📄 আলি রা.-এর শাহাদতের ঘটনা
ইবনুল হানাফিয়া বলেন, আমিও ওই রাতে লোকজনের সাথে জামে মসজিদে নামাজ পড়েছি। নামাজে এত অধিক পরিমাণ লোক অংশগ্রহণ করে যে, দরজার কাছেও অনেকের নামাজ পড়তে হয়েছে। কেউ ছিল কিয়ামে, কেউ রুকুতে, কেউ সেজদায়। সারারাত তাঁরা ইবাদত ও নামাজ পড়ে ক্লান্ত হতো না। সে রাত ভোরবেলা আলি রা. ফজর নামাজের জন্য বের হন। আসার পথে লোকদের ঘুম থেকে জাগাবার জন্য 'আসসালাত আসসালাত' শব্দে আহ্বান করেন। মসিজদে প্রবেশকালে তিনি একটি আলোকরশ্মি দেখতে পান এবং এই আওয়াজ শোনেন— فرأيت الحكم لله يا علي لا لك ولا لأصحابك ، سینا 'আল্লাহ ছাড়া কারও হুকুম করার অধিকার নেই। হে আলি, তোমারও নেই এবং তোমার অনুসারীদেরও নেই।' এরপর আমি একটি তরবারি দেখলাম। এবং সাথে সাথে আরেকটি তরবারির ওপর আমার দৃষ্টি পড়ল। এরপর আলি রা.-কে বলতে শুনলাম—'এই লোক যেন পালিয়ে যেতে না পারে।' লোকজন চারদিক দিয়ে তাকে ঘিরে রাখল। সে আর পালাতে পারল না। ধরা পড়ল। তাকে আলি রা.-এর সামনে পেশ করা হলো। লোকদের সাথে আমিও তার কাছে গেলাম। এরপর আলি রা. সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন, 'আমি যদি মারা যাই, তবে কিসাস হিসেবে তাকে হত্যা করবে। আর যদি বেঁচে যাই তাহলে আমিই সিদ্ধান্ত নেব তার ব্যাপারে কী করা যায়।'২০৮
মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া বলেন, এরপর লোকেরা হতচকিত হয়ে হাসান রা.- এর কাছে গেল। ইবনে মুলজিমকে সেসময় একটি মশকের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ইবনে কুলসুম বিনতে আলি রা. তাঁর পিতার অবস্থা দেখে কাঁদছিলেন। তিনি ইবনে মুলজিমকে বললেন, 'হে আল্লাহর দুশমন, আমার আব্বার কোনো ক্ষতি হবে না। আল্লাহ তোকেই অপদস্থ করবেন।' ইবনে মুলজিম বলল, 'তাহলে তুমি কাঁদছ কেন? এই তরবারিটি আমি ১ হাজার দিরহাদ দিয়ে ক্রয় করেছি। আরও ১ হাজার দিরহাম দিয়ে একে বিষমিশ্রিত করেছি। এর একটি আঘাত যদি গোটা শহরবাসীকে মারা হয়, তবে কেউই বেঁচে থাকবে না।'২০৯
টিকাঃ
২০৭ তারিখে তাবারি: ৬/৬২।
২০৮ তারিখে তাবারি: ৬/৬২।
২০৯ তারিখে তাবারি: ৬/৬২।
📄 চিকিৎসককে আলি রা.-এর উপদেশ এবং ওযুর আগ্রহ
আবদুল্লাহ ইবনে মালিক বলেন, যেদিন আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. আঘাতপ্রাপ্ত হন, সেদিন ক'জন চিকিৎসককে ডেকে আনা হয়। তম্মধ্যে আসির বিন আমর আসসাকুনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ চিকিৎসক। কিসরার সম্রাটও তাঁর কাছ থেকে চিকিৎসা নিত। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে সে ছাগলের গরম ফুসফুস নেয়। সেখান থেকে বিশেষ একটি রগ বের করে আলি রা.- এর ক্ষতস্থানে রাখে। এরপর তাতে ফুঁ দেয় এবং বাইরে বের করে। দেখা গেল তাতে মস্তিষ্কের সাদা আবরণ লেগে আছে। তার মানে, তরবারির আঘাত মস্তিষ্কের গভীরে গিয়ে পৌঁছেছে। এরপর চিকিৎসক বললেন, 'আপনি এখন নিজের কাজ সেরে ফেলুন। আর প্রাণে বাঁচা সম্ভব নয়।'২১০
আবদুল্লাহ বলেন, এ সময় জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ আলি রা.-কে জিজ্ঞেস করেন, 'আপনার যদি মৃত্যু হয়ে যায়, তাহলে আমরা কি হাসানের নিকট বায়আত গ্রহণ করব?' তিনি বললেন, 'আমি তোমাদেরকে আদেশও করছি না, নিষেধও করছি না। এ ব্যাপারে কী করবে তোমরাই ভালো জানো।'২১১
টিকাঃ
২১০ আল ইসতিয়াব: ৩/১১২৮।
২১১ আল ইসতিয়াব: ৩/১১২৮।
📄 হাসান ও হুসাইন রা.-কে আলি রা.-এর উপদেশ
এরপর তিনি তাঁর দুই ছেলে হাসান ও হুসাইনকে ডাকলেন। তাঁদের উদ্দেশ করে বললেন, 'আমি তোমাদের কিছু অসিয়ত করতে চাই। আল্লাহকে ভয় করবে। দুনিয়ায় মন লাগাবে না; যদিও সে তোমাদের পিছু লেগে থাকে। পাওয়ার মতো নয় এমন কোনো বস্তুর জন্য আক্ষেপ করবে না। সত্য কথা বলবে। এতিমের ওপর দয়া করবে। অসহায়কে সাহায্য করবে। নিজের পরকালকে সাজাবার চেষ্টা করবে। জালেমকে তার জুলম হতে বাধা দেবে। আল্লাহর কিতাবমতে আমল করবে। তাঁর বিধান পালন করতে গিয়ে কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কার পাত্তা দেবে না।'
এরপর তিনি তার তৃতীয় ছেলে মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়ার দিকে ফিরে বললেন, 'আমি তোমার দুই ভাইকে যে উপদেশ দিয়েছি তুমি কি তা ভালো করে শুনতে পেয়েছ?'২১২
তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' আলি রা. বললেন, 'তুমি তোমার বড় ভাইদের শ্রদ্ধা করবে। কেননা, তোমার ওপর তাদের অনেক হক আছে। তারা যা বলবে তদানুযায়ী আমল করবে। তাদের নির্দেশ মান্য করতে বিলম্ব করবে না।'
এরপর তিনি হাসান ও হুসাইনকে ডেকে আবার উপদেশ দিয়ে বলেন, 'আমি তাঁর (মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া) ব্যাপারে তোমাদের কল্যাণকামিতার উপদেশ দিচ্ছি। কেননা, সে-ও তোমাদের পিতার সন্তান। তোমরা তো জানো, তাঁর পিতা তাঁকে কী পরিমাণ স্নেহ করে।'
অতঃপর হাসান রা.-এর দিকে ফিরে তিনি বলেন, 'হে আমার ছেলে, সকল ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে চলবে। নামাজ কায়েম করবে। জাকাত আদায় করবে। ক্রোধ নিবারণ করবে। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে। মুর্খদের ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করবে। দীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করবে। দৃঢ়তার সাথে কাজ করবে। কুরআনের হেফাজত করবে। প্রতিবেশীর সাথে উত্তম ব্যবহার করবে। ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ করবে। নির্লজ্জতা থেকে দূরে থাকবে।'২১৩
মৃত্যু একেবারে নিকটবর্তী হলে তিনি অসিয়ত করে বলেন,
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
এটা আলি ইবনে আবু তালিবের অসিয়ত। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসুল। তিনি তাঁকে হেদায়াত ও দীনে হকসহ পাঠিয়েছেন; যাতে অন্যান্য সকল দীনের ওপর একে বিজয়ী করতে পারেন। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্যে নিবেদিত। তাঁর কোনো শরিক নেই—এটা বলার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি একজন মুসলিম।
হে হাসান, আমি তোমাকে, আমার সকল সন্তানকে ও যাদের কাছে আমার এ অসিয়তলিপি পৌঁছবে, সকলের কাছে আমার এ উপদেশ রইল—তোমরা সবাই আল্লাহকে ভয় করে চলবে। খাঁটি মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করো। ছিন্নভিন্ন হয়ে থেকো না। আমি আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি—“সালাত ও সিয়ামের ব্যাপকতার তুলনায় নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও সুসম্পর্কের গুরুত্ব অনেক বেশি।” তোমরা রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের অধিকারের প্রতি যত্নবান থেকো। তাঁদের অধিকার প্রদানপূর্বক সম্পর্ক রক্ষা করিয়ো। আল্লাহ তোমাদের হিসাব সহজ করে নেবেন। এতিমদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তাঁদের খোরাক বন্ধ করো না। তোমরা বেঁচে থাকতে যেন তাঁরা ধ্বংস হয়ে না যায়। প্রতিবেশীর অধিকারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, তাঁদের অধিকারের ব্যাপারে তোমাদের নবির অসিয়ত রয়েছে। তিনি প্রতিবেশীর ব্যাপারে সর্বদা অসিয়ত করতেন। এমনকি আমাদের মনে হতে লাগল যে, হয়তো তিনি প্রতিবেশীকেও ওয়ারিসদের অন্তর্ভুক্ত করে দেবেন।
পবিত্র কুরআনের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। এমন যেন না হয় যে, কুরআন অনুসরণে অন্যরা তোমাদের চেয়ে এগিয়ে যাবে। সালাতের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কারণ, সালাত হচ্ছে দীনের স্তম্ভ। তোমাদের প্রতিপালকের ঘর সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করো। যতদিন জীবিত থাকো, তোমাদের থেকে যেন তা খালি না হয়। যদি তা ত্যাগ করা হয়, তা হলে পরস্পর বিতর্ক করো না। রমজান মাসের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, এ মাসের সিয়াম জাহান্নামের আগুন থেকে ঢালস্বরূপ। আল্লাহর পথে জান-মাল দিয়ে জিহাদ করার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।
জাকাতের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, জাকাত আল্লাহর ক্রোধকে নির্বাপিত করে। তোমাদের নবির জিম্মিদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তোমাদের সম্মুখে যেন তাদের ওপর অত্যাচার না হয়। তোমাদের নবির সাহাবিগণের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের সম্পর্কে সংযত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।
ফকির ও মিসকিনদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তাঁদেরকে তোমাদের সমাজের অন্তর্ভুক্ত করে রেখো। তোমাদের অধীনস্থ দাস-দাসীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনের সর্বশেষ উপদেশ দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন-"আমি দুই শ্রেণির দুর্বলদের ব্যাপারে সদয় হতে তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছি। তারা হলো নারী ও দাস-দাসী।" সালাত, সালাত; আল্লাহর ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করো না। এ মনোভাব তোমাদেরকে তাদের ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে, যারা তোমাদের আক্রমণ করতে চায় কিংবা যারা তোমাদের ওপর বিদ্রোহ করতে চায়। মানুষের সাথে সদালাপ করো। মহান আল্লাহ তোমাদেরকে সে আদেশই করেছেন। সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা ত্যাগ করো না। যদি এ নীতি অবলম্বন করো, তাহলে নিকৃষ্ট লোকদের হাতে নেতৃত্ব চলে যাবে। তখন তোমরা দুআ করবে; কিন্তু সে দুআ কবুল হবে না। পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা করবে এবং একে অপরের জন্যে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করবে। কারও দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করা, সম্পর্ক ছিন্ন করা ও অনৈক্য সৃষ্টি করা থেকে সাবধান থাকবে। ভালো কাজে ও তাকওয়ামূলক কাজে একে অপরের সহযোগিতা করো।
পাপ কাজে ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজে কারও সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে সদা-সর্বদা ভয় করিয়ো। তিনি কঠিন শাস্তি দানকারী। আহলে বাইতের কোনো ক্ষতি করা থেকে আল্লাহ তোমাদেরকে রক্ষা করুন। তোমাদের নবি (এর সুন্নাত)-কে হেফাজত করুন। আমি তোমাদেরকে মহান আল্লাহর দায়িত্বে রেখে যাচ্ছি। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।'
এরপর তিনি কেবল 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কালেমা পড়তে থাকেন। একপর্যায়ে তাঁর নির্ধারিত নিঃশ্বাস শেষ হয়ে যায়। সাথে সাথে পার্থিব জীবনের চির-অবসান ঘটে। তাঁর ইনতেকালের তারিখ ৪০ হিজরি সনের রমজান মাস।২১৪
এক বর্ণনায় এসেছে; তিনি রমজানের ২১ তারিখ ভোরে শহিদ হন।২১৫ দুষ্কৃতিকারীর হাতে আঘাতের তিনদিন পর তিনি ইনতেকাল করেন।২১৬
টিকাঃ
২১০ তারিখে তাবারি: ৬/৬৩।
২১৩ তারিখে তাবারি: ৬/৬৩।
২১৪ তারিখে তাবারি: ৬/৬৪।
২১৫ বুখারি প্রণীত আততারিখুল কাবির: ১/৯৯ [সনদ বিশুদ্ধ]।
২১৬ আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৪৩০।
📄 হত্যাকারীর চেহারা বিবর্ণ করতে আলি রা.-এর বাধা
তিনি তাঁর হন্তারকের ব্যাপারে বলেন, 'তাকে বন্দি করে রাখো। আমি মারা গেলে তাকে হত্যা করবে। যদি বেঁচে থাকি তবে আঘাতের বদলে কিসাস নেওয়া হবে।'২১৭
আরেক বর্ণনায় এসেছে; তিনি বলেছেন, 'তাকে পানাহার-সামগ্রী দাও। বন্দির ক্ষেত্রে কোমলতা গ্রহণ করো। আমি যদি সুস্থ হয়ে উঠি তাহলে নিজ খুনের ব্যাপারে আমিই দায়িত্ব নেব। চাইলে ক্ষমা করে দেবো অন্যথায় বদলা নেব।'২১b
অন্য বর্ণনায় এটুকু বাড়তি ভাষ্য এসেছে যে, 'আমি যদি মারা যাই, তাহলে আমার হত্যার মতো তাকে হত্যা করবে। সীমা অতিক্রম করবে না। আল্লাহ তাআলা সীমালঙ্ঘনকারীকে ভালোবাসেন না।'২১৯
তিনি হজরত হাসান রা.-কে নিজ হন্তারকের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন ও চেহারা বিকৃতি করতে নিষেধ করতে গিয়ে বলেন, 'হে বনু আবদিল মুত্তালিব, আমি তোমাদেরকে মুসলমানদের রক্তে যেন ডুবন্ত না দেখি। "আমিরুল মুমিনিনকে হত্যা করা হয়েছে, আমিরুল মুমিনিনকে হত্যা করা হয়েছে"- এই বলে যেন তাদের হত্যা করা না হয়। সাবধান! কিছুতেই অন্য কাউকে হত্যা করা যাবে না। আর হে হাসান, তুমি শোনো। আমি যদি তার আঘাতে মারা যাই, তাহলে একটি আঘাতের পরিবর্তে তাকে একটি আঘাত করবে। খুনির চেহারা বিকৃত করবে না। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন করবে না। কেননা, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-“কারও চেহারা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকৃত করবে না।”'২২০
স্মর্তব্য, হজরত আলি রা. তাঁর হত্যাকারীর ব্যাপারে যে অসিয়ত করেছিলেন, সে ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। কিছু সহিহ কিছু জয়িফ। তম্মধ্যে একটি রেওয়ায়াত হচ্ছে-আলি রা. তাঁর হত্যাকারীকে হত্যা করার পর আগুনে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ এই বর্ণনার সনদ জয়িফ তথা দুর্বল। কেননা, অন্যান্য সব বর্ণনার মর্ম একদিকে। সেটা হচ্ছে-তিনি বলেছেন, 'আমি যদি তার আঘাতে মারা যাই, তাহলে তাকে হত্যা করবে।' এ ছাড়া অন্য কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিতে তিনি নিষেধ করেছেন। সুতরাং এই অর্থের সব বর্ণনা একটি আরেকটির সমর্থন করে। যা দ্বারা বিপরীতধর্মী বর্ণনা অসার ও অমূলক হিসেবে সাব্যস্ত হয়। এ দিকটিও বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, আলি রা. তার হত্যাকারীকে মুরতাদ আখ্যায়িত করেননি। বেঁচে থাকাবস্থায় তাকে হত্যা করতে নির্দেশ দেননি; বরং যখন কিছু লোক তাকে হত্যা করতে চাইল, তিনি তাদের বাধা দিলেন। বললেন, 'তাকে হত্যা করবে না। আমি যদি সুস্থ হই তবে তার কাছ থেকে আঘাতের বদলায় কিসাস নেব। আর যদি মারা যাই তবে তাকে হত্যা করবে।'২২১
প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত; আলি রা. ইনতেকাল করলে হাসান রা. ইবনে মুলজিমকে তলব করেন। সে এসে হাসান রা.-কে বলল, 'আমি আপনাকে একটি কথা বলতে চাই।' হাসান রা. বললেন, 'কী কথা?' ইবনে মূলজিম বলল, 'আমি হাতিমে আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করেছি—আলি ও মুআবিয়া উভয়কে হত্যা করব, অন্যথায় আত্মহত্যা করব। অতএব, আপনি এই শর্তে আমাকে ছেড়ে দিন যে, আমি মুআবিয়ার কাছে যাব। তাকে হত্যা করতে সক্ষম হই বা না হই; আমি বেঁচে থাকলে উভয় পরিস্থিতিতে আপনাকে কথা দিচ্ছি—আপনার কাছে ফিরে আসব। নিজেকে আপনার হাতে সোপর্দ করব।'
হাসান রা. বললেন, 'না, কখনো না—যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি নিজ চোখে আগুন দেখে না নেবে'। এরপর তিনি এগিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করলেন। পরে লোকজন তার গায়ে আগুন লাগিয়ে দিলো।২২২ তবে এই বর্ণনা বিচ্ছিন্ন।২২৩
হাসান ও হুসাইন রা.-সহ শোকসন্তপ্ত আহলে বাইতের সম্পর্কে যে কথা বলা হয়েছে যে, তাঁরা আবদুর রহমান ইবনে মুলজিমের ব্যাপারে আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর ওসিয়তের ওপর কঠোরতার আশ্রয় নিয়েছেন। এটা মোটেই প্রমাণিত নয়।
আলি রা.-কে দাফনের পর ইবনে মুলজিমকে উপস্থিত করা হয়। অতঃপর সবাই সমবেত হয়। পরে তাকে পুড়িয়ে মারা হয়। মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া, হুসাইন ও আবদুল্লাহ ইবনে জাফর ইবনে আবি তালিব প্রমুখ বলেন, 'আমাদের ছেড়ে দিন। এটা দেখে মনটাকে খানিক শান্ত করি।'
এরপর আবদুল্লাহ তার মাথা ও পা কাটলেন। সে চিৎকার করতে লাগল। পরে তার চোখ সেলাই করলেন; কিন্তু সে কোনো সাড়াশব্দ করল না; বরং বলতে লাগল—'তোমরা তোমাদের চাচার দুচোখ সেলাই করছ।' অতঃপর সে 'সুরা আলাক'-এর প্রথম আয়াত তেলাওয়াত করল। তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। সম্পূর্ণ সুরা সে তেলাওয়াত করল। অতঃপর তার জিহ্বা কর্তন করার কথা বলা হলে সে চিৎকার করতে আরম্ভ করল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'কেন চিৎকার করছ?' জবাবে সে বলল, 'চিৎকার করছি না; বরং আমি তো বেঁচে থাকতে একটি মুহূর্তও আল্লাহর জিকর ছাড়া কাটাতে চাই না।' পরে তার জিহ্বা কাটা হলো। অতঃপর আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। সে ছিল গৌধূম বর্ণের ও উজ্জ্বল চেহারার লোক। দুই কানের লতি পর্যন্ত লম্বা চুল এবং ললাটে ছিল তার সেজদার চিহ্ন।২২৪
আবদুর রহমান ইবনে মুলজিমের ব্যাপারে ইমাম জাহাবি রাহ. বলেন, আলি রা.-এর খুনি ছিল এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের খারেজি। সে মিসর বিজয় অভিযানে অংশগ্রহণ করেছে। ওখানে সম্মানের সাথে বসবাস করেছিল। সে কুরআন পড়েছিল এবং দীনের আহকাম শিখেছিল। সে ছিল বনু ওয়াতদুলের বাসিন্দা। মিসরে ওই গোত্রের সবচে বড় অশ্বারোহী, খুবই ইবাদতগুজার এবং মুআজ বিন জাবাল রা.-এর শাগরেদ ছিল। সাবিগ তামিমিকে সে-ই উমর রা.-এর কাছে পাঠিয়েছিল। সে তার কাছে কুরআনের মুতাশাবিহাতের ব্যাপারে প্রশ্ন করে। তার ব্যাপারে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন- 'কিন্তু শেষে তার মস্তিষ্কে বিকৃতি এসে গেল। মারাত্মক অঘটন ঘটিয়ে বসল। খারেজিরা তাকে উম্মতের সবচে উত্তম ব্যক্তি মনে করে।' ইমরান ইবনে হাতান নামক জনৈক খারেজি ইবনে মুলজিমের প্রশংসায় বলেছে-
يا ضربة من تقي ما أراد بها ** إلا ليبلغ من ذي العرش رضوانا إني لأذكره يوماً فأحسبه ** أوفى البرية عند الله ميزانا
'সেই আল্লাহভীরু লোকটির তরবারির আঘাত আমার মনে পড়ে। যেই আঘাতের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আরশের অধিপতির সন্তুষ্টি লাভ করা। আজ আমি তাকে স্মরণ করছি এবং ভাবছি আল্লাহর নিকট তার পাল্লা সবার চেয়ে ভারি হবে।'
এদিকে রাফেজিদের মতে ইবনে মুলজিম আখেরাতে সবচে নিকৃষ্ট মাখলুক। আর আমরা আহলে সুন্নাত তার জন্য জাহান্নামের শাস্তি কামনা করি। এটাও সম্ভব বলে মনে করি যে, আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমাও করতে পারেন। খারেজি ও রাফেজিরা তার সম্পর্কে যে আকিদা লালন করে, সেটা আমাদের আকিদা নয়। তার ব্যাপারেও ওই বিধান যা উসমান, জুবাইর, তালহা, সাইদ বিন জুবাইর, আম্মার, খারিজা ও হুসাইনের হত্যাকারীদের ব্যাপারে রয়েছে। এসব খুনিদের থেকে আমরা নিজেদের দায়মুক্তি প্রকাশ করছি। আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করি এবং তাদের ব্যাপারটি আল্লাহর হাতে সোপর্দ করি।২২৫
মুআবিয়া রা.-কে হত্যার দায়িত্ব নিয়েছিল বারক বিন আবদুল্লাহ। নির্ধারিত দিনে মুআবিয়া ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য বের হলে পথে বারক তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করে। কেউ বলেছেন বিষযুক্ত খঞ্জর দিয়ে আঘাত করে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তা তার নিতম্বে লেগে সেখান থেকে কিছু অংশ কেটে যায়। লোকজন ওই খারেজিকে ধরে হত্যা করে ফেলে।
মৃত্যুর পূর্বে সে মুআরিয়াকে বলেছিল-'আমাকে ছেড়ে দিন, আমি আপনাকে একটি সুসংবাদ দেবো।' মুআবিয়া রা. বললেন, 'কী সে সুসংবাদ?' সে বলল, 'আমার আরেক ভাই আজ আলি ইবনে আবু তালিবকে হত্যা করেছে।' মুআবিয়া রা. বললেন, 'হয়তো সে হত্যা করতে সক্ষম হয়নি।' খারেজি বলল, 'অবশ্যই হয়েছে। কেননা, আলি কোনো দেহরক্ষী রাখেন না।' এরপর মুআবিয়া রা.-এর নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়।
মুআবিআ রা.-এর চিকিৎসার জন্যে ডাক্তার আনা হয়। ডাক্তার জখম দেখে মুআবিয়াকে জানায়-'আপনার জখমে বিষ আছে। এর চিকিৎসায় হয় এখানে উত্তপ্ত লোহার দাগ দিতে হবে; নতুবা এমন একটা তরল ওষুধ পান করতে হবে; যার দ্বারা বিষ নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু আপনার আর সন্তানাদি হবে না।' মুআবিয়া রা. বললেন, 'আমি আগুনের দাগ দেওয়া কষ্ট সহ্য করতে পারব না। তবে আগামীতে সন্তান না হলেও বর্তমান দুই ছেলে ইয়াজিদ ও আবদুল্লাহকে দেখে আমার চোখ জুড়াবে।'
অবশেষে ডাক্তার তাঁকে তরল ওষুধ সেবন করায়। এর ফলে তাঁর ব্যথা কমে যায়, জখম শুকিয়ে যায় এবং তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। এ ঘটনার পরে মুআরিয়া রা. মসজিদের মধ্যে নিজের জন্যে একটা সুরক্ষিত কক্ষ তৈরি করেন। সেজদার সময় তাঁর চারপাশে পাহারাদার দণ্ডায়মান থাকত।
আমর ইবনুল আস রা.-কে হত্যা করার দায়িত্ব নিয়েছিল আমর ইবনে বকর। সে-ও নির্ধারিত দিনে ফজরের নামাজে যাওয়ার সময় তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্য পথে ওত পেতে বসে থাকে। কিন্তু ঘটনাক্রমে ওই সময় আমরের ভীষণ পেটব্যথা হওয়ায় তিনি মসজিদে আসতে পারেননি। তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে খারিজা ইবনে হুজাফাকে পাঠিয়ে দেন।
খারিজা ছিলেন বনু আমির ইবন লুওয়াইয়ের লোক এবং আমর ইবনে আসে র অন্যতম পুলিশ অফিসার। খারেজি আমর ইবনে বকর তাঁকে আমর ইবনুল আস মনে করে একটিমাত্র আঘাতে হত্যা চূড়ান্ত করে ফেলে। সে বুঝতে পারেনি যে, আমর ইবনে আস রা.-এর স্থলে খারিজা ইবনে হুজাফা নামাজ পড়ানোর জন্য আসছেন।
লোকজন তাকে ধরে ফেলে এবং হজরত আমর ইবনুল আস রা.-এর কাছে নিয়ে যায়। আমর ইবনে বকর লোকজনকে জিজ্ঞেস করল, 'এই লোক কে?' লোকেরা বলল, 'তিনি আমর ইবনুল আস রা.।' সে বলল, 'তাহলে আমি কাকে হত্যা করলাম?' লোকেরা বলল, 'খারিজা ইবনে হুজাফাকে।' সে আমর ইবনুল আস রা.-কে উদ্দেশ্য করে বলল, 'হে ফাসেক, আমি তো ভেবেছি তোমাকে হত্যা করতে পেরেছি।' আমর ইবনুল আস রা. বললেন, 'তুমি আমাকে হত্যার ইচ্ছা পোষণ করেছ, আর আল্লাহর ইচ্ছা ছিল আমার স্থলে খারিজার মৃত্যু।' এরপর তিনি তাকে হত্যা করলেন।২২৬
টিকাঃ
২১৭ ফাজাইলুস সাহাবাহ: ২/৫৬০ [সনদ বিশুদ্ধ]।
২১৮ আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৪৩৯।
২১৯ তাবাকাতে ইবনে সাআদ: ৩/৩৫।
২২০ তারিখে তাবারি: ৬/৬৪।
২২১ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৫/২৪৫, ৭/৪০৫, ৪০৬; মানহাজু ইবনি তাইমিয়া ফি মাসআলাতিত তাকফির: ৩০৯।
২২২ তারিখে তাবারি: ৬/৬৪।
২২৩ আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৪৪০।
২২৪ তারিখে তাবারি: ৬/৬৪।
২২৫ জাহাবি প্রণীত তারিখুল ইসলাম আহদিল খুলাফাইর রাশিদিন: ৬৫৪।
২২৬ তারিখে তাবারি: ৬/৬৫।