📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 দম্ভের সাথে আত্মপ্রচার

📄 দম্ভের সাথে আত্মপ্রচার


বর্তমান যুগের চরমপন্থী ও উগ্রবাদীদের নিদর্শন এবং তাদের বিশেষ গুন হচ্ছে, তারা চরম আত্মম্ভরিতায় লিপ্ত। সবজান্তার ভাব থাকে সবসময় চেহারায়। অথচ শরয়ি ইলমের প্রাথমিক শিক্ষা এবং মৌলিক বিধিবিধান ও মূলনীতি সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। যদি কিছু ইলম থেকেও থাকে, তবে তা শরয়ি মূলনীতি, বিশুদ্ধ ফিকহ ও সঠিক রায়ের পরিপন্থী। তারা তাদের স্বল্পতর জ্ঞান আর অসার চিন্তা-চেতনা নিয়ে এতটাই গর্বিত ও আহ্লাদিত, যেন পূর্বাপর সকলের জ্ঞানের চেয়ে তার জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ। নিজ দম্ভের এই ছাঁচে তারা বিদগ্ধ আলেমগণের জ্ঞানকেও তুচ্ছ মনে করতে আরম্ভ করে। বন্ধ করে দেয় জ্ঞানান্বেষণের ধারা। এতে করে নিজে তো ধ্বংস হয়ই; অন্যকে ডুবিয়ে মারে ধ্বংসের অতলে।
খারেজিদেরও এমনই অবস্থা ছিল। তারা ইলম ও ইজতেহাদের দাবি করত। আলেমদের মুখে মুখে তর্ক করত। অথচ মূলত তারা ছিল মূর্খ ও অজ্ঞ। তাদের দাম্ভিক শ্রেণিটি অপরিপক্ক মন-মানসিকতাসম্পন্ন যুবক এবং অদূরদর্শীদেরকে ইলম ও ফিকহের দাওয়াতের ময়দানে নেতৃত্বের জন্য লেলিয়ে দেয়। কিছু লোক ওইসব মুর্খদেরকে নিজেদের নেতা ও ধর্মীয় গুরু হিসেবে মান্য করে। পরে কী হতো? ওরা ইলম ও দূরদর্শিতা ব্যতিরেকে ফতোয়া দিতে আরম্ভ করল। বিচার শোনাতে লাগল। অনভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিস্বল্পতার দরুন বহু দুর্দশা আর মুহুর্মুহু ক্ষতির সম্মুখীন হতে লাগল। তাদের অনেককে দেখা যায় যারা ওলামায়ে কেরাম ও মুসলিম মনীষীদের হেয়-প্রতিপন্নে কুণ্ঠাবোধ করে না। তাদের মান-মর্যাদার তোয়াক্কা করে না। হকপন্থী আলেমগণের কেউ যদি তাদের রায় ও চিন্তাধারার বিপরীতে ফতোয়া দিয়ে দেন, কিংবা তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একাত্মতা পোষণ না করেন, তাহলে তারা সেই আলেমকে জেনেশুনে ভ্রান্তিতে পতিত, অপরিণত, হীনম্মন্য, অতি উদার এবং জ্ঞানস্বল্পতার অপবাদে অভিযুক্ত করে। কিংবা অন্য কোনো অশোভনীয় আচরণ করে; যা দ্বারা সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতা, মহা-ফিতনা, আলেমগণের অসম্মান ও অবিশ্বস্ততা ছাড়া ভিন্ন কিছু বৃদ্ধি পায় না। ফলে এর করুণ পরিণতি গোটা মুসলিম জাতিকে ইহকাল ও পরকালে সমানভাবে পোহাতে হয়।১৫৭

টিকাঃ
১৫৭ নাসির আল আকল প্রণীত আল খাওয়ারিজ: ১২৯।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 স্বীয় রায়ের প্রাধান্য ও অন্যকে অজ্ঞ মনে করা

📄 স্বীয় রায়ের প্রাধান্য ও অন্যকে অজ্ঞ মনে করা


উগ্রপন্থার একটি স্পষ্ট দিক-নিজের রায়ের ক্ষেত্রে গোঁড়ামি আর অন্যের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন। অন্যের রায় যদি সঠিকও হয়ে থাকে, তবুও এরা জ্ঞানস্বল্পতা, আত্মম্ভরিতা ও অন্তঃসারশূন্য ধ্যান-ধারণার কারণে নিজের রায়কেই প্রাধান্য দেবে। গোঁড়ামি তবুও তাদের পিছু ছাড়বে না। আমাদের পূর্বেকার যুগে আত্মপূজা ও নিজ চিন্তাধারার গোঁড়ামির কারণেই এই ব্যাধিতে আক্রান্তকে মৃত্যুর দুয়ায়ে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। বলুন, এতদ্‌ভিন্ন কী এমন বিষয় আছে; যা জ্বলখুয়াইসারার মতো মূর্খ লোককে ডুবিয়েছে? ইবনুল জাওজি রাহ. বলেন,
'তার ধ্বংসের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে নিজের রায়কে প্রাধান্য দিয়েছে। একটু অপেক্ষা করলে সে বুঝে নিতে পারত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রায়ের চেয়ে উত্তম রায় আর হতে পারে না। জ্বলখুয়াইসারার সমবিশ্বাস লালনকারীদের অবস্থাও অনুরূপ। তারাও নিজেদের রায়কে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মনে করে এবং অন্যের রায়কে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। খারেজিরাও ইবাদতগুজার ছিল। তবে তাদের বিশ্বাস ছিল—তারা আলি রা.-এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী। এই মরণঘাতী ব্যাধি তাদের ধ্বংসের অতল গহ্বরে তলিয়ে নেয়।১৫৮
এই বেচারারা মুষ্টিমেয় কিছু বাক্যে আবদ্ধ হয়ে যায়, যার অর্থও তারা ভালো করে বুঝতে সক্ষম হয়নি। এ ছাড়া এর মর্মোদ্‌ঘাটনে সক্ষম—এমন কাউকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেসও করেনি। নিজেই সবজান্তা—এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাদের। অন্যদের তারা অজ্ঞ ও ভ্রান্ত মনে করত।
মুহাম্মাদ আবু জুহরাহ লিখেন, 'ইমান, لا حكم إلا الله, 'জালিম হতে মুক্তি'-এই শব্দ-বাক্যগুলোর নেশায় তারা এতই বুঁদ হয়ে পড়ে যে, তারা এর বাহ্যিক অর্থের দিকে তাকিয়ে مسلمانوں রক্ত হালাল মনে করে বসে। সর্বত্র হত্যাযজ্ঞ ও বিদ্রোহে মেতে ওঠে।১৫৯
এই অন্ধ গোঁড়ামি তাদেরকে সত্য গ্রহণে বাধা দেয়। অথচ সত্য তাদের সামনে উন্মুক্ত ছিল। আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. তাদের সাথে মুনাজারা করেছেন। বিতর্ক-বাহাস করেছেন ইবনে আব্বাস রা.। দূরীভূত করেছেন তাদের সন্দেহ ও আপত্তির বিষয়। স্পষ্ট দলিল-প্রমাণ দ্বারা বন্ধ করে দিয়েছেন তাদের মুখ। কিন্তু কিছুসংখ্যক লোক ছাড়া অন্যরা এতে সন্তুষ্ট হতে পারল না। তাদের কথা মানল না। উপরন্তু مسلمانوں জান-মাল বৈধ মরতে লাগল। আসল কথা হচ্ছে, নিজের অভিমতকে প্রাধান্য দেওয়া এবং অন্যকে অজ্ঞ মনে করা ইসলামের অন্যতম মূলনীতি—যেমন : শূরাব্যবস্থা ও কল্যাণকামিতার পরিপন্থী।১৬০

টিকাঃ
১৫৮ তালবিসু ইবলিস : ৯০, ৯১।
১৫৯ মুহাম্মাদ আবু যুহরাহ প্রণীত তারিখুল মাজাহিবিল ইসলামিয়া : ৬১।
১৬০ জাহিরাতুল গুলু ফিদ্দিন: ২১৫-২২৩।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 হক্কানি আলেমদের বিষোদগার ও বিদ্বেষ

📄 হক্কানি আলেমদের বিষোদগার ও বিদ্বেষ


বর্তমান সময়ে বেশ বিচিত্র ও বিস্ময়কর পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। হক্কানি আলেমদের মানসম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। এতে বিচ্যুতি ও ভ্রষ্টতার চাকু চালানোর চেষ্টা চলছে। এই আক্রমণ বড়ই শক্তিশালী। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী, প্রবন্ধ, গ্রন্থ, সেমিনার হল, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষাকেন্দ্রে এই আক্রমণের দৃষ্টান্ত দেখতে পাওয়া যায়। এই আক্রমণ ও চেতনাগত স্রোতধারা মুসলিম জাতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যারা পূর্ব হতে দিশেহারা তাদের পথ আরও বেঁকে যাচ্ছে। শুরু থেকে যারা গোত্রপ্রিয় ও আঞ্চলিকতার মোহজালে আডষ্ট, তারা আরও বেশি গোত্রপ্রিয় ও সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠছে। ওলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও বিদ্বেষের ধারা এমনিতেই চালু হয়নি; বরং এর পেছনে বহু প্রভাবক নিয়ামক শক্তি কাজ করছে। যেমন: শিক্ষক ছাড়া ইলম শেখা, আলেমগণের ভাষ্য ও বক্তৃতার উল্টো অর্থ বোঝা, আত্মম্ভরিতা ও হিংসা-বিদ্বেষ।
পরিতাপের বিষয়, আমাদের কিছু অতি উৎসাহী যুবক এক্ষেত্রে একধাপ এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তারা আলেমগণের দোষচর্চা ও ভুল-ত্রুটি খুঁটেখুঁটে বের করার কাজে উঠেপড়ে লেগেছে। তাঁদের বক্তৃতা ও ব্যক্তিগত চিন্তাধারা খণ্ডনে উচ্চকণ্ঠ হচ্ছে। সেগুলোতে এদিক-সেদিক করে সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
এমন কর্মকাণ্ডে ধোঁকায় পতিত হচ্ছে সাধারণ জনগণ। বিরুদ্ধবাদীদের কণ্ঠ রোধে এটাকে ব্যবহার করা হচ্ছে হাতিয়ার হিসেবে। এসব অদূরদর্শী বন্ধুদের এ-জাতীয় কর্মকাণ্ড ইসলামের জন্য আত্মঘাতি এবং ইসলামের শত্রুদের জন্য চোখ জুড়ানোর উপাদান। এমন নিকৃষ্ট কার্যক্রম অজ্ঞতা, জিঘাংসা ও আত্মিক ব্যাধির দলিল। হক্কানি আলেমগণ সবসময় এ বিষয়ে হুঁশিয়ার করেছেন। কেননা, এর মন্দ প্রভাব مسلمانوںকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে। কোনোরূপ চেষ্টা-তদবির ব্যতিরেকেই ইসলামের শত্রু ও ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা এর সুফল ভোগ করে।
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রাহ. আলেম ও ইমামগণের দুর্বল উক্তি ও ব্যক্তিগত মতামতকে সাধারণ্যে পৌঁছাতে নিষেধ করতে গিয়ে বলেছেন,
"... এ ধরনের জয়িফ মাসআলা মুসলিম ইমামগণের মধ্য হতে কোনো ইমামের কাছ থেকে উদ্ধৃত করা কারও জন্য বৈধ নয়। চাই তা খণ্ডন উদ্দেশ্য হোক বা তাতে আমল করা। কেননা, এর দ্বারা জয়িফ উক্তির প্রসারের পাশাপাশি ইমামের ব্যাপারে বিদ্বেষ-বিষোদগারও করা হয়ে থাকে। এ জাতীয় মাসআলার কারণে তাতারিদের এক গুপ্তচর মুসলমানদের মাঝে অনুপ্রবেশ করে আহলে সুন্নাতের মাঝে ফিতনার বীজ বপন করতে সক্ষম হয়। তাদেরকে নিজেদের আকিদা-বিশ্বাস থেকে সে এমনভাবে পৃথক করে নেয় যে, একপর্যায়ে তারা নিজেদের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করে বসে। পরে তারা রাফেজি ও নাস্তিক হয়ে যায়।১৬১
যারাই মুসলিম জাতির হক্কানি ওলামায়ে কেরামগণের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হয়েছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে, তারা ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়—ইহুদি, খ্রিষ্টান ও তাগুতের ষড়যন্ত্র ও গুপ্ত মিশনের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। জেনে হোক বা না-জেনে; এসব লোক আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও মধ্যপন্থী মতাদর্শ হতে দূরে সরে আছে। যারা বিশ্বাস করে—
'আলেম মনীষীগণ—পূর্ববর্তী যুগের হোক বা পরবর্তী যুগের; সর্বাবস্থায় তাঁরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদাঙ্ক অনুসারী ছিলেন। ছিলেন কল্যাণের অনুগামী এবং ফকিহ ও দূরদর্শী। যখনই তাঁদের আলোচনা করা হবে, সৎ উদ্দেশ্যে কল্যাণের সাথে হবে। তাঁদের মান-মর্যাদার সাথে ধৃষ্টতা প্রদর্শনকারীরা সরল পথ থেকে ছিটকে পড়বে।' ১৬২
হক্কানি আলেমগণের দোষচর্চা ও বিষোদ্গারকারীদের জেনে রাখা উচিত, ওইসব আলেমগণের গোশত বিষমিশ্রিত। তাদের শানে বিদ্বেষ পোষণকারীদের ব্যাপারে আল্লাহর সুন্নাত তো সবার জানা। সম্ভবত এসব অজ্ঞলোক জানে না, অধিক মর্যাদা এবং তাকওয়া ও আল্লাহভীতিই মানুষের ভালোমন্দের ব্যাপারে বিধান আরোপের মাপকাঠি।
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রাহ. বলেন,
'শরিয়ত, ইতিহাস ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এ ব্যাপারে সম্যক অবগত যে, যেসব মর্যাদাবান ব্যক্তি ইসলামের তরে উত্তম কীর্তি রেখে গেছেন, সুনাম অর্জন করেছেন, ইসলাম ও مسلمانوں হৃদয়ে তাঁর উঁচু মর্যাদা রয়েছে; তাঁর পক্ষেও ভুল হতে পারে। কিন্তু তাঁকে সেক্ষেত্রে মাজুর তথা অপারগ মনে করতে হবে। তাঁর জন্য সওয়াবের প্রত্যাশা রাখতে হবে। কেননা, সেগুলো তাঁদের ইজতেহাদি ভুল ছিল। সেই ভুলের ক্ষেত্রে যেমন তাঁদের অনুসরণ করা যাবে না, তদ্রূপ মানুষের অন্তরে তাঁদের মান-মর্যাদায় আঘাত আসে বা সম্মানহানি হয়-এমন কাজও করা যাবে না।১৮০
উম্মতের হক্কানি আলেমদের যদি পর্যায়ক্রমে অভিযুক্ত করে তোলা যায়, তাহলে এই উম্মতের নেতৃত্ব দেবে কারা? একসময় এই নেতৃত্ব এমন অজ্ঞ যুবকদের হাতে চলে আসবে, যারা না ভালো করে কুরআন পড়তে পারে, না তাদের ভাষা ঠিক আছে আর না শরয়ি ইলম ও শাস্ত্রে তাদের ন্যূনতম দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা আছে।
এই সংস্কৃতি তো ইসলামের শত্রুদের চোখ তৃপ্ত করে তুলবে। আর কেনই বা হবে না! এতে এমন এক প্রজন্ম তৈরি হয়ে যাবে, যাদের কোনো নেতা থাকবে না। প্রত্যেকেই বনে যাবে নিজ নিজ নেতা। পৃথিবীর বুকে এমন কোনো প্রজন্ম কখনোই সফল হয়নি; যাদের নেতৃত্ব নেই। পূর্বেকার যুগের জাতিদের সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তি হতো তাদের ধর্মীয় পণ্ডিত ও সন্ন্যাসীরা। তাদের মধ্যে থাকত ভ্রান্তি ও ভ্রান্ত লোকদের আধিক্য। কুরআন সাক্ষ্য দিচ্ছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيراً مِنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ
'হে ইমানদারগণ, পণ্ডিত ও সংসারবিরাগীদের অনেকে লোকদের মালামাল অন্যায়ভাবে ভোগ করে চলছে এবং আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত রাখছে।' -সুরা তাওবা: আয়াত ৩৪।
অথচ মুসলিম জাতির সবচে পুতঃপবিত্র ব্যক্তিরা হচ্ছেন আলেমগণ। ইমাম শাবি রাহ. বলেন,
'মুসলমান ছাড়া অন্যান্য জাতির সবচে নিকৃষ্ট লোক ছিল তাদের আলেম তথা ধর্মীয় পণ্ডিতগণ। কিন্তু মুসলমানদের আলেমগণ হচ্ছেন তাদের বাছাইকৃত পবিত্র মানুষ। বিষয়টি এভাবেও বোঝা যেতে পারে যে, মুসলিম ছাড়া অন্য সব জাতি ও সম্প্রদায় পথভ্রষ্ট। আর তাদের ভ্রষ্টতার কারণ হচ্ছে তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতরা। কারণ, তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতেরা তাদের সবার মাঝে নিকৃষ্ট। পক্ষান্তরে গোটা মুসলিম জাতি হেদায়াতের ওপর রয়েছে। তাদের এই হেদায়াতের পথ দেখিয়েছে তাদের আলেমগণ। কেননা, তাদের আলেমগণ তাদের মধ্যে সবচে ভালো মানুষ।১৬৪

টিকাঃ
১৬১ আল ফাতাওয়া: ৩২/১৩৭।
১৬২ শারহুল আকিদাতিত তাহাবিয়া: ২/৭৪০।
১৮০ আলামূল মুআক্কিয়িন: ৩/২৮৩।
১৬৪ আল ফাতাওয়া: ৭/২৮৪।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 অন্যের ওপর বাড়াবাড়ি ও উগ্রপন্থা

📄 অন্যের ওপর বাড়াবাড়ি ও উগ্রপন্থা


বর্তমান সময়ে উগ্রপন্থার একটি নিদর্শন হচ্ছে, অহেতুক অন্যের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। এটা এতটাই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেন অন্যের ব্যাপারে কঠোরতা ও কড়াকড়িই প্রত্যাশিত; হৃদতা-নম্রতা নয়। কতেক যুবকের ভেতর কঠোরতা ও উগ্রপন্থার প্রতি ঝোঁক একধরনের অভ্যাস হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। কেবল কথা নয়, কাজেও তারা এমনটি দেখিয়ে যাচ্ছে। ফলে রক্ত ঝরছে নিরপরাধ মানুষের। ধ্বংস হচ্ছে জনবসতি। এর মন্দ পরিণতি কেবল উগ্রপন্থীদেরই নয়; বরং গোটা উম্মতকেই পোহাতে হচ্ছে। সুতরাং এটা বেশ ভাবনার বিষয় যে, যুবকেরা কোথা হতে এবং কেন এই উগ্রপন্থার আশ্রয় নিল? পরিস্থিতি ও পর্যবেক্ষণ দ্বারা অনুমিত হচ্ছে, এর পেছনে বেশ কিছু মৌলিক ও তাৎপর্যবহ নিয়ামক শক্তি কাজ করছে। সংক্ষেপে তা এভাবে বলা যায়:
**পরীক্ষা ও দুর্দশা**
দীনের দাওয়াতে নিবেদিতপ্রাণ যুবকদের উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার একটি কারণ হচ্ছে, এ পথে তাদের নানা ধরনের বিপদ ও পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অনেক দুঃখ-কষ্ট তারা সহ্য করছে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে তারা উগ্রপন্থা দ্বারা এর জবাব দিচ্ছে। একপর্যায়ে এটাই তাদের আরেক স্বভাবে পরিণত হয়ে যায়।
**দাওয়াত ও তাবলিগের মূলনীতি সম্পর্কে অজ্ঞতা**
দাওয়াত ও তাবলিগ দ্বারা আমার উদ্দেশ্য—সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা। এটা গোটা উম্মতের গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। সুতরাং যারা এ পদে অধিষ্টিত তাঁদের দূরদৃষ্টি ও ফিকহ সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে; যাতে তাঁরা সহজে উম্মতের স্বার্থ সামনে রাখতে পারে এবং মন্দ প্রবণতা রুখতে পারে। এ ছাড়া আরও কিছু বিষয় তাঁদের জেনে রাখা আবশ্যক। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, এই দায়িত্ব কখনো অন্তর দ্বারা, কখনো মুখ দ্বারা, কখনো মুখ ও হাত দ্বারা পালন করা ওয়াজিব। এই জায়গাটায় অনেকে ভুল করে বসে। অসহিষ্ণুতা, অজ্ঞতা ও মূর্খতার কারণে কেবল হাত বা মুখ দ্বারা এই দায়িত্ব পালন করতে চায়। কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়—এটা সে দেখে না। এখন কোনটা পালনযোগ্য, কোনটা নয়—এসবের সে ধার ধারে না। ব্যস, এ পথে সে নিজের জবান চালায় এবং হাত চালায়, আর বিশ্বাস করে—সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করছে। অথচ সে আনুগত্য করছে না; বরং শরিয়তের সীমারেখা ভেঙে দিচ্ছে।১৬৭
অনুরূপভাবে যাকে উদ্দেশ করে দাওয়াত দেওয়া হচ্ছে তার অবস্থা ও গ্রহণক্ষমতার প্রতিও লক্ষ রাখা জরুরি। এক্ষেত্রে যাঁরা কাজ করে থাকেন তাদের প্রতি আমার পরামর্শ—সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের জন্য 'সিরাতুল মুতাকিম' তথা ভারসাম্যপূর্ণ সঠিক-সরল পথ গ্রহণ করবেন। চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌছার এটাই সবচে নিকটতম পন্থা। তদ্রূপ এ পথে নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন, সহিষ্ণু মনোভাব ও বিপদে ধৈর্যধারণও আবশ্যক। এ কাজের দায়িত্বশীলগণ যদি ধৈর্যশীল ও সহিষ্ণু না হন, তবে গড়ার চেয়ে ভাঙার প্রবণতাই সৃষ্টি হবে বেশি। মোটকথা, এ কাজে তিনটি বিষয় অতীব গুরুত্বপূর্ণ। যথা: ইলম, নম্রতা ও ধৈর্যশীলতা। অর্থাৎ, দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার পূর্বে সহিষ্ণুতা, দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার পর নম্রতা এবং ময়দানে অবতরণের পর তাতে ধৈর্যধারণ।
কাজি আবু ইয়ালা রাহ. বলেন, 'সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ তথা আল্লাহর পথে দাওয়াতের কাজ ওই ব্যক্তি পালন করবে, যে বুঝতে পারে যে, আমি কী বলছি এবং কী কাজ থেকে বারণ করা হচ্ছে—সেটাও আমি জানি। '১৬৮
এই হচ্ছে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ-সংক্রান্ত কিছু জ্ঞাতব্য বিষয়। এসব বিষয় জানা না-থাকার কারণে এবং আল্লাহর পথে দাওয়াতের ক্ষেত্রে এসবের তোয়াক্কা না করার ফলে মানুষ উগ্রপন্থা ও বাড়াবাড়ির পথে এগিয়ে যায়।
আমাদের কতেক যুবক দাওয়াত, ওয়াজ ও তাবলিগের ময়দানে মানুষকে আত্মশুদ্ধির কথা বলতে গিয়ে এবং শরিয়তবিরোধী কাজ থেকে বাধা দিতে গিয়ে বাড়াবাড়ি ও কঠোরতা অবলম্বন করে থাকে। তারা মনে করে কঠোরতাই মন্দ কাজ উপড়ে ফেলবে; ফলে দীনের কাজ গতিশীল হবে। তাদের দৃষ্টি হতে কোমলপন্থা অদৃশ্য হয়ে আছে। অথচ এটা ছিল এই সফরের মূল পাথেয়। এর সমুদয় পথ যখন রুদ্ধ হয়ে যাবে, কেবল তখনই দ্বিতীয় পন্থা হাতে নেওয়া যেতে পারে। কেননা, এই নীতি বেশ কার্যকর ও প্রভাবক।
কঠোরতা দ্বারা সাধারণত ঘৃণা জন্ম নেয়। প্রতিপক্ষকে ক্রুদ্ধ করে তোলে। আশ্চর্যের বিষয়; উগ্র চিন্তা লালনকারী যুবকেরা এটারই পার্থক্য করতে পারে না যে, কে ইলমের ভিত্তিতে আমাদের বিরোধিতা করছে, আর কে অজ্ঞতার ভিত্তিতে। কারা বেদআতের দিকে ডাকছে, আর কারা ধোঁকার বশবর্তী হয়ে ভ্রষ্ট-পথে আত্মবলিদান দিচ্ছে! কোন পথ সর্বসম্মত আর কোন পথ মতানৈক্যপূর্ণ।
এসব অজ্ঞ যুবকদের মধ্যে একটি ঘৃণিত বিষয় এমনও দেখা যাচ্ছে যে, মাতা-পিতার সাথে তারা খুবই স্পর্ধার ও অপছন্দনীয় আচরণ করে। তাদের দৃষ্টিতে যেন এদের মান-মর্যাদা ও সম্মানের প্রতি লক্ষ রাখার কোনো মানে নেই। না তাদের সে সাহায্য করে, না সেবা। তারা ভুলে যায়—অন্যদের তুলনায় এদের উভয়ের রয়েছে পৃথক পৃথক মান-মর্যাদা। যে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ তারা আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে, তা তাদেরই ফসল।
আমার আলোচনার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, তাদের সন্তুষ্ট করার নিমিত্তে পাপে নিমজ্জিত হতে হবে, কিংবা ধর্মীয় কার্যক্রম ও দাওয়াতি কমসূচি থেকে হাত গুটিয়ে রাখতে হবে। না, কখনো নয়; বরং আমরা চাই তাঁদের সাথে যেন আমাদের আচরণ হয় শিষ্ট, শান্ত ও কোমল। সামাজিকভাবে তাঁদের প্রতি হৃদ্যতা যেন অটুট থাকে। তাঁদের অসঙ্গত কর্মকাণ্ডে ধৈর্যধারণ করতে হবে; তাঁরা যেন দায়ির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ পান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهُنَّا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَى أَن تَشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تَطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعُ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
'আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু-বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে। পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরিক স্থির করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহাবস্থান করবে। যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে জ্ঞাত করব।' -সুরা লুকমান: আয়াত ১৪-১৫।
আমি আরও দেখেছি, আমাদের কতেক মুবাল্লিগ ভাই এমন লোকদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন না যারা ভালোর পাশাপাশি কিছু মন্দ কাজেও লিপ্ত। তাদের মতে এসব লোক সেবা, উপকার ও কোনো প্রকার ভালো বিষয় পাবার উপযুক্ত নয়। আমাদের এই যুবক ভাইয়েরা শত্রুতা-মিত্রতার মর্ম ও তার সীমারেখা সম্পর্কে অবগত নন। ফলে বন্ধুত্ব ও মহব্বতের ওপর শত্রুতা ও ঘৃণা প্রাধান্য বিস্তার করে। তারা ভুলে যায়, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা ইসলামি দাওয়াতের অন্যতম উপাদান। কেননা, এটা বাস্তব ও দৃশ্যমান কাজ। কথার মোকাবিলায় এর দ্বারা অন্তর প্রভাবিত হয় বেশি।
তারা জানে না সামাজিক লেনদেন ও আচার-আচরণে আমাদের ক্রুদ্ধ স্বভাব ও অসহায়তাপূর্ণ ভূমিকা উদ্দীষ্ট ব্যক্তির হৃদয়ে বক্রতা ও হেয়ালিপনা সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে ইসলামের শত্রুরা এটা ব্যবহার করে তাদেরকে বিকৃত চিন্তার মানুষদের সারিতে ফেলে দেয়।
অনুরূপভাবে কঠোরতাপ্রবণ ও উগ্রপন্থীদের আরেকটি নিদর্শন হচ্ছে, অতি উৎসাহী এসব যুবকের অদূরদর্শী কঠোরতা অনেক সময় কথার গণ্ডি অতিক্রম করে হত্যা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সৃষ্টি করে। তারা আলেমদের রক্তাক্ত করে। নিরপরাধ প্রহরীদের রক্ত ভাসায়। রক্তাক্ত করে ঘটনার সাথে জড়িত নয় এমন অনেক নাগরিককে। শেষে এটা জেনে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না যে, এরা কখনো কখনো পরস্পরই লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে পড়ে। একে অন্যের বিরুদ্ধে মুখ ও হাত চালায়।
আমার এ কথায় আশ্চর্যের কিছু নেই। আপনি আল্লাহর কিতাব, রাসুলের সুন্নাত ও সালফে সালেহিনের মতাদর্শ পরিপন্থী ফেরকাগুলোর ইতিহাস অনুসন্ধান করলে এসব ঘটনা দেখতে পাবেন। এই পথভ্রষ্ট সম্প্রদায় পরস্পর রক্তারক্তিতে লিপ্ত। একে অন্যকে পথভ্রষ্ট বলে বেড়ায়। একে অন্যকে কাফের বলে। এসব দেখে আমাদের আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আখেরি নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতাদর্শ ও হেদায়াত ছেড়ে দিলে এমনই পরিণতি হয়ে থাকে।
দাওয়াত, ওয়াজ ও তাবলিগ এবং মানুষের ব্যাপারে কঠোরতা ও কড়াকড়ি সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে পরিষ্কার। আল্লাহ তাআলা মুসা আ. ও তাঁর ভাই হারুন আ.-কে নির্দেশ দিয়ে বলেন,
وَاذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيْنَا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى 'তোমরা উভয়ে ফেরাউনের কাছে যাও, সে খুব উদ্ধত হয়ে গেছে। অতঃপর তোমরা তাকে নম্র-কথা বলো, হয়তো সে চিন্তা-ভাবনা করবে অথবা ভীত হবে।' -সুরা তাহা: আয়াত ৪৩-৪৪।
এই হচ্ছে ফেরাউনের মতো জালেমকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য মুসা আ. ও তাঁর ভাই হারুন আ.-এর প্রতি আমাদের প্রতিপালকের দিকনির্দেশনা। অর্থাৎ, হকের দাওয়াত দিতে হবে কোমলভাবে, নম্র ভাষায়। কেননা, এই নীতিতে দাওয়াত গ্রহণ করতে মন-মানসিকতা দ্রুত প্রস্তুত হয়। মনে আল্লাহর ভয় তৈরি হয়। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّذِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ) 'সমান নয় ভালো ও মন্দ। জবাবে তা-ই বলুন যা উৎকৃষ্ট। তখন দেখবেন আপনার সাথে যে ব্যক্তির শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু। এ চরিত্র তারাই লাভ করে, যারা সবর করে এবং এ চরিত্রের অধিকারী তারাই হয়, যারা অত্যন্ত ভাগ্যবান।' -সুরা হা-মিম: আয়াত ৩৪-৩৫।
দাওয়াত ও তাবলিগের সদস্যরা এ পথে দুঃখ-দুর্দশার মুখে পড়তে পারেন। বরং নিশ্চিতভাবে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েও থাকেন। তাই নিজের ভেতর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার অনুশীলন জরুরি। আবেগের কাছে পরাজিত হওয়া যাবে না। মানুষকে ক্ষমা করতে শিখতে হবে। হজরত লুকমান আ. তাঁর ছেলেকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, আল্লাহ তাআলা তা উল্লেখ করে বলেছেন,
يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
'হে বৎস, সালাত কায়েম করো, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ করো এবং বিপদাপদে সবর করো। নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ।' -সুরা লুকমান : আয়াত ১৭।
দাওয়াতি কাজের প্রত্যেক সদস্যের উচিত, তাঁরা যেন দাওয়াতের ক্ষেত্রে তার শ্রোতার আবেগ নিয়ে খেলা না করে এবং তাঁর ওপর কঠোরতা চাপিয়ে না দেয়। বরং সবধরনের অন্যায় কথাবার্তা ও গালমন্দ হতে দূরে থাকা চাই। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلاَ تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدُوًّا بِغَيْرِ عِلْمٍ 'তোমরা তাদেরকে মন্দ বলো না; যাদের তারা আরাধনা করে আল্লাহকে ছেড়ে। তাহলে তারা ধৃষ্টতা করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে মন্দ বলবে।' -সুরা আনআম: আয়াত ১০৮।
দাওয়াত, ওয়াজ ও তাবলিগের ময়দানে নম্রতা ও কোমলতাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং উগ্রতা ও কঠোরতা থেকে দূরে থাকা-সংক্রান্ত বহু হাদিস রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ الرِّفْقَ لا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ 'যার ভেতর নম্রতা থাকে সেটা তার অলংকার। আর নম্রতা ফুরিয়ে গেলে সেটা তার দোষ হিসেবে সাব্যস্ত হয়।' ১৬৯
অতএব, নম্রতা ও কোমলতাই দাওয়াত ও তাবলিগের প্রাণ। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, কঠোরতা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বরং প্রয়োজন সাপেক্ষে কঠোরতারও ব্যবহার হওয়া চাই। তবে তা হতে হবে যথাযথ স্থানে এবং সর্বশেষ পরিস্থিতিতে-যখন ধৈর্য ও নম্রতার সমুদয় উপাদান অকার্যকর হয়ে পড়বে। তাঁরাই সাহায্যপ্রাপ্ত যাঁদেরকে আল্লাহ তাআলা তাওফিক দান করেছেন এবং আত্মম্ভরিতা হতে রক্ষা করেছেন। ১৭০

টিকাঃ
১৬৭ আল ফাতাওয়া: ৮/২৭, ১২৮।
১৬৮ আল ফাতাওয়া: ৮/২৭, ১২৮।
১৬৯ মুসনাদে আহমাদ: ৪/৩৬২।
১৭০ জাহিরাতুল গুলু ফিদ্দিন: ২৩১-২৩৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00