📄 রাসুল সা.-কে জালিম আখ্যায়িত করা
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন,
খারেজিরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে নিজেদেরকে স্বাধীন ভেবে নিয়েছে। তারা বলেছে, (নাউজুবিল্লাহ) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুলম করেছেন। নিজের সুন্নাতের ব্যাপারে ভ্রষ্টতার শিকার হয়েছেন। এই তথাকথিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণকে ওয়াজিব মনে করত না। বরং এই জালিমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কেবল ওই পরিমাণ সত্য মনে করত যতটুকু কুরআনে এসেছে। তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওইসব সুন্নাত, বিধানাবলি ও নির্দেশাবলি মান্য করা জরুরি মনে করত না; যেগুলো তাদের মতে কুরআনবিরোধী হিসেবে বিবেচ্য।
বর্তমানেও খারেজি ও বেদআতিদের অধিকাংশ তাদের পূর্বেকার খারেজিদের অনুসরণ করে থাকে। এই জালিমদের অভিমত-রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি কোনো মাসআলার ক্ষেত্রে তাদের উক্তি ও অভিমতের বিরুদ্ধাচরণ করেন, তাহলে ওইসব ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করা যাবে না। বরং তারা সেটা নিজেদের প্রণীত প্রমাণের নিরিখে কার্যকর করবে, অথবা শরয়ি উদ্ধৃতিমূলক ভাষ্যকে রহিত করবে কিংবা পুনরায় হাদিস ও সুন্নাতকে নিজেদের মর্জি মোতাবেক ব্যাখ্যা করবে। কখনো সনদে আপত্তি তুলবে। কখনো ভাষ্যে দোষ দেখাবে। অথচ এরা মোটেই রাসুলের আনীত সুন্নাতমতে আমল করতে প্রস্তুত নয়। আর না প্রকৃতপক্ষে তারা কুরআনের অনুসরণ করছে।১৪৭
টিকাঃ
১৪৭ আল ফাতাওয়া: ১৯/৭৩।
📄 দোষচর্চা ও ভ্রান্ত বলা
খারেজিদের সবচে স্পষ্ট নিদর্শন-এরা মুসলিম নেতৃবৃন্দকে ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করে। তারা বলে, 'এসব মুসলিম নেতৃবৃন্দ হেদায়াতের পথ থেকে দূরে সরে গেছেন'। তাদের এই দোষ তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জুলখুয়াইসারার দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রকাশ পায়, যখন সে বলেছিল, 'হে আল্লাহর রাসুল, ইনসাফ করুন।১৪৮ আসলে এটা বলে সে নিজেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে অধিক আল্লাহভীরু ও মুত্তাকি প্রমাণের চেষ্টা করতে চেয়েছে। সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর জুলম ও বেইনসাফির বিধান লাগিয়েছে। তাদের এ জাতীয় দোষ ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে দৃশ্যমান। যার ফলে বহু মন্দ পরিণাম দেখা গিয়েছে। কেননা, এটা চাট্টিখানি কথা নয়; বরং এর ওপর বহু বিধান ও মাসআলা সম্পৃক্ত।১৪৯
টিকাঃ
১৪৮ বুখারি, ফাতহুল বারি: ১২/২৯০।
১৪৯ মুহাম্মাদ আবদুল হাকিম প্রণীত জাহিরাতুল গুলু ফিদ্দিন: ১০৬।
📄 ক্রুরদশা
খারেজিদের আরেকটি চিন্তাধারা-কুধারণা পোষণ করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর জুলখুয়াইসারার মতো গণ্ডমূর্খ আপত্তি তুলেছে। রাসুলের বিরুদ্ধে বেইনসাফির অভিযোগ উত্থাপন করে বলেছে, 'আল্লাহর কসম! এই বণ্টন ইনসাফসিদ্ধ নয়। এতে আল্লাহর ভয়ের প্রতি লক্ষ রাখা হয়নি।'১৫০
হীন বোধ ও দুর্বল বুদ্ধির প্রেক্ষিতে জুলখুয়াইসারা যখন দেখল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পদগুলো ধনিক শ্রেণির মাঝে বিতরণ করছেন এবং রিক্তহস্ত গরিবদের দিচ্ছেন না, তখন সে এটাকে কেন ভালো চোখে দেখল না-এটা এক বিস্ময়ের বিষয়। উদাহরণত সে ভাবতে পারত, বণ্টনকারী ব্যক্তি যেনতেন সাধারণ কোনো মানুষ নয়; বরং মহৎ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও হেদায়াতের রাসুল। সে সুধারণা রাখতে পারলে এটাই তার জন্য যথেষ্ট হতো। কিন্তু জুলখুয়াইসারা এটা কীভাবে মানবে! সে প্রাধান্য দিয়ে বসে আছে আত্মম্ভরিতাকে। শিকার হয়েছে কুধারণার। এই হীন মানসিকতার লোকটি 'ইনসাফ'-এর মতো সুন্দর শব্দটি ব্যবহার করতেও কুণ্ঠাবোধ করল না। ইবলিসও হেসে দিয়েছে তাকে দেখে। তার ওপর ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার জাল বিছিয়ে দিয়েছে। তাতে সে আরও ফেঁসে গেছে।
অতএব, প্রত্যেক মানুষের উচিত; সে যেন নিজের হিসাব করে। নিজ কর্মকাণ্ড ও আচার-আচরণের কারণ, পাত্র ও উপলক্ষ যাচাই করে নেয়। প্রবৃত্তির অনুসরণ হতে ভীত থাকে। অভিশপ্ত ইবলিসের হিলা-বাহানা সম্পর্কে সজাগ থাকে। কেননা, সে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মন্দ কাজকে খুবই চিত্তাকর্ষক আঙ্গিকে সুদৃশ্য প্রলেপ লাগিয়ে উপস্থাপন করে। হক ও সততার নামে কুকর্মের জন্য নানা টালবাহানা তালাশ করে।
সুতরাং এই পথে শয়তানি চাল থেকে রক্ষা পেতে এবং প্রবৃত্তির আনুগত্যের মায়াজালে নিক্ষিপ্ত না হওয়ার একটাই ওষুধ—ইলম। জুলখুয়াইসারার কাছে এই ইলমের কিঞ্চিত দ্যুতি বা বুদ্ধিমত্তার সামান্যতম অনুরণনও যদি থাকত, তবে সে ধ্বংসের এই ভয়াল প্রান্তরে ধ্বসে যেত না।১৫১
টিকাঃ
১৫০ বুখারি, ফাতহুল বারি: ১২/২৯০।
১৫১ মুহাম্মাদ আবদুল হাকিম প্রণীত জাহিরাতুল গুলু ফিদ্দিন: ১০৬, ১০৭।
📄 মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরমপন্থা
খারেজিরা পাষাণ, উগ্র ও কঠোরতাপ্রবণ হিসেবে প্রসিদ্ধ। তারা শুরুতেই মুসলামানদের বিরুদ্ধে পাষণ্ডতা ও চরমপন্থা দেখিয়েছে। নিন্দার চরম সীমায় পৌঁছেছে এই বাড়াবাড়ির মাত্রা। ফলে তারা مسلمانوں জান-মাল, ইজ্জত-আব্রু ও স্ত্রী-সন্তানদেরকে নিজেদের জন্য হালাল মনে করল। তাঁদের হত্যা করা সওয়াবের কারণ ভাবতে লাগল। পৌত্তলিকদের মতো ইসলামের শত্রুদের থেকে চোখ ফিরিয়ে তারা مسلمانوں কষ্ট দেওয়াকে বৈধ মনে করল। তাদের এ-ধরনের অনৈতিক বর্বরতার ঘটনায় ইতিহাসের পাতা টইটম্বুর। বেশি দূরে যাবার প্রয়োজন নেই। এই তো একটু আগেই আব্দুল্লাহ ইবনে খাব্বাবের সাথে তারা যে আচরণ করল, তা তো আপনাদের সামনেই রয়েছে। সার্বিক অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, مسلمانوں সাথে তাদের আচরণ কড়াকড়ি, বাড়াবাড়ি, উগ্রপন্থা ও পাষণ্ডতায় ঠাসা। অথচ কাফেরদের সাথে তাদের আচরণ সদয়পূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও কোমল চিত্তের।১৫২
শরিয়তপ্রণেতার প্রকৃতি খুবই সহজ, মধ্যমপন্থী ও আমলযোগ্য। ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে, একজন মুসলমান কাফেরদের বিরুদ্ধে হবে পাষাণ আর মুমিনদের বেলায় সদয় ও আন্তরিক হৃদ্যতাপূর্ণ। অথচ খারেজিরা তাদের কথায়-কাজে এ নীতি সম্পূর্ণ উল্টিয়ে দিয়েছে।১৫০ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
﴿ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ﴾ 'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল এবং তার সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল।' -সূরা ফাতহ : আয়াত ২৯।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
﴿ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ ﴾ 'হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরে আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং তারা তাকে ভালোবাসবে। তারা مسلمانوں প্রতি বিনয়-নম্র হবে এবং কাফেরদের প্রতি হবে কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না।' -সুরা মায়িদা: আয়াত ৫৪।
খারেজিরা এসব আয়াতের অর্থ সম্পূর্ণ বিকৃত করে ফেলেছে এবং মুসলমানদের কষ্ট দিতে বদ্ধপরিকর।১৫৪
এই হচ্ছে খারেজিদের কয়েকটি কুখ্যাত ও বড় ধরনের নিদর্শন। সংক্ষেপে আমরা উপস্থাপন করলাম।
টিকাঃ
১৫২ জাহিরাতুল গুলু ফিদ্দিন: ১০৬-১১১।
১৫০ ফাতহুল বারি: ১২/৩০১।
১৫৪ জাহিরাতুল গুলু ফিদ্দিন: ১১১।