📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 ষড়যন্ত্রকারীদের বৈঠক

📄 ষড়যন্ত্রকারীদের বৈঠক


ইবনে মুলজিম ও তার সঙ্গীদের ভাষ্য; ইবনে মুলজিম, বারাক বিন আবদুল্লাহ এবং আমর বিন বকর তামিমি-এরা তিনজন একত্রিত হয়ে নাহরাওয়ানে আলির হাতে তাদের ভাইদের নিহত হওয়ার ঘটনা আলোচনা করে অনুশোচনা ব্যক্ত করে বলে—'এরাই যখন মারা গেল, তখন আমাদের বেঁচে থাকার সার্থকতা কী? তারা তো আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে কোনো নিন্দুকের নিন্দার ভয় করত না। আমরা যদি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব পথভ্রষ্ট নেতাদের (শাসকদের) হত্যা করি, তাহলে সারা দেশের মানুষ এদের জুলুম থেকে মুক্তি পাবে। তেমনি আমাদের নিহত ভাইদের প্রতিশোধও গ্রহণ করা হবে।' তখন ইবনে মুলজিম বলল, 'আমি আলি ইবনে আবু তালিবের দায়িত্ব নিলাম।' বারাক বলল, 'আমি মুআবিয়ার দায়িত্ব নিলাম।' আমর ইবনে বকর বলল, 'আমি আমর ইবনে আসের দায়িত্ব নিলাম।'
এরপর তিনজন শপথের মাধ্যমে অঙ্গীকার করল—প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বের লোককে হত্যা করা থেকে ক্ষান্ত হবে না। হয় তার শত্রুকে হত্যা করবে, না-হয় নিজে নিহত হবে। এরপর তারা নিজ নিজ তরবারিতে বিষ সংযোগ করল এবং হত্যাকাণ্ড ঘটাবার জন্য রমজানের ১৭ তারিখ দিন ধার্য করল। যে যাঁকে হত্যা করার দায়িত্ব নিল, তিনি যে শহরে থাকেন সেদিকে তারা রওনা হয়ে গেল।২০৬

টিকাঃ
২০৬ তারিখে তাবারি: ৬/৫৬।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 ইবনে মুলজিমের যাত্রা ও বিনতে শাজানাহ-এর সাক্ষাৎ

📄 ইবনে মুলজিমের যাত্রা ও বিনতে শাজানাহ-এর সাক্ষাৎ


ইবনে মুলজিম আলমুরাদির সম্পর্ক যেহেতু বনু কিন্দার সাথে, তাই সে কুফা গিয়ে পৌঁছল। সে তার উদ্দেশ্য গোপন রেখে অবস্থান করতে থাকে। কুফায় তার নিজ সম্প্রদায়ের যেসব খারেজি বসবাস করত তাদের কাছেও সে তার উদ্দেশ্য গোপন রাখে। একদিন বনু রাবাবের কতিপয় লোকের এক বৈঠকে ইবনে মুলজিম বসে আছে। বৈঠকে তারা নাহরাওয়ানের যুদ্ধে নিজেদের নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে আলোচনা করছিল। একপর্যায়ে ওই গোত্রের এক মহিলা সেখানে উপস্থিত হয়। মহিলার নাম কিতাম বিনতে শাজানাহ। নাহরাওয়ানে তার পিতা ও ভাই আলি রা.-এর হাতে নিহত হয়।
মহিলাটি ছিল সে যুগের এক অপ্রতিদ্বন্ধী অনিন্দ্যসুন্দরী। সারাক্ষণ মসজিদে ইবাদত-বন্দেগিতে নিমগ্ন থাকত। মহিলার ওপর দৃষ্টি পড়তে তার সৌন্দর্য- দর্শনে ইবনে মুলজিম আত্মহারা হয়ে যায়। এমনকি তার আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কেই সে বিস্মৃত হয়ে পড়ে।
অবশেষে সে মহিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মহিলা ৩ হাজার দিরহাম, একজন খাদেম, একজন দাসী ও আলি ইবনে আবু তালিবকে হত্যার শর্তে প্রস্তাবে সম্মত হয়। ইবনে মুলজিম সকল শর্ত মেনে নেয়। প্রথম তিনটি তখনই আদায় করে এবং শেষেরটি সম্পর্কে জানায়—আমি এ শহরে কেবল আলিকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই এসেছি।
উভয়ের মধ্যে বিয়ে হয়ে যায়। তারা একত্রে বসবাস করে। মহিলা আলির হত্যা ত্বরান্বিত করতে ইবনে মুলজিমকে উত্তেজিত করতে থাকে। সে তার নিজের রাবাব গোত্রের ওয়ারদান নামক এক ব্যক্তিকে আলি রা.-কে হত্যা কাজে সহযোগী হিসেবে ইবনে মুলজিমের সাথি বানিয়ে দেয়।
ইবনে মুলজিম শাবিব ইবনে বাজরা নামক আরেক ব্যক্তিকে তার কাজে সহযোগী বানাবার চেষ্টা করে। ইবনে মুলজিম তার কাছে গিয়ে বলে—'তুমি কি দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করতে চাও?' সে বলল, 'কীভাবে?' ইবনে মুলজিম বলল, 'আলিকে হত্যা করতে হবে।' শাবিব বলল, 'তোমার মা তোমাকে হাবিয়ে ফেলুক! তুমি তো এক বীভৎস কাজের পরিকল্পনা নিয়ে এসেছ। আচ্ছা, কীভাবে তাকে হত্যা করবে—বলো।' ইবনে মুলজিম বলল, 'আমি মসজিদে লুকিয়ে থাকব। তিনি যখন ফজরের নামাজে আসবেন তখন তাকে আঘাত হানব ও হত্যা করব। এরপর যদি বেঁচে যাই তাহলে তো অন্তরে তৃপ্তি বোধ করলাম ও প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম হলাম। আর যদি মারা পড়ি তাহলে আল্লাহর কাছে যে প্রতিদান পাব, তা দুনিয়ার থেকে বহুগুণে উত্তম।'
শাবিব বলল, 'তোমার সর্বনাশ হোক! যদি আলি ব্যতীত অন্য কেউ হতো তাহলে আমার কাছে সহজ লাগত। তুমি তো জানো যে, আলি রা. হচ্ছেন প্রথম সময়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তাঁকে হত্যা করতে আমি অন্তরের সাড়া পাচ্ছি না।'
ইবন মূলজিম বলল, 'তোমার কি জানা নেই—নাহরাওয়ানে আলি আমাদের লোকদের হত্যা করেছেন?' শাবিব বলল, 'হ্যাঁ, তা করেছেন।' ইবনে মূলজিম বলল, 'তাহলে আমাদের যেসব ভাইদের তিনি হত্যা করেছেন তার পরিবর্তে আমরা তাকে হত্যা করব।' কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর শাবিব ইবনে মূলজিমের প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করল।
এরপর উভয়ে কিতামের কাছে আসে। সে সেখানকার জামে মসজিদে এতেকাফে বসেছিল। তারা উভয়ে তাকে বলল, 'আমরা আলিকে হত্যার ব্যাপারে একমত হয়েছি।' কিতাম বলল, 'ঠিক আছে। যেদিন তোমরা কার্যসিদ্ধি করবে সেদিন আমার কাছে আসবে।' পরে যে জুমআর রাতে আলি রা. শহিদ হন, সেদিন ইবনে মুলজিম কিতামের কাছে পুনরায় আসে।
এটা ৪০ হিজরির ঘটনা। কিতাম একটি রেশমি কাপড়ে টুকরো চাইল। সেটা তার মাথায় বেঁধে দিলো। তখন ইবনে মুলজিম তার সাথিদেরকে ১৭ রমজান শুক্রবার রাতে হামলা চালাবার কথা জানিয়ে দিলো। তাদেরকে সে আরও জানাল-'আমার আরও দুই সঙ্গী আছে যারা এই একই সময়ে মুআবিয়া ও আমর ইবনে আসের ওপর হামলা করবে।'
নির্ধারিত সময়ে তারা তিনজন; অর্থাৎ, ইবনে মুলজিম, ওয়ারদান ও শাবিব তরবারি সজ্জিত হয়ে মসজিদের যেই দরজা দিয়ে আলি রা. বের হন সেই দরজার কাছে গিয়ে অবস্থান নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে আলি রা. তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে মসজিদে রওনা হন। আসার পথে লোকদের ঘুম থেকে জাগাবার জন্য 'আসসালাত আসসালাত' শব্দে আহ্বান করেন। মসজিদে প্রবেশকালে প্রথমে শাবিব তার তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে। কিন্তু সেই আঘাত আলি রা.-এর গায়ে না লেগে মসজিদের প্রাচীরে তাকের উপর লাগে। এরপর ইবনে মুলজিম আলির মাথার উপরিভাগে আঘাত করে। তখন আলি রা.-এর মস্তক থেকে রক্ত প্রবাহিত হয়ে দাড়ি ভিজে যেতে থাকে।
ওয়ারদান পালিয়ে যাবার সময় লোকেরা তাকে ধরে হত্যা করে ফেলে। শাবিব কিন্দার বসতির দিকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। চারদিকে শুরু হয়ে যায় চিৎকার-হাঙ্গামা। এ সময়ে হাজরামাওতের এক লোক; যার নাম উয়াইমির-সে শাবিবকে ধাওয়া করে। তার হাত থেকে তরবারি ছিনিয়ে নিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দেয়। কিন্তু সে যখন দেখল লোকজন খুনি ওয়ারদানকে তালাশ করছে আর তার তরবারি আমার হাতে, তখন উয়াইমির ভীত হয়ে পড়ল। সে ভাবল; না জানি লোকেরা আমাকে খুনি মনে করে হত্যা করে ফেলে। তাই সে তাকে ছেড়ে দেয়। শাবিব সুযোগ পেয়ে জনসমাগমে ঢুকে যায়। লোকেরা চেষ্টা করেও তাকে আর ধরতে পারেনি।
ইবনে মুলজিম ধৃত হয়। তাকে ঘাড়মোড়া করে বাঁধা হয়। আবু দিমা উপনাম-বিশিষ্ট হামদান গোত্রের এক লোক তার তরবারি ছিনিয়ে নিয়ে ইবনে মূলজিমের পায়ে আঘাত করে; ফলে সে মাটিতে পড়ে যায়। নামাজে ইমামতি করার জন্য আলি রা. জাদা ইবনে হুবাইরা ইবনে আবু ওহাবকে নির্দেশ দেন। তিনি ফজরের নামাজে ইমামতি করেন। আলিকে তাঁর গৃহে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আবদুর রহমান ইবনে মূলজিমকে ঘাড়মোড়া অবস্থায় তার সামনে হাজির করা হয়।
আলি রা. বললেন, 'হে আল্লাহর দুশমন, আমি কি তোমার সাথে উত্তম ব্যবহার করিনি?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' আলি বললেন, 'তুমি এ কাজ কেন করলে?' সে কোনো জবাব দিলো না। অবশ্য সে বলেছে-'আমি ৪০ দিন যাবৎ এ তরবাবি ধার দিয়েছি এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি; যেন সৃষ্টিজগতের সবচে নিকৃষ্ট লোক এ তরবারির আঘাতে হত হয়।' আলি রা. বললেন, 'আমি দেখছি এর দ্বারা তোমাকে হত্যা করা হবে এবং তুমিই হবে সৃষ্টিজগতের নিকৃষ্টতম লোক।'২০৭

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 আলি রা.-এর শাহাদতের ঘটনা

📄 আলি রা.-এর শাহাদতের ঘটনা


ইবনুল হানাফিয়া বলেন, আমিও ওই রাতে লোকজনের সাথে জামে মসজিদে নামাজ পড়েছি। নামাজে এত অধিক পরিমাণ লোক অংশগ্রহণ করে যে, দরজার কাছেও অনেকের নামাজ পড়তে হয়েছে। কেউ ছিল কিয়ামে, কেউ রুকুতে, কেউ সেজদায়। সারারাত তাঁরা ইবাদত ও নামাজ পড়ে ক্লান্ত হতো না। সে রাত ভোরবেলা আলি রা. ফজর নামাজের জন্য বের হন। আসার পথে লোকদের ঘুম থেকে জাগাবার জন্য 'আসসালাত আসসালাত' শব্দে আহ্বান করেন। মসিজদে প্রবেশকালে তিনি একটি আলোকরশ্মি দেখতে পান এবং এই আওয়াজ শোনেন— فرأيت الحكم لله يا علي لا لك ولا لأصحابك ، سینا 'আল্লাহ ছাড়া কারও হুকুম করার অধিকার নেই। হে আলি, তোমারও নেই এবং তোমার অনুসারীদেরও নেই।' এরপর আমি একটি তরবারি দেখলাম। এবং সাথে সাথে আরেকটি তরবারির ওপর আমার দৃষ্টি পড়ল। এরপর আলি রা.-কে বলতে শুনলাম—'এই লোক যেন পালিয়ে যেতে না পারে।' লোকজন চারদিক দিয়ে তাকে ঘিরে রাখল। সে আর পালাতে পারল না। ধরা পড়ল। তাকে আলি রা.-এর সামনে পেশ করা হলো। লোকদের সাথে আমিও তার কাছে গেলাম। এরপর আলি রা. সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন, 'আমি যদি মারা যাই, তবে কিসাস হিসেবে তাকে হত্যা করবে। আর যদি বেঁচে যাই তাহলে আমিই সিদ্ধান্ত নেব তার ব্যাপারে কী করা যায়।'২০৮
মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া বলেন, এরপর লোকেরা হতচকিত হয়ে হাসান রা.- এর কাছে গেল। ইবনে মুলজিমকে সেসময় একটি মশকের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ইবনে কুলসুম বিনতে আলি রা. তাঁর পিতার অবস্থা দেখে কাঁদছিলেন। তিনি ইবনে মুলজিমকে বললেন, 'হে আল্লাহর দুশমন, আমার আব্বার কোনো ক্ষতি হবে না। আল্লাহ তোকেই অপদস্থ করবেন।' ইবনে মুলজিম বলল, 'তাহলে তুমি কাঁদছ কেন? এই তরবারিটি আমি ১ হাজার দিরহাদ দিয়ে ক্রয় করেছি। আরও ১ হাজার দিরহাম দিয়ে একে বিষমিশ্রিত করেছি। এর একটি আঘাত যদি গোটা শহরবাসীকে মারা হয়, তবে কেউই বেঁচে থাকবে না।'২০৯

টিকাঃ
২০৭ তারিখে তাবারি: ৬/৬২।
২০৮ তারিখে তাবারি: ৬/৬২।
২০৯ তারিখে তাবারি: ৬/৬২।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 চিকিৎসককে আলি রা.-এর উপদেশ এবং ওযুর আগ্রহ

📄 চিকিৎসককে আলি রা.-এর উপদেশ এবং ওযুর আগ্রহ


আবদুল্লাহ ইবনে মালিক বলেন, যেদিন আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. আঘাতপ্রাপ্ত হন, সেদিন ক'জন চিকিৎসককে ডেকে আনা হয়। তম্মধ্যে আসির বিন আমর আসসাকুনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ চিকিৎসক। কিসরার সম্রাটও তাঁর কাছ থেকে চিকিৎসা নিত। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে সে ছাগলের গরম ফুসফুস নেয়। সেখান থেকে বিশেষ একটি রগ বের করে আলি রা.- এর ক্ষতস্থানে রাখে। এরপর তাতে ফুঁ দেয় এবং বাইরে বের করে। দেখা গেল তাতে মস্তিষ্কের সাদা আবরণ লেগে আছে। তার মানে, তরবারির আঘাত মস্তিষ্কের গভীরে গিয়ে পৌঁছেছে। এরপর চিকিৎসক বললেন, 'আপনি এখন নিজের কাজ সেরে ফেলুন। আর প্রাণে বাঁচা সম্ভব নয়।'২১০
আবদুল্লাহ বলেন, এ সময় জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ আলি রা.-কে জিজ্ঞেস করেন, 'আপনার যদি মৃত্যু হয়ে যায়, তাহলে আমরা কি হাসানের নিকট বায়আত গ্রহণ করব?' তিনি বললেন, 'আমি তোমাদেরকে আদেশও করছি না, নিষেধও করছি না। এ ব্যাপারে কী করবে তোমরাই ভালো জানো।'২১১

টিকাঃ
২১০ আল ইসতিয়াব: ৩/১১২৮।
২১১ আল ইসতিয়াব: ৩/১১২৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00