📘 খিলাফত ও রাজতন্ত্র ইতিহাস ও পর্যালোচনা > 📄 খিলাফত ও রাজতন্ত্র

📄 খিলাফত ও রাজতন্ত্র


নবুয়তি খিলাফতের সময়সীমা এবং রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা
রাসূল বলেন-
'নবুয়তি খিলাফত ৩০ বছর থাকবে। তারপর আল্লাহ যাকে খুশি রাজত্ব দেবেন অথবা তাঁর রাজত্ব দেবেন।'

আবু দাউদের বর্ণনার শব্দগুলো আবদুল ওয়ারিস ও আওয়ামের সূত্রে এভাবে এসেছে-
'খিলাফত ৩০ বছর অব্যাহত থাকবে। তারপর রাজতন্ত্র কায়েম হবে। খিলাফত ৩০ বছর অব্যাহত থাকবে। তারপর খিলাফত রাজতন্ত্রে পরিণত হবে।'

এই বর্ণনাটি হাম্মাদ ইবনে সালামাহ আবদুল ওয়ারিস ইবনে সাইদ থেকে এবং আওয়াম ইবনে হাওশাব প্রমুখ সাইদ ইবনে জুমহান থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিস। তিনি রাসূল -এর দাসী সাফিনা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। আবু দাউদ প্রমুখ সুনান রচয়িতাদের অনেকেই এটা বর্ণনা করেছেন। ৩৯

বাতিলপন্থি ছাড়া সবাই আলি (রা.)-কে শেষ খলিফা মানেন।
ইমাম আহমদ (রহ.)সহ প্রমুখ ইমামগণ মনে করেন, আলি (রা.) চতুর্থ ও শেষ খলিফা ছিলেন। এটাই খুলাফায়ে রাশেদিন তথা সত্যনিষ্ঠ খলিফাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত ও প্রমাণিত সত্য। ইমাম আহমদ (রহ.) এটাকে প্রমাণিতও করেছেন। অতঃপর এ থেকে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, যারা আলি (রা.)-এর শেষ খলিফা হওয়ার বিষয়ে চুপ থাকবে কিংবা তাঁকে শেষ খলিফা মনে করবে না, তারা মূলত গাধাতুল্য। তাদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যাবে না। এটাই ফকিহ, সুন্নাহবিশারদ ও সুফিতাত্ত্বিকদের সর্বসম্মত মতামত। বলা ভালো, এটা সর্বসাধারণেরও অভিমত।

প্রকৃত অর্থে এ বিষয়ে তারাই দ্বিমত করেন, যারা প্রবৃত্তিপূজারি বা বাতিলপন্থি। এদের মধ্যে কতিপয় কালামশাস্ত্রবিদও আছেন। যেমন : রাফিজি সম্প্রদায়; যারা অবশিষ্ট তিন খলিফার খিলাফতের কুৎসা করে অথবা খারেজি সম্প্রদায়; যারা রাসূল -এর দুই জামাতা আলি ও উসমান (রা.)-এর খিলাফতের বিরূপ সমালোচনা করে কিংবা নাসিবি সম্প্রদায়; যারা আলি (রা.)-এর খিলাফতকে অস্বীকার করে। কিছু মূর্খ লোকও এই দলের অন্তর্ভুক্ত।

রাসূল -এর ইন্তেকাল এবং আমুল জামাত
হিজরি একাদশ বছরের রবিউল আউয়াল মাসে রাসূল ইন্তেকাল করেন। এর ঠিক ৩০ বছর পর হিজরি ৪১ সনের জুমাদাল উলা মাসে হাসান ইবনে আলি (রা.) মুসলিমদের দুই সম্প্রদায়ের মাঝে সন্ধির জন্য শাসনভার থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করেন। তখন সকল মুসলিম মুয়াবিয়া (রা.)-এর পতাকাতলে একত্রিত হয়। তাই একে আমুল জামাত বা দলবদ্ধতার বছর বলা হয়। এজন্য মুয়াবিয়া (রা.) ছিলেন রাজতন্ত্রের প্রথম পুরুষ।

নবুয়তি খিলাফতের পর কী হবে
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে-
'নবুয়তি খিলাফতের সাথে রহমত থাকবে। তারপর রাজা; তার সাথেও রহমত থাকবে। তারপর আসবে স্বেচ্ছাচারী রাজা। তারপর আসবে নিষ্ঠুর অত্যাচারী রাজা।'৪০

একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসূল বলেন-
'আমার পরে তোমাদের মধ্যকার জীবিতরা অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তোমরা আমার সুন্নাহ এবং আমার পরে হিদায়াতপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহ আঁকড়ে থেকো। খুব মজবুতভাবে তা ধারণ করো। নবোদ্ভূত বিষয় বা বিদআত থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা, প্রতিটা বিদআতই গোমরাহি।'৪১

রাজাদের খলিফা বলা যাবে কি
খুলাফায়ে রাশেদিন তথা প্রথম চার খলিফা ছাড়া অন্যদেরও খলিফা বলা যাবে; যদিও-বা তারা রাজা হন এবং যদিও অন্যান্য নবির কোনো খলিফা ছিল না। কারণ, সহিহাইনে একটি হাদিস আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল বলেন- 'বনি ইসরাইলকে শাসন করতেন নবিগণ। যখনই কোনো নবি ইন্তেকাল করতেন, তখনই তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন আরেকজন নবি। আর আমার পরে কোনো নবি নেই, তবে খলিফা থাকবে অনেক। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, “তখন আমাদের করণীয় কী?” প্রথম যে খলিফা বাইয়াত নেবেন, তাঁকেই তোমরা মানবে। তাঁর মৃত্যুর পরে যে প্রথমে বাইয়াত নেবে, তাঁকে মানবে এবং তাঁদের হক আদায় করবে। কেননা, তাঁদেরকে জনগণের হক সম্পর্কে আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন। '৪২

'খলিফা থাকবে অনেক' কথাটি দ্বারা বোঝা যায়-চার খলিফা ছাড়াও আরও খলিফা হবে। কেননা, চারজন তো অনেক নয়। তা ছাড়া 'প্রথম খলিফাকেই মানবে' কথাটি দ্বারা বোঝা যায়-খলিফাদের মধ্যে মতভেদ হবে। অথচ চার খলিফার মাঝে কোনো মতভেদ হয়নি। আর 'তাঁদের হক আদায় করবে। কেননা, তাঁদেরকে আল্লাহ জনগণের হক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন'-এটা দ্বারা বোঝানো হচ্ছে, শাসকদের হক আদায় করতে হবে গনিমতের মাল ও সম্পদ ইত্যাদি থেকে-যা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদাকে মজবুত করে।

জনগণের দায়িত্ব কী
আমি অন্যত্রে বলেছি-দেশের দুর্দশার জন্য কেবল শাসক, তাদের প্রতিনিধি, বিচারক ও আমলাদের দুর্বলতা বা ত্রুটিই দায়ী নয়; বরং শাসক-জনগণ উভয় পক্ষের দুর্বলতা ও ত্রুটিই এর জন্য দায়ী। কারণ, রাসূল ﷺ বলেছেন-
'তোমরা যেমন, তেমন শাসকই তোমাদের ওপর নিযুক্ত হবে।'৪৩
আল্লাহ বলেন-
وَكَذَلِكَ نُوَلِّي بَعْضَ الظَّالِمِينَ بَعْضًا بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'এভাবেই আমি কতিপয় জালিমের ওপরে কতিপয় জালিমকে শাসক নিযুক্ত করি।' সূরা আনআম: ১২৯

শাসকদের ভালো কাজে আনুগত্য করা
আমরা পূর্বেও আলোচনা করেছি, যেসব কাজে আল্লাহর অবাধ্যতা নেই, সেসব কাজে শাসকের আনুগত্য ও সহযোগিতা করা, তাদের বিচার ও বণ্টনে ধৈর্য ধরা এবং তাদের সাথে যুদ্ধে ও নামাজে শরিক হওয়া ভালো কাজের অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে তাদের তদারকি ছাড়া সংঘটিত হয় না এমন কাজে আনুগত্য করাও জরুরি। এসব কাজের মধ্য দিয়ে তো প্রকৃত অর্থে কুরআনে বর্ণিত 'ভালো ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো' বলতে যা বোঝানো হয়েছে, তা-ই করা হচ্ছে। আর যেসব কাজে তাদের আনুগত্য করতে নিষেধ করা হয়েছে, সেসবে তাদের আনুগত্য করা মানেই হচ্ছে-অন্যায় ও অবিচারের কাজে সহযোগিতা করা। যেমন: শাসকদের মিথ্যাকে সত্য মনে করা, জুলুমে সহযোগিতা করা, সর্বোপরি আল্লাহর নাফরমানিতে তাদের সাহায্য করা ইত্যাদি।

নবুয়তি খিলাফত সমাপ্তির দ্বারা রাসূল যা বুঝিয়েছেন
নবুয়তি খিলাফতের পর ইমারত গ্রহণ-বর্জন নিয়ে ভালো ও মন্দের যে বিবাদ দেখা দেয়, তা নিয়ে এখন আমরা আলোচনা করব। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়। কারণ, ৩০ বছর পর খিলাফত সমাপ্তির যে বক্তব্য, তাতে রাজতন্ত্রের নিন্দা ও দূষণীয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশেষত আবু বাকরা (রা.)-এর হাদিসটিতে। এ হাদিসটিতে আবু বাকরা (রা.)-এর স্বপ্নকে রাসূল অপছন্দ করেন এবং বলেন- 'নবুয়তি খিলাফতের পর হবে রাজতন্ত্র। আল্লাহ যাকে খুশি রাজত্ব দান করেন।'

ইমাম ও শাসক নির্ণয় এবং সৎকর্মপরায়ণ শাসকের উত্তম পরিণামের কথা যেসব আয়াত ও হাদিসে বলা হয়েছে, সেসব আয়াত ও হাদিসে নবুয়তি খিলাফতের পরে শাসক নির্ণয়ের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে এবং প্রশংসাও করা হয়েছে। তাই এখন আমাদের উচিত হলো-কখন খলিফা নির্ণয় দূষণীয় ও প্রশংসনীয়, তা খোলাসা করা। রাসূল বলেন-
'আল্লাহ আমাকে দুটি জিনিসের মধ্যে একটি নির্বাচনের অধিকার দিয়েছেন। আমি আল্লাহর "রাজা রাসূল” হব, নাকি “দাস রাসূল” হব। আমি "দাস রাসূল” হওয়াকে গ্রহণ করেছি। '৪৪

নবুয়তি খিলাফত কি ওয়াজিব
ইমারত বা শাসন, কাজা ও শাসক-এই তিন বিষয় রাষ্ট্রশাসনে বা রাষ্ট্র পরিচালনায় হাজির থাকা যদি মূল বিষয় হয়, তাহলে রাজতন্ত্র কি জায়েজ? আর খিলাফত কি মুস্তাহাব? নাকি পর্যাপ্ত বিদ্যা ও সামর্থ্যের অভাব ব্যতীত তা জায়েজ নেই? এক্ষেত্রে আমরা বলব, মূলত রাজতন্ত্র জায়েজ নয়। খিলাফত প্রতিষ্ঠা করাটাই ওয়াজিব। আমরা পূর্বে একটি হাদিস উল্লেখ করেছি। সেখানে 'আমার পরে তোমাদের মধ্যকার জীবিতরা অনেক মতভেদ দেখতে পাবে'-এই কথাটি বলার পর সেই পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী হবে, সে সম্পর্কে বলা হচ্ছে- 'তোমরা আমার সুন্নাহ এবং আমার পরে হিদায়াতপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহ আঁকড়ে থাকো। খুব মজবুতভাবে তা ধারণ করো। নবোদ্ভূত বিষয় বা বিদআত থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা, প্রতিটা বিদআতই গোমরাহি।'

সুতরাং এটা খলিফাদের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার একটি নির্দেশ এবং তার প্রতি উৎসাহ প্রদান। পাশাপাশি এটা খলিফাদের সুন্নাহ (খিলাফত) পরিপন্থি নবোদ্ভূত (রাজতন্ত্র) বিদআত সম্পর্কে একটি সতর্কবার্তা। তাই এই হাদিসে বর্ণিত খলিফাদের সুন্নাহর অনুসরণের আদেশ এবং বিদআত বর্জনের নির্দেশের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে খিলাফত ওয়াজিব।

উপরন্তু রাসূল ﷺ অন্য একটি হাদিসের মাধ্যমে আরেকটু নির্দিষ্ট করে বলেছেন- 'আমার পর তোমরা আবু বকর ও উমর-এই দুজনের অনুসরণ করবে।'৪৫

তাই তাঁরাও তাঁদের দুজনকে অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন। আর খুলাফায়ে রাশেদিন তাঁদের চারজনের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার কথা বলেছেন।

এখানে আবু বকর ও উমর (রা.)-কে নির্দিষ্টকরণটা দুইভাবে হয়েছে। এক. সুন্নাহ হলো, যে আমল তাঁরা দুজন সকলের জন্য ধার্য করেছেন। আর কুদওয়া হলো, তাঁরা কোনো আমলকে সুন্নাহ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও তাঁদের দুজনকে অনুসরণ করতে হবে।

দুই. সুন্নাহকে রাসূল খলিফাদের সাথে সম্বন্ধিত করেছেন; সব সাহাবির সাথে করেননি। তাই কেউ কেউ বলেন-সুন্নাহ হলো যে আমলের ব্যাপারে সাহাবিগণ একমত হয়েছেন; কতিপয় সাহাবির বিচ্ছিন্ন মতকে সুন্নাহ বলা যাবে না। আর কুদওয়া হওয়াটা এই দুজনের সাথে খাস বা এই দুজনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তবে এতে আপত্তির অবকাশ আছে।

এর থেকে বোঝা যায়, আলি ও উসমান (রা.) যে ইজতিহাদগুলো করেছিলেন, তারচেয়ে ভালো ইজতিহাদ আবু বকর ও উমর (রা.) করেছিলেন। নসুস ও জমহুরের মতৈক্য এই দুজনের সিদ্ধান্তের যথাযোগ্যতাকে সমর্থন করে। আর এর কারণ হলো-আলি ও উসমান (রা.)-এর সময় উম্মতের মাঝে সৃষ্ট বিভাজন। তাই তাঁদের অজুহাত দিয়ে উম্মাহর মাঝে বিভাজন তৈরির করার উদ্দেশ্যে তাঁদের অনুসরণ করা যাবে না। কারণ, বিভাজন খলিফাদের সুন্নাহ না।

তাই তো আমরা দেখতে পাই, আবু বকর ও উমর (রা.) উম্মতকে শাসন করেছেন উদ্দীপনা ও ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে। ৪৬ রক্তপাত ও সম্পদের বিষয়ে তাঁদের কোনো ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয়নি। উসমান (রা.)-এর মূলমন্ত্র ছিল উম্মতকে উৎসাহ ও উদ্দীপনার মাধ্যমে শাসন করা। তাই মালের ক্ষেত্রে অর্থাৎ সম্পদ বণ্টনের বিষয়ে তাঁকে ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে। ৪৭ আর আলি (রা.) শাসনের মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন ভীতিপ্রদর্শনকে। তাই তাঁকে রক্তপাত করার বিষয়ে বিশেষ ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে। উক্ত পর্যালোচনাকে সামনে রেখে আমরা বলতে পারি, সম্পদ বণ্টন ও উম্মতকে শাসন করা-এই উভয় ক্ষেত্রেই আবু বকর ও উমর (রা.)-এর খোদাভীতি চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। উসমান (রা.)-এর খোদাভীতি পূর্ণতা পেয়েছে ক্ষমতার ক্ষেত্রে। আলি (রা.)-এর খোদাভীতি পূর্ণতা পেয়েছে অর্থ-সম্পদ বণ্টনের বেলায়।

সর্বোপরি রাসূল -এর খিলাফতপরবর্তী রাজতন্ত্রকে অপছন্দ করাটাই প্রমাণ করে, এতে দিনের ওয়াজিবকে আংশিক পরিত্যাগ করা হয়েছে।

রাজতন্ত্রের হুকুম
যারা রাজতন্ত্রকে বৈধ বলেন, তাদের দলিল হলো-রাসূল মুয়াবিয়া (রা.)-কে বলেন-
'তুমি যদি কোনো রাষ্ট্রের মালিক বা রাজা হও, তাহলে উত্তমরূপে শাসন করো।'৪৮

তাদের অন্য আরেকটি দলিল হলো- 'একবার মুয়াবিয়া (রা.) রাজার পোশাকে শামে এলেন। উমর (রা.) তাঁকে দেখে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। মুয়াবিয়া (রা.) রাজকীয় শান-শওকত ও চাকচিক্য গ্রহণ করার প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করলেন। সব শুনে উমর (রা.) বললেন- “আমি তোমাকে এসব করতে নিষেধ করি না, আদেশও দিই না।”

এক্ষেত্রে কেউ কেউ বলেন-উমর (রা.) যেহেতু মুয়াবিয়া (রা.)-কে নিষেধও করেননি আবার আদেশও দেননি, তাই এর দ্বারা বোঝা যায়- মুয়াবিয়া (রা.) যে কারণ দর্শিয়েছেন, সেটা তাঁর মনঃপূত হয়নি। তাই এটা একটা নিছক ইজতিহাদ হিসেবে বিবেচ্য।

এক্ষেত্রে মধ্যমপন্থি মতামত হলো-খিলাফত ওয়াজিব। তবে প্রয়োজনমাফিক খিলাফত থেকে বের হওয়া যাবে অথবা এভাবে বলা যায়-শাসনের মূল উদ্দেশ্যটি যদি রাজতন্ত্রের মাধ্যমে হাসিল করা সহজ হয়, তাহলে তাকে গ্রহণ করা যায়। কারণ, যখন শাসনের মূল উদ্দেশ্য রাজতন্ত্র ব্যতীত হাসিল হওয়া কষ্টকর হয়, তখন রাজতন্ত্রকে বৈধকরণ ছাড়া উপায় নেই। সর্বোপরি রাজতন্ত্রকে আবশ্যক ও ঐচ্ছিক সাব্যস্ত করার বিষয়টা নিতান্তই ইজতিহাদি বিষয়।

এই বিষয়ে ইতিহাসে দুটি পক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রথমপক্ষ, এরা সর্বাবস্থায় এবং সব সময়ই সবার ওপর খিলাফত প্রতিষ্ঠা ওয়াজিব মনে করেন। তাই এই পক্ষটি মূলত যারা খিলাফতকে পরিত্যাগ করেছে, তাদেরও নিন্দা করেন। আবার যারা পরিস্থিতির শিকার হয়ে পরিত্যাগ করেছেন, তাদেরও নিন্দা করেন। এমনটাই বিদআতপন্থি খারেজি, মুতাজিলা ও সুফি সম্প্রদায়সহ আরও কয়েকটি সম্প্রদায় মনে করে।

দ্বিতীয়পক্ষ, এই দলটি মনে করে সর্বাবস্থাই রাজতন্ত্র বৈধ; চাই তা খলিফাদের সুন্নাহর পরিপন্থি হোক, আর পক্ষে হোক। যেমনটা জুলুমবাজ স্বৈরাচারী শাসক ও মুরজিয়াদের একটা গোষ্ঠী মনে করে। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে।

শাসনব্যবস্থাকে খিলাফত থেকে রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত করার পেছনে কয়েকটা সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে—
১. হয়তো নবুয়তি খিলাফত প্রতিষ্ঠায় জনগণের অক্ষমতা রয়েছে।
২. কিংবা কোনো গ্রহণযোগ্য ইজতিহাদ রয়েছে।
৩. অথবা খিলাফত প্রতিষ্ঠার আমলি ও ইলমি যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে না।

যদি ইলমি ও আমলি অপারগতার দরুন খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা না যায়, তাহলে রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাকারীকে অপারগ বা মাজুর হিসেবে বিবেচনা করা হবে। খিলাফত প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা থাকলে তা প্রতিষ্ঠা করা ওয়াজিব। তবুও যেহেতু অপারগতার দরুন শরিয়তের অনেক হুকুম রহিত হয়ে যায়, তেমনি এটাও রহিত হয়ে যাবে। যেমন: বাদশাহ ইসলাম গ্রহণ করা সত্ত্বেও তা প্রকাশ করতে পারেননি তাঁর সম্প্রদায়ের কারণে। তাঁর এই অবস্থাটা সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ.)-এর সাথে যথেষ্ট সাদৃশ্য রাখে। তবে এখানে মনে রাখতে হবে, কতিপয় নবির জন্য রাজতন্ত্র বৈধ ছিল। যেমন: সোলায়মান (আ.), ইউসুফ (আ.), দাউদ (আ.)।

আর খিলাফত প্রতিষ্ঠার ইলমি ও আমলি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য নবিদের শরিয়তের ওপর বিবেচনা করে কেউ যদি ধরে নেয় যে খিলাফত মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয় এবং রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হন, তাহলেও শাসকের এই মতামতকে হক মনে করা হবে। সে যদি ন্যায়পরায়ণ হয়, তাহলে তার কোনো গুনাহ হবে না।

কাজি আবু ইয়ালা তাঁর আল মুতামাদ গ্রন্থে মুয়াবিয়া (রা.)-এর খিলাফতকে প্রমাণ করতে গিয়ে এই বিষয়টির অবতারণা করেছেন। তিনি তাঁর ইসলামকে সমুন্নত করা, ন্যায়পরায়ণতা ও উত্তম চরিত্রের ওপর ভিত্তি করেই এসব বলেছেন। তা ছাড়া তিনি তাঁর নেতৃত্বকে সাব্যস্ত করেছেন আলি (রা.)-এর মৃত্যুর পর যখন হাসান (রা.) তাঁর হাতে বাইয়াতবদ্ধ হয়েছিলেন, সেই সময়টাকে 'আমুল জামাত' বা সংঘবদ্ধতার বছর বলা হয়। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর একটি হাদিস বর্ণনা করেন-
'ইসলামের চাকা ৩৫ হিজরির শেষ ভাগ পর্যন্ত থাকবে।'৪৯

ইমাম আহমদ (রহ.) ইবনুল হাকামের রেওয়ায়েত সম্পর্কে বলেন- 'ইমাম জুহরি (রহ.) থেকে বর্ণনা করা হয়, তিনি বলেন- “মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনকাল পাঁচ বছর ছিল।" এতে আপত্তির অবকাশ নেই। অতএব, এটা রাসূলের হাদিসে বর্ণিত, “৩৫ হিজরি" কথাটির সাথে সংগতিপূর্ণ।'

ইবনুল হাকাম (রহ.) বলেন- 'আমি আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-কে বললাম-“কে বলেছে ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত এই হাদিসে মুয়াবিয়া (রা.)-এর কথা বলা হয়েছে?” ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বললেন-“রাসূল এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্য দিয়েছেন নিজের অবস্থান থেকে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া একজন নবির কাজ নয়।"'

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর বক্তব্যের সাধারণ পাঠোদ্ধার হলো, তিনি হাদিসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করেছেন। মুয়াবিয়া (রা.)-এর খিলাফত হিজরি ৩৫তম বছর পর্যন্ত ছিল। বলা হয়, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-কে খিলাফত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন- 'মদিনায় যেসব বাইয়াত হয়েছে, তা আমাদের কাছে খিলাফত।'

কাজি আবু ইয়ালা বলেন- 'ইমাম আহমদ (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মদিনার বাইরে যেসব বাইয়াত হয়েছে, তা নবুয়তি খিলাফত ছিল না।
আমি মনে করি, নবুয়তি খিলাফত আলি (রা.)-এর মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছে। এর সপক্ষে ইমাম আহমদ (রহ.)-এর বক্তব্য ও মতামত বেশি।'

তবে এতটুকু বলার পর ইমাম কাজি আবু ইয়ালা 'খিলাফত ৩০ বছর। তারপর রাজতন্ত্র কায়েম হবে'- হাদিসটি নিয়ে একটি আপত্তির কথা উল্লেখ করেন। প্রশ্নকারী বলেন- 'সুনির্দিষ্টভাবে যেহেতু ৩০ বছর নবুয়তি খিলাফত থাকার কথা বলা হয়েছে, তাই খিলাফত শেষ হয়েছে আলি (রা.)-এর মাধ্যমে। তাঁর পরের সময়টি ছিল রাজতন্ত্রের। তাই মুয়াবিয়া (রা.)-এর সময়-পর্বটি খিলাফতের সময় ছিল না।'

কাজি আবু ইয়ালা এর জবাবে বলেন-'এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা আছে যে, রাসূল ﷺ উক্ত হাদিসটিতে "খিলাফত” শব্দটি দিয়ে বুঝিয়েছেন এমন খিলাফত, যা রাজতন্ত্রমুক্ত হবে।'

আর বাস্তবেও তা-ই ছিল; চার খলিফার খিলাফত ছিল রাজতন্ত্রমুক্ত। কিন্তু মুয়াবিয়া (রা.)-এর খিলাফত রাজতন্ত্রমুক্ত ছিল না। আর এটা তাঁর খিলাফতের জন্য দূষণীয় কোনো বিষয় না। যেমনটা সোলাইমান (আ.)-এর রাজতন্ত্র তাঁর নবুয়তের জন্য দূষণীয় বিষয় নয়; যদিও তিনি ছাড়া প্রায় সব নবিই ছিলেন বিত্তহীন।

খিলাফত ও রাজতন্ত্র একসঙ্গে চলতে পারে কি
ওপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, খিলাফতের সাথে রাজতন্ত্রের মিশ্রণ আমাদের শরিয়তে জায়েজ এবং এটা ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতিবন্ধক নয়। তবে বিমিশ্র খিলাফত বা নিরেট খিলাফতই সর্বোত্তম পন্থা।

অতএব, মুয়াবিয়া (রা.)-এর সাথে যারা একাত্মতা পোষণ করেন এবং মুয়াবিয়া (রা.)-কে মুজতাহিদ জ্ঞান করে তাঁকে গুনাহগার মনে করে না, তাদের দুটি বক্তব্যের একটি অবলম্বন করতে হবেই-
এক. তাদের বলতে হবে, খিলাফতের সাথে রাজতন্ত্রের মিশ্রণ বৈধ।
দুই. অথবা বলতে হবে, এক্ষেত্রে কোনো নিন্দা করা যাবে না।

মুতাজিলা সম্প্রদায়ের মতো বিদআতপন্থি লোকেরা আলি (রা.)-এর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়াসহ আরও কিছু কারণে মুয়াবিয়া (রা.)-কে ফাসিক বলে থাকে। তাদের যুক্তি হলো- 'তিনি কবিরা গুনাহ করেছেন। আর কবিরা গুনাহকারীকে ফাসিক বলা আবশ্যক। তাই দুটি বিষয়ের (কবিরা গুনাহ করা এবং এর দরুন ফাসিক হওয়া) যেকোনো একটিকে অবশ্যই নিষিদ্ধ সাব্যস্ত করতে হবে। তা না হলে কবিরা গুনাহ করা যদি রাজার জন্য বৈধ হয়ে যায়, তাহলে কাজি ও আমিরদের জন্যও বৈধ হয়ে যাবে।'

খিলাফত ত্যাগ করার হুকুম
খিলাফত প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ খিলাফত প্রতিষ্ঠা থেকে বিরত থাকে, তাহলে এই ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়াটা নিন্দনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে সে যদি সগিরা গুনাহ মনে করে এটাকে ত্যাগ করে, তাহলে এটা তার ন্যায়পরায়ণতার প্রতিবন্ধক নয়। সে ইনসাফকারী হিসেবে বিবেচিত হবে। আর যদি সে কবিরা গুনাহ মনে করে ছেড়ে থাকে, তাহলে দ্বিবিধ বক্তব্য পাওয়া যায়।

রাজতন্ত্রী অথবা ইমারতপন্থি শাসক যদি আদিষ্ট ভালো কাজগুলো পালন করে এবং নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকে আর এভাবে যদি তার সওয়াবের তুলনায় গুনাহ কম হয়, তাহলে ধরে নেওয়া হবে সে সৎ। আর কেউ যদি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সত্ত্বেও এসব কর্তব্য পালনে ত্রুটি করে, তাহলে তিন অবস্থা-
১. হয়তো শাসকের ভালো কাজ জনগণের ভালো কাজের চেয়ে কম হবে;
২. অথবা বেশি হবে
৩. অথবা সমান হবে।

যদি বেশি হয়, তাহলে সে উত্তম। আর কম হলে অনুত্তম। সমান হলে সমকক্ষ হিসেবে বিবেচিত হবে। সওয়াব ও শাস্তির ব্যাপারে এটাই কুরআন-সুন্নাহ ও ইনসাফের দাবি।

এ বক্তব্যটি তাদের কথার ওপর ভিত্তি করে আমরা বলেছি, যারা কিয়ামতে বিচার ও আদালতের ক্ষেত্রে ভালো-মন্দ আমলকে একসঙ্গে মাপা ও তুলনা করা হবে বলে বিশ্বাস করে। আর যারা বিশ্বাস করেন, হাজার ভালো কাজ করা সত্ত্বেও একটি কবিরা গুনাহই মানুষের দোজখে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট, তাদের কথা এখানে আমরা আনছি না। (অর্থাৎ মুতাজিলাদের কথা। যেমনটা আমরা একটু আগে পড়ে এসেছি।) কেননা, প্রথম মতামতটিই সবচেয়ে প্রমাণসিদ্ধ ও দালিলিক।

বৃহত্তম স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্রতম স্বার্থ বিসর্জনের হুকুম
এখানে একটি মাসয়ালা আলোচনা করে নেওয়া দরকার। পাপের আশ্রয় ব্যতীত যদি অতীব ভালো কাজ না করা যায়, তাহলে দুটি অবস্থা-
প্রথম অবস্থা: যদি অবৈধ কাজ ছাড়া সেই ভালো কাজটি করা অসম্ভব হয়, তাহলে সেই অবৈধ কাজ আর অবৈধ বা নাজায়েজ থাকে না। কারণ, ওয়াজিব যা ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না কিংবা মুস্তাহাব যা ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না, তাও ওয়াজিব কিংবা মুস্তাহাব। অর্থাৎ ওয়াজিব বিষয়টি পালনে যা যা করতে হয়, সেগুলো ওয়াজিব। আর মুস্তাহাব বিষয় পালন করতে যা যা করা লাগে, তাও মুস্তাহাব। তাই এতে যদি অমঙ্গলের চেয়ে মঙ্গলই বেশি থাকে, তাহলে তা 'মাহজুর' বা 'অবিধিবদ্ধ' থাকে না; বরং জায়েজ হয়ে যায়। যেমন: অপারগ ব্যক্তির জন্য মৃত প্রাণীর গোশত খাওয়া এবং ঠান্ডার সময় রেশমি কাপড় পরা ইত্যাদি বিষয় মানুষের অপারগতাকে বিবেচনায় রেখে জায়েজ সাব্যস্ত করা হয়। ফিকহের কিতাবে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, অধিকাংশ মানুষ শুধু এতটুকুই অনুভব করে-কাজটি খারাপ; কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রয়োজনের প্রতি তারা খেয়াল করে না। অথচ ভালো কাজটির গুরুত্ব ও নেকি এত বেশি যে, খারাপ কাজটি সেখানে নিতান্তই গৌণ। (সুতরাং পরিস্থিতিকে গুরুত্ব না দিয়ে কেউ যদি খারাপ কাজটির কারণে একটি অধিক ভালো কাজ করা থেকে বিরত থাকে, তাহলে সে নিশ্চিতভাবে একটি অতীব ভালো ও পুণ্য থেকে নিজেকে বঞ্চিত করল। - অনুবাদক)

এভাবেই যদি একান্তই কোনো জরুরত বা বাধ্যবাধকতা দেখা দেয়, তাহলে 'মাহজুর' বা 'অবিধিবদ্ধ' বিষয়টি 'মাহবুব' বা প্রিয় হয়ে যায় কিংবা মুবাহ হয়ে যায়। একইভাবে মুবাহ বিষয়ে কিংবা ওয়াজিব ও মুস্তাহাব বিষয়ে যখন অমঙ্গলের প্রাধান্য বিরাজ করে, তখন তা হারাম হয়ে যায় কিংবা অনুত্তম কাজে রূপান্তরিত হয়। যেমন: অসুস্থ ব্যক্তির রোজা রাখা এবং এমন ব্যক্তি-যার পানির দ্বারা প্রাণনাশের আশঙ্কা আছে, তার পানি ব্যবহার করা। রাসূল বলেন-

'যারা তাঁকে নাহকভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে, তাদের ধ্বংস হোক। তাঁরা যখন জানে না, তখন কেন তাঁরা প্রশ্ন করে জানল না? অজ্ঞতার একমাত্র প্রতিষেধক হলো প্রশ্ন।'৫০

প্রয়োজন সাপেক্ষে ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়া এবং মাহজুর বা অবাঞ্ছিত কাজ করা জায়েজ।

এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, প্রয়োজন সাপেক্ষে কিছু ওয়াজিব যেমন ছেড়ে দেওয়া যায় এবং কিছু অবিধিবদ্ধ তথা অবাঞ্ছিত কাজও করা যায়, তেমনি কখনো কখনো খলিফাদের সুন্নাহ থেকেও বের হওয়া যায়; যদি তাঁদের কিছু সুন্নাহ পালনে অক্ষমতা এবং কিছু নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা নিতান্তই অসম্ভব হয়ে পড়ে। যেমন: অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া ব্যতীত রাষ্ট্রপরিচালনার কাঙ্ক্ষিত দায়িত্বগুলো আদায় করা যাচ্ছে না।

খিলাফতকে ত্যাগ করার বিষয়টিও অনুরূপ; যেমনটা আমরা আগেও বলেছি। আর এটা কতিপয় জালিম ও জাহেল বিদআতপন্থিরা ছাড়া সবাই মানে।

গুনাহহীন কষ্টসাধ্য ভালো কাজের হুকুম
দ্বিতীয় অবস্থা : গুনাহহীনভাবেই ভালো কাজটি করা সম্ভব। তবে তা এতটাই কষ্টসাধ্য যে, প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে হয়। অথবা কাজটা এতটাই অপছন্দনীয় হয় যে, প্রবৃত্তি বা মানবপ্রকৃতি এই অতীব ভালো কাজে উৎসুক হয় না; হোক সেই কাজটি ওয়াজিব কিংবা মুস্তাহাব।

যদি না সে কাজটি করতে গিয়ে এমন কিছু করে বসে, যা নিষিদ্ধ এবং যার গুনাহ ভালো কাজের কল্যাণের তুলনায় কম। এই অবস্থার সম্মুখীন অনেককেই হতে হয়। শাসক, রাজনীতিবিদ, মুজাহিদ, আলিম, কাজি বা বিচারক, কালামবিদ, সুফি ও সাধারণ মানুষগণও এই অবস্থার সম্মুখীন হন। যেমন: হুদুদ কায়েম করা, নাগরিক নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করা, সম্পদ বণ্টন, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ ইত্যাদি রাষ্ট্রের কল্যাণের সাথে জড়িত কর্মসমূহ পালন করতে গিয়ে নিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন। সম্পদ আত্মসাৎ করা, মানুষের ওপর দখলদারিত্ব করা, সম্পদ বণ্টনে পক্ষপাত করা ইত্যাদি কুপ্রবৃত্তিতাড়িত কাজে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন।

একইভাবে জিহাদের ক্ষেত্রে কেউ অযাচিত ধ্বংস সাধনে প্রবৃত্ত হলো কিংবা ইলম চর্চার ক্ষেত্রে ফিকহ ও উসুলুদ-দ্বীন বা দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদি চর্চা করতে গিয়ে নিজস্ব মত দ্বারা চালিত হলো এবং এসব বিষয়ে কালামশাস্ত্র দ্বারা তাড়িত হলো কিংবা শরয়ি ইবাদতবিষয়ক ইলম ও আল্লাহর মারেফতের ইলমচর্চার বেলায় রাহবানিয়াত বা বৈরাগ্যতায় লিপ্ত হলো। এই জাতীয় বিষয় রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রচুর দেখা যায়। তা শাসক, আমির, কাজি, আলিম, আবেদ সবার মাঝেই দেখা যায়। যার দরুন সমাজে ফিতনা দেখা দেয়। তাই বাধ্য হয়ে করা এ নিষিদ্ধ কাজগুলোই কেবল এক দলের চোখে পড়ে। তারা তাদের নিন্দা এবং ঘৃণা করে। আরেক দলের কেবল এদের ভালো কাজগুলোই চোখে পড়ে, তারা তাদের ভালোবাসে। তাই প্রথম দল তাদের ভালো কাজগুলো খারাপ বিবেচনা করে এবং দ্বিতীয় দল খারাপকে ভালো মনে করে।

এ বিষয়ক মূলনীতি আমরা পূর্বেও আলোচনা করেছি। রাষ্ট্রের জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় বা ওয়াজিব কোনো কিছু আদায় করাটা যদি রাজতান্ত্রিক নীতি ছাড়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়, তখন রাজতন্ত্র কি মুবাহ বা জায়েজ হয়ে যাবে, যেমনটা অপারগতার সময়ে মুবাহ হয়ে যায়? আমরা এ প্রসঙ্গে দুটি মত উল্লেখ করেছি। যদি দুষ্করতাকে অপারগতার স্থলাভিষিক্ত করা হয়, তাহলে এটা কোনো গুনাহ হবে না। আর যদি স্থলাভিষিক্ত না করা হয়, তাহলে গুনাহ হবে। আর যে কাজে কোনো দুষ্করতা ও অপারগতা নেই, তাতে খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহকে না মানা কুপ্রবৃত্তির অনুগমন বলে বিবেচিত হবে।

প্রকৃত অর্থে ভালো কাজ ভালোই, আর খারাপ কাজ খারাপই। মানুষ ভালো কাজে খারাপের মিশ্রণ করে এবং খারাপ কাজের সাথে ভালোর মিশ্রণ করে। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তাদের খারাপ কাজটি অনুমোদিত নয় কিংবা শরিয়ত এর নির্দেশও দেয় না।

শরিয়তের দৃষ্টিতে তাদের অপারগতা যদি গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে তাদের কাজের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অজুহাত বা অপারগতাকে গ্রহণ করা হবে না। তবে ভালো কাজের বেলায় অবশ্যই তারা আদিষ্ট; বরং এক্ষেত্রে তাদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করা হবে। তবে শর্ত হলো-কাজটি এমন হতে হবে, যা হালকা মন্দকর্ম ছাড়া সম্পাদন করা সম্ভব হয় না। যেমনটা ঘটে থাকে জিহাদের ময়দানে; বাধ্য হয়ে এবং অনিচ্ছাবশত জুলুম হয়ে যায়, অথচ জিহাদটির কল্যাণের তুলনায় জুলুম বা অকল্যাণের পরিমাণ সামান্য।

অনুরূপভাবে, যদি এমনটা নিশ্চিত জানা যায় যে, সেই সব মন্দ কাজে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে লোকেরা এমন ওয়াজিব ও গুরুত্বপূর্ণ ভালো কাজও পরিত্যাগ করবে-যা করতে কোনো নিষেধ বা বাধা নেই, তাহলে এই অবস্থাতেও শিথিলতাকে বৈধ মনে করা হবে। কেননা, এই নিষেধাজ্ঞার মাঝে ওয়াজিব ত্যাগের নেতিবাচক দিক আছে। তবে যদি এই দুটোর সমন্বয় সম্ভব হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে পূর্ণ ওয়াজিবই আদায় করবে। যেমন: কর্মদক্ষতা ও পারদর্শিতার বিবেচনায় উমর (রা.) এমন লোককেও কাজে নিয়োগ দিতেন, যার ভেতরে পাপাচারের মনোভাব আছে। তারপর তিনি নিজ ন্যায়পরায়ণতা ও ব্যক্তিত্বের ক্ষমতাবলে তার ভেতর থেকে পাপাচারিতাকে দূর করতে সক্ষম হতেন।

এসব বিষয়ে (খারাপ কাজে) নিষেধ করা বা প্রতিবাদ করাকে পরিহার করাটা মূলত অপরাধকে স্বহস্তে প্রতিবাদ করা অথবা অস্ত্রসহ প্রতিহত করাকে ছেড়ে দেওয়ার মতোই একটি বিষয়। ৫১ কেননা, উপরিউক্ত অবস্থার ক্ষতিটি অপরাধ প্রতিহতকারীর ক্ষতির চেয়ে আরও বড়ো ও ব্যাপক ক্ষতি বয়ে আনে।

তাই কোনো নিষেধাজ্ঞার ফলে যখন আবশ্যিকভাবে নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে অতি উত্তম কোনো কাজকে পরিত্যাগ করার পরিস্থিতি তৈরি হবে, তখন সেই নিষেধাজ্ঞাটি আবশ্যিকভাবেই অতি মন্দ কাজকে ডেকে আনবে। যেমন : কেউ একজন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার বদলে দুই ওয়াক্ত নামাজ পড়ার শর্তে ইসলাম গ্রহণ করল (এমনটা রাসূলের সময়ে ঘটেছে) কিংবা কোনো জালিম শাসক মদ পান বা এ জাতীয় কোনো হারাম কাজের শর্তে ইসলাম গ্রহণ করল। সেক্ষেত্রে তাকে যদি বাধা দেওয়া হয়, তাহলে সে ইসলাম থেকে বিমুখ হয়ে যাবে। ৫২

সুতরাং একজন আলিম বা শাসকের নিষেধাজ্ঞাতে বিশেষ কোনো অকল্যাণের প্রতি লক্ষ রেখে নিষেধ করা থেকে বিরত থাকার মাঝে আর কাজটি সম্পাদন করার আদেশ দেওয়ার মাঝে পার্থক্য আছে। অবস্থা অনুপাতে বা পরিস্থিতিভেদে আদেশ ও নিষেধের প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। এসব পরিস্থিতি ছাড়া অন্য অবস্থায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা আবশ্যক। হতে পারে এই নিষেধাজ্ঞাটি হারামের হুকুম বর্ণনার জন্য অথবা হারামের বিশ্বাস তৈরির জন্য কিংবা সে কাজের ব্যাপারে ভীতিপ্রদর্শনের জন্য বা সে কাজ পরিহার করবে এমন আশায় অথবা প্রমাণ প্রতিষ্ঠার জন্য। তাই রাসূল কর্তৃক কোনো কাজ করার আদেশ-নিষেধ, জিহাদ, ক্ষমা, হুদুদ কায়েম এবং কঠোরতা ও নম্রতার অবস্থায় বৈচিত্র্য দেখা যায়。

টিকাঃ
৩৯. আবু দাউদ: ৪৬৪৭
৪০. মুজামুল আওসাত: ৬/৩৪৫, মাজমাউজ জাওয়াইদ: ৫/১৯৩, হাদিসটি মুসলিম শরিফে পাওয়া যায়নি। তবে হাদিসটি একাধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আবু ইয়ালা (রহ.) ও ইমাম বাজ্জার (রহ.) তাঁদের কিতাবে এই হাদিসটি এনেছেন। ইমাম হাইসামি (রহ.) হাদিসটি তাঁর কিতাব 'মাজমাউজ-জাওয়াই'দে এনে বলেন, এই হাদিসের রাবিগণ সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য-অনুবাদক
৪১. আবু দাউদ: ৪৬০৭, তিরমিজি: ২৬৭৬, ইবনে মাজাহ: ৪২, আহমাদ: ১৭১৪২
৪২. মুসলিম: ১৮৪২, বুখারি, ৩৪৫৫
৪৩. আল মাকাসিদুল হাসানাহ ৩৮৫, কানজুল উম্মাল: ৬/৮৯; ফিরদাউস, দাইলামি: ৩/৩০৫
৪৪. আহমদ: ৭১৬০, বাজ্জার: ৯৮০৭
৪৫. তিরমিজি: ৩৬৬২, ইবনে মাজাহ: ৯৭, আহমদ: ২৩২৯৩
৪৬. অর্থাৎ তারা মুসলিম জনসাধারণকে উৎসাহমূলক কর্মপন্থার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।- অনুবাদক
৪৭. শাইখুল ইসলাম (রহ.) এখানে উসমান (রা.)-এর স্বভাবসুলভ উদারতা ও নম্রতার কথা বলেছেন। উসমান (রা.) কখনো বাইতুলমাল থেকে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজের সম্পদ থেকে উদার হস্তে জনসাধারণ ও তাঁর আত্মীয়দের দান করতেন। (মাওসুআতুত তারিখিল ইসলামি, মাহমুদ শাকের, ৩/২৩৪) তবে তিনি নিজে বাইতুলমাল থেকে কোনো ভাতা গ্রহণ করতেন না। (আল মাবসুত, শামসুল আইম্মাহ শারাখসি রহ., ৩/২১)
তাবাকাতে ইবনে সাদে বর্ণিত আছে, উসমান (রা.) একবার 'মজলিশে শূরা'র সদস্যদের সামনে বলেন- 'রাসূলুল্লাহ তাঁর আত্মীয়দের দান করতেন। অধিকন্তু আমি দরিদ্র ও সম্বলহীন আত্মীয়দের নিয়ে বাস করি। তাই তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। তোমরা যদি একে ভুল মনে করো, তাহলে তারা এ অনুদান ফিরিয়ে দেবে।' (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সাদ ৩/১৯০)
৪৮. আহমাদ: ১৬৯৩৩, ইবনে আবি শাইবা: ৩১৩৫৮
৪৯. আবু দাউদ: ৪২৫৪, আহমাদ: ৩৭০৭
৫০. হাদিসটির পূর্ণরূপ হলো-একজন সাহাবি আঘাত পেয়ে অন্যদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমি কি এখন তায়াম্মুম করতে পারব?' সাহাবিরা বলেছিলেন-'না, তুমি পানি ব্যবহারে সক্ষম।' তারপর সাহাবি পানি ব্যবহার করেন এবং মারা যান। রাসূল বিষয়টি অবগত হওয়ার পর উক্ত কথাগুলো বলেন। আবু দাউদ: ৩৩৬, আহমাদ: ৩০৫৭
৫১. শাইখুল ইসলাম (রহ.) এখানে যে হাদিসটির ইঙ্গিত দিয়েছেন তা হলো, রাসূল বলেন- 'তোমাদের কেউ কোনো অপরাধ হতে দেখলে সে যেন তা স্বহস্তে প্রতিহত করে।' মুসলিম: ৪৯
৫২. যেমন : উল্লিখিত ক্ষেত্রে লোকটিকে যদি এই শর্তে ইসলাম গ্রহণ করতে দেওয়া না হতো-তথা তাকে নিষেধ করা হতো, তখন এই নিষেধাজ্ঞাটি অতি মন্দ একটি কাজ তথা লোকটির জন্য কুফরের দরজা উন্মুক্ত করে দিত। - অনুবাদক

📘 খিলাফত ও রাজতন্ত্র ইতিহাস ও পর্যালোচনা > 📄 পূর্বেকার শরিয়ত ও আমাদের শরিয়তে রাজতন্ত্র

📄 পূর্বেকার শরিয়ত ও আমাদের শরিয়তে রাজতন্ত্র


পূর্বেকার শরিয়তে রাজতন্ত্র
ইতঃপূর্বেই আলোচনা করেছি, আমাদের পূর্বেকার শরিয়তে রাজতন্ত্রের বিধান কী ছিল। আমাদের শরিয়তে রাজতন্ত্র কি বৈধ? নবুয়তি খিলাফত মুস্তাহাব, নাকি আরও উত্তম কিছু? নাকি ওয়াজিব? নাকি নবুয়তি খিলাফত বাদ দিয়ে রাজতন্ত্র গ্রহণ করা কেবল তখনই বৈধ হবে, যখন কোনো অপারগতা দেখা দেবে; যেমনটা অপরাপর ওয়াজিবের বেলায় হয়ে থাকে?

পূর্বেকার শরিয়তে রাজতন্ত্র বৈধ ছিল। আল্লাহ তায়ালা কখনো কখনো নবি ও সৎকর্মকারীদের ধন-সম্পদও দান করেছেন। যেমন : দাউদ (আ.) সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-

وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ

‘আল্লাহ তাঁকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করেছেন এবং তাঁর যা ইচ্ছা শিক্ষা দিয়েছেন।’ সূরা বাকারা : ২৫১

সোলায়মান (আ.) সম্পর্কে বলেছেন-

قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِنْ بَعْدِي إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ

'হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে এমন রাজত্ব দান করুন-যা আমার পরে আর কারও জন্য প্রযোজ্য হবে না। নিশ্চয়ই আপনি পরম দানশীল।' সূরা সোয়াদ : ৩৫

ইউসুফ (আ.) সম্পর্কে বলেছেন-
رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ -
'হে রব! আপনি আমাকে রাজত্ব দিয়েছেন এবং আমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিখিয়েছেন।' সূরা ইউসুফ : ১০১

এই তিনজন নবিকে আল্লাহ নিজেই রাজত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।
তিনি আরও বলেছেন-
أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ فَقَدْ آتَيْنَا آلَ إِبْرَاهِيمَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَآتَيْنَاهُمْ مُلْكًا عَظِيمًا - فَمِنْهُمْ مَنْ امَنَ بِهِ وَمِنْهُمْ مَنْ صَدَّ عَنْهُ وَكَفَى بِجَهَنَّمَ سَعِيرًا -

'নাকি আল্লাহ তাঁদের ওপর যে অনুগ্রহ করেছেন, সেজন্য লোকেরা হিংসা করে? অতএব, আমি ইবরাহিমের বংশধরদের কিতাব ও প্রজ্ঞা দিয়েছি এবং দিয়েছি মহান রাজত্ব। তাই তাদের কেউ ঈমান এনেছে এবং কেউ বিরত থেকেছে। আর দগ্ধকারী হিসেবে জাহান্নামই যথেষ্ট।' সূরা নিসা : ৫৪-৫৫

এখানে ইবরাহিম ও দাউদ (আ.)-এর বংশধরদের রাজত্ব দেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-

تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ -

'যাকে খুশি তুমি রাজত্ব দাও।' সূরা আলে ইমরান : ২৬

এই আয়াতের তাফসিরে ইমাম মুজাহিদ (রহ.) খোদ নবুয়তকেই 'রাজত্ব' বলে আখ্যা দিয়েছেন।

নবুয়ত, রাজত্ব এবং নবিদের তিনটি অবস্থান
নবুয়তের কিছু অংশ অনেকটা রাজক্ষমতার মতো। নবিদের কাউকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে এবং তাঁদের অনুসরণ ও আনুগত্য করা হয়নি। তাঁরা হলেন রাজত্বহীন নবি। আবার নবিদের কাউকে অনুসরণ ও আনুগত্য করা হয়েছে। এই মান্য হওয়ার মাধ্যমেই তিনি রাজ্যাধিকারী হয়ে ওঠেন। তবে নবি যা করতে আদিষ্ট হয়েছেন, শুধু যদি তা-ই করতে অনুসারীদের আদেশ দেন, তাহলে তাঁকে বলা হবে 'বান্দা রাসূল'। তাঁর কোনো রাজত্ব নেই। আর নবি নিজে যা মুবাহ বা জায়েজ মনে করেন, তাও যদি অনুসারীদের আদেশ দেন, তাহলে তিনি রাজা বলে বিবেচিত হবেন। যেমন: সোলায়মান (আ.)-কে বলা হয়েছে-

هُذَا عَطَاؤُنَا فَامْنُنْ أَوْ أَمْسِكْ بِغَيْرِ حِسَابٍ

'এটা আমার অনুগ্রহ-তুমি এটা অন্যকে দান করো অথবা নিজের জন্য রেখে দাও, এর কোনো হিসাব নেওয়া হবে না।' সূরা সোয়াদ: ৩৯

অতএব, তিনি হলেন রাজা বা 'বাদশাহ নবি', যা 'বান্দা নবি'র বিপরীত। যেমনটা রাসূলকে বলা হয়েছে-'আপনি চাইলে "রাজা নবি” হতে পারেন কিংবা 'বান্দা নবি" হতে পারেন।'

'বান্দা নবি'-এর ব্যাখ্যা হলো-আনুগত্য ও অনুসরণ করা, যা নবুয়ত ও রিসালাতের একটি প্রকার এবং এই বিষয়গুলো নবুয়তকে পূর্ণতা দান করে। এটা আমাদের নবির মধ্যে ছিল। কেননা, তিনি ছিলেন বান্দা নবি। অনুসৃত ও মান্য। তাই তিনি অনুসৃত হওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছেন, যেন তিনি অনুসারীদের আদর্শ হয়ে মানবসমাজকে উপকৃত করতে পারেন। তারা তাঁর ওপর রহম করতে পারে এবং তিনিও যেন তাদের অনুগ্রহ করতে পারেন। তিনি রাজা হননি, যাতে করে রাজতন্ত্রে থাকা ক্ষমতা ও সম্পদের সম্ভোগ আখিরাতে তাঁর প্রতিদানে ঘাটতি বয়ে না আনে। তাই আল্লাহর কাছে রাজা রাসূলের চেয়ে বান্দা রাসূলই প্রিয়। তাই ইবরাহিম, নুহ ও মুসা (আ.)-এর অবস্থান সোলায়মান, দাউদ ও ইউসুফ (আ.)-এর চেয়ে মহত্তম। তাই সত্য যা-ই হোক, আহলে কিতাবের অনেকেই দাউদ ও সোলায়মান (আ.)-এর নবুয়তের ওপর আপত্তি করেছে, যেমনটা সাধারণ মানুষ অনেক সময় বিত্তবান ও ক্ষমতাশালী লোকদের শাসন সম্পর্কে করে থাকে।

সৎ রাজা-বাদশাহ এবং সাধারণ রাজা-বাদশাহদের ঐতিহ্য
আল্লাহ বলেন-
إِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ لَكُمْ طَالُوْتَ مَلِكًا قَالُوا أَي يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةً مِنَ الْمَالِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَه بَسْطَةً فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَه مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ - وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ آيَةَ مُلْكِهِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ التَّابُوْتُ

'আল্লাহ অবশ্যই তালুতকে তোমাদের রাজা করে পাঠিয়েছেন।' তারা বলল-'আমাদের ওপর তাঁর রাজত্ব কীভাবে হবে অথচ আমরা তাঁর চেয়ে রাজত্বের বেশি হকদার এবং তাঁকে প্রচুর ঐশ্বর্যও দেওয়া হয়নি!' তিনি বললেন- 'আল্লাহ অবশ্যই তাঁকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি তাঁকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন। বস্তুত আল্লাহ যাকে ইচ্ছে স্বীয় রাজত্ব দান করেন। আর আল্লাহ সর্বব্যাপী প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।' তাদের নবি তাদের বললেন-'তাঁর রাজত্বের নিদর্শন হলো "তাবুত” আসবে।' সূরা বাকারা: ২৪৭-২৪৮

আল্লাহ আরও বলেন-
وَيَسْأَلُونَكَ عَنْ ذِي الْقَرْنَيْنِ قُلْ سَأَتْلُو عَلَيْكُمْ مِنْهُ ذِكْرًا - إِنَّا مَكَّنَا لَهُ فِي الْأَرْضِ وَأَتَيْنَاهُ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ سَبَبًا -

'তারা তোমাকে জুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তুমি বলো, আমি তোমাদের তাঁর বর্ণনা শোনাব। আমি তাঁকে জমিনে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং প্রতিটি বিষয়ের উপায় ও পন্থা বাতলে দিয়েছি।' সূরা কাহাফ: ৮৩-৮৪

মুজাহিদ (রহ.) বলেন- 'দুজন কাফির ও দুজন মুমিন পৃথিবীকে শাসন করেছে। মুমিন দুজন হলেন সোলায়মান (আ.) ও জুলকারনাইন। আর কাফির দুজন হলেন বুখতে নাসর ও নমরুদ। এই উম্মতের পঞ্চম আরেকজন ব্যক্তি পৃথিবীকে শাসন করবেন।'

আল্লাহ আরও বলেছেন-
يَا قَوْمِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَعَلَ فِيكُمْ أَنْبِيَاءَ وَجَعَلَكُمْ مُلُوكًا -

'হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের যে নিয়ামত দেওয়া হয়েছে, তা স্মরণ করো। তিনি তোমাদের মধ্যে নবিদের পাঠিয়েছেন এবং তোমাদের রাজা বানিয়েছেন।' সূরা মায়েদা : ২০

কুরআনে রাজা (مَلِكٌ) শব্দটি অনেকবার এসেছে। যেমন-
وَكَانَ وَرَاءَهُم مَّلِكُ يَأْخُذُ كُلَّ سَفِينَةٍ غَصْبًا -
'তাঁদের পেছনে এমন এক রাজা রয়েছে, যে প্রতিটি নৌকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।' সূরা কাহফ : ৭৯

এ ছাড়াও যেমন-
وَقَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَى سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعَ سُنْبُلَاتٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَا بِسَاتٍ
'রাজা বলেন-নিশ্চয়ই আমি সাতটি দুর্বল গাভি সাতটি মোটাতাজা গাভিকে খেতে দেখেছি।' সূরা ইউসুফ : ৪৩

📘 খিলাফত ও রাজতন্ত্র ইতিহাস ও পর্যালোচনা > 📄 সমাজে ইমাম বা শাসকদের অবস্থান

📄 সমাজে ইমাম বা শাসকদের অবস্থান


কুরআন, ইনসাফ ও তরবারি দিয়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠা
আল্লাহ রাসূল -কে পাঠিয়েছেন হিদায়াত ও সত্য ধর্ম দিয়ে, যাতে তিনি এই ধর্মকে সমস্ত ধর্মের ওপর বিজয় লাভ করাতে পারেন। তাই আল্লাহ এই উম্মতের জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন এবং নিয়ামতে পূর্ণ করেছেন। তিনি শাসনের জন্য একটি বিধান দিয়ে তা অনুসরণের আদেশ দিয়েছেন। আর জ্ঞানহীনদের অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। মুহাম্মাদ -এর ওপর অবতীর্ণ কিতাবকে অপরাপর কিতাবের ওপর প্রভুত্বকারী ও সত্যায়ক বানিয়েছেন। তাঁর জন্য আরও দিয়েছেন শরিয়ত ও জীবনবিধান। তাঁর উম্মতের জন্য দিয়েছেন হিদায়াতের বহুবিধ পন্থা।

দ্বীন কায়েম হবে কেবল কিতাব, ইনসাফ ও তরবারির মাধ্যমে। কিতাব পথপ্রদর্শন করবে। তরবারি তাকে সহযোগিতা করবে। আল্লাহ বলেন-

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَاَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيْهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ

'নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদের প্রেরণ করেছি প্রমাণাদি দিয়ে এবং তাঁদের সাথে দিয়েছি কিতাব ও ইনসাফ-যাতে মানুষ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আর দিয়েছি তরবারি, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য প্রচুর ক্ষমতা ও উপকার।' সূরা হাদিদ : ২৫
সুতরাং কিতাব দিয়ে জ্ঞান ও দ্বীন প্রতিষ্ঠা পায়। মিজান বা ইনসাফ দিয়ে অর্থনৈতিক চুক্তি ও অধিগ্রহণের অধিকার সাব্যস্ত হয়। আর তরবারি দিয়ে হুদুদ কায়েম হয় কাফির ও মুনাফিকদের ওপর।

তাই পরবর্তী যুগে কিতাব ছিল আলিম ও আবেদগণের চর্চায়। মিজান ছিল মন্ত্রী, আমলা, দাপ্তরিকদের চর্চায়। আর তরবারি ছিল শাসক ও সৈন্যদের চর্চায়। ভিন্ন ভাষায়-নামাজে কিতাব আর জিহাদে তরবারি।

সবচেয়ে বেশি আয়াত ও হাদিস নামাজ ও জিহাদ সম্পর্কে
তাই রাসূল যখনই কোনো রোগীকে দেখতে যেতেন, বলতেন- 'হে আল্লাহ! তোমার বান্দাকে তুমি সুস্থ করে দাও। (সুস্থ হয়ে) তোমার জন্য নামাজে সে হাজির হবে এবং তোমার শত্রুকে আঘাত করবে। '৫৪

রাসূল আরও বলেন- 'সবকিছুর মূল ইসলাম। ইসলামের মূল নামাজ। আর এর সর্বোচ্চ শিখর হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। '৫৫

তাই কুরআনে এই দুটোকে (নামাজ ও জিহাদ) অনেক জায়গায় একসঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে-

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ -

'তাঁরাই হলো মুমিন, যারা আল্লাহ ও রাসূলের ওপর ঈমান আনার পর সন্দেহ করেনি এবং তাঁদের জান-মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে।' সূরা হুজুরাত: ১৫

নামাজ হলো ইসলামের অগ্রগণ্য আমল এবং ঈমানি আমলের মূল। তাই কুরআনে একে ঈমান শব্দ দিয়ে ব্যক্ত করা হয়েছে-৫৬

وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ إِيْمَانَكُمْ -

'আর আল্লাহ এরূপ নন যে তোমাদের ঈমান বিনষ্ট করবেন।' সূরা বাকারা: ১৪৩

সালাফদের মতে, এখানে ঈমান অর্থ নামাজ। অর্থাৎ বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখী তোমাদের নামাজ। আল্লাহ বলেন-

اجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللهِ لَا يَسْتَوُونَ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ

'হাজিদের পানি পান করানো আর মসজিদে হারামের আবাদ করাকে তোমরা কি তাঁদের কাজের সমান মনে করো, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করে? আল্লাহর দৃষ্টিতে এরা সমান নয়। (যারা ভ্রান্ত পথে আল্লাহর সন্তুষ্টি) খোঁজে এমন জালিম সম্প্রদায়কে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন না।' সূরা তাওবা: ১৯

তিনি আরও বলেন-
فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ اعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائم -
'অচিরেই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় প্রেরণ করবেন, যাদের তিনি ভালোবাসবেন। তাঁকেও তাঁরা ভালোবাসবে। তাঁরা মুমিনদের ওপর নমনীয়, কাফিরদের বেলায় কঠোর হবে। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ক্ষেত্রে তাঁরা কোনো নিন্দুকের নিন্দার তোয়াক্কা করবে না।' সূরা মায়েদা : ৫৪

তাঁদের গুণ বর্ণনায় 'ভালোবাসা' শব্দটিকে ব্যবহার করেছেন, যেটা নামাজের প্রকৃত গূঢ়ার্থ। যেমনটা তিনি বলেছেন-
مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللَّهِ وَ الَّذِيْنَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَعًا سُجَّدًا يَبْتَغُوْنَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا-

'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর যারা তাঁর সাথে ঈমান এনেছে, তাঁরা পরস্পরে নম্র এবং কাফিরদের বেলায় কঠোর। তাঁদের তুমি দেখবে রুকুকারীরূপে, সিজদারত হয়ে আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করছে।' সূরা ফাতহ : ২৯

এখানে তাঁদের গুণ বলতে গিয়ে কুফর ও গোমরাহির ক্ষেত্রে কঠোরতার কথা বলেছেন। সহিহ হাদিসে এসেছে-

'নবি -কে জিজ্ঞেস করা হলো-“কোন আমলটি উত্তম?” তিনি বললেন-"আল্লাহর ওপর ঈমান আনা এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।" তারপর জিজ্ঞেস করা হলো, "এরপর কোন কাজ উত্তম?” "মকবুল হজ।””৫৭

অথচ অন্য একটি সহিহ হাদিসে এসেছে, ইবনে মাসউদ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন-

'কোন আমল উত্তম?' নবিজি বললেন, 'ওয়াক্তমতো নামাজ।' ইবনে মাসউদ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন-'তারপর কোনটা?' তিনি বললেন, 'পিতা-মাতার সাথে সদ্‌ব্যবহার।' আবার জিজ্ঞেস করলেন-'তারপর কোনটা?' নবিজি বললেন- 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। '৫৮

প্রথম হাদিসে 'আল্লাহর ওপর ঈমান' কথাটিতে নামাজও অন্তর্গত। তবে প্রথম হাদিসটিতে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার কথাটি নেই। কারণ, পিতা-মাতা তো সবার থাকে না। তাই প্রথমটি ব্যাপক এবং দ্বিতীয়টি যার পিতা-মাতা আছে তার জন্য নির্দিষ্ট।

জিহাদ ও নামাজে নেতৃত্ব দেবেন শাসক
রাসূলের যুগে, চার খলিফার আমলে এবং তাঁদের পথানুসারী আব্বাসি ও উমাইয়া শাসকদের যুগে নামাজ ও জিহাদ-এই মৌলিক দুই বিষয়ে নেতৃত্বে থাকতেন শাসকরাই। তাই যিনি নামাজের ইমাম, তিনিই জিহাদের ইমাম। রাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে জিহাদ ও নামাজের আদেশ অভিন্ন। তাই রাসূল যখন আত্তাব ইবনে উসাইদ (রা.)-কে মক্কায় এবং তায়েফে উসমান ইবনে আবুল আস (রা.)-কে গভর্নর নিযুক্ত করেন, তখন তাঁরাই নামাজে ইমামতি করতেন এবং হুদুদ কায়েম করতেন। একইভাবে রাসূল যখন কাউকে কোনো গাজওয়ার আমির নিযুক্ত করতেন-যেমন: জায়েদ ইবনে হারিসা, উসামা ইবনে জায়েদ ও আমর ইবনুল আস (রা.) প্রমুখ সাহাবিকে করেছিলেন-তখন যুদ্ধের আমিরই নামাজ পড়াতেন। এজন্যই আবু বকর (রা.)-কে যেহেতু রাসূল নামাজে ইমামতির ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য করেছেন, তাই অপরাপর সকল বিষয়েও তাঁর অগ্রগণ্যতা বা ইমামতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

অনুরূপভাবে আবু বকর (রা.)-এর যুগে যারা যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন, তাঁরাই নামাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যেমন: ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ, আমর ইবনুল আস (রা.) প্রমুখ সাহাবিগণ।

উমর (রা.)-এর সময়েও কুফার প্রতিনিধিরা নিয়োগ অনুযায়ী কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) যুদ্ধ ও নামাজের দায়িত্বে ছিলেন। ইবনে মাসউদ (রা.) কাজি ও বাইতুলমালের দায়িত্বে ছিলেন। উসমান ইবনে হুনাইফ (রা.) ছিলেন খারাজের পদে।

সেনাপতি, কালেক্টর ও বিচারকের পদের সূচনা
এরপর থেকেই সেনাপতি, কালেক্টর ও বিচারকের পদের সূচনা হয়। কারণ, উমর (রা.)-এর যুগে যখন ইসলামের ভূখণ্ড বিস্তার লাভ করে, তখন বিভিন্ন নতুন নতুন প্রশাসনিক বিভাগ বা দপ্তর খোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যেমন: ভূমিকর অধিদপ্তর, সহায়তা অধিদপ্তর বা দিওয়ানুল আতা। অনেক শহর গড়ে তোলেন। মিশর, বসরা, ফুসতাতের মতো শহর আবাদ হয়।

এমনভাবে শহরগুলো গড়ে তোলা হয়-দজলা, ফোরাত, নীল-এর মতো বিশাল বিশাল নদীও শহর ও সেনাবাহিনীর মাঝে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারেনি।

মসজিদ ছিল শাসকদের কার্যালয়
মসজিদ ছিল শাসক ও জনগণের সমবেত হওয়ার জায়গা। কেননা, নবিজি মসজিদকে তাকওয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাই তাতে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, শিক্ষা কার্যক্রম ও ওয়াজ-নসিহতের মতো ব্যক্তিগত বিষয় যেমন ছিল, তেমনি সেনাপতি, আমির ও গুপ্তচর নির্ধারণের মতো রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ও সমাধা করা হতো। এছাড়াও মুসলিমদের আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ মসজিদে সম্পন্ন হতো। একইভাবে মক্কা, তায়েফ, ইয়ামান ইত্যাদি শহর, সাধারণ জনপদ ও প্রত্যন্ত গ্রামে উমর (রা.)-এর কর্মকর্তাগণ মসজিদে জমায়েত হয়েই রাজনৈতিক কার্যাদি সম্পাদন করতেন। কেননা, রাসূল বলেছেন-
'বনি ইসরাইলদের শাসন করতেন নবিরা। যখনই কোনো নবি ইন্তেকাল করতেন, তাঁর স্থানে অপর একজন নবি আসতেন। আর আমার পরে যেহেতু আর কোনো নবি নেই, তাই আমার পরে খলিফাগণ শাসক হবেন। যাদের কাউকে তোমরা গ্রহণ করবে এবং বর্জন করবে।' সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, 'সে অবস্থায় আপনি আমাদের কী আদেশ করবেন?' রাসূল বললেন- 'তোমরা যে আগে বাইয়াত নেবে, তাঁর হাতেই বাইয়াত গ্রহণ করবে। আর আল্লাহর কাছে তোমাদের হিতকামী শাসকের জন্য দুআ করবে। কারণ, নিশ্চয়ই শাসকগণ অর্পিত দায়িত্ব বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবেন। '৫৯

খলিফা ও আমিরগণ তাঁদের বাসস্থানেই বসবাস করতেন
অপরাপর মুসলিমদের মতো খলিফা ও আমিরগণও নিজ বাসস্থানেই বসবাস করতেন। তবে তাঁদের মজলিশ বসত জামে মসজিদে।

সাদ (রা.)-এর রাজমহল জ্বালানোর হুকুম দিয়েছিলেন উমর (রা.)
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) কুফাতে একটি রাজমহল নির্মাণ করেন এবং বলেন-'আমি সাধারণ মানুষ থেকে দূরে থাকতে চাই।' উমর (রা.) মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাকে তাঁর রাজমহল জ্বালানোর ফরমান দিয়ে পাঠালেন। বলে দিলেন, 'সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) যেন নাবতি কাঠের আঁটি কিনে তাঁর মহল পর্যন্ত নিয়ে যায় এবং মহল জ্বালিয়ে দেন। উমর (রা.) তাঁর শাসক ও জনগণের মাঝে কোনোরূপ অন্তরায় বরদাশত করতেন না। তবুও কয়েকজন আমিরের ব্যক্তিগত প্রাসাদ নির্মিত হয়েছিল!

মুয়াবিয়া (রা.) জনগণ থেকে দূরে থাকতেন
আলি (রা.)-এর ওপর অতর্কিত হামলা হওয়ার পর মুয়াবিয়া (রা.) নিজের ওপর হামলার আশঙ্কা করতেন। তাই মসজিদের এক নিরাপদ প্রকোষ্ঠে তিনি ও তাঁর অমাত্যবর্গ নামাজ আদায় করতেন। বাইরে বের হলে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে বের হতেন। তাঁকে দেখে পরবর্তী রাজতান্ত্রিক খলিফাগণও এই প্রটোকলে উদ্বুদ্ধ হন এবং তাঁকে অনুসরণ করেন। তাঁরা জুমা ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মানুষের সম্মুখে আসতেন এবং নামাজ পড়াতেন। এর বাইরে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া ও হুদুদ কায়েমের সময় তাঁরা জনসম্মুখে আসতেন। এ ছাড়া বাকি সময় তাঁরা মহলে বাস করতেন এবং জনসাধারণ থেকে দূরে থাকতেন। এমনই একটি মহল হলো বনু উমাইয়ার 'আল খাদ্রা' প্রাসাদ-যা জামে মসজিদের সামনে অবস্থিত ছিল।

রাজা ও আমিরদের কেল্লা ও দুর্গ নির্মাণ
সময় যতই অতিবাহিত হতে লাগল, মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি ততই বাড়তে থাকল। প্রতিটি সম্প্রদায় ইসলামের সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরল এবং তাতে নিজেদের মনমতো বাড়াবাড়ি করে অপর সম্প্রদায় থেকে বিমুখ হয়ে গেল। ভুলে গেল ইসলামের ব্যাপকতা ও উদারতার কথা। আমির ও শাসকগণ কেল্লা ও দুর্গ নির্মাণ করতে শুরু করলেন। ইতঃপূর্বেও কেল্লা ও দুর্গ নির্মিত হয়েছে, তবে দেশের সীমানাগুলোতে; যেন শত্রুর হামলা থেকে দেশকে রক্ষা করা যায়।

কেননা, সে যুগে সীমান্তরক্ষী বাহিনী তখনও তৈরি হয়নি। তখন শাম অঞ্চলের সীমান্তকে বলা হতো 'আল আওয়াসিম' অর্থাৎ কিন্নাসরিন ও হালাব (আলেপ্পো)।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খানকাহ ও আস্তাবল নির্মাণ
বিদ্যোৎসাহীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইবাদতকারীদের জন্য খানকাহ এবং তাদের বাহনের জন্য ঘোড়াশাল তৈরি করা হয়। সম্ভবত এর ব্যাপক প্রসার শুরু হয় সেলজুক আমলে। প্রথম দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরাইখানা নির্মাণ করা হয় গরিবদের জন্য। নিজামুল মুলকের সময়ে এসব সরাইখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উপযুক্ত গরিবদের জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং ওয়াকফকৃত সম্পদ থেকে এর ব্যয় নির্বাহ করা হতো। এর আগে সরাইখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেলেও আমার মনে হয় না তা ওয়াকফ ছিল। তবে বিশেষ কিছু স্থাপনা ছিল।

ইমাম ওয়াহিদি (রহ.)-এর ছাত্র ইমাম মামার ইবনে জিয়াদ আখবারুস সুফিয়াহ গ্রন্থে বলেন-'সুফিদের জন্য প্রথম ঘর নির্মাণ করা হয় বসরায়।' তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উল্লেখ সেলজুক আমলের পূর্বেও পাওয়া যায়; হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। আর সেলজুক আমলের সময়কাল হচ্ছে হিজরি পঞ্চম শতাব্দী। অনুরূপভাবে শামের বেশিরভাগ কেল্লা ও দুর্গই নবনির্মিত। যেমনিভাবে আল আদিল দামেশক, বসরা ও হারানে কেল্লা নির্মাণ করেছিলেন। কারণ, খ্রিষ্টানরা তাদের ওপর ক্রমাগতভাবে আক্রমণ করত। তৃতীয় শতকের পর মুসলিমরা সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে খ্রিষ্টানদের প্রতিহত করতে অক্ষম হতে শুরু করে। একপর্যায়ে তারা শামের তীরবর্তী সীমান্তগুলো দখল করে নেয়।

টিকাঃ
৫৩. কুরআনে মূল শব্দ الْحَدِيدَ লোহা রয়েছে, যা দ্বারা রূপক অর্থে তরবারিকে নির্দেশ করে।
৫৪. আবু দাউদ: ৩১০৭, আহমাদ: ৬৬০০
৫৫. তিরমিজি: ২৬১৬, আহমাদ: ২২০১৬, ইবনে মাজাহ : ৩৯৭৩
৫৬. ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মতে-ওপরের আয়াতটিতেও (হুজুরাত: ১৫) ঈমান শব্দ দিয়ে অপরাপর ঈমানি আমলের সাথে সাথে নামাজকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
৫৭. বুখারি: ১৫১৯, মুসলিম: ৮৩
৫৮. বুখারি: ৫২৭
৫৯. প্রাগুক্ত

📘 খিলাফত ও রাজতন্ত্র ইতিহাস ও পর্যালোচনা > 📄 খিলাফতসংক্রান্ত কিছু ভ্রান্ত আকিদা

📄 খিলাফতসংক্রান্ত কিছু ভ্রান্ত আকিদা


কুরআনে খলিফা শব্দের প্রয়োগ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً

'স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন- নিশ্চয়ই আমি জমিনে আমার প্রতিনিধি প্রেরণ করব।' সূরা বাকারা : ৩০

আল্লাহ আরও বলেন-

يَا دَاوُوُدُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ

'হে দাউদ! আমি তোমাকে জমিনে আমার প্রতিনিধি বানাব। অতএব, মানুষের মাঝে হকভাবে বিচার করো আর প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। তা না হলে সে (প্রবৃত্তি) তোমাকে পথভ্রষ্ট করে ছাড়বে।' সূরা সোয়াদ: ২৬

'আমি জমিনে প্রতিনিধি প্রেরণ করব' কথাটি দ্বারা আদম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের বোঝানো হয়েছে। তবে নাম নিয়েছেন শুধু আদম (আ.)- এর। (আবার কখনো কখনো তাঁর বংশধর বোঝাতে 'মানুষ' শব্দ ব্যবহার করে আদম (আ.)-কেও বক্তব্যের মধ্যে শামিল করা হয়েছে।) যেমন: আল্লাহ বলেন-

لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ -

'নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছি।' সূরা তিন: ৪

خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ صَلْصَالٍ كَالْفَخَارِ وَخَلَقَ الْجَانَّ مِنْ مَّارِجٍ مِنْ نَارٍ -

'মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন শুষ্ক ঠনঠনে মাটি থেকে, যা পোড়ামাটির মতো। আর জিনকে সৃষ্টি করেছেন ধোঁয়াহীন অগ্নি থেকে।' সূরা আর-রাহমান: ১৪, ১৫

الَّذِي أَحْسَنَ كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ وَبَدَا خَلْقَ الْإِنْسَانِ مِنْ طِينٍ ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهُ مِنْ سُلَالَةٍ مِّنْ مَّاءٍ مَّهِينٍ

'কাদা হতে তিনি মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। তারপর তিনি তাঁর বংশ উৎপন্ন করেন তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস থেকে।' সূরা আস-সাজদা: ৭-৮

ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ

'তারপর তাকে নুতফারূপে স্থাপন করেছি নিরাপদ স্থানে।' সূরা মুমিনুন: ১৩

হাদিসে খলিফা শব্দের প্রয়োগ
খলিফা অর্থ হলো-যে অপরের স্থলাভিষিক্ত হয় বা যে পেছনে রয়ে যায়। যেমন: রাসূল বলতেন-

اللَّهُمَّ انْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي أَهْلِي

'হে আল্লাহ! আপনি আমার সফরের সঙ্গী। আমি চলে যাওয়ার পর আপনিই আমার পরিবারের নিরাপত্তার "খলিফা”। ৬০

জায়েদ ইবনে খালিদ জুহানি (রহ.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন-

مَنْ جَهَزَ غَازِيًا فَقَدْ غَزَا وَمَنْ خَلَفَهُ فِي أَهْلِهِ فَقَدْ غَزَا -
'যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে কোনো মুজাহিদকে যুদ্ধসাজে সজ্জিত করে দিলো, সেও জিহাদ করল। যে ব্যক্তি কোনো মুজাহিদের অনুপস্থিতিতে তাঁর পরিবারবর্গের দেখাশোনার জন্য তার স্থলাভিষিক্ত হলো, সেও জিহাদ করল। (অর্থাৎ সেও জিহাদকারীর সমান সওয়াব লাভ করবে)। '৬১

أَوْ كُلَّمَا خَرَجْنَا فِي الْغَزْوِ خَلْفَ أَحَدُهُمْ وَلَهُ نَبِيْبٌ كَنَبِيْبِ التَّيْسِ يَمْنَحُ إِحْدَاهُنَ اللَّبَنَةِ مِنَ اللَّبَنِ لَئِنْ أَظْفَرَنِي اللَّهُ بِأَحَدٍ مِنْهُمْ لَاجْعَلْتُهُ نَكَالًا -
'আমরা যখন জিহাদে বের হই, তাদের কেউ পেছনে রয়ে যায় এবং ছাগলের মতো আওয়াজ করে (অর্থাৎ প্রচণ্ড যৌনাকাঙ্ক্ষা দেখা দেয়) এবং মুমিনপত্নীদের অল্প দুধ প্রদান করে (অর্থাৎ ব্যভিচার করে)। আল্লাহ যদি তাদের কাউকে পাকড়াও করার ক্ষমতা আমাকে দান করে, তাহলে তাদের এমন শাস্তি দেবো-যা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।'

একইভাবে কুরআনেও এই শব্দমূল দ্বারা 'পেছনে রয়ে যাওয়া' বোঝানো হয়েছে। যেমন-

سَيَقُولُ لَكَ الْمُخَلَّفُونَ مِنَ الْأَعْرَابِ
'অচিরেই বেদুইনদের যারা পেছনে রয়ে যাবে তারা বলবে...' সূরা ফাতহ: ১১

فَرِحَ الْمُخَلَّفُوْنَ بِمَقْعَدِهِمْ خِلَافَ رَسُولِ اللَّهِ وَكَرِهُوا أَنْ يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ

'যাদের পেছনে থেকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তারা আল্লাহর রাসূলের সাথে সহযোগিতা না করার ও ঘরে বসে থাকার জন্য আনন্দিত হলো এবং তারা নিজেদের ধন-প্রাণ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করতে অপছন্দ করল।' সূরা আত-তাওবা: ৮১

খলিফা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে তার পূর্ববর্তীর স্থানে রয়ে গেছে। যেমন: রাসূল -এর ওফাতের পর আবু বকর (রা.) উম্মতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অনুরূপভাবে রাসূল হজ, উমরাহ কিংবা যুদ্ধের জন্য সফরে বের হলে তাঁর স্থানে আরেকজনকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রেখে যেতেন। এভাবে তিনি কখনো ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-কে খলিফা বানিয়েছেন, কখনো-বা অন্য কাউকে। তাবুকের যুদ্ধে খলিফা বানিয়েছিলেন আলি (রা.)-কে।

ইবনে আরাবি (রহ.)-এর একটি ভুল ধারণা
ইবনে আরাবি (রহ.)-এর মতো কতিপয় লোক ধারণা করেছেন, খলিফা আল্লাহর প্রতিনিধি বা আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত। তাঁরা মনে করেন যে, আল্লাহর খলিফা হওয়ার অর্থ হচ্ছে ইনসান আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত। তাঁরা প্রায়শই আদম (আ.)-কে সকল নাম শিক্ষাদানের বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন-'সকল নামের অর্থ মানুষের মধ্যে একত্রিত হয়েছে।' পাশাপাশি তাঁরা 'আদম (আ.)-কে আল্লাহর অবয়বে সৃষ্টি করা হয়েছে'- হাদিসটিকেও একইভাবে ব্যাখ্যা করে থাকেন। কখনো তাঁরা দার্শনিকদের কথাকে নকল করে বলেন-'মানুষ একটি ছোটো দুনিয়া।' এটা মূলত আগের বক্তব্যটিরই প্রতিফলন। শুধু তা-ই নয়; এর সাথে তাঁরা আরও যোগ করে বলেন-'আল্লাহ হলো একটি বড়ো জগৎ।' মূলত তাঁদের বক্তব্যের মূল ভিত্তি হলো তাঁদের 'ওয়াহদাতুল ওজুদ'-এর কুফরি আকিদা। এই মতবাদ অনুসারে স্রষ্টা হলেন সৃষ্টির অস্তিত্বের সারবস্তু বা মূল। তাই ইনসান হলো আল্লাহর প্রকাশ্য খলিফা বা স্থলাভিষিক্ত-যাতে সকল নাম ও গুণের সমাবেশ ঘটেছে। আর এর থেকে তৈরি হয় এমন একটি আকিদা, যা তাঁদের রুবুবিয়্যাত ও ইলাহিয়াতের দাবির প্রতি উদ্‌বুদ্ধ করে। পরিশেষে তাঁরা ফেরাউনি কারামেতা ফিরকা ও বাতেনি ফিরকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

কখনো কখনো তাঁরা নবুয়তকে অপরাপর স্তরের মতো সাধারণ একটি স্তর সাব্যস্ত করেন এবং নিজেদের এর চেয়ে মহৎ মনে করেন। আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, ইলাহিয়্যাত ও একত্ববাদকে স্বীকার এবং নবিদের নবুয়তকে মানা সত্ত্বেও তাঁরা ফেরাউনিয়্যাতের অনুসারী। কিংবা তাঁরা মনে করেন, শরিয়তের আদেশ-নিষেধ ও হালাল-হারামের বিধান তাঁদের জন্য প্রযোজ্য নয়। ৬২

আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হওয়াটা সম্ভব নয়
আল্লাহর খলিফা (স্থলাভিষিক্ত) হওয়া জায়েজ নেই। তাই লোকেরা যখন আবু বকর (রা.)-কে বলল-'হে আল্লাহর খলিফা!' তখন তিনি বলেছিলেন-'আমি আল্লাহর খলিফা নই; আমি রাসূল্লালাহ-এর খলিফা। আমার জন্য এটাই অনেক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এর থেকে পবিত্র।'

খলিফা হলেন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও প্রতিনিধি। নবিজি বলেন- 'হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সফরসঙ্গী এবং পরিবারের দেখভালের ক্ষেত্রে আপনি আমাদের প্রতিনিধি। '৬৩

আরেকটি হাদিসেও অনুরূপ এসেছে- 'হে আল্লাহ! সফরে আমাদের সাথে থাকুন আর পরিবারে আমাদের প্রতিনিধি হোন। '৬৪

আল্লাহ হলেন চিরঞ্জীব, সর্বদর্শী, ক্ষমতাবান, রক্ষাকর্তা, তত্ত্বাবধানকারী, শাশ্বত, সমগ্র জগৎ থেকে অমুখাপেক্ষী; তাঁর কোনো শরিক নেই, সহযোগী নেই। তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ কিয়ামতের দিন সুপারিশ করতে পারবে না। আর খলিফা তো তখনই হয়, যখন খলিফা নিয়োগকারীর মৃত্যু বা অনুপস্থিতির কারণ দেখা দেয় অথবা খলিফার প্রয়োজন তখনই দেখা দেয়, যখন খলিফা নিয়োগকারীর খলিফা বানানোর প্রয়োজন পড়ে। এমনকী তাকে 'খলিফা' বলাও হয় এই কারণে যে, সে যুদ্ধে না গিয়ে বাসস্থানে রয়ে গেছে।

খলিফার এই প্রতিটি গুণই আল্লাহর শানে অনুপস্থিত। তিনি এসব থেকে পবিত্র। কারণ, তিনি চিরঞ্জীব, শাশ্বত ও সর্বদর্শী। তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অনুপস্থিতও হন না। তিনি অমুখাপেক্ষী। তিনি রিজিক দেন, রিজিক গ্রহণ করেন না। তিনি তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেন। পথ দেখান। সুস্থতা দান করেন তাঁর সৃষ্ট উপকরণের মাধ্যমে। তিনিই হলেন প্রশংসিত, অমুখাপেক্ষী। আসমান ও জমিন এবং এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে, সবকিছুর মালিক তিনি।

وَهُوَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ إِلهُ وَفِي الْأَرْضِ الهُ

'তিনি আসমানেও ইলাহ, জমিনেও ইলাহ।' সূরা জুখরুফ: ৮৪

আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর সমকক্ষ ও প্রতিপক্ষ কেউ নেই। তাই যে লোক তাঁর স্থলাভিষিক্ত কাউকে বানাবে, সে মুশরিক। ৬৫

ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর ছায়া শাসক
এখানে একটি প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে। হাদিসে এসেছে-
'সুলতান হলেন জমিনে আল্লাহর ছায়া; যেখানে আশ্রয় নেয় দুর্বল ও দুস্থ লোকেরা। '৬৬

ছায়া তো আশ্রয়প্রার্থীর মুখাপেক্ষী, সঙ্গী ও একপ্রকার অনুগামীও বটে। আর আশ্রয়প্রার্থীও ছায়ার মুখাপেক্ষী। ছায়া তাকে ঘিরে থাকায় সেও ছায়ার সঙ্গী। ৬৭ সুলতান আল্লাহর বান্দা। আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী। এক মুহূর্তের জন্যও সে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা ত্যাগ করতে পারবে না। আল্লাহর কাছেই যাবতীয় ক্ষমতা, শক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ, সাহায্য ইত্যাদি বিষয়ের মর্যাদা ও নিরপেক্ষ গুণ রয়েছে-যার ওপর ভিত্তি করে সমগ্র সৃষ্টি দণ্ডায়মান এবং আল্লাহর ছায়ার সাদৃশ্য লাভ করেছে। আল্লাহর সৃষ্টি ও বান্দাদের জীবনকে সংশোধিত করার সবচেয়ে মজবুত মাধ্যম হচ্ছে শাসক। ক্ষমতাসীন শাসক যদি দুরস্ত হয়ে যায়, তাহলে জনগণের অবস্থাও দুরস্ত হয়ে যাবে। আর সে নষ্ট হলে তার কারণে এবং তার বিপথগামিতা অনুসরণ করে জনগণও নষ্ট ও বিপথগামী হবে।

তবে সে পুরোপুরি নষ্ট হতে পারবে না। তার মধ্যে কিছুটা কল্যাণের নিদর্শন অবশিষ্ট থাকা আবশ্যক। কারণ, সে আল্লাহর ছায়া। ছায়া কখনো সম্পূর্ণ রোদমুক্ত করে (কষ্ট লাঘব করে) আবার কখনো আংশিক কষ্ট লাঘব করে। আর যদি স্বয়ং ছায়াটিই না থাকে, তাহলে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলাই ধসে পড়বে। রাষ্ট্রের কাঠামোই অবশিষ্ট থাকবে না। অনেকটা রুবুবিয়্যাতের গূঢ়তত্ত্ব হারিয়ে যাওয়ার মতো, যার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্ব।

আবু বকর (রা.)-এর খলিফা হওয়ার প্রমাণ
আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত কি মুসলিমদের মনোনয়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, নাকি রাসূল -এর কোনো প্রচ্ছন্ন কিংবা অপ্রচ্ছন্ন হাদিস দ্বারা হয়েছিল? এ বিষয়ে ইমাম কাজি আবু ইয়ালাসহ আমাদের হাম্বলি মাজহাবের অন্যান্য ইমামগণ আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত সম্পর্কে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) থেকে দুটি মত বর্ণনা করেছেন-

১. ‘আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিমদের মনোনয়নের ভিত্তিতে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিম, ফুকাহা ও হাদিস বিশারদগণ এমনটিই মনে করেন; এমনকী মুতাজিলা ও আশআরিদের মতো কিছু মুতাকাল্লিমিনও এই মত পোষণ করেন।

২. আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাসূল -এর ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যের ভিত্তিতে। এ বক্তব্যের পক্ষে মত দিয়েছেন হাদিস বিশারদদের কয়েকটি দল এবং কতিপয় মুতাকাল্লিমিন। হাসান বসরি (রহ.) থেকেও এমন একটি মতামত পাওয়া যায়। রাসূল -এর বক্তব্যের মাধ্যমে তাঁর খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে যারা মনে করেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন-প্রত্যক্ষ বক্তব্য দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ স্পষ্ট বক্তব্যের ভিত্তিতেই আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত প্রমাণিত হয়েছে।’

খিলাফত নিয়ে কতিপয় গোষ্ঠীর ভ্রান্ত আকিদা
ইমমিয়ারা বলে-অপ্রচ্ছন্ন বা স্পষ্ট বক্তব্য দ্বারা আলি (রা.)-এর খিলাফত প্রমাণিত। জাইদিয়্যা, জারুদিয়া ফেরকার লোকেরা মনে করে, এটা আলি (রা.)-এর ব্যাপারে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত। আর রাওয়ান্দিয়ারা মনে করে, আব্বাস (রা.)-এর খিলাফত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

মূলত ইসলামের বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞজনদের কাছে এ জাতীয় বক্তব্যগুলোর অসারতা সুস্পষ্ট। এসব মতকে যারা বিশ্বাস করে-তারা হয়তো মূর্খ, নয়তো জালিম। এসব যারা বিশ্বাস করে, তাদের অধিকাংশই জিন্দিক।

আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক মূল্যায়নটি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর কথাকেই পোক্ত করে। বাস্তব কথা হলো-
'আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত প্রতিষ্ঠা হয়েছে সাহাবিদের মনোনয়ন এবং তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণের মাধ্যমে। রাসূল তাঁর খিলাফত সম্পর্কে প্রশংসা ও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর আনুগত্যের এবং শাসনভার তাঁর ওপর ন্যস্ত করার আদেশ দিয়েছেন। রাসূল উম্মতকে আবু বকর (রা.)-এর হাতে বাইয়াতের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।'

হাদিসে আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের প্রমাণ
মোটকথা রাসূলের বক্তব্যে আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের পক্ষে তিন ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়-
১. সমর্থনমূলক
২. আদেশ বা হুকুমমূলক
৩. দিকনির্দেশনামূলক

সমর্থনমূলক বক্তব্য: যেমন, রাসূল বলেছেন-
'আমি স্বপ্নে দেখেছি, একটি কাঁচা কুয়া থেকে আমি পানি তুলছি। তারপর ইবনে আবি কুহাফা (আবু বকর রা.) এলো এবং এক বালতি অথবা দুই বালতি ভরপুর পানি তুলল। '৬৮

অপর একটি হাদিসে এসেছে, এক সাহাবি বলেন-
'আমি স্বপ্নে একটি দাঁড়িপাল্লা আকাশ থেকে নামতে দেখেছি। তারপর তা দিয়ে আপনাকে (রাসূল -কে) ও আবু বকরকে পরিমাপ করা হলে আপনার পাল্লা ভারী হয়ে যায়। তারপর আবু বকর ও উমর (রা.)-কে পরিমাপ করা হলে আবু বকর (রা.)-এর পাল্লা ভারী হয়। '৬৯

আরেকটি হাদিস আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
'মৃত্যুশয্যায় রাসূল আমাকে বলেন-“তোমার বাবা ও ভাইকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি একটা ফরমান লিখে দিই-যাতে আমার পর আর কোনো বিবাদ না হয়।" তারপর নবিজি বলেন-“আল্লাহ আবু বকরকে ছাড়া আর কাউকে গ্রহণ করবেন না; এমনকী মুমিনরাও আর কাউকে মানবে না।"'৭০

অন্য একটি হাদিসে এসেছে-
'এক সৎ লোক স্বপ্নে দেখেছেন, আবু বকর (রা.) রাসূল- এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। '৭১
'নবুয়তি খিলাফত ৩০ বছর। তারপর রাজতন্ত্র কায়েম হবে।' তো এসব হাদিস দ্বারা বুঝে আসে, আল্লাহ আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতকে গ্রহণ করেছেন, সর্মথন করেছেন এবং মুমিনরাও তাঁর খিলাফতকে মেনে নেবেন।

আদেশমূলক বক্তব্য: যেমন-
'আমার পরবর্তী দুজন তথা আবু বকর ও উমরকে মান্য করো।' 'আমার পর তোমরা আমার সুন্নাহ ও সুপথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহ আঁকড়ে থাকো।' রাসূল-কে একবার এক মহিলা জিজ্ঞেস করল- 'আমরা যদি আপনাকে না পাই, কাকে মেনে চলব?' রাসূল বললেন- 'তাহলে আবু বকরকে মানো। '৭২

নির্দেশনামূলক বক্তব্য: যেমন- রাসূল আবু বকর (রা.)-কে নামাজের ইমামতির অনুমোদন দিয়েছেন। এ ছাড়াও রাসূল বলেছেন-
'আবু বকরের দরজাটি ছাড়া তোমাদের বাড়ির যেসব দরজা মসজিদের ভেতরমুখী রয়েছে, তা বন্ধ করে দাও।'৭৩
এসব ছাড়াও তাঁর আরও বহু গুণ, বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।

কুরআনে আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের প্রমাণ
মূলত রাসূল-এর সুন্নাহ থেকে এতক্ষণ যেসব প্রমাণ আমরা হাজির করলাম, তার প্রত্যেকটিই কুরআন দ্বারা সমর্থিত। অর্থাৎ অনুরূপভাবে পবিত্র কুরআনেও আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের সপক্ষে তিন ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়।

সমর্থনমূলক বক্তব্য যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ

'তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে এবং সৎকাজ করবে, তাদেরকে আল্লাহ নিশ্চয়ই খলিফা মনোনীত করবেন।' সূরা নুর: ৫৫

আল্লাহ আরও বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يَحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَه
'হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্য হতে যে ধর্মত্যাগ করবে, (তাদের স্থলে) নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায়কে প্রতিস্থাপিত করবেন, যারা আল্লাহকে ভালোবাসবেন এবং আল্লাহও তাদের ভালোবাসবেন।' ৭৪ সূরা মায়েদা: ৫৪

وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ

'অচিরেই আল্লাহ কৃতজ্ঞচিত্তদের প্রতিদান দেবেন।' সূরা ইমরান: ১৪৪

আদেশমূলক বক্তব্য
আল্লাহ বলেন-
لِلْمُخَلَّفِينَ مِنَ الْأَعْرَابِ سَتُدْعَوْنَ إِلَى قَوْمٍ أُولِي بَأْسٍ شَدِيدٍ تُقَاتِلُونَهُمْ أَوْ يُسْلِمُونَ

'পেছনে পড়ে থাকা বেদুইনদের বলো, অচিরেই তোমাদের এমন এক বিপুল শক্তিধর সম্প্রদায়ের বিপক্ষে যুদ্ধে ডাকা হবে, যাদের সাথে তোমরা যুদ্ধ করবে অথবা তারা আত্মসমর্পণ করবে।' সূরা ফাতহ : ১৬

নির্দেশনামূলক বক্তব্য
যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى

'নিশ্চয়ই অধিক পরহেজগার ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে।' সূরা লাইল: ১৭

'নবি ও সিদ্দিকগণ।'৭৫ 'আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী'৭৬ ইত্যাদি আয়াতে আবু বকর (রা.)-এর খলিফা হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

অতএব, আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত হয়ে গেল; যদিও তাঁর খিলাফতটি নিছক ইজমা দ্বারাই সাব্যস্ত হতে পারত। যেমন: আল্লাহ যদি কোনো ব্যক্তির বিয়ের অভিভাবক (ওলি) হওয়ার আদেশ দেন অথবা কাউকে বিয়ে করানোর জন্য আদেশ দেন কিংবা এর সাথে আরও অনেক কাজের আদেশ দেন, তাহলে তো সেই আদেশ বাস্তবায়নের স্বার্থে ওলি হওয়ার চুক্তি অথবা বিয়ের চুক্তি বিদ্যমান থাকাটা আবশ্যক। আর কুরআন ও সুন্নাহ এই চুক্তির আদেশকেই প্রমাণিত করেছে এবং তাঁর প্রতি আল্লাহর ভালোবাসাকে সাব্যস্ত করেছে। তাই কুরআন ও সুন্নাহ এটাই বলছে যে, জনসাধারণের ওপর আবু বকর (রা.)-কে মনোনীত করাটা আবশ্যক এবং তাঁরা এ ব্যাপারে আদিষ্ট। কাজেই এই আদেশ পালন না করে কোনো গত্যন্তর নেই। তাঁরা আল্লাহর আদেশকে মান্য করে আবু বকর (রা.)-কে মনোনীত করার মাধ্যমে নিজেদের সর্বোত্তম কাজটি করেছেন এবং নিজেদের মর্যাদাকে বুলন্দ করেছেন।

টিকাঃ
৬০. মুসলিম: ১৩৪২
৬১. মুসলিম: ১৬৯২
৬২. এখানে পাঠকদের সুবিধার জন্য কিছু কথা বলে নেওয়া একান্তই জরুরি মনে করি। আবুল হাসান আলি নদভি (রহ.) বলেন, শাইখে আকবর ইবনে আরাবি (৫৫৮-৬৩৮ হি.) (রহ.)-এর কিতাবাদি ও তাঁর ইলম সম্পর্কে যারা গবেষণা করেন, তাঁদের একটি দল মনে করেন-তাঁর কিতাবাদি, বিশেষত ফুসুসুল হিকাম ব্যাপক বিকৃতির শিকার হয়েছে। শাইখের ভক্ত ও তাঁর জ্ঞানের ধারক-বাহক দামেশকের শাইখ আহমাদ আল হারুন আল আসাল দৃঢ়তার সাথে বলতেন, ফুসুসুল হিকামের এক-তৃতীয়াংশ কিংবা তারও অধিক বানোয়াট ও ভিত্তিহীন তথা মূলপাঠের সাথে সম্পর্কহীন। - (তারিখে দাওয়াত ওয়া আজিমাত-২/৭০। মূল উর্দু কিতাব দ্রষ্টব্য।)
শাইখে আকবর ইবনে আরাবি (রহ.)-এর সবচে' কড়া সমালোচকদের অন্যতম একজন হিসেবে মনে করা হয় ইমামে রাব্বানি মুজাদ্দিদে আলফে সানি (১৫৬৪- ১৬২৪ খ্রি. রহ.)-কে। তা সত্ত্বেও তিনি তার মাকতুবাতে বলেন, 'অধম ইবনে আরাবি (রহ.)-কে আল্লাহর মকবুল বান্দা মনে করি। ...লোকেরা তার বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়িতে লিপ্ত। তার ভক্ত ও বিদ্বেষীরা কেউ-ই ভারসাম্যতার ধারেকাছে নেই। ... অধম এক্ষেত্রে মধ্যবর্তী মতকে গ্রহণ করি। ওয়াহদাতুল ওজুদের মন্দকে বাদ দিয়ে ভালোকে গ্রহণ করি। ... মূলত ওয়াহদাতুল ওজুদ হলো আত্মশুদ্ধি চর্চার একটি স্তর। এর পরবর্তী স্তর হলো 'ওয়াহদাতুশ-শুহুদ'।' (মাকতুবাতে আলফে সানি রহ.-এর বরাতে আবুল হাসান আলি নদভি, তারিখে দাওয়াত ওয়া আজিমাত: ৪/২৯৪,২৯৫)
ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি রহ. (১৭০৩-১৭৬২ খ্রি.) ওয়াহদাতুল ওজুদের সমর্থক ছিলেন। তিনি তার বাবা শাহ আব্দুর রহিম মুহাদ্দিসে দেহলবি (১৬৪৪- ১৭১৯ খ্রি) সম্পর্কে আনফাসুল আরিফিনে লিখেন, 'আমার বাবা শাইখে আকবর ইমাম মুহিউদ্দীন ইবনে আরাবি রহ.-কে অনেক শ্রদ্ধা করতেন। তিনি বলতেন, "আমি চাইলে ফুসুসুল হিকাম-এর (ইবনে আরাবি রহ.-এর সর্বাধিক আলোচিত গ্রন্থগুলোর অন্যতম) সকল মাসাইলকে কুরআন ও হাদিসের আলোকে বর্ণনা করে প্রমাণ করে দিতে পারি এবং তা এমনভাবে করব, এরপর কারও সন্দেহ বাকি থাকবে না।" এরপর শাহ সাহেব (রহ.) লিখেন, 'তা সত্ত্বেও আমার বাবা ওয়াহদাতুল ওজুদ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করা থেকে বিরত থাকতেন। কারণ, এই যুগের অধিকাংশ মানুষ ওয়াহদাতুল ওজুদকে বোঝার যোগ্যতা রাখে না।
আর না বোঝার কারণে তারা ইলহাদ (ধর্মহীনতা) ও নাস্তিকতার ফাঁদে পড়ে যায়।' (আনফাসুল আরিফিন, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি রহ., ১৮৯ পৃ.)
শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) তাঁর পিতা শাহ আব্দুর রহিম (রহ.)-এর চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েই ইবনে আরাবি রহ.-এর ওয়াহদাতুল ওজুদ ও ইমামে রাব্বানি মুজাদ্দিদে আলফে সানি রহ.-এর 'ওয়াহদাতুশ শুহুদ'-এর মাঝে অপূর্ব সমন্বয় স্থাপন করেন। (আবুল হাসান আলি নদভি, তারিখে দাওয়া ওয়া আজিমাত ৫/৮৪)
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) থেকেও ইবনুল আরাবি সম্পর্কে কিছু ইতিবাচক মূল্যায়ন পাওয়া যায়। যেমন: ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, 'এদের মধ্যে ইবনে আরাবি ইসলামের সবচেয়ে নিকটবর্তী। তাঁর কথাবার্তা অনেক স্থানেই তুলনামূলক ভালো। আর তা এই জন্য যে, তিনি আদেশ-নিষেধ ও শরিয়তের বিধানাবলিকে যথাস্থানে রেখে চলেন। তাসাউফের শাইখগণ যে আখলাক অবলম্বন করেন এবং যেসব ইবাদত পালনের তাগিদ দিয়েছেন, তিনি তা গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। এজন্য অনেক সুফি ও পরহেজগার লোক তাঁর থেকে তাসাওউফের শিক্ষা নিয়ে থাকেন। যদিও তারা তাঁর কথার তাৎপর্য যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। তবে যারা তাঁর কথার সঠিক তাৎপর্য বুঝে তাঁর সাথে একমত হয়, তাদের কাছে তাঁর কথার প্রকৃত মর্ম খুবই পরিষ্কার।' (জালাউল আইনাইনের বরাতে আবুল হাসান আলি নদভি, তারিখে দাওয়াত ওয়া আজিমাত-৪/২৭৮)
৬৩. মুসলিম: ১৩৪২
৬৪. সুনানে তিরমিজি: ৩৪৪৭
৬৫. 'স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বলেন, আমি জমিনে খলিফা বানাব (সূরা বাকারা: ৩০)।' ইমাম তাবারি (রহ.) এই আয়াতে 'খলিফা' শব্দের ব্যাখ্যায় ইবনে মাসউদ ও ইবনে আব্বাস (রা.)-এর একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করে বলেন-'এর অর্থ হলো, দুনিয়াতে আল্লাহর পক্ষ হয়ে আল্লাহর হুকুম কায়েম করা।' কুরআন শরিফের আরেকটি আয়াতেও এই ব্যাখ্যাটির সমর্থন পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন-'হে দাউদ! আমি তোমাকে খলিফা বানিয়েছি। সুতরাং মানুষের মাঝে হকভাবে বিচার করো এবং প্রবৃত্তিতাড়িত হয়ো না।' সূরা সোয়াদ: ২৬ মোটকথা, 'আল্লাহর খলিফা হওয়া'-বিষয়ক যে মতটি ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এখানে উল্লেখ করেছেন, তার বিপরীত ভিন্ন একটি মতামতও সালাফ থেকে বর্ণিত আছে। তবে যে অর্থ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) করেছেন, সেই অর্থে মানুষ আল্লাহর খলিফা হতে পারে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কুরআনে যেই অর্থে মানুষকে তাঁর খলিফা বলেছেন, সেই অর্থে মানুষ অবশ্যই আল্লাহর খলিফা-অনুবাদক
৬৬. বাজ্জার: ৫৩৮৩, কানজুল উম্মাল: ৬/৪-৫ (হাদিসটি সহিহ)
৬৭. ছায়া তখনই গুরুত্বপূর্ণ হবে, যখন তার কাছে আশ্রয় নেওয়ার কেউ থাকবে। তাই ছায়া ছায়াগ্রহীতার মুখাপেক্ষী। - অনুবাদক
৬৮. বুখারি: ৩৬৮২, মুসলিম: ২৩৯৩
৬৯. আবু দাউদ: ৪৬৩৪, তিরমিজি: ২২৮৭
৭০. বুখারি: ৫৬৬৬, মুসলিম: ২৩৮৭
৭১. আবু দাউদ: ৪৬৩৬, আহমাদ: ১৪৮২১
৭২. বুখারি: ৭৩৬০
৭৩. বুখারি: ৪৬৭
৭৪. এই আয়াতে বর্ণিত 'রিদ্দাহ' যেন আবু বকর (রা.)-এর সময়কার ধর্মান্তরণের ফিতনার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেটাকে আবু বকর (রা.) কঠোর হাতে দমন করেছিলেন। এখানে ধর্মত্যাগীদের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে যার কথা বলা হচ্ছে, তিনি খলিফা আবু বকর (রা.) ও সাহাবিগণ।
৭৫. সূরা নিসা: ৬৯
৭৬. সূরা তাওবা: ১০০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00