📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 মুসলিম নেতার আনুগত্যের অস্বীকৃতি

📄 মুসলিম নেতার আনুগত্যের অস্বীকৃতি


ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন,
'খারেজিদের ভ্রষ্টনীতির একটি হচ্ছে, তারা হেদায়াত ও ইসলামের ইমাম ও মুসলিম জামাতের ব্যাপারে বেইনসাফির আকিদা পোষণ করে থাকে। তারা পথভ্রষ্ট। এটা সুন্নাত হতে বিতাড়িত রাফেজি ও তাদের মতো অন্য পথভ্রষ্ট ফেরকা হতে উৎসারিত। উপরন্তু যে কাজকে তারা অন্যায় ও জুলম মনে করে, সেটা তারা কুফরি হিসেবে গণ্য করে। এরপর সেই কুফরির ক্ষেত্রে এমন বিধান আরোপ করে যা তাদের নিজেদেরই উদ্ভাবিত ও আবিষ্কৃত।'১৩৯
একই সাথে তারা মুসলিম জামাতের নেতার আনুগত্য ও অনুসরণের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। مسلمانوں ঐক্যে ফাটল ধরাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েছে। আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তোলে। তারা তাঁর আনুগত্য হতে সম্পূর্ণরূপে বেরিয়ে যায়। স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে তারা আলি রা.-এর বিরুদ্ধাচরণ আরম্ভ করে।১৪০
মুসলিম নেতাদের প্রতি বিরুদ্ধাচরণের এই ধারা ও নিদর্শন ইতিহাসের প্রতিটি ধাপেই অব্যাহত থাকে। এ ধরনের কোনো ব্যাপারে কেউ যদি তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে, তার সাথে তারা বিদ্বেষ পোষণ করতে থাকে। ছুঁড়ে ফেলে দেয় তার অভিমত। একপর্যায়ে দেখা যায়, তাদের ফেরকাতেই কয়েকটি শাখা-উপশাখা জন্ম নিতে আরম্ভ করে। একে অন্যকে কাফের আখ্যায়িত করে বেড়ায়। পরস্পরে খুনোখুনি, হাঙ্গামা ও বিদ্রোহ বৃদ্ধি পায় বহুগুনে।১৪১

টিকাঃ
১৩৯ আল ফাতাওয়া: ২৮/৪৯৭।
১৪০ আসসাবি প্রণীত আল খাওয়ারিজ: ১৯১।
১৪১ আসসাবি প্রণীত আল খাওয়ারিজ: ১৯২।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 পাপের কারণে কাফের ফতোয়া দেওয়া এবং মুসলিমদের রক্ত ও সম্পদ বৈধ মনে করা

📄 পাপের কারণে কাফের ফতোয়া দেওয়া এবং মুসলিমদের রক্ত ও সম্পদ বৈধ মনে করা


ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন, 'বেদআতি ও খারেজিদের আরেকটি পার্থক্য হচ্ছে, এরা পাপীকে তাকফির তথা কাফের ঘোষণা করে। সেই তাকফিরের ভিত্তিতে مسلمانوں জান-মাল বৈধ মনে করে। তারা এই বিশ্বাস পোষণ করে যে, "দারুল ইসলাম" হচ্ছে "দারুল হারব"। আর তাদের নিজেদের আবাসস্থল হচ্ছে "দারুল ইমান"। অধিকাংশ রাফেজিও এই আকিদা লালন করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বেদআতের মূল। এ বিষয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সুন্নাতের ইজমা রয়েছে। অন্যভাবে বলা যায়, ক্ষমাযোগ্য ভুলকে গোনাহ মনে করা এবং গোনাহকে কুফরি আখ্যায়িত করাই এই বেদআতের মূল দর্শন।১৪২
খারেজিরা নিজেদের বিশেষ আকিদা ও চিন্তাধারার আলোকে মুসলিম জামাত হতে পৃথকভাবে বসবাস করে। তারা নিজেদের আকিদাকে আল্লাহর কাছে মুক্তিদাতা ধর্ম মনে করে। যারা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করবে, তাদের ধারণামতে তারা ধর্ম হতে বেরিয়ে গেছে। তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা ওয়াজিব। এমনকি তাদের কোনো কোনো উপদল এতটাই বাড়াবাড়ির শিকার যে, তারা নিজেদের বিরুদ্ধবাদীদের জান-মাল বৈধ মনে করে।১৪৩
এর একটি উপমা হচ্ছে আবদুল্লাহ ইবনে খাব্বাবের ঘটনা। তাদের বিপরীত মত লালন করার কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।১৪৪
আল্লামা ইবনে কাসির রাহ. বলেন,
'এসব লোক নিজেদের ধর্মবিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে নারী ও শিশুদের হত্যা করতে আরম্ভ করে। গর্ভবতী নারীর পেট ফেঁড়ে ফেলা বৈধ মনে করে। তাদের মতো অনাচার ও দুষ্কৃতি অন্য আর কেউ চালায়নি।'১৪৫
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন,
'প্রথম বেদআত তথা খারেজিদের বেদআতের উৎপত্তি হয় কুরআন না-বোঝার কারণে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআন এবং নিজেদের চিন্তাধারার সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টি করতে চায়নি। তারা কুরআনকে ওই অর্থে ব্যবহার করেছে, যা তার মূল অর্থ নয়। এই অজ্ঞতার কারণে তারা ভেবেছে, গোনাহে পতিত ব্যক্তিকে কাফের আখ্যা দেওয়া ওয়াজিব। কেননা, নেককার ও মুত্তাকিরাই পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারে। তার মানে, যে ব্যক্তি নেককার ও মুত্তাকি হবে না সে কাফের। চিরদিন সে জাহান্নামে দগ্ধ হবে। এসব লোক উসমান রা. ও আলি রা. এবং তাঁদের উভয়ের সমর্থকদের ব্যাপারে বলত—এরা মুমিন নয়। কেননা, তাঁরা কুরআন ছাড়া অন্য বস্তুকে সালিশ বানিয়েছে। তাদের এই বেদআতের দুটি ভূমিকা ছিল :
১. যে ব্যক্তি ভুলে বা নিজের রায়ের মাধ্যমে কুরআনের বিরোধিতা করবে সে কাফের।
২. উসমান, আলি ও তাঁদের সমর্থকরা এ কারণে কাফের। (নাউজুবিল্লাহ)
সুতরাং গোনাহ ও ভুলের ভিত্তিতে ইমানদারকে কাফের আখ্যায়িত করা হতে বেঁচে থাকতে হবে। নিঃসন্দেহে এটা ছিল প্রথম প্রকাশ্য বেদআত। এই বেদআতে লিপ্ত ব্যক্তি; অর্থাৎ, খারেজিরা مسلمانوں কাফের আখ্যায়িত করেছে। তাদের জান-মাল লুণ্ঠন বৈধ ভেবেছে। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা ও নিন্দার বিষয়ে বিভিন্ন গ্রন্থে বিশুদ্ধ হাদিস রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত আছে।'১৪৬

টিকাঃ
১৪২ আল ফাতাওয়া: ১৯/৭৩।
১৪৩ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৩/৬২।
১৪৪ আল বাগদাদি প্রণীত আল ফারকু বাইনাল ফিরাক: ৫৭; আসসাবি প্রণীত আল খাওয়ারিজ: ১৯১।
১৪৫ আল বিদায়া ওয়াননিহায়া ৩/২৯৪।
১৪৬ আল ফাতাওয়া: ১৩/৩০, ৩১।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 রাসুল সা.-কে জালিম আখ্যায়িত করা

📄 রাসুল সা.-কে জালিম আখ্যায়িত করা


ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন,
খারেজিরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে নিজেদেরকে স্বাধীন ভেবে নিয়েছে। তারা বলেছে, (নাউজুবিল্লাহ) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুলম করেছেন। নিজের সুন্নাতের ব্যাপারে ভ্রষ্টতার শিকার হয়েছেন। এই তথাকথিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণকে ওয়াজিব মনে করত না। বরং এই জালিমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কেবল ওই পরিমাণ সত্য মনে করত যতটুকু কুরআনে এসেছে। তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওইসব সুন্নাত, বিধানাবলি ও নির্দেশাবলি মান্য করা জরুরি মনে করত না; যেগুলো তাদের মতে কুরআনবিরোধী হিসেবে বিবেচ্য।
বর্তমানেও খারেজি ও বেদআতিদের অধিকাংশ তাদের পূর্বেকার খারেজিদের অনুসরণ করে থাকে। এই জালিমদের অভিমত-রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি কোনো মাসআলার ক্ষেত্রে তাদের উক্তি ও অভিমতের বিরুদ্ধাচরণ করেন, তাহলে ওইসব ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করা যাবে না। বরং তারা সেটা নিজেদের প্রণীত প্রমাণের নিরিখে কার্যকর করবে, অথবা শরয়ি উদ্ধৃতিমূলক ভাষ্যকে রহিত করবে কিংবা পুনরায় হাদিস ও সুন্নাতকে নিজেদের মর্জি মোতাবেক ব্যাখ্যা করবে। কখনো সনদে আপত্তি তুলবে। কখনো ভাষ্যে দোষ দেখাবে। অথচ এরা মোটেই রাসুলের আনীত সুন্নাতমতে আমল করতে প্রস্তুত নয়। আর না প্রকৃতপক্ষে তারা কুরআনের অনুসরণ করছে।১৪৭

টিকাঃ
১৪৭ আল ফাতাওয়া: ১৯/৭৩।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 দোষচর্চা ও ভ্রান্ত বলা

📄 দোষচর্চা ও ভ্রান্ত বলা


খারেজিদের সবচে স্পষ্ট নিদর্শন-এরা মুসলিম নেতৃবৃন্দকে ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করে। তারা বলে, 'এসব মুসলিম নেতৃবৃন্দ হেদায়াতের পথ থেকে দূরে সরে গেছেন'। তাদের এই দোষ তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জুলখুয়াইসারার দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রকাশ পায়, যখন সে বলেছিল, 'হে আল্লাহর রাসুল, ইনসাফ করুন।১৪৮ আসলে এটা বলে সে নিজেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে অধিক আল্লাহভীরু ও মুত্তাকি প্রমাণের চেষ্টা করতে চেয়েছে। সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর জুলম ও বেইনসাফির বিধান লাগিয়েছে। তাদের এ জাতীয় দোষ ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে দৃশ্যমান। যার ফলে বহু মন্দ পরিণাম দেখা গিয়েছে। কেননা, এটা চাট্টিখানি কথা নয়; বরং এর ওপর বহু বিধান ও মাসআলা সম্পৃক্ত।১৪৯

টিকাঃ
১৪৮ বুখারি, ফাতহুল বারি: ১২/২৯০।
১৪৯ মুহাম্মাদ আবদুল হাকিম প্রণীত জাহিরাতুল গুলু ফিদ্দিন: ১০৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00