহ: ১১
فَرِحَ الْمُخَلَّفُوْنَ بِمَقْعَدِهِمْ خِلَافَ رَسُولِ اللَّهِ وَكَرِهُوا أَنْ يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
'যাদের পেছনে থেকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তারা আল্লাহর রাসূলের সাথে সহযোগিতা না করার ও ঘরে বসে থাকার জন্য আনন্দিত হলো এবং তারা নিজেদের ধন-প্রাণ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করতে অপছন্দ করল।' সূরা আত-তাওবা: ৮১
খলিফা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে তার পূর্ববর্তীর স্থানে রয়ে গেছে। যেমন: রাসূল -এর ওফাতের পর আবু বকর (রা.) উম্মতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অনুরূপভাবে রাসূল হজ, উমরাহ কিংবা যুদ্ধের জন্য সফরে বের হলে তাঁর স্থানে আরেকজনকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রেখে যেতেন। এভাবে তিনি কখনো ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-কে খলিফা বানিয়েছেন, কখনো-বা অন্য কাউকে। তাবুকের যুদ্ধে খলিফা বানিয়েছিলেন আলি (রা.)-কে।
ইবনে আরাবি (রহ.)-এর একটি ভুল ধারণা
ইবনে আরাবি (রহ.)-এর মতো কতিপয় লোক ধারণা করেছেন, খলিফা আল্লাহর প্রতিনিধি বা আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত। তাঁরা মনে করেন যে, আল্লাহর খলিফা হওয়ার অর্থ হচ্ছে ইনসান আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত। তাঁরা প্রায়শই আদম (আ.)-কে সকল নাম শিক্ষাদানের বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন-'সকল নামের অর্থ মানুষের মধ্যে একত্রিত হয়েছে।' পাশাপাশি তাঁরা 'আদম (আ.)-কে আল্লাহর অবয়বে সৃষ্টি করা হয়েছে'- হাদিসটিকেও একইভাবে ব্যাখ্যা করে থাকেন। কখনো তাঁরা দার্শনিকদের কথাকে নকল করে বলেন-'মানুষ একটি ছোটো দুনিয়া।' এটা মূলত আগের বক্তব্যটিরই প্রতিফলন। শুধু তা-ই নয়; এর সাথে তাঁরা আরও যোগ করে বলেন-'আল্লাহ হলো একটি বড়ো জগৎ।' মূলত তাঁদের বক্তব্যের মূল ভিত্তি হলো তাঁদের 'ওয়াহদাতুল ওজুদ'-এর কুফরি আকিদা। এই মতবাদ অনুসারে স্রষ্টা হলেন সৃষ্টির অস্তিত্বের সারবস্তু বা মূল। তাই ইনসান হলো আল্লাহর প্রকাশ্য খলিফা বা স্থলাভিষিক্ত-যাতে সকল নাম ও গুণের সমাবেশ ঘটেছে। আর এর থেকে তৈরি হয় এমন একটি আকিদা, যা তাঁদের রুবুবিয়্যাত ও ইলাহিয়াতের দাবির প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। পরিশেষে তাঁরা ফেরাউনি কারামেতা ফিরকা ও বাতেনি ফিরকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
কখনো কখনো তাঁরা নবুয়তকে অপরাপর স্তরের মতো সাধারণ একটি স্তর সাব্যস্ত করেন এবং নিজেদের এর চেয়ে মহৎ মনে করেন। আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, ইলাহিয়্যাত ও একত্ববাদকে স্বীকার এবং নবিদের নবুয়তকে মানা সত্ত্বেও তাঁরা ফেরাউনিয়্যাতের অনুসারী। কিংবা তাঁরা মনে করেন, শরিয়তের আদেশ-নিষেধ ও হালাল-হারামের বিধান তাঁদের জন্য প্রযোজ্য নয়। ৬২
আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হওয়াটা সম্ভব নয়
আল্লাহর খলিফা (স্থলাভিষিক্ত) হওয়া জায়েজ নেই। তাই লোকেরা যখন আবু বকর (রা.)-কে বলল-'হে আল্লাহর খলিফা!' তখন তিনি বলেছিলেন-'আমি আল্লাহর খলিফা নই; আমি রাসূল্লালাহ-এর খলিফা। আমার জন্য এটাই অনেক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এর থেকে পবিত্র।'
খলিফা হলেন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও প্রতিনিধি। নবিজি বলেন- 'হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সফরসঙ্গী এবং পরিবারের দেখভালের ক্ষেত্রে আপনি আমাদের প্রতিনিধি। '৬৩
আরেকটি হাদিসেও অনুরূপ এসেছে- 'হে আল্লাহ! সফরে আমাদের সাথে থাকুন আর পরিবারে আমাদের প্রতিনিধি হোন। '৬৪
আল্লাহ হলেন চিরঞ্জীব, সর্বদর্শী, ক্ষমতাবান, রক্ষাকর্তা, তত্ত্বাবধানকারী, শাশ্বত, সমগ্র জগৎ থেকে অমুখাপেক্ষী; তাঁর কোনো শরিক নেই, সহযোগী নেই। তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ কিয়ামতের দিন সুপারিশ করতে পারবে না। আর খলিফা তো তখনই হয়, যখন খলিফা নিয়োগকারীর মৃত্যু বা অনুপস্থিতির কারণ দেখা দেয় অথবা খলিফার প্রয়োজন তখনই দেখা দেয়, যখন খলিফা নিয়োগকারীর খলিফা বানানোর প্রয়োজন পড়ে। এমনকী তাকে 'খলিফা' বলাও হয় এই কারণে যে, সে যুদ্ধে না গিয়ে বাসস্থানে রয়ে গেছে।
খলিফার এই প্রতিটি গুণই আল্লাহর শানে অনুপস্থিত। তিনি এসব থেকে পবিত্র। কারণ, তিনি চিরঞ্জীব, শাশ্বত ও সর্বদর্শী। তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অনুপস্থিতও হন না। তিনি অমুখাপেক্ষী। তিনি রিজিক দেন, রিজিক গ্রহণ করেন না। তিনি তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেন। পথ দেখান। সুস্থতা দান করেন তাঁর সৃষ্ট উপকরণের মাধ্যমে। তিনিই হলেন প্রশংসিত, অমুখাপেক্ষী। আসমান ও জমিন এবং এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে, সবকিছুর মালিক তিনি।
وَهُوَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ إِلهُ وَفِي الْأَرْضِ الهُ
'তিনি আসমানেও ইলাহ, জমিনেও ইলাহ।' সূরা জুখরুফ: ৮৪
আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর সমকক্ষ ও প্রতিপক্ষ কেউ নেই। তাই যে লোক তাঁর স্থলাভিষিক্ত কাউকে বানাবে, সে মুশরিক। ৬৫
ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর ছায়া শাসক
এখানে একটি প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে। হাদিসে এসেছে-
'সুলতান হলেন জমিনে আল্লাহর ছায়া; যেখানে আশ্রয় নেয় দুর্বল ও দুস্থ লোকেরা। '৬৬
ছায়া তো আশ্রয়প্রার্থীর মুখাপেক্ষী, সঙ্গী ও একপ্রকার অনুগামীও বটে। আর আশ্রয়প্রার্থীও ছায়ার মুখাপেক্ষী। ছায়া তাকে ঘিরে থাকায় সেও ছায়ার সঙ্গী। ৬৭ সুলতান আল্লাহর বান্দা। আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী। এক মুহূর্তের জন্যও সে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা ত্যাগ করতে পারবে না। আল্লাহর কাছেই যাবতীয় ক্ষমতা, শক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ, সাহায্য ইত্যাদি বিষয়ের মর্যাদা ও নিরপেক্ষ গুণ রয়েছে-যার ওপর ভিত্তি করে সমগ্র সৃষ্টি দণ্ডায়মান এবং আল্লাহর ছায়ার সাদৃশ্য লাভ করেছে। আল্লাহর সৃষ্টি ও বান্দাদের জীবনকে সংশোধিত করার সবচেয়ে মজবুত মাধ্যম হচ্ছে শাসক। ক্ষমতাসীন শাসক যদি দুরস্ত হয়ে যায়, তাহলে জনগণের অবস্থাও দুরস্ত হয়ে যাবে। আর সে নষ্ট হলে তার কারণে এবং তার বিপথগামিতা অনুসরণ করে জনগণও নষ্ট ও বিপথগামী হবে।
তবে সে পুরোপুরি নষ্ট হতে পারবে না। তার মধ্যে কিছুটা কল্যাণের নিদর্শন অবশিষ্ট থাকা আবশ্যক। কারণ, সে আল্লাহর ছায়া। ছায়া কখনো সম্পূর্ণ রোদমুক্ত করে (কষ্ট লাঘব করে) আবার কখনো আংশিক কষ্ট লাঘব করে। আর যদি স্বয়ং ছায়াটিই না থাকে, তাহলে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলাই ধসে পড়বে। রাষ্ট্রের কাঠামোই অবশিষ্ট থাকবে না। অনেকটা রুবুবিয়্যাতের গূঢ়তত্ত্ব হারিয়ে যাওয়ার মতো, যার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্ব।
আবু বকর (রা.)-এর খলিফা হওয়ার প্রমাণ
আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত কি মুসলিমদের মনোনয়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, নাকি রাসূল -এর কোনো প্রচ্ছন্ন কিংবা অপ্রচ্ছন্ন হাদিস দ্বারা হয়েছিল? এ বিষয়ে ইমাম কাজি আবু ইয়ালাসহ আমাদের হাম্বলি মাজহাবের অন্যান্য ইমামগণ আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত সম্পর্কে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) থেকে দুটি মত বর্ণনা করেছেন-
১. ‘আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিমদের মনোনয়নের ভিত্তিতে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিম, ফুকাহা ও হাদিস বিশারদগণ এমনটিই মনে করেন; এমনকী মুতাজিলা ও আশআরিদের মতো কিছু মুতাকাল্লিমিনও এই মত পোষণ করেন।
২. আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাসূল -এর ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যের ভিত্তিতে। এ বক্তব্যের পক্ষে মত দিয়েছেন হাদিস বিশারদদের কয়েকটি দল এবং কতিপয় মুতাকাল্লিমিন। হাসান বসরি (রহ.) থেকেও এমন একটি মতামত পাওয়া যায়। রাসূল -এর বক্তব্যের মাধ্যমে তাঁর খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে যারা মনে করেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন-প্রত্যক্ষ বক্তব্য দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ স্পষ্ট বক্তব্যের ভিত্তিতেই আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত প্রমাণিত হয়েছে।’
খিলাফত নিয়ে কতিপয় গোষ্ঠীর ভ্রান্ত আকিদা
ইমমিয়ারা বলে-অপ্রচ্ছন্ন বা স্পষ্ট বক্তব্য দ্বারা আলি (রা.)-এর খিলাফত প্রমাণিত। জাইদিয়্যা, জারুদিয়া ফেরকার লোকেরা মনে করে, এটা আলি (রা.)-এর ব্যাপারে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত। আর রাওয়ান্দিয়ারা মনে করে, আব্বাস (রা.)-এর খিলাফত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
মূলত ইসলামের বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞজনদের কাছে এ জাতীয় বক্তব্যগুলোর অসারতা সুস্পষ্ট। এসব মতকে যারা বিশ্বাস করে-তারা হয়তো মূর্খ, নয়তো জালিম। এসব যারা বিশ্বাস করে, তাদের অধিকাংশই জিন্দিক।
আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক মূল্যায়নটি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর কথাকেই পোক্ত করে। বাস্তব কথা হলো-
'আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত প্রতিষ্ঠা হয়েছে সাহাবিদের মনোনয়ন এবং তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণের মাধ্যমে। রাসূল তাঁর খিলাফত সম্পর্কে প্রশংসা ও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর আনুগত্যের এবং শাসনভার তাঁর ওপর ন্যস্ত করার আদেশ দিয়েছেন। রাসূল উম্মতকে আবু বকর (রা.)-এর হাতে বাইয়াতের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।'
হাদিসে আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের প্রমাণ
মোটকথা রাসূলের বক্তব্যে আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের পক্ষে তিন ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়-
১. সমর্থনমূলক
২. আদেশ বা হুকুমমূলক
৩. দিকনির্দেশনামূলক
সমর্থনমূলক বক্তব্য: যেমন, রাসূল বলেছেন-
'আমি স্বপ্নে দেখেছি, একটি কাঁচা কুয়া থেকে আমি পানি তুলছি। তারপর ইবনে আবি কুহাফা (আবু বকর রা.) এলো এবং এক বালতি অথবা দুই বালতি ভরপুর পানি তুলল। '৬৮
অপর একটি হাদিসে এসেছে, এক সাহাবি বলেন-
'আমি স্বপ্নে একটি দাঁড়িপাল্লা আকাশ থেকে নামতে দেখেছি। তারপর তা দিয়ে আপনাকে (রাসূল -কে) ও আবু বকরকে পরিমাপ করা হলে আপনার পাল্লা ভারী হয়ে যায়। তারপর আবু বকর ও উমর (রা.)-কে পরিমাপ করা হলে আবু বকর (রা.)-এর পাল্লা ভারী হয়। '৬৯
আরেকটি হাদিস আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
'মৃত্যুশয্যায় রাসূল আমাকে বলেন-“তোমার বাবা ও ভাইকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি একটা ফরমান লিখে দিই-যাতে আমার পর আর কোনো বিবাদ না হয়।" তারপর নবিজি বলেন-“আল্লাহ আবু বকরকে ছাড়া আর কাউকে গ্রহণ করবেন না; এমনকী মুমিনরাও আর কাউকে মানবে না।"'৭০
অন্য একটি হাদিসে এসেছে-
'এক সৎ লোক স্বপ্নে দেখেছেন, আবু বকর (রা.) রাসূল- এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। '৭১
'নবুয়তি খিলাফত ৩০ বছর। তারপর রাজতন্ত্র কায়েম হবে।' তো এসব হাদিস দ্বারা বুঝে আসে, আল্লাহ আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতকে গ্রহণ করেছেন, সর্মথন করেছেন এবং মুমিনরাও তাঁর খিলাফতকে মেনে নেবেন।
আদেশমূলক বক্তব্য: যেমন-
'আমার পরবর্তী দুজন তথা আবু বকর ও উমরকে মান্য করো।' 'আমার পর তোমরা আমার সুন্নাহ ও সুপথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহ আঁকড়ে থাকো।' রাসূল-কে একবার এক মহিলা জিজ্ঞেস করল- 'আমরা যদি আপনাকে না পাই, কাকে মেনে চলব?' রাসূল বললেন- 'তাহলে আবু বকরকে মানো। '৭২
নির্দেশনামূলক বক্তব্য: যেমন- রাসূল আবু বকর (রা.)-কে নামাজের ইমামতির অনুমোদন দিয়েছেন। এ ছাড়াও রাসূল বলেছেন-
'আবু বকরের দরজাটি ছাড়া তোমাদের বাড়ির যেসব দরজা মসজিদের ভেতরমুখী রয়েছে, তা বন্ধ করে দাও।'৭৩
এসব ছাড়াও তাঁর আরও বহু গুণ, বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।
কুরআনে আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের প্রমাণ
মূলত রাসূল-এর সুন্নাহ থেকে এতক্ষণ যেসব প্রমাণ আমরা হাজির করলাম, তার প্রত্যেকটিই কুরআন দ্বারা সমর্থিত। অর্থাৎ অনুরূপভাবে পবিত্র কুরআনেও আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের সপক্ষে তিন ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়।
সমর্থনমূলক বক্তব্য যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ
'তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে এবং সৎকাজ করবে, তাদেরকে আল্লাহ নিশ্চয়ই খলিফা মনোনীত করবেন।' সূরা নুর: ৫৫
আল্লাহ আরও বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يَحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَه
'হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্য হতে যে ধর্মত্যাগ করবে, (তাদের স্থলে) নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায়কে প্রতিস্থাপিত করবেন, যারা আল্লাহকে ভালোবাসবেন এবং আল্লাহও তাদের ভালোবাসবেন।' ৭৪ সূরা মায়েদা: ৫৪
وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ
'অচিরেই আল্লাহ কৃতজ্ঞচিত্তদের প্রতিদান দেবেন।' সূরা ইমরান: ১৪৪
আদেশমূলক বক্তব্য
আল্লাহ বলেন-
لِلْمُخَلَّفِينَ مِنَ الْأَعْرَابِ سَتُدْعَوْنَ إِلَى قَوْمٍ أُولِي بَأْسٍ شَدِيدٍ تُقَاتِلُونَهُمْ أَوْ يُسْلِمُونَ
'পেছনে পড়ে থাকা বেদুইনদের বলো, অচিরেই তোমাদের এমন এক বিপুল শক্তিধর সম্প্রদায়ের বিপক্ষে যুদ্ধে ডাকা হবে, যাদের সাথে তোমরা যুদ্ধ করবে অথবা তারা আত্মসমর্পণ করবে।' সূরা ফাতহ : ১৬
নির্দেশনামূলক বক্তব্য
যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى
'নিশ্চয়ই অধিক পরহেজগার ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে।' সূরা লাইল: ১৭
'নবি ও সিদ্দিকগণ।'৭৫ 'আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী'৭৬ ইত্যাদি আয়াতে আবু বকর (রা.)-এর খলিফা হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
অতএব, আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত হয়ে গেল; যদিও তাঁর খিলাফতটি নিছক ইজমা দ্বারাই সাব্যস্ত হতে পারত। যেমন: আল্লাহ যদি কোনো ব্যক্তির বিয়ের অভিভাবক (ওলি) হওয়ার আদেশ দেন অথবা কাউকে বিয়ে করানোর জন্য আদেশ দেন কিংবা এর সাথে আরও অনেক কাজের আদেশ দেন, তাহলে তো সেই আদেশ বাস্তবায়নের স্বার্থে ওলি হওয়ার চুক্তি অথবা বিয়ের চুক্তি বিদ্যমান থাকাটা আবশ্যক। আর কুরআন ও সুন্নাহ এই চুক্তির আদেশকেই প্রমাণিত করেছে এবং তাঁর প্রতি আল্লাহর ভালোবাসাকে সাব্যস্ত করেছে। তাই কুরআন ও সুন্নাহ এটাই বলছে যে, জনসাধারণের ওপর আবু বকর (রা.)-কে মনোনীত করাটা আবশ্যক এবং তাঁরা এ ব্যাপারে আদিষ্ট। কাজেই এই আদেশ পালন না করে কোনো গত্যন্তর নেই। তাঁরা আল্লাহর আদেশকে মান্য করে আবু বকর (রা.)-কে মনোনীত করার মাধ্যমে নিজেদের সর্বোত্তম কাজটি করেছেন এবং নিজেদের মর্যাদাকে বুলন্দ করেছেন।
টিকাঃ
৬০. মুসলিম: ১৩৪২
৬১. মুসলিম: ১৬৯২
৬২. এখানে পাঠকদের সুবিধার জন্য কিছু কথা বলে নেওয়া একান্তই জরুরি মনে করি। আবুল হাসান আলি নদভি (রহ.) বলেন, শাইখে আকবর ইবনে আরাবি (৫৫৮-৬৩৮ হি.) (রহ.)-এর কিতাবাদি ও তাঁর ইলম সম্পর্কে যারা গবেষণা করেন, তাঁদের একটি দল মনে করেন-তাঁর কিতাবাদি, বিশেষত ফুসুসুল হিকাম ব্যাপক বিকৃতির শিকার হয়েছে। শাইখের ভক্ত ও তাঁর জ্ঞানের ধারক-বাহক দামেশকের শাইখ আহমাদ আল হারুন আল আসাল দৃঢ়তার সাথে বলতেন, ফুসুসুল হিকামের এক-তৃতীয়াংশ কিংবা তারও অধিক বানোয়াট ও ভিত্তিহীন তথা মূলপাঠের সাথে সম্পর্কহীন। - (তারিখে দাওয়াত ওয়া আজিমাত-২/৭০। মূল উর্দু কিতাব দ্রষ্টব্য।)
শাইখে আকবর ইবনে আরাবি (রহ.)-এর সবচে' কড়া সমালোচকদের অন্যতম একজন হিসেবে মনে করা হয় ইমামে রাব্বানি মুজাদ্দিদে আলফে সানি (১৫৬৪- ১৬২৪ খ্রি. রহ.)-কে। তা সত্ত্বেও তিনি তার মাকতুবাতে বলেন, 'অধম ইবনে আরাবি (রহ.)-কে আল্লাহর মকবুল বান্দা মনে করি। ...লোকেরা তার বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়িতে লিপ্ত। তার ভক্ত ও বিদ্বেষীরা কেউ-ই ভারসাম্যতার ধারেকাছে নেই। ... অধম এক্ষেত্রে মধ্যবর্তী মতকে গ্রহণ করি। ওয়াহদাতুল ওজুদের মন্দকে বাদ দিয়ে ভালোকে গ্রহণ করি। ... মূলত ওয়াহদাতুল ওজুদ হলো আত্মশুদ্ধি চর্চার একটি স্তর। এর পরবর্তী স্তর হলো 'ওয়াহদাতুশ-শুহুদ'।' (মাকতুবাতে আলফে সানি রহ.-এর বরাতে আবুল হাসান আলি নদভি, তারিখে দাওয়াত ওয়া আজিমাত: ৪/২৯৪,২৯৫)
ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি রহ. (১৭০৩-১৭৬২ খ্রি.) ওয়াহদাতুল ওজুদের সমর্থক ছিলেন। তিনি তার বাবা শাহ আব্দুর রহিম মুহাদ্দিসে দেহলবি (১৬৪৪- ১৭১৯ খ্রি) সম্পর্কে আনফাসুল আরিফিনে লিখেন, 'আমার বাবা শাইখে আকবর ইমাম মুহিউদ্দীন ইবনে আরাবি রহ.-কে অনেক শ্রদ্ধা করতেন। তিনি বলতেন, "আমি চাইলে ফুসুসুল হিকাম-এর (ইবনে আরাবি রহ.-এর সর্বাধিক আলোচিত গ্রন্থগুলোর অন্যতম) সকল মাসাইলকে কুরআন ও হাদিসের আলোকে বর্ণনা করে প্রমাণ করে দিতে পারি এবং তা এমনভাবে করব, এরপর কারও সন্দেহ বাকি থাকবে না।" এরপর শাহ সাহেব (রহ.) লিখেন, 'তা সত্ত্বেও আমার বাবা ওয়াহদাতুল ওজুদ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করা থেকে বিরত থাকতেন। কারণ, এই যুগের অধিকাংশ মানুষ ওয়াহদাতুল ওজুদকে বোঝার যোগ্যতা রাখে না।
আর না বোঝার কারণে তারা ইলহাদ (ধর্মহীনতা) ও নাস্তিকতার ফাঁদে পড়ে যায়।' (আনফাসুল আরিফিন, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি রহ., ১৮৯ পৃ.)
শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) তাঁর পিতা শাহ আব্দুর রহিম (রহ.)-এর চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েই ইবনে আরাবি রহ.-এর ওয়াহদাতুল ওজুদ ও ইমামে রাব্বানি মুজাদ্দিদে আলফে সানি রহ.-এর 'ওয়াহদাতুশ শুহুদ'-এর মাঝে অপূর্ব সমন্বয় স্থাপন করেন। (আবুল হাসান আলি নদভি, তারিখে দাওয়া ওয়া আজিমাত ৫/৮৪)
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) থেকেও ইবনুল আরাবি সম্পর্কে কিছু ইতিবাচক মূল্যায়ন পাওয়া যায়। যেমন: ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, 'এদের মধ্যে ইবনে আরাবি ইসলামের সবচেয়ে নিকটবর্তী। তাঁর কথাবার্তা অনেক স্থানেই তুলনামূলক ভালো। আর তা এই জন্য যে, তিনি আদেশ-নিষেধ ও শরিয়তের বিধানাবলিকে যথাস্থানে রেখে চলেন। তাসাউফের শাইখগণ যে আখলাক অবলম্বন করেন এবং যেসব ইবাদত পালনের তাগিদ দিয়েছেন, তিনি তা গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। এজন্য অনেক সুফি ও পরহেজগার লোক তাঁর থেকে তাসাওউফের শিক্ষা নিয়ে থাকেন। যদিও তারা তাঁর কথার তাৎপর্য যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। তবে যারা তাঁর কথার সঠিক তাৎপর্য বুঝে তাঁর সাথে একমত হয়, তাদের কাছে তাঁর কথার প্রকৃত মর্ম খুবই পরিষ্কার।' (জালাউল আইনাইনের বরাতে আবুল হাসান আলি নদভি, তারিখে দাওয়াত ওয়া আজিমাত-৪/২৭৮)
৬৩. মুসলিম: ১৩৪২
৬৪. সুনানে তিরমিজি: ৩৪৪৭
৬৫. 'স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বলেন, আমি জমিনে খলিফা বানাব (সূরা বাকারা: ৩০)।' ইমাম তাবারি (রহ.) এই আয়াতে 'খলিফা' শব্দের ব্যাখ্যায় ইবনে মাসউদ ও ইবনে আব্বাস (রা.)-এর একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করে বলেন-'এর অর্থ হলো, দুনিয়াতে আল্লাহর পক্ষ হয়ে আল্লাহর হুকুম কায়েম করা।' কুরআন শরিফের আরেকটি আয়াতেও এই ব্যাখ্যাটির সমর্থন পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন-'হে দাউদ! আমি তোমাকে খলিফা বানিয়েছি। সুতরাং মানুষের মাঝে হকভাবে বিচার করো এবং প্রবৃত্তিতাড়িত হয়ো না।' সূরা সোয়াদ: ২৬ মোটকথা, 'আল্লাহর খলিফা হওয়া'-বিষয়ক যে মতটি ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এখানে উল্লেখ করেছেন, তার বিপরীত ভিন্ন একটি মতামতও সালাফ থেকে বর্ণিত আছে। তবে যে অর্থ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) করেছেন, সেই অর্থে মানুষ আল্লাহর খলিফা হতে পারে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কুরআনে যেই অর্থে মানুষকে তাঁর খলিফা বলেছেন, সেই অর্থে মানুষ অবশ্যই আল্লাহর খলিফা-অনুবাদক
৬৬. বাজ্জার: ৫৩৮৩, কানজুল উম্মাল: ৬/৪-৫ (হাদিসটি সহিহ)
৬৭. ছায়া তখনই গুরুত্বপূর্ণ হবে, যখন তার কাছে আশ্রয় নেওয়ার কেউ থাকবে। তাই ছায়া ছায়াগ্রহীতার মুখাপেক্ষী। - অনুবাদক
৬৮. বুখারি: ৩৬৮২, মুসলিম: ২৩৯৩
৬৯. আবু দাউদ: ৪৬৩৪, তিরমিজি: ২২৮৭
৭০. বুখারি: ৫৬৬৬, মুসলিম: ২৩৮৭
৭১. আবু দাউদ: ৪৬৩৬, আহমাদ: ১৪৮২১
৭২. বুখারি: ৭৩৬০
৭৩. বুখারি: ৪৬৭
৭৪. এই আয়াতে বর্ণিত 'রিদ্দাহ' যেন আবু বকর (রা.)-এর সময়কার ধর্মান্তরণের ফিতনার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেটাকে আবু বকর (রা.) কঠোর হাতে দমন করেছিলেন। এখানে ধর্মত্যাগীদের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে যার কথা বলা হচ্ছে, তিনি খলিফা আবু বকর (রা.) ও সাহাবিগণ।
৭৫. সূরা নিসা: ৬৯
৭৬. সূরা তাওবা: ১০০
📄 সাহাবিদের পারস্পরিক যুদ্ধের ইতিহাস এবং আহলে সুন্নাহর অভিমত
সাহাবিদের পারস্পরিক যুদ্ধ সর্ম্পকে ভ্রান্ত ধারণাসমূহ
খারেজিরা আলি (রা.) এবং যারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, তাদের সবাইকে কাফির মনে করে। আর রাফেজিরা মনে করে-যারা আলি (রা.)-এর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, তারা কাফির। অথচ রাসূল থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রাসূল তাদের মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং কাফির না বলার আদেশ দিয়েছেন।
আয়িশা (রা.), জুবাইর (রা.) ও তালহা (রা.)-এর যুদ্ধের ব্যাপারে ভ্রান্ত আকিদার অনুসারীদের তিন রকমের মতামত পাওয়া যায়। একদল মনে করে, যুদ্ধকারী উভয়পক্ষের একপক্ষ ফাসিক; সবাই না। এ দলে আছে আমর ইবনে উবাইদ ও তাঁর অনুসারীগণ।
আরেক দল মনে করে-যে দল যুদ্ধ বাধিয়েছে, তারা ফাসিক। তবে কেউ যদি তওবা করে, তাহলে সে ফাসিক হবে না। তারা মনে করে, আয়িশা (রা.), জুবায়ের (রা.) ও তালহা (রা.) তওবা করেছিলেন। এটাই তাঁদের জমহুর তথা আবুল হুজাইল ও তাঁর অনুসারী এবং আবুল হুসাইন প্রমুখের বক্তব্যের সারবস্তু।
আরেকদল মনে করে, জুবায়ের (রা.) ও তালহা (রা.)-এর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়াটা ভুল ছিল। তবে শামবাসীদের সাথে যুদ্ধটাকে তাঁরা ভুল সিদ্ধান্ত মনে করে না।
মোটকথা, খারেজি রাফেজি ও মুতাজিলারা মুসলমানদের পারস্পরিক যুদ্ধকে কুফর ও ফাসিকির কারণ মনে করে।
সাহাবিদের পারস্পরিক লড়াই সম্পর্কে আহলে সুন্নাহর অভিমত
আহলে সুন্নাহর সবাই সাহাবিদের 'আদালত' তথা ন্যায়নিষ্ঠতায় বিশ্বাসী। তবে সাহাবিদের ভেতর কার ইজতিহাদ সঠিক বা ভুল ছিল-এ নিয়ে বিভিন্ন মাজহাবের ইমামের বিভিন্ন মতামত রয়েছে।
প্রথমপক্ষ মনে করে, আলি (রা.)-এর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।
দ্বিতীয়পক্ষ মনে করে, সবার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল।
তৃতীয়পক্ষ মনে করে, সবার মত সঠিক নয়; কোনো একটি দলের মত সঠিক।
চতুর্থপক্ষ মনে করে, তাঁদের ভেতরকার বিবাদকে মোটেই গ্রহণ করা যাবে না; অর্থাৎ এ বিষয়ে আলোচনা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এটা সর্বজনবিদিত যে, আলি (রা.) ও তাঁর অনুসারীগণ সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী ছিলেন। যেমনটা আবু সাইদ (রা.)-এর হাদিসে এসেছে-
'একদল ইসলাম থেকে একসময় বের হয়ে যাবে। তাদের এমন একটি দল হত্যা করবে, যারা সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী। ৭৭
এই হাদিসটি মূলত শামবাসীদের সাথে যুদ্ধবিষয়ক। এ ছাড়া আরও বহু হাদিস এটাই প্রমাণ করছে যে, জঙ্গে জামাল মূলত একপ্রকার 'ফিতনা' ছিল। আর ফিতনার সময় যুদ্ধ এড়িয়ে চলাটাই উত্তম। এই মতামতটিই ইমাম আহমদ (রহ.) সহ অধিকাংশ আহলে সুন্নাহর বক্তব্য দ্বারা সমর্থিত। এই ঘটনার পর উম্মতের মধ্যে দিন ও দুনিয়ার বিষয়ে যত বিবাদ হয়েছে, তার মূল হলো-মানুষের কথা ও অসংযত কাজ (মুখ ও হাত)। এখান থেকে প্রতিটি বুদ্ধিমান লোকের শিক্ষা নেওয়া উচিত। ফিতনার সময় যুদ্ধ-সংঘাত এড়িয়ে চলাটাই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মাজহাব বা আমল।
মুসলিমদের পারস্পরিক লড়াইয়ে নিহত ব্যক্তি কি জান্নাতি
মুসলিমদের দুটি দল যদি একটির ওপর আরেকটি হামলা করে। যাদের ওপর হামলা চালানো হয়, তারা যদি পরাজিত হয় এবং পরাজয়ের পর তাদের হত্যা করা হয়, তাহলে পরাজিত দলটির নিহত লোকদের কি জাহান্নামি বলা যাবে? তারা কি রাসূলের হাদিস '(মুসলিমদের পারস্পরিক লড়াইয়ে) হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামে যাবে'-এর অন্তর্ভুক্ত হবে? আর পরাজিতদের মধ্যে যারা জীবিত রয়ে যাবে, তারা কি যুদ্ধে নিহত লোকদের মতোই জাহান্নামি হবে?
যদি পরাজিত লোকটি হারাম যুদ্ধ থেকে তওবার নিয়্যাতে পরাজিত হয়, তাহলে তাকে জাহান্নামি বলা যাবে না। কেননা, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং গুনাহ মাফ করেন। তবে যদি তার পরাজয়টা নিছক অক্ষমতার দরুন হয়; তথা সুযোগ পেলে সে অবশ্যই তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করত, তাহলে অবশ্যই সে জাহান্নামে যাবে। যেমন: রাসূল বলেছেন-
'যখন দুজন মুসলিম তরবারিসমেত ময়দানে মিলিত হয়, তখন হত্যাকারী ও হত্যাকৃত উভয় ব্যক্তিই জাহান্নামে যাবে।' বলা হলো-'হে রাসূল! হত্যাকারীর বিষয়টা বোধগম্য, তবে হত্যাকৃত বা নিহত ব্যক্তির জাহান্নামে যাওয়াটা বোধগম্য নয়।' রাসূল বললেন-'নিশ্চয়ই সেও হত্যার ইচ্ছাতেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল।'৭৮
তাই নিহত ব্যক্তি যেহেতু জাহান্নামে যাবে, সেহেতু পরাজিত লোকটির জাহান্নামে যাওয়াটাও সুস্পষ্ট। কেননা, বিজয়ী-পরাজিত উভয়েরই ইচ্ছা ও কাজ একই ছিল। তা ছাড়া নিহত ব্যক্তিটির ওপর মৃত্যুর যে দুর্বিপাক নেমে এলো, তা পরাজিত ব্যক্তিটিকে ভোগ করতে হয়নি। (কারণ, সে জীবিত ও অক্ষত অবস্থাতেই পরাজয় বরণ করেছে)। তাই এই মৃত্যুর দুর্বিপাক যেহেতু নিহত ব্যক্তিটির পাপ মোচন করতে পারেনি বা তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করতে পারেনি, তাহলে সামান্য পরাজয়ের দুর্বিপাক বা গ্লানি তার মুসলিম ভাইকে হত্যায় অবতীর্ণ হওয়ার মতো জঘন্য পাপকে কী করে মোচন করবে? বরং তা কখনোই সম্ভব না। উপরন্তু পরাজিত ব্যক্তিটি যদি এরূপ যুদ্ধে অবিচল থাকে, তাহলে তার পাপ ময়দানে নিহত ব্যক্তিটির অপেক্ষায় নিঃসন্দেহে গুরুতর হবে এবং এ কারণে সে জাহান্নামে যাওয়ার অধিক হকদার। কারণ, যে লোকটি ময়দানে মারা গেল, তার পাপ তো মৃত্যুর সাথেই বন্ধ হয়ে গেল। পক্ষান্তরে অন্য লোকটি তওবা না করে তার এই জঘন্য পাপে অবিচল রইল।
এজন্যই ফুকাহাদের একটি দল বলেন-যদি এই সব স্বেচ্ছাচারী পরাজিত ব্যক্তিদের পুনর্বার সংগঠিত হয়ে আক্রমণ করার ক্ষমতা থাকে বা সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তাদের সবাইকে হত্যা করা হবে। তবে যে পরাজিত ব্যক্তি আঘাতের দরুন দুর্বল হয়ে গেছে, তার কথা ভিন্ন। কারণ, তার পুনরায় হামলা করার শক্তি নেই।
উল্লেখ্য, নিহত ব্যক্তি সম্পর্কে কথিত আছে-সে জাহান্নামি হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর কারণে হয়তো তার আজাব কমতে পারে। আর পরাজয়ের গ্লানি অপেক্ষা মৃত্যু গুরুতর। অতএব এটা সুস্পষ্ট যে, পরাজিত ব্যক্তিটি যদি তওবা না করে তার ভাইয়ের হত্যায় অবিচল থাকে, তাহলে সে নিহত ব্যক্তিটির চেয়ে জঘন্যতম। তবে সে তওবা করলে অবশ্যই আল্লাহ তার প্রতি দয়া ও মাফ করবেন।
বাগি ও খারেজি কি অভিন্ন
বাগি ও খারেজি কি সমার্থক, নাকি এ দুটোতে পার্থক্য আছে? শরিয়ত কি এই দুই দলের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন বিধান আরোপ করেছে, নাকি একই? আর কেউ যদি দাবি করে-ইমামরা এক্ষেত্রে একমত (ইজমা) যে, এদের বিধান একই; পার্থক্য শুধু নামে। অপরপক্ষে কেউ যদি এর বিরোধিতা করে বলে যে, আলি (রা.) শাম ও নাহরাওয়ানের অধিবাসীদের মধ্যে পার্থক্য করেছেন, তাহলে কোনটা সঠিক হবে?
প্রথমত, 'এই দুই দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; স্রেফ নামের পার্থক্য'-কথাটি মোটেও ইমামদের ইজমা (সর্বসম্মতি) দ্বারা সমর্থিত নয়। এটা সম্পূর্ণ ভুল। মূলত বাগিদের বিষয়ে অনেক গবেষকদের মতো হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি, হাম্বলিসহ অন্যান্য মাজহাবের একদল আলিমও মনে করেন, এই দুই দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাঁরা মনে করেন- আবু বকর (রা.) জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করেছিলেন, তা ছিল 'বাগিদের' বিরুদ্ধে যুদ্ধ। খারেজিদের বিরুদ্ধে আলি (রা.)-এর যুদ্ধও এই পর্যায়ের। এমনকী তাঁরা মনে করেন, জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফিনসহ যত যুদ্ধ মুসলিম নামধেয় সম্প্রদায়ের সাথে হয়েছে, সবই ছিল বাগিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এর পাশাপাশি তাঁরা এও বিশ্বাস করেন যে, তালহা (রা.), জুবায়ের (রা.) এবং তাঁদের সমমনা সাহাবিরা সকলেই সত্যের ওপর আছেন। তাঁদের কাউকেই কাফির বা ফাসিক বলা যাবে না। কেননা, তাঁরা সকলেই মুজতাহিদ ছিলেন। আর একজন মুজতাহিদের মতের ক্ষেত্রে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ দুটোরই সম্ভাবনা থাকে। ভুল হলে তা ক্ষমাযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তাই তাঁরা ব্যাপকভাবে বলে দেন, বাগিরা ফাসিক নন।
কথা হচ্ছে-যখন তাঁরা উভয় দলকে অভিন্ন মনে করেন, তখন অনিবার্যভাবেই খারেজি এবং যেসব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহাবিরা সত্যের ওপর থেকে ইজতিহাদ করে যুদ্ধ করেছেন, উভয়েই এক কাতারে শামিল হয়ে যায়। তাই একদল বাগিদের ফাসিক বলেছেন। তবে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদা হলো-সাহাবিগণ সত্যনিষ্ঠ। আদালাত বা বিশ্বাসযোগ্যতায় তাঁরা সর্বজনস্বীকৃত।
জমহুরের মতামত
জমহুর বা সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামগণ খারেজি বাগিদের, জঙ্গে জামাল-জঙ্গে সিফফিনের অংশগ্রহণকারী 'বাগিদের' এবং তারা ব্যতীত অন্য বাগি তথা যাদের ব্যাখ্যা সাপেক্ষে বাগি বলা হয়, তাদের মাঝে পার্থক্য করে থাকেন। সাহাবিদের এটাই প্রসিদ্ধ মত। জমহুর মুহাদ্দিসিন, ফুকাহা মুতাকাল্লিমিন এবং ইমাম মালেক, শাফেয়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ বহু ইমাম এবং তাঁদের অনুসারীগণও এই মতটিকেই গ্রহণ করেছেন।
খারেজিদের হত্যা করা যাবে কি
সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল বলেছেন-
'একটি দল ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে, যখন মুসলিমদের দুটি দলের মধ্যে অধিক সত্যনিষ্ঠ দলটি তাদের হত্যা করবে।'৭৯
এই হাদিসটি তিনটি দলের কথা বলছে। ইসলাম থেকে বের হবে তৃতীয় দলটি। যে দলটি যুদ্ধরত মুসলিম দুটি দল থেকে ভিন্ন আরেকটি দল। সে দুটি দলের একটি হলো মুয়াবিয়া (রা.)-এর এবং অপরটি আলি (রা.)-এর। আর আলি (রা.)-এর দলটিই হলো অধিক সত্যনিষ্ঠ।
খারেজিদের সম্পর্কে আরেকটি হাদিসে এসেছে—
‘তোমাদের মধ্যে এমন লোক হবে, যারা তোমাদের সাথে নামাজ-রোজা আদায় করা এবং কুরআন তিলাওয়াত করাকে অপমানজনক মনে করবে। কুরআন তাদের গলা দিয়ে নামবে না। তির যেভাবে ধনুক থেকে বের হয়, ইসলাম থেকে তারা সেভাবে বের হয়ে যাবে। তাদের তোমরা যেখানেই পাবে হত্যা করবে। কেননা, যারা তাদের হত্যা করবে, তারা কিয়ামতের দিন এই হত্যার জন্য আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাবে।’৮০
অন্যত্র এসেছে—
‘যারা খারেজিদের হত্যা করবে, তারা যদি নবির কৃত প্রতিশ্রুতির কথা জানত, তাহলে তারা এই আমল (হত্যা) থেকে বিরত থাকত না; এ কাজেই নিরত থাকত। ’৮১
ইমাম মুসলিম (রহ.) খারেজিদের বিষয়ক হাদিস ১০টি সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারি (রহ.) একাধিক সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়াও সুনান ও মুসনাদসমূহেও এই হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ এ সংক্রান্ত হাদিস বহুল বর্ণিত ও বহুল প্রচলিত। সবার কাছেই গ্রহণীয়। তাই খারেজিদের হত্যার ব্যাপারে সাহাবিরা সবাই একমত এবং সাহাবিদের অনুসারী উম্মতের আলিমগণও একমত।
অধিকাংশ সাহাবি জঙ্গে জামালে শরিক হননি
জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফিনে একদল সাহাবি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন বটে, তবে অধিকাংশ প্রবীণ ও বিজ্ঞ সাহাবি কোনো পক্ষেই লড়েননি।
তাঁরা রাসুল ﷺ থেকে বর্ণিত বহু হাদিস দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং এ যুদ্ধকে ফিতনা হিসেবে আখ্যা দেন। আর ফিতনার সময় যুদ্ধ পরিহার করার সিদ্ধান্ত নেন।
খারেজিদের হত্যার ব্যাপারে আলি (রা.) উৎসাহী ছিলেন। তাদের হত্যার বিষয়ে হাদিসও বর্ণনা করেছেন। পক্ষান্তরে সিফ্ফিনের যুদ্ধের সমর্থনে তাঁর পক্ষে কোনো দলিল পাওয়া যায় না। এটা নিছক তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা ইজতিহাদ; বরং তিনি যুদ্ধের বিপক্ষে মতামত দাতাদের কখনো কখনো প্রসংশাও করেছেন।
সহিহ হাদিসে এসেছে, রাসুল ﷺ হাসান (রা.) সম্পর্কে বলেছেন—
‘নিশ্চয়ই আমার এই বংশের একজন নেতা। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের দুটি বিরাট জামায়াতের মাঝে সন্ধি করাবেন।’৪২
রাসুল ﷺ আলি (রা.)-এর দল ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর দলের মাঝে সন্ধি সম্পাদনের জন্য হাসান (রা.)-এর প্রশংসা করেছেন। আর এটা এ কথাই বোঝাচ্ছে যে, এই দুই দলের মধ্যকার যুদ্ধটি পরিহার করাটাই উত্তম ছিল। এই যুদ্ধটি মোটেই কোনো ওয়াজিব কিংবা মুস্তাহাব যুদ্ধ ছিল না।
সুতরাং রাসুল ﷺ খারেজিদের হত্যার আদেশ দিয়েছেন এবং উৎসাহিত করেছেন—এটা প্রমাণিত। তাই রাসুল ﷺ যে দলকে হত্যা করতে আদেশ ও উৎসাহ দিয়েছেন এবং যে দলের সাথে যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন, সেই দুই দল কি সমান হতে পারে? সাহাবিদের সিফফিন ও জামালের যুদ্ধ এবং খারেজি গোষ্ঠীর জুল খুওয়াইসারাহসহ অন্যান্য ও হারক্বিয়া গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধকে যারা অভিন্ন মনে করে, তারা নিশ্চিত গোমরাহি ও অন্ধকারে নিমজ্জিত আছে। মূলত তারা রাফেজি ও মুতাজিলা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তারা খারেজিদের সাথে সাথে জামাল ও সিফ্ফিনের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবিদেরও ফাসিক ও কাফির মনে করে। তাই এই সম্প্রদায়ের কুফরির বিষয়ে ইমামদের ভেতরে প্রসিদ্ধ দুটি মতামতও রয়েছে। তবুও সকল সালাফ ও ইমাম সাহাবিদের বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবে স্থির এবং তাঁদের মধ্যকার বিবাদিত বিষয়ে নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করেন এবং এই বিষয়ে বিতর্ককে তাঁরা এড়িয়ে চলেন। অতএব, এতদুভয়ের মধ্যে তুলনা নিতান্তই বাতুলতা।
তা ছাড়া রাসূল খারেজিদের দ্বারা নিহত হওয়ার পূর্বে তাদের হত্যা করার জন্য মুসলিমদের আদেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে বাগিদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন-
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
'যদি মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তাদের মাঝে সন্ধি স্থাপন করো। একটি দল যদি অন্য দলের ওপর বাগাওয়াত (বাড়াবাড়ি) করে ফেলে, তাহলে বাগাওয়াতকারী বা বাগিদের সাথে যুদ্ধ করো; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর আদেশের দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে, তাহলে দলদ্বয়ের মাঝে সন্ধি স্থাপন করো ইনসাফপূর্ণভাবে। ইনসাফ করো। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন।' সূরা হুজুরাত : ৯
এখানে বাগিদের দলকে শুরুতেই হত্যা করতে বলা হয়নি। তাই হত্যা করাটা প্রাথমিক আদিষ্ট বিষয় নয়; বরং তারা যুদ্ধে লিপ্ত হলে প্রথমে তাদের মাঝে সন্ধি কর্তব্য। তারপর একটি দল যদি অবাধ্যাচরণ করে (অর্থাৎ বাগাওয়াত করে), তাহলে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। তাই একদল ফুকাহা বলেন-অবাধ্যাচারী বা বাগিদের সাথে শুরুতেই যুদ্ধ কাম্য নয়; বরং তারা যুদ্ধের ইচ্ছা করলে যুদ্ধ করতে হবে।
খারেজিদের সম্পর্কে রাসূল বলেছেন-
'খারেজিদের তোমরা যেখানেই পাও, হত্যা করো। তাদের হত্যাকারীদের জন্য আল্লাহর নিকট প্রতিদান রয়েছে। '৮৩
অন্যত্র বলেন-
'আমি যদি তাদের পেতাম, তাহলে আদ জাতির মতো তাদের হত্যা করতাম।'৮৪
খারেজি ও জাকাত অস্বীকারকারীরা কি এক
যারা জাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের বিষয়টাও অনুরূপ। কেননা, আবু বকর (রা.) ও সাহাবিগণের এক্ষেত্রে প্রাথমিক আমল ছিল তাদের হত্যা করা। আবু বকর (রা.) বলেন-
'আল্লাহর কসম! উটের যে রশিটি তারা রাসূলকে দিত, তা যদি আমাকে দিতে অসম্মতি জানায়, তাহলেও তা আদায়ের জন্য তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামব।'৮৫
জাকাতের ওয়াজিব হওয়াকে মান্য করা সত্ত্বেও শুধু জাকাত না দেওয়ার কারণে সাহাবিরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।
জাকাত অস্বীকারকারীরা কি কাফির
যারা জাকাত দিতে অসম্মত হয়েছিল, তারা কাফির কি না এবং তাদের সাথে শাসক যুদ্ধ করবেন কি না-এ নিয়ে ফুকাহাদের মধ্যে দুই ধরনের মত রয়েছে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর দুটি মত পাওয়া যায় এদের তাকফিরের ব্যাপারে। যেমন : খারেজিদের ব্যাপারেও তাঁর দুটি মত রয়েছে।
নিছক অবাধ্যাচারী কাফির নয়
সর্বসম্মতভাবে 'নিছক বাগি' কাফির নয়। কেননা, তারা যুদ্ধে জড়িত ও অবাধ্য হওয়ার পরও কুরআন তাদের 'মুমিন ও পরস্পরে ভাই' বলে উল্লেখ করেছে; তবে আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
টিকাঃ
৭৭. মুসলিম: ১০৬৪
৭৮. বুখারি: ৬৮৭৫
৭৯. মুসলিম: ১০৬৪
৮০. বুখারি: ৩৬১১, মুসলিম: ১০৬৬
৮১. মুসলিম: ১০৬৬, আবু দাউদ: ৪৭৬৮
৮২. বুখারি: ২৭০৪, আবু দাউদ: ৪৬৬২
৮৩. বুখারি: ৩৬১১, মুসলিম: ১০৬৬
৮৪. বুখারি : ৩৩৪৪, মুসলিম : ১০৬৪
৮৫. বুখারি : ৬৯২৪
📄 সাহাবিগণ সর্বোত্তম মানুষ এবং তাঁদের গালমন্দ করা গুনাহ
যারা মুয়াবিয়া (রা.)-কে অভিশাপ দেয়, তাদের পরিণাম কী? আর রাসূল ﷺ কি এই হাদিসটি বলেছেন- 'যখন দুজন খলিফা যুদ্ধ করে, তখন একজন অভিশপ্ত বিবেচিত হবে?' আর এটাও কি রাসূল বলেছেন- 'আম্মার (রা.)-কে হত্যা করবে একদল বাগি?'
আম্মার (রা.)-কে কি হত্যা করেছে মুয়াবিয়া (রা.)-এর সৈন্যদল? এরা কি নবিপরিবারকে গালি দিত? হাজ্জাজ কি অভিজাত কাউকে হত্যা করেছে?
সাহাবিদের গালমন্দ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ
সাহাবিদের অভিসম্পাতকারী শাস্তির উপযুক্ত। তাঁদের অভিশাপ বা বদদুআ দেওয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেই সাহাবি যে-ই হোক না কেন; চাই তিনি মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.)-এর সমমর্যাদার হোক কিংবা হোক তাঁদের চেয়েও অধিক মর্যাদার। যেমন: আবু মুসা আশআরি ও আবু হুরায়রা (রা.)-এর সমপর্যায়ের হোক অথবা তাঁদের চেয়েও অধিক মর্যাদার। যেমন: তালহা, জুবায়ের, উসমান, আলি, আবু বকর, উমর, আয়িশা (রা.) প্রমুখ সাহাবিদের সমপর্যায়ের।
মোটকথা যাকেই গালি দিক, গালিদাতা কঠিন শাস্তি পাবে-এটা ইমামদের সর্বসম্মত অভিমত। তবে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে তার শাস্তির ধরন নিয়ে।
তাকে কি হত্যা করা হবে, নাকি হত্যার চেয়ে লঘুদণ্ড দেওয়া হবে? এ ব্যাপারে আমি অন্যত্র সবিস্তার আলোচনা করেছি।
সাহাবিদের গালি দেওয়া হারাম। দলিল হলো আবু সাইদ খুদরি (রা.)- এর হাদিস। রাসূল বলেন-
'তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিয়ো না। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পরিমাণ স্বর্ণ দান করে, তবুও সে তাঁদের এক মুদ পরিমাণ বা তার অর্ধেক (সাদাকার) পুণ্য অর্জন করতে পারবে না।'৮৬
আর অভিশাপ গালির চেয়ে নিকৃষ্টতর। সহিহ হাদিসে এসেছে-
'মুমিনকে অভিশাপ দেওয়া তাঁকে হত্যার সমতুল্য।'৮৭
রাসূল কোনো মুমিনকে অভিশাপ দেওয়াকে হত্যার সমতুল্য গণ্য করেছেন।
মুমিনদের সর্বোত্তম দল সাহাবিদের দল
রাসূল বলেন-
'সর্বোত্তম সহচর হলো-যাদের মাঝে আমি প্রেরিত হয়েছি। এদের পর যারা আসবে, তাঁদের মর্যাদা। এদের পর তাঁরা শ্রেষ্ঠ, যারা এদের পরবর্তী সময়ে আসবে।'৮৮
সাহাবিদের ভেতর মুমিন অবস্থায় যে যতটুকু রাসূলকে দেখেছে, সে ততটুকুই রাসূলের সাহচর্য পেয়েছে। যেমনটা সহিহ হাদিসে এসেছে-
'একটি দল যুদ্ধ করতে থাকবে। তাদের জিজ্ঞেস করা হবে- “তোমাদের ভেতর এমন কেউ কি আছে, যে রাসূলের সান্নিধ্য পেয়েছে? তাঁরা বলবে-“হ্যাঁ।” তাঁরা তখন বিজয়ী হবে। তারপর আরেকটি দল যুদ্ধ করবে। তাঁদের বলা হবে- “তোমাদের কেউ কি রাসূল -কে দেখেছ?” তাঁরা বলবে- “হ্যাঁ।” তাঁরা তখন বিজয়ী হবে। তারপর তৃতীয় দলটির কথা উল্লেখ করা হলো। '৮৯
এই হাদিসে আমরা দেখতে পাচ্ছি-যে রাসূলের সাহচর্য পেয়েছে আর যে রাসূলকে দেখেছে, তাঁকে একই দলভুক্ত করা হচ্ছে।
রাসূলের সোহবত বা সাহচর্য শব্দ নিয়ে কিছু কথা
রাসূলের সাহচর্যের কিছু স্তরভেদ রয়েছে। যে সাহাবি তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা কৃতিত্বের জন্য অনন্য, তাঁকে সোহবত বা সাহচর্যের সেই বিশেষণেই অভিহিত করা হয়। যেমন: আবু সাইদ (রা.)-এর পূর্বোল্লিখিত হাদিসে আছে, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) যখন আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর সাথে বিতণ্ডা করছিলেন, তখন রাসূল খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-কে বলেন-
'হে খালিদ! তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিয়ো না। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পরিমাণ স্বর্ণ দান করে, তবুও সে তাঁদের এক মুদ পরিমাণ বা তার অর্ধেক পুণ্যও অর্জন করতে পারবে না।'
কারণ, আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ও তাঁর সমপর্যায়ের সাহাবিদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাঁরা ইসলামের প্রথম দিকের অগ্রবর্তী দল-যারা ইসলামের বিজয় তথা হুদাইবিয়ার বিজয়ের পূর্বে ধন-সম্পদ উৎসর্গ করেছে। আর খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর সমপর্যায়ের সাহাবিরা হুদাইবিয়ার বিজয়ের পরে জান ও মাল উৎসর্গ করতে সচেষ্ট হয়েছেন এবং যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ বলেন-
لَا يَسْتَوِي مِنْكُمْ مَنْ أَنْفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُولَئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِنَ الَّذِينَ أَنْفَقُوا مِنْ بَعْدُ وَقَاتَلُوا وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ -
'তোমাদের মধ্যকার ওইসব লোক (মর্যাদার দিক থেকে) ভিন্ন, যারা (হুদাইবিয়ার) বিজয়ের পূর্বে সম্পদ উৎসর্গ করেছে এবং যুদ্ধ করেছে। এরা তাঁদের চেয়ে উত্তম, যারা তাঁদের পরে সম্পদ উৎসর্গ করেছে এবং যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ প্রত্যেকের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন।' সূরা হাদিদ: ১০
আর এখানে বিজয় দ্বারা হুদাইবিয়ার বিজয় উদ্দেশ্য। যখন রাসূল গাছের নিচে বাইয়াত নিয়েছেন, তখন চৌদ্দশোর অধিক সাহাবি বাইয়াতবদ্ধ হন। এরা পরবর্তী সময়ে খায়বার জয় করেন। এদের সম্পর্কে নবিজি বলেন-
'যে গাছের নিচে বাইয়াতবদ্ধ হয়েছে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।'৯০
উল্লেখ্য, সূরা ফাতহে যে বাইয়াতের কথা বলা হয়েছে, তা মক্কা বিজয়ের পূর্বে সংঘটিত হয়েছে; বরঞ্চ তা রাসূল -এর উমরাহেরও আগে হয়েছে। রাসূল তাঁর সাহাবিদের নিকট থেকে বাইয়াত নিয়েছিলেন ষষ্ঠ হিজরিতে একটি গাছের নিচে। সে বছরই মুশরিকদের সাথে সুপ্রসিদ্ধ হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়। এই সন্ধির মাধ্যমে মুসলমানদের বিশাল বিজয় সাধিত হয়। যে বিজয় সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই অবগত ছিলেন; যদিও অনেক মুসলিম এই সন্ধিকে পছন্দ করেননি। এমনকী এটা তাঁদের জন্য কী শুভ পরিণাম বয়ে আনতে যাচ্ছে, তা আঁচও করতে পারেননি। তাই সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.) বলে বসেন-
'হে লোক সকল! তোমাদের বুদ্ধিকে অভিযুক্ত মনে করো। আল্লাহর কসম! আমি আবু জানদালের সে দিনটি দেখেছি। আমার যদি রাসূল -এর আদেশ প্রত্যাখ্যান করার সাধ্য থাকত, তাহলে অবশ্যই তা করতাম।'৯১
এর পরের বছর রাসূল ও তাঁর সাহাবিগণ উমরাহ করার জন্য মক্কায় প্রবেশ করেন। মক্কার অধিবাসীরা তখন মুশরিকদের পক্ষে ছিল। তারপর অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয় হয়। আল্লাহ সূরা ফাতহের আয়াত নাজিল করেন-
لَقَدْ صَدَقَ اللهُ رَسُولَهُ الرُّؤْيَا بِالْحَقِّ لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِنْ شَاءَ اللَّهُ أَمِنِيْنَ مُحَلِّقِينَ رُءُوسَكُمْ وَمُقَصِّرِيْنَ لَا تَخَافُوْنَ فَعَلِمَ مَا لَمْ تَعْلَمُوا فَجَعَلَ مِنْ دُوْنِ ذَلِكَ فَتْحًا قَرِيبًا -
'নিশ্চয়ই আল্লাহ চাহে তো তোমরা মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদ হয়ে, নিজদের মাথা মুণ্ডন করে, কেশ কর্তিত অবস্থায়, নির্ভয়ে। যেহেতু আল্লাহ তা জানেন, যা তোমরা জানতে পারোনি। এ ছাড়াও তোমাদের জন্য রেখেছেন আসন্ন বিজয়।' সূরা ফাতহ: ২৭
আল্লাহ সূরা ফাতহে মুসলিমদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁরা নিরাপদে মক্কায় প্রবেশ করবেন। আর সে প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন দুই বছর পরেই। এ সম্পর্কে আয়াত নাজিল করেন-
الشَّهْرُ الْحَرَامُ بِالشَّهْرِ الْحَرَامِ وَالْحُرُمَاتُ قِصَاصُ
'সম্মানিত মাস সম্মানিত মাসের বিনিময়ে এবং সমস্ত নিষিদ্ধ বিষয় কিসাসভুক্ত।' সূরা বাকারা: ১৯৪
এ সবই মক্কা বিজয়ের পূর্বে। তাই যারা ধারণা করে থাকে যে সূরা ফাতহ মক্কা বিজয়ের পর নাজিল হয়েছে, তারা নিতান্তই ভুল ধারণায় ডুবে আছে। এই দীর্ঘ আলোচনার উদ্দেশ্য হলো-যেসব সাহাবি হুদাইবিয়ার বিজয়ের পূর্বে রাসূলের সাহচর্য পেয়েছেন, তাঁরা বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তাই তাঁদের পরে যারা সাহচর্য পেয়েছেন, তাঁদের চেয়ে তাঁরা বেশি মর্যাদার দাবিদার। এ কারণেই রাসূল খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-কে বলেছেন, 'তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিয়ো না।' খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) ও তাঁর সমপর্যায়ের সাহাবিরা আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর পরে রাসূলের সান্নিধ্যে এসেছেন।
মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.) নিফাকমুক্ত
মুয়াবিয়া (রা.) ও আমর ইবনুল আস (রা.)-এর সমমতের সাহাবিদের সম্পর্কে কোনো সালাফই নিফাক বা মুনাফিক হওয়ার অভিযোগ আরোপ করেননি। সহিহ হাদিসে এসেছে-
'আমর ইবনুল আস (রা.) যখন রাসূলের হাতে বাইয়াতবদ্ধ হন, তখন শর্তজুড়ে দেন, "আমার পূর্বের সমস্ত পাপ মাফ হবে তো?" রাসূল বলেন-"হে আমর! তুমি কি জানো না, ইসলাম ব্যক্তির পূর্বের সমস্ত কিছু মিটিয়ে দেয়?"'৯২
আর এটা সকলেই জানে-যে ইসলাম সবকিছু মিটিয়ে দেয় বা মুছে দেয়, তা মুমিনের ইসলাম। মুনাফিকের ইসলাম গ্রহণ কিছুই মেটাতে পারে না। তা ছাড়া আমর ইবনুল আস (রা.) ও তাঁর সমতুল্য অনেক সাহাবিই হুদাইবিয়ার পরে নিজ দেশ থেকে হিজরত করে রাসূলের কাছে চলে এসেছিলেন সাগ্রহে ও স্বেচ্ছায়; কোনো প্রকার জবরদস্তির শিকার না হয়ে। আর মুহাজিরদের ভেতর কেউ-ই মুনাফিক ছিল না।
কতিপয় মুনাফিক আনসারের মুনাফিকির কারণ
কতিপয় আনসারের ভেতর নিফাক ছিল। এর কারণ হলো-সকল আনসার মদিনাবাসী হওয়ার কারণে মদিনার অভিজাত ও মান্যবর ব্যক্তিগণ যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন অন্যরাও কপটতা ও মুনাফিকির আশ্রয় নিয়ে নিজেদের মুসলিম হিসেবে উপস্থাপন করার প্রয়োজন বোধ করে। কারণ, ইসলাম তখন সম্মানের প্রতীক এবং তাদের গোত্রের সবাই তা গ্রহণ করে নিয়েছে। পক্ষান্তরে মক্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ ও অভিজাত লোকই ছিল কাফির। তাই ইসলামের প্রকাশ ওই ব্যক্তিই করেছে, যে ভেতরে ও বাইরে সমানভাবে মুসলিম ছিল। তখন যে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করত, তাকেই নির্যাতন করা হতো এবং বয়কট করা হতো। অন্যদিকে মদিনার মুনাফিকরা ইসলামের কথা বলত দুনিয়াবি সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য। আর মক্কায় ইসলামের কথা প্রকাশ করলে দুনিয়ার সুযোগ-সুবিধা বন্ধ হয়ে যেত। জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠত।
তারপর রাসূল যখন মদিনায় হিজরত করলেন, তখন তাঁর সাথে অধিকাংশ মুসলিমই হিজরত করলেন। কিছু লোককে হিজরত করতে বাধা দেওয়া হলো। এদের মধ্যে বনি মাখজুমের খালিদ বিন ওয়ালিদ-এর ভাই ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা (রা.)ও ছিলেন (এখানে পিতা ও পুত্রের নাম একই)। রাসূল তাঁদের জন্য কুনুত পড়তেন-
'হে আল্লাহ! তুমি ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদকে এবং সালামা ইবনে হিশামকে মুক্ত করো। মুদার গোত্রের ওপর তোমার পাকড়াও মজবুত করো...'৯৪
তাই মুহাজিরদের ভেতর সবাই নিফাকের অভিযোগমুক্ত। তাঁদের কারও সম্পর্কে কেউ নিফাকের অভিযোগ করেননি; বরং প্রত্যেকেই মুমিন হিসেবে সনদপ্রাপ্ত।
ওহির লিপিকার মুয়াবিয়া (রা.) সম্পর্কে রাসূলের দুআ
স্বাধীন লোকদের মধ্যে মুয়াবিয়া (রা.) সহ আরও কিছু সাহাবি মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেছেন। যেমন: ইকরামা ইবনে আবু জাহেল, হারিস ইবনে হিশাম, সুহাইল ইবনে আমর, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, আবু সুফিয়ান (রা.) প্রমুখ সাহাবি। তাঁদের ইসলাম সকল মুসলিমদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে কলুষমুক্ত। মুয়াবিয়া (রা.)-কে দিয়ে রাসূল ওহি অনুলিখন করিয়েছেন এবং তাঁর জন্য দুআ করেছেন-
'হে আল্লাহ! তুমি তাঁকে কুরআনের জ্ঞান ও হিসাববিদ্যার জ্ঞান দান করো এবং তাঁকে আজাব থেকে নাজাত দান করো।'৯৫
তাঁর ভাই ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) ছিলেন তাঁর চেয়েও মহত্তম। আবু বকর (রা.) যেসব আমিরকে শাম বিজয়ের জন্য পাঠিয়েছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)। একবার আবু বকর (রা.) পায়ে হেঁটে এবং ইয়াজিদ ইবনে সুফিয়ান আরোহী হয়ে যাচ্ছিলেন। ইয়াজিদ (রা.) আবু বকর (রা.)-কে বলেছিলেন-
'হে আল্লাহর রাসূলের খলিফা! হয়তো আপনি সওয়ারি হন, নয়তো আমি আপনার সাথে হাঁটি।' আবু বকর (রা.) বলেছিলেন-
'আমি সওয়ারি হব না, আর তুমিও নামবে না। কারণ, আমি আল্লাহর রাস্তায় আমার পদক্ষেপগুলো গুনছি। '৯৬
অপর আমির ছিলেন আমর ইবনুল আস (রা.)। তৃতীয়জন ছিলেন শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ (রা.)। চতুর্থজন ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)। তিনি ছিলেন সাধারণ আমির। পরবর্তী সময়ে উমর (রা.) তাঁকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন। তাঁর স্থানে নিযুক্ত করেছিলেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.)-কে, যার সম্পর্কে খোদ রাসূল বলেন-
'সে হলো এই উম্মতের আস্থার আধার। '৯৭
শাম বিজয় হয়েছিল তাঁর হাতেই। আর ইরাক বিজয় হয়েছে আমর ইবনুল আস (রা.)-এর হাতে।
উমর (রা.) কর্তৃক মুয়াবিয়া (রা.)-কে গভর্নর নিয়োগ
উমর (রা.)-এর শাসনামলে যখন ইয়াজিদ ইবনে সুফিয়ান (রা.) ইন্তেকাল করেন, তখন তাঁর ভাই মুয়াবিয়া (রা.)-কে গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। আর এটা সর্বজনবিদিত যে, উমর (রা.) সর্বাপেক্ষা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং মানুষ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি ছিলেন সত্য সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশি নিবেদিতপ্রাণ। তাই তো আলি (রা.) বলেন-'আমরা পরস্পরে আলোচনা করতাম, “প্রশান্তি” উমর (রা.)-এর ভাষায় কথা বলে।'
রাসূল বলেন-
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সত্যকে উমরের মুখে ও অন্তরে স্থাপিত করেছেন। '৯৮
রাসূল আরও বলেন-
'আমি যদি তোমাদের মাঝে প্রেরিত না হতাম, তাহলে উমর প্রেরিত হতো।'৯৯
ইবনে উমর (রা.) বলেন-
'আমি উমর (রা.)-কে কোনো বিষয়ে সন্দেহ ও দ্বিধান্বিত হয়ে কথা বলতে দেখিনি। যা বলতেন, দৃঢ়তার সাথে বলতেন।'
রাসূল আরও বলেছেন-
'তুমি যে রাস্তায় চলেছ, সে রাস্তায় শয়তানকে চলতে দেখিনি।'১০০
আবু বকর ও উমর (রা.) নিজ আত্মীয় ও মুনাফিকদের কখনোই নিয়োগ দেননি
আবু বকর ও উমর (রা.) মুসলিমদের প্রশাসক হিসেবে কখনোই নিজেদের আত্মীয় ও মুনাফিকদের নিয়োগ করেননি। আল্লাহর জন্য তাঁরা কখনোই কোনো নিন্দার তোয়াক্কা করেননি; বরং তাঁরা যখন ধর্মান্তরীদের (মুরতাদ) সাথে যুদ্ধ করছিলেন এবং তাদের ইসলামে ফিরিয়ে এনেছিলেন, তখন তাদের পশুর ওপর সওয়ার হয়ে অস্ত্র বহন করতে নিষেধ করেছিলেন, যেন তাদের তওবা সঠিকভাবে হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। উমর (রা.) সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-কে ইরাকের প্রশাসক থাকাকালে বলেছিলেন, 'ধর্মান্তরীদের কাউকে কোনো প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেবে না। তাদের সাথে যুদ্ধসংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ করবে না।'
সুতরাং এই আলোচনা থেকে এটা প্রমাণিত যে, উমর (রা.) ও আবু বকর (রা.) যখন কারও থেকে কোনো রকম নিফাকির আশঙ্কা বোধ করেছেন, তাকে আর প্রশাসনিক পদে নিযুক্ত করেননি।
আবু সুফিয়ান ও আমর ইবনুল আস (রা.)-কে আমির নিযুক্তি
আমর ইবনুল আস (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.) প্রমুখ সাহাবিদের থেকে যদি নিফাকির বা মুনাফিকির আশঙ্কা থাকত, তাহলে তাঁদের কখনোই মুসলিমদের শাসক বানানো হতো না। রাসূল আমর ইবনুল আস (রা.)-কে গাজওয়ায়ে জাতুস-সালাসিলে আমির নিযুক্ত করেছিলেন। আর নবি কখনোই একজন মুনাফিককে আমির বানাতে পারেন না। রাসূল মুয়াবিয়া (রা.)-এর পিতা আবু সুফিয়ান (রা.)-কেও নাজরানের শাসক বানিয়েছিলেন। রাসূলের মৃত্যু পর্যন্ত আবু সুফিয়ান (রা.) নাজরানে রাসূলের প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আর সকল মুসলিমই একমত যে, মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইসলাম ছিল তাঁর বাবার ইসলামের অপেক্ষায় শ্রেষ্ঠতর।
তাই তাঁরা যদি মুনাফিক হতেন, তাহলে রাসূল কী করে তাঁদের ওপর মুসলমানদের ইলম ও আমলের দায়িত্বভার আরোপ করতেন কিংবা তাঁদের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত করে নিরাপদ থাকতেন?
হাদিস বর্ণনায় মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.)-এর গ্রহণযোগ্যতা
এটা সকলেই জানে যে, মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.) প্রমুখ সাহাবিদের মাঝে ফিতনার দরুন অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল। তদুপরি তাঁদের পক্ষের, বিপক্ষের কিংবা নিরেপক্ষ কেউ-ই তাঁদের বিরুদ্ধে রাসূলের নামে মিথ্যাচারের অভিযোগ দেননি; বরং সাহাবি ও তাবেয়িদের মধ্য হতে সকল আলিম এক্ষেত্রে একমত যে, তাঁরা সকলেই রাসূলের কথা সত্য সত্যই মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। আস্থা ও বিশ্বস্ততার সাথে রাসূলের বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে রাসূলের হাদিসের ব্যাপারে মুনাফিকের ওপর আস্থা রাখা যায় না; বরং সে রাসূলের নামে মিথ্যাচার করে বেড়ায় এবং রাসূলকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে।
মুয়াবিয়া (রা.) ও অন্যান্য সাহাবিদের অভিশাপকারীর পরিণাম
সাহাবিগণ যেহেতু মুমিন ছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর ভালোবাসায় মত্ত ছিলেন, তাই যে ব্যক্তি তাঁদের অভিশাপ দেবে, সে আল্লাহ ও রাসূলের অবাধ্যাচরণ করবে। বুখারিতে এসেছে—
'এক ব্যক্তির ডাকনাম ছিল গাধা। সে মদ পান করত। ফলে তাকে বারবার রাসূলের কাছে হাজির করা হতো দোররা মারার জন্য। একবার তাকে নিয়ে আসা হলে এক লোক বলল- "আল্লাহ তার ওপর অভিশাপ দিক! আর কত বার একে শাস্তি দিতে হবে?" রাসূল বললেন-"তোমরা তাকে অভিশাপ দিয়ো না। কেননা, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে।””১০১
প্রত্যেক মুমিনই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -কে ভালোবাসে। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে না, সে মুমিন নয়। ঈমান ও ঈমানের গভীরতা সাপেক্ষে মুমিনদের বহু স্তরভেদ থাকা সত্ত্বেও রাসূল মদ পানকারীকে লানত করতে নিষেধ করেছেন। যদিও তিনি মদ তৈরিকারী, মদের ফরমায়েশকারী, মদ পানকারী, মদ বহনকারী, যার জন্য মদ বহন করা হয়, মদ পরিবেশনকারী, মদ বিক্রয়কারী, এর মূল্য ভোগকারী, মদ ক্রেতা এবং যার জন্য মদ ক্রয় করা হয়১০২-এদের সবাইকে অভিশপ্ত ঘোষণা করেছেন, তবুও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লানত করতে নিষেধ করেছেন।
কেননা, অভিশাপ একপ্রকার সতর্ককরণ কিংবা ভীতিপ্রদর্শন-যা প্রায়শই প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এই নির্দিষ্ট ব্যক্তিটি খাঁটি তওবার মাধ্যমে এই সতর্কীকরণ কিংবা শাস্তির প্রকোপ থেকে মুক্তি পেতে পারে। আবার গুনাহ মোচনকারী নেক কাজের মাধ্যমে, বিপদাপদের মাধ্যমে কিংবা মকবুল শাফায়াত-যা শাস্তি থেকে বান্দাকে মুক্তি দিতে পারে ইত্যাদির মাধ্যমেও সে মুক্তি পেতে পারে।
নেক কাজের মাধ্যমে সাহাবিদের বড়ো ভুলগুলোও আল্লাহ ক্ষমা করেন
হাতিব ইবনে আবি বালতায়া (রা.) তাঁর দাসদের সাথে রূঢ় আচরণ করত। সহিহ হাদিসে এসেছে-
'তাঁর এক দাস তাঁর সম্পর্কে রাসূল -এর কাছে বললেন- “হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম! নিশ্চয়ই হাতিব ইবনে আবি বালতায়া জাহান্নামে যাবে।" রাসূল বললেন-"তুমি মিথ্যা বলছ। কারণ, সে বদর ও হুদাইবিয়ায় অংশগ্রহণ করেছে। "'১০০
সহিহ হাদিসে এসেছে-
'রাসূল আলি ও জুবায়ের ইবনুল আওয়ام (রা.)-কে বললেন-'তোমরা দুজন রওজাতু খাখে যাও, সেখানে একজন দাসীকে পাবে। তার কাছে একটি চিঠি আছে।” আলি (রা.) বলেন-"আমরা ঘোড়া ছুটিয়ে রওয়ানা হলাম। একসময় সেই দাসীর দেখা পেয়ে বললাম- “চিঠি কোথায়?” সে বলল- "আমার কাছে কোনো চিঠি নেই।" আমরা তাকে বললাম- “তুমি চিঠি বের করবে, নাকি আমরা তোমার কাপড় খুলে বের করব?"
আলি (রা.) বলেন-“তারপর সে তার চুলের খোঁপা থেকে চিঠিটি বের করে দিলো। আমরা সেটা নিয়ে রাসূল -এর কাছে এলাম। চিঠিটা ছিল হাতিব ইবনে বালতায়ার। সে তাতে মক্কার মুশরিকদের কাছে রাসূলের বিভিন্ন গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য পাচার করছিল।" রাসূল তাঁকে বললেন- “এটা কী হাতিব?" তিনি বললেন-"আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুরতাদ হয়ে এটা করিনি। ইসলাম ছেড়ে কুফরির প্রতি সন্তুষ্ট হয়েও করিনি। আমি কুরাইশ বংশোদ্ভূত নই। তাদের সাথে আমার সম্পর্ক রয়েছে বটে। আর আপনার সাথে যেসব মুহাজির সাহাবি রয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকেই কুরাইশের সাথে আত্মীয়তাসূত্রে আবদ্ধ। তাঁদের পরিবার মক্কাতে নিরাপদে থাকবে। তাই আমার যখন এই সুবিধাটি নেই, আমি চাইলাম তাদের একটু সহযোগিতা করতে, যেন তারা আমার পরিবারকে হেফাজত করে।"'১০৪
অন্য বর্ণনায় এসেছে, হাতিব ইবনে আবি বালতায়া (রা.) তারপর বলেছিলেন-
'আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, এটা আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর রাসূল ও মুমিনদের সাহায্য করবেন।'
এ কথা শুনে উমর (রা.) বলেন- 'অনুমতি দিন! এই মুনাফিকের গরদান উড়িয়ে দিই।'
রাসূল ﷺ বলেন-'সে বদর যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তুমি কি জানো না, বদরে অংশগ্রহণকারীদের বিষয়ে আল্লাহ অবগত রয়েছেন? তিনি বলেছেন-“জেনো রাখো! তোমরা যা-ই করো, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন।””১০৫
আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি, বদরে অংশ নেওয়ার কারণে আল্লাহ তায়ালা এই মহাগর্হিত কাজটিও ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং এই হাদিসটি দ্বারা বোঝা গেল, বড়ো কোনো ভালো কাজের দ্বারা আল্লাহ বড়ো খারাপ কাজকে মিটিয়ে দেন, মাফ করে দেন। আর মুমিনগণ প্রতিশ্রুতি ও সতর্কবাণীতে বিশ্বাস করে। কেননা, রাসূল ﷺ বলেছেন- 'যার শেষ কথা হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতে যাবে। '১০৬
যদিও পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালা এটাও বলেছেন-
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا -
'নিশ্চয়ই যারা ইয়াতিমদের সম্পদ জুলুম করে কুক্ষিগত করে নেয়, তারা তো কেবল আগুনই উদরস্থ করে। অচিরেই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।' সূরা নিসা: ১০
অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে জাহান্নামি কিংবা জান্নাতি না বলা
সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট কাউকে জাহান্নামি অথবা জান্নাতি বলা যাবে না।
'যে অণু পরিমাণ কল্যাণ করবে, তা সে দেখতে পাবে এবং যে অণু পরিমাণ অকল্যাণ করবে, তাও সে দেখতে পাবে।' উল্লিখিত আয়াতের ব্যাপকতার ওপর ভর করে বলা যাবে না যে, গুনাহকারী শাস্তি পাবেই। কোনো বান্দার আমলনামায় যখন গুনাহ ও নেকি একসঙ্গে জমা হয়, তখন সে গুনাহর কারণে শাস্তির উপযুক্ত বিবেচিত হলেও পুণ্যের বিনিময় পাবেই। মুমিনের সওয়াব তার গুনাহর কারণে নষ্ট হবে না। এটা খারেজি ও মুতাজিলাদের বিশ্বাস যে, কবিরা গুনাহর কারণে বান্দার সকল সওয়াব নষ্ট হয়ে যাবে এবং কবিরা গুনাহকারীগণ অনন্তকাল জাহান্নামে থাকবে। তারা কারও শাফায়াতের বিনিময়ে জাহান্নام থেকে বের হতে পারবে না। কবিরা গুনাহকারীর ঈমান থাকবে না। এই সব ভ্রান্ত মতামত। কুরআন ও হাদিসে মুতাওয়াতিরের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। ইজমায়ে সাহাবি তথা সাহাবিদের সর্বসম্মতিক্রমে এই মতামত ভ্রান্ত।
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের দৃষ্টিতে ব্যক্তির নিষ্পাপতা
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের সকল ইমাম একমত যে, কোনো সাহাবি কিংবা আল্লাহর নৈকট্যধন্য ও ইসলামে অগ্রবর্তী কোনো ব্যক্তি-কেউ-ই নিষ্পাপ নয়; বরং তাঁরা মনে করেন, এসব লোকেরাও পাপ করে ফেলতে পারেন। আল্লাহ তাঁদের তওবার বিনিময়ে ক্ষমা করে দেবেন। তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। গুনাহ মোচনকারী নেক কাজের ওসিলায় আল্লাহর তাঁদের গুনাহ মাফ করবেন।
আল্লাহ বলেন-
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ أُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ لَهُمْ مَا يَشَاءُونَ عِنْدَ رَبِّهِمْ ذُلِكَ جَزَاءُ الْمُحْسِنِينَ لِيُكَفِّرَ اللَّهُ عَنْهُمُ أَسْوَا الَّذِي عَمِلُوا وَيَجْزِيَهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ الَّذِي كَانُوا يَعْمَلُونَ
'যে সত্য নিয়ে এসেছে এবং যে তা সত্যায়ন করেছে, তারাই মুত্তাকি। তারা যা চাইবে, আল্লাহর তরফ থেকে তা-ই তাদের জন্য রয়েছে। এটা সৎকর্মপরায়ণদের প্রতিদান-যাতে করে তাদের কৃত মন্দ কাজ আল্লাহ মাফ করে দেন এবং তারা যে উত্তম কাজ করত, তার প্রতিদান দেন।' সূরা জুমার: ৩৩-৩৫
আল্লাহ অন্যত্র বলেন-
حَتَّى إِذَا بَلَغَ أَشُدَّه وَبَلَغَ أَرْبَعِينَ سَنَةً قَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحُ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
'যখন পরিণত বয়সে উপনীত হয় এবং চল্লিশ বছরে উপনীত হয়, তখন সে বলে-“হে আমার রব! আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন, যাতে আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি। আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি আপনি যে অনুগ্রহ করেছেন, তার জন্য এবং যাতে আমি এমন সৎ কাজ করতে পারি-যা আপনি পছন্দ করেন। আর আমার জন্য আমার সন্তান-সন্ততিদের সংশোধন করে দিন। নিশ্চয় আমি আপনারই অভিমুখী হলাম এবং নিশ্চয়ই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।"' সূরা আহকাফ: ১৫
أُولَئِكَ الَّذِينَ نَتَقَبَّلَ عَنْهُمْ أَحْسَنَ مَا عَمِلُوا وَنَتَجَاوَزُ عَنْ سَيِّئَاتِهِمْ فِي أَصْحَابِ الْجَنَّةِ
'ওরাই তারা, আমি যাদের সৎ আমলগুলো কবুল করি এবং মন্দ কাজগুলো ক্ষমা করি। তারা জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।' সূরা আহকাফ: ১৬
নবিগণ পাপ থেকে মুক্ত
নবিদের সম্পর্কে আলিমগণ বলেন-'তাঁরা পাপ থেকে মুক্ত।' আর নিশ্চিত পাপ থেকে সিদ্দিকিন, শুহাদা, সালেহিন মুক্ত নন। তবে ইজতিহাদি বিষয়গুলোতে তাঁরা কখনো সঠিক সিদ্ধান্ত নেন, কখনো-বা ভুল সিদ্ধান্ত নেন।
ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে তার জন্য দুটি প্রতিদান, আর ভুল হলে ইজতিহাদ করার জন্য একটি প্রতিদান পাবেন। তাঁদের ভুলটি ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
পথভ্রষ্ট লোকেরা ভুল করা মানেই পাপ মনে করে। কখনো এই বলে বাড়াবাড়ি করে বসে যে, সাহাবি ও ইমামগণ পাপমুক্ত বা মাসুম। আবার কখনো তাঁদের ওপর জুলুম করে বলে, তাঁরা ভুল করে বাগিতে পরিণত হয়েছেন। তবে জ্ঞানীগণ তাঁদের নিষ্পাপও মনে করেন না, আবার পাপিষ্ঠও মনে করেন না।
বিদআতি ও পথভ্রষ্টরা কেন সালাফদের ফাসিক মনে করে
উল্লিখিত বিষয়টিকে কেন্দ্র করে অনেক বিদআতি ও পথভ্রষ্ট ফেরকা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ সালাফদের গালি দেয় এবং লানত করে। কারণ, তারা বিশ্বাস করে, সালাফগণ গুনাহ করেছেন। আর যে গুনাহ করে, সে লানতের যোগ্য। তাদের কেউ কেউ তো সালাফদের ফাসিক কিংবা কাফিরও মনে করে; যেমনটা খারেজিরা করে। তারা আলি (রা.) ও উসমান (রা.)-কে কাফির মনে করে এবং এই দুজন যাদের নিযুক্ত করেছেন, তাঁদেরও কাফির মনে করে। তাঁদের সবাইকে খারেজিরা লানত করে, গালি দেয় এবং তাঁদের হত্যা করা বৈধ মনে করে। নাউজুবিল্লাহ!
খারেজিদের সম্পর্কে কতিপয় হাদিস
এরাই সেই লোক, যাদের সম্পর্কে রাসূল বলেন-
'তোমাদের মধ্যে এমন লোক হবে, যারা তোমাদের সাথে নামাজ-রোজা আদায় করা এবং কুরআন তিলাওয়াত করাকে অপমানজনক মনে করবে। কুরআন তাদের গলা দিয়ে নামবে না। তির যেভাবে ধনুক থেকে বের হয়, ইসলাম থেকে তারা সেভাবে বের হয়ে যাবে।'
রাসূল আরও বলেন-
'মুসলমানদের একটি দল বের হয়ে মুসলমানদের একটি দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। তাদের হক বা সত্যের খাতিরে হত্যা করবে দুই দল থেকে উত্তম একটি দল।'
এরাই সেই খারেজি, যারা আলি (রা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং তাঁকে ও তাঁর নিযুক্ত সকল প্রশাসককে কাফির মনে করত।
দুজন খলিফা যখন যুদ্ধ করে, তখন একটি অভিশপ্ত
প্রকৃত অর্থে এটা বানোয়াট, মিথ্যা কথা। এমন কোনো হাদিস ইলমে হাদিসের কোনো পণ্ডিত ব্যক্তিই বর্ণনা করেন না। ইসলামের নির্ভরযোগ্য কোনো গ্রন্থেও এটা বর্ণিত হয়নি।
মুয়াবিয়া (রা.) খিলাফতের দাবিতে আলি (রা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি
মুয়াবিয়া (রা.) খিলাফতের দাবি করেননি এবং আলি (রা.)-এর সাথে যুদ্ধের সময় তিনি খিলাফতের জন্য জনগণের নিকট থেকে বাইয়াতও গ্রহণ করেননি। নিজেকে খলিফা মনে করে তিনি এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হননি। তিনি নিজেকে খিলাফতের হকদারও মনে করতেন না। মুয়াবিয়া (রা.)-কে কেউ এ কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি তা অকপটেই স্বীকার করতেন। এমনকী মুয়াবিয়া (রা.) ও তাঁর সাথিবর্গ কখনোই এমনটা ভাবেননি যে, তাঁরা আলি (রা.)-এর সাথে যুদ্ধ করবেন এবং জয় করবেন।
বরং আলি (রা.) ও তাঁর সাথিবর্গ মনে করতেন, আলি (রা.)-এর হাতে বাইয়াত নেওয়া এখন ওয়াজিব। কেননা, মুসলিমদের দুজন খলিফা থাকাটা কিছুতেই কাম্য নয়। মুয়াবিয়া (রা.)-এর সমর্থকগণ আলি (রা.)-এর আনুগত্য থেকে বের হয়ে একটি ওয়াজিব পালন থেকে নিজেদের বিরত রেখেছে। আর অপরপক্ষের লোকেরা ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার দরুন তাঁদের বিপক্ষে যুদ্ধ করে এই ওয়াজিব পালনের প্রতি আগ্রহী করে তোলাকে উপযুক্ত কৌশল বলে মনে করেছেন-যাতে করে 'ইতায়াত' ও 'জামায়াত' তথা আনুগত্য ও একতা ফিরে আসে।
মুয়াবিয়া (রা.)-এর সমর্থকগোষ্ঠীর বক্তব্য হলো-আলি (রা.)-এর আনুগত্য তাঁদের জন্য ওয়াজিব নয়। তাঁদের ওপর যখন হামলা করা হয়, তখন তাঁরা মজলুম ছিল। অর্থাৎ তাঁদের ওপর হামলাটি ছিল নিতান্তই জুলুম। কারণ, উসমান (রা.)-এর হত্যাটা সকল মুসলিমের মতেই একটা জুলুম ছিল। আর আলি (রা.)-এর সৈন্যদল যখন অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল, তখন তাঁদের লোকেরাই এই হত্যাটা করেছে। আমরা যখন আলি (রা.)- এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করলাম, তখন হামলাকারীরা আমাদের ওপর জুলুম ও অবিচার করেছে। আলি (রা.)-এর পক্ষে তাদের দমন করা সম্ভব হয়নি। যেমনিভাবে উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের দমন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই আমাদের উচিত এমন একজন খলিফার কাছে বাইয়াত নেওয়া, যে আমাদের ওপর ইনসাফ করার সক্ষমতা রাখে।
আলি (রা.) ও উসমান (রা.) সম্পর্কে কিছু মিথ্যা ধারণা
উভয়পক্ষের কিছু জাহেল উসমান ও আলি (রা.) সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা পোষণ করেছে। (আল্লাহ তাঁদের দুজনকে সেই মিথ্যা থেকে বাঁচান)। তারা বলে-'আলি (রা.) উসমান (রা.)-কে হত্যার আদেশ দিয়েছেন।' আলি (রা.) যদিও কোনো প্রকার কসম খাওয়া ব্যতীতই সত্যবাদী, তবুও তিনি কসম খেয়ে বলতেন, তিনি এই হত্যা করেননি এবং এই হত্যায় তাঁর কোনো মত ছিল না এবং এই হত্যায় তাঁর কোনো সহযোগিতাও ছিল না।
নিঃসন্দেহে এটা আলি (রা.)-এর বহুল প্রচলিত একটি উক্তি। এই কথার ওপর তাঁর অনুসারী ও শত্রুগণ দুই দলে ভাগ হয়ে যায়। তাঁর ভক্তরা এ থেকে প্রেরণা পায় উসমান (রা.)-কে কলুষিত করার। তাঁরা মনে করে, তিনি হত্যাযোগ্য। তাঁকে হত্যা করা উচিত। আলি (রা.) তাঁকে হত্যার আদেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে আলি (রা.)-এর শত্রুরা তাঁকে এই বলে দোষারোপ করে যে, তিনি নির্যাতিত খলিফা উসমান (রা.)-কে হত্যার আদেশ দিয়েছেন। উসমান (রা.) আত্মসংবরণ করেছেন। নিজেকে বাঁচাতে তিনি কোনো মুসলিমকে হত্যা করেননি। অতএব, আলি (রা.)-এর আনুগত্যের কোনো প্রশ্নই আসে না।
এ জাতীয় বহু বিষয় তাঁদেরকে উসমানিয়া ও আলাওইয়্যা সম্প্রদায়ে বিভক্ত হতে প্ররোচিত করেছে।
সর্বসম্মতভাবে মুয়াবিয়া (রা.) আলি (রা.)-এর সমকক্ষ নন
এ দলগুলোর সবাই একটি বিষয়ে একমত যে, মুয়াবিয়া (রা.) খিলাফতের ক্ষেত্রে আলি (রা.)-এর সমকক্ষ নন। তাহলে আলি (রা.)-এর খলিফা হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আরেকজন খলিফা নির্বাচন করা জায়েজ হয় কীভাবে? কেননা, আলি (রা.)-এর বিদ্যা-বুদ্ধি, সাবিকিয়্যাত (ইসলাম গ্রহণে অগ্রবর্তিতা) পরহেজগারিতা ও সাহসিকতাসহ তাঁর যাবতীয় শ্রেষ্ঠত্ব তাঁদের কাছে স্পষ্ট ছিল; যেমনিভাবে আবু বকর, উমর, উসমান (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব সর্বজনবিদিত ছিল।
তিনি ও সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) ছাড়া আহলে শূরার আর কেউ জীবিত ছিলেন না। সাদ (রা.) এসব বিষয় থেকে নিজেকে সব সময় দূরে রাখতেন। তাই অবধারিতভাবেই উসমান ও আলি (রা.)-এর ওপর এই গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়। উসমান (রা.)-এর ইন্তেকালের পর খিলাফতের একমাত্র যোগ্য উত্তরাধিকারী বা সহযোগী রয়ে গেলেন আলি (রা.)। তবে বিপত্তির উদয় হলো তখনই, যখন উসমান (রা.)-কে হত্যা করা হলো। তাঁর মৃত্যুতে জালিম ও শত্রুশিবিরের লোকেরা শক্তিশালী হয়ে উঠল। জ্ঞানী ও ঈমানদার লোকেরা দুর্বল হয়ে পড়ল। পরস্পরে বিভেদ-বিভাজন দেখা দিলো। যার ফলে দেখা গেল, লোকেরা যোগ্য লোকের বদলে অযোগ্য লোকের কথা শুনতে লাগল।
এজন্য আল্লাহ একতা ও সম্প্রীতির প্রতি খুব জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিভেদ-বিভাজন থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। তাই বলা হয়, বিভেদমূলক কাজে একমত হওয়ার চেয়ে দলবদ্ধভাবে অপছন্দনীয় কাজ করাও শ্রেয়।
আম্মার (রা.)-কে হত্যাসংক্রান্ত বুখারির হাদিসটি কি সহিহ
'নিশ্চয়ই আম্মারকে একদল বাগি হত্যা করবে'-হাদিসটি যদিও ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর সহিহ মুসলিমে এনেছেন, তবুও একদল এর ওপর আপত্তি উত্থাপন করেছেন। উক্ত হাদিসটি বুখারিতেও এসেছে। ১০৭
কেউ কেউ এই হাদিসটির ভিন্ন ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এখানে বাগি দ্বারা মূলত সেসব বাগি উদ্দেশ্য, যারা উসমান (রা.)-এর রক্তপিপাসু হয়ে উঠেছিল। যেমন: তারা উসমান (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলত-
'আমরা আফফানের বেটাকে আমাদের বর্শার অগ্রভাগে দেখতে চাই।'
যাহোক, এসব অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেননা, রাসূল যা বলেছেন, তা যথার্থই সত্য। আর 'আম্মারকে একদল (অবাধ্যাচারী বিদ্রোহী) বাগি দল হত্যা করবে'- কথাটা দ্বারা আমরা ইতঃপূর্বে যা প্রমাণ করেছি (তথা উভয়পক্ষের লোকেরাই মুমিন ছিলেন), তা মিথ্যা কিংবা অসত্য প্রমাণিত হয় না। কারণ, আল্লাহ নিজেই বলেছেন-
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
'যদি মুমিনদের দুটি দল মারামারি করে, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একদল অন্য দলের ওপর বাড়াবাড়ি (বাগাওয়াত) করে, তাহলে যে দল বাড়াবাড়ি (বাগাওয়াত) করবে, তোমরা তার বিরুদ্ধে লড়বে; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে (আল্লাহর নির্দেশ মেনে নেয়)। যদি ফিরে আসে, তাহলে তোমরা উভয়ের মধ্যে ন্যায়ের সাথে মীমাংসা করে দেবে এবং সুবিচার করবে। আল্লাহ تو সুবিচারকারীদেরই ভালোবাসেন।' সূরা হুজুরাত : ৯
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ -
'নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পরে ভাই। তাই তোমাদের ভাইদের মাঝে তোমরা সন্ধি করে দাও।' সূরা হুজুরাত : ১০
এখানে পরস্পরে হত্যা ও বাগাওয়াত বা বাড়াবাড়ির উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও তাদের সকলকে মুমিন ও ভাইরূপে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। আল্লাহ বাগি বা বাগাওয়াতকারী দলের সাথে যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও তাদের মুমিন হিসেবে গণ্য করেছেন। সর্বোপরি একজন সাধারণ মানুষের অবাধ্যতা, বাগাওয়াত, জুলুম ও শত্রুতা যখন তাকে ঈমানের গণ্ডি থেকে বের করে দেয় না এবং তার ওপর লানত বর্ষণ করাকে ওয়াজিব করে না, তখন কীভাবে একজন 'খাইরুল কুরুন' তথা 'সর্বোত্তম সময়ের মানুষকে ঈমানের গণ্ডি থেকে বের করে দেবে এবং তার ওপর লানত করাকে আবশ্যক করবে?
বাগির প্রকারভেদ
এখানে একটা বিষয় জানা দরকার যে জালিম, বাগি, অতিরঞ্জনকারী কিংবা পাপাচারী-এরা প্রত্যেকেই দুই ভাগে বিভক্ত।
এক. ব্যাখ্যা সাপেক্ষ এবং
দুই. ব্যাখ্যাহীন।
যাদের অসংগত আমলের ব্যাখ্যা রয়েছে, তারা হলেন মুজতাহিদ। ইলম ও দ্বীনের বিষয়ে আন্তরিক যে বিশেষজ্ঞগণ ইজতিহাদ করেছেন, তাদের একদল কিছু জিনিসকে হালাল মনে করেছেন, অপরদল সে জিনিসগুলোকে হারাম মনে করেছেন। যেমন: কতিপয় মুজতাহিদ মদের কিছু প্রকারকে হালাল বলেছেন। আবার কতিপয় মুজতাহিদ কিছু সুদি কারবারকে বৈধ জ্ঞান করেছেন। এ জাতীয় কাজ বড়ো বড়ো সালাফদের নিকট থেকেও প্রকাশিত হয়েছে। এরা হলেন ব্যাখ্যা সাপেক্ষে বাগি। তারা নিজেদের সিদ্ধান্তে ভুলের শিকার হয়েছেন। আর কুরআনে এসেছে-
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا -
'হে আল্লাহ! আমরা যদি ভুলে যাই অথবা ভুল করে বসি, তাহলে আমাদের পাকড়াও কোরো না।' সূরা বাকারা: ২৮৬
সহিহ হাদিসে এই দুআটির কবুল হওয়ার ব্যাপারে প্রমাণ পাওয়া যায়। ১০৮
এক্ষেত্রে সোলাইমান (আ.) ও দাউদ (আ.) সম্পর্কে বর্ণিত একটি শস্যক্ষেত্র নিয়ে বিচারের বিখ্যাত ঘটনাটি প্রণিধানযোগ্য। তাঁদের দুজনের প্রজ্ঞা ও জ্ঞান সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা যদিও প্রশংসা করেছেন, তবুও একজনকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞানে বিশেষত্ব দান করেছেন। আলিমদের বিষয়টিও অনুরূপ। কারণ, তাঁরা নবিদের উত্তরসূরি। তাই তাঁরা একজন একটি মাসয়ালায় যা বুঝেছেন, অপরজন তা বোঝেননি। এতে তাঁদের নিন্দা করা যাবে না এবং তাঁদের বিদ্যা-বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও একনিষ্ঠতায় এটা কোনো প্রভাব ফেলবে না।
তবে গুনাহ জেনেও কেউ যদি ভিন্ন হুকুম দেয়, তাহলে সে গুনাহের শিকার হবে এবং জালিম বলে বিবেচিত হবে। আর এর ওপর লাগাতার আমল করে ফাসিক বিবেচিত হবে। অধিকন্তু কেউ যদি কোনো আমলকে নিশ্চিত গুনাহ জেনেও তাকে হালাল মনে করে, তাহলে তা কুফরি কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে।
বাগির গুনাহ মাফ হয়
বাগি যদি মুজতাহিদ হয় এবং সে নিজেকে বাগি মনে না করে; বরং হকের অনুসারী মনে করে (aunque তার এই মনে করাটা ভুল হয়), তবে তাকে 'গুনাহকারী বাগি' বলে আখ্যায়িত করা হবে না। তাই তার ফাসিক হওয়াটা কখনো সম্ভব না।
'ব্যাখ্যা সাপেক্ষে বাগিদের সাথে যুদ্ধের কথা যারা বলেন, তাদের বক্তব্য হলো-'আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করার আদেশ দিই, যাতে তাদের বাগাওয়াত বা অবাধ্যতা সমাজে বিশৃঙ্খলা বা ব্যাপক ক্ষতির প্রাদুর্ভাব ঘটাতে না পারে। তাদের কৃত কাজকে অপরাধ মনে করে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না; বরং (তাদের কাজের অনিবার্য বিরূপ প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে কিংবা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায়) শত্রুপক্ষ যেন রাষ্ট্রের শান্তি ও সংহতি নষ্ট করার সুযোগ না পায়, সেজন্যই যুদ্ধ করা হচ্ছে।'
তাঁরা আরও বলেন-'এই প্রকার বাগিদের 'আদালত' বা সত্যনিষ্ঠতা অক্ষত থাকবে। তাদের চরিত্রে এই কাজের জন্য কোনো প্রকার অভিযোগ আরোপ করা হবে না। তারা ফাসিক নন। তারা 'গাইরে মুকাল্লাফদের' (যাদের ওপর শরিয়তের হুকুম আরোপ হয় না।) অনুরূপ। অর্থাৎ শিশু, উন্মাদ, বিস্মৃতিপরায়ণ, বেহুঁশ ও ঘুমন্ত ব্যক্তির মতো গাইরে মুকাল্লাফদের যেমন অরাজক কর্মকাণ্ড করতে বাধা দেওয়া হয়ে থাকে, তেমনি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বাগিদের অরাজক কাজেও বাধা দিতে হবে। এমনকী চতুষ্পদ প্রাণীকেও বাধা দিতে হবে। কুরআনের আয়াত অনুযায়ী-কেউ যদি ভুলবশত কাউকে হত্যা করে ফেলে, তাহলে তার ওপর দিয়াত ওয়াজিব হবে; যদিও হত্যাকারী গুনাহগার হবে না। আবার হদ্দ তথা দণ্ডপ্রাপ্য ব্যক্তি যদি তওবা করে, হাদিস অনুযায়ী তার তওবা আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে।
প্রসঙ্গত 'ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বাগি'-কে ইমাম মালেক, শাফেয়ি ও আহমদ (রহ.)-এর মতে দোররা মারা হবে।
আর বাগি যদি 'ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বাগি' না হয় তথা নিরেট বাগি হয়, তাহলে সে গুনাহগার বিবেচিত হবে। আর গুনাহ বিভিন্ন ওসিলার মাধ্যমে মাফ হয়ে যায়। ভালো কাজ ও বিপদাপদের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের গুনাহকে মাফ করে দেন।
আম্মার (রা.) সম্পর্কিত হাদিসে মুয়াবিয়া (রা.)-এর নাম নেই
আম্মার (রা.)-এর হত্যা সম্পর্কিত আলোচ্য হাদিসটিতে মুয়াবিয়া (রা.) ও তাঁর অনুসারীদের কোনো উল্লেখ নেই। এই হাদিসে সম্ভবত ওই গোষ্ঠীটির কথা বলা হয়েছে, যারা আম্মার (রা.)-কে হত্যার জন্য প্রলুব্ধ হয়েছে এবং তাঁকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়েছে। এরা হচ্ছে সেনাবাহিনীর ক্ষুদ্র একটি দল। যারা আম্মার (রা.)-এর হত্যাকে সমর্থন করে, তারাও ওই ক্ষুদ্র সেনাদলটির পরিণাম ভোগ করবে। আর এটা জানা কথা, পুরো বাহিনীতে এমন সদস্য অনেক ছিল, যারা এই হত্যাকে মোটেই সমর্থন করেনি। যেমন: আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) সহ কিছু সাহাবি; বরং বলা ভালো, সবাই আম্মার (রা.)-এর হত্যায় অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এমনকী মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.)ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
বর্ণিত আছে, আম্মার (রা.)-কে যারা হত্যা করেছেন, তাদের বদলে যারা তাঁকে যুদ্ধের ময়দানে হাজির করেছেন, তাদেরই মুয়াবিয়া (রা.) তাঁর হত্যার জন্য দায়ী করেছেন। মুয়াবিয়া (রা.)-এর বক্তব্যকে আলি (রা.) প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন- 'তাহলে তো হামজা (রা.)-এর হত্যাকারী আমরা সবাই! 'কারণ, তাঁকে তো মক্কার কাফিরদের বিরুদ্ধে সকল মুসলিমই হাজির করেছিলেন।'
এখানে আলি (রা.)-এর বক্তব্য নিঃসন্দেহে সঠিক। তবে কেউ যদি ওইসব বাহাসকারী আলিম-যাদের মাঝে যুদ্ধ ও রাজত্বের বিষয় নিয়ে কোনো বিরোধ নেই, তাদের বক্তব্যের ওপর নজর দেয়, তাহলে দেখা যাবে- মুয়াবিয়া (রা.)-এর চেয়ে ঢের দুর্বল মতামত ও ব্যাখ্যা তাদের রয়েছে। তা ছাড়া এমন ব্যাখ্যা (মুয়াবিয়া রা.-এর ব্যাখ্যাটি) যিনি করেছেন, তিনি নিজেকে আম্মার (রা.)-এর হত্যাকারী মনে করবেন না। তাই সে কিছুতেই নিজেকে বাগি হিসেবে বিশ্বাস করবে না। আর যে নিজের বাগি হওয়ার বিষয়টি অবিশ্বাস করে, সে কার্যত বাগি হলেও তাকে ব্যাখ্যাগত ভুলের শিকার বা ভুল ইজতিহাদ করেছেন বলে ধরা হবে।
জ্যেষ্ঠ সাহাবি ও ফুকাহাদের অভিমত
সাহাবি ও ফুকাহাদের কেউ-ই আম্মার (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কথা বলেন না। এ ব্যাপারে জ্যেষ্ঠ সাহাবিদের দুটো প্রসিদ্ধ মত পাওয়া যায়। একদল আম্মার ও তাঁর দলের সাথে যুদ্ধে শরিক হওয়ার কথা বলেন। আরেক দল এরূপ যুদ্ধের সর্বত বিপক্ষে। এই দুই দলেই বড়ো বড়ো অগ্রগণ্য সাহাবি রয়েছেন। তাই দেখা যাচ্ছে, প্রথম দলে রয়েছেন আম্মার, সাহল ইবনে হুনাইফ ও আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)। আর দ্বিতীয় দলে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা, উসামা ইবনে জায়েদ ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর মতো বড়ো বড়ো সাহাবিগণ। খুব সম্ভবত বড়ো বড়ো সাহাবিদের অধিকাংশই ছিলেন এই দলে; অর্থাৎ এই যুদ্ধের বিপক্ষে। উভয় দলে আলি (রা.)-এর পর সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ সাহাবি আর কেউ ছিলেন না। আর তিনি ছিলেন যুদ্ধের বিপক্ষে।
আম্মার (রা.)-এর হাদিস দিয়ে ভুল দলিল প্রদান
আম্মার (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসটি যুদ্ধের সপক্ষের লোকেরা নিজেদের পক্ষে দলিল দিয়ে থাকে। কারণ, যদি আম্মার (রা.)-কে একদল বাগি হত্যা করে, তাহলে আল্লাহর কথা- 'যারা বাগাওয়াত করে, তাদের হত্যা করো' (সূরা হুজুরাত: ৯)-এর ওপর আমল করা সহজ হয়ে যাচ্ছে। আর যারা যুদ্ধ থেকে বিরত ছিল, তাঁদের দলিল হলো রাসূলের সহিহ হাদিস- 'ফিতনার সময় যুদ্ধের চেয়ে উত্তম হলো যুদ্ধ না করে ফিতনা থেকে দূরে থাকা। '১০৯
আর তাঁরা মনে করতেন, এটা ফিতনার যুদ্ধ। কেননা, এ ব্যাপারে বহু সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসূল এই ফিতনার মুহূর্তে যুদ্ধ করার আদেশ দেননি এবং পছন্দও করেননি; বরং তিনি এই মুহূর্তে সন্ধি করাকেই পছন্দ করেছেন। আল্লাহ তায়ালাও এই মুহূর্তে যুদ্ধ করার কোনো আদেশ দেননি; বরং তিনি আদেশ দিয়েছেন-মুসলিমদের দুপক্ষের মাঝে যারা বাগাওয়াত করবে এবং সন্ধি করতে সম্মত হবে না, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। যেমন: আল্লাহ বলেন-
'যদি মুমিনদের দুটি দল মারামারি করে, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একদল অন্যদলের ওপর বাড়াবাড়ি (বাগাওয়াত) করে, তাহলে যে দল বাড়াবাড়ি করবে, তোমরা তার বিরুদ্ধে লড়বে; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে (আল্লাহর নির্দেশ মেনে নেয়)। যদি ফিরে আসে, তাহলে তোমরা উভয়ের মধ্যে ন্যায়ের সাথে মীমাংসা করে দেবে এবং সুবিচার করবে। আল্লাহ তো সুবিচারকারীদেরই ভালোবাসেন।' সূরা হুজুরাত : ৯
সুতরাং প্রথম যারা যুদ্ধ শুরু করেছে, তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছে। অর্থাৎ প্রথম আক্রমণের ব্যাপারে আল্লাহর অনুমোদন নেই। এমনকী আল্লাহ বাগাওয়াতের (জুলুমের) শিকার সকল ব্যক্তিকে অনুমোদন দেন না বাগাওয়াতকারীকে হত্যা করার। কেননা, যেকোনো বাগাওয়াতকারীকেই হত্যা করাটা কুফরি। প্রকৃত অর্থে, অধিকাংশ মুমিনই বাগাওয়াত করে থাকে; বরং অধিকাংশ মানুষই কোনো না কোনো অনাচার ও বাগাওয়াতে লিপ্ত। কিন্তু যখন মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হবে, তখন আবশ্যক হলো তাদের মাঝে সন্ধি করে দেওয়া। আর যদি দুটি দলের একটিকেও যুদ্ধের আদেশ দেওয়া না হয়, তখন আক্রমণকারী দলটি বাগি সাব্যস্ত হবে এবং তাদের হত্যা করা হবে। কেননা, আক্রমণকারী দলটি যুদ্ধ প্রত্যাখ্যান করে সন্ধির পথ অবলম্বন করেনি। সুতরাং বাগি দলটির ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচার একটিই উপায়-তাদের সাথে যুদ্ধ করা, তাদের হত্যা করা। তাই এই দলটিকে হত্যা করা দ্বিতীয় দলের জন্য কোনো আক্রমণকারীকে হত্যার অনুরূপ হবে, তথা আত্মরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে। কেননা, এখানে আক্রমণ বা জুলুম থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো হত্যা করা। যেমনটা রাসূল বলেছেন—
'যে লোক নিজের সম্পদ বাঁচাতে গিয়ে নিহত হয়েছে, সে শহিদ। যে নিজেকে বাঁচানোর জন্য নিহতে হয়েছে, সেও শহিদ। যে ব্যক্তি দ্বীনের জন্য নিহত হয়েছে, সেও শহিদ এবং যে নিজের সম্মান রক্ষার জন্য নিহত হয়েছে, সেও শহিদ।'১১০
অতএব, আলি ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যকার যুদ্ধের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সেনাদলকে যখন বাগি সাব্যস্ত করা হচ্ছে, তখনও যুদ্ধ ও হত্যার বদলে প্রথমে সন্ধির বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিতে হবে। তবে 'তাঁরা আগে হামলা করেছে'-এই অজুহাতেও আলি (রা.)-এর পক্ষের লোকদের হত্যা করা জায়েজ নেই। কারণ, আলি (রা.)-এর সাথে যুদ্ধ থেকে পলায়নকারী লোকও ছিল, যারা আলি (রা.)-এর বেশি বিরোধিতা করত; এরা দুর্বল অনুসারী ছিল।
মোটকথা, এই হাদিসটি কিছুতেই কোনো সাহাবিকে অভিশাপ ও লানত করার বৈধতা দেয় না। এমনকী কাউকে ফাসিক সাব্যস্ত করারও বৈধতা দেয় না।
আহলে বাইত বা নবিপরিবারের কেউ কখনো গালি দেয়নি, আলহামদুলিল্লাহ!
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বনু হাশিমের কাউকে হত্যা করেনি
হাজ্জাজ বনু হাশিমের কাউকে হত্যা করেনি। তবে সে আরবের অভিজাত লোকদের হত্যা করেছে। সে আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা.)-এর মেয়েকে বিয়ে করেছিল। তা বনু হাশিম, বনু আবদে মানাফ ও বনু উমাইয়ার লোকেরা পছন্দ করেনি। এমনকী তাঁরা তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদও ঘটিয়েছিল। কেননা, তাঁরা হাজ্জাজকে নিজেদের 'কুফু' বা সমকক্ষ মনে করেনি। এই ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন!
টিকাঃ
৮৬. বুখারি: ৩৬৭৩, মুসলিম: ২৫৪০
৮৭. বুখারি: ৬০৪৭
৮৮. বুখারি: ২৬৫১, মুসলিম: ১৭৬
৮৯. বুখারি: ২৮৯৭, মুসলিম: ২০৮
৯০. মুসলিম: ২৪৯৬, ৬২৯৮
৯১. বুখারি: ৩১৮১
৯২. মুসলিম: ১২১
১০০. আমর ইবনুল আস (রা.) যেমন ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে সকল গুনাহ থেকে মুক্ত হয়েছেন, একইভাবে মুয়াবিয়া (রা.) ও ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে সকল পাপ থেকে মুক্ত হয়েছেন।- অনুবাদক
৯৪. বুখারি: ৮০৪
৯৫. আহমাদ: ১৭১৫২
৯৬. মুয়াত্তা ইমাম মালেক: ১০
৯৭. বুখারি: ৭২৫৫
৯৮. তিরমিজি: ৩৬৮২
৯৯. ভিন্ন শব্দে তিরমিজিতে এসেছে: ৩৬৮৬
১০০. বুখারি: ৩৬৮৩
১০১. বুখারি: ৬৭৮০
১০২. তিরমিজি: ১২৯৫
১০০. মুসলিম: ২৪৯৫
১০৪. বুখারি: ৩০০৮, মুসলিম: ১৬১
১০৫. বাজ্জার: ২৬৯৫, মাজমাউজ জাওয়াইদ: ৯/৩০৪
১০৬. আবু দাউদ: ৩১১৬
১০৭. বুখারি শরিফে বর্ণিত হাদিসটি সম্পর্কে এখানে কিছু কথা বলা খুবই জরুরি।
ক. ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এখানে হাদিসটির একটি অংশ উল্লেখ করে বিপক্ষের মতাদশর্কে খণ্ডন করেছেন। তবে হাদিসটির পরবর্তী অংশটিও আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মতার্দশকে মজবুতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পরবর্তী অংশটি হলো-'আম্মার (রা.) তাদের জান্নাতের প্রতি আহ্বান করবে, আর তারা (বাগিরা) আম্মার (রা.)-কে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করবে।' স্বভাবতই এখানে প্রশ্ন ওঠে-যারা আম্মার (রা.)-কে হত্যা করেছে, তারা কি তাহলে জাহান্নামি? নচেৎ তারা আম্মার (রা.)-কে কেন জান্নাতের বদলে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করবে?
এর উত্তরে ইবনে কাসির (রহ.) বলেন- 'এখানে জান্নাত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, উম্মাহর ঐক্য। আর জাহান্নাম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, উম্মাহর বিভাজন (আল বিদাআ ওয়ান নিহায়া : ৪/৫৩৮)।' অর্থাৎ আম্মার (রা.) তাদের ঐক্যের (আলি রা.-এর আনুগত্য করার) প্রতি আহ্বান করবেন, আর তারা আম্মার (রা.)-কে বিভাজনের প্রতি তথা ইমামের আনুগত্য না করার প্রতি আহ্বান করবেন। আর এটা তারা করেছিলেন নিজস্ব ইজতিহাদের আলোকে। ইসলামে ইজতিহাদ বৈধ। সেই বিবেচনায় সাহাবিদের একটি দলের সম্মিলিত ইজতিহাদ নিয়ে তো সন্দেহ পোষণের কোনো অবকাশই নেই। তা ছাড়া কুরআন মাজিদেও বিভাজনের ফলাফলকে জাহান্নام বা অগ্নিকুণ্ডের সাথে তুল্য বিবেচনা করা হয়েছে। (দ্রষ্টব্য আলে ইমরান : ১০২-৬) যাই হোক, এই হাদিসের মাধ্যমে রাসূল যেন কিছুটা স্পষ্টভাবেই বলে দিলেন, কোন দলটি বেশি সঠিক।
খ. 'নিশ্চয়ই আম্মারকে একদল বাগি হত্যা করবে'-বুখারি শরিফে বর্ণিত হাদিসের এই অংশটি সম্পর্কে বড়ো বড়ো মুহাদ্দিসিন ও ইমামগণের আপত্তি রয়েছে। ইমাম হামিদি (মৃ.-৪৮৮ হি.) তাঁর আল জামউ বইনাস সাহিহাইন গ্রন্থে (২/৪৬২), ইমাম বাইহাকি (মৃ.-৪৮৮ হি.) তাঁর দালাইলুন নবুওয়াহ গ্রন্থে (২/৫৪৬), ইমাম ইবনুল আসির (মৃ. ৬০৬ হি.) তাঁর জামিউল উসুল গ্রন্থে (৯/৪৩), ইমাম মিজ্জি (মৃ-৭৪২ হি.) তাঁর তুহফাতুল আশরাফ গ্রন্থে (৩/৪২৭), ইমাম জাহাবি (মৃ.-৭৪৮ হি.) তাঁর তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে (২/৯), ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (মৃ.-৮৫২ হি.) তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে (১/৫৪২) বলেছেন, হাদিসের এই অংশটি বুখারির মূল নুসখায় নেই। ইবনে হাজার বলেন- 'কতিপয় মুহাদ্দিস মনে করেন, এই অংশটিকে ইমাম বুখারি (রহ.) লেখার পর মুছে দিয়েছেন। কারণ, এই অংশটুকু তাঁর হাদিস গ্রহণের শর্তমতে সিদ্ধ নয়।' ইমাম জাহাবি বলেছেন-'এই অংশটি বুখারিতে যদিও নেই, তবুও তা প্রমাণসিদ্ধ।'
১০৮. মুসলিম: ১২৫
১০৯. বুখারি: ৭০৮১
১১০. আবু দাউদ: ৪৭৭২, তিরমিজি: ১৪২১