📄 হত্যাকারীর চেহারা বিবর্ণ করতে আলি রা.-এর বাধা
তিনি তাঁর হন্তারকের ব্যাপারে বলেন, 'তাকে বন্দি করে রাখো। আমি মারা গেলে তাকে হত্যা করবে। যদি বেঁচে থাকি তবে আঘাতের বদলে কিসাস নেওয়া হবে।'২১৭
আরেক বর্ণনায় এসেছে; তিনি বলেছেন, 'তাকে পানাহার-সামগ্রী দাও। বন্দির ক্ষেত্রে কোমলতা গ্রহণ করো। আমি যদি সুস্থ হয়ে উঠি তাহলে নিজ খুনের ব্যাপারে আমিই দায়িত্ব নেব। চাইলে ক্ষমা করে দেবো অন্যথায় বদলা নেব।'২১b
অন্য বর্ণনায় এটুকু বাড়তি ভাষ্য এসেছে যে, 'আমি যদি মারা যাই, তাহলে আমার হত্যার মতো তাকে হত্যা করবে। সীমা অতিক্রম করবে না। আল্লাহ তাআলা সীমালঙ্ঘনকারীকে ভালোবাসেন না।'২১৯
তিনি হজরত হাসান রা.-কে নিজ হন্তারকের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন ও চেহারা বিকৃতি করতে নিষেধ করতে গিয়ে বলেন, 'হে বনু আবদিল মুত্তালিব, আমি তোমাদেরকে মুসলমানদের রক্তে যেন ডুবন্ত না দেখি। "আমিরুল মুমিনিনকে হত্যা করা হয়েছে, আমিরুল মুমিনিনকে হত্যা করা হয়েছে"- এই বলে যেন তাদের হত্যা করা না হয়। সাবধান! কিছুতেই অন্য কাউকে হত্যা করা যাবে না। আর হে হাসান, তুমি শোনো। আমি যদি তার আঘাতে মারা যাই, তাহলে একটি আঘাতের পরিবর্তে তাকে একটি আঘাত করবে। খুনির চেহারা বিকৃত করবে না। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন করবে না। কেননা, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-“কারও চেহারা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকৃত করবে না।”'২২০
স্মর্তব্য, হজরত আলি রা. তাঁর হত্যাকারীর ব্যাপারে যে অসিয়ত করেছিলেন, সে ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। কিছু সহিহ কিছু জয়িফ। তম্মধ্যে একটি রেওয়ায়াত হচ্ছে-আলি রা. তাঁর হত্যাকারীকে হত্যা করার পর আগুনে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ এই বর্ণনার সনদ জয়িফ তথা দুর্বল। কেননা, অন্যান্য সব বর্ণনার মর্ম একদিকে। সেটা হচ্ছে-তিনি বলেছেন, 'আমি যদি তার আঘাতে মারা যাই, তাহলে তাকে হত্যা করবে।' এ ছাড়া অন্য কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিতে তিনি নিষেধ করেছেন। সুতরাং এই অর্থের সব বর্ণনা একটি আরেকটির সমর্থন করে। যা দ্বারা বিপরীতধর্মী বর্ণনা অসার ও অমূলক হিসেবে সাব্যস্ত হয়। এ দিকটিও বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, আলি রা. তার হত্যাকারীকে মুরতাদ আখ্যায়িত করেননি। বেঁচে থাকাবস্থায় তাকে হত্যা করতে নির্দেশ দেননি; বরং যখন কিছু লোক তাকে হত্যা করতে চাইল, তিনি তাদের বাধা দিলেন। বললেন, 'তাকে হত্যা করবে না। আমি যদি সুস্থ হই তবে তার কাছ থেকে আঘাতের বদলায় কিসাস নেব। আর যদি মারা যাই তবে তাকে হত্যা করবে।'২২১
প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত; আলি রা. ইনতেকাল করলে হাসান রা. ইবনে মুলজিমকে তলব করেন। সে এসে হাসান রা.-কে বলল, 'আমি আপনাকে একটি কথা বলতে চাই।' হাসান রা. বললেন, 'কী কথা?' ইবনে মূলজিম বলল, 'আমি হাতিমে আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করেছি—আলি ও মুআবিয়া উভয়কে হত্যা করব, অন্যথায় আত্মহত্যা করব। অতএব, আপনি এই শর্তে আমাকে ছেড়ে দিন যে, আমি মুআবিয়ার কাছে যাব। তাকে হত্যা করতে সক্ষম হই বা না হই; আমি বেঁচে থাকলে উভয় পরিস্থিতিতে আপনাকে কথা দিচ্ছি—আপনার কাছে ফিরে আসব। নিজেকে আপনার হাতে সোপর্দ করব।'
হাসান রা. বললেন, 'না, কখনো না—যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি নিজ চোখে আগুন দেখে না নেবে'। এরপর তিনি এগিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করলেন। পরে লোকজন তার গায়ে আগুন লাগিয়ে দিলো।২২২ তবে এই বর্ণনা বিচ্ছিন্ন।২২৩
হাসান ও হুসাইন রা.-সহ শোকসন্তপ্ত আহলে বাইতের সম্পর্কে যে কথা বলা হয়েছে যে, তাঁরা আবদুর রহমান ইবনে মুলজিমের ব্যাপারে আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর ওসিয়তের ওপর কঠোরতার আশ্রয় নিয়েছেন। এটা মোটেই প্রমাণিত নয়।
আলি রা.-কে দাফনের পর ইবনে মুলজিমকে উপস্থিত করা হয়। অতঃপর সবাই সমবেত হয়। পরে তাকে পুড়িয়ে মারা হয়। মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া, হুসাইন ও আবদুল্লাহ ইবনে জাফর ইবনে আবি তালিব প্রমুখ বলেন, 'আমাদের ছেড়ে দিন। এটা দেখে মনটাকে খানিক শান্ত করি।'
এরপর আবদুল্লাহ তার মাথা ও পা কাটলেন। সে চিৎকার করতে লাগল। পরে তার চোখ সেলাই করলেন; কিন্তু সে কোনো সাড়াশব্দ করল না; বরং বলতে লাগল—'তোমরা তোমাদের চাচার দুচোখ সেলাই করছ।' অতঃপর সে 'সুরা আলাক'-এর প্রথম আয়াত তেলাওয়াত করল। তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। সম্পূর্ণ সুরা সে তেলাওয়াত করল। অতঃপর তার জিহ্বা কর্তন করার কথা বলা হলে সে চিৎকার করতে আরম্ভ করল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'কেন চিৎকার করছ?' জবাবে সে বলল, 'চিৎকার করছি না; বরং আমি তো বেঁচে থাকতে একটি মুহূর্তও আল্লাহর জিকর ছাড়া কাটাতে চাই না।' পরে তার জিহ্বা কাটা হলো। অতঃপর আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। সে ছিল গৌধূম বর্ণের ও উজ্জ্বল চেহারার লোক। দুই কানের লতি পর্যন্ত লম্বা চুল এবং ললাটে ছিল তার সেজদার চিহ্ন।২২৪
আবদুর রহমান ইবনে মুলজিমের ব্যাপারে ইমাম জাহাবি রাহ. বলেন, আলি রা.-এর খুনি ছিল এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের খারেজি। সে মিসর বিজয় অভিযানে অংশগ্রহণ করেছে। ওখানে সম্মানের সাথে বসবাস করেছিল। সে কুরআন পড়েছিল এবং দীনের আহকাম শিখেছিল। সে ছিল বনু ওয়াতদুলের বাসিন্দা। মিসরে ওই গোত্রের সবচে বড় অশ্বারোহী, খুবই ইবাদতগুজার এবং মুআজ বিন জাবাল রা.-এর শাগরেদ ছিল। সাবিগ তামিমিকে সে-ই উমর রা.-এর কাছে পাঠিয়েছিল। সে তার কাছে কুরআনের মুতাশাবিহাতের ব্যাপারে প্রশ্ন করে। তার ব্যাপারে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন- 'কিন্তু শেষে তার মস্তিষ্কে বিকৃতি এসে গেল। মারাত্মক অঘটন ঘটিয়ে বসল। খারেজিরা তাকে উম্মতের সবচে উত্তম ব্যক্তি মনে করে।' ইমরান ইবনে হাতান নামক জনৈক খারেজি ইবনে মুলজিমের প্রশংসায় বলেছে-
يا ضربة من تقي ما أراد بها ** إلا ليبلغ من ذي العرش رضوانا إني لأذكره يوماً فأحسبه ** أوفى البرية عند الله ميزانا
'সেই আল্লাহভীরু লোকটির তরবারির আঘাত আমার মনে পড়ে। যেই আঘাতের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আরশের অধিপতির সন্তুষ্টি লাভ করা। আজ আমি তাকে স্মরণ করছি এবং ভাবছি আল্লাহর নিকট তার পাল্লা সবার চেয়ে ভারি হবে।'
এদিকে রাফেজিদের মতে ইবনে মুলজিম আখেরাতে সবচে নিকৃষ্ট মাখলুক। আর আমরা আহলে সুন্নাত তার জন্য জাহান্নামের শাস্তি কামনা করি। এটাও সম্ভব বলে মনে করি যে, আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমাও করতে পারেন। খারেজি ও রাফেজিরা তার সম্পর্কে যে আকিদা লালন করে, সেটা আমাদের আকিদা নয়। তার ব্যাপারেও ওই বিধান যা উসমান, জুবাইর, তালহা, সাইদ বিন জুবাইর, আম্মার, খারিজা ও হুসাইনের হত্যাকারীদের ব্যাপারে রয়েছে। এসব খুনিদের থেকে আমরা নিজেদের দায়মুক্তি প্রকাশ করছি। আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করি এবং তাদের ব্যাপারটি আল্লাহর হাতে সোপর্দ করি।২২৫
মুআবিয়া রা.-কে হত্যার দায়িত্ব নিয়েছিল বারক বিন আবদুল্লাহ। নির্ধারিত দিনে মুআবিয়া ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য বের হলে পথে বারক তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করে। কেউ বলেছেন বিষযুক্ত খঞ্জর দিয়ে আঘাত করে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তা তার নিতম্বে লেগে সেখান থেকে কিছু অংশ কেটে যায়। লোকজন ওই খারেজিকে ধরে হত্যা করে ফেলে।
মৃত্যুর পূর্বে সে মুআরিয়াকে বলেছিল-'আমাকে ছেড়ে দিন, আমি আপনাকে একটি সুসংবাদ দেবো।' মুআবিয়া রা. বললেন, 'কী সে সুসংবাদ?' সে বলল, 'আমার আরেক ভাই আজ আলি ইবনে আবু তালিবকে হত্যা করেছে।' মুআবিয়া রা. বললেন, 'হয়তো সে হত্যা করতে সক্ষম হয়নি।' খারেজি বলল, 'অবশ্যই হয়েছে। কেননা, আলি কোনো দেহরক্ষী রাখেন না।' এরপর মুআবিয়া রা.-এর নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়।
মুআবিআ রা.-এর চিকিৎসার জন্যে ডাক্তার আনা হয়। ডাক্তার জখম দেখে মুআবিয়াকে জানায়-'আপনার জখমে বিষ আছে। এর চিকিৎসায় হয় এখানে উত্তপ্ত লোহার দাগ দিতে হবে; নতুবা এমন একটা তরল ওষুধ পান করতে হবে; যার দ্বারা বিষ নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু আপনার আর সন্তানাদি হবে না।' মুআবিয়া রা. বললেন, 'আমি আগুনের দাগ দেওয়া কষ্ট সহ্য করতে পারব না। তবে আগামীতে সন্তান না হলেও বর্তমান দুই ছেলে ইয়াজিদ ও আবদুল্লাহকে দেখে আমার চোখ জুড়াবে।'
অবশেষে ডাক্তার তাঁকে তরল ওষুধ সেবন করায়। এর ফলে তাঁর ব্যথা কমে যায়, জখম শুকিয়ে যায় এবং তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। এ ঘটনার পরে মুআরিয়া রা. মসজিদের মধ্যে নিজের জন্যে একটা সুরক্ষিত কক্ষ তৈরি করেন। সেজদার সময় তাঁর চারপাশে পাহারাদার দণ্ডায়মান থাকত।
আমর ইবনুল আস রা.-কে হত্যা করার দায়িত্ব নিয়েছিল আমর ইবনে বকর। সে-ও নির্ধারিত দিনে ফজরের নামাজে যাওয়ার সময় তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্য পথে ওত পেতে বসে থাকে। কিন্তু ঘটনাক্রমে ওই সময় আমরের ভীষণ পেটব্যথা হওয়ায় তিনি মসজিদে আসতে পারেননি। তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে খারিজা ইবনে হুজাফাকে পাঠিয়ে দেন।
খারিজা ছিলেন বনু আমির ইবন লুওয়াইয়ের লোক এবং আমর ইবনে আসে র অন্যতম পুলিশ অফিসার। খারেজি আমর ইবনে বকর তাঁকে আমর ইবনুল আস মনে করে একটিমাত্র আঘাতে হত্যা চূড়ান্ত করে ফেলে। সে বুঝতে পারেনি যে, আমর ইবনে আস রা.-এর স্থলে খারিজা ইবনে হুজাফা নামাজ পড়ানোর জন্য আসছেন।
লোকজন তাকে ধরে ফেলে এবং হজরত আমর ইবনুল আস রা.-এর কাছে নিয়ে যায়। আমর ইবনে বকর লোকজনকে জিজ্ঞেস করল, 'এই লোক কে?' লোকেরা বলল, 'তিনি আমর ইবনুল আস রা.।' সে বলল, 'তাহলে আমি কাকে হত্যা করলাম?' লোকেরা বলল, 'খারিজা ইবনে হুজাফাকে।' সে আমর ইবনুল আস রা.-কে উদ্দেশ্য করে বলল, 'হে ফাসেক, আমি তো ভেবেছি তোমাকে হত্যা করতে পেরেছি।' আমর ইবনুল আস রা. বললেন, 'তুমি আমাকে হত্যার ইচ্ছা পোষণ করেছ, আর আল্লাহর ইচ্ছা ছিল আমার স্থলে খারিজার মৃত্যু।' এরপর তিনি তাকে হত্যা করলেন।২২৬
টিকাঃ
২১৭ ফাজাইলুস সাহাবাহ: ২/৫৬০ [সনদ বিশুদ্ধ]।
২১৮ আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৪৩৯।
২১৯ তাবাকাতে ইবনে সাআদ: ৩/৩৫।
২২০ তারিখে তাবারি: ৬/৬৪।
২২১ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৫/২৪৫, ৭/৪০৫, ৪০৬; মানহাজু ইবনি তাইমিয়া ফি মাসআলাতিত তাকফির: ৩০৯।
২২২ তারিখে তাবারি: ৬/৬৪।
২২৩ আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৪৪০।
২২৪ তারিখে তাবারি: ৬/৬৪।
২২৫ জাহাবি প্রণীত তারিখুল ইসলাম আহদিল খুলাফাইর রাশিদিন: ৬৫৪।
২২৬ তারিখে তাবারি: ৬/৬৫।
📄 আলি রা.-এর খেলাফতকাল, তাঁর বয়স ও কবরের স্থান
খেলাফতকাল : খলিফা ইবনে খাইয়াতের ভাষ্য-হজরত আলি রা.-এর খেলাফতকাল ছিল ৪ বছর ৯ মাস ৬ দিন। কেউ কেউ ৩ দিন বা ১৪ দিনও বলেছেন। ৪ বছর ৯ মাস ৩ দিনের বর্ণনাটি অধিক যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। কেননা, ৩৫ হিজরির জিলহজ মাসের ১৮ তারিখে তিনি খেলাফতের বায়আত নেন এবং ৪০ হিজরির রমজান মাসের ২১ তারিখে তিনি শাহাদতবরণ করেন। ২২৭
আমিরুল মুমিমিন হজরত আলি রা.-কে হাসান, হুসাইন ও আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা. গোসল দেন। তিনটি কাপড়ে তাঁকে কাফন পরানো হয়। তাতে কামিস ছিল না। হাসান রা. চার তাকবিরের সাথে জানাজার নামাজ পড়ান। সনদবিহীন এক বর্ণনামতে নয় তাকবিরের কথা বলা হয়। ২২৮
কবরের স্থান: আমিরুল মুমিমিন হজরত আলি রা.-এর কবর কোথায়-এ ব্যাপারে বিভিন্ন উক্তি রয়েছে। আল্লামা ইবনুল জাওজি রাহ. এ-সংক্রান্ত কয়েকটি বর্ণনা উদ্ধৃত করার পর বলেছেন, এসব বর্ণনার মধ্যে কোনটি সর্বাধিক বিশুদ্ধ সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। ২২৯
এ ব্যাপারে যেসব বর্ণনা পাওয়া যায়, তা হচ্ছে-
* ফজর নামাজ থেকে ফেরার পূর্বে হাসান ইবনে আলি রা. আমিরুল মুমিমিন হজরত আলি রা.-কে কিন্দার সাথে লাগোয়া একটি মাঠের জামে মসজিদের কাছে দাফন করেন। ২৩০
* আরেক বর্ণনায় এসেছে; কুফার প্রশাসনিক কার্যালয়ের সাথে সংযুক্ত জামে মসজিদের পাশে রাতের বেলা আমিরুল মুমিমিন হজরত আলি রা.-কে দাফন করা হয় এবং তাঁর কবর ঢেকে রাখা হয়। ২৩১
* অন্য বর্ণনামতে, আমিরুল মুমিমিন হজরত আলি রা.-এর ছেলে হাসান রা. তাঁকে মদিনায় স্থানান্তর করে সেখানে দাফন করেন। ২৩২
* আরেকটি বর্ণনায় দেখা যায়, কুফার নাজাফ এলাকায় যে কবরকে তাঁর প্রতি সম্পৃক্ত করা হয়, সেটাই তাঁর কবর। কিন্তু কতেক পূর্ববর্তী ওলামায়ে কেরাম; যেমন: কুফার বিচারপতি শুরাইক বিন আবদুল্লাহ নাখয়ি (মৃত: ১৭৮ হিজরি) এবং মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান হাজরামি (মৃত: ২৯৭ হিজরি) এই উক্তি অস্বীকার করেন। ২০০
বাস্তবতা হচ্ছে, নাজাফে আলি রা.-এর স্মৃতিস্মারকের অস্তিত্ব উদ্ভাবন করেছে আব্বাসি শাসনামলের রাফেজি প্রশাসক বনুবুইয়া। শিয়া রাফেজিরা চতুর্থ হিজরি শতাব্দীতে নিজেদের অভ্যেসমতে এটা নির্মাণ করে এবং প্রচারণা চালায়। অথচ প্রায় সকল বিশ্লেষক এ ব্যাপারে একমত যে, এটা আলি রা.- এর কবর নয়; বরং মুগিরা ইবনে শুবাহ রা.-এর কবর।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন,
'নাজাফে যে আলি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে, সে ব্যাপারে ইতিহাসবিদগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, সেটা আলি রা.-এর কবর নয়; বরং মুগিরা ইবনে শুবাহ রা.-এর কবর। কেউই বলেননি এটা আলি রা.-এর কবর। আজ থেকে তিন শতাব্দী পূর্বে আহলে বাইত এমনকি শিয়াদের প্রাধান্য সত্ত্বেও এবং কুফায় তাদের শাসন-ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও কেউই ওখানে জিয়ারতের ইচ্ছা পোষণ করেনি। তবে আলি স্মৃতিস্তম্ভটি হজরত আলি রা.-এর ইনতেকালের ৩০০ বছর পর অনারব শাসক বনুবুইয়ার শাসনামলে নির্মিত হয়। ২৩৪
অন্যত্র তিনি লিখেন—
'আলি স্মৃতিস্তম্ভের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের অভিমত হচ্ছে, সেটা তার কবর নয়; বরং সেটা মুগিরা ইবনে শুবাহ রা.-এর কবর বলে কথিত আছে। আলি রা.-এর ইনতেকালের ৩০০ বছর পর অনারব শাসক বনুবুইয়ার শাসনামলে এর অস্তিত্ব দেখা যায়। ২৩৫
আলি রা.-এর শাহাদতের সময় তাঁর বয়স: শাহাদতের সময় তাঁর বয়স কত ছিল—এ ব্যাপারে বিভিন্ন উক্তি রয়েছে। কেউ বলেছেন ৫৩ বছর, কারও মতে ৬৫ বছর, আবার কেউ কেউ ৬৩ বছর বলেও অভিমত পোষণ করেছেন। সর্বশেষ উক্তিটি অধিক বিশুদ্ধ। ২৩৬
টিকাঃ
২২৭. আততারিখ: ১৯৯; বুখারি প্রণীত আততারিখল কাবির: ১/৯৯ (সনদ বিশুদ্ধ)।
২২৮. তাবাকাতে ইবনে সাআদ : ৩/৩৭; আলমুনতাজাম: ৫/১৭৫; তাবাকাতে ইবনে সাআদ : ৩/৩৩৭; আলমুনতাজাম: ৫/১৭৫।
২২৯. আলমুনতাজাম: ৫/১৭৮।
২৩০. তাবাকাতে ইবনে সা’আদ: ৩/৩৮; আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৪৪১।
২৩১. আলমুনতাজাম: ৫/১৭৭; জাহাবি প্রণীত তারিখুল ইসলাম আহদিল খুলাফাইর রাশিদিন: ৬৫৪।
২৩২. তারিখে বাগদাদ: ১/১৩৮।
২০০. আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৪৪১।
২৩৪.
২৩৫.
২৩৬.
📄 মুসলমানদের ওপর ভ্রান্ত ও বিকৃত ফেরকার কুপভাব
ইসলামি রাজ্যসমূহে ও মুসলিম সমাজে ভ্রান্ত ফেরকা ও বিকৃত দলের উদ্ভবের ফলে ওখানকার অধিবাসীদের মাঝে ভীতির সঞ্চার হয়। ভ্রান্ত ফেরকাগুলো সেখানকার শান্তি-শৃঙ্খলাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করে মানুষের আকিদা-বিশ্বাসে। সেখানকার ভূখণ্ড ফিতনা-ফাসাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বিষিয়ে তোলে। দীন থেকে বেরিয়ে যাওয়া খারেজিদের এই ছিল অবস্থা। আলি রা.-এর বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহ করেছে। তাঁকে কাফের বলেছে। একটু পূর্বেই গত হলো যে, এই দলটি আলি রা.-কে অতর্কিত শহিদ করে ফেলে। আবার এই হত্যাকাণ্ডও তারা এই বিশ্বাস নিয়ে ঘটিয়েছে যে, তারা এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে। অথচ এটা ছিল সম্পূর্ণরূপে তাদের মনগড়া মতবাদ ও শয়তানের আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। এর বিপরীতে তাদের কাছে কোনো প্রমাণ ছিল না।
যাইহোক, পূর্বেকার আলোচনা দ্বারা বিষয়টি আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, আলি রা.-এর শাহাদতের সবচে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল খারেজিরা। আমরা তাদের চিন্তাধারা ও মন-মানসিকতা সম্পর্কে ধারণা পেয়ে গেছি। সুতরাং তাদের থেকে সাবধান হওয়া আমাদের গোটা মুসলিম জাতির উচিত। তাদের ভ্রান্ত চিন্তাধারা ও অসার মতাদর্শ খণ্ডনে ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামের পথে আহ্বানকারীদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করা আবশ্যক; যাতে শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় থাকে। সুন্নাতের আলো উদ্ভাসিত হয়। বেদআতের মশাল নিভে যায়। খুবই উত্তম ও যথাযথ পন্থায় তাদের বিতাড়নের পাশাপাশি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা-বিশ্বাস সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা করা এবং বেদআত ও বেদআতিদের শিকড় উপড়ে ফেলা দ্বারা মুসলিম সমাজের সভ্যতা ও সমৃদ্ধি আসবে। উম্মতের নানা প্রভেদকে একতার ছায়াতলে নিয়ে আসাও জরুরি। ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাস সম্পর্কে যারা অবগত, তারা ভালো করে জানেন—যে শাসকশ্রেণিই সুন্নাতের ওপর অবিচল ছিলেন, কেবল তাঁরাই মুসলমানদের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে ঐক্যের প্লাটফর্মে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁদের মাধ্যমে জিহাদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। শিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমন কার্যকর হয়েছে। প্রাচীন ও আধুনিক—সর্বযুগে তাঁদের মাধ্যমেই ইসলামের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে।
পক্ষান্তরে যে রাজ্যব্যবস্থা বেদআতের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, সেখানে মতানৈক্য, দ্বন্দ্ব, বিশৃঙ্খলা, হাঙ্গামা, অন্যায়-অবিচার ও বেদআতের পরিবেশই বিরাজ করেছে। মুসলমানদের ঐক্য টুকরো টুকরো হয়েছে। দ্রুতই তারা হারিয়ে গেছে ধ্বংসের অতলে। তাদের যুগ ফুরিয়ে গেছে।২৩৭
টিকাঃ
২৩৭. আবদুল হামিদ আসসাহিবানি প্রণীত সিয়ারুশ শুহাদা দুরুসুন ওয়া ইবার: ৭৭।
📄 হিংস্র খারেজিদের মনে প্রকৃত মুমিনদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ
হিংসুটে খারেজিদের মনে সত্যিকার মুমিনদের বিরুদ্ধে শত্রুতা, বিদ্বেষ ও হিংসা কী পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল, তার বড় একটি প্রমাণ আবদুর রহমান ইবনে মুলজিমের ওই উক্তি: যেটা সে তার তরবারি সম্পর্কে বলেছিল। সে বলেছে, 'আমি এটা ১ হাজার দিরহাম দিয়ে ক্রয় করেছি। আরও ১ হাজার দিরহাম ব্যয় করে এটাকে বিষমিশ্রিত করেছি। গোটা শহরবাসীর ওপর যদি এর একটি আঘাত পতিত হয়, তবে কেউই প্রাণে বাঁচতে পারত না। '২৩৮
নিঃসন্দেহে তার এই উক্তি তাদের অন্তরে গেঁথে থাকা বিদ্বেষ সম্পর্কে আমাদের স্পষ্টভাবে জানান দেয়। এমন হিংসা-বিদ্বেষ তারা কেবল গোটা মুসলিম জাতির বিরুদ্ধেই নয়; বরং স্বয়ং আলি বিন আবি তালিব রা.-এর মতো ইসলামের মহান ব্যক্তির বিরুদ্ধেও লালন করত। অথচ আলি রা. ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও কোমল স্বভাবের মানুষ।
আমার ভাই, আল্লাহ তোমাদের হেফাজত করুন। এটাও একটু চিন্তা করে দেখুন, কীভাবে এই ভ্রান্ত মতবাদ এবং বিকৃত চিন্তা-চেতনা লালনকারীরা মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মুমিনদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, আর পৌত্তলিকদের ছেড়ে দিয়েছে। ২৩৯
টিকাঃ
২৩৮. তারিখে তাবারি: ৬/৬২।
২৩৯. আবদুল হামিদ আসসাহিবানি প্রণীত সিয়ারুশ শুহাদা দুরুসুন ওয়া ইবার : ৭৮।