📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 হিংস্র খারেজিদের মনে প্রকৃত মুমিনদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ

📄 হিংস্র খারেজিদের মনে প্রকৃত মুমিনদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ


হিংসুটে খারেজিদের মনে সত্যিকার মুমিনদের বিরুদ্ধে শত্রুতা, বিদ্বেষ ও হিংসা কী পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল, তার বড় একটি প্রমাণ আবদুর রহমান ইবনে মুলজিমের ওই উক্তি: যেটা সে তার তরবারি সম্পর্কে বলেছিল। সে বলেছে, 'আমি এটা ১ হাজার দিরহাম দিয়ে ক্রয় করেছি। আরও ১ হাজার দিরহাম ব্যয় করে এটাকে বিষমিশ্রিত করেছি। গোটা শহরবাসীর ওপর যদি এর একটি আঘাত পতিত হয়, তবে কেউই প্রাণে বাঁচতে পারত না। '২৩৮

নিঃসন্দেহে তার এই উক্তি তাদের অন্তরে গেঁথে থাকা বিদ্বেষ সম্পর্কে আমাদের স্পষ্টভাবে জানান দেয়। এমন হিংসা-বিদ্বেষ তারা কেবল গোটা মুসলিম জাতির বিরুদ্ধেই নয়; বরং স্বয়ং আলি বিন আবি তালিব রা.-এর মতো ইসলামের মহান ব্যক্তির বিরুদ্ধেও লালন করত। অথচ আলি রা. ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও কোমল স্বভাবের মানুষ।

আমার ভাই, আল্লাহ তোমাদের হেফাজত করুন। এটাও একটু চিন্তা করে দেখুন, কীভাবে এই ভ্রান্ত মতবাদ এবং বিকৃত চিন্তা-চেতনা লালনকারীরা মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মুমিনদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, আর পৌত্তলিকদের ছেড়ে দিয়েছে। ২৩৯

টিকাঃ
২৩৮. তারিখে তাবারি: ৬/৬২।
২৩৯. আবদুল হামিদ আসসাহিবানি প্রণীত সিয়ারুশ শুহাদা দুরুসুন ওয়া ইবার : ৭৮।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 মন্দ পরিস্থিতির প্রভাব

📄 মন্দ পরিস্থিতির প্রভাব


এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মন্দ পরিবেশ তার অভ্যন্তরে নিঃশ্বাস নেওয়া লোকদেরও গ্রাস করে। যদিও ওই পরিবেশে কিছু নীতিবান লোক থাক না কেন। আপনারা দেখে এসেছেন-ইবনে মুলজিম যখন শাবিব ইবনে বাজরার কাছে গিয়ে বলে, 'তুমি কি দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করতে চাও?' সে বলল, 'কীভাবে?' ইবনে মুলজিম বলল, 'আলিকে হত্যা করতে হবে।' শাবিব বলল, 'তোমার মা তোমাকে হাবিয়ে ফেলুক! তুমি তা এক বীভৎস কাজের পরিকল্পনা নিয়ে এসেছ। আচ্ছা, কীভাবে তাকে হত্যা করবে-বলো।' ইবনে মুলজিম বলল, 'আমি মসজিদে লুকিয়ে থাকব। তিনি যখন ফজরের নামাজে আসবেন তখন তাকে আঘাত হানব ও হত্যা করব। এরপর যদি বেঁচে যাই তাহলে তো অন্তরে তৃপ্তিবোধ করলাম ও প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম হলাম। আর যদি মারা পড়ি তাহলে আল্লাহর কাছে যে প্রতিদান পাব, তা দুনিয়ার থেকে বহুগুণে উত্তম।' শাবিব বলল, 'তোমার সর্বনাশ হোক! যদি আলি ব্যতীত অন্য কেউ হতো তাহলে আমার কাছে সহজ' লাগত। তুমি তো জানো যে, আলি রা. হচ্ছেন প্রথম সময়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তাঁকে হত্যা করতে আমি অন্তরের সাড়া পাচ্ছি না।'

ইবন মুলজিম বলল, 'তোমার কি জানা নেই যে, নাহরাওয়ানে আলি আমাদের লোকদের হত্যা করেছেন?' শাবিব বলল, 'হ্যাঁ, তা করেছেন।' ইবনে মুলজিম বলল, 'তাহলে আমাদের যেসব ভাইদের তিনি হত্যা করেছেন তার পরিবর্তে আমরা তাকে হত্যা করব।' কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর শাবিব ইবনে মুলজিমের প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করল। ২৪০

হে আমার ভাই, আল্লাহ তোমাদের রক্ষা করুন। একটু চিন্তা করে দেখুন, ভ্রান্ত মতবাদ ও বিকৃত চিন্তাধারার ধারকেরা কীভাবে তাদের সঙ্গে চলাফেরাকারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ইসলামে আলি রা.-এর ত্যাগ- তিতিক্ষা ও ইসলামে তাঁর অগ্রগামিতার মতো মর্যাদা ও বাস্তব কীর্তিমালা প্রত্যক্ষ সত্ত্বেও শাবিব ইবনে মুলজিমকে সঙ্গ দিতে প্রস্তুত হয়ে যায়। সে সন্তুষ্ট হতে না পারলে তাকে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে নিহতদের দোহাই দিয়ে আলি রা.-এর বিরুদ্ধে প্ররোচনা দেয়। একসময় তার ভেতর জেগে ওঠে প্রতিশোধস্পৃহা। শেষে তার উদ্দেশ্য সাধন হয়। শাবিব তার কথা মেনে নেয়। অথচ নাহরাওয়ানের যুদ্ধে নিহত খারেজিদের হত্যা করা কিছুতেই ভুল ছিল না; বরং তা ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। পরে শাবিব কী পেল? কেবল চিন্তার বিকৃতি, বদনামি আর অশুভ পরিণতি।

এই ঘটনা প্রত্যেক মুসলমানকে এই শিক্ষা দিয়ে থাকে যে, যারাই এ ধরনের বিকৃত চিন্তা, অসার খেয়াল ও ভ্রষ্ট আকিদা লালন করে তাকে বয়কট করা। তার সান্নিধ্য ত্যাগ করা। ওইসব হক্কানি ওলামায়ে কেরামের সান্নিধ্যে থাকা চাই; যারা হক সম্পর্কে সম্যক অবগত। এ লক্ষ্যে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন। মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের নির্দেশনা দিচ্ছেন। সুতরাং যে মুসলমান এই সরল পথে সন্তুষ্ট হতে পারবে না এবং ভ্রান্ত বিশ্বাসীদের সাহচর্য গ্রহণ করবে; অতিসত্ত্বর সে তিরষ্কৃত হবে। লাঞ্ছনার মুখে পড়বে। ২৪১ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذُ فُلَانًا خَلِيلًا لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنسَانِ خَذُولا
'জালেম সেদিন আপন হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, হায় আফসোস! আমি যদি রাসুলের সাথে পথ অবলম্বন করতাম। হায় আমার দুর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল। শয়তান মানুষকে বিপদকালে ধোঁকা দেয়।' -সূরা ফুরকান : আয়াত ২৯।
এই ছিল রব্বানি আলেম, আল্লাহর ভয়ে জীবন উৎসর্গকারী, তওবায় ডুবে থাকা হেদায়াতপ্রাপ্ত খলিফা আলি বিন আবি তালিব রা.-এর শাহাদতের ঘটনা হতে প্রাপ্ত কিছু শিক্ষা, তাৎপর্য ও উপদেশ। যিনি আমাদের জন্য নেতৃত্বের একটি বরকতমণ্ডিত রাজপথ প্রতিষ্ঠা করে আমাদের সরল পথে তুলে এনেছেন। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি আমি ১১ শাওয়াল ১৪৩৫ হিজরি (৭ আগস্ট ২০১৪ খ্রি.) বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে লেখা শেষ করি। পরিশেষে গ্রন্থ রচনার কাজ শেষে আল্লাহর কাছে দুআ করি, আল্লাহ যেন আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা কবুল করেন। এর দ্বারা তাঁর বান্দাদের উপকৃত করেন। নিজ দয়া- অনুগ্রহে এতে বরকত দান করেন।
مَا يَفْتَحِ اللَّهُ لِلنَّاسِ مِنْ رَّحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَا وَمَا يُمْسِكُ فَلَا مُرْسِلَ لَهُ مِنْ بَعْدِهِ ۚ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ﴾
'আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত উন্মুক্ত করে দেন, তা আটকে রাখার কেউ নেই। আর তিনি যা আটকে রাখেন, তারপর তা ছাড়াবার কেউ নেই। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' -সুরা ফাতির: আয়াত ২।

পরম করুণাময় আল্লাহর দয়া-দাক্ষিণ্যতার প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে কম্পিত মনে দুআর হাত তুলছি। তিনিই অনুগ্রহকারী, সম্মানদাতা, সাহায্যকারী ও সুযোগদাতা। সর্বাবস্থায় তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। তাঁর আসমাউল হুসনা ও উন্নত গুণাবলির সাহায্যে নিবেদন করে বলছি-'হে আল্লাহ, এই কাজ দ্বারা আমাকে আপনার সন্তুষ্টি সন্ধানকারী বানিয়ে দিন। আপনার বান্দাদের জন্য এটাকে উপকারী সাব্যস্ত করুন। প্রতিটি অক্ষরের বিনিময়ে আমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। এটাকে আমার নেকির পাল্লায় রাখুন। ক্ষুদ্র এই প্রচেষ্টা সম্পন্ন করার কাজে আমার যেসব প্রিয়ভাজন সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের উত্তম প্রতিদান দান করুন।'

পাঠক ভাইদের কাছেও আমার এই অনুরোধ থাকবে, দুআর সময় আপনাদের এই ভাইয়ের কথা ভুলবেন না।
﴿رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّلِحِينَ ﴾
'হে আমার রব, তুমি আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছ, তার জন্য আমাকে তোমার শুকরিয়া আদায় করার তাওফিক দাও। আর আমি যাতে এমন সৎকাজ করতে পারি, যা তুমি পছন্দ করো। আর তোমার অনুগ্রহে তুমি আমাকে তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো।' -সুরা নামাল: আয়াত ১৯।
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ و أُخِر دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ.
মহান রবের মাগফিরাত, রহমত ও সন্তুষ্টি কামনায়-
আলি মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ আসসাল্লাবি

টিকাঃ
২৪০. তারিখে তাবারি: ৬/৬২।
২৪১. আবদুল হামিদ আসসাহিবানি প্রণীত সিয়ারুশ শুহাদা দুরুসুন ওয়া ইবার: ৭৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00