📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 আমিরুল মুমিনিন রা. তাঁর শাহাদাতের বিষয়টি জানতেন

📄 আমিরুল মুমিনিন রা. তাঁর শাহাদাতের বিষয়টি জানতেন


দালায়িলুন নাবুওয়াতের অন্তর্ভুক্ত কিছু কিছু হাদিস দ্বারা অনুমিত হয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলি রা.-এর শাহাদতের বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। সহিহ মুসলিম-এ হজরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত; রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেরা পর্বতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আবু বকর, উমর, উসমান, আলি, তালহা ও জুবাইর রা.। পর্বত কাঁপতে লাগল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'থেমে যাও হেরা! তোমার ওপর নবি, সিদ্দিক ও শহিদ ছাড়া আর কেউ নেই।'১৯৪
এ ছাড়া এ বিষয়ে অন্যান্য বিশেষ হাদিসও রয়েছে। যা দ্বারা বোঝা যায়, তিনি ইরাকের ভূখণ্ডে শাহাদত বরণ করবেন। এমনকি কীভাবে শহিদ হবেন—তার বর্ণনাও রয়েছে। সুতরাং নববি ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী সমুদয় পরিস্থিতি যথাযথভাবে সংঘটিত হওয়া আমাদের নবিজির সত্যবাদিতার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। সেটা এ বিষয়েও প্রমাণ বহন করে যে, তিনি নিজের মনগড়া কোনো কথা বলতেন না; বরং আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে তাঁকে যে কথা বলতে নির্দেশ দিতেন, তিনি তা-ই বলতেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলি রা.-কে ওই অবস্থা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন-যা ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে। আলি রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেইসব ভবিষ্যদ্‌বাণী সত্যরূপে বিশ্বাস করেছেন। বিভিন্ন সময়ে মানুষের সাথে এসব বিষয়ে আলোচনাও করতেন। একবার ইরাকে এ-সংক্রান্ত আলোচনা করছিলেন। আবুল আসওয়াদ দুয়ালি সেটা বর্ণনা করেন এভাবে:
আমি আলি রা.-কে বলতে শুনেছি-আমি সফরের জন্য সওয়ারির রিকার হাতে নিলাম। এমন সময়ে আবদুল্লাহ ইবনে সালাম আমার কাছে এলেন। তিনি আমাকে বলতে লাগলেন, 'কোথায় যাচ্ছেন'? আমি বললাম, 'ইরাকে'। তিনি বললেন, 'আপনি কি দোধারি তরবারির আঘাতে কেটে পড়ার জন্য সেখানে যাচ্ছেন'? আলি রা. বললেন, 'আল্লাহর শপথ! আপনার পূর্বে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একথা বলতে শুনেছি'।
আবুল আসওয়াদ বলেন, একথা শুনে আমি বিস্ময়বোধ করতে লাগলাম। মনে মনে বললাম-এ-তো দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। নিজের ব্যাপারে এমন কথা বলে যাচ্ছে! ১৯৫
তিনি খেলাফতের দায়িত্বে অধিষ্টিত হওয়ার পূর্বে ইয়ানবা এলাকায় আবু ফুজালাহ আনসারির সাথে এ ধরনের আলোচনা করেছিলেন। তখন আবু ফুজালাহ আলি রা.-এর রোগের অবস্থা দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি তখন বলেছিলেন-আমি এই রোগে বা এই কষ্টে মারা যাব না। আমার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছেন, 'আমি ততক্ষণ পর্যন্ত মারা যাব না, যতক্ষণ পর্যন্ত এই দাড়ি মাথার রক্তে রঞ্জিত না হবে। '১৯৬
খারেজিদেরও তিনি একথা বলেছেন। সাধারণ সাথিদেরও বলেছেন। ইমাম বায়হাকি রাহ. তাঁর দালাইলুন নুবুওয়াহ গ্রন্থে এ-সংক্রান্ত হাদিসসমূহ একত্র করেছেন।১৯৭ অনুরূপভাবে হাফেজ ইবনে কাসির রাহ.-ও আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে এসব বর্ণনা জমা করেছেন।১৯৮
আবদুল্লাহ ইবনে দাউদ আমাশের 'সূত্রে তিনি সালামাহ ইবনে সুহাইল হতে, তিনি সালিম ইবনে আবি জাদাহ হতে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে সাবা হতে বর্ণনা করেন; আবদুল্লাহ ইবনে সাবা বলেছেন, আমি আলি রা.-কে মিম্বরে বলতে শুনেছি-'আমি কেবল একজন বদবখতের অপেক্ষায় আছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে নিশ্চিত করেছেন, এই (দাড়ি) তার (মাথার) রক্তে রঞ্জিত হবে।' লোকেরা বলল, 'হে আমিরুল মু’মিনিন, আমাদেরকে ওই হন্তারকের পরিচয় দিন। আমরা তার গোটা গোষ্ঠীসহ সমূলে উৎপাটন করব।' আলি রা. বললেন, 'আল্লাহর পানাহ! আমি চাই না আমার কারণে আমার খুনি ছাড়া অন্য একজন লোককেও অন্যায়ভাবে হত্যা করা হোক।'১৯৯ অতঃপর তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করেন,
أشدد حيازيمكَ لِلمَوتِ * فَإِنَّ المَوتَ لاقيكا ولا تجزع من القتل * إذا حلّ بواديكا
'মৃত্যুর অভ্যর্থনার প্রস্তুতি নাও। সে অবশ্যই তোমাদের কাছে এসে পৌঁছবে। মৃত্যু যখন তোমার উঠানে পা বাড়াবে তখন তাকে ভয় পাবে না।'২০০
কোনো কোনো বর্ণনায় এরচে অধিক স্পষ্ট ভাষ্য এসেছে। যার সারকথা- আলি রা. তাঁর হন্তারক সম্পর্কে জানতেন। উবায়দা আসসালামানি বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণনা করে বলেন, আলি রা. যখন ইবনে মুলজিমকে দেখতেন, তখন তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করতেন,
أريد حياته ويريد قتلي * عذيرك من خليلك من مرادي
'আমি চাই সে বেঁচে থাকুক, আর সে আমাকে হত্যা করতে চায়। মুরাদ গোত্রের তোমার বন্ধুর কাছ থেকে কে তোমাকে ন্যায়বিচার এনে দেবে?'২০১
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে; আলি রা. আবদুল্লাহ ইবনে মুলজিমের ব্যাপারে বলেছেন, 'এই লোক আমার খুনি।' আলি রা.-কে বলা হলো, 'তাহলে এই লোককে শাস্তি দিতে কোন বস্তু আপনাকে বিরত রেখেছে?' জবাবে তিনি বললেন, 'কিন্তু এখনও তো সে আমাকে হত্যা করেনি।'২০২
তিনি যখন লোকদের বললেন, 'আমাকে হত্যা করা হবে'-তখন সবাই তাঁকে পরবর্তী খলিফা মনোনয়নের অনুরোধ জানান। কিন্তু আলি রা. এমনটি করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। আবদুল্লাহ ইবনে সাবা থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি শুনেছি আলি রা. বলতেন- 'এটা (মাথা) এটাকে (দাড়ি) রঞ্জিত করবে। কাজেই হতভাগ্য ব্যক্তিটি আমার ব্যাপারে অপেক্ষা করছে কেন?' লোকজন বলল, 'হে আমিরুল মুমিনিন, কে সে ব্যক্তি আমাদের জানান, আমরা তাকে হত্যা করে ফেলি।' আলি রা. বললেন, 'আল্লাহর কসম! তাহলে তো আমাকে যে হত্যা করেনি তাকে হত্যা করা হবে।' তারা বলল, 'তাহলে আমাদের জন্যে একজন আমির নির্বাচন করুন।' আলি বললেন, 'না, বরং আমি তোমাদেরকে সেভাবে রেখে যাব যেভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রেখে গেছেন।' তারা বলল, 'তাহলে আপনি আপনার প্রতিপালকের কাছে গিয়ে কী উত্তর দেবেন?' তিনি বললেন, 'আমি বলব-হে আল্লাহ! আপনার যতদিন খুশি ততদিন আমাকে তাদের মাঝে রেখেছেন। এরপর আমাকে আপনার নিকটে নিয়ে এসেছেন। আর আপনি তাদের মাঝে বিরাজমান। এখন আপনি চাইলে তাদের কল্যাণ করুন, চাইলে অকল্যাণ করুন।'১২০৩
হজরত আলি রা. হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি মহা সত্যবাদী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
إِنَّكَ سَتُضْرَبُ ضَرْبَةً هَاهُنَا ، وَضَرْبَةً هَاهُنَا ، وَأَشَارَ إِلَى صُدْغَيْهِ ، فَيَسِيلُ دَمُهَا حَتَّى يَخْضِبَ لِحْيَتَكَ ، وَيَكُونُ صَاحِبُهَا أَشْقَاهَا كَمَا كَانَ عَاقِرُ النَّاقَةِ أَشْقَى ثَمُودَ
'তোমাকে এই স্থানে আঘাত করা হবে। একথা বলার সময় তিনি মাথার তালুর দিকে ইঙ্গিত করেন এবং বলেন “এটা” “এটা”কে রঞ্জিত করবে। অর্থাৎ, মাথার রক্তে দাড়ি রঞ্জিত করবে। আঘাতকারী এমনভাবে সবচে নিকৃষ্ট লোক হবে, যেভাবে উষ্ট্রীর পা কর্তনকারী সামুদ জাতি সবচে নিকৃষ্ট জাতি ছিল।'২০৪

টিকাঃ
১৯৪ সহিহ মুসলিম: ৪/১৮৮০।
১৯৫ জাহাবি প্রণীত তারিখুল ইসলাম আহদিল খুলাফাইর রাশিদিন: ৬৪৮।
১৯৬ খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৪৩১।
১৯৭ দালাইলুন নুবুওয়াহ: ৬/৪৩৮-৪৪১।
১৯৮ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৭/৩২৩-৩২৫।
১৯৯ আজিরি প্রণীত কিতাবুশ শারিয়াহ: ৪/২১০৫।
২০০ জাহাবি প্রণীত তারিখুল ইসলাম আহদিল খুলাফাইর রাশিদিন: ৬৪৮।
২০১ তাবাকাতে ইবনে সাআদ ৩/৩৪, ৩৩ [সনদ বিশুদ্ধ)।
২০২ আল ইসতিয়াব: ৩/১২৭।
২০৩ মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল, আল মাউসুআতুল হাদিসিয়া : ২/৩২৫ [হাসান লিগাইরিহি]।
২০৪ খাসায়িসু আমিরিল মুমিনিন আলি বিন আবি তালিব: ১৬৩, ১৬৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00