📄 ইবনে মুলজিমের যাত্রা ও বিনতে শাজানাহ-এর সাক্ষাৎ
ইবনে মুলজিম আলমুরাদির সম্পর্ক যেহেতু বনু কিন্দার সাথে, তাই সে কুফা গিয়ে পৌঁছল। সে তার উদ্দেশ্য গোপন রেখে অবস্থান করতে থাকে। কুফায় তার নিজ সম্প্রদায়ের যেসব খারেজি বসবাস করত তাদের কাছেও সে তার উদ্দেশ্য গোপন রাখে। একদিন বনু রাবাবের কতিপয় লোকের এক বৈঠকে ইবনে মুলজিম বসে আছে। বৈঠকে তারা নাহরাওয়ানের যুদ্ধে নিজেদের নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে আলোচনা করছিল। একপর্যায়ে ওই গোত্রের এক মহিলা সেখানে উপস্থিত হয়। মহিলার নাম কিতাম বিনতে শাজানাহ। নাহরাওয়ানে তার পিতা ও ভাই আলি রা.-এর হাতে নিহত হয়।
মহিলাটি ছিল সে যুগের এক অপ্রতিদ্বন্ধী অনিন্দ্যসুন্দরী। সারাক্ষণ মসজিদে ইবাদত-বন্দেগিতে নিমগ্ন থাকত। মহিলার ওপর দৃষ্টি পড়তে তার সৌন্দর্য- দর্শনে ইবনে মুলজিম আত্মহারা হয়ে যায়। এমনকি তার আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কেই সে বিস্মৃত হয়ে পড়ে।
অবশেষে সে মহিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মহিলা ৩ হাজার দিরহাম, একজন খাদেম, একজন দাসী ও আলি ইবনে আবু তালিবকে হত্যার শর্তে প্রস্তাবে সম্মত হয়। ইবনে মুলজিম সকল শর্ত মেনে নেয়। প্রথম তিনটি তখনই আদায় করে এবং শেষেরটি সম্পর্কে জানায়—আমি এ শহরে কেবল আলিকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই এসেছি।
উভয়ের মধ্যে বিয়ে হয়ে যায়। তারা একত্রে বসবাস করে। মহিলা আলির হত্যা ত্বরান্বিত করতে ইবনে মুলজিমকে উত্তেজিত করতে থাকে। সে তার নিজের রাবাব গোত্রের ওয়ারদান নামক এক ব্যক্তিকে আলি রা.-কে হত্যা কাজে সহযোগী হিসেবে ইবনে মুলজিমের সাথি বানিয়ে দেয়।
ইবনে মুলজিম শাবিব ইবনে বাজরা নামক আরেক ব্যক্তিকে তার কাজে সহযোগী বানাবার চেষ্টা করে। ইবনে মুলজিম তার কাছে গিয়ে বলে—'তুমি কি দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করতে চাও?' সে বলল, 'কীভাবে?' ইবনে মুলজিম বলল, 'আলিকে হত্যা করতে হবে।' শাবিব বলল, 'তোমার মা তোমাকে হাবিয়ে ফেলুক! তুমি তো এক বীভৎস কাজের পরিকল্পনা নিয়ে এসেছ। আচ্ছা, কীভাবে তাকে হত্যা করবে—বলো।' ইবনে মুলজিম বলল, 'আমি মসজিদে লুকিয়ে থাকব। তিনি যখন ফজরের নামাজে আসবেন তখন তাকে আঘাত হানব ও হত্যা করব। এরপর যদি বেঁচে যাই তাহলে তো অন্তরে তৃপ্তি বোধ করলাম ও প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম হলাম। আর যদি মারা পড়ি তাহলে আল্লাহর কাছে যে প্রতিদান পাব, তা দুনিয়ার থেকে বহুগুণে উত্তম।'
শাবিব বলল, 'তোমার সর্বনাশ হোক! যদি আলি ব্যতীত অন্য কেউ হতো তাহলে আমার কাছে সহজ লাগত। তুমি তো জানো যে, আলি রা. হচ্ছেন প্রথম সময়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তাঁকে হত্যা করতে আমি অন্তরের সাড়া পাচ্ছি না।'
ইবন মূলজিম বলল, 'তোমার কি জানা নেই—নাহরাওয়ানে আলি আমাদের লোকদের হত্যা করেছেন?' শাবিব বলল, 'হ্যাঁ, তা করেছেন।' ইবনে মূলজিম বলল, 'তাহলে আমাদের যেসব ভাইদের তিনি হত্যা করেছেন তার পরিবর্তে আমরা তাকে হত্যা করব।' কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর শাবিব ইবনে মূলজিমের প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করল।
এরপর উভয়ে কিতামের কাছে আসে। সে সেখানকার জামে মসজিদে এতেকাফে বসেছিল। তারা উভয়ে তাকে বলল, 'আমরা আলিকে হত্যার ব্যাপারে একমত হয়েছি।' কিতাম বলল, 'ঠিক আছে। যেদিন তোমরা কার্যসিদ্ধি করবে সেদিন আমার কাছে আসবে।' পরে যে জুমআর রাতে আলি রা. শহিদ হন, সেদিন ইবনে মুলজিম কিতামের কাছে পুনরায় আসে।
এটা ৪০ হিজরির ঘটনা। কিতাম একটি রেশমি কাপড়ে টুকরো চাইল। সেটা তার মাথায় বেঁধে দিলো। তখন ইবনে মুলজিম তার সাথিদেরকে ১৭ রমজান শুক্রবার রাতে হামলা চালাবার কথা জানিয়ে দিলো। তাদেরকে সে আরও জানাল-'আমার আরও দুই সঙ্গী আছে যারা এই একই সময়ে মুআবিয়া ও আমর ইবনে আসের ওপর হামলা করবে।'
নির্ধারিত সময়ে তারা তিনজন; অর্থাৎ, ইবনে মুলজিম, ওয়ারদান ও শাবিব তরবারি সজ্জিত হয়ে মসজিদের যেই দরজা দিয়ে আলি রা. বের হন সেই দরজার কাছে গিয়ে অবস্থান নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে আলি রা. তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে মসজিদে রওনা হন। আসার পথে লোকদের ঘুম থেকে জাগাবার জন্য 'আসসালাত আসসালাত' শব্দে আহ্বান করেন। মসজিদে প্রবেশকালে প্রথমে শাবিব তার তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে। কিন্তু সেই আঘাত আলি রা.-এর গায়ে না লেগে মসজিদের প্রাচীরে তাকের উপর লাগে। এরপর ইবনে মুলজিম আলির মাথার উপরিভাগে আঘাত করে। তখন আলি রা.-এর মস্তক থেকে রক্ত প্রবাহিত হয়ে দাড়ি ভিজে যেতে থাকে।
ওয়ারদান পালিয়ে যাবার সময় লোকেরা তাকে ধরে হত্যা করে ফেলে। শাবিব কিন্দার বসতির দিকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। চারদিকে শুরু হয়ে যায় চিৎকার-হাঙ্গামা। এ সময়ে হাজরামাওতের এক লোক; যার নাম উয়াইমির-সে শাবিবকে ধাওয়া করে। তার হাত থেকে তরবারি ছিনিয়ে নিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দেয়। কিন্তু সে যখন দেখল লোকজন খুনি ওয়ারদানকে তালাশ করছে আর তার তরবারি আমার হাতে, তখন উয়াইমির ভীত হয়ে পড়ল। সে ভাবল; না জানি লোকেরা আমাকে খুনি মনে করে হত্যা করে ফেলে। তাই সে তাকে ছেড়ে দেয়। শাবিব সুযোগ পেয়ে জনসমাগমে ঢুকে যায়। লোকেরা চেষ্টা করেও তাকে আর ধরতে পারেনি।
ইবনে মুলজিম ধৃত হয়। তাকে ঘাড়মোড়া করে বাঁধা হয়। আবু দিমা উপনাম-বিশিষ্ট হামদান গোত্রের এক লোক তার তরবারি ছিনিয়ে নিয়ে ইবনে মূলজিমের পায়ে আঘাত করে; ফলে সে মাটিতে পড়ে যায়। নামাজে ইমামতি করার জন্য আলি রা. জাদা ইবনে হুবাইরা ইবনে আবু ওহাবকে নির্দেশ দেন। তিনি ফজরের নামাজে ইমামতি করেন। আলিকে তাঁর গৃহে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আবদুর রহমান ইবনে মূলজিমকে ঘাড়মোড়া অবস্থায় তার সামনে হাজির করা হয়।
আলি রা. বললেন, 'হে আল্লাহর দুশমন, আমি কি তোমার সাথে উত্তম ব্যবহার করিনি?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' আলি বললেন, 'তুমি এ কাজ কেন করলে?' সে কোনো জবাব দিলো না। অবশ্য সে বলেছে-'আমি ৪০ দিন যাবৎ এ তরবাবি ধার দিয়েছি এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি; যেন সৃষ্টিজগতের সবচে নিকৃষ্ট লোক এ তরবারির আঘাতে হত হয়।' আলি রা. বললেন, 'আমি দেখছি এর দ্বারা তোমাকে হত্যা করা হবে এবং তুমিই হবে সৃষ্টিজগতের নিকৃষ্টতম লোক।'২০৭
📄 আলি রা.-এর শাহাদতের ঘটনা
ইবনুল হানাফিয়া বলেন, আমিও ওই রাতে লোকজনের সাথে জামে মসজিদে নামাজ পড়েছি। নামাজে এত অধিক পরিমাণ লোক অংশগ্রহণ করে যে, দরজার কাছেও অনেকের নামাজ পড়তে হয়েছে। কেউ ছিল কিয়ামে, কেউ রুকুতে, কেউ সেজদায়। সারারাত তাঁরা ইবাদত ও নামাজ পড়ে ক্লান্ত হতো না। সে রাত ভোরবেলা আলি রা. ফজর নামাজের জন্য বের হন। আসার পথে লোকদের ঘুম থেকে জাগাবার জন্য 'আসসালাত আসসালাত' শব্দে আহ্বান করেন। মসিজদে প্রবেশকালে তিনি একটি আলোকরশ্মি দেখতে পান এবং এই আওয়াজ শোনেন— فرأيت الحكم لله يا علي لا لك ولا لأصحابك ، سینا 'আল্লাহ ছাড়া কারও হুকুম করার অধিকার নেই। হে আলি, তোমারও নেই এবং তোমার অনুসারীদেরও নেই।' এরপর আমি একটি তরবারি দেখলাম। এবং সাথে সাথে আরেকটি তরবারির ওপর আমার দৃষ্টি পড়ল। এরপর আলি রা.-কে বলতে শুনলাম—'এই লোক যেন পালিয়ে যেতে না পারে।' লোকজন চারদিক দিয়ে তাকে ঘিরে রাখল। সে আর পালাতে পারল না। ধরা পড়ল। তাকে আলি রা.-এর সামনে পেশ করা হলো। লোকদের সাথে আমিও তার কাছে গেলাম। এরপর আলি রা. সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন, 'আমি যদি মারা যাই, তবে কিসাস হিসেবে তাকে হত্যা করবে। আর যদি বেঁচে যাই তাহলে আমিই সিদ্ধান্ত নেব তার ব্যাপারে কী করা যায়।'২০৮
মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া বলেন, এরপর লোকেরা হতচকিত হয়ে হাসান রা.- এর কাছে গেল। ইবনে মুলজিমকে সেসময় একটি মশকের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ইবনে কুলসুম বিনতে আলি রা. তাঁর পিতার অবস্থা দেখে কাঁদছিলেন। তিনি ইবনে মুলজিমকে বললেন, 'হে আল্লাহর দুশমন, আমার আব্বার কোনো ক্ষতি হবে না। আল্লাহ তোকেই অপদস্থ করবেন।' ইবনে মুলজিম বলল, 'তাহলে তুমি কাঁদছ কেন? এই তরবারিটি আমি ১ হাজার দিরহাদ দিয়ে ক্রয় করেছি। আরও ১ হাজার দিরহাম দিয়ে একে বিষমিশ্রিত করেছি। এর একটি আঘাত যদি গোটা শহরবাসীকে মারা হয়, তবে কেউই বেঁচে থাকবে না।'২০৯
টিকাঃ
২০৭ তারিখে তাবারি: ৬/৬২।
২০৮ তারিখে তাবারি: ৬/৬২।
২০৯ তারিখে তাবারি: ৬/৬২।
📄 চিকিৎসককে আলি রা.-এর উপদেশ এবং ওযুর আগ্রহ
আবদুল্লাহ ইবনে মালিক বলেন, যেদিন আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. আঘাতপ্রাপ্ত হন, সেদিন ক'জন চিকিৎসককে ডেকে আনা হয়। তম্মধ্যে আসির বিন আমর আসসাকুনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ চিকিৎসক। কিসরার সম্রাটও তাঁর কাছ থেকে চিকিৎসা নিত। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে সে ছাগলের গরম ফুসফুস নেয়। সেখান থেকে বিশেষ একটি রগ বের করে আলি রা.- এর ক্ষতস্থানে রাখে। এরপর তাতে ফুঁ দেয় এবং বাইরে বের করে। দেখা গেল তাতে মস্তিষ্কের সাদা আবরণ লেগে আছে। তার মানে, তরবারির আঘাত মস্তিষ্কের গভীরে গিয়ে পৌঁছেছে। এরপর চিকিৎসক বললেন, 'আপনি এখন নিজের কাজ সেরে ফেলুন। আর প্রাণে বাঁচা সম্ভব নয়।'২১০
আবদুল্লাহ বলেন, এ সময় জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ আলি রা.-কে জিজ্ঞেস করেন, 'আপনার যদি মৃত্যু হয়ে যায়, তাহলে আমরা কি হাসানের নিকট বায়আত গ্রহণ করব?' তিনি বললেন, 'আমি তোমাদেরকে আদেশও করছি না, নিষেধও করছি না। এ ব্যাপারে কী করবে তোমরাই ভালো জানো।'২১১
টিকাঃ
২১০ আল ইসতিয়াব: ৩/১১২৮।
২১১ আল ইসতিয়াব: ৩/১১২৮।
📄 হাসান ও হুসাইন রা.-কে আলি রা.-এর উপদেশ
এরপর তিনি তাঁর দুই ছেলে হাসান ও হুসাইনকে ডাকলেন। তাঁদের উদ্দেশ করে বললেন, 'আমি তোমাদের কিছু অসিয়ত করতে চাই। আল্লাহকে ভয় করবে। দুনিয়ায় মন লাগাবে না; যদিও সে তোমাদের পিছু লেগে থাকে। পাওয়ার মতো নয় এমন কোনো বস্তুর জন্য আক্ষেপ করবে না। সত্য কথা বলবে। এতিমের ওপর দয়া করবে। অসহায়কে সাহায্য করবে। নিজের পরকালকে সাজাবার চেষ্টা করবে। জালেমকে তার জুলম হতে বাধা দেবে। আল্লাহর কিতাবমতে আমল করবে। তাঁর বিধান পালন করতে গিয়ে কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কার পাত্তা দেবে না।'
এরপর তিনি তার তৃতীয় ছেলে মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়ার দিকে ফিরে বললেন, 'আমি তোমার দুই ভাইকে যে উপদেশ দিয়েছি তুমি কি তা ভালো করে শুনতে পেয়েছ?'২১২
তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' আলি রা. বললেন, 'তুমি তোমার বড় ভাইদের শ্রদ্ধা করবে। কেননা, তোমার ওপর তাদের অনেক হক আছে। তারা যা বলবে তদানুযায়ী আমল করবে। তাদের নির্দেশ মান্য করতে বিলম্ব করবে না।'
এরপর তিনি হাসান ও হুসাইনকে ডেকে আবার উপদেশ দিয়ে বলেন, 'আমি তাঁর (মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া) ব্যাপারে তোমাদের কল্যাণকামিতার উপদেশ দিচ্ছি। কেননা, সে-ও তোমাদের পিতার সন্তান। তোমরা তো জানো, তাঁর পিতা তাঁকে কী পরিমাণ স্নেহ করে।'
অতঃপর হাসান রা.-এর দিকে ফিরে তিনি বলেন, 'হে আমার ছেলে, সকল ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে চলবে। নামাজ কায়েম করবে। জাকাত আদায় করবে। ক্রোধ নিবারণ করবে। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে। মুর্খদের ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করবে। দীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করবে। দৃঢ়তার সাথে কাজ করবে। কুরআনের হেফাজত করবে। প্রতিবেশীর সাথে উত্তম ব্যবহার করবে। ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ করবে। নির্লজ্জতা থেকে দূরে থাকবে।'২১৩
মৃত্যু একেবারে নিকটবর্তী হলে তিনি অসিয়ত করে বলেন,
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
এটা আলি ইবনে আবু তালিবের অসিয়ত। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসুল। তিনি তাঁকে হেদায়াত ও দীনে হকসহ পাঠিয়েছেন; যাতে অন্যান্য সকল দীনের ওপর একে বিজয়ী করতে পারেন। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্যে নিবেদিত। তাঁর কোনো শরিক নেই—এটা বলার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি একজন মুসলিম।
হে হাসান, আমি তোমাকে, আমার সকল সন্তানকে ও যাদের কাছে আমার এ অসিয়তলিপি পৌঁছবে, সকলের কাছে আমার এ উপদেশ রইল—তোমরা সবাই আল্লাহকে ভয় করে চলবে। খাঁটি মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করো। ছিন্নভিন্ন হয়ে থেকো না। আমি আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি—“সালাত ও সিয়ামের ব্যাপকতার তুলনায় নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও সুসম্পর্কের গুরুত্ব অনেক বেশি।” তোমরা রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের অধিকারের প্রতি যত্নবান থেকো। তাঁদের অধিকার প্রদানপূর্বক সম্পর্ক রক্ষা করিয়ো। আল্লাহ তোমাদের হিসাব সহজ করে নেবেন। এতিমদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তাঁদের খোরাক বন্ধ করো না। তোমরা বেঁচে থাকতে যেন তাঁরা ধ্বংস হয়ে না যায়। প্রতিবেশীর অধিকারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, তাঁদের অধিকারের ব্যাপারে তোমাদের নবির অসিয়ত রয়েছে। তিনি প্রতিবেশীর ব্যাপারে সর্বদা অসিয়ত করতেন। এমনকি আমাদের মনে হতে লাগল যে, হয়তো তিনি প্রতিবেশীকেও ওয়ারিসদের অন্তর্ভুক্ত করে দেবেন।
পবিত্র কুরআনের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। এমন যেন না হয় যে, কুরআন অনুসরণে অন্যরা তোমাদের চেয়ে এগিয়ে যাবে। সালাতের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কারণ, সালাত হচ্ছে দীনের স্তম্ভ। তোমাদের প্রতিপালকের ঘর সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করো। যতদিন জীবিত থাকো, তোমাদের থেকে যেন তা খালি না হয়। যদি তা ত্যাগ করা হয়, তা হলে পরস্পর বিতর্ক করো না। রমজান মাসের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, এ মাসের সিয়াম জাহান্নামের আগুন থেকে ঢালস্বরূপ। আল্লাহর পথে জান-মাল দিয়ে জিহাদ করার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।
জাকাতের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, জাকাত আল্লাহর ক্রোধকে নির্বাপিত করে। তোমাদের নবির জিম্মিদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তোমাদের সম্মুখে যেন তাদের ওপর অত্যাচার না হয়। তোমাদের নবির সাহাবিগণের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের সম্পর্কে সংযত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।
ফকির ও মিসকিনদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তাঁদেরকে তোমাদের সমাজের অন্তর্ভুক্ত করে রেখো। তোমাদের অধীনস্থ দাস-দাসীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনের সর্বশেষ উপদেশ দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন-"আমি দুই শ্রেণির দুর্বলদের ব্যাপারে সদয় হতে তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছি। তারা হলো নারী ও দাস-দাসী।" সালাত, সালাত; আল্লাহর ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করো না। এ মনোভাব তোমাদেরকে তাদের ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে, যারা তোমাদের আক্রমণ করতে চায় কিংবা যারা তোমাদের ওপর বিদ্রোহ করতে চায়। মানুষের সাথে সদালাপ করো। মহান আল্লাহ তোমাদেরকে সে আদেশই করেছেন। সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা ত্যাগ করো না। যদি এ নীতি অবলম্বন করো, তাহলে নিকৃষ্ট লোকদের হাতে নেতৃত্ব চলে যাবে। তখন তোমরা দুআ করবে; কিন্তু সে দুআ কবুল হবে না। পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা করবে এবং একে অপরের জন্যে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করবে। কারও দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করা, সম্পর্ক ছিন্ন করা ও অনৈক্য সৃষ্টি করা থেকে সাবধান থাকবে। ভালো কাজে ও তাকওয়ামূলক কাজে একে অপরের সহযোগিতা করো।
পাপ কাজে ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজে কারও সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে সদা-সর্বদা ভয় করিয়ো। তিনি কঠিন শাস্তি দানকারী। আহলে বাইতের কোনো ক্ষতি করা থেকে আল্লাহ তোমাদেরকে রক্ষা করুন। তোমাদের নবি (এর সুন্নাত)-কে হেফাজত করুন। আমি তোমাদেরকে মহান আল্লাহর দায়িত্বে রেখে যাচ্ছি। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।'
এরপর তিনি কেবল 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কালেমা পড়তে থাকেন। একপর্যায়ে তাঁর নির্ধারিত নিঃশ্বাস শেষ হয়ে যায়। সাথে সাথে পার্থিব জীবনের চির-অবসান ঘটে। তাঁর ইনতেকালের তারিখ ৪০ হিজরি সনের রমজান মাস।২১৪
এক বর্ণনায় এসেছে; তিনি রমজানের ২১ তারিখ ভোরে শহিদ হন।২১৫ দুষ্কৃতিকারীর হাতে আঘাতের তিনদিন পর তিনি ইনতেকাল করেন।২১৬
টিকাঃ
২১০ তারিখে তাবারি: ৬/৬৩।
২১৩ তারিখে তাবারি: ৬/৬৩।
২১৪ তারিখে তাবারি: ৬/৬৪।
২১৫ বুখারি প্রণীত আততারিখুল কাবির: ১/৯৯ [সনদ বিশুদ্ধ]।
২১৬ আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৪৩০।