📄 ধর্ম ও ইবাদতের নামে নিজের ক্ষেত্রে চরমপন্থা ও অন্যের জন্য সংকীর্ণতা
বর্তমান সময়ের চরমপন্থীদের একটি নিদর্শন— ধর্মে যে মধ্যমপন্থা ও সংযতচিত্ততার কথা বলা আছে এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, তা হতে তারা বহুক্রোশ দূরে অবস্থান করছে। অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটি করতে নিষেধ করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত; রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ الدِّينَ يُسْرُ، وَلَنْ يُشَادَّ الدِّينَ أَحَدُ إِلَّا غَلَبَهُ، فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَأَبْشِرُوا، وَاسْتَعِينُوا بِالْغَدْوَةِ وَالرَّوْحَةِ وَشَيْءٍ مِنَ الدُّلْجَةِ
'নিশ্চয়ই দীন সহজ। দীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করে দীন তার ওপর জয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং (মধ্যপন্থার) নিকটে থাকো, আশান্বিত থাকো এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে সাহায্য চাও।'১৫৫
দীনে বাড়াবাড়ি প্রকৃতপক্ষে দীন সম্পর্কে অজ্ঞতারই পরিণাম। এই উভয় দোষই রয়েছে খারেজিদের মধ্যে। বর্তমান সময়েও খারেজি চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত অধিকাংশ লোকের মধ্যে এই দোষ দুটি স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হচ্ছে।১৫৬
সহজ বিষয় এড়িয়ে চলা এবং অন্যকে সংকীর্ণতায় ফেলাও চরমপন্থার অংশবিশেষ। চরমপন্থীরা নিজেদের উদ্দীষ্ট ব্যক্তির যোগ্যতা ও সামর্থ্যের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করে না। তাদের শক্তির পার্থক্য সম্পর্কে ধারণা রাখে না। মন-মানসিকতার তারতম্যের ব্যাপারে তাদের অবগতি নেই। ফলে শক্তি-সামর্থ্যের চেয়ে অধিক ভারি দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে তাদের বাধ্য করা হয়। সহজ শরিয়তকে তাদের জন্য দুঃসাধ্য কর্মে রূপান্তর করে তোলে। এমন এমন কথা দ্বারা বক্তব্য রাখে, যা বোঝার সামর্থ্য শ্রোতার নেই।
অসার ভীতি, শরিয়তের বিধিবিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা ও মানুষের মান-মর্যাদা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল না-থাকার কারণে অন্যদের মধ্যে ব্যাপক সংকোচ ও সংকীর্ণতার সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানারূপে এর বিবর্তণীয় রূপ দেখতে পাওয়া যায়। নিজ চিন্তাধারা গ্রহণে অন্যকে বাধ্য করা, সবাইকে নিজের কথা গেলানো, অসার-অপ্রামাণ্য তথ্য দ্বারা বিভ্রান্ত করা এবং শরয়ি ছাড় উপেক্ষা করে শরিয়তে নিষিদ্ধ কড়াকড়ি-বাড়াবাড়ি বিষয়সমূহ জোর করে পালন করতে বাধ্য করা তাদের অন্যতম নিদর্শন।
টিকাঃ
১৫৫ সহিহ বুখারি মাআল ফাতহ: ১.৯৩।
১৫৬ নাসির আল আকল প্রণীত আল খাওয়ারিজ: ১৩০।
📄 দম্ভের সাথে আত্মপ্রচার
বর্তমান যুগের চরমপন্থী ও উগ্রবাদীদের নিদর্শন এবং তাদের বিশেষ গুন হচ্ছে, তারা চরম আত্মম্ভরিতায় লিপ্ত। সবজান্তার ভাব থাকে সবসময় চেহারায়। অথচ শরয়ি ইলমের প্রাথমিক শিক্ষা এবং মৌলিক বিধিবিধান ও মূলনীতি সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। যদি কিছু ইলম থেকেও থাকে, তবে তা শরয়ি মূলনীতি, বিশুদ্ধ ফিকহ ও সঠিক রায়ের পরিপন্থী। তারা তাদের স্বল্পতর জ্ঞান আর অসার চিন্তা-চেতনা নিয়ে এতটাই গর্বিত ও আহ্লাদিত, যেন পূর্বাপর সকলের জ্ঞানের চেয়ে তার জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ। নিজ দম্ভের এই ছাঁচে তারা বিদগ্ধ আলেমগণের জ্ঞানকেও তুচ্ছ মনে করতে আরম্ভ করে। বন্ধ করে দেয় জ্ঞানান্বেষণের ধারা। এতে করে নিজে তো ধ্বংস হয়ই; অন্যকে ডুবিয়ে মারে ধ্বংসের অতলে।
খারেজিদেরও এমনই অবস্থা ছিল। তারা ইলম ও ইজতেহাদের দাবি করত। আলেমদের মুখে মুখে তর্ক করত। অথচ মূলত তারা ছিল মূর্খ ও অজ্ঞ। তাদের দাম্ভিক শ্রেণিটি অপরিপক্ক মন-মানসিকতাসম্পন্ন যুবক এবং অদূরদর্শীদেরকে ইলম ও ফিকহের দাওয়াতের ময়দানে নেতৃত্বের জন্য লেলিয়ে দেয়। কিছু লোক ওইসব মুর্খদেরকে নিজেদের নেতা ও ধর্মীয় গুরু হিসেবে মান্য করে। পরে কী হতো? ওরা ইলম ও দূরদর্শিতা ব্যতিরেকে ফতোয়া দিতে আরম্ভ করল। বিচার শোনাতে লাগল। অনভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিস্বল্পতার দরুন বহু দুর্দশা আর মুহুর্মুহু ক্ষতির সম্মুখীন হতে লাগল। তাদের অনেককে দেখা যায় যারা ওলামায়ে কেরাম ও মুসলিম মনীষীদের হেয়-প্রতিপন্নে কুণ্ঠাবোধ করে না। তাদের মান-মর্যাদার তোয়াক্কা করে না। হকপন্থী আলেমগণের কেউ যদি তাদের রায় ও চিন্তাধারার বিপরীতে ফতোয়া দিয়ে দেন, কিংবা তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একাত্মতা পোষণ না করেন, তাহলে তারা সেই আলেমকে জেনেশুনে ভ্রান্তিতে পতিত, অপরিণত, হীনম্মন্য, অতি উদার এবং জ্ঞানস্বল্পতার অপবাদে অভিযুক্ত করে। কিংবা অন্য কোনো অশোভনীয় আচরণ করে; যা দ্বারা সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতা, মহা-ফিতনা, আলেমগণের অসম্মান ও অবিশ্বস্ততা ছাড়া ভিন্ন কিছু বৃদ্ধি পায় না। ফলে এর করুণ পরিণতি গোটা মুসলিম জাতিকে ইহকাল ও পরকালে সমানভাবে পোহাতে হয়।১৫৭
টিকাঃ
১৫৭ নাসির আল আকল প্রণীত আল খাওয়ারিজ: ১২৯।
📄 স্বীয় রায়ের প্রাধান্য ও অন্যকে অজ্ঞ মনে করা
উগ্রপন্থার একটি স্পষ্ট দিক-নিজের রায়ের ক্ষেত্রে গোঁড়ামি আর অন্যের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন। অন্যের রায় যদি সঠিকও হয়ে থাকে, তবুও এরা জ্ঞানস্বল্পতা, আত্মম্ভরিতা ও অন্তঃসারশূন্য ধ্যান-ধারণার কারণে নিজের রায়কেই প্রাধান্য দেবে। গোঁড়ামি তবুও তাদের পিছু ছাড়বে না। আমাদের পূর্বেকার যুগে আত্মপূজা ও নিজ চিন্তাধারার গোঁড়ামির কারণেই এই ব্যাধিতে আক্রান্তকে মৃত্যুর দুয়ায়ে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। বলুন, এতদ্ভিন্ন কী এমন বিষয় আছে; যা জ্বলখুয়াইসারার মতো মূর্খ লোককে ডুবিয়েছে? ইবনুল জাওজি রাহ. বলেন,
'তার ধ্বংসের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে নিজের রায়কে প্রাধান্য দিয়েছে। একটু অপেক্ষা করলে সে বুঝে নিতে পারত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রায়ের চেয়ে উত্তম রায় আর হতে পারে না। জ্বলখুয়াইসারার সমবিশ্বাস লালনকারীদের অবস্থাও অনুরূপ। তারাও নিজেদের রায়কে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মনে করে এবং অন্যের রায়কে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। খারেজিরাও ইবাদতগুজার ছিল। তবে তাদের বিশ্বাস ছিল—তারা আলি রা.-এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী। এই মরণঘাতী ব্যাধি তাদের ধ্বংসের অতল গহ্বরে তলিয়ে নেয়।১৫৮
এই বেচারারা মুষ্টিমেয় কিছু বাক্যে আবদ্ধ হয়ে যায়, যার অর্থও তারা ভালো করে বুঝতে সক্ষম হয়নি। এ ছাড়া এর মর্মোদ্ঘাটনে সক্ষম—এমন কাউকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেসও করেনি। নিজেই সবজান্তা—এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাদের। অন্যদের তারা অজ্ঞ ও ভ্রান্ত মনে করত।
মুহাম্মাদ আবু জুহরাহ লিখেন, 'ইমান, لا حكم إلا الله, 'জালিম হতে মুক্তি'-এই শব্দ-বাক্যগুলোর নেশায় তারা এতই বুঁদ হয়ে পড়ে যে, তারা এর বাহ্যিক অর্থের দিকে তাকিয়ে مسلمانوں রক্ত হালাল মনে করে বসে। সর্বত্র হত্যাযজ্ঞ ও বিদ্রোহে মেতে ওঠে।১৫৯
এই অন্ধ গোঁড়ামি তাদেরকে সত্য গ্রহণে বাধা দেয়। অথচ সত্য তাদের সামনে উন্মুক্ত ছিল। আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. তাদের সাথে মুনাজারা করেছেন। বিতর্ক-বাহাস করেছেন ইবনে আব্বাস রা.। দূরীভূত করেছেন তাদের সন্দেহ ও আপত্তির বিষয়। স্পষ্ট দলিল-প্রমাণ দ্বারা বন্ধ করে দিয়েছেন তাদের মুখ। কিন্তু কিছুসংখ্যক লোক ছাড়া অন্যরা এতে সন্তুষ্ট হতে পারল না। তাদের কথা মানল না। উপরন্তু مسلمانوں জান-মাল বৈধ মরতে লাগল। আসল কথা হচ্ছে, নিজের অভিমতকে প্রাধান্য দেওয়া এবং অন্যকে অজ্ঞ মনে করা ইসলামের অন্যতম মূলনীতি—যেমন : শূরাব্যবস্থা ও কল্যাণকামিতার পরিপন্থী।১৬০
টিকাঃ
১৫৮ তালবিসু ইবলিস : ৯০, ৯১।
১৫৯ মুহাম্মাদ আবু যুহরাহ প্রণীত তারিখুল মাজাহিবিল ইসলামিয়া : ৬১।
১৬০ জাহিরাতুল গুলু ফিদ্দিন: ২১৫-২২৩।
📄 হক্কানি আলেমদের বিষোদগার ও বিদ্বেষ
বর্তমান সময়ে বেশ বিচিত্র ও বিস্ময়কর পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। হক্কানি আলেমদের মানসম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। এতে বিচ্যুতি ও ভ্রষ্টতার চাকু চালানোর চেষ্টা চলছে। এই আক্রমণ বড়ই শক্তিশালী। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী, প্রবন্ধ, গ্রন্থ, সেমিনার হল, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষাকেন্দ্রে এই আক্রমণের দৃষ্টান্ত দেখতে পাওয়া যায়। এই আক্রমণ ও চেতনাগত স্রোতধারা মুসলিম জাতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যারা পূর্ব হতে দিশেহারা তাদের পথ আরও বেঁকে যাচ্ছে। শুরু থেকে যারা গোত্রপ্রিয় ও আঞ্চলিকতার মোহজালে আডষ্ট, তারা আরও বেশি গোত্রপ্রিয় ও সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠছে। ওলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও বিদ্বেষের ধারা এমনিতেই চালু হয়নি; বরং এর পেছনে বহু প্রভাবক নিয়ামক শক্তি কাজ করছে। যেমন: শিক্ষক ছাড়া ইলম শেখা, আলেমগণের ভাষ্য ও বক্তৃতার উল্টো অর্থ বোঝা, আত্মম্ভরিতা ও হিংসা-বিদ্বেষ।
পরিতাপের বিষয়, আমাদের কিছু অতি উৎসাহী যুবক এক্ষেত্রে একধাপ এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তারা আলেমগণের দোষচর্চা ও ভুল-ত্রুটি খুঁটেখুঁটে বের করার কাজে উঠেপড়ে লেগেছে। তাঁদের বক্তৃতা ও ব্যক্তিগত চিন্তাধারা খণ্ডনে উচ্চকণ্ঠ হচ্ছে। সেগুলোতে এদিক-সেদিক করে সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
এমন কর্মকাণ্ডে ধোঁকায় পতিত হচ্ছে সাধারণ জনগণ। বিরুদ্ধবাদীদের কণ্ঠ রোধে এটাকে ব্যবহার করা হচ্ছে হাতিয়ার হিসেবে। এসব অদূরদর্শী বন্ধুদের এ-জাতীয় কর্মকাণ্ড ইসলামের জন্য আত্মঘাতি এবং ইসলামের শত্রুদের জন্য চোখ জুড়ানোর উপাদান। এমন নিকৃষ্ট কার্যক্রম অজ্ঞতা, জিঘাংসা ও আত্মিক ব্যাধির দলিল। হক্কানি আলেমগণ সবসময় এ বিষয়ে হুঁশিয়ার করেছেন। কেননা, এর মন্দ প্রভাব مسلمانوںকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে। কোনোরূপ চেষ্টা-তদবির ব্যতিরেকেই ইসলামের শত্রু ও ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা এর সুফল ভোগ করে।
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রাহ. আলেম ও ইমামগণের দুর্বল উক্তি ও ব্যক্তিগত মতামতকে সাধারণ্যে পৌঁছাতে নিষেধ করতে গিয়ে বলেছেন,
"... এ ধরনের জয়িফ মাসআলা মুসলিম ইমামগণের মধ্য হতে কোনো ইমামের কাছ থেকে উদ্ধৃত করা কারও জন্য বৈধ নয়। চাই তা খণ্ডন উদ্দেশ্য হোক বা তাতে আমল করা। কেননা, এর দ্বারা জয়িফ উক্তির প্রসারের পাশাপাশি ইমামের ব্যাপারে বিদ্বেষ-বিষোদগারও করা হয়ে থাকে। এ জাতীয় মাসআলার কারণে তাতারিদের এক গুপ্তচর মুসলমানদের মাঝে অনুপ্রবেশ করে আহলে সুন্নাতের মাঝে ফিতনার বীজ বপন করতে সক্ষম হয়। তাদেরকে নিজেদের আকিদা-বিশ্বাস থেকে সে এমনভাবে পৃথক করে নেয় যে, একপর্যায়ে তারা নিজেদের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করে বসে। পরে তারা রাফেজি ও নাস্তিক হয়ে যায়।১৬১
যারাই মুসলিম জাতির হক্কানি ওলামায়ে কেরামগণের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হয়েছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে, তারা ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়—ইহুদি, খ্রিষ্টান ও তাগুতের ষড়যন্ত্র ও গুপ্ত মিশনের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। জেনে হোক বা না-জেনে; এসব লোক আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও মধ্যপন্থী মতাদর্শ হতে দূরে সরে আছে। যারা বিশ্বাস করে—
'আলেম মনীষীগণ—পূর্ববর্তী যুগের হোক বা পরবর্তী যুগের; সর্বাবস্থায় তাঁরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদাঙ্ক অনুসারী ছিলেন। ছিলেন কল্যাণের অনুগামী এবং ফকিহ ও দূরদর্শী। যখনই তাঁদের আলোচনা করা হবে, সৎ উদ্দেশ্যে কল্যাণের সাথে হবে। তাঁদের মান-মর্যাদার সাথে ধৃষ্টতা প্রদর্শনকারীরা সরল পথ থেকে ছিটকে পড়বে।' ১৬২
হক্কানি আলেমগণের দোষচর্চা ও বিষোদ্গারকারীদের জেনে রাখা উচিত, ওইসব আলেমগণের গোশত বিষমিশ্রিত। তাদের শানে বিদ্বেষ পোষণকারীদের ব্যাপারে আল্লাহর সুন্নাত তো সবার জানা। সম্ভবত এসব অজ্ঞলোক জানে না, অধিক মর্যাদা এবং তাকওয়া ও আল্লাহভীতিই মানুষের ভালোমন্দের ব্যাপারে বিধান আরোপের মাপকাঠি।
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রাহ. বলেন,
'শরিয়ত, ইতিহাস ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এ ব্যাপারে সম্যক অবগত যে, যেসব মর্যাদাবান ব্যক্তি ইসলামের তরে উত্তম কীর্তি রেখে গেছেন, সুনাম অর্জন করেছেন, ইসলাম ও مسلمانوں হৃদয়ে তাঁর উঁচু মর্যাদা রয়েছে; তাঁর পক্ষেও ভুল হতে পারে। কিন্তু তাঁকে সেক্ষেত্রে মাজুর তথা অপারগ মনে করতে হবে। তাঁর জন্য সওয়াবের প্রত্যাশা রাখতে হবে। কেননা, সেগুলো তাঁদের ইজতেহাদি ভুল ছিল। সেই ভুলের ক্ষেত্রে যেমন তাঁদের অনুসরণ করা যাবে না, তদ্রূপ মানুষের অন্তরে তাঁদের মান-মর্যাদায় আঘাত আসে বা সম্মানহানি হয়-এমন কাজও করা যাবে না।১৮০
উম্মতের হক্কানি আলেমদের যদি পর্যায়ক্রমে অভিযুক্ত করে তোলা যায়, তাহলে এই উম্মতের নেতৃত্ব দেবে কারা? একসময় এই নেতৃত্ব এমন অজ্ঞ যুবকদের হাতে চলে আসবে, যারা না ভালো করে কুরআন পড়তে পারে, না তাদের ভাষা ঠিক আছে আর না শরয়ি ইলম ও শাস্ত্রে তাদের ন্যূনতম দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা আছে।
এই সংস্কৃতি তো ইসলামের শত্রুদের চোখ তৃপ্ত করে তুলবে। আর কেনই বা হবে না! এতে এমন এক প্রজন্ম তৈরি হয়ে যাবে, যাদের কোনো নেতা থাকবে না। প্রত্যেকেই বনে যাবে নিজ নিজ নেতা। পৃথিবীর বুকে এমন কোনো প্রজন্ম কখনোই সফল হয়নি; যাদের নেতৃত্ব নেই। পূর্বেকার যুগের জাতিদের সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তি হতো তাদের ধর্মীয় পণ্ডিত ও সন্ন্যাসীরা। তাদের মধ্যে থাকত ভ্রান্তি ও ভ্রান্ত লোকদের আধিক্য। কুরআন সাক্ষ্য দিচ্ছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيراً مِنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ
'হে ইমানদারগণ, পণ্ডিত ও সংসারবিরাগীদের অনেকে লোকদের মালামাল অন্যায়ভাবে ভোগ করে চলছে এবং আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত রাখছে।' -সুরা তাওবা: আয়াত ৩৪।
অথচ মুসলিম জাতির সবচে পুতঃপবিত্র ব্যক্তিরা হচ্ছেন আলেমগণ। ইমাম শাবি রাহ. বলেন,
'মুসলমান ছাড়া অন্যান্য জাতির সবচে নিকৃষ্ট লোক ছিল তাদের আলেম তথা ধর্মীয় পণ্ডিতগণ। কিন্তু মুসলমানদের আলেমগণ হচ্ছেন তাদের বাছাইকৃত পবিত্র মানুষ। বিষয়টি এভাবেও বোঝা যেতে পারে যে, মুসলিম ছাড়া অন্য সব জাতি ও সম্প্রদায় পথভ্রষ্ট। আর তাদের ভ্রষ্টতার কারণ হচ্ছে তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতরা। কারণ, তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতেরা তাদের সবার মাঝে নিকৃষ্ট। পক্ষান্তরে গোটা মুসলিম জাতি হেদায়াতের ওপর রয়েছে। তাদের এই হেদায়াতের পথ দেখিয়েছে তাদের আলেমগণ। কেননা, তাদের আলেমগণ তাদের মধ্যে সবচে ভালো মানুষ।১৬৪
টিকাঃ
১৬১ আল ফাতাওয়া: ৩২/১৩৭।
১৬২ শারহুল আকিদাতিত তাহাবিয়া: ২/৭৪০।
১৮০ আলামূল মুআক্কিয়িন: ৩/২৮৩।
১৬৪ আল ফাতাওয়া: ৭/২৮৪।