📄 পূর্বেকার শরিয়ত ও আমাদের শরিয়তে রাজতন্ত্র
পূর্বেকার শরিয়তে রাজতন্ত্র
ইতঃপূর্বেই আলোচনা করেছি, আমাদের পূর্বেকার শরিয়তে রাজতন্ত্রের বিধান কী ছিল। আমাদের শরিয়তে রাজতন্ত্র কি বৈধ? নবুয়তি খিলাফত মুস্তাহাব, নাকি আরও উত্তম কিছু? নাকি ওয়াজিব? নাকি নবুয়তি খিলাফত বাদ দিয়ে রাজতন্ত্র গ্রহণ করা কেবল তখনই বৈধ হবে, যখন কোনো অপারগতা দেখা দেবে; যেমনটা অপরাপর ওয়াজিবের বেলায় হয়ে থাকে?
পূর্বেকার শরিয়তে রাজতন্ত্র বৈধ ছিল। আল্লাহ তায়ালা কখনো কখনো নবি ও সৎকর্মকারীদের ধন-সম্পদও দান করেছেন। যেমন : দাউদ (আ.) সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ
‘আল্লাহ তাঁকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করেছেন এবং তাঁর যা ইচ্ছা শিক্ষা দিয়েছেন।’ সূরা বাকারা : ২৫১
সোলায়মান (আ.) সম্পর্কে বলেছেন-
قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِنْ بَعْدِي إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ
'হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে এমন রাজত্ব দান করুন-যা আমার পরে আর কারও জন্য প্রযোজ্য হবে না। নিশ্চয়ই আপনি পরম দানশীল।' সূরা সোয়াদ : ৩৫
ইউসুফ (আ.) সম্পর্কে বলেছেন-
رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ -
'হে রব! আপনি আমাকে রাজত্ব দিয়েছেন এবং আমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিখিয়েছেন।' সূরা ইউসুফ : ১০১
এই তিনজন নবিকে আল্লাহ নিজেই রাজত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।
তিনি আরও বলেছেন-
أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ فَقَدْ آتَيْنَا آلَ إِبْرَاهِيمَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَآتَيْنَاهُمْ مُلْكًا عَظِيمًا - فَمِنْهُمْ مَنْ امَنَ بِهِ وَمِنْهُمْ مَنْ صَدَّ عَنْهُ وَكَفَى بِجَهَنَّمَ سَعِيرًا -
'নাকি আল্লাহ তাঁদের ওপর যে অনুগ্রহ করেছেন, সেজন্য লোকেরা হিংসা করে? অতএব, আমি ইবরাহিমের বংশধরদের কিতাব ও প্রজ্ঞা দিয়েছি এবং দিয়েছি মহান রাজত্ব। তাই তাদের কেউ ঈমান এনেছে এবং কেউ বিরত থেকেছে। আর দগ্ধকারী হিসেবে জাহান্নামই যথেষ্ট।' সূরা নিসা : ৫৪-৫৫
এখানে ইবরাহিম ও দাউদ (আ.)-এর বংশধরদের রাজত্ব দেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-
تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ -
'যাকে খুশি তুমি রাজত্ব দাও।' সূরা আলে ইমরান : ২৬
এই আয়াতের তাফসিরে ইমাম মুজাহিদ (রহ.) খোদ নবুয়তকেই 'রাজত্ব' বলে আখ্যা দিয়েছেন।
নবুয়ত, রাজত্ব এবং নবিদের তিনটি অবস্থান
নবুয়তের কিছু অংশ অনেকটা রাজক্ষমতার মতো। নবিদের কাউকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে এবং তাঁদের অনুসরণ ও আনুগত্য করা হয়নি। তাঁরা হলেন রাজত্বহীন নবি। আবার নবিদের কাউকে অনুসরণ ও আনুগত্য করা হয়েছে। এই মান্য হওয়ার মাধ্যমেই তিনি রাজ্যাধিকারী হয়ে ওঠেন। তবে নবি যা করতে আদিষ্ট হয়েছেন, শুধু যদি তা-ই করতে অনুসারীদের আদেশ দেন, তাহলে তাঁকে বলা হবে 'বান্দা রাসূল'। তাঁর কোনো রাজত্ব নেই। আর নবি নিজে যা মুবাহ বা জায়েজ মনে করেন, তাও যদি অনুসারীদের আদেশ দেন, তাহলে তিনি রাজা বলে বিবেচিত হবেন। যেমন: সোলায়মান (আ.)-কে বলা হয়েছে-
هُذَا عَطَاؤُنَا فَامْنُنْ أَوْ أَمْسِكْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
'এটা আমার অনুগ্রহ-তুমি এটা অন্যকে দান করো অথবা নিজের জন্য রেখে দাও, এর কোনো হিসাব নেওয়া হবে না।' সূরা সোয়াদ: ৩৯
অতএব, তিনি হলেন রাজা বা 'বাদশাহ নবি', যা 'বান্দা নবি'র বিপরীত। যেমনটা রাসূলকে বলা হয়েছে-'আপনি চাইলে "রাজা নবি” হতে পারেন কিংবা 'বান্দা নবি" হতে পারেন।'
'বান্দা নবি'-এর ব্যাখ্যা হলো-আনুগত্য ও অনুসরণ করা, যা নবুয়ত ও রিসালাতের একটি প্রকার এবং এই বিষয়গুলো নবুয়তকে পূর্ণতা দান করে। এটা আমাদের নবির মধ্যে ছিল। কেননা, তিনি ছিলেন বান্দা নবি। অনুসৃত ও মান্য। তাই তিনি অনুসৃত হওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছেন, যেন তিনি অনুসারীদের আদর্শ হয়ে মানবসমাজকে উপকৃত করতে পারেন। তারা তাঁর ওপর রহম করতে পারে এবং তিনিও যেন তাদের অনুগ্রহ করতে পারেন। তিনি রাজা হননি, যাতে করে রাজতন্ত্রে থাকা ক্ষমতা ও সম্পদের সম্ভোগ আখিরাতে তাঁর প্রতিদানে ঘাটতি বয়ে না আনে। তাই আল্লাহর কাছে রাজা রাসূলের চেয়ে বান্দা রাসূলই প্রিয়। তাই ইবরাহিম, নুহ ও মুসা (আ.)-এর অবস্থান সোলায়মান, দাউদ ও ইউসুফ (আ.)-এর চেয়ে মহত্তম। তাই সত্য যা-ই হোক, আহলে কিতাবের অনেকেই দাউদ ও সোলায়মান (আ.)-এর নবুয়তের ওপর আপত্তি করেছে, যেমনটা সাধারণ মানুষ অনেক সময় বিত্তবান ও ক্ষমতাশালী লোকদের শাসন সম্পর্কে করে থাকে।
সৎ রাজা-বাদশাহ এবং সাধারণ রাজা-বাদশাহদের ঐতিহ্য
আল্লাহ বলেন-
إِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ لَكُمْ طَالُوْتَ مَلِكًا قَالُوا أَي يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةً مِنَ الْمَالِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَه بَسْطَةً فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَه مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ - وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ آيَةَ مُلْكِهِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ التَّابُوْتُ
'আল্লাহ অবশ্যই তালুতকে তোমাদের রাজা করে পাঠিয়েছেন।' তারা বলল-'আমাদের ওপর তাঁর রাজত্ব কীভাবে হবে অথচ আমরা তাঁর চেয়ে রাজত্বের বেশি হকদার এবং তাঁকে প্রচুর ঐশ্বর্যও দেওয়া হয়নি!' তিনি বললেন- 'আল্লাহ অবশ্যই তাঁকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি তাঁকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন। বস্তুত আল্লাহ যাকে ইচ্ছে স্বীয় রাজত্ব দান করেন। আর আল্লাহ সর্বব্যাপী প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।' তাদের নবি তাদের বললেন-'তাঁর রাজত্বের নিদর্শন হলো "তাবুত” আসবে।' সূরা বাকারা: ২৪৭-২৪৮
আল্লাহ আরও বলেন-
وَيَسْأَلُونَكَ عَنْ ذِي الْقَرْنَيْنِ قُلْ سَأَتْلُو عَلَيْكُمْ مِنْهُ ذِكْرًا - إِنَّا مَكَّنَا لَهُ فِي الْأَرْضِ وَأَتَيْنَاهُ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ سَبَبًا -
'তারা তোমাকে জুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তুমি বলো, আমি তোমাদের তাঁর বর্ণনা শোনাব। আমি তাঁকে জমিনে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং প্রতিটি বিষয়ের উপায় ও পন্থা বাতলে দিয়েছি।' সূরা কাহাফ: ৮৩-৮৪
মুজাহিদ (রহ.) বলেন- 'দুজন কাফির ও দুজন মুমিন পৃথিবীকে শাসন করেছে। মুমিন দুজন হলেন সোলায়মান (আ.) ও জুলকারনাইন। আর কাফির দুজন হলেন বুখতে নাসর ও নমরুদ। এই উম্মতের পঞ্চম আরেকজন ব্যক্তি পৃথিবীকে শাসন করবেন।'
আল্লাহ আরও বলেছেন-
يَا قَوْمِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَعَلَ فِيكُمْ أَنْبِيَاءَ وَجَعَلَكُمْ مُلُوكًا -
'হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের যে নিয়ামত দেওয়া হয়েছে, তা স্মরণ করো। তিনি তোমাদের মধ্যে নবিদের পাঠিয়েছেন এবং তোমাদের রাজা বানিয়েছেন।' সূরা মায়েদা : ২০
কুরআনে রাজা (مَلِكٌ) শব্দটি অনেকবার এসেছে। যেমন-
وَكَانَ وَرَاءَهُم مَّلِكُ يَأْخُذُ كُلَّ سَفِينَةٍ غَصْبًا -
'তাঁদের পেছনে এমন এক রাজা রয়েছে, যে প্রতিটি নৌকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।' সূরা কাহফ : ৭৯
এ ছাড়াও যেমন-
وَقَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَى سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعَ سُنْبُلَاتٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَا بِسَاتٍ
'রাজা বলেন-নিশ্চয়ই আমি সাতটি দুর্বল গাভি সাতটি মোটাতাজা গাভিকে খেতে দেখেছি।' সূরা ইউসুফ : ৪৩
📄 সমাজে ইমাম বা শাসকদের অবস্থান
কুরআন, ইনসাফ ও তরবারি দিয়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠা
আল্লাহ রাসূল -কে পাঠিয়েছেন হিদায়াত ও সত্য ধর্ম দিয়ে, যাতে তিনি এই ধর্মকে সমস্ত ধর্মের ওপর বিজয় লাভ করাতে পারেন। তাই আল্লাহ এই উম্মতের জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন এবং নিয়ামতে পূর্ণ করেছেন। তিনি শাসনের জন্য একটি বিধান দিয়ে তা অনুসরণের আদেশ দিয়েছেন। আর জ্ঞানহীনদের অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। মুহাম্মাদ -এর ওপর অবতীর্ণ কিতাবকে অপরাপর কিতাবের ওপর প্রভুত্বকারী ও সত্যায়ক বানিয়েছেন। তাঁর জন্য আরও দিয়েছেন শরিয়ত ও জীবনবিধান। তাঁর উম্মতের জন্য দিয়েছেন হিদায়াতের বহুবিধ পন্থা।
দ্বীন কায়েম হবে কেবল কিতাব, ইনসাফ ও তরবারির মাধ্যমে। কিতাব পথপ্রদর্শন করবে। তরবারি তাকে সহযোগিতা করবে। আল্লাহ বলেন-
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَاَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيْهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ
'নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদের প্রেরণ করেছি প্রমাণাদি দিয়ে এবং তাঁদের সাথে দিয়েছি কিতাব ও ইনসাফ-যাতে মানুষ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আর দিয়েছি তরবারি, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য প্রচুর ক্ষমতা ও উপকার।' সূরা হাদিদ : ২৫
সুতরাং কিতাব দিয়ে জ্ঞান ও দ্বীন প্রতিষ্ঠা পায়। মিজান বা ইনসাফ দিয়ে অর্থনৈতিক চুক্তি ও অধিগ্রহণের অধিকার সাব্যস্ত হয়। আর তরবারি দিয়ে হুদুদ কায়েম হয় কাফির ও মুনাফিকদের ওপর।
তাই পরবর্তী যুগে কিতাব ছিল আলিম ও আবেদগণের চর্চায়। মিজান ছিল মন্ত্রী, আমলা, দাপ্তরিকদের চর্চায়। আর তরবারি ছিল শাসক ও সৈন্যদের চর্চায়। ভিন্ন ভাষায়-নামাজে কিতাব আর জিহাদে তরবারি।
সবচেয়ে বেশি আয়াত ও হাদিস নামাজ ও জিহাদ সম্পর্কে
তাই রাসূল যখনই কোনো রোগীকে দেখতে যেতেন, বলতেন- 'হে আল্লাহ! তোমার বান্দাকে তুমি সুস্থ করে দাও। (সুস্থ হয়ে) তোমার জন্য নামাজে সে হাজির হবে এবং তোমার শত্রুকে আঘাত করবে। '৫৪
রাসূল আরও বলেন- 'সবকিছুর মূল ইসলাম। ইসলামের মূল নামাজ। আর এর সর্বোচ্চ শিখর হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। '৫৫
তাই কুরআনে এই দুটোকে (নামাজ ও জিহাদ) অনেক জায়গায় একসঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ -
'তাঁরাই হলো মুমিন, যারা আল্লাহ ও রাসূলের ওপর ঈমান আনার পর সন্দেহ করেনি এবং তাঁদের জান-মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে।' সূরা হুজুরাত: ১৫
নামাজ হলো ইসলামের অগ্রগণ্য আমল এবং ঈমানি আমলের মূল। তাই কুরআনে একে ঈমান শব্দ দিয়ে ব্যক্ত করা হয়েছে-৫৬
وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ إِيْمَانَكُمْ -
'আর আল্লাহ এরূপ নন যে তোমাদের ঈমান বিনষ্ট করবেন।' সূরা বাকারা: ১৪৩
সালাফদের মতে, এখানে ঈমান অর্থ নামাজ। অর্থাৎ বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখী তোমাদের নামাজ। আল্লাহ বলেন-
اجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللهِ لَا يَسْتَوُونَ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
'হাজিদের পানি পান করানো আর মসজিদে হারামের আবাদ করাকে তোমরা কি তাঁদের কাজের সমান মনে করো, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করে? আল্লাহর দৃষ্টিতে এরা সমান নয়। (যারা ভ্রান্ত পথে আল্লাহর সন্তুষ্টি) খোঁজে এমন জালিম সম্প্রদায়কে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন না।' সূরা তাওবা: ১৯
তিনি আরও বলেন-
فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ اعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائم -
'অচিরেই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় প্রেরণ করবেন, যাদের তিনি ভালোবাসবেন। তাঁকেও তাঁরা ভালোবাসবে। তাঁরা মুমিনদের ওপর নমনীয়, কাফিরদের বেলায় কঠোর হবে। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ক্ষেত্রে তাঁরা কোনো নিন্দুকের নিন্দার তোয়াক্কা করবে না।' সূরা মায়েদা : ৫৪
তাঁদের গুণ বর্ণনায় 'ভালোবাসা' শব্দটিকে ব্যবহার করেছেন, যেটা নামাজের প্রকৃত গূঢ়ার্থ। যেমনটা তিনি বলেছেন-
مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللَّهِ وَ الَّذِيْنَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَعًا سُجَّدًا يَبْتَغُوْنَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا-
'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর যারা তাঁর সাথে ঈমান এনেছে, তাঁরা পরস্পরে নম্র এবং কাফিরদের বেলায় কঠোর। তাঁদের তুমি দেখবে রুকুকারীরূপে, সিজদারত হয়ে আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করছে।' সূরা ফাতহ : ২৯
এখানে তাঁদের গুণ বলতে গিয়ে কুফর ও গোমরাহির ক্ষেত্রে কঠোরতার কথা বলেছেন। সহিহ হাদিসে এসেছে-
'নবি -কে জিজ্ঞেস করা হলো-“কোন আমলটি উত্তম?” তিনি বললেন-"আল্লাহর ওপর ঈমান আনা এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।" তারপর জিজ্ঞেস করা হলো, "এরপর কোন কাজ উত্তম?” "মকবুল হজ।””৫৭
অথচ অন্য একটি সহিহ হাদিসে এসেছে, ইবনে মাসউদ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন-
'কোন আমল উত্তম?' নবিজি বললেন, 'ওয়াক্তমতো নামাজ।' ইবনে মাসউদ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন-'তারপর কোনটা?' তিনি বললেন, 'পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার।' আবার জিজ্ঞেস করলেন-'তারপর কোনটা?' নবিজি বললেন- 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। '৫৮
প্রথম হাদিসে 'আল্লাহর ওপর ঈমান' কথাটিতে নামাজও অন্তর্গত। তবে প্রথম হাদিসটিতে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার কথাটি নেই। কারণ, পিতা-মাতা তো সবার থাকে না। তাই প্রথমটি ব্যাপক এবং দ্বিতীয়টি যার পিতা-মাতা আছে তার জন্য নির্দিষ্ট।
জিহাদ ও নামাজে নেতৃত্ব দেবেন শাসক
রাসূলের যুগে, চার খলিফার আমলে এবং তাঁদের পথানুসারী আব্বাসি ও উমাইয়া শাসকদের যুগে নামাজ ও জিহাদ-এই মৌলিক দুই বিষয়ে নেতৃত্বে থাকতেন শাসকরাই। তাই যিনি নামাজের ইমাম, তিনিই জিহাদের ইমাম। রাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে জিহাদ ও নামাজের আদেশ অভিন্ন। তাই রাসূল যখন আত্তাব ইবনে উসাইদ (রা.)-কে মক্কায় এবং তায়েফে উসমান ইবনে আবুল আস (রা.)-কে গভর্নর নিযুক্ত করেন, তখন তাঁরাই নামাজে ইমামতি করতেন এবং হুদুদ কায়েম করতেন। একইভাবে রাসূল যখন কাউকে কোনো গাজওয়ার আমির নিযুক্ত করতেন-যেমন: জায়েদ ইবনে হারিসা, উসামা ইবনে জায়েদ ও আমর ইবনুল আস (রা.) প্রমুখ সাহাবিকে করেছিলেন-তখন যুদ্ধের আমিরই নামাজ পড়াতেন। এজন্যই আবু বকর (রা.)-কে যেহেতু রাসূল নামাজে ইমামতির ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য করেছেন, তাই অপরাপর সকল বিষয়েও তাঁর অগ্রগণ্যতা বা ইমামতির প্রমাণ পাওয়া যায়।
অনুরূপভাবে আবু বকর (রা.)-এর যুগে যারা যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন, তাঁরাই নামাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যেমন: ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ, আমর ইবনুল আস (রা.) প্রমুখ সাহাবিগণ।
উমর (রা.)-এর সময়েও কুফার প্রতিনিধিরা নিয়োগ অনুযায়ী কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) যুদ্ধ ও নামাজের দায়িত্বে ছিলেন। ইবনে মাসউদ (রা.) কাজি ও বাইতুলমালের দায়িত্বে ছিলেন। উসমান ইবনে হুনাইফ (রা.) ছিলেন খারাজের পদে।
সেনাপতি, কালেক্টর ও বিচারকের পদের সূচনা
এরপর থেকেই সেনাপতি, কালেক্টর ও বিচারকের পদের সূচনা হয়। কারণ, উমর (রা.)-এর যুগে যখন ইসলামের ভূখণ্ড বিস্তার লাভ করে, তখন বিভিন্ন নতুন নতুন প্রশাসনিক বিভাগ বা দপ্তর খোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যেমন: ভূমিকর অধিদপ্তর, সহায়তা অধিদপ্তর বা দিওয়ানুল আতা। অনেক শহর গড়ে তোলেন। মিশর, বসরা, ফুসতাতের মতো শহর আবাদ হয়।
এমনভাবে শহরগুলো গড়ে তোলা হয়-দজলা, ফোরাত, নীল-এর মতো বিশাল বিশাল নদীও শহর ও সেনাবাহিনীর মাঝে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারেনি।
মসজিদ ছিল শাসকদের কার্যালয়
মসজিদ ছিল শাসক ও জনগণের সমবেত হওয়ার জায়গা। কেননা, নবিজি মসজিদকে তাকওয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাই তাতে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, শিক্ষা কার্যক্রম ও ওয়াজ-নসিহতের মতো ব্যক্তিগত বিষয় যেমন ছিল, তেমনি সেনাপতি, আমির ও গুপ্তচর নির্ধারণের মতো রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ও সমাধা করা হতো। এছাড়াও মুসলিমদের আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ মসজিদে সম্পন্ন হতো। একইভাবে মক্কা, তায়েফ, ইয়ামান ইত্যাদি শহর, সাধারণ জনপদ ও প্রত্যন্ত গ্রামে উমর (রা.)-এর কর্মকর্তাগণ মসজিদে জমায়েত হয়েই রাজনৈতিক কার্যাদি সম্পাদন করতেন। কেননা, রাসূল বলেছেন-
'বনি ইসরাইলদের শাসন করতেন নবিরা। যখনই কোনো নবি ইন্তেকাল করতেন, তাঁর স্থানে অপর একজন নবি আসতেন। আর আমার পরে যেহেতু আর কোনো নবি নেই, তাই আমার পরে খলিফাগণ শাসক হবেন। যাদের কাউকে তোমরা গ্রহণ করবে এবং বর্জন করবে।' সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, 'সে অবস্থায় আপনি আমাদের কী আদেশ করবেন?' রাসূল বললেন- 'তোমরা যে আগে বাইয়াত নেবে, তাঁর হাতেই বাইয়াত গ্রহণ করবে। আর আল্লাহর কাছে তোমাদের হিতকামী শাসকের জন্য দুআ করবে। কারণ, নিশ্চয়ই শাসকগণ অর্পিত দায়িত্ব বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবেন। '৫৯
খলিফা ও আমিরগণ তাঁদের বাসস্থানেই বসবাস করতেন
অপরাপর মুসলিমদের মতো খলিফা ও আমিরগণও নিজ বাসস্থানেই বসবাস করতেন। তবে তাঁদের মজলিশ বসত জামে মসজিদে।
সাদ (রা.)-এর রাজমহল জ্বালানোর হুকুম দিয়েছিলেন উমর (রা.)
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) কুফাতে একটি রাজমহল নির্মাণ করেন এবং বলেন-'আমি সাধারণ মানুষ থেকে দূরে থাকতে চাই।' উমর (রা.) মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাকে তাঁর রাজমহল জ্বালানোর ফরমান দিয়ে পাঠালেন। বলে দিলেন, 'সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) যেন নাবতি কাঠের আঁটি কিনে তাঁর মহল পর্যন্ত নিয়ে যায় এবং মহল জ্বালিয়ে দেন। উমর (রা.) তাঁর শাসক ও জনগণের মাঝে কোনোরূপ অন্তরায় বরদাশত করতেন না। তবুও কয়েকজন আমিরের ব্যক্তিগত প্রাসাদ নির্মিত হয়েছিল!
মুয়াবিয়া (রা.) জনগণ থেকে দূরে থাকতেন
আলি (রা.)-এর ওপর অতর্কিত হামলা হওয়ার পর মুয়াবিয়া (রা.) নিজের ওপর হামলার আশঙ্কা করতেন। তাই মসজিদের এক নিরাপদ প্রকোষ্ঠে তিনি ও তাঁর অমাত্যবর্গ নামাজ আদায় করতেন। বাইরে বের হলে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে বের হতেন। তাঁকে দেখে পরবর্তী রাজতান্ত্রিক খলিফাগণও এই প্রটোকলে উদ্বুদ্ধ হন এবং তাঁকে অনুসরণ করেন। তাঁরা জুমা ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মানুষের সম্মুখে আসতেন এবং নামাজ পড়াতেন। এর বাইরে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া ও হুদুদ কায়েমের সময় তাঁরা জনসম্মুখে আসতেন। এ ছাড়া বাকি সময় তাঁরা মহলে বাস করতেন এবং জনসাধারণ থেকে দূরে থাকতেন। এমনই একটি মহল হলো বনু উমাইয়ার 'আল খাদ্রা' প্রাসাদ-যা জামে মসজিদের সামনে অবস্থিত ছিল।
রাজা ও আমিরদের কেল্লা ও দুর্গ নির্মাণ
সময় যতই অতিবাহিত হতে লাগল, মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি ততই বাড়তে থাকল। প্রতিটি সম্প্রদায় ইসলামের সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরল এবং তাতে নিজেদের মনমতো বাড়াবাড়ি করে অপর সম্প্রদায় থেকে বিমুখ হয়ে গেল। ভুলে গেল ইসলামের ব্যাপকতা ও উদারতার কথা। আমির ও শাসকগণ কেল্লা ও দুর্গ নির্মাণ করতে শুরু করলেন। ইতঃপূর্বেও কেল্লা ও দুর্গ নির্মিত হয়েছে, তবে দেশের সীমানাগুলোতে; যেন শত্রুর হামলা থেকে দেশকে রক্ষা করা যায়।
কেননা, সে যুগে সীমান্তরক্ষী বাহিনী তখনও তৈরি হয়নি। তখন শাম অঞ্চলের সীমান্তকে বলা হতো 'আল আওয়াসিম' অর্থাৎ কিন্নাসরিন ও হালাব (আলেপ্পো)।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খানকাহ ও আস্তাবল নির্মাণ
বিদ্যোৎসাহীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইবাদতকারীদের জন্য খানকাহ এবং তাদের বাহনের জন্য ঘোড়াশাল তৈরি করা হয়। সম্ভবত এর ব্যাপক প্রসার শুরু হয় সেলজুক আমলে। প্রথম দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরাইখানা নির্মাণ করা হয় গরিবদের জন্য। নিজামুল মুলকের সময়ে এসব সরাইখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উপযুক্ত গরিবদের জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং ওয়াকফকৃত সম্পদ থেকে এর ব্যয় নির্বাহ করা হতো। এর আগে সরাইখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেলেও আমার মনে হয় না তা ওয়াকফ ছিল। তবে বিশেষ কিছু স্থাপনা ছিল।
ইমাম ওয়াহিদি (রহ.)-এর ছাত্র ইমাম মামার ইবনে জিয়াদ আখবারুস সুফিয়াহ গ্রন্থে বলেন-'সুফিদের জন্য প্রথম ঘর নির্মাণ করা হয় বসরায়।' তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উল্লেখ সেলজুক আমলের পূর্বেও পাওয়া যায়; হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। আর সেলজুক আমলের সময়কাল হচ্ছে হিজরি পঞ্চম শতাব্দী। অনুরূপভাবে শামের বেশিরভাগ কেল্লা ও দুর্গই নবনির্মিত। যেমনিভাবে আল আদিল দামেশক, বসরা ও হারানে কেল্লা নির্মাণ করেছিলেন। কারণ, খ্রিষ্টানরা তাদের ওপর ক্রমাগতভাবে আক্রমণ করত। তৃতীয় শতকের পর মুসলিমরা সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে খ্রিষ্টানদের প্রতিহত করতে অক্ষম হতে শুরু করে। একপর্যায়ে তারা শামের তীরবর্তী সীমান্তগুলো দখল করে নেয়।
টিকাঃ
৫৩. কুরআনে মূল শব্দ الْحَدِيدَ লোহা রয়েছে, যা দ্বারা রূপক অর্থে তরবারিকে নির্দেশ করে।
৫৪. আবু দাউদ: ৩১০৭, আহমাদ: ৬৬০০
৫৫. তিরমিজি: ২৬১৬, আহমাদ: ২২০১৬, ইবনে মাজাহ : ৩৯৭৩
৫৬. ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মতে-ওপরের আয়াতটিতেও (হুজুরাত: ১৫) ঈমান শব্দ দিয়ে অপরাপর ঈমানি আমলের সাথে সাথে নামাজকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
৫৭. বুখারি: ১৫১৯, মুসলিম: ৮৩
৫৮. বুখারি: ৫২৭
৫৯. প্রাগুক্ত
📄 খিলাফতসংক্রান্ত কিছু ভ্রান্ত আকিদা
কুরআনে খলিফা শব্দের প্রয়োগ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-
وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً
'স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন- নিশ্চয়ই আমি জমিনে আমার প্রতিনিধি প্রেরণ করব।' সূরা বাকারা : ৩০
আল্লাহ আরও বলেন-
يَا دَاوُوُدُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ
'হে দাউদ! আমি তোমাকে জমিনে আমার প্রতিনিধি বানাব। অতএব, মানুষের মাঝে হকভাবে বিচার করো আর প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। তা না হলে সে (প্রবৃত্তি) তোমাকে পথভ্রষ্ট করে ছাড়বে।' সূরা সোয়াদ: ২৬
'আমি জমিনে প্রতিনিধি প্রেরণ করব' কথাটি দ্বারা আদম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের বোঝানো হয়েছে। তবে নাম নিয়েছেন শুধু আদম (আ.)- এর। (আবার কখনো কখনো তাঁর বংশধর বোঝাতে 'মানুষ' শব্দ ব্যবহার করে আদম (আ.)-কেও বক্তব্যের মধ্যে শামিল করা হয়েছে।) যেমন: আল্লাহ বলেন-
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ -
'নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছি।' সূরা তিন: ৪
خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ صَلْصَالٍ كَالْفَخَارِ وَخَلَقَ الْجَانَّ مِنْ مَّارِجٍ مِنْ نَارٍ -
'মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন শুষ্ক ঠনঠনে মাটি থেকে, যা পোড়ামাটির মতো। আর জিনকে সৃষ্টি করেছেন ধোঁয়াহীন অগ্নি থেকে।' সূরা আর-রাহমান: ১৪, ১৫
الَّذِي أَحْسَنَ كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ وَبَدَا خَلْقَ الْإِنْسَانِ مِنْ طِينٍ ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهُ مِنْ سُلَالَةٍ مِّنْ مَّاءٍ مَّهِينٍ
'কাদা হতে তিনি মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। তারপর তিনি তাঁর বংশ উৎপন্ন করেন তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস থেকে।' সূরা আস-সাজদা: ৭-৮
ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ
'তারপর তাকে নুতফারূপে স্থাপন করেছি নিরাপদ স্থানে।' সূরা মুমিনুন: ১৩
হাদিসে খলিফা শব্দের প্রয়োগ
খলিফা অর্থ হলো-যে অপরের স্থলাভিষিক্ত হয় বা যে পেছনে রয়ে যায়। যেমন: রাসূল বলতেন-
اللَّهُمَّ انْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي أَهْلِي
'হে আল্লাহ! আপনি আমার সফরের সঙ্গী। আমি চলে যাওয়ার পর আপনিই আমার পরিবারের নিরাপত্তার "খলিফা”। ৬০
জায়েদ ইবনে খালিদ জুহানি (রহ.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন-
مَنْ جَهَزَ غَازِيًا فَقَدْ غَزَا وَمَنْ خَلَفَهُ فِي أَهْلِهِ فَقَدْ غَزَا -
'যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে কোনো মুজাহিদকে যুদ্ধসাজে সজ্জিত করে দিলো, সেও জিহাদ করল। যে ব্যক্তি কোনো মুজাহিদের অনুপস্থিতিতে তাঁর পরিবারবর্গের দেখাশোনার জন্য তার স্থলাভিষিক্ত হলো, সেও জিহাদ করল। (অর্থাৎ সেও জিহাদকারীর সমান সওয়াব লাভ করবে)। '৬১
أَوْ كُلَّمَا خَرَجْنَا فِي الْغَزْوِ خَلْفَ أَحَدُهُمْ وَلَهُ نَبِيْبٌ كَنَبِيْبِ التَّيْسِ يَمْنَحُ إِحْدَاهُنَ اللَّبَنَةِ مِنَ اللَّبَنِ لَئِنْ أَظْفَرَنِي اللَّهُ بِأَحَدٍ مِنْهُمْ لَاجْعَلْتُهُ نَكَالًا -
'আমরা যখন জিহাদে বের হই, তাদের কেউ পেছনে রয়ে যায় এবং ছাগলের মতো আওয়াজ করে (অর্থাৎ প্রচণ্ড যৌনাকাঙ্ক্ষা দেখা দেয়) এবং মুমিনপত্নীদের অল্প দুধ প্রদান করে (অর্থাৎ ব্যভিচার করে)। আল্লাহ যদি তাদের কাউকে পাকড়াও করার ক্ষমতা আমাকে দান করে, তাহলে তাদের এমন শাস্তি দেবো-যা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।'
একইভাবে কুরআনেও এই শব্দমূল দ্বারা 'পেছনে রয়ে যাওয়া' বোঝানো হয়েছে। যেমন-
سَيَقُولُ لَكَ الْمُخَلَّفُونَ مِنَ الْأَعْرَابِ
'অচিরেই বেদুইনদের যারা পেছনে রয়ে যাবে তারা বলবে...' সূরা ফাতহ: ১১
فَرِحَ الْمُخَلَّفُوْنَ بِمَقْعَدِهِمْ خِلَافَ رَسُولِ اللَّهِ وَكَرِهُوا أَنْ يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
'যাদের পেছনে থেকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তারা আল্লাহর রাসূলের সাথে সহযোগিতা না করার ও ঘরে বসে থাকার জন্য আনন্দিত হলো এবং তারা নিজেদের ধন-প্রাণ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করতে অপছন্দ করল।' সূরা আত-তাওবা: ৮১
খলিফা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে তার পূর্ববর্তীর স্থানে রয়ে গেছে। যেমন: রাসূল -এর ওফাতের পর আবু বকর (রা.) উম্মতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অনুরূপভাবে রাসূল হজ, উমরাহ কিংবা যুদ্ধের জন্য সফরে বের হলে তাঁর স্থানে আরেকজনকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রেখে যেতেন। এভাবে তিনি কখনো ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-কে খলিফা বানিয়েছেন, কখনো-বা অন্য কাউকে। তাবুকের যুদ্ধে খলিফা বানিয়েছিলেন আলি (রা.)-কে।
ইবনে আরাবি (রহ.)-এর একটি ভুল ধারণা
ইবনে আরাবি (রহ.)-এর মতো কতিপয় লোক ধারণা করেছেন, খলিফা আল্লাহর প্রতিনিধি বা আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত। তাঁরা মনে করেন যে, আল্লাহর খলিফা হওয়ার অর্থ হচ্ছে ইনসান আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত। তাঁরা প্রায়শই আদম (আ.)-কে সকল নাম শিক্ষাদানের বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন-'সকল নামের অর্থ মানুষের মধ্যে একত্রিত হয়েছে।' পাশাপাশি তাঁরা 'আদম (আ.)-কে আল্লাহর অবয়বে সৃষ্টি করা হয়েছে'- হাদিসটিকেও একইভাবে ব্যাখ্যা করে থাকেন। কখনো তাঁরা দার্শনিকদের কথাকে নকল করে বলেন-'মানুষ একটি ছোটো দুনিয়া।' এটা মূলত আগের বক্তব্যটিরই প্রতিফলন। শুধু তা-ই নয়; এর সাথে তাঁরা আরও যোগ করে বলেন-'আল্লাহ হলো একটি বড়ো জগৎ।' মূলত তাঁদের বক্তব্যের মূল ভিত্তি হলো তাঁদের 'ওয়াহদাতুল ওজুদ'-এর কুফরি আকিদা। এই মতবাদ অনুসারে স্রষ্টা হলেন সৃষ্টির অস্তিত্বের সারবস্তু বা মূল। তাই ইনসান হলো আল্লাহর প্রকাশ্য খলিফা বা স্থলাভিষিক্ত-যাতে সকল নাম ও গুণের সমাবেশ ঘটেছে। আর এর থেকে তৈরি হয় এমন একটি আকিদা, যা তাঁদের রুবুবিয়্যাত ও ইলাহিয়াতের দাবির প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। পরিশেষে তাঁরা ফেরাউনি কারামেতা ফিরকা ও বাতেনি ফিরকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
কখনো কখনো তাঁরা নবুয়তকে অপরাপর স্তরের মতো সাধারণ একটি স্তর সাব্যস্ত করেন এবং নিজেদের এর চেয়ে মহৎ মনে করেন। আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, ইলাহিয়্যাত ও একত্ববাদকে স্বীকার এবং নবিদের নবুয়তকে মানা সত্ত্বেও তাঁরা ফেরাউনিয়্যাতের অনুসারী। কিংবা তাঁরা মনে করেন, শরিয়তের আদেশ-নিষেধ ও হালাল-হারামের বিধান তাঁদের জন্য প্রযোজ্য নয়। ৬২
আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হওয়াটা সম্ভব নয়
আল্লাহর খলিফা (স্থলাভিষিক্ত) হওয়া জায়েজ নেই। তাই লোকেরা যখন আবু বকর (রা.)-কে বলল-'হে আল্লাহর খলিফা!' তখন তিনি বলেছিলেন-'আমি আল্লাহর খলিফা নই; আমি রাসূল্লালাহ-এর খলিফা। আমার জন্য এটাই অনেক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এর থেকে পবিত্র।'
খলিফা হলেন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও প্রতিনিধি। নবিজি বলেন- 'হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সফরসঙ্গী এবং পরিবারের দেখভালের ক্ষেত্রে আপনি আমাদের প্রতিনিধি। '৬৩
আরেকটি হাদিসেও অনুরূপ এসেছে- 'হে আল্লাহ! সফরে আমাদের সাথে থাকুন আর পরিবারে আমাদের প্রতিনিধি হোন। '৬৪
আল্লাহ হলেন চিরঞ্জীব, সর্বদর্শী, ক্ষমতাবান, রক্ষাকর্তা, তত্ত্বাবধানকারী, শাশ্বত, সমগ্র জগৎ থেকে অমুখাপেক্ষী; তাঁর কোনো শরিক নেই, সহযোগী নেই। তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ কিয়ামতের দিন সুপারিশ করতে পারবে না। আর খলিফা তো তখনই হয়, যখন খলিফা নিয়োগকারীর মৃত্যু বা অনুপস্থিতির কারণ দেখা দেয় অথবা খলিফার প্রয়োজন তখনই দেখা দেয়, যখন খলিফা নিয়োগকারীর খলিফা বানানোর প্রয়োজন পড়ে। এমনকী তাকে 'খলিফা' বলাও হয় এই কারণে যে, সে যুদ্ধে না গিয়ে বাসস্থানে রয়ে গেছে।
খলিফার এই প্রতিটি গুণই আল্লাহর শানে অনুপস্থিত। তিনি এসব থেকে পবিত্র। কারণ, তিনি চিরঞ্জীব, শাশ্বত ও সর্বদর্শী। তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অনুপস্থিতও হন না। তিনি অমুখাপেক্ষী। তিনি রিজিক দেন, রিজিক গ্রহণ করেন না। তিনি তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেন। পথ দেখান। সুস্থতা দান করেন তাঁর সৃষ্ট উপকরণের মাধ্যমে। তিনিই হলেন প্রশংসিত, অমুখাপেক্ষী। আসমান ও জমিন এবং এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে, সবকিছুর মালিক তিনি।
وَهُوَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ إِلهُ وَفِي الْأَرْضِ الهُ
'তিনি আসমানেও ইলাহ, জমিনেও ইলাহ।' সূরা জুখরুফ: ৮৪
আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর সমকক্ষ ও প্রতিপক্ষ কেউ নেই। তাই যে লোক তাঁর স্থলাভিষিক্ত কাউকে বানাবে, সে মুশরিক। ৬৫
ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর ছায়া শাসক
এখানে একটি প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে। হাদিসে এসেছে-
'সুলতান হলেন জমিনে আল্লাহর ছায়া; যেখানে আশ্রয় নেয় দুর্বল ও দুস্থ লোকেরা। '৬৬
ছায়া তো আশ্রয়প্রার্থীর মুখাপেক্ষী, সঙ্গী ও একপ্রকার অনুগামীও বটে। আর আশ্রয়প্রার্থীও ছায়ার মুখাপেক্ষী। ছায়া তাকে ঘিরে থাকায় সেও ছায়ার সঙ্গী। ৬৭ সুলতান আল্লাহর বান্দা। আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী। এক মুহূর্তের জন্যও সে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা ত্যাগ করতে পারবে না। আল্লাহর কাছেই যাবতীয় ক্ষমতা, শক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ, সাহায্য ইত্যাদি বিষয়ের মর্যাদা ও নিরপেক্ষ গুণ রয়েছে-যার ওপর ভিত্তি করে সমগ্র সৃষ্টি দণ্ডায়মান এবং আল্লাহর ছায়ার সাদৃশ্য লাভ করেছে। আল্লাহর সৃষ্টি ও বান্দাদের জীবনকে সংশোধিত করার সবচেয়ে মজবুত মাধ্যম হচ্ছে শাসক। ক্ষমতাসীন শাসক যদি দুরস্ত হয়ে যায়, তাহলে জনগণের অবস্থাও দুরস্ত হয়ে যাবে। আর সে নষ্ট হলে তার কারণে এবং তার বিপথগামিতা অনুসরণ করে জনগণও নষ্ট ও বিপথগামী হবে।
তবে সে পুরোপুরি নষ্ট হতে পারবে না। তার মধ্যে কিছুটা কল্যাণের নিদর্শন অবশিষ্ট থাকা আবশ্যক। কারণ, সে আল্লাহর ছায়া। ছায়া কখনো সম্পূর্ণ রোদমুক্ত করে (কষ্ট লাঘব করে) আবার কখনো আংশিক কষ্ট লাঘব করে। আর যদি স্বয়ং ছায়াটিই না থাকে, তাহলে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলাই ধসে পড়বে। রাষ্ট্রের কাঠামোই অবশিষ্ট থাকবে না। অনেকটা রুবুবিয়্যাতের গূঢ়তত্ত্ব হারিয়ে যাওয়ার মতো, যার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্ব।
আবু বকর (রা.)-এর খলিফা হওয়ার প্রমাণ
আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত কি মুসলিমদের মনোনয়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, নাকি রাসূল -এর কোনো প্রচ্ছন্ন কিংবা অপ্রচ্ছন্ন হাদিস দ্বারা হয়েছিল? এ বিষয়ে ইমাম কাজি আবু ইয়ালাসহ আমাদের হাম্বলি মাজহাবের অন্যান্য ইমামগণ আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত সম্পর্কে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) থেকে দুটি মত বর্ণনা করেছেন-
১. ‘আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিমদের মনোনয়নের ভিত্তিতে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিম, ফুকাহা ও হাদিস বিশারদগণ এমনটিই মনে করেন; এমনকী মুতাজিলা ও আশআরিদের মতো কিছু মুতাকাল্লিমিনও এই মত পোষণ করেন।
২. আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাসূল -এর ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যের ভিত্তিতে। এ বক্তব্যের পক্ষে মত দিয়েছেন হাদিস বিশারদদের কয়েকটি দল এবং কতিপয় মুতাকাল্লিমিন। হাসান বসরি (রহ.) থেকেও এমন একটি মতামত পাওয়া যায়। রাসূল -এর বক্তব্যের মাধ্যমে তাঁর খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে যারা মনে করেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন-প্রত্যক্ষ বক্তব্য দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ স্পষ্ট বক্তব্যের ভিত্তিতেই আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত প্রমাণিত হয়েছে।’
খিলাফত নিয়ে কতিপয় গোষ্ঠীর ভ্রান্ত আকিদা
ইমমিয়ারা বলে-অপ্রচ্ছন্ন বা স্পষ্ট বক্তব্য দ্বারা আলি (রা.)-এর খিলাফত প্রমাণিত। জাইদিয়্যা, জারুদিয়া ফেরকার লোকেরা মনে করে, এটা আলি (রা.)-এর ব্যাপারে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত। আর রাওয়ান্দিয়ারা মনে করে, আব্বাস (রা.)-এর খিলাফত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
মূলত ইসলামের বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞজনদের কাছে এ জাতীয় বক্তব্যগুলোর অসারতা সুস্পষ্ট। এসব মতকে যারা বিশ্বাস করে-তারা হয়তো মূর্খ, নয়তো জালিম। এসব যারা বিশ্বাস করে, তাদের অধিকাংশই জিন্দিক।
আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক মূল্যায়নটি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর কথাকেই পোক্ত করে। বাস্তব কথা হলো-
'আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত প্রতিষ্ঠা হয়েছে সাহাবিদের মনোনয়ন এবং তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণের মাধ্যমে। রাসূল তাঁর খিলাফত সম্পর্কে প্রশংসা ও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর আনুগত্যের এবং শাসনভার তাঁর ওপর ন্যস্ত করার আদেশ দিয়েছেন। রাসূল উম্মতকে আবু বকর (রা.)-এর হাতে বাইয়াতের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।'
হাদিসে আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের প্রমাণ
মোটকথা রাসূলের বক্তব্যে আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের পক্ষে তিন ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়-
১. সমর্থনমূলক
২. আদেশ বা হুকুমমূলক
৩. দিকনির্দেশনামূলক
সমর্থনমূলক বক্তব্য: যেমন, রাসূল বলেছেন-
'আমি স্বপ্নে দেখেছি, একটি কাঁচা কুয়া থেকে আমি পানি তুলছি। তারপর ইবনে আবি কুহাফা (আবু বকর রা.) এলো এবং এক বালতি অথবা দুই বালতি ভরপুর পানি তুলল। '৬৮
অপর একটি হাদিসে এসেছে, এক সাহাবি বলেন-
'আমি স্বপ্নে একটি দাঁড়িপাল্লা আকাশ থেকে নামতে দেখেছি। তারপর তা দিয়ে আপনাকে (রাসূল -কে) ও আবু বকরকে পরিমাপ করা হলে আপনার পাল্লা ভারী হয়ে যায়। তারপর আবু বকর ও উমর (রা.)-কে পরিমাপ করা হলে আবু বকর (রা.)-এর পাল্লা ভারী হয়। '৬৯
আরেকটি হাদিস আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
'মৃত্যুশয্যায় রাসূল আমাকে বলেন-“তোমার বাবা ও ভাইকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি একটা ফরমান লিখে দিই-যাতে আমার পর আর কোনো বিবাদ না হয়।" তারপর নবিজি বলেন-“আল্লাহ আবু বকরকে ছাড়া আর কাউকে গ্রহণ করবেন না; এমনকী মুমিনরাও আর কাউকে মানবে না।"'৭০
অন্য একটি হাদিসে এসেছে-
'এক সৎ লোক স্বপ্নে দেখেছেন, আবু বকর (রা.) রাসূল- এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। '৭১
'নবুয়তি খিলাফত ৩০ বছর। তারপর রাজতন্ত্র কায়েম হবে।' তো এসব হাদিস দ্বারা বুঝে আসে, আল্লাহ আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতকে গ্রহণ করেছেন, সর্মথন করেছেন এবং মুমিনরাও তাঁর খিলাফতকে মেনে নেবেন।
আদেশমূলক বক্তব্য: যেমন-
'আমার পরবর্তী দুজন তথা আবু বকর ও উমরকে মান্য করো।' 'আমার পর তোমরা আমার সুন্নাহ ও সুপথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহ আঁকড়ে থাকো।' রাসূল-কে একবার এক মহিলা জিজ্ঞেস করল- 'আমরা যদি আপনাকে না পাই, কাকে মেনে চলব?' রাসূল বললেন- 'তাহলে আবু বকরকে মানো। '৭২
নির্দেশনামূলক বক্তব্য: যেমন- রাসূল আবু বকর (রা.)-কে নামাজের ইমামতির অনুমোদন দিয়েছেন। এ ছাড়াও রাসূল বলেছেন-
'আবু বকরের দরজাটি ছাড়া তোমাদের বাড়ির যেসব দরজা মসজিদের ভেতরমুখী রয়েছে, তা বন্ধ করে দাও।'৭৩
এসব ছাড়াও তাঁর আরও বহু গুণ, বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।
কুরআনে আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের প্রমাণ
মূলত রাসূল-এর সুন্নাহ থেকে এতক্ষণ যেসব প্রমাণ আমরা হাজির করলাম, তার প্রত্যেকটিই কুরআন দ্বারা সমর্থিত। অর্থাৎ অনুরূপভাবে পবিত্র কুরআনেও আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের সপক্ষে তিন ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়।
সমর্থনমূলক বক্তব্য যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ
'তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে এবং সৎকাজ করবে, তাদেরকে আল্লাহ নিশ্চয়ই খলিফা মনোনীত করবেন।' সূরা নুর: ৫৫
আল্লাহ আরও বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يَحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَه
'হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্য হতে যে ধর্মত্যাগ করবে, (তাদের স্থলে) নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায়কে প্রতিস্থাপিত করবেন, যারা আল্লাহকে ভালোবাসবেন এবং আল্লাহও তাদের ভালোবাসবেন।' ৭৪ সূরা মায়েদা: ৫৪
وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ
'অচিরেই আল্লাহ কৃতজ্ঞচিত্তদের প্রতিদান দেবেন।' সূরা ইমরান: ১৪৪
আদেশমূলক বক্তব্য
আল্লাহ বলেন-
لِلْمُخَلَّفِينَ مِنَ الْأَعْرَابِ سَتُدْعَوْنَ إِلَى قَوْمٍ أُولِي بَأْسٍ شَدِيدٍ تُقَاتِلُونَهُمْ أَوْ يُسْلِمُونَ
'পেছনে পড়ে থাকা বেদুইনদের বলো, অচিরেই তোমাদের এমন এক বিপুল শক্তিধর সম্প্রদায়ের বিপক্ষে যুদ্ধে ডাকা হবে, যাদের সাথে তোমরা যুদ্ধ করবে অথবা তারা আত্মসমর্পণ করবে।' সূরা ফাতহ : ১৬
নির্দেশনামূলক বক্তব্য
যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى
'নিশ্চয়ই অধিক পরহেজগার ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে।' সূরা লাইল: ১৭
'নবি ও সিদ্দিকগণ।'৭৫ 'আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী'৭৬ ইত্যাদি আয়াতে আবু বকর (রা.)-এর খলিফা হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
অতএব, আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত হয়ে গেল; যদিও তাঁর খিলাফতটি নিছক ইজমা দ্বারাই সাব্যস্ত হতে পারত। যেমন: আল্লাহ যদি কোনো ব্যক্তির বিয়ের অভিভাবক (ওলি) হওয়ার আদেশ দেন অথবা কাউকে বিয়ে করানোর জন্য আদেশ দেন কিংবা এর সাথে আরও অনেক কাজের আদেশ দেন, তাহলে তো সেই আদেশ বাস্তবায়নের স্বার্থে ওলি হওয়ার চুক্তি অথবা বিয়ের চুক্তি বিদ্যমান থাকাটা আবশ্যক। আর কুরআন ও সুন্নাহ এই চুক্তির আদেশকেই প্রমাণিত করেছে এবং তাঁর প্রতি আল্লাহর ভালোবাসাকে সাব্যস্ত করেছে। তাই কুরআন ও সুন্নাহ এটাই বলছে যে, জনসাধারণের ওপর আবু বকর (রা.)-কে মনোনীত করাটা আবশ্যক এবং তাঁরা এ ব্যাপারে আদিষ্ট। কাজেই এই আদেশ পালন না করে কোনো গত্যন্তর নেই। তাঁরা আল্লাহর আদেশকে মান্য করে আবু বকর (রা.)-কে মনোনীত করার মাধ্যমে নিজেদের সর্বোত্তম কাজটি করেছেন এবং নিজেদের মর্যাদাকে বুলন্দ করেছেন।
টিকাঃ
৬০. মুসলিম: ১৩৪২
৬১. মুসলিম: ১৬৯২
৬২. এখানে পাঠকদের সুবিধার জন্য কিছু কথা বলে নেওয়া একান্তই জরুরি মনে করি। আবুল হাসান আলি নদভি (রহ.) বলেন, শাইখে আকবর ইবনে আরাবি (৫৫৮-৬৩৮ হি.) (রহ.)-এর কিতাবাদি ও তাঁর ইলম সম্পর্কে যারা গবেষণা করেন, তাঁদের একটি দল মনে করেন-তাঁর কিতাবাদি, বিশেষত ফুসুসুল হিকাম ব্যাপক বিকৃতির শিকার হয়েছে। শাইখের ভক্ত ও তাঁর জ্ঞানের ধারক-বাহক দামেশকের শাইখ আহমাদ আল হারুন আল আসাল দৃঢ়তার সাথে বলতেন, ফুসুসুল হিকামের এক-তৃতীয়াংশ কিংবা তারও অধিক বানোয়াট ও ভিত্তিহীন তথা মূলপাঠের সাথে সম্পর্কহীন। - (তারিখে দাওয়াত ওয়া আজিমাত-২/৭০। মূল উর্দু কিতাব দ্রষ্টব্য।)
শাইখে আকবর ইবনে আরাবি (রহ.)-এর সবচে' কড়া সমালোচকদের অন্যতম একজন হিসেবে মনে করা হয় ইমামে রাব্বানি মুজাদ্দিদে আলফে সানি (১৫৬৪- ১৬২৪ খ্রি. রহ.)-কে। তা সত্ত্বেও তিনি তার মাকতুবাতে বলেন, 'অধম ইবনে আরাবি (রহ.)-কে আল্লাহর মকবুল বান্দা মনে করি। ...লোকেরা তার বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়িতে লিপ্ত। তার ভক্ত ও বিদ্বেষীরা কেউ-ই ভারসাম্যতার ধারেকাছে নেই। ... অধম এক্ষেত্রে মধ্যবর্তী মতকে গ্রহণ করি। ওয়াহদাতুল ওজুদের মন্দকে বাদ দিয়ে ভালোকে গ্রহণ করি। ... মূলত ওয়াহদাতুল ওজুদ হলো আত্মশুদ্ধি চর্চার একটি স্তর। এর পরবর্তী স্তর হলো 'ওয়াহদাতুশ-শুহুদ'।' (মাকতুবাতে আলফে সানি রহ.-এর বরাতে আবুল হাসান আলি নদভি, তারিখে দাওয়াত ওয়া আজিমাত: ৪/২৯৪,২৯৫)
ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি রহ. (১৭০৩-১৭৬২ খ্রি.) ওয়াহদাতুল ওজুদের সমর্থক ছিলেন। তিনি তার বাবা শাহ আব্দুর রহিম মুহাদ্দিসে দেহলবি (১৬৪৪- ১৭১৯ খ্রি) সম্পর্কে আনফাসুল আরিফিনে লিখেন, 'আমার বাবা শাইখে আকবর ইমাম মুহিউদ্দীন ইবনে আরাবি রহ.-কে অনেক শ্রদ্ধা করতেন। তিনি বলতেন, "আমি চাইলে ফুসুসুল হিকাম-এর (ইবনে আরাবি রহ.-এর সর্বাধিক আলোচিত গ্রন্থগুলোর অন্যতম) সকল মাসাইলকে কুরআন ও হাদিসের আলোকে বর্ণনা করে প্রমাণ করে দিতে পারি এবং তা এমনভাবে করব, এরপর কারও সন্দেহ বাকি থাকবে না।" এরপর শাহ সাহেব (রহ.) লিখেন, 'তা সত্ত্বেও আমার বাবা ওয়াহদাতুল ওজুদ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করা থেকে বিরত থাকতেন। কারণ, এই যুগের অধিকাংশ মানুষ ওয়াহদাতুল ওজুদকে বোঝার যোগ্যতা রাখে না।
আর না বোঝার কারণে তারা ইলহাদ (ধর্মহীনতা) ও নাস্তিকতার ফাঁদে পড়ে যায়।' (আনফাসুল আরিফিন, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি রহ., ১৮৯ পৃ.)
শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) তাঁর পিতা শাহ আব্দুর রহিম (রহ.)-এর চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েই ইবনে আরাবি রহ.-এর ওয়াহদাতুল ওজুদ ও ইমামে রাব্বানি মুজাদ্দিদে আলফে সানি রহ.-এর 'ওয়াহদাতুশ শুহুদ'-এর মাঝে অপূর্ব সমন্বয় স্থাপন করেন। (আবুল হাসান আলি নদভি, তারিখে দাওয়া ওয়া আজিমাত ৫/৮৪)
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) থেকেও ইবনুল আরাবি সম্পর্কে কিছু ইতিবাচক মূল্যায়ন পাওয়া যায়। যেমন: ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, 'এদের মধ্যে ইবনে আরাবি ইসলামের সবচেয়ে নিকটবর্তী। তাঁর কথাবার্তা অনেক স্থানেই তুলনামূলক ভালো। আর তা এই জন্য যে, তিনি আদেশ-নিষেধ ও শরিয়তের বিধানাবলিকে যথাস্থানে রেখে চলেন। তাসাউফের শাইখগণ যে আখলাক অবলম্বন করেন এবং যেসব ইবাদত পালনের তাগিদ দিয়েছেন, তিনি তা গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। এজন্য অনেক সুফি ও পরহেজগার লোক তাঁর থেকে তাসাওউফের শিক্ষা নিয়ে থাকেন। যদিও তারা তাঁর কথার তাৎপর্য যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। তবে যারা তাঁর কথার সঠিক তাৎপর্য বুঝে তাঁর সাথে একমত হয়, তাদের কাছে তাঁর কথার প্রকৃত মর্ম খুবই পরিষ্কার।' (জালাউল আইনাইনের বরাতে আবুল হাসান আলি নদভি, তারিখে দাওয়াত ওয়া আজিমাত-৪/২৭৮)
৬৩. মুসলিম: ১৩৪২
৬৪. সুনানে তিরমিজি: ৩৪৪৭
৬৫. 'স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বলেন, আমি জমিনে খলিফা বানাব (সূরা বাকারা: ৩০)।' ইমাম তাবারি (রহ.) এই আয়াতে 'খলিফা' শব্দের ব্যাখ্যায় ইবনে মাসউদ ও ইবনে আব্বাস (রা.)-এর একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করে বলেন-'এর অর্থ হলো, দুনিয়াতে আল্লাহর পক্ষ হয়ে আল্লাহর হুকুম কায়েম করা।' কুরআন শরিফের আরেকটি আয়াতেও এই ব্যাখ্যাটির সমর্থন পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন-'হে দাউদ! আমি তোমাকে খলিফা বানিয়েছি। সুতরাং মানুষের মাঝে হকভাবে বিচার করো এবং প্রবৃত্তিতাড়িত হয়ো না।' সূরা সোয়াদ: ২৬ মোটকথা, 'আল্লাহর খলিফা হওয়া'-বিষয়ক যে মতটি ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এখানে উল্লেখ করেছেন, তার বিপরীত ভিন্ন একটি মতামতও সালাফ থেকে বর্ণিত আছে। তবে যে অর্থ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) করেছেন, সেই অর্থে মানুষ আল্লাহর খলিফা হতে পারে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কুরআনে যেই অর্থে মানুষকে তাঁর খলিফা বলেছেন, সেই অর্থে মানুষ অবশ্যই আল্লাহর খলিফা-অনুবাদক
৬৬. বাজ্জার: ৫৩৮৩, কানজুল উম্মাল: ৬/৪-৫ (হাদিসটি সহিহ)
৬৭. ছায়া তখনই গুরুত্বপূর্ণ হবে, যখন তার কাছে আশ্রয় নেওয়ার কেউ থাকবে। তাই ছায়া ছায়াগ্রহীতার মুখাপেক্ষী। - অনুবাদক
৬৮. বুখারি: ৩৬৮২, মুসলিম: ২৩৯৩
৬৯. আবু দাউদ: ৪৬৩৪, তিরমিজি: ২২৮৭
৭০. বুখারি: ৫৬৬৬, মুসলিম: ২৩৮৭
৭১. আবু দাউদ: ৪৬৩৬, আহমাদ: ১৪৮২১
৭২. বুখারি: ৭৩৬০
৭৩. বুখারি: ৪৬৭
৭৪. এই আয়াতে বর্ণিত 'রিদ্দাহ' যেন আবু বকর (রা.)-এর সময়কার ধর্মান্তরণের ফিতনার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেটাকে আবু বকর (রা.) কঠোর হাতে দমন করেছিলেন। এখানে ধর্মত্যাগীদের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে যার কথা বলা হচ্ছে, তিনি খলিফা আবু বকর (রা.) ও সাহাবিগণ।
৭৫. সূরা নিসা: ৬৯
৭৬. সূরা তাওবা: ১০০
📄 সাহাবিদের পারস্পরিক যুদ্ধের ইতিহাস এবং আহলে সুন্নাহর অভিমত
সাহাবিদের পারস্পরিক যুদ্ধ সর্ম্পকে ভ্রান্ত ধারণাসমূহ
খারেজিরা আলি (রা.) এবং যারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, তাদের সবাইকে কাফির মনে করে। আর রাফেজিরা মনে করে-যারা আলি (রা.)-এর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, তারা কাফির। অথচ রাসূল থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রাসূল তাদের মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং কাফির না বলার আদেশ দিয়েছেন।
আয়িশা (রা.), জুবাইর (রা.) ও তালহা (রা.)-এর যুদ্ধের ব্যাপারে ভ্রান্ত আকিদার অনুসারীদের তিন রকমের মতামত পাওয়া যায়। একদল মনে করে, যুদ্ধকারী উভয়পক্ষের একপক্ষ ফাসিক; সবাই না। এ দলে আছে আমর ইবনে উবাইদ ও তাঁর অনুসারীগণ।
আরেক দল মনে করে-যে দল যুদ্ধ বাধিয়েছে, তারা ফাসিক। তবে কেউ যদি তওবা করে, তাহলে সে ফাসিক হবে না। তারা মনে করে, আয়িশা (রা.), জুবায়ের (রা.) ও তালহা (রা.) তওবা করেছিলেন। এটাই তাঁদের জমহুর তথা আবুল হুজাইল ও তাঁর অনুসারী এবং আবুল হুসাইন প্রমুখের বক্তব্যের সারবস্তু।
আরেকদল মনে করে, জুবায়ের (রা.) ও তালহা (রা.)-এর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়াটা ভুল ছিল। তবে শামবাসীদের সাথে যুদ্ধটাকে তাঁরা ভুল সিদ্ধান্ত মনে করে না।
মোটকথা, খারেজি রাফেজি ও মুতাজিলারা মুসলমানদের পারস্পরিক যুদ্ধকে কুফর ও ফাসিকির কারণ মনে করে।
সাহাবিদের পারস্পরিক লড়াই সম্পর্কে আহলে সুন্নাহর অভিমত
আহলে সুন্নাহর সবাই সাহাবিদের 'আদালত' তথা ন্যায়নিষ্ঠতায় বিশ্বাসী। তবে সাহাবিদের ভেতর কার ইজতিহাদ সঠিক বা ভুল ছিল-এ নিয়ে বিভিন্ন মাজহাবের ইমামের বিভিন্ন মতামত রয়েছে।
প্রথমপক্ষ মনে করে, আলি (রা.)-এর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।
দ্বিতীয়পক্ষ মনে করে, সবার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল।
তৃতীয়পক্ষ মনে করে, সবার মত সঠিক নয়; কোনো একটি দলের মত সঠিক।
চতুর্থপক্ষ মনে করে, তাঁদের ভেতরকার বিবাদকে মোটেই গ্রহণ করা যাবে না; অর্থাৎ এ বিষয়ে আলোচনা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এটা সর্বজনবিদিত যে, আলি (রা.) ও তাঁর অনুসারীগণ সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী ছিলেন। যেমনটা আবু সাইদ (রা.)-এর হাদিসে এসেছে-
'একদল ইসলাম থেকে একসময় বের হয়ে যাবে। তাদের এমন একটি দল হত্যা করবে, যারা সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী। ৭৭
এই হাদিসটি মূলত শামবাসীদের সাথে যুদ্ধবিষয়ক। এ ছাড়া আরও বহু হাদিস এটাই প্রমাণ করছে যে, জঙ্গে জামাল মূলত একপ্রকার 'ফিতনা' ছিল। আর ফিতনার সময় যুদ্ধ এড়িয়ে চলাটাই উত্তম। এই মতামতটিই ইমাম আহমদ (রহ.) সহ অধিকাংশ আহলে সুন্নাহর বক্তব্য দ্বারা সমর্থিত। এই ঘটনার পর উম্মতের মধ্যে দিন ও দুনিয়ার বিষয়ে যত বিবাদ হয়েছে, তার মূল হলো-মানুষের কথা ও অসংযত কাজ (মুখ ও হাত)। এখান থেকে প্রতিটি বুদ্ধিমান লোকের শিক্ষা নেওয়া উচিত। ফিতনার সময় যুদ্ধ-সংঘাত এড়িয়ে চলাটাই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মাজহাব বা আমল।
মুসলিমদের পারস্পরিক লড়াইয়ে নিহত ব্যক্তি কি জান্নাতি
মুসলিমদের দুটি দল যদি একটির ওপর আরেকটি হামলা করে। যাদের ওপর হামলা চালানো হয়, তারা যদি পরাজিত হয় এবং পরাজয়ের পর তাদের হত্যা করা হয়, তাহলে পরাজিত দলটির নিহত লোকদের কি জাহান্নামি বলা যাবে? তারা কি রাসূলের হাদিস '(মুসলিমদের পারস্পরিক লড়াইয়ে) হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামে যাবে'-এর অন্তর্ভুক্ত হবে? আর পরাজিতদের মধ্যে যারা জীবিত রয়ে যাবে, তারা কি যুদ্ধে নিহত লোকদের মতোই জাহান্নামি হবে?
যদি পরাজিত লোকটি হারাম যুদ্ধ থেকে তওবার নিয়্যাতে পরাজিত হয়, তাহলে তাকে জাহান্নামি বলা যাবে না। কেননা, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং গুনাহ মাফ করেন। তবে যদি তার পরাজয়টা নিছক অক্ষমতার দরুন হয়; তথা সুযোগ পেলে সে অবশ্যই তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করত, তাহলে অবশ্যই সে জাহান্নামে যাবে। যেমন: রাসূল বলেছেন-
'যখন দুজন মুসলিম তরবারিসমেত ময়দানে মিলিত হয়, তখন হত্যাকারী ও হত্যাকৃত উভয় ব্যক্তিই জাহান্নামে যাবে।' বলা হলো-'হে রাসূল! হত্যাকারীর বিষয়টা বোধগম্য, তবে হত্যাকৃত বা নিহত ব্যক্তির জাহান্নামে যাওয়াটা বোধগম্য নয়।' রাসূল বললেন-'নিশ্চয়ই সেও হত্যার ইচ্ছাতেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল।'৭৮
তাই নিহত ব্যক্তি যেহেতু জাহান্নামে যাবে, সেহেতু পরাজিত লোকটির জাহান্নামে যাওয়াটাও সুস্পষ্ট। কেননা, বিজয়ী-পরাজিত উভয়েরই ইচ্ছা ও কাজ একই ছিল। তা ছাড়া নিহত ব্যক্তিটির ওপর মৃত্যুর যে দুর্বিপাক নেমে এলো, তা পরাজিত ব্যক্তিটিকে ভোগ করতে হয়নি। (কারণ, সে জীবিত ও অক্ষত অবস্থাতেই পরাজয় বরণ করেছে)। তাই এই মৃত্যুর দুর্বিপাক যেহেতু নিহত ব্যক্তিটির পাপ মোচন করতে পারেনি বা তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করতে পারেনি, তাহলে সামান্য পরাজয়ের দুর্বিপাক বা গ্লানি তার মুসলিম ভাইকে হত্যায় অবতীর্ণ হওয়ার মতো জঘন্য পাপকে কী করে মোচন করবে? বরং তা কখনোই সম্ভব না। উপরন্তু পরাজিত ব্যক্তিটি যদি এরূপ যুদ্ধে অবিচল থাকে, তাহলে তার পাপ ময়দানে নিহত ব্যক্তিটির অপেক্ষায় নিঃসন্দেহে গুরুতর হবে এবং এ কারণে সে জাহান্নামে যাওয়ার অধিক হকদার। কারণ, যে লোকটি ময়দানে মারা গেল, তার পাপ তো মৃত্যুর সাথেই বন্ধ হয়ে গেল। পক্ষান্তরে অন্য লোকটি তওবা না করে তার এই জঘন্য পাপে অবিচল রইল।
এজন্যই ফুকাহাদের একটি দল বলেন-যদি এই সব স্বেচ্ছাচারী পরাজিত ব্যক্তিদের পুনর্বার সংগঠিত হয়ে আক্রমণ করার ক্ষমতা থাকে বা সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তাদের সবাইকে হত্যা করা হবে। তবে যে পরাজিত ব্যক্তি আঘাতের দরুন দুর্বল হয়ে গেছে, তার কথা ভিন্ন। কারণ, তার পুনরায় হামলা করার শক্তি নেই।
উল্লেখ্য, নিহত ব্যক্তি সম্পর্কে কথিত আছে-সে জাহান্নামি হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর কারণে হয়তো তার আজাব কমতে পারে। আর পরাজয়ের গ্লানি অপেক্ষা মৃত্যু গুরুতর। অতএব এটা সুস্পষ্ট যে, পরাজিত ব্যক্তিটি যদি তওবা না করে তার ভাইয়ের হত্যায় অবিচল থাকে, তাহলে সে নিহত ব্যক্তিটির চেয়ে জঘন্যতম। তবে সে তওবা করলে অবশ্যই আল্লাহ তার প্রতি দয়া ও মাফ করবেন।
বাগি ও খারেজি কি অভিন্ন
বাগি ও খারেজি কি সমার্থক, নাকি এ দুটোতে পার্থক্য আছে? শরিয়ত কি এই দুই দলের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন বিধান আরোপ করেছে, নাকি একই? আর কেউ যদি দাবি করে-ইমামরা এক্ষেত্রে একমত (ইজমা) যে, এদের বিধান একই; পার্থক্য শুধু নামে। অপরপক্ষে কেউ যদি এর বিরোধিতা করে বলে যে, আলি (রা.) শাম ও নাহরাওয়ানের অধিবাসীদের মধ্যে পার্থক্য করেছেন, তাহলে কোনটা সঠিক হবে?
প্রথমত, 'এই দুই দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; স্রেফ নামের পার্থক্য'-কথাটি মোটেও ইমামদের ইজমা (সর্বসম্মতি) দ্বারা সমর্থিত নয়। এটা সম্পূর্ণ ভুল। মূলত বাগিদের বিষয়ে অনেক গবেষকদের মতো হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি, হাম্বলিসহ অন্যান্য মাজহাবের একদল আলিমও মনে করেন, এই দুই দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাঁরা মনে করেন- আবু বকর (রা.) জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করেছিলেন, তা ছিল 'বাগিদের' বিরুদ্ধে যুদ্ধ। খারেজিদের বিরুদ্ধে আলি (রা.)-এর যুদ্ধও এই পর্যায়ের। এমনকী তাঁরা মনে করেন, জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফিনসহ যত যুদ্ধ মুসলিম নামধেয় সম্প্রদায়ের সাথে হয়েছে, সবই ছিল বাগিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এর পাশাপাশি তাঁরা এও বিশ্বাস করেন যে, তালহা (রা.), জুবায়ের (রা.) এবং তাঁদের সমমনা সাহাবিরা সকলেই সত্যের ওপর আছেন। তাঁদের কাউকেই কাফির বা ফাসিক বলা যাবে না। কেননা, তাঁরা সকলেই মুজতাহিদ ছিলেন। আর একজন মুজতাহিদের মতের ক্ষেত্রে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ দুটোরই সম্ভাবনা থাকে। ভুল হলে তা ক্ষমাযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তাই তাঁরা ব্যাপকভাবে বলে দেন, বাগিরা ফাসিক নন।
কথা হচ্ছে-যখন তাঁরা উভয় দলকে অভিন্ন মনে করেন, তখন অনিবার্যভাবেই খারেজি এবং যেসব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহাবিরা সত্যের ওপর থেকে ইজতিহাদ করে যুদ্ধ করেছেন, উভয়েই এক কাতারে শামিল হয়ে যায়। তাই একদল বাগিদের ফাসিক বলেছেন। তবে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদা হলো-সাহাবিগণ সত্যনিষ্ঠ। আদালাত বা বিশ্বাসযোগ্যতায় তাঁরা সর্বজনস্বীকৃত।
জমহুরের মতামত
জমহুর বা সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামগণ খারেজি বাগিদের, জঙ্গে জামাল-জঙ্গে সিফফিনের অংশগ্রহণকারী 'বাগিদের' এবং তারা ব্যতীত অন্য বাগি তথা যাদের ব্যাখ্যা সাপেক্ষে বাগি বলা হয়, তাদের মাঝে পার্থক্য করে থাকেন। সাহাবিদের এটাই প্রসিদ্ধ মত। জমহুর মুহাদ্দিসিন, ফুকাহা মুতাকাল্লিমিন এবং ইমাম মালেক, শাফেয়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ বহু ইমাম এবং তাঁদের অনুসারীগণও এই মতটিকেই গ্রহণ করেছেন।
খারেজিদের হত্যা করা যাবে কি
সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল বলেছেন-
'একটি দল ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে, যখন মুসলিমদের দুটি দলের মধ্যে অধিক সত্যনিষ্ঠ দলটি তাদের হত্যা করবে।'৭৯
এই হাদিসটি তিনটি দলের কথা বলছে। ইসলাম থেকে বের হবে তৃতীয় দলটি। যে দলটি যুদ্ধরত মুসলিম দুটি দল থেকে ভিন্ন আরেকটি দল। সে দুটি দলের একটি হলো মুয়াবিয়া (রা.)-এর এবং অপরটি আলি (রা.)-এর। আর আলি (রা.)-এর দলটিই হলো অধিক সত্যনিষ্ঠ।
খারেজিদের সম্পর্কে আরেকটি হাদিসে এসেছে—
‘তোমাদের মধ্যে এমন লোক হবে, যারা তোমাদের সাথে নামাজ-রোজা আদায় করা এবং কুরআন তিলাওয়াত করাকে অপমানজনক মনে করবে। কুরআন তাদের গলা দিয়ে নামবে না। তির যেভাবে ধনুক থেকে বের হয়, ইসলাম থেকে তারা সেভাবে বের হয়ে যাবে। তাদের তোমরা যেখানেই পাবে হত্যা করবে। কেননা, যারা তাদের হত্যা করবে, তারা কিয়ামতের দিন এই হত্যার জন্য আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাবে।’৮০
অন্যত্র এসেছে—
‘যারা খারেজিদের হত্যা করবে, তারা যদি নবির কৃত প্রতিশ্রুতির কথা জানত, তাহলে তারা এই আমল (হত্যা) থেকে বিরত থাকত না; এ কাজেই নিরত থাকত। ’৮১
ইমাম মুসলিম (রহ.) খারেজিদের বিষয়ক হাদিস ১০টি সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারি (রহ.) একাধিক সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়াও সুনান ও মুসনাদসমূহেও এই হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ এ সংক্রান্ত হাদিস বহুল বর্ণিত ও বহুল প্রচলিত। সবার কাছেই গ্রহণীয়। তাই খারেজিদের হত্যার ব্যাপারে সাহাবিরা সবাই একমত এবং সাহাবিদের অনুসারী উম্মতের আলিমগণও একমত।
অধিকাংশ সাহাবি জঙ্গে জামালে শরিক হননি
জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফিনে একদল সাহাবি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন বটে, তবে অধিকাংশ প্রবীণ ও বিজ্ঞ সাহাবি কোনো পক্ষেই লড়েননি।
তাঁরা রাসুল ﷺ থেকে বর্ণিত বহু হাদিস দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং এ যুদ্ধকে ফিতনা হিসেবে আখ্যা দেন। আর ফিতনার সময় যুদ্ধ পরিহার করার সিদ্ধান্ত নেন।
খারেজিদের হত্যার ব্যাপারে আলি (রা.) উৎসাহী ছিলেন। তাদের হত্যার বিষয়ে হাদিসও বর্ণনা করেছেন। পক্ষান্তরে সিফ্ফিনের যুদ্ধের সমর্থনে তাঁর পক্ষে কোনো দলিল পাওয়া যায় না। এটা নিছক তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা ইজতিহাদ; বরং তিনি যুদ্ধের বিপক্ষে মতামত দাতাদের কখনো কখনো প্রসংশাও করেছেন।
সহিহ হাদিসে এসেছে, রাসুল ﷺ হাসান (রা.) সম্পর্কে বলেছেন—
‘নিশ্চয়ই আমার এই বংশের একজন নেতা। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের দুটি বিরাট জামায়াতের মাঝে সন্ধি করাবেন।’৪২
রাসুল ﷺ আলি (রা.)-এর দল ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর দলের মাঝে সন্ধি সম্পাদনের জন্য হাসান (রা.)-এর প্রশংসা করেছেন। আর এটা এ কথাই বোঝাচ্ছে যে, এই দুই দলের মধ্যকার যুদ্ধটি পরিহার করাটাই উত্তম ছিল। এই যুদ্ধটি মোটেই কোনো ওয়াজিব কিংবা মুস্তাহাব যুদ্ধ ছিল না।
সুতরাং রাসুল ﷺ খারেজিদের হত্যার আদেশ দিয়েছেন এবং উৎসাহিত করেছেন—এটা প্রমাণিত। তাই রাসুল ﷺ যে দলকে হত্যা করতে আদেশ ও উৎসাহ দিয়েছেন এবং যে দলের সাথে যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন, সেই দুই দল কি সমান হতে পারে? সাহাবিদের সিফফিন ও জামালের যুদ্ধ এবং খারেজি গোষ্ঠীর জুল খুওয়াইসারাহসহ অন্যান্য ও হারক্বিয়া গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধকে যারা অভিন্ন মনে করে, তারা নিশ্চিত গোমরাহি ও অন্ধকারে নিমজ্জিত আছে। মূলত তারা রাফেজি ও মুতাজিলা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তারা খারেজিদের সাথে সাথে জামাল ও সিফ্ফিনের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবিদেরও ফাসিক ও কাফির মনে করে। তাই এই সম্প্রদায়ের কুফরির বিষয়ে ইমামদের ভেতরে প্রসিদ্ধ দুটি মতামতও রয়েছে। তবুও সকল সালাফ ও ইমাম সাহাবিদের বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবে স্থির এবং তাঁদের মধ্যকার বিবাদিত বিষয়ে নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করেন এবং এই বিষয়ে বিতর্ককে তাঁরা এড়িয়ে চলেন। অতএব, এতদুভয়ের মধ্যে তুলনা নিতান্তই বাতুলতা।
তা ছাড়া রাসূল খারেজিদের দ্বারা নিহত হওয়ার পূর্বে তাদের হত্যা করার জন্য মুসলিমদের আদেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে বাগিদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন-
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
'যদি মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তাদের মাঝে সন্ধি স্থাপন করো। একটি দল যদি অন্য দলের ওপর বাগাওয়াত (বাড়াবাড়ি) করে ফেলে, তাহলে বাগাওয়াতকারী বা বাগিদের সাথে যুদ্ধ করো; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর আদেশের দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে, তাহলে দলদ্বয়ের মাঝে সন্ধি স্থাপন করো ইনসাফপূর্ণভাবে। ইনসাফ করো। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন।' সূরা হুজুরাত : ৯
এখানে বাগিদের দলকে শুরুতেই হত্যা করতে বলা হয়নি। তাই হত্যা করাটা প্রাথমিক আদিষ্ট বিষয় নয়; বরং তারা যুদ্ধে লিপ্ত হলে প্রথমে তাদের মাঝে সন্ধি কর্তব্য। তারপর একটি দল যদি অবাধ্যাচরণ করে (অর্থাৎ বাগাওয়াত করে), তাহলে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। তাই একদল ফুকাহা বলেন-অবাধ্যাচারী বা বাগিদের সাথে শুরুতেই যুদ্ধ কাম্য নয়; বরং তারা যুদ্ধের ইচ্ছা করলে যুদ্ধ করতে হবে।
খারেজিদের সম্পর্কে রাসূল বলেছেন-
'খারেজিদের তোমরা যেখানেই পাও, হত্যা করো। তাদের হত্যাকারীদের জন্য আল্লাহর নিকট প্রতিদান রয়েছে। '৮৩
অন্যত্র বলেন-
'আমি যদি তাদের পেতাম, তাহলে আদ জাতির মতো তাদের হত্যা করতাম।'৮৪
খারেজি ও জাকাত অস্বীকারকারীরা কি এক
যারা জাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের বিষয়টাও অনুরূপ। কেননা, আবু বকর (রা.) ও সাহাবিগণের এক্ষেত্রে প্রাথমিক আমল ছিল তাদের হত্যা করা। আবু বকর (রা.) বলেন-
'আল্লাহর কসম! উটের যে রশিটি তারা রাসূলকে দিত, তা যদি আমাকে দিতে অসম্মতি জানায়, তাহলেও তা আদায়ের জন্য তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামব।'৮৫
জাকাতের ওয়াজিব হওয়াকে মান্য করা সত্ত্বেও শুধু জাকাত না দেওয়ার কারণে সাহাবিরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।
জাকাত অস্বীকারকারীরা কি কাফির
যারা জাকাত দিতে অসম্মত হয়েছিল, তারা কাফির কি না এবং তাদের সাথে শাসক যুদ্ধ করবেন কি না-এ নিয়ে ফুকাহাদের মধ্যে দুই ধরনের মত রয়েছে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর দুটি মত পাওয়া যায় এদের তাকফিরের ব্যাপারে। যেমন : খারেজিদের ব্যাপারেও তাঁর দুটি মত রয়েছে।
নিছক অবাধ্যাচারী কাফির নয়
সর্বসম্মতভাবে 'নিছক বাগি' কাফির নয়। কেননা, তারা যুদ্ধে জড়িত ও অবাধ্য হওয়ার পরও কুরআন তাদের 'মুমিন ও পরস্পরে ভাই' বলে উল্লেখ করেছে; তবে আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
টিকাঃ
৭৭. মুসলিম: ১০৬৪
৭৮. বুখারি: ৬৮৭৫
৭৯. মুসলিম: ১০৬৪
৮০. বুখারি: ৩৬১১, মুসলিম: ১০৬৬
৮১. মুসলিম: ১০৬৬, আবু দাউদ: ৪৭৬৮
৮২. বুখারি: ২৭০৪, আবু দাউদ: ৪৬৬২
৮৩. বুখারি: ৩৬১১, মুসলিম: ১০৬৬
৮৪. বুখারি : ৩৩৪৪, মুসলিম : ১০৬৪
৮৫. বুখারি : ৬৯২৪