📘 খিলাফত ও রাজতন্ত্র ইতিহাস ও পর্যালোচনা > 📄 মুখবন্ধ

📄 মুখবন্ধ


পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন জনপদ মক্কা ছিল তাওহিদের উৎসভূমি। বহু পয়গম্বরের আদিপুরুষ ইবরাহিম (আ.) নিজ পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর সহায়তায় সেখানে আল্লাহর ইবাদতের জন্য প্রথম গৃহ তথা কাবা ঘর নির্মাণ করেন। ইবরাহিম (আ.) কেনানে ফিরে গেলেও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.) সপরিবারে মক্কায় বসবাস করতে থাকেন। কালের আবর্তে সেই মক্কায় মূর্তিপূজা প্রবর্তিত হয়।

৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে মহানবি মুহাম্মাদ জন্মগ্রহণ করেন। এর আগেই তাওহিদের উৎসভূমি মক্কা শিরকের কেন্দ্রে পরিণত হয়, আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত কাবা ঘরে স্থাপিত হয় ৩৬০টি মূর্তি। ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে নবুয়ত লাভের পর রাসূলুল্লাহ মক্কাবাসীকে শিরক ও মূর্তিপূজা ত্যাগ করে আল্লাহর একত্ববাদে ফিরে আসার আহ্বান জানান। ১৩ বছরের মাক্কিজীবনে কুরাইশ গোত্রের মুষ্টিমেয় লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। অবশেষে হিজাজের আরেকটি জনপদ ইয়াসরিবের কিছু মানুষ হজ পালনের জন্য মক্কায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মহানবি-কে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন।

৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মাদ ও তাঁর সাথিরা ইয়াসরিবে হিজরত করেন, জনপদটির নতুন নামকরণ হয় মদিনাতুর রাসূল বা মদিনা। মদিনার বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। ফলে বহু বছরের নির্যাতন, ভয় ও আতঙ্কের অবসানে নির্বিঘ্নে দ্বীন পালনের সুযোগ পায় মুসলিমরা।

মহানবি-এর কার্যধারা পর্যালোচনায় বোঝা যায়, তিনি তাওহিদ ও ইবাদতের সংকীর্ণ অর্থ গ্রহণ করেননি। তাই ইবাদত ও পার্থিব কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তিনি দ্বৈত উৎস হতে প্রেরণা গ্রহণ করেননি। মুহাম্মাদ ছিলেন সালাতের ইমাম, আবার তিনিই ছিলেন যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতি এবং বিচারালয়ের প্রধান বিচারপতি।

রাসূলুল্লাহ-এর ইন্তেকালের পর দেশ চালনায় সাহাবায়ে কেরাম তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। তাঁরা আনুষ্ঠানিক ইবাদত ও পার্থিব কর্মকাণ্ড পরিচালনায় অভিন্ন উৎস হতে প্রেরণা গ্রহণের ধারা অব্যাহত রাখেন।

সেকালে পুরো দুনিয়ায় রাজতন্ত্র চালু থাকলেও তাঁরা রাজত্ব বা বাদশাহি কায়েম করেননি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, উমর (রা.)-এর পুত্র আবদুল্লাহ জ্ঞানগরিমা, তাকওয়া-পরহেজগারি এবং সাহসিকতা ও বীরত্বের বিচারে খলিফা হওয়ার উপযুক্ত ছিলেন, কিন্তু উমর (রা.) তাঁকে খলিফা হিসেবে নিয়োগ না করার নির্দেশ দেন।

কেবল শাসক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নয়, আর্থিক স্বচ্ছতা বিধান, জনগণের অধিকার আদায়, সুকৃতির লালন ও দুষ্কৃতির দমনসহ সকল ক্ষেত্রে প্রথম চার খলিফা (আবু বকর, উমর, উসমান ও আলি রা.) রাসূলুল্লাহ -এর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। তাই তাঁদের ৩০ বছরের শাসনকাল (১১-৪০ হিজরি) 'খিলাফাহ আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ' বা নবুয়তি ধারার খিলাফত নামে পরিচিত। প্রথম চার খলিফার শাসনব্যবস্থাকে খিলাফত নামকরণের দ্বিবিধ তাৎপর্য রয়েছে। প্রথমত, তাঁরা রাসূলুল্লাহ -এর প্রতিনিধি হিসেবে তাঁরই আদর্শে শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। দ্বিতীয়ত, সেকালে সারা দুনিয়ায় প্রচলিত রাজতান্ত্রিকব্যবস্থা গ্রহণ না করে সত্যিকার অর্থে প্রতিনিধিত্বশীল শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন। বলা বাহুল্য, খিলাফত মানে প্রতিনিধিত্ব।

তবে জনগণের নৈতিক মানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল তৃতীয় খলিফা উসমান (রা)-এর আমলেই। তাঁর শাসনকালের শেষার্ধে কতিপয় দুষ্কৃতিকারী এমন ফিতনা শুরু করে যে, শান্তিপ্রিয় ও লাজনম্র খলিফা নিজের জীবন উৎসর্গ করেও তার অবসান ঘটাতে পারেননি। ফলে চরম গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয় রাসূল জামাতা আলি (রা.)-কে।

উসমান (রা.) হত্যার প্রতিক্রিয়ায় যে গোলযোগের সূচনা হয়, তার প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে আলি (রা.)-এর খিলাফতের পুরো সময়জুড়ে। এমনকী কয়েকটি যুদ্ধ করতেও বাধ্য হন আলি (রা.), যেগুলোর অধিকাংশই ছিল ভ্রাতৃঘাতী। জনৈক খারিজি আততায়ীর গুপ্ত হামলায় আলি (রা.) শহিদ হলে তাঁর চার বছরের শাসনের অবসান হয়। মুসলিম উম্মাহর দুর্ভাগ্য! আলি (রা.)-এর মতো প্রজ্ঞাবান ও বিচক্ষণ খলিফা নির্বিঘ্নে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য উৎপাতহীন নিরুপদ্রব সময় পাননি।

আলি (রা.)-এর শাহাদাতের মাধ্যমে নবুওয়তের আদর্শে পরিচালিত খিলাফতের অবসান ঘটে। মুসলিম দুনিয়ায় চালু হয় রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। নতুন ধারার শাসনব্যবস্থার ফলে কেবল শাসকের উত্তরাধিকার নির্ধারণ পদ্ধতিতেই পরিবর্তন আসে এমন নয়; বরং শাসনপ্রণালির বিভিন্ন ক্ষেত্রেও পরিবর্তন সূচিত হয়। যদিও শাসনব্যবস্থার পরিচয়জ্ঞাপক শব্দ হিসেবে খিলাফত বহাল রাখা হয়, কিন্তু 'খিলাফাহ রাশিদা' হতে পৃথক করার জন্য বংশের দিকে সম্পর্কিত করে বলা হয় 'উমাইয়া খিলাফত', 'আব্বাসি খিলাফত' ইত্যাদি। এটিকে রাজতান্ত্রিক খিলাফতও বলা যায়।

উসমান (রা)-এর হত্যাকাণ্ডের পর মুসলিম উম্মাহয় যে বিভাজনের ধারা সূচিত হয়, তার অবসান পরবর্তী সময়ে আর হয়নি। খিলাফত-প্রশ্নেও এই বিভাজনের প্রভাব লক্ষ করা যায়। প্রান্তিক ধারার কোনো কোনো গোষ্ঠী মনে করে-খিলাফত প্রতিষ্ঠা ওয়াজিব; কোনো অবস্থায় রাজতন্ত্র বৈধ নয়। আবার আরেক দল মনে করে-খিলাফত প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকলেও রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা বৈধ।

খিলাফত-প্রশ্নে প্রান্তিক ধারার গোষ্ঠীগুলোর ধারণা খণ্ডন করে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের চিন্তাধারা তুলে ধরার লক্ষ্যেই শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এই গ্রন্থটি রচনা করেন। সেখানে তিনি মতামত দেন-স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠাই ওয়াজিব, তবে অপারগ অবস্থায় বা বিশেষ পরিস্থিতিতে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে সেটিও বৈধ বলে গণ্য হবে।

শাসনব্যবস্থার বৈধতার সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয় হলো-শাসকের আনুগত্য। কয়েকটি প্রান্তিক গোষ্ঠী নানা অজুহাতে শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে বৈধ মনে করে। এই মত খণ্ডন করার জন্য ইবনে তাইমিয়া (রহ.) হাদিসের আলোকে শাসকের আনুগত্যের বিষয়েও আলোকপাত করেছেন। তাঁর মতে, শাসকের বৈধ আদেশ মেনে চলতে হবে। এমনকী জুলুমের শিকার হলে বা অধিকারবঞ্চিত হলেও ধৈর্যধারণ করতে হবে। প্রাসঙ্গিক আরও কিছু বিষয়ও আলোচিত হয়েছে এই পুস্তকে। যেমন : বাগি (যারা বাড়াবাড়ি করে) ও খারেজিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পদ্ধতি, মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক যুদ্ধে নিহত ব্যক্তির হুকুম এবং বিবদমান দলগুলোর মাঝে সন্ধি স্থাপনের উপায় ইত্যাদি।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ইন্তেকালের পর প্রায় সাড়ে ছয়শত বছর অতিবাহিত হয়েছে। মুসলিম দুনিয়ার শাসনপদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন খিলাফতের নামমাত্র অস্তিত্বও নেই। কিছু দেশে রাজতন্ত্রের প্রচলন রয়েছে। বহু দেশে চালু আছে গণতন্ত্র। এমন পরিস্থিতিতে শাসনপদ্ধতির বৈধতা-অবৈধতা নির্ধারণে এই গ্রন্থের ঢালাও প্রয়োগ কাম্য নয়। আলিমগণ অনিবার্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রাজতন্ত্রের বৈধতা দিয়েছেন। তাঁদের অভিমতের অন্ধ ও আক্ষরিক প্রয়োগের পরিবর্তে তাঁদের বক্তব্যের চেতনাকে বিবেচনায় নিতে হবে। যেমন: পূর্বসূরি আলিমগণের মতে, শাসকের আনুগত্য ওয়াজিব। এই অভিমতের পক্ষে হাদিসও উদ্ধৃত হয়েছে। এই অভিমতের ওপর ভিত্তি করে গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিবাদের অধিকারকে আনুগত্য বর্জনের সমান্তরাল হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। গণতান্ত্রিক দেশে বাচনিক প্রতিবাদ, শোভাযাত্রা ও সমাবেশ আয়োজন করা জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। পূর্বসূরি আলিমগণের অভিমতের অন্ধ ও আক্ষরিকভাবে প্রয়োগ করে এসব গণতান্ত্রিক অধিকারকে বিদ্রোহ বা আনুগত্যহীনতা বলে বিবেচনা করা যাবে না। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর এই গ্রন্থ অধ্যয়নকালে এই বিষয়গুলো আমাদের মনে রাখা উচিত।

পরিশেষে গুরুত্বপূর্ণ এই গ্রন্থ প্রকাশে উদ্যোগী হওয়ায় গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্সকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আশা করি খিলাফতব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন প্রত্যাশী তরুণচিত্ত এই গ্রন্থ অধ্যয়নে সঠিক দিশা লাভ করবে।

📘 খিলাফত ও রাজতন্ত্র ইতিহাস ও পর্যালোচনা > 📄 শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) : জীবনবৃত্তান্ত

📄 শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) : জীবনবৃত্তান্ত


জন্ম
পৃথিবীর ইতিহাসে যে সকল মনীষী জ্ঞানের জগতের পাশাপাশি রাজনৈতিক জগতেও বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে নিজের নামকে অবিস্মরণীয় করেছেন, তাঁদের মধ্যে শাইখুল ইসলাম১ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) অন্যতম। এই মহান মনীষী জন্মগ্রহণ করেন আব্বাসি খিলাফত পতনের ঠিক চার বছর পর ৬৬১ হিজরি মোতাবেক ১২৬৩ খ্রিষ্টাব্দে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সময়টি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর জন্মস্থান বর্তমান তুরস্কের হাররান নামক স্থানে। তৎকালীন সময়ে তাঁর পরিবার ইলম ও জ্ঞানচর্চায় সমগ্র আরব জাহানে সুবিখ্যাত ছিল। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)- এর বাবা আবদুল হালিম ইবনে আবদুস সালাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) (৬২৭-৬৮২ হি.) ছিলেন অনেক বড়ো মুহাদ্দিস। দাদা মাজদুদ্দিন আবদুস সালাম ইবনে তাইমিয়া (৫৯০-৬৫২ হি.) (রহ.) ও ছিলেন হাম্বলি মাজহাবের অনেক বড়ো ফকিহ ও মুহাদ্দিস। হাম্বলি মাজহাবের শাস্ত্রীয় পরিভাষায় 'শাইখাইন' দ্বারা মাজদুদ্দিন ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ও ইবনে কুদামা (রহ.) (৫৪১-৬২০ হি.)-কে বোঝানো হয়। তাঁর রচিত আল মুহাররার ও আল মুনতাকা ফি আহাদিসিল আহকাম গ্রন্থদ্বয় হাম্বলি মাজহাবের মূল্যবান আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।২

শৈশব ও ছাত্রজীবন
শাইখের বয়স যখন সাত বছর, তখন হাররানে মঙ্গলদের আক্রমণ হয়। ফলে তাঁর পরিবার সেখান থেকে হিজরত করে দামেস্কে চলে আসেন। ইতিহাসবিদগণ লিখেন, হিজরতের সময় এই বিদ্যোৎসাহী পরিবারটি তাঁদের মালামালের বোঝা ফেলে দিয়ে বংশপরম্পরায় সংরক্ষিত গ্রন্থাবলি সাথে নিয়ে সিরিয়ায় চলে আসেন।৩

দামেস্কে এসে তাঁর বাবা 'দারুল হাদিস আস সুকরিয়াহ' এবং উমাইয়া জামে মসজিদে পাঠদান শুরু করেন। শাইখের প্রাথমিক পড়াশোনা তাঁর বাবার কাছেই হয়। খুব অল্প বয়সেই তিনি কুরআন হেফজ করেন। পরে বাবার তত্ত্বাবধানে থেকেই হাম্বলি ফিকহের মৌলিক পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি সিরিয়ার দুই শতাধিক মুহাদ্দিসের নিকট থেকে হাদিস শ্রবণ করেন। ৪

তাঁর বাবা ও দাদার মতো তিনিও প্রখর স্মৃতিশক্তি ও তুখোড় মেধাশক্তির অধিকারী ছিলেন। ছোটোবেলায় এক বড়ো আলিম তাঁর স্মৃতিশক্তির জনশ্রুতি শুনে তাঁকে পরখ করতে চাইলেন। এজন্য তিনি শিশু ইবনে তাইমিয়াকে স্লেটে ১৩টি হাদিস লিখতে বললেন এবং পরক্ষণেই আবার মুছে ফেলতে বললেন। তারপর বললেন হাদিসগুলো শোনাতে। তিনি সকল হাদিস নির্ভুলভাবে শুনিয়ে দিলেন। অনুরূপভাবে তিনি হাদিসের সনদ দিয়েও তাঁকে পরখ করলেন। অতঃপর তাঁর প্রখর মেধাশক্তি দেখে সেই বড়ো আলিম যারপরনাই বিস্মিত হলেন এবং তাঁর জন্য দুআ করলেন। ৫

শিক্ষকতা
১৭ বছর বয়স থেকে ইবনে তাইমিয়া (রহ.) শিক্ষকতা ও ফতোয়া প্রদান করা শুরু করেন। তবে বাবার ইন্তেকালের পর ২২ বছর বয়সে যেই দিন তিনি পিতার স্থলাভিষিক্ত হন, সেই দিনটি ছিল তাঁর শিক্ষকতাজীবনের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। ২২ বছরের এক যুবকের দারস শুনতে সেদিন সিরিয়ার বিদ্বানমণ্ডলীর ভিড় জমেছিল। কাজিউল কুজাত বাহাউদ্দিন আশ-শাফেয়ি স্বয়ং হাজির ছিলেন সেখানে। এ ছাড়াও শাইখুশ-শাফিইয়্যাহ তাজুদ্দিন ফাজারিসহ হাম্বলি মাজহাবের অনেক ইমামও সেই দারসে উপস্থিত ছিলেন। সেই দিনটি সম্পর্কে ইবনে কাসির (রহ.) (৭০১-৭৭৪ হি.) বলেন-

'এটা ছিল বিস্ময়কর এক দারস। এর ব্যাপক উপকারিতা এবং সাধারণ জনগণের নিকট পছন্দনীয় হওয়ার দরুন শাইখ তাজুদ্দিন ফাজারি পুরো দারসটিই লিপিবদ্ধ করেছিলেন। উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলী এত তরুণ বয়সে এমন মূল্যবান দারসের জন্য তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। '৬

এ ছাড়াও মাদরাসায়ে হাম্বলিয়াসহ সিরিয়া ও মিশরের বিখ্যাত বিদ্যাপীঠগুলোতে তিনি দারস প্রদান করেন। তাঁর ছাত্রের সংখ্যা ছিল অগণিত।

রাজনৈতিক জীবন
৬৯৯ হিজরিতে সিরিয়ায় যখন ইরান ও ইরাকের তাতারি শাসক কাজান৭ আক্রমণ করে বসে, তখন তাদের মোকাবিলা করার জন্য মিশরের সুলতান মুহাম্মাদ ইবনে কালায়ান সসৈন্যে রওয়ানা হন। দামেস্কের বাইরে উভয়পক্ষের তুমুল লড়াই। মুসলিমরা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করা সত্ত্বেও পরাজয় বরণ করে। দামেস্কে শহরবাসী আতঙ্কিত ও ভীতবিহ্বল হয়ে পড়ে এবং এই দুর্ধর্ষ তাতারিদের হাত থেকে বাঁচার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পারে, এই পরিস্থিতে সন্ধি ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই। কিন্তু সন্ধির পথও এত মসৃণ নয়। তাই সন্ধির বার্তা নিয়ে যাওয়ার জন্য শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ শাইখুল ইসলাম (রহ.)-কে মনোনীত করেন।

শাইখের সাথে কাজানের এই সাক্ষাৎ ইতিহাসে অনন্য হয়ে আছে। শাইখ তাকে ন্যায় ও ইনসাফের প্রতি আহ্বান করেন এবং কঠোর ভাষায় তার কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। কাজান শাইখের কথায় খুবই প্রভাবিত হন এবং অনেক যুদ্ধবন্দিকে মুক্ত করে দেন। বলা বাহুল্য, তাতার জাতি এত সহজে দমার পাত্র ছিল না। ৭০০ হিজরিতে তারা আবার দামেস্ক আক্রমণ করে। ফলে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর জীবনে শুরু হয় কলম-কিতাবের কোমল জীবনে তরবারির তীক্ষ্ণ ও তেজস্বী অধ্যায়।

সংগ্রাম ও যুদ্ধের জীবন
তাতারিদের পুনর্বার আক্রমণের কথা শুনে সমগ্র দামেশকবাসী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। মিশরের সুলতান তাদের সহায়তার আশ্বাস দিয়েও হঠাৎ পিছু হটে গেলেন। জাতির এহেন দুর্দিনে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মতো মহামানব কিছুতেই নির্বিকারভাবে বসে থাকতে পারেন না; ছুটে যান শহরের গভর্নরের কাছে। তাকে বলেন-

'আমরা মজলুম; আর মজলুমের জয় সুনিশ্চিত। কেননা, আল্লাহ বলেছেন-

ذُلِكَ وَ مَنْ عَاقَبَ بِمِثْلِ مَا عُقِبَ بِهِ ثُمَّ بُغِيَ عَلَيْهِ لَيَنْصُرَنَّهُ اللهُ -

"যে ব্যক্তি নিজের প্রতি হওয়া অবিচারের সমপরিমাণ বদলা নেয়, সে পুনরায় জুলুমের শিকার হলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন।"' সূরা হাজ্জ : ৬০

সিরিয়ার আলিম ও নেতাগণ শাইখের কথায় আশ্বস্ত হন। তাঁরা সবাই শাইখের কাছে অনুরোধ করেন মিশরে গিয়ে সুলতানকে বোঝানোর জন্য। তিনি দীর্ঘ আট দিন মিশরে অবস্থান করে সুলতানকে সাহস জোগান। একপর্যায়ে শাইখের কথায় প্রভাবিত হয়ে সুলতান যুদ্ধে শরিক হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) জনগণ থেকে শুরু করে শাসক, সেনাবাহিনী-সবাইকে একক প্রচেষ্টায় জিহাদের জন্য অনুপ্রাণিত করেন। বহু আলিম ও বেসামরিক জনগণ এই জিহাদে শামিল হন। সবাইকে তিনি সাহস দিয়ে বলতেন- 'জয় আমাদেরই হবে, ইনশাআল্লাহ!'

সে সময় শাইখুল ইসলাম সৈনিকদের দেখিয়ে দেখিয়ে রমজানের রোজা ভাঙতেন আর রাসূল -এর হাদিস শুনিয়ে বলতেন- 'নবি করিম বলেন-"তোমরা আগামীকাল শত্রুর মোকাবিলা করবে, তাই রোজা ভাঙলে বেশি শক্তি পাবে।"'

তাতারিদের বিরুদ্ধে জিহাদের মুহূর্তে شাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর পর্বতসম অবিচলতা ও সাগরসম সাহসিকতা ইতিহাসের পাতাকে চিরকাল আলোকিত করে রাখবে। অবশেষে ৭০২ হিজরির ৪ রমজান সত্যি সত্যিই মুসলিমরা তাতারিদের শোচনীয়ভাবে পরাভূত করে। তাতারিদের বহু নেতা প্রাণ হারায় এবং অনেকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে। দীর্ঘদিন যাবৎ সুলতান, আলিম-উলামা ও জনসাধারণকে যে জয়ের ভবিষ্যদ্বাণী শাইখুল ইসলাম দিয়ে আসছিলেন, তা সত্যে রূপান্তরিত হলো। ইতিহাস তাঁর অন্তর্দৃষ্টির সাক্ষাৎ প্রমাণ পেল। দামেস্কবাসী শাইখুল ইসলামকে বিপুল আড়ম্বরতার সাথে স্বাগত জানায় এবং তাঁর জন্য দুআ করে।

কারাজীবন
শাইখুল ইসলাম আহমদ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) সত্যের প্রতি নিরন্তর আপসহীন ছিলেন। সমাজে পরিব্যাপ্ত বিদআত ও কুসংস্কার নির্মূলে নিরলস সংগ্রামের জন্য তিনি বহুবার কারারুদ্ধ হন। কখনো আলিম-উলামার রোষানলে পড়ে, কখনো-বা কাজির হিংসার শিকার হয়ে তিনি কারারুদ্ধ হন। এমনকী শাসকের বিরাগভাজন হয়েও তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে।

কারাগারের সেই দুর্বিষহ দিনগুলোতে শাইখ কখনো এক মুহূর্তের জন্যও বিচলিত হননি। এই বিষয়ে তাঁর শিষ্য ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) লিখেন-

'কারাগারে একবার শাইখুল ইসলাম আমাকে বলেন-“শত্রুরা আমাকে কিছুই করতে পারবে না। আমার সুখ ও জান্নাত তো সর্বদা আমার সাথেই থাকে। ইলম আমার সুখ, আর ঈমান হলো আমার জান্নাত। আমি যেখানেই যাই না কেন, তারা আমার সাথেই থাকে; কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না। কারাগার হলো আমার জন্য নিছক নির্জনবাস। এখন আমার মৃত্যু হবে শাহাদাত। আর দেশান্তর তো আমার জন্য কেবল প্রমোদভ্রমণ।”'৮

দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও সমাজ সংস্কারে ইবনে তাইমিয়া (রহ.)
দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও ইলমুল কালামের প্রতি ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর আকর্ষণ তৈরি হয় মূলত কয়েকটি কারণে। শাইখুল ইসলামের সময়টা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনের উত্তাল এক সময়। মুসলিমদের ভেতর জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে অধঃপতনের জোরালো সূচনা শুরু হয় মূলত এই সময় থেকেই। তাসাওউফের নামে সে সময়ে প্রচুর কুসংস্কার দার্শনিক আবহে মুসলিম সমাজে ব্যাপক প্রভাবশালী ছিল। তাই মুসলিম সমাজে বিরাজমান কুসংস্কার ও বিদআতের মূলোৎপাটন করা ছিল সময়ের ঐকান্তিক দাবি। কিন্তু এই বিদআতগুলোর শিকড় এতটাই গভীরে ছিল যে, এর জন্য দরকার ছিল বিশেষ প্রস্তুতি এবং দর্শন ও ইলমুল কালাম সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তাঁর পূর্বেকার ও সমকালীন হাম্বলি আলিমদের মধ্যে এই বিষয়ে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও শূন্যতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

এর পাশাপাশি আরেকটি কারণও উল্লেখ করা যেতে পারে। তা হলো- হাম্বলি মাজহাবের প্রমাণ প্রক্রিয়া ছিল প্রধানত সরল ও কুরআন-হাদিসের বাহ্যিক বোধকেন্দ্রিক। পক্ষান্তরে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আশয়ারিদের প্রমাণ পদ্ধতিতে ছিল প্রচুর বৈচিত্র্য ও গভীরতা। ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিভিত্তিক প্রমাণের প্রাচুর্য। তাই তিনি দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার গভীর পাঠে আত্মনিয়োগ করেন। একপর্যায়ে তিনি তৎকালীন সমাজে দর্শনের নামে প্রচলিত ভ্রান্ত মতবাদ ও কুসংস্কারের শিকড় স্পর্শ করতে সক্ষম হন। শাইখুল ইসলাম যথাসম্ভব ভারসাম্যপূর্ণ ভাষায় এসবের প্রতিবাদ ও যুক্তি খণ্ডন করেন।

গবেষকরা বলেন-দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও ইলমুল কালামের বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চায় তিনি এতটাই ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন যে, স্বয়ং সেই শাস্ত্ররই দুর্বলতা ও ত্রুটি উদ্‌ঘাটন করেছিলেন। সেইসঙ্গে এই শাস্ত্রের বিভিন্ন পণ্ডিত, গবেষক, এমনকী গ্রিক দার্শনিকদের ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে এমন কিছু প্রশ্ন ও সমালোচনা উত্থাপন করেছিলেন, যার সদুত্তর এখন পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি। তবে কিছু গবেষকের অনুমান হলো-ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ও তাঁর অনুসারীদের সমালোচনার যে অংশটি জনপ্রিয় হওয়ার কথা ছিল, তার বদলে এমন কিছু সমালোচনা মুখরোচক হয়েছে, যার ফলে মুসলিম সমাজে এই শাস্ত্রগুলোর যথাযথ চর্চা আর হতে দেখা যায়নি। একপর্যায়ে এই শাস্ত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ইউরোপিয়ানদের হাতে। ফলত পৃথিবীর শাসনভার কুক্ষিগত করতে পরবর্তী সময়ে এসব শাস্ত্রের চর্চা তাদের অনেক সহযোগিতা করেছে।

তবে এতটুকু সকলেই স্বীকার করেন যে, শাইখুল ইসলাম আহমদ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) দর্শন, ইলমুল কালাম, তাসাউফ ইত্যাকার শাস্ত্রের প্রভৃত সংস্কার সাধন করেছেন। পাশাপাশি মুসলিম সমাজে চলমান যাবতীয় শিরক, বিদআত ও পথভ্রষ্ট মতাদশের বিরুদ্ধে আমরণ লড়াই করে গেছেন। তাঁর নেতৃত্বে একদল যুবক তৈরি হয়েছিল, যারা এসব কুসংস্কার নির্মূলে সদা বদ্ধপরিকর থাকত। শাইখের কথায় তারা ঝাঁপিয়ে পড়ত। একবার তিনি শুনতে পেলেন, এক এলাকায় কতিপয় মুসলিম পাথরের পূজা করা শুরু করেছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সদলবলে সেখানে গিয়ে পাথরটি ভেঙে ফেলেন।

মৃত্যু
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ৭২৮ হিজরিতে দামেস্কের কেল্লায় বন্দি অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মাকবারায়ে সুফিয়্যাতে তাঁকে দাফন করা হয়।

চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর উদারতা ও মহানুভবতার জন্য একটি ঘটনার উল্লেখই এখানে যথেষ্ট মনে করি। ইবনে কাসির (রহ.) লিখেন-

'মিশরে ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর সবচেয়ে বড়ো প্রতিপক্ষ মালেকি মাজহাবের কাজি ইবনে মাখলুফ বলতেন, "আমি তাঁর মতো উদার মনের মানুষ আর দেখিনি। আমরা সুলতানকে তাঁর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি (যদিও তাতে সফল হইনি), কিন্তু তিনি যখন সুযোগ পেলেন, আমাদের সবাইকে মাফ করে দিলেন। অধিকন্তু তিনি আমাদের হয়ে সুলতানের কাছে সুপারিশ করলেন (পরে সুলতান তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া থেকে বিরত রইলেন)।” ১০

ছাত্রবৃন্দ
শাইখুল ইসলাম (রহ.) যদি কেবল দারসের ময়দানেই নিরত থাকতেন, তবুও তিনি সমকালীন সকল মনীষী থেকে নির্দ্বিধায় এগিয়ে যেতেন। তিনি এমন কিছু শিষ্য-শাগরেদ তৈরি করেছেন, পরবর্তী সময়ে যাদের কোনো সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই আমরা এখানে তাঁর কয়েকজন ছাত্রের কথা বলে নেওয়া জরুরি মনে করছি।

ইমাম শামসুদ্দিন জাহাবি (রহ.) (৬৭৩-৭৪৮ হি.)
ইসলামের ইতিহাসে এমন মনীষী খুবই কম পাওয়া যায়, যারা একই সঙ্গে ইতিহাস, উলুমে হাদিস ও রিজালশাস্ত্রে এমন সব যুগান্তকারী কিতাব লিখে গেছেন, যা শাস্ত্রগুলোর সমান সময় মুসলিমদের মাঝে জীবিত থাকবে বলে নিঃসংকোচে অনুমান করা যায়। এসব শাস্ত্রে মোটামুটি তাঁদের কথাই চূড়ান্ত বক্তব্য। জাহাবি (রহ.) তেমনই একজন মনীষী। হাফিজুদ্দুনিয়া শাইখুল ইসলাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) (৭৭৩-৮৫২ হি.)-এর মতো পণ্ডিতপ্রবর ইমাম জমজমের পানি পান করার সময় দুআ করেছিলেন-'হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ইমাম জাহাবি (রহ.)-এর মতো পাণ্ডিত্য দান করুন।'

ইমাম জাহাবি (রহ.) ফিকহের ক্ষেত্রে শাফেয়ি মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। তিনি তাঁর প্রকাণ্ড গ্রন্থগুলোতে এমন বহু কিতাবের তথ্য লিপিবদ্ধ করেছেন-যা আজ কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তাই মুসলিম উম্মাহ আজও সেসব অবলুপ্ত কিতাবের অমূল্য জ্ঞান-সম্পদ থেকে উপকৃত হচ্ছে। তাঁর এই সকল বিরল জ্ঞানকর্মের জন্য মুসলিমরা অনেক বড়ো অপূরণীয় ক্ষতি থেকে বেঁচে গেছে। তাঁর রচিত প্রায় চার শতাধিক কিতাব রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১. তারিখুল ইসলাম, ৫২ খণ্ডে প্রকাশিত। ৪০ হাজার মনীষীর জীবনী এবং তাঁদের সময়ের ইতিহাস এখানে সংকলিত হয়েছে।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৩০ খণ্ডে প্রকাশিত
৩. মিজানুল ইতিদাল, ৪ খণ্ডে প্রকাশিত
৪. তাজকিরাতুল হুফফাজ, ৪ খণ্ডে প্রকাশিত

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) (৬৯১-৭৫১ হি.)
হাম্বলি মাজহাবের অনেক বড়ো একজন ইমাম। ফিকহ, হাদিস, তাফসির, সিরাত, আত্মশুদ্ধি ও সাহিত্যসহ বহু শাস্ত্রে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির জন্য সকল মতাদর্শের মুসলিমের কাছে তিনি অনুসরণীয়। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর ফিকহি মতামত সমর্থনের জন্য তাঁকেও ওস্তাদের সাথে ৭২৬ হিজরিতে কারাবরণ করতে হয়। তাঁর বিখ্যাত রচনাবলির মধ্যে রয়েছে-
১. জাদুল মাআদ
২. মাদারিজুস সালিকিন
৩. আলামুল মুআক্কিইন

ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) (৭০১-৭৭৪ হি.)
শাফেয়ি মাজহাবের বড়ো মাপের একজন ইমাম। তাফসির, উলুমে হাদিস ও ইতিহাসশাস্ত্রে তাঁর অপার পাণ্ডিত্য ছিল। তাঁর রচিত জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থগুলো শাস্ত্রীয় আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি-
১. আল বিদআ ওয়ান নিহায়া, ১৫ খণ্ডে প্রকাশিত
২. তাফসিরে ইবনে কাসির, ৯ খণ্ডে প্রকাশিত
৩. জামিউস সুনানি ওয়াল মাসানিদ, ১০ খণ্ডে প্রকাশিত

এ ছাড়া হাফিজুদ্দুনিয়া ইমাম মিজি (রহ.) (৬৫৪-৭৪২ হি.) ও ইমাম ইবনে মুফলিহ (রহ.) (৭০৮-৭৬৩ হি.)-এর মতো অসংখ্য যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর দারসের বরকত লাভ করেছেন। তাঁরা সকলেই নিজ নিজ কিতাবে শাইখের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

রচনাবলি
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় পাঁচ শতাধিক।১১ তার মধ্য হতে সমধিক বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর তালিকা পেশ করছি-
১. মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩৭ খণ্ডে প্রকাশিত
২. ইকতিজাউস সিরাতিল মুসতাকিম
৩. রাফউল মালাম আন আইম্মাতিল আলাম
৪. আল ফুরকান বাইনাল হাক্কি ওয়াল বাতিল
৫. আত-তাওয়াসসুল ওয়াল ওয়াসিলাহ
৬. আল আকিদাতুল ওয়াসিতিয়্যাহ
৭. আল জাওয়াবুস সাহিহ লিমান বাদ্দালা দিনাল মাসিহ ইত্যাদি。

টিকাঃ
১. উসমানি খিলাফতের সময় ধর্মীয় সর্বোচ্চ পদাধিকারীকে 'শাইখুল ইসলাম' বলা হতো। ১৬ শতকের মধ্যভাগে এই পদটির ক্ষমতা অনেকগুণ বেড়ে যায়। শাসকগণ ধর্মীয় বিষয়াদির বাইরেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সাথে পরামর্শ করতেন। তবে উসমানি খিলাফতের পূর্বে আলিমগণ কুরআন ও হাদিসের অগাধ পাণ্ডিত্য এবং মুসলিম সমাজে ধর্মীয় বিষয়ে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিকে 'শাইখুল ইসলাম' উপাধিতে ভূষিত করতেন।
২. ইমাম শাওকানি (রহ.) (১১৭৩-১২৫৫ হি.)-এর জগদ্বিখ্যাত নাইনুল আওতার কিতাবটি মূলত এই গ্রন্থটিরই ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
৩. সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস, ২/৩৮
৪. আল কাওয়াকিবুদ দুররিয়‍্যাহ, পৃষ্ঠা-২
৫. ইবনে তাইমিয়া, ইমাম আবু জাহরা, পৃষ্ঠা-২১
৬. আল বিদাআ ওয়ান নিহায়া (১৩/৩০৩)
৭. কাজান ছিলেন চেঙ্গিজ খানের প্রপৌত্র। ৬৯৪ হিজরিতে আমির তুজুন (রহ.)-এর দাওয়াতি তৎপরতায় ইসলাম কবুল করলেও পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত পরিসরে তার চারিত্রিক পরির্বতন সূচিত হয়নি। তার মুসলিম নাম ছিল মাহমুদ।
৮. পৃষ্ঠা ৫৭, আল ওয়াবিলুস সায়্যিব, ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)
১. আবুল হাসান আলি নদবি (রহ.), সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস (২/৪৩)
১০. আল বিদাআ ওয়ান নিহায়া (১৪/৫৪)
১১. আল উলামাউল উজ্জাব, আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ, পৃষ্ঠা-৯৯

📘 খিলাফত ও রাজতন্ত্র ইতিহাস ও পর্যালোচনা > 📄 আনুগত্যের মূলনীতি

📄 আনুগত্যের মূলনীতি


আল্লাহ, রাসূল ও শাসকের আনুগত্য ওয়াজিব
আল্লাহ ও রাসূল -এর আনুগত্যের সংক্ষিপ্ত মূলনীতি হলো—‘আল্লাহর আনুগত্য ও শাসকের আনুগত্য করা এবং শাসকের কল্যাণ কামনা করা ওয়াজিব।’ তাই যেসব বিষয়ে আল্লাহ ও রাসূল আনুগত্য ও সহযোগিতার আদেশ দিয়েছেন, সেসব বিষয়ে আনুগত্য করা এবং (তাদের শাসনকার্যে) সহযোগিতা করা প্রতিটি মানুষের জন্য অন্যান্য ওয়াজিবের মতোই সদা আবশ্যক। আল্লাহ বলেন—

إِنَّ اللهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمْنَتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا -

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের যার যা প্রাপ্য (আমানত), তা পরিশোধ করার আদেশ দিচ্ছেন এবং যখন তোমরা লোকেদের মাঝে বিচারকার্য করবে, তখন ন্যায়ভিত্তিক বিচার করবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ কতই-না সুন্দর উপদেশ দেন! নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।’ সূরা নিসা: ৫৮

আল্লাহ আরও বলেন-
يَأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَ أَطِيعُوا الرَّسُوْلَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا -

'হে মুমিনগণ! আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসূলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যকার শাসকদের অনুসরণ করো। আর তোমাদের মাঝে কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য হলে তা আল্লাহ ও রাসূলের কাছে সোপর্দ করে দাও; যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের ওপর বিশ্বাস করো। এটাই কল্যাণকর ও উত্তম সমাধান।' সূরা নিসা: ৫৯

সুতরাং আল্লাহ মুমিনদের আদেশ দিয়েছেন-আল্লাহর, রাসূলের ও শাসকদের আনুগত্য করতে। পাশাপাশি হকদারের হক আদায় করার এবং পারস্পরিক বিচারকার্যে ন্যায়ভিত্তিক ফয়সালা করার। একই সঙ্গে পারস্পরিক বিবদমান বিষয়কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে সোপর্দ করারও আদেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ ও রাসূলের কাছে সোপর্দ করার পদ্ধতি
আলিমগণ বলেন-আল্লাহর কাছে সোপর্দ করার অর্থ: আল্লাহর কিতাবের দ্বারস্থ হওয়া। আর রাসূলের মৃত্যুর পর তাঁর কাছে সোপর্দ করার অর্থ হচ্ছে, রাসূলের সুন্নাহর দ্বারস্থ হওয়া। আল্লাহ বলেন-

كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً، فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّنَ مُبَشِّرِينَ وَ مُنْذِرِينَ - وَأَنْزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيْهِ وَ مَا اخْتَلَفَ فِيْهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنْتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ فَهَدَى اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا لِمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ وَاللَّهُ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ -

'মানবকুল এক গোত্রভুক্ত ছিল। তারপর আমি তাদের মাঝে নবিদের সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছি।

আর তাঁদের সাথে সত্যসহ কিতাব দিয়েছি মানুষের মাঝে মতভেদপূর্ণ বিষয়ে মীমাংসা করার জন্য। অথচ কিতাবপ্রাপ্তরা তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণাদি আসার পরও পারস্পরিক বিদ্বেষবশত মতভেদে লিপ্ত হয়। অতঃপর আল্লাহ অনুগ্রহ করে বিশ্বাসীদের তাদের মতভেদপূর্ণ বিষয়ে সত্য পথের দিশা দেন। আল্লাহ যাকে খুশি সঠিক পথের দিশা দেন।' সূরা বাকারা: ২১৩

আল্লাহ তাঁর নাজিলকৃত কিতাবকেই মানুষের মতভেদপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসাকারী বানিয়েছেন।

সহিহ মুসলিম ও অন্যান্য কিতাবে আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবিজি রাতের নামাজে বলতেন- 'হে জিবরাইল, মিকাইল ও ইসরাফিলের প্রতিপালক! হে আসমান-জমিনের সৃষ্টিকর্তা! হে দৃষ্টাদৃষ্টের জ্ঞানী! তোমার বান্দাদের মাঝে মতভেদপূর্ণ বিষয়ে মীমাংসা করো। আমাকে তোমার অনুগ্রহে সত্য পথের দিশা দাও। নিশ্চয় যাকে খুশি তুমি সঠিক পথের দিশা দাও।'১২

সহিহ মুসলিমে তামিম দারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন- 'হিতচর্চাই (কল্যাণ কামনা) দ্বীন, হিতচর্চাই দ্বীন, হিতচর্চাই দ্বীন।' সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন-'কার হিতচর্চা হে আল্লাহর রাসূল!' রাসূল বললেন-'আল্লাহর, তাঁর কিতাবের, তাঁর রাসূলের, মুসলিম শাসকদের এবং জনগণের হিতচর্চা।'১৩

সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে আরেকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, রাসূল বলেন- 'তোমাদের জন্য তিনটি কাজকে প্রশংসনীয় করা হয়েছে। এক. আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করা।

দুই. আল্লাহর রশিকে সবাই একত্রে ধারণ করা এবং বিভক্ত না হওয়া। তিন. আল্লাহ যাদেরকে তোমাদের শাসক বানিয়েছেন, তাদের হিতচর্চা করা। ১৪

আরেকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে ইবনে মাসউদ ও জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) থেকে, যেখানে রাসূল বলেন-

'যে আমাদের নিকট থেকে হাদিস শুনে তাদের নিকট পৌছে দেয়, যারা হাদিস শোনেনি; আল্লাহ তাকে সমৃদ্ধশালী করুন। অনেক লোক আছে-যারা নিজের থেকে অধিক জ্ঞানী ফকিহের নিকট ফিকহ পৌঁছে দেয়। ফিকহের অনেক বহনকারী আছে, যে ফকিহ নয়। তিনটি বিষয় যেন কোনো মুসলিমের মনকে ধোঁকায় না ফেলে-ইখলাসের সাথে আল্লাহর ইবাদত, শাসকদের হিতচর্চা বা কল্যাণ কামনা এবং মুসলিমদের দলের সাথে থাকা। কারণ, তাদের দুআ পেছন থেকে তাদের ঘিরে থাকে।'১৫

এখানে বর্ণিত তিনটি বিষয় এবং পূর্বের হাদিসে বর্ণিত তিনটি বিষয় অভিন্ন। পূর্বের হাদিসে এসেছে-
১. আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করা।
২. আল্লাহর রশিকে সবাই একত্রে ধারণ করা এবং বিভক্ত না হওয়া।
৩. আল্লাহ যাদের শাসক বানিয়েছেন, তাদের কল্যাণ কামনা বা হিতচর্চা করা।

সুতরাং আল্লাহ যখন এ তিনটি বিষয়কে পছন্দ করেন, তখন আল্লাহর পছন্দনীয় বস্তুকে পছন্দ করাই যার আরাধ্য, তার অন্তর এ বিষয়গুলো সম্পর্কে ধোঁকা, অপছন্দ ও বিরাগের শিকার হবে না; বরং মুমিনের অন্তর তাকে আনন্দচিত্তে গ্রহণ করবে।

'আনসারদের কেউ রাসূল -এর সাথে একাকী দেখা করে বলল-"আপনি কি আমাকে কাজে নিযুক্ত করবেন না, যেমনটা অমুককে করেছেন?" জবাবে রাসূল বললেন-"নিশ্চয়ই তোমরা আমার পরে স্বজনপ্রীতি দেখতে পাবে। অতএব, হাউজে কাওসারে আমার সাথে সাক্ষাৎ পর্যন্ত তোমরা ধৈর্য ধরো।"'১৯

ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে সহিহাইনে আরও এসেছে, রাসূল বলেন- 'নিশ্চয়ই আমার পরে স্বজনপ্রীতি ও এমন কিছু বিষয় পাবে- যা তোমাদের কাছে গর্হিত মনে হবে।' সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের ভেতর কেউ সে যুগ পেলে আপনি তাঁকে কী আদেশ দেবেন?' রাসূল বললেন- 'তোমাদের ওপর অন্যের যে হক আছে, তা আদায় করো। আর অন্যের কাছে তোমাদের যে হক আছে, তার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করো।'২০

সহিহ মুসলিমে ওয়াইল ইবনে হুজর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে- 'সালামা জুফি (রা.) রাসূল -কে জিজ্ঞেস করলেন-“হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের শাসক যদি এমন হয়-যে আমাদের কাছে তার হক ঠিকই চায়, কিন্তু আমাদের হক দিতে অসম্মতি জানায়, তাহলে আপনার নির্দেশ কী?" রাসূল মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সাহাবি আবার জিজ্ঞেস করল, রাসূল মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তারপর দ্বিতীয়বার অথবা তৃতীয়বারও জিজ্ঞেস করল। আশআস ইবনে কাইস (রা.) তাঁকে একপাশে এনে বললেন- "তখনও শাসকের কথা শুনতে হবে এবং মানতে হবে। কারণ, তারা যা করবে, তার বোঝা তাদের টানতে হবে। আর তোমরা যা করবে, তার বোঝা তোমাদের বহন করতে হবে।"২১

মোটকথা, শাসক স্বজনপ্রীতি করলেও আল্লাহ ও রাসূল শাসকের আনুগত্যকে মুসলিমদের ওপর ওয়াজিব করেছেন। আর যা কিছু আল্লাহ ও রাসূল হারাম করেছেন-তা হারাম; যদিও কাউকে তা করতে বাধ্য করা হয়। অর্থাৎ হারাম কাজ বা আল্লাহর নাফরমানি করতে শাসক আদেশ দিলে তা মানা যাবে না, তা হারামই থাকবে।

প্রতিশ্রুতি বহির্ভূত হলেও ভালো কাজে শাসকের আনুগত্য ওয়াজিব
(জনগণ শপথ নিক আর না নিক, সর্বাবস্থায় শাসকের আনুগত্য করা ওয়াজিব।)
আল্লাহ ও রাসূল -এর আদেশ অনুযায়ী, শাসক জনগণের নিকট থেকে আনুগত্য ও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি বা বাইয়াত গ্রহণ করুক আর না করুক, শাসকের আনুগত্য করা জনগণের জন্য ওয়াজিব; যেমনিভাবে বাইয়াত গ্রহণ না করলেও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জাকাত, রোজা, হজ ইত্যাদি ইবাদত বান্দার ওপর ওয়াজিব।

আর যদি শাসক জনগণের নিকট থেকে আনুগত্য ও সহযোগিতার শপথ নেন, তাহলে ধরে নেওয়া হবে, তিনি এই সংক্রান্ত আল্লাহ ও রাসূলের আদেশকে অধিক গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন এবং তার ওপর অবিচল থেকেছেন; চাই সেই শপথ আল্লাহর নামে হোক কিংবা মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত অন্য কোনো পন্থায় হোক। কেননা, শাসকের আনুগত্য ও সহযোগিতা করা শপথ ব্যতীত এমনিতেই ওয়াজিব। উপরন্তু যদি শপথ নেওয়া হয়, তাহলে তা বলা বাহুল্য। তাই আল্লাহ ও রাসূল শাসকদের সাথে প্রতারণা, বাগাওয়াত বা অবাধ্যাচরণের যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন (বা হারাম বলেছেন), তা শপথ না নিলেও বলবৎ থাকবে।

যেমন: ধরুন কেউ শপথ করল-সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে, রমজানের রোজা রাখবে, অন্যের হক আদায় করবে এবং সত্য সাক্ষ্য দেবে, অথচ এগুলো শপথ ছাড়াই তার ওপর ওয়াজিব ছিল। এখন শপথের মাধ্যমে সে এটাকে নিজের ওপর পূর্বাপেক্ষা বেশি আবশ্যক করে নিল। তেমনিভাবে শিরক করা, মিথ্যা বলা, মদ পান করা, জুলুম করা, অশালীন কর্ম করা, শাসকের সাথে প্রতারণা করা এবং শাসকের অনুসরণীয় বিষয়ে তাকে না মানা ইত্যাদি বিষয়গুলো এমনিতেই হারাম। 'এসব কাজ কখনো করব না' -এমন শপথ ছাড়াই এগুলো হারাম। এখন যদি কেউ এসব কাজ না করার শপথ করেই ফেলে, তাহলে তো বলাই বাহুল্য।

শাসকের আনুগত্য, কল্যাণ কামনা, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, আমানত আদায় করা, ইনসাফ করা ইত্যাদি বিষয়ে আল্লাহ ও রাসূল যে আদেশ দিয়েছেন, তা যদি কসমকারী ব্যক্তি পালন না করে, তবে তার ওপর কসম ভঙ্গের ফতোয়া প্রযোজ্য হবে না (বরং ওয়াজিব ভঙ্গের ফতোয়া প্রযোজ্য হবে)। সে কসমের খেলাফ করেছে-এমন ফতোয়া দেওয়াও যাবে না এবং এ বিষয়ে ফতোয়া জিজ্ঞেস করাও যাবে না। আর যে মুফতি তাকে কসম ভঙ্গ করেছে মর্মে ফতোয়া দেবে এবং কসম ভঙ্গ করেছে বলবে, সে মূলত আল্লাহর ওপর অপবাদ আরোপ করবে এবং অনৈসলামি পন্থায় ফতোয়া দেবে। কারণ ব্যাবসা, বিয়ে, ভাড়া ইত্যাদি বিষয়ে চুক্তি কসম খাওয়া ছাড়াই অবশ্য পালনীয়।

জোরপূর্বক অনৈতিকভাবে কারও নিকট থেকে শপথ নেওয়া
জমহুর আলিমগণ বলেন- 'জোরপূর্বক কারও নিকট থেকে কসম নেওয়া হলে কসম সংঘটিত হবে না; চাই সে কসম আল্লাহর নামে হোক কিংবা তালাক, দাসমুক্তি বা মান্নতের কসম হোক।' এটা ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ (রহ.)-এর মত। কিন্তু যদি শাসক জনগণকে তার আনুগত্য ও সহযোগিতার জন্য বাধ্য করে এবং তাদের থেকে কসম নেয়, তাহলে তাতে আল্লাহ ও রাসূলের আদেশ অমান্য হবে না। এই কসম ভাঙাও যাবে না। কারণ, যে বিধান কসম ছাড়াই ওয়াজিব, তাকে কসম তো কেবল মজবুতই করতে পারে; দুর্বল করতে পারে না। যদি তাকে অপারগ ধরে নিই, তবুও না।

আর শাসক প্রায়শই জনগণের নিকট থেকে শপথ বা প্রতিশ্রুতি নিয়ে থাকে বলে যারা দাবি তোলেন-সর্বাবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু কসমের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি পূরণ করা অবশ্য পালনীয়, তাদের বলব-জোরপূর্বক কসম করানোর ক্ষেত্রে তোমাদের মতামতটি তোমাদেরই বিপক্ষে যায়। কেননা, তোমাদের বক্তব্য হলো-জোরপূর্বক যে কসম করানো হয়, তা পালন করা বা পূরণ করা আবশ্যক নয়; যদিও সে কসমটি শাসক গ্রহণ করে। এ ছাড়াও 'হিলাবিষয়ক' বহু মাসয়ালায় আল্লাহ, রাসূল ও শাসকের অবাধ্যতা থাকা সত্ত্বেও এই জোরপূর্বক কসমের পক্ষে ফতোয়া দেওয়া হয়।

তবে এটা সত্য যে, ইলম ও আমলওয়ালা পরহেজগার আলিমগণ কখনোই আল্লাহর আদেশকে উপেক্ষা করে শাসকের বিরুদ্ধে অবাধ্যতা, প্রতারণা ও বিদ্রোহ করাকে বৈধ মনে করেন না। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের প্রাচীন ও আধুনিক ইতিহাস তার সাক্ষী।

শাসকের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং শরয়ি চুক্তি ভঙ্গ করা হারাম
ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন- 'কিয়ামতের দিন প্রত্যেক গাদ্দারের পেছনে তার গাদ্দারি অনুযায়ী পতাকা স্থাপন করা হবে। ' ২২

সবচেয়ে বড়ো গাদ্দারি হলো শাসকের সাথে গাদ্দারি করা। মদিনার একটি গোত্র যখন শাসকের সাথে বিদ্রোহ ও গাদ্দারি করে বসল, তখন এই হাদিসটি ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন। সহিহ মুসলিমে নাফি (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- 'ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া (রা.)-এর সময়ে যখন গোলযোগ চলছিল, তখন আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) আবদুল্লাহ ইবনে মুতি (রা.)-এর কাছে এলেন। ইবনে মুতি (রা.) বললেন- "আবু আবদুর রহমানকে (ইবনে উমর রা.) বসার গদি এগিয়ে দাও।” ইবনে উমর (রা.) বললেন- “আমি বসতে আসিনি; আমি এসেছি তোমাকে একটি হাদিস শোনাতে। রাসূল -কে আমি বলতে শুনেছি-যে লোক শাসকের সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে, কিয়ামতের দিন সে সাক্ষী-সাবুতহীন হয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে। আর যে লোক বাইয়াতের বন্ধনহীন হয়ে মারা গেল, সে জাহেলি মৃত্যুবরণ করল।”২৩

সহিহাইনে এসেছে, ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল বলেন- 'কারও যদি শাসকের কোনো অপছন্দনীয় কাজ দৃষ্টিগোচর হয়, তাহলে তার ধৈর্য ধরা উচিত। কেননা, কেউ যদি শাসকের সাথে বিদ্রোহ করার অল্প কিছুক্ষণ পরেই মারা যায়, তাহলেও সে জাহেলি মৃত্যুর শিকার হবে। ২৪

সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন- 'যে লোক শাসকের আনুগত্য থেকে বের হয়ে গেল এবং সমাজবিচ্ছিন্ন বা জামাত থেকে বিভক্ত হয়ে মারা গেল, সে জাহেলি মৃত্যুবরণ করল। আর যে লোক অস্বচ্ছ পতাকাতলে আসাবিয়্যাত বা প্রান্তিকতার বশবর্তী হয়ে যুদ্ধ করে কিংবা প্রান্তিকতার প্রতি আহ্বান করে অথবা প্রান্তিকতার মদদ জোগাতে মৃত্যুবরণ করে, সে জাহেলি মৃত্যুবরণ করল। ২৫

'যে আমার উম্মতের ওপর চড়াও হয়ে ভালো ও মন্দ লোকদের হামলা করে; এমনকী মুমিনদেরও ছাড় দেয় না এবং জিম্মিদের হক নষ্ট করে, সে আমার উম্মত নয়। তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমার সাথেও তার কোনো সম্পর্ক নেই। ২৬

উপরিউক্ত হাদিসে নবিজি তিন ধরনের লোকদের কথা বলেছেন। প্রথম ব্যক্তি, যে শাসকের আনুগত্য থেকে বের হয়ে গেছে এবং দলবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

দ্বিতীয় ব্যক্তি, যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের বদলে ক্ষমতার লোভ ও প্রান্তিকতার বশবর্তী হয়ে হত্যাকর্মে লিপ্ত হয় প্রবৃত্তিপূজারিদের মতো তথা বাতিলপন্থিদের মতো। যেমন: কায়েস ও ইয়ামন গোত্রের লোকেরা।

তৃতীয় ব্যক্তি, যারা মুসলিম জিম্মিদের মাল ডাকাতি করে নেয় এবং যাদের বিরুদ্ধে আলি (রা.) জিহাদ করেছেন, সেই খারেজিদের হারুরি গোষ্ঠীর লোকেরা। রাসূল তাদের সম্পর্কে বলেছেন- 'তোমাদের মধ্যে এমন লোক হবে, যারা তোমাদের সাথে নামাজ-রোজা আদায় করা এবং কুরআন তিলাওয়াত করাকে অপমানজনক মনে করবে। কুরআন তাদের গলা দিয়ে নামবে না। তির যেভাবে ধনুক থেকে বের হয়, ইসলাম থেকে তারা সেভাবে বের হয়ে যাবে। তোমরা তাদের যেখানেই পাবে, হত্যা করবে। কারণ, তাদের যে হত্যা করবে, তাকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন প্রতিদান দেবেন। ২৭

শাসক কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস হলেও আনুগত্য আবশ্যক
শাসক কালো নিগ্রো দাস হলেও রাসূল ﷺ তার আনুগত্যের আদেশ দিয়েছেন। বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে- 'যদি তোমাদের ওপর এমন শাসক নিয়োগ দেওয়া হয়-যে কালো কুৎসিত এবং মাথায় ঘা আছে, তবুও তার কথা শোনো এবং মানো। '২৮

আবু জর গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- 'আমার বন্ধু আমাকে অসিয়ত করেছে যে, তোমাদের শাসক হাত-পাহীন কালো হাবশি দাস হলেও তার কথা শোনো এবং মানো।'

বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে- 'যদিও সেই শাসক এমন কালো নিগ্রো দাস হয়, যার মাথাকে ঘায়ের মতো মনে হয়। '২৯

সহিহ মুসলিমে উম্মুল হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-'আমি রাসূল ﷺ-কে বিদায় হজের সময় বলতে শুনেছি- “যদি কোনো ক্রীতদাস তোমাদের কিতাবুল্লাহ মোতাবেক শাসন করে, তোমরা তার কথা শোনো এবং মানো। (আরেক বর্ণনায় এসেছে কালো হাত-পাহীন ক্রীতদাস)। "'৩০

সৎ ও অসৎ শাসক কারা, কখন তাদের মানা যাবে না
আওফ ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল বলেন— 'তারাই সর্বোত্তম শাসক, যারা জনগণকে ভালোবাসে এবং জনগণও যাদের ভালোবাসে। যারা জনগণের জন্য দুআ করে এবং জনগণও যাদের জন্য দুআ করে। আর নিকৃষ্ট শাসক তারাই, যারা জনগণকে ভালোবাসে না এবং জনগণও তাদের ভালোবাসে না। যারা জনগণকে বদদুআ করে এবং জনগণও তাদের জন্য বদদুআ করে। আমরা (সাহাবিরা) বললাম- "আমরা কি তখন তাদের সাথে তলোয়ারের মাধ্যমে ফয়সালা করব?" নবিজি বললেন-“না, যতক্ষণ তারা তোমাদের মাঝে নামাজ কায়েম করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত না। জেনে রেখ! শাসক নিযুক্ত হওয়ার পর যদি কেউ শাসকের কোনো পাপ কাজ দেখতে পায়, তাহলে সেই পাপ কাজকে শুধু অপছন্দ করবে; কিছুতেই সে শাসকের আনুগত্য থেকে বের হতে পারবে না।"'৩১

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল বলেন- 'নিশ্চয়ই ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিগণ কিয়ামতের দিন নুরের মিম্বরে আল্লাহর ডানে অবস্থান করবেন। আর আল্লাহর উভয় দিকই ডান। ন্যায়পরায়ণ তাঁরাই, যারা বিচারকাজে ইনসাফ করে; পরিবারের সাথে ইনসাফ করে; সর্বোপরি তাঁর ওপর ন্যস্ত যাবতীয় বিষয়ে ইনসাফ করে।'৩২

সহিহ মুসলিমে আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল -কে বলতে শুনেছেন- 'হে আল্লাহ! যে আমার উম্মতের শাসনভার গ্রহণ করার পর তাদের সাথে কঠোরতা করে, তুমি তার সাথে কঠোরতা করো। আর যে আমার উম্মতের ওপর কোমল আচরণ করবে, তুমি তার সাথে কোমল আচরণ করো।'৩৩

সহিহাইনে হাসান বসরি (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন- 'মাকিল ইবনে ইয়াসার (রা.)-এর অসুখের সময় আবদুল্লাহ ৩৪ ইবনে জিয়াদ (রা.) তাঁকে দেখতে যান। পরে এই রোগে মাকিল (রা.) মারা গিয়েছিলেন। মাকিল ইবনে ইয়াসার (রা.) আবদুল্লাহকে বললেন-"তোমাকে একটি হাদিস শোনাব, যা আমি রাসূল থেকে শুনেছি। নবিজি বলেন- 'কোনো বান্দাকে জনগণের শাসনভার দেওয়ার পর সে যদি জনগণের ওপর জুলুমরত অবস্থায় মারা যায়, তাহলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।"'৩৫

সহিহ মুসলিমে আরেকটি হাদিস এসেছে- 'কেউ যদি শাসক হওয়ার পর জনগণের কল্যাণ ও হিতচর্চার জন্য কোনো শ্রম না দেয়, তাহলে সে জনগণের সাথে জান্নাতে যেতে পারবে না।'৩৬

ভালো কাজে শাসকের আনুগত্য করতে হবে
ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন- 'জেনে রাখো! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই অধীনস্থের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল; পরিবার সম্পর্কে সে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন মহিলা তার স্বামীর ঘরের ব্যাপারে দায়িত্বশীল; এ বিষয়ে সে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন দাস তার মুনিবের সম্পদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল; তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে। অতএব, জেনে রাখো! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের দায়িত্বাধীন ও আওতাধীন বিষয় সম্পর্কে তোমরা সকলেই জিজ্ঞাসিত হবে।'৩৭

আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- 'রাসূলুল্লাহ একটি সেনাবাহিনী পাঠালেন এবং এক ব্যক্তিকে তার আমির নিযুক্ত করে দিলেন। আমির একটি অগ্নিকুণ্ড প্রস্তুত করলেন এবং অধীনস্থদের তাতে ঝাঁপ দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। একদল লোক তাতে ঝাঁপ দিতে প্রস্তুতি নিল। কিন্তু অপর একদল বলল-"আমরা (ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে তো) আগুন থেকেই পালিয়ে এসেছি। সুতরাং আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।” যথাসময়ে রাসূল-এর দরবারে সে ব্যাপারটি উত্থাপিত হলো। যারা আগুনে ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত হয়েছিল, তাদের লক্ষ করে নবিজি বললেন- "যদি তোমরা আগুনে প্রবেশ করতে, তবে কিয়ামত পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করতে।" অপর দলকে লক্ষ করে তিনি ভালো কথা বললেন। তিনি বললেন-"আল্লাহর অবাধ্যতা হয় এমন কাজে আনুগত্য নেই। আনুগত্য কেবলই ভালো কাজে।"'৩৮

আনুগত্য আল্লাহর জন্য; দুনিয়ার জন্য নয়
মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ -

'আমি মানুষ ও জিনকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য।' সূরা জারিয়াত: ৫৬

তিনি আরও বলেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ -

'আমি সকল রাসূলকে পাঠিয়েছি কেবল আল্লাহর আদেশের আনুগত্য করার জন্য।' সূরা নিসা: ৬৪

مَنْ يُطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ -

'যে রাসূলের আনুগত্য করে, সে আল্লাহর আনুগত্য করে।' সূরা নিসা : ৮০

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -

'আপনার রবের কসম! তারা কখনোই মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের বিবদমান বিষয়ে আপনাকে বিচারক মানবে এবং আপনার ফয়সালার বিষয়ে তাদের মনে কোনো প্রকার সংকোচ থাকবে এবং হৃষ্টচিত্তে তা মেনে না নেবে।' সূরা নিসা : ৬৫

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ -

'হে নবি! আপনি বলুন- "যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে ভালোবাসো। তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন। তোমাদের গুনাহ মাফ করে দেবেন।"' সূরা আলে ইমরান: ৩১

يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَلَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأطَعْنَا الرَّسُولَا وَقَالُوا رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلَا - رَبَّنَا آتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيرًا -

'যেদিন তাদের চেহারাকে জাহান্নামের আগুনে নাড়াচাড়া করা হবে, তারা বলবে-“হায়! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম! রাসূলের আনুগত্য করতাম!” তারা বলবে-“হে আমাদের রব! আমরা তো আমাদের নেতা ও গুরুজনদের আনুগত্য করেছি। ফলত তারা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছে। হে আমাদের রব! তুমি তাদের আজাবকে দ্বিগুণ করে দাও এবং তাদের ওপর মহা অভিশাপ দাও।"' সূরা আহজাব : ৬৬-৬৮

وَ مَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُوْلَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّنَ وَ الصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصُّلِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا -

'যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে, তারা কিয়ামতের দিন নবি, সত্যনিষ্ঠ, শহিদ, সৎকর্মপরায়ণ ও নিয়ামতপ্রাপ্ত মানুষদের সাথে থাকবে। আর তাঁরা কতই-না উত্তম বন্ধু!' সূরা নিসা : ৬৯

অতএব, আল্লাহ ও রাসূল -এর আনুগত্য করা প্রত্যেকের ওপর ওয়াজিব। আল্লাহ শাসকদের আনুগত্যের আদেশ দিয়েছেন। তাই তাদের আনুগত্য করাও ওয়াজিব। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূল -এর আনুগত্য করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর হাতে। যে লোক সম্পদ ও ক্ষমতার লোভে শাসকদের আনুগত্য করবে- তথা শাসক সম্পদ ও ক্ষমতা প্রদান করলে আনুগত্য করবে, অন্যথায় করবে না, তাহলে তার জন্য আখিরাতে কোনো কল্যাণ নেই।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেছেন- 'তিন রকম লোকের সঙ্গে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা কথা বলবেন না এবং তাদের পবিত্রও করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।'

এক. ওই ব্যক্তি, যে অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত পানির মালিক হওয়া সত্ত্বেও নির্জন জায়গায় আগন্তুক মুসাফিরকে পানি পান করতে দেয় না।

দুই. ওই ব্যক্তি, যে আসরের পর অন্য লোকের নিকট দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয় করতে গিয়ে এমন কসম খায়- “আল্লাহর শপথ! এটার এত দাম হয়েছে।” ক্রেতা সেটাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে পণ্যটি কিনে নেয়, অথচ সে জিনিসের এত দাম নয়।

তিন. ওই ব্যক্তি, যে একমাত্র দুনিয়ার স্বার্থে ইমামের বাইয়াত গ্রহণ করে। শাসক তার মনের বাসনা পূর্ণ করলে সে বাইয়াত পূর্ণ করে। আর যদি তা না হয়, তাহলে বাইয়াত ভঙ্গ করে।'

টিকাঃ
১২. মুসলিম: ১৮৪৭, নাসায়ি: ১৬২৪, আবু দাউদ: ৭৬৭, ইবনে হিব্বান: ২৬০০
১০. মুসলিম: ৫৫, আবু দাউদ: ৪৯৪৪, নাসায়ি ৪১৯৭। সাধারণত 'নাসিহা' শব্দের তরজমা করা হয় 'কল্যাণ কামনা'। কিন্তু 'আল্লাহর কল্যাণ কামনা' বিষয়টি অশোভনীয় ও অসৌজন্যমূলক। তাই আমরা তরজমা করেছি 'হিতচর্চা'।
১৪. মুসলিম: ১৭১৫
১৫. তিরমিজি: ২৬৫৬, আবু দাউদ: ৩৬৬০, নাসায়ি, সুনানে কুবরা: ৫৮৪৭, ইবনে মাজাহ: ৪১০৫
১৯. বুখারি: ৩৭৯৩, মুসলিম: ১০৫৯
২০. বুখারি: ৭০৫২, মুসলিম: ১৮৪৩
২১. মুসলিম: ১৮৪৬
২২. বুখারি: ৬১৭৯, মুসলিম: ১৭৩৫
২৩. মুসলিম: ১৮৫১
২৪. বুখারি: ৭১৪৩, মুসলিম: ৪৮৯৬
২৫. মুসলিম: ১৮৫০
২৬. মুসলিম: ১৮৪৮
২৭. বুখারি: ৩৬১১, মুসলিম: ১০৬৬
২৮. বুখারি: ৭১৪২
২৯. মুসলিম: ১৮৩৭, বুখারি: ৭১৪২
৩০. মুসলিম: ১৮৩৮
৩১. মুসলিম: ১৮৫৫
৩২. মুসলিম: ১৮২৭
৩৩. মুসলিম: ১৮২৮
৩৪. ইবনে তাইমিয়া (রহ.) 'আবদুল্লাহ' লিখেছেন। বুখারি ও মুসলিমে 'উবাইদুল্লাহ' এসেছে।
৩৫. বুখারি: ৭১৫০
৩৬. মুসলিম: ১৪২
৩৭. বুখারি: ৭১৩৮, মুসলিম: ১৮২৯
৩৮. বুখারি: ৭২৫৭, মুসলিম: ১৮৪০

📘 খিলাফত ও রাজতন্ত্র ইতিহাস ও পর্যালোচনা > 📄 খিলাফত ও রাজতন্ত্র

📄 খিলাফত ও রাজতন্ত্র


নবুয়তি খিলাফতের সময়সীমা এবং রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা
রাসূল বলেন-
'নবুয়তি খিলাফত ৩০ বছর থাকবে। তারপর আল্লাহ যাকে খুশি রাজত্ব দেবেন অথবা তাঁর রাজত্ব দেবেন।'

আবু দাউদের বর্ণনার শব্দগুলো আবদুল ওয়ারিস ও আওয়ামের সূত্রে এভাবে এসেছে-
'খিলাফত ৩০ বছর অব্যাহত থাকবে। তারপর রাজতন্ত্র কায়েম হবে। খিলাফত ৩০ বছর অব্যাহত থাকবে। তারপর খিলাফত রাজতন্ত্রে পরিণত হবে।'

এই বর্ণনাটি হাম্মাদ ইবনে সালামাহ আবদুল ওয়ারিস ইবনে সাইদ থেকে এবং আওয়াম ইবনে হাওশাব প্রমুখ সাইদ ইবনে জুমহান থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিস। তিনি রাসূল -এর দাসী সাফিনা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। আবু দাউদ প্রমুখ সুনান রচয়িতাদের অনেকেই এটা বর্ণনা করেছেন। ৩৯

বাতিলপন্থি ছাড়া সবাই আলি (রা.)-কে শেষ খলিফা মানেন।
ইমাম আহমদ (রহ.)সহ প্রমুখ ইমামগণ মনে করেন, আলি (রা.) চতুর্থ ও শেষ খলিফা ছিলেন। এটাই খুলাফায়ে রাশেদিন তথা সত্যনিষ্ঠ খলিফাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত ও প্রমাণিত সত্য। ইমাম আহমদ (রহ.) এটাকে প্রমাণিতও করেছেন। অতঃপর এ থেকে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, যারা আলি (রা.)-এর শেষ খলিফা হওয়ার বিষয়ে চুপ থাকবে কিংবা তাঁকে শেষ খলিফা মনে করবে না, তারা মূলত গাধাতুল্য। তাদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যাবে না। এটাই ফকিহ, সুন্নাহবিশারদ ও সুফিতাত্ত্বিকদের সর্বসম্মত মতামত। বলা ভালো, এটা সর্বসাধারণেরও অভিমত।

প্রকৃত অর্থে এ বিষয়ে তারাই দ্বিমত করেন, যারা প্রবৃত্তিপূজারি বা বাতিলপন্থি। এদের মধ্যে কতিপয় কালামশাস্ত্রবিদও আছেন। যেমন : রাফিজি সম্প্রদায়; যারা অবশিষ্ট তিন খলিফার খিলাফতের কুৎসা করে অথবা খারেজি সম্প্রদায়; যারা রাসূল -এর দুই জামাতা আলি ও উসমান (রা.)-এর খিলাফতের বিরূপ সমালোচনা করে কিংবা নাসিবি সম্প্রদায়; যারা আলি (রা.)-এর খিলাফতকে অস্বীকার করে। কিছু মূর্খ লোকও এই দলের অন্তর্ভুক্ত।

রাসূল -এর ইন্তেকাল এবং আমুল জামাত
হিজরি একাদশ বছরের রবিউল আউয়াল মাসে রাসূল ইন্তেকাল করেন। এর ঠিক ৩০ বছর পর হিজরি ৪১ সনের জুমাদাল উলা মাসে হাসান ইবনে আলি (রা.) মুসলিমদের দুই সম্প্রদায়ের মাঝে সন্ধির জন্য শাসনভার থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করেন। তখন সকল মুসলিম মুয়াবিয়া (রা.)-এর পতাকাতলে একত্রিত হয়। তাই একে আমুল জামাত বা দলবদ্ধতার বছর বলা হয়। এজন্য মুয়াবিয়া (রা.) ছিলেন রাজতন্ত্রের প্রথম পুরুষ।

নবুয়তি খিলাফতের পর কী হবে
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে-
'নবুয়তি খিলাফতের সাথে রহমত থাকবে। তারপর রাজা; তার সাথেও রহমত থাকবে। তারপর আসবে স্বেচ্ছাচারী রাজা। তারপর আসবে নিষ্ঠুর অত্যাচারী রাজা।'৪০

একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসূল বলেন-
'আমার পরে তোমাদের মধ্যকার জীবিতরা অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তোমরা আমার সুন্নাহ এবং আমার পরে হিদায়াতপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহ আঁকড়ে থেকো। খুব মজবুতভাবে তা ধারণ করো। নবোদ্ভূত বিষয় বা বিদআত থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা, প্রতিটা বিদআতই গোমরাহি।'৪১

রাজাদের খলিফা বলা যাবে কি
খুলাফায়ে রাশেদিন তথা প্রথম চার খলিফা ছাড়া অন্যদেরও খলিফা বলা যাবে; যদিও-বা তারা রাজা হন এবং যদিও অন্যান্য নবির কোনো খলিফা ছিল না। কারণ, সহিহাইনে একটি হাদিস আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল বলেন- 'বনি ইসরাইলকে শাসন করতেন নবিগণ। যখনই কোনো নবি ইন্তেকাল করতেন, তখনই তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন আরেকজন নবি। আর আমার পরে কোনো নবি নেই, তবে খলিফা থাকবে অনেক। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, “তখন আমাদের করণীয় কী?” প্রথম যে খলিফা বাইয়াত নেবেন, তাঁকেই তোমরা মানবে। তাঁর মৃত্যুর পরে যে প্রথমে বাইয়াত নেবে, তাঁকে মানবে এবং তাঁদের হক আদায় করবে। কেননা, তাঁদেরকে জনগণের হক সম্পর্কে আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন। '৪২

'খলিফা থাকবে অনেক' কথাটি দ্বারা বোঝা যায়-চার খলিফা ছাড়াও আরও খলিফা হবে। কেননা, চারজন তো অনেক নয়। তা ছাড়া 'প্রথম খলিফাকেই মানবে' কথাটি দ্বারা বোঝা যায়-খলিফাদের মধ্যে মতভেদ হবে। অথচ চার খলিফার মাঝে কোনো মতভেদ হয়নি। আর 'তাঁদের হক আদায় করবে। কেননা, তাঁদেরকে আল্লাহ জনগণের হক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন'-এটা দ্বারা বোঝানো হচ্ছে, শাসকদের হক আদায় করতে হবে গনিমতের মাল ও সম্পদ ইত্যাদি থেকে-যা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদাকে মজবুত করে।

জনগণের দায়িত্ব কী
আমি অন্যত্রে বলেছি-দেশের দুর্দশার জন্য কেবল শাসক, তাদের প্রতিনিধি, বিচারক ও আমলাদের দুর্বলতা বা ত্রুটিই দায়ী নয়; বরং শাসক-জনগণ উভয় পক্ষের দুর্বলতা ও ত্রুটিই এর জন্য দায়ী। কারণ, রাসূল ﷺ বলেছেন-
'তোমরা যেমন, তেমন শাসকই তোমাদের ওপর নিযুক্ত হবে।'৪৩
আল্লাহ বলেন-
وَكَذَلِكَ نُوَلِّي بَعْضَ الظَّالِمِينَ بَعْضًا بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'এভাবেই আমি কতিপয় জালিমের ওপরে কতিপয় জালিমকে শাসক নিযুক্ত করি।' সূরা আনআম: ১২৯

শাসকদের ভালো কাজে আনুগত্য করা
আমরা পূর্বেও আলোচনা করেছি, যেসব কাজে আল্লাহর অবাধ্যতা নেই, সেসব কাজে শাসকের আনুগত্য ও সহযোগিতা করা, তাদের বিচার ও বণ্টনে ধৈর্য ধরা এবং তাদের সাথে যুদ্ধে ও নামাজে শরিক হওয়া ভালো কাজের অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে তাদের তদারকি ছাড়া সংঘটিত হয় না এমন কাজে আনুগত্য করাও জরুরি। এসব কাজের মধ্য দিয়ে তো প্রকৃত অর্থে কুরআনে বর্ণিত 'ভালো ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো' বলতে যা বোঝানো হয়েছে, তা-ই করা হচ্ছে। আর যেসব কাজে তাদের আনুগত্য করতে নিষেধ করা হয়েছে, সেসবে তাদের আনুগত্য করা মানেই হচ্ছে-অন্যায় ও অবিচারের কাজে সহযোগিতা করা। যেমন: শাসকদের মিথ্যাকে সত্য মনে করা, জুলুমে সহযোগিতা করা, সর্বোপরি আল্লাহর নাফরমানিতে তাদের সাহায্য করা ইত্যাদি।

নবুয়তি খিলাফত সমাপ্তির দ্বারা রাসূল যা বুঝিয়েছেন
নবুয়তি খিলাফতের পর ইমারত গ্রহণ-বর্জন নিয়ে ভালো ও মন্দের যে বিবাদ দেখা দেয়, তা নিয়ে এখন আমরা আলোচনা করব। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়। কারণ, ৩০ বছর পর খিলাফত সমাপ্তির যে বক্তব্য, তাতে রাজতন্ত্রের নিন্দা ও দূষণীয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশেষত আবু বাকরা (রা.)-এর হাদিসটিতে। এ হাদিসটিতে আবু বাকরা (রা.)-এর স্বপ্নকে রাসূল অপছন্দ করেন এবং বলেন- 'নবুয়তি খিলাফতের পর হবে রাজতন্ত্র। আল্লাহ যাকে খুশি রাজত্ব দান করেন।'

ইমাম ও শাসক নির্ণয় এবং সৎকর্মপরায়ণ শাসকের উত্তম পরিণামের কথা যেসব আয়াত ও হাদিসে বলা হয়েছে, সেসব আয়াত ও হাদিসে নবুয়তি খিলাফতের পরে শাসক নির্ণয়ের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে এবং প্রশংসাও করা হয়েছে। তাই এখন আমাদের উচিত হলো-কখন খলিফা নির্ণয় দূষণীয় ও প্রশংসনীয়, তা খোলাসা করা। রাসূল বলেন-
'আল্লাহ আমাকে দুটি জিনিসের মধ্যে একটি নির্বাচনের অধিকার দিয়েছেন। আমি আল্লাহর "রাজা রাসূল” হব, নাকি “দাস রাসূল” হব। আমি "দাস রাসূল” হওয়াকে গ্রহণ করেছি। '৪৪

নবুয়তি খিলাফত কি ওয়াজিব
ইমারত বা শাসন, কাজা ও শাসক-এই তিন বিষয় রাষ্ট্রশাসনে বা রাষ্ট্র পরিচালনায় হাজির থাকা যদি মূল বিষয় হয়, তাহলে রাজতন্ত্র কি জায়েজ? আর খিলাফত কি মুস্তাহাব? নাকি পর্যাপ্ত বিদ্যা ও সামর্থ্যের অভাব ব্যতীত তা জায়েজ নেই? এক্ষেত্রে আমরা বলব, মূলত রাজতন্ত্র জায়েজ নয়। খিলাফত প্রতিষ্ঠা করাটাই ওয়াজিব। আমরা পূর্বে একটি হাদিস উল্লেখ করেছি। সেখানে 'আমার পরে তোমাদের মধ্যকার জীবিতরা অনেক মতভেদ দেখতে পাবে'-এই কথাটি বলার পর সেই পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী হবে, সে সম্পর্কে বলা হচ্ছে- 'তোমরা আমার সুন্নাহ এবং আমার পরে হিদায়াতপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহ আঁকড়ে থাকো। খুব মজবুতভাবে তা ধারণ করো। নবোদ্ভূত বিষয় বা বিদআত থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা, প্রতিটা বিদআতই গোমরাহি।'

সুতরাং এটা খলিফাদের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার একটি নির্দেশ এবং তার প্রতি উৎসাহ প্রদান। পাশাপাশি এটা খলিফাদের সুন্নাহ (খিলাফত) পরিপন্থি নবোদ্ভূত (রাজতন্ত্র) বিদআত সম্পর্কে একটি সতর্কবার্তা। তাই এই হাদিসে বর্ণিত খলিফাদের সুন্নাহর অনুসরণের আদেশ এবং বিদআত বর্জনের নির্দেশের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে খিলাফত ওয়াজিব।

উপরন্তু রাসূল ﷺ অন্য একটি হাদিসের মাধ্যমে আরেকটু নির্দিষ্ট করে বলেছেন- 'আমার পর তোমরা আবু বকর ও উমর-এই দুজনের অনুসরণ করবে।'৪৫

তাই তাঁরাও তাঁদের দুজনকে অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন। আর খুলাফায়ে রাশেদিন তাঁদের চারজনের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার কথা বলেছেন।

এখানে আবু বকর ও উমর (রা.)-কে নির্দিষ্টকরণটা দুইভাবে হয়েছে। এক. সুন্নাহ হলো, যে আমল তাঁরা দুজন সকলের জন্য ধার্য করেছেন। আর কুদওয়া হলো, তাঁরা কোনো আমলকে সুন্নাহ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও তাঁদের দুজনকে অনুসরণ করতে হবে।

দুই. সুন্নাহকে রাসূল খলিফাদের সাথে সম্বন্ধিত করেছেন; সব সাহাবির সাথে করেননি। তাই কেউ কেউ বলেন-সুন্নাহ হলো যে আমলের ব্যাপারে সাহাবিগণ একমত হয়েছেন; কতিপয় সাহাবির বিচ্ছিন্ন মতকে সুন্নাহ বলা যাবে না। আর কুদওয়া হওয়াটা এই দুজনের সাথে খাস বা এই দুজনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তবে এতে আপত্তির অবকাশ আছে।

এর থেকে বোঝা যায়, আলি ও উসমান (রা.) যে ইজতিহাদগুলো করেছিলেন, তারচেয়ে ভালো ইজতিহাদ আবু বকর ও উমর (রা.) করেছিলেন। নসুস ও জমহুরের মতৈক্য এই দুজনের সিদ্ধান্তের যথাযোগ্যতাকে সমর্থন করে। আর এর কারণ হলো-আলি ও উসমান (রা.)-এর সময় উম্মতের মাঝে সৃষ্ট বিভাজন। তাই তাঁদের অজুহাত দিয়ে উম্মাহর মাঝে বিভাজন তৈরির করার উদ্দেশ্যে তাঁদের অনুসরণ করা যাবে না। কারণ, বিভাজন খলিফাদের সুন্নাহ না।

তাই তো আমরা দেখতে পাই, আবু বকর ও উমর (রা.) উম্মতকে শাসন করেছেন উদ্দীপনা ও ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে। ৪৬ রক্তপাত ও সম্পদের বিষয়ে তাঁদের কোনো ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয়নি। উসমান (রা.)-এর মূলমন্ত্র ছিল উম্মতকে উৎসাহ ও উদ্দীপনার মাধ্যমে শাসন করা। তাই মালের ক্ষেত্রে অর্থাৎ সম্পদ বণ্টনের বিষয়ে তাঁকে ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে। ৪৭ আর আলি (রা.) শাসনের মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন ভীতিপ্রদর্শনকে। তাই তাঁকে রক্তপাত করার বিষয়ে বিশেষ ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে। উক্ত পর্যালোচনাকে সামনে রেখে আমরা বলতে পারি, সম্পদ বণ্টন ও উম্মতকে শাসন করা-এই উভয় ক্ষেত্রেই আবু বকর ও উমর (রা.)-এর খোদাভীতি চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। উসমান (রা.)-এর খোদাভীতি পূর্ণতা পেয়েছে ক্ষমতার ক্ষেত্রে। আলি (রা.)-এর খোদাভীতি পূর্ণতা পেয়েছে অর্থ-সম্পদ বণ্টনের বেলায়।

সর্বোপরি রাসূল -এর খিলাফতপরবর্তী রাজতন্ত্রকে অপছন্দ করাটাই প্রমাণ করে, এতে দিনের ওয়াজিবকে আংশিক পরিত্যাগ করা হয়েছে।

রাজতন্ত্রের হুকুম
যারা রাজতন্ত্রকে বৈধ বলেন, তাদের দলিল হলো-রাসূল মুয়াবিয়া (রা.)-কে বলেন-
'তুমি যদি কোনো রাষ্ট্রের মালিক বা রাজা হও, তাহলে উত্তমরূপে শাসন করো।'৪৮

তাদের অন্য আরেকটি দলিল হলো- 'একবার মুয়াবিয়া (রা.) রাজার পোশাকে শামে এলেন। উমর (রা.) তাঁকে দেখে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। মুয়াবিয়া (রা.) রাজকীয় শান-শওকত ও চাকচিক্য গ্রহণ করার প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করলেন। সব শুনে উমর (রা.) বললেন- “আমি তোমাকে এসব করতে নিষেধ করি না, আদেশও দিই না।”

এক্ষেত্রে কেউ কেউ বলেন-উমর (রা.) যেহেতু মুয়াবিয়া (রা.)-কে নিষেধও করেননি আবার আদেশও দেননি, তাই এর দ্বারা বোঝা যায়- মুয়াবিয়া (রা.) যে কারণ দর্শিয়েছেন, সেটা তাঁর মনঃপূত হয়নি। তাই এটা একটা নিছক ইজতিহাদ হিসেবে বিবেচ্য।

এক্ষেত্রে মধ্যমপন্থি মতামত হলো-খিলাফত ওয়াজিব। তবে প্রয়োজনমাফিক খিলাফত থেকে বের হওয়া যাবে অথবা এভাবে বলা যায়-শাসনের মূল উদ্দেশ্যটি যদি রাজতন্ত্রের মাধ্যমে হাসিল করা সহজ হয়, তাহলে তাকে গ্রহণ করা যায়। কারণ, যখন শাসনের মূল উদ্দেশ্য রাজতন্ত্র ব্যতীত হাসিল হওয়া কষ্টকর হয়, তখন রাজতন্ত্রকে বৈধকরণ ছাড়া উপায় নেই। সর্বোপরি রাজতন্ত্রকে আবশ্যক ও ঐচ্ছিক সাব্যস্ত করার বিষয়টা নিতান্তই ইজতিহাদি বিষয়।

এই বিষয়ে ইতিহাসে দুটি পক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রথমপক্ষ, এরা সর্বাবস্থায় এবং সব সময়ই সবার ওপর খিলাফত প্রতিষ্ঠা ওয়াজিব মনে করেন। তাই এই পক্ষটি মূলত যারা খিলাফতকে পরিত্যাগ করেছে, তাদেরও নিন্দা করেন। আবার যারা পরিস্থিতির শিকার হয়ে পরিত্যাগ করেছেন, তাদেরও নিন্দা করেন। এমনটাই বিদআতপন্থি খারেজি, মুতাজিলা ও সুফি সম্প্রদায়সহ আরও কয়েকটি সম্প্রদায় মনে করে।

দ্বিতীয়পক্ষ, এই দলটি মনে করে সর্বাবস্থাই রাজতন্ত্র বৈধ; চাই তা খলিফাদের সুন্নাহর পরিপন্থি হোক, আর পক্ষে হোক। যেমনটা জুলুমবাজ স্বৈরাচারী শাসক ও মুরজিয়াদের একটা গোষ্ঠী মনে করে। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে।

শাসনব্যবস্থাকে খিলাফত থেকে রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত করার পেছনে কয়েকটা সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে—
১. হয়তো নবুয়তি খিলাফত প্রতিষ্ঠায় জনগণের অক্ষমতা রয়েছে।
২. কিংবা কোনো গ্রহণযোগ্য ইজতিহাদ রয়েছে।
৩. অথবা খিলাফত প্রতিষ্ঠার আমলি ও ইলমি যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে না।

যদি ইলমি ও আমলি অপারগতার দরুন খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা না যায়, তাহলে রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাকারীকে অপারগ বা মাজুর হিসেবে বিবেচনা করা হবে। খিলাফত প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা থাকলে তা প্রতিষ্ঠা করা ওয়াজিব। তবুও যেহেতু অপারগতার দরুন শরিয়তের অনেক হুকুম রহিত হয়ে যায়, তেমনি এটাও রহিত হয়ে যাবে। যেমন: বাদশাহ ইসলাম গ্রহণ করা সত্ত্বেও তা প্রকাশ করতে পারেননি তাঁর সম্প্রদায়ের কারণে। তাঁর এই অবস্থাটা সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ.)-এর সাথে যথেষ্ট সাদৃশ্য রাখে। তবে এখানে মনে রাখতে হবে, কতিপয় নবির জন্য রাজতন্ত্র বৈধ ছিল। যেমন: সোলায়মান (আ.), ইউসুফ (আ.), দাউদ (আ.)।

আর খিলাফত প্রতিষ্ঠার ইলমি ও আমলি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য নবিদের শরিয়তের ওপর বিবেচনা করে কেউ যদি ধরে নেয় যে খিলাফত মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয় এবং রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হন, তাহলেও শাসকের এই মতামতকে হক মনে করা হবে। সে যদি ন্যায়পরায়ণ হয়, তাহলে তার কোনো গুনাহ হবে না।

কাজি আবু ইয়ালা তাঁর আল মুতামাদ গ্রন্থে মুয়াবিয়া (রা.)-এর খিলাফতকে প্রমাণ করতে গিয়ে এই বিষয়টির অবতারণা করেছেন। তিনি তাঁর ইসলামকে সমুন্নত করা, ন্যায়পরায়ণতা ও উত্তম চরিত্রের ওপর ভিত্তি করেই এসব বলেছেন। তা ছাড়া তিনি তাঁর নেতৃত্বকে সাব্যস্ত করেছেন আলি (রা.)-এর মৃত্যুর পর যখন হাসান (রা.) তাঁর হাতে বাইয়াতবদ্ধ হয়েছিলেন, সেই সময়টাকে 'আমুল জামাত' বা সংঘবদ্ধতার বছর বলা হয়। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর একটি হাদিস বর্ণনা করেন-
'ইসলামের চাকা ৩৫ হিজরির শেষ ভাগ পর্যন্ত থাকবে।'৪৯

ইমাম আহমদ (রহ.) ইবনুল হাকামের রেওয়ায়েত সম্পর্কে বলেন- 'ইমাম জুহরি (রহ.) থেকে বর্ণনা করা হয়, তিনি বলেন- “মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনকাল পাঁচ বছর ছিল।" এতে আপত্তির অবকাশ নেই। অতএব, এটা রাসূলের হাদিসে বর্ণিত, “৩৫ হিজরি" কথাটির সাথে সংগতিপূর্ণ।'

ইবনুল হাকাম (রহ.) বলেন- 'আমি আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-কে বললাম-“কে বলেছে ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত এই হাদিসে মুয়াবিয়া (রা.)-এর কথা বলা হয়েছে?” ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বললেন-“রাসূল এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্য দিয়েছেন নিজের অবস্থান থেকে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া একজন নবির কাজ নয়।"'

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর বক্তব্যের সাধারণ পাঠোদ্ধার হলো, তিনি হাদিসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করেছেন। মুয়াবিয়া (রা.)-এর খিলাফত হিজরি ৩৫তম বছর পর্যন্ত ছিল। বলা হয়, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-কে খিলাফত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন- 'মদিনায় যেসব বাইয়াত হয়েছে, তা আমাদের কাছে খিলাফত।'

কাজি আবু ইয়ালা বলেন- 'ইমাম আহমদ (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মদিনার বাইরে যেসব বাইয়াত হয়েছে, তা নবুয়তি খিলাফত ছিল না।
আমি মনে করি, নবুয়তি খিলাফত আলি (রা.)-এর মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছে। এর সপক্ষে ইমাম আহমদ (রহ.)-এর বক্তব্য ও মতামত বেশি।'

তবে এতটুকু বলার পর ইমাম কাজি আবু ইয়ালা 'খিলাফত ৩০ বছর। তারপর রাজতন্ত্র কায়েম হবে'- হাদিসটি নিয়ে একটি আপত্তির কথা উল্লেখ করেন। প্রশ্নকারী বলেন- 'সুনির্দিষ্টভাবে যেহেতু ৩০ বছর নবুয়তি খিলাফত থাকার কথা বলা হয়েছে, তাই খিলাফত শেষ হয়েছে আলি (রা.)-এর মাধ্যমে। তাঁর পরের সময়টি ছিল রাজতন্ত্রের। তাই মুয়াবিয়া (রা.)-এর সময়-পর্বটি খিলাফতের সময় ছিল না।'

কাজি আবু ইয়ালা এর জবাবে বলেন-'এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা আছে যে, রাসূল ﷺ উক্ত হাদিসটিতে "খিলাফত” শব্দটি দিয়ে বুঝিয়েছেন এমন খিলাফত, যা রাজতন্ত্রমুক্ত হবে।'

আর বাস্তবেও তা-ই ছিল; চার খলিফার খিলাফত ছিল রাজতন্ত্রমুক্ত। কিন্তু মুয়াবিয়া (রা.)-এর খিলাফত রাজতন্ত্রমুক্ত ছিল না। আর এটা তাঁর খিলাফতের জন্য দূষণীয় কোনো বিষয় না। যেমনটা সোলাইমান (আ.)-এর রাজতন্ত্র তাঁর নবুয়তের জন্য দূষণীয় বিষয় নয়; যদিও তিনি ছাড়া প্রায় সব নবিই ছিলেন বিত্তহীন।

খিলাফত ও রাজতন্ত্র একসঙ্গে চলতে পারে কি
ওপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, খিলাফতের সাথে রাজতন্ত্রের মিশ্রণ আমাদের শরিয়তে জায়েজ এবং এটা ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতিবন্ধক নয়। তবে বিমিশ্র খিলাফত বা নিরেট খিলাফতই সর্বোত্তম পন্থা।

অতএব, মুয়াবিয়া (রা.)-এর সাথে যারা একাত্মতা পোষণ করেন এবং মুয়াবিয়া (রা.)-কে মুজতাহিদ জ্ঞান করে তাঁকে গুনাহগার মনে করে না, তাদের দুটি বক্তব্যের একটি অবলম্বন করতে হবেই-
এক. তাদের বলতে হবে, খিলাফতের সাথে রাজতন্ত্রের মিশ্রণ বৈধ।
দুই. অথবা বলতে হবে, এক্ষেত্রে কোনো নিন্দা করা যাবে না।

মুতাজিলা সম্প্রদায়ের মতো বিদআতপন্থি লোকেরা আলি (রা.)-এর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়াসহ আরও কিছু কারণে মুয়াবিয়া (রা.)-কে ফাসিক বলে থাকে। তাদের যুক্তি হলো- 'তিনি কবিরা গুনাহ করেছেন। আর কবিরা গুনাহকারীকে ফাসিক বলা আবশ্যক। তাই দুটি বিষয়ের (কবিরা গুনাহ করা এবং এর দরুন ফাসিক হওয়া) যেকোনো একটিকে অবশ্যই নিষিদ্ধ সাব্যস্ত করতে হবে। তা না হলে কবিরা গুনাহ করা যদি রাজার জন্য বৈধ হয়ে যায়, তাহলে কাজি ও আমিরদের জন্যও বৈধ হয়ে যাবে।'

খিলাফত ত্যাগ করার হুকুম
খিলাফত প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ খিলাফত প্রতিষ্ঠা থেকে বিরত থাকে, তাহলে এই ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়াটা নিন্দনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে সে যদি সগিরা গুনাহ মনে করে এটাকে ত্যাগ করে, তাহলে এটা তার ন্যায়পরায়ণতার প্রতিবন্ধক নয়। সে ইনসাফকারী হিসেবে বিবেচিত হবে। আর যদি সে কবিরা গুনাহ মনে করে ছেড়ে থাকে, তাহলে দ্বিবিধ বক্তব্য পাওয়া যায়।

রাজতন্ত্রী অথবা ইমারতপন্থি শাসক যদি আদিষ্ট ভালো কাজগুলো পালন করে এবং নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকে আর এভাবে যদি তার সওয়াবের তুলনায় গুনাহ কম হয়, তাহলে ধরে নেওয়া হবে সে সৎ। আর কেউ যদি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সত্ত্বেও এসব কর্তব্য পালনে ত্রুটি করে, তাহলে তিন অবস্থা-
১. হয়তো শাসকের ভালো কাজ জনগণের ভালো কাজের চেয়ে কম হবে;
২. অথবা বেশি হবে
৩. অথবা সমান হবে।

যদি বেশি হয়, তাহলে সে উত্তম। আর কম হলে অনুত্তম। সমান হলে সমকক্ষ হিসেবে বিবেচিত হবে। সওয়াব ও শাস্তির ব্যাপারে এটাই কুরআন-সুন্নাহ ও ইনসাফের দাবি।

এ বক্তব্যটি তাদের কথার ওপর ভিত্তি করে আমরা বলেছি, যারা কিয়ামতে বিচার ও আদালতের ক্ষেত্রে ভালো-মন্দ আমলকে একসঙ্গে মাপা ও তুলনা করা হবে বলে বিশ্বাস করে। আর যারা বিশ্বাস করেন, হাজার ভালো কাজ করা সত্ত্বেও একটি কবিরা গুনাহই মানুষের দোজখে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট, তাদের কথা এখানে আমরা আনছি না। (অর্থাৎ মুতাজিলাদের কথা। যেমনটা আমরা একটু আগে পড়ে এসেছি।) কেননা, প্রথম মতামতটিই সবচেয়ে প্রমাণসিদ্ধ ও দালিলিক।

বৃহত্তম স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্রতম স্বার্থ বিসর্জনের হুকুম
এখানে একটি মাসয়ালা আলোচনা করে নেওয়া দরকার। পাপের আশ্রয় ব্যতীত যদি অতীব ভালো কাজ না করা যায়, তাহলে দুটি অবস্থা-
প্রথম অবস্থা: যদি অবৈধ কাজ ছাড়া সেই ভালো কাজটি করা অসম্ভব হয়, তাহলে সেই অবৈধ কাজ আর অবৈধ বা নাজায়েজ থাকে না। কারণ, ওয়াজিব যা ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না কিংবা মুস্তাহাব যা ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না, তাও ওয়াজিব কিংবা মুস্তাহাব। অর্থাৎ ওয়াজিব বিষয়টি পালনে যা যা করতে হয়, সেগুলো ওয়াজিব। আর মুস্তাহাব বিষয় পালন করতে যা যা করা লাগে, তাও মুস্তাহাব। তাই এতে যদি অমঙ্গলের চেয়ে মঙ্গলই বেশি থাকে, তাহলে তা 'মাহজুর' বা 'অবিধিবদ্ধ' থাকে না; বরং জায়েজ হয়ে যায়। যেমন: অপারগ ব্যক্তির জন্য মৃত প্রাণীর গোশত খাওয়া এবং ঠান্ডার সময় রেশমি কাপড় পরা ইত্যাদি বিষয় মানুষের অপারগতাকে বিবেচনায় রেখে জায়েজ সাব্যস্ত করা হয়। ফিকহের কিতাবে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, অধিকাংশ মানুষ শুধু এতটুকুই অনুভব করে-কাজটি খারাপ; কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রয়োজনের প্রতি তারা খেয়াল করে না। অথচ ভালো কাজটির গুরুত্ব ও নেকি এত বেশি যে, খারাপ কাজটি সেখানে নিতান্তই গৌণ। (সুতরাং পরিস্থিতিকে গুরুত্ব না দিয়ে কেউ যদি খারাপ কাজটির কারণে একটি অধিক ভালো কাজ করা থেকে বিরত থাকে, তাহলে সে নিশ্চিতভাবে একটি অতীব ভালো ও পুণ্য থেকে নিজেকে বঞ্চিত করল। - অনুবাদক)

এভাবেই যদি একান্তই কোনো জরুরত বা বাধ্যবাধকতা দেখা দেয়, তাহলে 'মাহজুর' বা 'অবিধিবদ্ধ' বিষয়টি 'মাহবুব' বা প্রিয় হয়ে যায় কিংবা মুবাহ হয়ে যায়। একইভাবে মুবাহ বিষয়ে কিংবা ওয়াজিব ও মুস্তাহাব বিষয়ে যখন অমঙ্গলের প্রাধান্য বিরাজ করে, তখন তা হারাম হয়ে যায় কিংবা অনুত্তম কাজে রূপান্তরিত হয়। যেমন: অসুস্থ ব্যক্তির রোজা রাখা এবং এমন ব্যক্তি-যার পানির দ্বারা প্রাণনাশের আশঙ্কা আছে, তার পানি ব্যবহার করা। রাসূল বলেন-

'যারা তাঁকে নাহকভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে, তাদের ধ্বংস হোক। তাঁরা যখন জানে না, তখন কেন তাঁরা প্রশ্ন করে জানল না? অজ্ঞতার একমাত্র প্রতিষেধক হলো প্রশ্ন।'৫০

প্রয়োজন সাপেক্ষে ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়া এবং মাহজুর বা অবাঞ্ছিত কাজ করা জায়েজ।

এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, প্রয়োজন সাপেক্ষে কিছু ওয়াজিব যেমন ছেড়ে দেওয়া যায় এবং কিছু অবিধিবদ্ধ তথা অবাঞ্ছিত কাজও করা যায়, তেমনি কখনো কখনো খলিফাদের সুন্নাহ থেকেও বের হওয়া যায়; যদি তাঁদের কিছু সুন্নাহ পালনে অক্ষমতা এবং কিছু নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা নিতান্তই অসম্ভব হয়ে পড়ে। যেমন: অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া ব্যতীত রাষ্ট্রপরিচালনার কাঙ্ক্ষিত দায়িত্বগুলো আদায় করা যাচ্ছে না।

খিলাফতকে ত্যাগ করার বিষয়টিও অনুরূপ; যেমনটা আমরা আগেও বলেছি। আর এটা কতিপয় জালিম ও জাহেল বিদআতপন্থিরা ছাড়া সবাই মানে।

গুনাহহীন কষ্টসাধ্য ভালো কাজের হুকুম
দ্বিতীয় অবস্থা : গুনাহহীনভাবেই ভালো কাজটি করা সম্ভব। তবে তা এতটাই কষ্টসাধ্য যে, প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে হয়। অথবা কাজটা এতটাই অপছন্দনীয় হয় যে, প্রবৃত্তি বা মানবপ্রকৃতি এই অতীব ভালো কাজে উৎসুক হয় না; হোক সেই কাজটি ওয়াজিব কিংবা মুস্তাহাব।

যদি না সে কাজটি করতে গিয়ে এমন কিছু করে বসে, যা নিষিদ্ধ এবং যার গুনাহ ভালো কাজের কল্যাণের তুলনায় কম। এই অবস্থার সম্মুখীন অনেককেই হতে হয়। শাসক, রাজনীতিবিদ, মুজাহিদ, আলিম, কাজি বা বিচারক, কালামবিদ, সুফি ও সাধারণ মানুষগণও এই অবস্থার সম্মুখীন হন। যেমন: হুদুদ কায়েম করা, নাগরিক নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করা, সম্পদ বণ্টন, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ ইত্যাদি রাষ্ট্রের কল্যাণের সাথে জড়িত কর্মসমূহ পালন করতে গিয়ে নিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন। সম্পদ আত্মসাৎ করা, মানুষের ওপর দখলদারিত্ব করা, সম্পদ বণ্টনে পক্ষপাত করা ইত্যাদি কুপ্রবৃত্তিতাড়িত কাজে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন।

একইভাবে জিহাদের ক্ষেত্রে কেউ অযাচিত ধ্বংস সাধনে প্রবৃত্ত হলো কিংবা ইলম চর্চার ক্ষেত্রে ফিকহ ও উসুলুদ-দ্বীন বা দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদি চর্চা করতে গিয়ে নিজস্ব মত দ্বারা চালিত হলো এবং এসব বিষয়ে কালামশাস্ত্র দ্বারা তাড়িত হলো কিংবা শরয়ি ইবাদতবিষয়ক ইলম ও আল্লাহর মারেফতের ইলমচর্চার বেলায় রাহবানিয়াত বা বৈরাগ্যতায় লিপ্ত হলো। এই জাতীয় বিষয় রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রচুর দেখা যায়। তা শাসক, আমির, কাজি, আলিম, আবেদ সবার মাঝেই দেখা যায়। যার দরুন সমাজে ফিতনা দেখা দেয়। তাই বাধ্য হয়ে করা এ নিষিদ্ধ কাজগুলোই কেবল এক দলের চোখে পড়ে। তারা তাদের নিন্দা এবং ঘৃণা করে। আরেক দলের কেবল এদের ভালো কাজগুলোই চোখে পড়ে, তারা তাদের ভালোবাসে। তাই প্রথম দল তাদের ভালো কাজগুলো খারাপ বিবেচনা করে এবং দ্বিতীয় দল খারাপকে ভালো মনে করে।

এ বিষয়ক মূলনীতি আমরা পূর্বেও আলোচনা করেছি। রাষ্ট্রের জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় বা ওয়াজিব কোনো কিছু আদায় করাটা যদি রাজতান্ত্রিক নীতি ছাড়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়, তখন রাজতন্ত্র কি মুবাহ বা জায়েজ হয়ে যাবে, যেমনটা অপারগতার সময়ে মুবাহ হয়ে যায়? আমরা এ প্রসঙ্গে দুটি মত উল্লেখ করেছি। যদি দুষ্করতাকে অপারগতার স্থলাভিষিক্ত করা হয়, তাহলে এটা কোনো গুনাহ হবে না। আর যদি স্থলাভিষিক্ত না করা হয়, তাহলে গুনাহ হবে। আর যে কাজে কোনো দুষ্করতা ও অপারগতা নেই, তাতে খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহকে না মানা কুপ্রবৃত্তির অনুগমন বলে বিবেচিত হবে।

প্রকৃত অর্থে ভালো কাজ ভালোই, আর খারাপ কাজ খারাপই। মানুষ ভালো কাজে খারাপের মিশ্রণ করে এবং খারাপ কাজের সাথে ভালোর মিশ্রণ করে। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তাদের খারাপ কাজটি অনুমোদিত নয় কিংবা শরিয়ত এর নির্দেশও দেয় না।

শরিয়তের দৃষ্টিতে তাদের অপারগতা যদি গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে তাদের কাজের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অজুহাত বা অপারগতাকে গ্রহণ করা হবে না। তবে ভালো কাজের বেলায় অবশ্যই তারা আদিষ্ট; বরং এক্ষেত্রে তাদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করা হবে। তবে শর্ত হলো-কাজটি এমন হতে হবে, যা হালকা মন্দকর্ম ছাড়া সম্পাদন করা সম্ভব হয় না। যেমনটা ঘটে থাকে জিহাদের ময়দানে; বাধ্য হয়ে এবং অনিচ্ছাবশত জুলুম হয়ে যায়, অথচ জিহাদটির কল্যাণের তুলনায় জুলুম বা অকল্যাণের পরিমাণ সামান্য।

অনুরূপভাবে, যদি এমনটা নিশ্চিত জানা যায় যে, সেই সব মন্দ কাজে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে লোকেরা এমন ওয়াজিব ও গুরুত্বপূর্ণ ভালো কাজও পরিত্যাগ করবে-যা করতে কোনো নিষেধ বা বাধা নেই, তাহলে এই অবস্থাতেও শিথিলতাকে বৈধ মনে করা হবে। কেননা, এই নিষেধাজ্ঞার মাঝে ওয়াজিব ত্যাগের নেতিবাচক দিক আছে। তবে যদি এই দুটোর সমন্বয় সম্ভব হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে পূর্ণ ওয়াজিবই আদায় করবে। যেমন: কর্মদক্ষতা ও পারদর্শিতার বিবেচনায় উমর (রা.) এমন লোককেও কাজে নিয়োগ দিতেন, যার ভেতরে পাপাচারের মনোভাব আছে। তারপর তিনি নিজ ন্যায়পরায়ণতা ও ব্যক্তিত্বের ক্ষমতাবলে তার ভেতর থেকে পাপাচারিতাকে দূর করতে সক্ষম হতেন।

এসব বিষয়ে (খারাপ কাজে) নিষেধ করা বা প্রতিবাদ করাকে পরিহার করাটা মূলত অপরাধকে স্বহস্তে প্রতিবাদ করা অথবা অস্ত্রসহ প্রতিহত করাকে ছেড়ে দেওয়ার মতোই একটি বিষয়। ৫১ কেননা, উপরিউক্ত অবস্থার ক্ষতিটি অপরাধ প্রতিহতকারীর ক্ষতির চেয়ে আরও বড়ো ও ব্যাপক ক্ষতি বয়ে আনে।

তাই কোনো নিষেধাজ্ঞার ফলে যখন আবশ্যিকভাবে নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে অতি উত্তম কোনো কাজকে পরিত্যাগ করার পরিস্থিতি তৈরি হবে, তখন সেই নিষেধাজ্ঞাটি আবশ্যিকভাবেই অতি মন্দ কাজকে ডেকে আনবে। যেমন : কেউ একজন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার বদলে দুই ওয়াক্ত নামাজ পড়ার শর্তে ইসলাম গ্রহণ করল (এমনটা রাসূলের সময়ে ঘটেছে) কিংবা কোনো জালিম শাসক মদ পান বা এ জাতীয় কোনো হারাম কাজের শর্তে ইসলাম গ্রহণ করল। সেক্ষেত্রে তাকে যদি বাধা দেওয়া হয়, তাহলে সে ইসলাম থেকে বিমুখ হয়ে যাবে। ৫২

সুতরাং একজন আলিম বা শাসকের নিষেধাজ্ঞাতে বিশেষ কোনো অকল্যাণের প্রতি লক্ষ রেখে নিষেধ করা থেকে বিরত থাকার মাঝে আর কাজটি সম্পাদন করার আদেশ দেওয়ার মাঝে পার্থক্য আছে। অবস্থা অনুপাতে বা পরিস্থিতিভেদে আদেশ ও নিষেধের প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। এসব পরিস্থিতি ছাড়া অন্য অবস্থায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা আবশ্যক। হতে পারে এই নিষেধাজ্ঞাটি হারামের হুকুম বর্ণনার জন্য অথবা হারামের বিশ্বাস তৈরির জন্য কিংবা সে কাজের ব্যাপারে ভীতিপ্রদর্শনের জন্য বা সে কাজ পরিহার করবে এমন আশায় অথবা প্রমাণ প্রতিষ্ঠার জন্য। তাই রাসূল কর্তৃক কোনো কাজ করার আদেশ-নিষেধ, জিহাদ, ক্ষমা, হুদুদ কায়েম এবং কঠোরতা ও নম্রতার অবস্থায় বৈচিত্র্য দেখা যায়。

টিকাঃ
৩৯. আবু দাউদ: ৪৬৪৭
৪০. মুজামুল আওসাত: ৬/৩৪৫, মাজমাউজ জাওয়াইদ: ৫/১৯৩, হাদিসটি মুসলিম শরিফে পাওয়া যায়নি। তবে হাদিসটি একাধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আবু ইয়ালা (রহ.) ও ইমাম বাজ্জার (রহ.) তাঁদের কিতাবে এই হাদিসটি এনেছেন। ইমাম হাইসামি (রহ.) হাদিসটি তাঁর কিতাব 'মাজমাউজ-জাওয়াই'দে এনে বলেন, এই হাদিসের রাবিগণ সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য-অনুবাদক
৪১. আবু দাউদ: ৪৬০৭, তিরমিজি: ২৬৭৬, ইবনে মাজাহ: ৪২, আহমাদ: ১৭১৪২
৪২. মুসলিম: ১৮৪২, বুখারি, ৩৪৫৫
৪৩. আল মাকাসিদুল হাসানাহ ৩৮৫, কানজুল উম্মাল: ৬/৮৯; ফিরদাউস, দাইলামি: ৩/৩০৫
৪৪. আহমদ: ৭১৬০, বাজ্জার: ৯৮০৭
৪৫. তিরমিজি: ৩৬৬২, ইবনে মাজাহ: ৯৭, আহমদ: ২৩২৯৩
৪৬. অর্থাৎ তারা মুসলিম জনসাধারণকে উৎসাহমূলক কর্মপন্থার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।- অনুবাদক
৪৭. শাইখুল ইসলাম (রহ.) এখানে উসমান (রা.)-এর স্বভাবসুলভ উদারতা ও নম্রতার কথা বলেছেন। উসমান (রা.) কখনো বাইতুলমাল থেকে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজের সম্পদ থেকে উদার হস্তে জনসাধারণ ও তাঁর আত্মীয়দের দান করতেন। (মাওসুআতুত তারিখিল ইসলামি, মাহমুদ শাকের, ৩/২৩৪) তবে তিনি নিজে বাইতুলমাল থেকে কোনো ভাতা গ্রহণ করতেন না। (আল মাবসুত, শামসুল আইম্মাহ শারাখসি রহ., ৩/২১)
তাবাকাতে ইবনে সাদে বর্ণিত আছে, উসমান (রা.) একবার 'মজলিশে শূরা'র সদস্যদের সামনে বলেন- 'রাসূলুল্লাহ তাঁর আত্মীয়দের দান করতেন। অধিকন্তু আমি দরিদ্র ও সম্বলহীন আত্মীয়দের নিয়ে বাস করি। তাই তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। তোমরা যদি একে ভুল মনে করো, তাহলে তারা এ অনুদান ফিরিয়ে দেবে।' (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সাদ ৩/১৯০)
৪৮. আহমাদ: ১৬৯৩৩, ইবনে আবি শাইবা: ৩১৩৫৮
৪৯. আবু দাউদ: ৪২৫৪, আহমাদ: ৩৭০৭
৫০. হাদিসটির পূর্ণরূপ হলো-একজন সাহাবি আঘাত পেয়ে অন্যদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমি কি এখন তায়াম্মুম করতে পারব?' সাহাবিরা বলেছিলেন-'না, তুমি পানি ব্যবহারে সক্ষম।' তারপর সাহাবি পানি ব্যবহার করেন এবং মারা যান। রাসূল বিষয়টি অবগত হওয়ার পর উক্ত কথাগুলো বলেন। আবু দাউদ: ৩৩৬, আহমাদ: ৩০৫৭
৫১. শাইখুল ইসলাম (রহ.) এখানে যে হাদিসটির ইঙ্গিত দিয়েছেন তা হলো, রাসূল বলেন- 'তোমাদের কেউ কোনো অপরাধ হতে দেখলে সে যেন তা স্বহস্তে প্রতিহত করে।' মুসলিম: ৪৯
৫২. যেমন : উল্লিখিত ক্ষেত্রে লোকটিকে যদি এই শর্তে ইসলাম গ্রহণ করতে দেওয়া না হতো-তথা তাকে নিষেধ করা হতো, তখন এই নিষেধাজ্ঞাটি অতি মন্দ একটি কাজ তথা লোকটির জন্য কুফরের দরজা উন্মুক্ত করে দিত। - অনুবাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00