📄 নাহরাওয়ান অভিযানের ফলাফল
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. নাহরাওয়ানে খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ করা এ ব্যাপারে শক্তিশালী দলিল ও স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, সিরিয়াবাসীর বিরুদ্ধে তাঁর রণপরিকল্পনা নিশ্চয় সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। মুআবিয়া রা.-এর মোকাবিলায় তিনি ছিলেন হকের অধিক নিকটবর্তী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত। তিনি বলেছেন,
تَمْرُقُ مَارِقَةُ عِنْدَ فُرْقَةٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ ، يَقْتُلُهَا أَوْلَى الطَّائِفَتَيْنِ بالحق
'মুসলমানদের মতবিরোধের সময় একটি সম্প্রদায় পৃথক হয়ে যাবে। তাদেরকে ওই দলটি হত্যা করবে যারা হকের অধিক নিকটবর্তী।১৭১
এটা নিশ্চিত বিষয় যে, আলি রা.-এর বাহিনী সিরিয়াবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তুলনামূলক অধিক সম্মানের অধিকারী। কেননা, উপরোক্ত হাদিস এবং আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-এর শাহাদত ইত্যাদি স্পষ্ট প্রমাণাদি দ্বারা তিনি নিজ সঠিকতার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন। বাস্তবতা তো এমনই সম্ভাবনাময়; কিন্তু ফলাফল এর বিপরীত দেখা যাচ্ছিল। আলি রা.-এর পরিকল্পনা ছিল খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধশেষে সিরিয়াবাসীর ওপর আক্রমণ পরিচালনা করবেন। কেননা, সিরিয়াকে নিজ খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত করা এবং উম্মতের ঐক্য ফিরিয়ে আনা ছিল খেলাফতের বুনিয়াদি দাবি। এই লক্ষ্য অর্জনে চেষ্টারও প্রয়োজন।
খারেজিদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধের উদ্দেশ্যও এটা ছিল যে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সেনাক্যাম্প ও ঘাঁটিগুলো যেন নিরাপদে থাকে। অতর্কিত দুষ্কৃতিকারীরা যেন আমাদের অনুপস্থিতিতে দারুল খেলাফতে উপস্থিত মুসলিম শিশু ও নারীদের ওপর হামলা চালাতে না পারে। কিন্তু কী আর করা! বায়ু তো সবসময় নৌকার বিপরীত দিকেই প্রবাহিত হয়। পরিকল্পনামাফিক তিনি সিরিয়ায় যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারলেন না; এর পূর্বেই শহিদ হয়ে গেলেন।
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ছিল। কারণ, একদিকে যেমন খারেজিদের বিদ্রোহ নির্মূল করতে হয়েছে, অন্যদিকে উষ্ট্রী, সিফফিন ও নাহরাওয়ানের অভিযানগুলোতে অংশ নিয়ে ইরাকিরা এতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে, বাড়তি আর কোনো যুদ্ধে যেতে তারা প্রস্তুতি নিতে পারছিল না। তারা যুদ্ধকে ঘৃণা করতে লাগল। বিশেষত সিফফিনে সিরিয়াবাসীর বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধে তারা ব্যাপক পর্যুদস্ত হয়েছে। অন্যদের সঙ্গে যুদ্ধে তারা তেমন অভিজ্ঞ ছিল না। এ ছাড়া এক মুহূর্তের চিন্তা-ভাবনার সুযোগ না পাওয়ায় এতিম হয়েছে ইরাকবাসীর অসংখ্য শিশু। নারীরা হয়েছে বিধবা। একটি নিষ্ফল যুদ্ধ ছাড়া কিছুই তাদের হাতে আসেনি।
ওই সময়ে আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. এবং তাঁর সাথিরা যে সন্ধি ও সালিশকে স্বাগত জানিয়েছেন, সেটা যদি না হতো তবে মুসলিমবিশ্ব বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতো—যা কল্পনাও করা দুষ্কর। কেবল এ কারণেই আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর সাথিরা পুনরায় সিরিয়ায় সেনা প্রেরণের প্রতি আগ্রহবোধ করছিলেন না। যদিও তারা নিশ্চিত ছিলেন যে, হজরত আলি রা.-ই হকের ওপর রয়েছেন।১৭২
এ ছাড়া আলি রা.-এর পথের কাঁটাস্বরূপ দেখা দেয় আরেক ফিতনা। সেই দিনগুলোতে এমন একটি ফেরকার অভ্যুদয় ঘটে, যারা আলি রা.-এর মান- মর্যাদাকে প্রভুত্বের আসনে পৌঁছাতে বদ্ধপরিকর। খারেজিদের বিপরীতে ছিল এই ফেরকার দৃষ্টিভঙ্গি।১৭৩
অথচ বাস্তবতা এমন নয়। বরং ওই ফেরকার লক্ষ্য ছিল, ভ্রান্ত এই আকিদার মাধ্যমে কেবল আলি রা.-এর বাহিনীই নয়; বরং গোটা মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করে দেওয়া এবং ইসলামের শিকড় সমূলে উৎপাটন করা।১৭৪ এই অপশক্তিটির চ্যালেঞ্জও আলি রা. সম্পূর্ণ শক্তি, প্রত্যয় ও সাহসের সাথে মোকাবিলা করেন। এরা আপন লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়।
যাইহোক, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আলি রা.-এর বাহিনী থেকে খারেজিদের বেরিয়ে যাওয়া এবং তৎপরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ফলে তাঁর সামরিক শক্তি বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে পর্যায়ক্রমে এক এক করে কাছে-দূরের বহু লোক আলি রা.-এর খেলাফত থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। খুরাইজ ইবনে রাশেদ; অন্য উক্তিমতে যার নাম হারিস ইবনে রাশেদ—সে ছিল আলি রা. কর্তৃক নিযুক্ত আহওয়াজ এলাকার গভর্নর। সে তার গোত্র বনু নাজিয়ার লোকদেরকে আলি রা.-এর খেলাফতের বিরুদ্ধে প্ররোচনা দেয়। বহু লোক তার ডাকে সাড়া দেয়। সে তার অধীনস্থ বহু শহরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং লুণ্ঠন করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ। আলি রা. মাকিল ইবনে কায়স আররিয়াহির নেতৃত্বে তার মোকাবিলার জন্য বাহিনী প্রেরণ করেন। তিনি খুরাইজ ইবনে রাশেদকে পরাজিত করে হত্যা করেন।১৭৫
দেশের এমন অরাজক পরিস্থিতি দেখে খারাজদাতারাও আলি রা.-এর খেলাফতকে দুর্বল করে দিতে সচেষ্ট হয়; যাতে খারাজ দেওয়া হতে মুক্তি পাওয়া যায়। আহওয়াজের অধিবাসীরা তো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গই করে ফেলে। এমতাবস্থায় আলি রা.-এর আরও অধিক পরিমাণে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সমরশক্তি ক্ষয় হবে—এটা স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে ইমাম শাবি রাহ. হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, আলি রা. যখন নাহরাওয়ানদের হত্যা করেন তখন বিপুলসংখ্যক লোক তাঁর বিরুদ্ধে চলে যায়। তাঁর আশপাশের লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং বনু নাজিয়াহ বিরোধিতা শুরু করে। এ সুযোগে ইবনুল হাজরামি বসরায় অভিযান চালায়। পাহাড়ী লোকেরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যারা খারাজ দিত তারা খারাজ দেওয়া বন্ধ করতে উদ্যত হয়। পারস্যবাসী সাহল ইবনে হুনাইফকে সেখান থেকে বের করে দেয়। তিনি ছিলেন আলি রা. কর্তৃক নিযুক্ত পারস্যের শাসনকর্তা।১৭৬
অন্যদিকে হজরত মুআবিয়া রা. গোপনে-প্রকাশ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে হজরত আলি রা.-এর সামরিক শক্তি দুর্বল করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া তিনি যখন আলি রা.-এর খেলাফতের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দেখতে পেলেন, তখন এই সুযোগ কাজে লাগাতে আগ্রহী হন। এ লক্ষ্যে তিনি আমর ইবনুল আস রা.-এর নেতৃত্বে মিসর অভিমুখে সেনাবহর প্রেরণ করেন। সেখানে তিনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ওই এলাকা নিজের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। আমর রা.-এর এই বিজয় এবং মুআবিয়া রা.-এর এই রাজনৈতিক সফলতার পেছনে কয়েকটি কারণ ও উপকরণ রয়েছে। যথা:
* খারেজিদের বিরুদ্ধে আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর জড়িয়ে যাওয়া।
* আলি রা. কর্তৃক নিযুক্ত মিসরের গভর্নর মুহাম্মাদ ইবনে আবি বকর তাঁর প্রাক্তন স্থলাভিষিক্ত কায়স ইবনে সাআদ ইবনে উবাদাহ আনসারির মতো দূরদর্শী না হওয়া। তিনি উসমান রা.-এর হত্যাকারীদের বিচারপ্রত্যাশীদের সাথে প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেন। এক্ষেত্রে তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন; যেমনটি তার পূর্ববর্তী গভর্নর দিতে পেরেছিলেন। ফলে তিনি উসমান হত্যার বদলাপ্রত্যাশীদের কাছে পরাজয় বরণ করেন।
* মুআবিয়া রা. এবং উসমান রা. হত্যার বিচারপ্রত্যাশীদের চিন্তা-চেতনা অভিন্ন হওয়া। এই ঐকমত্যপূর্ণ রায়ের ফলে সহজেই মিসরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়।১৭৭
* আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর খেলাফতের রাজধানী মিসর থেকে দূরে এবং সিরিয়ার নিকটবর্তী হওয়া।
মিসরের ভৌগলিক অবস্থান যেহেতু সিনা'র সড়কের সীমান্তে সিরিয়ার ভূখণ্ডের সাথে লাগোয়া, তাই তা প্রাকৃতিকভাবে মনস্তাত্ত্বিক নৈকট্য বয়ে আনে। মিসরে মুআবিয়া রা.-এর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর তাঁর সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তিনি এতে ক্ষান্ত হননি; বরং আরব উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চল তথা মক্কা, মদিনা ও ইয়ামেন ইত্যাদি অঞ্চলেও নিজের সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে লাগলেন। কিন্তু আলি রা. যখন সামরিক প্রতিরক্ষার চেষ্টা করেন, তখন তাঁর বাহিনী ভগ্ন মনোরথে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।১৭৮
এ ছাড়া হজরত মুআবিয়া রা. বিভিন্ন গোত্রের নেতা এবং আলি রা.-এর গভর্নরদেরকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালান। যেমন, কায়স ইবনে সাআদ রা. যিনি আলি রা. কর্তৃক নিযুক্ত মিসরের গভর্নর ছিলেন; তাঁকে তিনি নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু সফল হননি।১৭৯ তবে এটুকু অবশ্যই হয়েছে যে, আলি রা.-এর উপদেষ্টা ও তাঁর সাথিদের কাছে কায়স রা.-কে সন্দেহভাজন বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আলি রা. তাঁকে অপসারণ করেন। পরে কায়স ইবনে সাআদের এই অপসারণ মুআবিয়া রা.-এর পক্ষে অনেক বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। অনুরূপভাবে তিনি পারস্যের গভর্নর জিয়াদ ইবনে আবিয়াকেও নিজের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছেন; কিন্তু সফল হননি।১৮০
মোটকথা, মুআবিয়া রা. বিভিন্ন গোত্রপ্রধান ও গভর্নরদের প্রতি নিজের অনুগ্রহ ও ভবিষ্যতে উত্তম পদের প্রতিশ্রুতির দেন। এটা তাঁদের ওপর প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া এরা দিনদিন মুআবিয়া রা.-এর সফলতা প্রত্যক্ষ করছিল। ফলে একপর্যায়ে দেখা গেল আলি রা.-এর খেলাফতের কাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো; যা তিনি নিজেই তাঁর এক ভাষণে স্বীকার করেছেন-
'আমি জেনেছি; বুসর ইয়ামেনে প্রবেশ করেছে। আল্লাহর কসম! খুব শীঘ্রই ওই দল তোমাদের ওপর বিজয় লাভ করবে। আর তোমাদের ওপর তাদের বিজয়ের কারণ হলো, তোমরা তোমাদের ইমামের বিরুদ্ধাচরণ করো, আর তারা তাদের ইমামের আনুগত্য করে। তোমরা খেয়ানত করো, আর তারা আমানত রক্ষা করে। তোমরা ভাঙার কাজে লিপ্ত আর তারা গড়ার কাজে ব্যাপৃত। আমি অমুককে পাঠিয়েছিলাম; সে খেয়ানত করেছে ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অমুককে পাঠালাম; সে-ও খেয়ানত করল ও বিশ্বাসঘাতকতা করল এবং মালগুলো মুআবিয়ার নিকট পাঠিয়ে দিলো। তোমাদেরকে একটি পাত্রের আমানতদার বানালেও সেক্ষেত্রে আমার এখন আশঙ্কা হচ্ছে।
হে আল্লাহ, আপনি ওদেরকে নিকৃষ্ট বানিয়েছেন, তাই ওরা আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে। আপনি ওদেরকে অপছন্দ করেন, তাই ওরা আমাকে অপছন্দ করে। হে আল্লাহ, ওদেরকে আমার থেকে নিষ্কৃতি দিন এবং আমাকেও ওদের থেকে মুক্ত করুন। '১৮১
টিকাঃ
১৭১ সহিহ মুসলিম: ২/৭৪৫, ৭৪৬।
১৭২ আবদুল হামিদ আলি প্রণীত খিলাফাত আলি বিন আবি তালিব: ৩৪৫।
১৭৩ আবদুল হামিদ আলি প্রণীত খিলাফাত আলি বিন আবি তালিব: ৩৪৫।
১৭৪ মুসতাফা হালামি প্রণীত নিযামুল খিলাফাতি ফিল ফিকরিল ইসলামি : ১৫, ১৬।
১৭৫ আবদুল হামিদ আলি প্রণীত খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৩৫০; তারিখে তাবারি: ৬/২৭-৪৭।
১৭৬ তারিখে তাবারি: ৬/৫৩।
১৭৭ মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক, তাবাকাতে ইবনে সাআদ: ৩/৮৩; আবদুল হামিদ আলি প্রণীত খিলাফাত আলি বিন আবি তালিব : ৩৫১ সনদ বিশুদ্ধ।
১৭৮ তারিখে খলিফা: ১৯৮ [সনদবিহীন]।
১৭৯ ওয়ালাইয়াতু মিসর: ৪৫-৪৬।
১৮০ আল ইসতিয়াব: ২/৫২৫-৫২৬।
১৮১ বুখারি প্রণীত আততারিখুস সাগির: ১/১২৫ সনদ বিচ্ছিন্ন। তবে এর অন্যান্য সাক্ষ্য রয়েছে।
📄 নিজ বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য আলি রা.-এর উদ্দীপ্তকরণ ও মুআবিয়া রা.-এর সাথে মুবাহিসার সন্ধি
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. উপরোল্লেখিত সমস্যার মুখোমুখি, সৈনিকদের নিস্তেজতা এবং যুদ্ধের প্রতি জনগণের অনিহা সত্ত্বেও মাথা নোয়াননি। বরং পরিপূর্ণ বিচক্ষণতা, যথাযথ প্রমাণ ও সাহিত্যপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি তাঁর সৈনিকদের সাহস যুগিয়ে যাচ্ছিলেন। এ ব্যাপারে রণ-উদ্দীপনা ও আত্মমর্যাদাবোধ-জাগৃতিমূলক যেসব ভাষণ প্রসিদ্ধ আছে, সাহিত্যের ইতিহাসে সেগুলো অত্যন্ত উঁচু স্থান দখল করে আছে। এগুলো তিনি কল্পনাবিলাসী হয়ে বলেননি; বরং সেটা ছিল এমন এক বাস্তবতা; যা তিনি নিজেই প্রত্যক্ষ করেছেন। সেসব ভাষণ ওই মর্মবিদারী পরিস্থিতিরই স্মারক বহন করে।
যখন তাঁর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ও সীমান্ত-অঞ্চলে সিরিয়ান বাহিনী আক্রমণ করে তখন তিনি এই ভাষণ দেন—
'হামদ ও সালাতের পর। জিহাদ হচ্ছে জান্নাতের ফটকসমূহের মধ্যে একটি ফটক। যে ব্যক্তি জেনেবুঝে এর থেকে বিমুখ থাকবে, আল্লাহ তাআলা তাকে অপদস্থতার পোশাক পরাবেন। দুর্দশার পাহাড় তার মাথায় ভেঙে পড়বে। হীনতা ও বেইজ্জতিই তার ললাট-লিখন। পর্দা পড়ে যাবে তার অন্তরে। তাকে বঞ্চিত করা হবে তার ন্যায্য অধিকার থেকে। সে ন্যায় ও ইনসাফ থেকে বঞ্চিত থেকে যাবে।
আমি তোমাদেরকে দিবানিশি সিরীয়দের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বলে আসছি। তোমাদের বারবার বলছি, ওরা তোমাদের ওপর আক্রমণের পূর্বে তোমরা তাদের ওপর চড়াও হও। কেননা, যে জাতির ওপর আক্রমণ করা হয় এবং যে এলাকায় তাদের শত্রুদের পা পৌছে যায়, তারা অপদস্থ ও পরাজিত না হয়ে পারে না। কিন্তু তোমরা আমার কথায় মোটেই কর্ণপাত করলে না। হাতের ওপর হাত রেখেই বসে রইলে। আমার উপদেশ তোমরা কঠিন মনে করলে। হাসি-ঠাট্টায় আমার কথা উড়িয়ে দিলে। এই উদাসীনতার যে কুফল, তা তোমাদের সামনেই। তোমাদের এলাকায় শত্রুরা চড়াও হয়েছে। দেখো, গামিদের ভাইয়ের (সুফইয়ান ইবনে আউফ গামিদি) ঘোড়া আনবারে১৮২ এসে পৌঁছেছে। আমার কাছে সংবাদ এসেছে, ওইসব লোক মুসলমান এবং জিম্মি নারীদের কাঁকন, বালা ও চুল পর্যন্ত তুলে নিয়ে গেছে। ওরা হত্যা ও নৃশংসতার বাজার বেশ গরম করে চলেছে। নিজ অভিষ্ট লক্ষ্যে তারা সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে ফিরে গেছে। অথচ তাদের কোনো লোক বিন্দু-পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হলো না। এরপরও যদি কোনো মুসলমান আফসোস আর দুঃখের কথা বলে, তবে সে আমার কাছে আর তিরষ্কারের উপযুক্ত থাকবে না; বরং এমন মৃত্যু অহেতুক।
কী আশ্চর্যের কথা! একটি সম্প্রদায় বাতিল হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের স্বার্থ পুরোপুরি আদায় করে নিতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর তোমরা হকের ওপর থাকা সত্ত্বেও হীনম্মন্যতায় ভুগছ! পরিতাপের বিষয়-তোমরা শত্রুদের নিশানায় পড়ে গেছ। মনমতো ওরা তোমাদের ওপর তির চালাবে। তোমরা হয়ে পড়বে তাদের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। ইচ্ছেমতো তারা তোমাদের ওপর লুণ্ঠন চালাবে। অথচ তোমাদের আত্মমর্যাদাবোধ সম্পূর্ণরূপে মরে গেছে। তোমাদের এলাকায় খুন-খারাবির হাট জমে উঠেছে, অথচ এদিকে তোমাদের কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই! তোমাদের ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে, অথচ চুপ করে বসে আছ তোমরা। শত্রুর হামলার মুখোমুখী হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতিরোধে তোমাদের কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ঘোষণা দিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতা করা হচ্ছে, অথচ তোমাদের অন্তরে মোটেই ব্যথা সৃষ্টি হচ্ছে না। গ্রীষ্মকালে তোমাদেরকে সিরিয়া অভিমুখে পাঠাতে চাইলে তোমরা বলো-"এখন খুব গরম। আমাদের কিছু অবকাশ দিন। উষ্ণতা কমলে আমরা বেরোব।" কিন্তু যখন শীতকাল আসে, তখন কঠিন শৈত্যপ্রবাহের আপত্তি তুলে বলো-"শীত কমলে আমরা বেরোব।" না তোমরা গরমের তাপ সহ্য করতে পারো, না ঠান্ডা। তোমরা যখন গরম আর শীত থেকেই পলায়ন করো, তবে তো নিশ্চয় তরবারি থেকেও পলায়ন করবে।
হে ওইসব লোক-যাদেরকে দেখতে পুরুষের মতো মনে হয়, অথচ তোমরা পুরুষ নও! আমার ইচ্ছে করে, আল্লাহ তাআলা যদি আমাকে তোমাদের মাঝ থেকে তুলে নিতেন! তোমাদের চেহারাও আমি আর দেখতে চাই না। তোমাদের সাথে তো এখন আমার আর কোনো সম্পর্কই নেই। আল্লাহর শপথ! আমি ভীষণ লজ্জিত। তোমরা আমার অন্তরকে ক্রুব্ধ-বিক্ষুব্ধ করে তুলেছ। তোমরা আমাকে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছিয়ে দিতে চাও। তোমরা আমার সাথে গাদ্দারি করেছ। আমার নির্দেশ অমান্য করে, আমাকে ছেড়ে দিয়ে আমার সকল পরিকল্পনা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছ। যার কারণে কুরাইশরা আজ বলছে-আবু তালিবের ছেলে বীর তো বটে; কিন্তু সে রণকৌশল জানে না। আল্লাহ তাদের কল্যাণ করুন। তাদের মধ্যে কেউই আমার চেয়ে অধিক সমর-অভিজ্ঞতা ও রণদক্ষতার অধিকারী নয়। যুদ্ধ সম্পর্কে যে পরিমাণ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমার অর্জিত হয়েছে, আর কেউ তা অর্জন করতে পারেনি। ২০ বছর বয়সে পৌঁছতে না পৌঁছতেই রণদক্ষতা আমার অর্জন হয়। এখন আমার বয়স প্রায় ৬০ বছর। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো রায় বা পরামর্শ কাজে পরিণত করা না যাবে, ততক্ষণ সেই রায় বা পরামর্শ কোনো সুফল বয়ে আনবে না। '১৮৩
প্রকৃতপক্ষে আলি রা.-এর এই ভাষণ ছিল একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। যা তিনি এমন এক জাতির মাথায় নিক্ষেপ করেছিলেন, যারা তাঁকে তাঁর জিহাদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে বঞ্চিত রেখেছেন। যে উদ্দেশ্য তিনি বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন, তারা সে পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি তাঁর ধারণা এবং পরে তার বিপরীত ফলাফল দেখে দুঃখে-ক্ষোভে এমন উন্নত ও সাহিত্যপূর্ণ ভাষ্যে নিজের আবেগ প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষণ ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি কোনো ধরনের সন্দেহ, সংশয় ও রাখঢাক রাখেননি।১৮৪
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলে নয়; তা হচ্ছে—আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর খেলাফতের ব্যাপারে তাঁর যে ভাষণ বর্ণিত আছে এবং খেলাফতের বাহ্যিক গুণাবলির বিপরীতে ইতিহাসের যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে ভাষণটি তিনি দিয়েছিলেন নাহরাওয়ানে অভিযানের পর। তখনকার করুণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েন। সেই দুঃখের কথাই প্রতিভাত হয়েছে তাঁর ভাষণে। তিনি জাতির পূর্বাপর অবস্থা প্রত্যক্ষ করে খুবই দুঃখ পান। মনোকষ্টে ভোগেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, তাঁর প্রতি সম্পৃক্ত অধিকাংশ ভাষণ বিশুদ্ধ সূত্রে বিবৃত নয়। কয়েকজন আলেম নাহজুল বালাগায় উল্লিখিত আলি রা.-এর ভাষণের ব্যাপারে বলেছেন, এগুলো সব শারিফ আররাজি'র বানোয়াট ভাষণ।১৮৫ সুতরাং ঐতিহাসিক সূত্রের আলোকে সেগুলো উপস্থাপনে আমাদের আরও দূরদর্শী ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে।
এতদ্ভিন্ন আরেকটি প্রেক্ষিতেও আলি রা. তাঁর লোকদেরকে যুদ্ধের প্রতি উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। সেটা হলো, তিনি তাঁর সাথিদেরকে নিজের ফাজায়েল, মর্যাদা এবং ইসলামে তাঁর উঁচু মর্যাদার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন। যারা এই দৃশ্য দেখছিল তারা বলছেন—আলি রা. উম্মুক্ত প্রান্তরে মানুষকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওই ফরমানের সূত্রে সাহায্যের জন্য ডাকছিলেন যে, কে আছ! জনাকীর্ণ দিনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একথা বলতে শুনেছ—'তোমরা কি জানো না, আমি মুমিনদের কাছে তাদের প্রাণাধিক প্রিয়?' লোকেরা বলল, 'হ্যাঁ, কেন নয়'? তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তাহলে আমি যার বন্ধু, আলিও তার বন্ধু। হে আল্লাহ, যে তাঁকে বন্ধু বানাবে, তুমি তাঁর প্রিয় হয়ে যাও। আর যে তাঁর সাথে বিদ্বেষ পোষণ করবে, তুমি তার শত্রু হয়ে যাও।'
একথা শুনে ১২ জন লোক মতান্তরে ১৬ জন লোক দাডিয়ে একথার সত্যতা ব্যাপারে সাক্ষ্য দেয়।১৮৬
হজরত আলি রা.-এর এই ভূমিকা আমাদেরকে হজরত উসমান রা.-এর জীবনের শেষ সময়কার স্মৃতি তাজা করে দেয়-যখন দুষ্কৃতিকারীরা তাঁকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। আর তিনি তাঁর ফাজায়েল ও মর্যাদার সাক্ষী তাঁর সামনে উপস্থিত সাহাবাদের কাছ থেকে নিচ্ছিলেন। যেন তিনি বলতে চাচ্ছিলেন-যার এমন মহৎ মর্যাদা, ইসলামের তরে যার এমন ত্যাগ; তাঁর বদলা কি এমন হতে পারে?
যাইহোক, এসব উদ্দীপনা ও অনবরত চেষ্টার পরও আলি রা. নিজ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হননি। অর্থাৎ, দেশের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, সৈনিকদের অসন্তুষ্টি, তাদের পারস্পরিক অসহযোগী মনোভাব ও আত্মম্ভরিতার ফলে সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে ৪০ হিজরিতে মুআবিয়া বিন আবি সুফইয়ান রা.-এর সাথে এ শর্তে সন্ধি করতে রাজি হয়ে যান যে, ইরাক আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আর সিরিয়া তাঁর (মুআবিয়া) নিয়ন্ত্রণে থাকবে। উভয়ের মধ্যে কেউই অন্যের কাজে সামরিক হস্তক্ষেপ, অতর্কিত আক্রমণ বা যুদ্ধের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। তাবারি রাহ. তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে লিখেন-
'৪০ হিজরি সনে আলি ও মুআবিয়ার মধ্যে অনেক পত্র লেখালেখির পর সন্ধিচুক্তি সাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে বলা হয়—উভয় পক্ষের মধ্যে আর কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হবে না। ইরাকের কর্তৃত্ব থাকবে আলির হাতে এবং সিরিয়ার কর্তৃত্ব থাকবে মুআবিয়ার হাতে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর হামলা, সৈন্য চালনা ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম গ্রহণ করবে না।১৮৭
টিকাঃ
১৮২ ফুরাতে পূর্ব তীরে অবস্থিত শহর।
১৮৩ আল জাহিয প্রণীত আল বায়ান ওয়াত তিবয়ান: ২৩৮, ২৩৯।
১৮৪ নায়েফ মারুফ প্রণীত আল আদাবুল ইসলামি : ৫৯।
১৮৫ মিযানুল ইতিদাল ৩/১২৪; খিলাফাত আলি বিন আবি তালিব: ৩৫৫।
১৮৬ ফাজায়িলুস সাহাবাহ: ২/৭০৫ [সনদ বিশুদ্ধ)।
১৮৭ তারিখে তাবারি: ৬/৫৬।
📄 শাহাদাত প্রার্থনার দুআ
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. হজরত মুআবিয়া রা.-এর সাথে সন্ধিচুক্তি তো করে নিয়েছেন; কিন্তু মনে হচ্ছিল এই সন্ধিচুক্তি বেশি দিন টেকেনি। কেননা, যে বছর আলি রা. শহিদ হন, ওই বছর মুআবিয়া রা. হেজাজ ও ইয়ামেন ইত্যাদি এলাকায় বুসর বিন আরতাতকে সামরিক বাহিনী দিয়ে প্রেরণ করেন।১৮৮
যাইহোক, যখন আলি রা. নিজের বাহিনীকে নিজ লক্ষ্য পূরণে নিয়ে যেতে সক্ষম হলেন না এবং তাদের পিছুটান ও হীনম্মন্যতা দেখতে পেলেন, তখন তিনি বেঁচে থাকার চাইতে মৃত্যুকে প্রাধান্য দিলেন। আল্লাহর দিকে মনোযোগী হলেন এবং দ্রুত এই নশ্বর পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নেওয়ার জন্য দুআ করতে লাগলেন। তিনি একদিন খুতবা দিতে গিয়ে বলেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي قَدْ سَئِمْتُهُمْ وَسَئِمُونِي وَمَلَلْتُهُمْ وَمَلُّونِي, فَأَرِحْنِي مِنْهُمْ وَأَرِحْهُمْ مِنِّي
'হে আল্লাহ, আমি এদের নিরাশ করেছি। তারাও আমাকে নিরাশ করেছে। সুতরাং তুমি তাদের কাছ থেকে আমাকে মুক্তি দাও এবং তাদেরকেও আমার কাছ থেকে মুক্তি দাও।'
অতঃপর দাড়িতে নিজ হাত রাখলেন। বলতে লাগলেন, 'তোমাদের সবচে নিকৃষ্ট লোক (খুনি)-এর জন্য আর কোনো বাধা নেই যে, সে এটাকে (দাড়ি) রক্তে রঞ্জিত করবে।'১৮৯
তিনি তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে খুবই কায়মনোবাক্যে দুআ করতেন। জুনদুবের বর্ণনা- লোকজন আলি রা.-এর কাছে সমবেত হলে তিনি বললেন, 'হে আল্লাহ, আমি তাদের পরাজিত করেছি, তারাও আমাকে পরাজিত করেছে। আমি তাদের ঘৃণা করেছি, তারাও আমাকে ঘৃণা করেছে। সুতরাং আপনি তাদেরকে আমার হতে এবং আমাকে তাদের হতে মুক্তি দিন।১৯০
অন্য বর্ণনায় এসেছে; আবু সালিহ বলেন, আলি রা. তাঁর মাথায় মাসহাফ রেখেছিলেন। আমি তখন তাঁর কাছে উপস্থিত ছিলাম। আমি পৃষ্ঠা উল্টানোর আওয়াজ শুনলাম। তিনি দুআ করছিলেন-
'হে আল্লাহ, আমি ওদের কাছে তা-ই চেয়েছি যা এই কুরআনে আছে। কিন্তু তারা তা আমাকে দেয়নি। হে আল্লাহ, আমি তাদের কষ্ট দিয়েছি, তারাও আমাকে কষ্ট দিয়েছে। আমি তাদের ঘৃণা করেছি, তারাও আমাকে ঘৃণা করেছে। তারা আমাকে এমন বিষয়ে বাধ্য করেছে যা আমার অপছন্দনীয়। সুতরাং আপনি তাদেরকে আমার স্থলে আমার চেয়েও মন্দ শাসক অধিষ্ঠিত করুন। আর আমাকে তার পরিবর্তে তাদের চেয়ে ভালো লোক দান করুন। ওদের মন এমনভাবে গলিয়ে দিন, লবণ যেমন পানিতে গলে যায়।১৯১
এক বর্ণনামতে, এই দুআর মাত্র তিনদিন পর তিনি শাহাদত বরণ করেন।১৯২
হজরত হাসান ইবনে আলি রা. বলেন, আমাকে আলি রা. বলেছেন-আজ রাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনার উম্মত আমার সাথে খুবই ঝগড়া ও বক্রতার আচরণ করছে।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি তাদের বদদুআ করো।' তখন আমি এই দুআ করলাম, 'হে আল্লাহ, এর বদলাস্বরূপ আপনি আমাকে এদের চেয়ে ভালো মানুষদের সঙ্গী বানান, আর তাদেরকে আমার স্থলে আমার চেয়ে মন্দ শাসক অধিষ্ঠিত করুন।' হাসান রা. বলেন, এরপর তিনি বাইরে গেলেন এবং এক লোক তাঁকে শহিদ করে দিলো।১৯৩
টিকাঃ
১৮৮ বুখারি প্রণীত আততারিখুস সাগির: ১/৪১; খিলাফাত আলি বিন আবি তালিব: ৪৩১।
১৮৯ মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক: ১০/১৫৪ সনদ বিশুদ্ধা: তাবাকাত: ৩/৪ সনদ বিশুদ্ধ।
১৯০ ইবনে আবি আসিম প্রণীত আল আহাদ ওয়াল মাসানি: ১/৩৭ [সনদ বিশুদ্ধ]; খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৪৩২।
১৯১ সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১৪৪।
১৯২ খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব : ৪০২।
১৯৩ জাহাবি প্রণীত তারিখুল ইসলাম আহদিল খুলাফাইর রাশিদিন : ৬৪৯।
📄 আমিরুল মুমিনিন রা. তাঁর শাহাদাতের বিষয়টি জানতেন
দালায়িলুন নাবুওয়াতের অন্তর্ভুক্ত কিছু কিছু হাদিস দ্বারা অনুমিত হয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলি রা.-এর শাহাদতের বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। সহিহ মুসলিম-এ হজরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত; রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেরা পর্বতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আবু বকর, উমর, উসমান, আলি, তালহা ও জুবাইর রা.। পর্বত কাঁপতে লাগল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'থেমে যাও হেরা! তোমার ওপর নবি, সিদ্দিক ও শহিদ ছাড়া আর কেউ নেই।'১৯৪
এ ছাড়া এ বিষয়ে অন্যান্য বিশেষ হাদিসও রয়েছে। যা দ্বারা বোঝা যায়, তিনি ইরাকের ভূখণ্ডে শাহাদত বরণ করবেন। এমনকি কীভাবে শহিদ হবেন—তার বর্ণনাও রয়েছে। সুতরাং নববি ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী সমুদয় পরিস্থিতি যথাযথভাবে সংঘটিত হওয়া আমাদের নবিজির সত্যবাদিতার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। সেটা এ বিষয়েও প্রমাণ বহন করে যে, তিনি নিজের মনগড়া কোনো কথা বলতেন না; বরং আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে তাঁকে যে কথা বলতে নির্দেশ দিতেন, তিনি তা-ই বলতেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলি রা.-কে ওই অবস্থা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন-যা ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে। আলি রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেইসব ভবিষ্যদ্বাণী সত্যরূপে বিশ্বাস করেছেন। বিভিন্ন সময়ে মানুষের সাথে এসব বিষয়ে আলোচনাও করতেন। একবার ইরাকে এ-সংক্রান্ত আলোচনা করছিলেন। আবুল আসওয়াদ দুয়ালি সেটা বর্ণনা করেন এভাবে:
আমি আলি রা.-কে বলতে শুনেছি-আমি সফরের জন্য সওয়ারির রিকার হাতে নিলাম। এমন সময়ে আবদুল্লাহ ইবনে সালাম আমার কাছে এলেন। তিনি আমাকে বলতে লাগলেন, 'কোথায় যাচ্ছেন'? আমি বললাম, 'ইরাকে'। তিনি বললেন, 'আপনি কি দোধারি তরবারির আঘাতে কেটে পড়ার জন্য সেখানে যাচ্ছেন'? আলি রা. বললেন, 'আল্লাহর শপথ! আপনার পূর্বে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একথা বলতে শুনেছি'।
আবুল আসওয়াদ বলেন, একথা শুনে আমি বিস্ময়বোধ করতে লাগলাম। মনে মনে বললাম-এ-তো দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। নিজের ব্যাপারে এমন কথা বলে যাচ্ছে! ১৯৫
তিনি খেলাফতের দায়িত্বে অধিষ্টিত হওয়ার পূর্বে ইয়ানবা এলাকায় আবু ফুজালাহ আনসারির সাথে এ ধরনের আলোচনা করেছিলেন। তখন আবু ফুজালাহ আলি রা.-এর রোগের অবস্থা দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি তখন বলেছিলেন-আমি এই রোগে বা এই কষ্টে মারা যাব না। আমার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছেন, 'আমি ততক্ষণ পর্যন্ত মারা যাব না, যতক্ষণ পর্যন্ত এই দাড়ি মাথার রক্তে রঞ্জিত না হবে। '১৯৬
খারেজিদেরও তিনি একথা বলেছেন। সাধারণ সাথিদেরও বলেছেন। ইমাম বায়হাকি রাহ. তাঁর দালাইলুন নুবুওয়াহ গ্রন্থে এ-সংক্রান্ত হাদিসসমূহ একত্র করেছেন।১৯৭ অনুরূপভাবে হাফেজ ইবনে কাসির রাহ.-ও আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে এসব বর্ণনা জমা করেছেন।১৯৮
আবদুল্লাহ ইবনে দাউদ আমাশের 'সূত্রে তিনি সালামাহ ইবনে সুহাইল হতে, তিনি সালিম ইবনে আবি জাদাহ হতে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে সাবা হতে বর্ণনা করেন; আবদুল্লাহ ইবনে সাবা বলেছেন, আমি আলি রা.-কে মিম্বরে বলতে শুনেছি-'আমি কেবল একজন বদবখতের অপেক্ষায় আছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে নিশ্চিত করেছেন, এই (দাড়ি) তার (মাথার) রক্তে রঞ্জিত হবে।' লোকেরা বলল, 'হে আমিরুল মু’মিনিন, আমাদেরকে ওই হন্তারকের পরিচয় দিন। আমরা তার গোটা গোষ্ঠীসহ সমূলে উৎপাটন করব।' আলি রা. বললেন, 'আল্লাহর পানাহ! আমি চাই না আমার কারণে আমার খুনি ছাড়া অন্য একজন লোককেও অন্যায়ভাবে হত্যা করা হোক।'১৯৯ অতঃপর তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করেন,
أشدد حيازيمكَ لِلمَوتِ * فَإِنَّ المَوتَ لاقيكا ولا تجزع من القتل * إذا حلّ بواديكا
'মৃত্যুর অভ্যর্থনার প্রস্তুতি নাও। সে অবশ্যই তোমাদের কাছে এসে পৌঁছবে। মৃত্যু যখন তোমার উঠানে পা বাড়াবে তখন তাকে ভয় পাবে না।'২০০
কোনো কোনো বর্ণনায় এরচে অধিক স্পষ্ট ভাষ্য এসেছে। যার সারকথা- আলি রা. তাঁর হন্তারক সম্পর্কে জানতেন। উবায়দা আসসালামানি বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণনা করে বলেন, আলি রা. যখন ইবনে মুলজিমকে দেখতেন, তখন তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করতেন,
أريد حياته ويريد قتلي * عذيرك من خليلك من مرادي
'আমি চাই সে বেঁচে থাকুক, আর সে আমাকে হত্যা করতে চায়। মুরাদ গোত্রের তোমার বন্ধুর কাছ থেকে কে তোমাকে ন্যায়বিচার এনে দেবে?'২০১
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে; আলি রা. আবদুল্লাহ ইবনে মুলজিমের ব্যাপারে বলেছেন, 'এই লোক আমার খুনি।' আলি রা.-কে বলা হলো, 'তাহলে এই লোককে শাস্তি দিতে কোন বস্তু আপনাকে বিরত রেখেছে?' জবাবে তিনি বললেন, 'কিন্তু এখনও তো সে আমাকে হত্যা করেনি।'২০২
তিনি যখন লোকদের বললেন, 'আমাকে হত্যা করা হবে'-তখন সবাই তাঁকে পরবর্তী খলিফা মনোনয়নের অনুরোধ জানান। কিন্তু আলি রা. এমনটি করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। আবদুল্লাহ ইবনে সাবা থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি শুনেছি আলি রা. বলতেন- 'এটা (মাথা) এটাকে (দাড়ি) রঞ্জিত করবে। কাজেই হতভাগ্য ব্যক্তিটি আমার ব্যাপারে অপেক্ষা করছে কেন?' লোকজন বলল, 'হে আমিরুল মুমিনিন, কে সে ব্যক্তি আমাদের জানান, আমরা তাকে হত্যা করে ফেলি।' আলি রা. বললেন, 'আল্লাহর কসম! তাহলে তো আমাকে যে হত্যা করেনি তাকে হত্যা করা হবে।' তারা বলল, 'তাহলে আমাদের জন্যে একজন আমির নির্বাচন করুন।' আলি বললেন, 'না, বরং আমি তোমাদেরকে সেভাবে রেখে যাব যেভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রেখে গেছেন।' তারা বলল, 'তাহলে আপনি আপনার প্রতিপালকের কাছে গিয়ে কী উত্তর দেবেন?' তিনি বললেন, 'আমি বলব-হে আল্লাহ! আপনার যতদিন খুশি ততদিন আমাকে তাদের মাঝে রেখেছেন। এরপর আমাকে আপনার নিকটে নিয়ে এসেছেন। আর আপনি তাদের মাঝে বিরাজমান। এখন আপনি চাইলে তাদের কল্যাণ করুন, চাইলে অকল্যাণ করুন।'১২০৩
হজরত আলি রা. হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি মহা সত্যবাদী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
إِنَّكَ سَتُضْرَبُ ضَرْبَةً هَاهُنَا ، وَضَرْبَةً هَاهُنَا ، وَأَشَارَ إِلَى صُدْغَيْهِ ، فَيَسِيلُ دَمُهَا حَتَّى يَخْضِبَ لِحْيَتَكَ ، وَيَكُونُ صَاحِبُهَا أَشْقَاهَا كَمَا كَانَ عَاقِرُ النَّاقَةِ أَشْقَى ثَمُودَ
'তোমাকে এই স্থানে আঘাত করা হবে। একথা বলার সময় তিনি মাথার তালুর দিকে ইঙ্গিত করেন এবং বলেন “এটা” “এটা”কে রঞ্জিত করবে। অর্থাৎ, মাথার রক্তে দাড়ি রঞ্জিত করবে। আঘাতকারী এমনভাবে সবচে নিকৃষ্ট লোক হবে, যেভাবে উষ্ট্রীর পা কর্তনকারী সামুদ জাতি সবচে নিকৃষ্ট জাতি ছিল।'২০৪
টিকাঃ
১৯৪ সহিহ মুসলিম: ৪/১৮৮০।
১৯৫ জাহাবি প্রণীত তারিখুল ইসলাম আহদিল খুলাফাইর রাশিদিন: ৬৪৮।
১৯৬ খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৪৩১।
১৯৭ দালাইলুন নুবুওয়াহ: ৬/৪৩৮-৪৪১।
১৯৮ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৭/৩২৩-৩২৫।
১৯৯ আজিরি প্রণীত কিতাবুশ শারিয়াহ: ৪/২১০৫।
২০০ জাহাবি প্রণীত তারিখুল ইসলাম আহদিল খুলাফাইর রাশিদিন: ৬৪৮।
২০১ তাবাকাতে ইবনে সাআদ ৩/৩৪, ৩৩ [সনদ বিশুদ্ধ)।
২০২ আল ইসতিয়াব: ৩/১২৭।
২০৩ মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল, আল মাউসুআতুল হাদিসিয়া : ২/৩২৫ [হাসান লিগাইরিহি]।
২০৪ খাসায়িসু আমিরিল মুমিনিন আলি বিন আবি তালিব: ১৬৩, ১৬৪।