📄 আলি রা.-এর যুদ্ধের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফেকহি মাসায়িল
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর জ্ঞানের গভীরতা ও ফেকহি বুৎপত্তি এতো উঁচু পর্যায়ের ছিল যে, তিনি সার্বিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতার আলোকে শরয়ি মূলনীতি ও বিধানাবলি প্রণয়ন ও চয়ন করতে পারতেন। এরই * প্রেক্ষিতে তিনি মুসলমানদের ইমামের সাথে বিদ্রোহকারীদের হত্যার ব্যাপারে শরয়ি মূলনীতি উদ্ভাবন করেন। পরবর্তী সময়কার সুন্নাহ ও ফিকহের ইমামগণ বিদ্রোহীদের ব্যাপারে তাঁর পদক্ষেপ ও দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা ব্যাপক উপকৃত হন। তারা এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত ফেকহি মূলনীতি ও বিধান উদ্ভাবন ও বিন্যস্ত করেন। একপর্যায়ে অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম একথা বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, প্রতিপক্ষের সাথে যদি আলি রা.-এর যুদ্ধ না হতো, তাহলে আহলে কিবলা (মুসলমান)-দের সাথে যুদ্ধের ব্যাপারে শরয়ি বিধান অজানা থেকে যেত। একথা স্বয়ং আলি রা. হতেও বর্ণিত আছে। তিনি বলতেন, 'আপনাদের কী মনে হয়, আমি যদি মানুষের দৃষ্টি থেকে আড়ালে থাকতাম তাহলে আজ এদের সাথে এমন কাজ কে আদায় করত?'*
আহনাফ যখন আলি রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আলি, বসরায় আমাদের স্বজাতিরা ভাবছে; আপনি যদি আগামীতে তাদের ওপর বিজয়ী হন, তবে তাদের পুরুষদের হত্যা করে ফেলবেন এবং নারীদের বন্দি বানাবেন।' আলি রা. তখন বললেন, 'আমার মতো মানুষের দ্বারা এ কাজ কখনো হবে না। কাফের ও মুরতাদ ছাড়া অন্য কারও বিরুদ্ধে কি এমনটি করা বৈধ?'
যাইহোক, তাঁর উপরোক্ত উক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতে বলা যায়, কাফের- মুরতাদদের স্থলে আহলে কিবলার বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাঝে কয়েক ধরনের পার্থক্য রয়েছে। যার বিবরণ নিম্নরূপ:
১. বিদ্রোহী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে কেবল তাদের ভয় দেখানো; প্রাণে মেরে ফেলা নয়। কেননা, তাদের হত্যা করা মূল সমাধান নয়; বরং আনুগত্যে ফিরিয়ে আনা এবং অন্যায়-অনাচার প্রতিহত করাই এর মূল লক্ষ্য।৯০
২. যদি বিদ্রোহীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাদের গোলাম, শিশু ও নারীরাও লড়াইয়ে অংশ নেয়, তখন সবার জন্য প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীন পুরুষের বিধান আরোপিত হবে। তারা আক্রমণে উদ্ধত হলে হত্যা করা হবে। পলায়নের ক্ষেত্রে ছেড়ে দেওয়া হবে। কারণ, তাদের সাথে লড়াইয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের অনিষ্ট হতে অন্যদের মুক্তি দেওয়া। পক্ষান্তরে মুরতাদ ও কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইকালে আক্রমণ ও পশ্চাৎপসারণ-উভয় ক্ষেত্রেই তাদের হত্যা করা যাবে।৯১
৩. বিদ্রোহীরা কোনো কারণে যদি লড়াই থামিয়ে দেয়; চাই আনুগত্য স্বীকারের মাধ্যমে বা অস্ত্র রেখে দেওয়ার মাধ্যমে, পরাজয় বরণের ফলে, আহত হওয়ায়, কোনোরূপ ব্যাধির কারণে কিংবা বন্দি হবার ভয়ে-সর্বাবস্থায় তাদের আহতদের আক্রমণ করা এবং বন্দিদের হত্যা করা বৈধ নয়। পক্ষান্তরে মুশরিক ও মুরতাদদের কেউ আহত হলে তাকে আক্রমণ এবং বন্দিদের হত্যা বৈধ।
মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ গ্রন্থে আলি রা.-এর বর্ণনা এসেছে; তিনি উষ্ট্রীর যুদ্ধের দিন বলেছেন, 'পলাতক কারও পিছু ধাওয়া করবে না। আহত কাউকে আক্রমণ করবে না। যে অস্ত্র ফেলে দেবে সে নিরাপত্তা পাবে। '৯২
আবদুর রাজ্জাক-এর বর্ণনায় এসেছে; আলি রা. তাঁর ঘোষককে ঘোষণা দিতে বলেন। সে বসরার দিন ঘোষণা দেয়, 'পলাতক কাউকে পিছু ধাওয়া করবে না। আহত কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করবে না। কোনো বন্দিকে হত্যা করবে না। যে ব্যক্তি তার ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে বা অস্ত্র ফেলে দেবে, সে নিরাপদে থাকবে।' আলি রা. তাদের ফেলে যাওয়া সম্পদ হতে কিছুই গ্রহণ করেননি।
উষ্ট্রীর যুদ্ধের দিন তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, 'পলাতক কাউকে পিছু ধাওয়া করবে না। আহত কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করবে না। কোনো বন্দিকে হত্যা করবে না। মহিলাদের দিকে তাকাবে না; যদিও সে তোমাদের মন্দ বলে এবং তোমাদের নেতাদের গালমন্দ করে। জাহেলি যুদ্ধের সংস্কৃতি সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। তাদের পুরুষেরা কোনো মহিলাকে লাঠি বা ডাণ্ডা দিয়ে পেটালে, সেই মহিলা এবং তার সন্তানকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করা হতো। '১৪
আবু উমাম বাহিলি বলেন, আমি সিফফিন যুদ্ধে উপস্থিত ছিলাম। ওরা (আলি রা.-এর সঙ্গীরা) আহত কাউকে আক্রমণ করত না। পলাতক কাউকে হত্যা করত না। নিহত কাউকে ফাঁসি দিত না।১৫
৪. বন্দি অবস্থায় বিদ্রোহী বন্দিকে বিদ্রোহী হিসেবে গণ্য করা হবে। তার ব্যাপারে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না-করার নিশ্চয়তা থাকলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। আর কারও ব্যাপারে যদি নিশ্চিত হওয়া না যায়, তবে যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত তাকে বন্দি করে রাখা হবে, অতঃপর তাকে মুক্ত করে দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে তাকে আর বন্দি করে রাখার প্রয়োজন নেই। পক্ষান্তরে কাফের বন্দিকে পরেও কয়েদখানায় রাখা হবে।৯৬
৫. বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য কোনো মুশরিকের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়া যাবে না, চাই সেই মুশরিক জিম্মি হোক বা চুক্তিবদ্ধ। পক্ষান্তরে মুরতাদ-কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইকালে তাদের সাহায্য নেওয়া যাবে।৯৭
৬. তাদের সাথে সাময়িক কোনো সন্ধি করা যাবে না। সম্পদের বিনিময়ে যুদ্ধ বন্ধ রাখার ঘোষণাও দেওয়া যাবে না। তৎসময়কার ইমাম যদি সাময়িক সন্ধি করে নেয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। যথাসময়ে মোকাবিলা করতে অক্ষম হলে শক্তি সঞ্চয় করে পরে মোকাবিলা করতে হবে। সম্পদের বিনিময়ে যুদ্ধ বন্ধের সন্ধি করলে এই সন্ধি অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। সম্পদের দিকে লক্ষ রাখতে হবে; সেগুলো যদি সদকা বা ফাইয়ের অংশ হয়, তবে তা ফেরত দেওয়া যাবে না; বরং সদকাগুলো সদকা গ্রহণকারীদের মাঝে বিতরণ করে দিতে হবে এবং ফাইয়ের সম্পদ তার অধিকারীর মাঝে বণ্টন করে দিতে হবে। যদি সেই সম্পদ কেবল তাদের নিজ উপার্জনেরই হয়, তাহলে ইমাম তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না; বরং সেগুলো তাদেরকে ফেরত দিতে হবে। কেননা, আলি রা. উষ্ট্রীর যুদ্ধে অংশ নেওয়া লোকদের সম্পদ নিজের জন্য বৈধ মনে করেননি।
৭. বিদ্রোহীরা যদি যুক্তিযুক্ত কোনো কারণে ইমামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তবে ইমামকে তাদের সাথে পত্রের আদান-প্রদান করতে হবে। যদি তারা নিজেদের ওপর কোনো জুলুমের বিষয় দেখিয়ে দেয়, তবে ইমামের উচিত তা দূর করা। কোনো সন্দেহ করে থাকলে তা স্পষ্টকরণ ও নিরসনও তাঁর কর্তব্য। যেমন, আলি রা. খারেজিদের সন্দেহ দূর করেছেন। ফলে বহুসংখ্যক খারেজি মুসলিম জামাতে ফিরে আসে। সুতরাং সন্দেহ নিরসনের পর তারা ফিরে এলে তো ভালো, অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ইমাম এবং مسلمانوں ওপর ওয়াজিব।
৮. বাহ্যত যদি বিদ্রোহীরা ইমামের আনুগত্য করে থাকে, পৃথক হয়ে কোথাও সমবেত হয়ে না থাকে এবং তাদেরকে গ্রেফতার করা সহজ হয়; সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যাবে না। বরং গ্রেফতার করে তাদেরকে বিচারালয়ে সোপর্দ করতে হবে। বিচারক যথাযথ ফয়সালা দেবেন। তবে সে যাবতীয় শরয়ি ও মানবিক অধিকারপ্রাপ্ত হবে।
৯. বিদ্রোহীদের সাথে এমন ধরনের যুদ্ধ বৈধ নয়, যা দ্বারা সাধারণ লোকদের জান-মালের হানি ঘটে। যেমন: তাদের বসতিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া, কামান দ্বারা গুলিবর্ষণ করা, বৃক্ষ ও বাসস্থান পুড়িয়ে ফেলা ও ধ্বংস করা। পক্ষান্তরে কাফের-মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালে এসব বৈধ। কেননা, দারুল ইসলামে এসব নিষিদ্ধ; চাই গুটিকয়েক লোকই হোক না কেন। অবশ্য যদি এর বিকল্প না থাকে; যেমন : বিদ্রোহীদের দুর্গে অবস্থান নেওয়া এবং অস্ত্র ফেলে না দেওয়া ইত্যাদি; সেক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ি রাহ.-এর মতানুসারে তাদের ওপর কামানের গোলাবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ বৈধ।১০২
১০. বিদ্রোহীদের সম্পদ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা এবং তাদের সন্তানদের বন্দি করা বৈধ নয়। কেননা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'কোনো মুসলমানের সম্পদ তার অনিচ্ছায় গ্রহণ করা বৈধ নয়। '১০৩
আলি রা.-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি উষ্ট্রীর যুদ্ধের দিন বলেছেন, 'যে ব্যক্তি নিজের কোনো সম্পদ আমাদের লোকদের কাছে পাবে, সে যেন তা নিয়ে নেয়। '১০৪
পরবর্তী সময়ে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি খারেজিদের জন্য আপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা বলে, 'আলি মুআবিয়া ও তার সাথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে; অথচ তাদের গালমন্দ করেনি। তাদের সম্পদ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করেনি। তাদের রক্ত যদি বৈধ হয়ে থাকে, তবে তাদের সম্পদ বৈধ হবে না কেন? সম্পদ হারাম হয়ে থাকলে রক্তও হারাম। সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে কেন যুদ্ধ করা হলো?'
ইবনে আব্বাস রা. তাদের সাথে মুনাজারা করার সময় এই অভিযোগের জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'তোমরা কি স্বীয় মা; অর্থাৎ, আয়েশা রা.-কে গালমন্দ করা পছন্দ করবে? তাঁদের কাছ থেকে যা গ্রহণ করা তোমরা বৈধ মনে করো, তাঁর কাছ থেকেও কি তা গ্রহণ করা বৈধ মনে করবে? আর যদি তোমরা বলো যে, তিনি আমাদের "মা" নন, তাহলে তো তোমরা কুফরি করে বসলে। আর যদি তাকে “মা” হিসেবে মেনে থাকো, তবে কি তাঁকে "বাঁদি” বানাতে চাও? এটাও তো কুফরি।'১০৫
আল্লামা ইবনে কুদামা রাহ. এই ঘটনার আলোকে লিখেন, বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধের লক্ষ্য হচ্ছে তাদের নিরুৎসাহিত করা এবং হকের দিকে ডেকে আনা। কুফরির ভিত্তিতে তাদের সাথে যুদ্ধ করা হচ্ছে না। অতএব, তাদের জান, মাল, ইজ্জত-আব্রুর ওপর ওই পরিমাণ হস্তক্ষেপ করা যাবে, যা দ্বারা তারা পিছু সরে আসে। যেমনটি হামলাকারী ও ডাকাতদের বেলায় করা হয়ে থাকে। তাদের সম্পদ ও সন্তান নিজ নিজ স্থানে বহাল থাকবে। অর্থাৎ, তাতে হস্তক্ষেপ হারাম হিসেবে বিবেচিত হবে।১০৬
অবশ্য আলি রা.-এর দৃষ্টিভঙ্গির দিকে তাকিয়ে এটুকু বলা যেতে পারে যে, তাদের অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে। যেমন ইবনে আবি শাইবাহ আবুল বুখতারি হতে বর্ণনা করেছেন, উষ্ট্রীবাহিনী পরাজয় বরণ করলে আলি রা. বলেন, 'যারা বাহিনীর বাইরে অবস্থান করছে তাদের অনুসন্ধান করবে না। তাদের যেসব অস্ত্র ও সওয়ারি তোমরা পেয়েছ তা তোমাদের।'১০৭
আরেক বর্ণনায় আছে; তিনি বলেছেন, 'বাহিনীর অভ্যন্তরে পড়ে থাকা সম্পদ ব্যতীত অন্য কোনো সম্পদে কিছুতেই হস্তক্ষেপ করবে না।'১০৮
১১. নিহত বিদ্রোহীদের গোসল দিতে হবে। কাফন পরাতে হবে এবং জানাজার নামাজ পড়াতে হবে। কেননা, ইমাম শাফেয়ি রাহ. এবং আসহাবুর রায়-এর মতাদর্শমতে সে মুসলমান।১০৯
১২. বিদ্রোহী গোষ্ঠী যদি বেদআতি না হয়, তাহলে তাকে ফাসেক বলা যাবে না। مسلمانوں ইমাম এবং বিচারকদের বিরুদ্ধে তার বিদ্রোহকে তার ইজতেহাদি ভুল হিসেবে সাব্যস্ত করা হবে। তাদের বিধান হবে মুজতাহিদ ফকিহদের অনুরূপ। তাদের মধ্যকার নীতিবান সদস্য সাক্ষ্য দিলে ইমাম শাফেয়ির ভাষ্য অনুসারে তার সাক্ষ্য ধর্তব্য হবে। কিন্তু যদি খারেজি ও বেদআতিরা ইমামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, সেক্ষেত্রে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা, তারা ফাসেক।১১০
১৩. ন্যায়নিষ্ঠ ইমামের জন্য নিজের রক্ত-সম্পর্কীয় বিদ্রোহী আত্মীয়কে হত্যা করা বৈধ। কেননা, তিনি তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করছেন না। এই হত্যা তার ওপর হদ তথা শরয়ি শাস্তি আরোপের মতো। তবুও তাকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত।১১১
১৪. কোনো শহরে বিদ্রোহীদের আধিপত্য দেখা দিলে এবং সেখানে যদি তারা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় খারাজ, জাকাত ও জিজিয়া ইত্যাদি উসুলের পাশাপাশি শরয়ি শান্তিও কার্যকর করে; পরবর্তী সময়ে অবস্থার পরিবর্তন ঘটলে হকপন্থীরা যদি সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, তাহলে তারা অতীতে উসুলকৃত সম্পদের কিছুই গ্রহণ করতে পারবেন না। কেননা, উষ্ট্রীর যুদ্ধের পর বসরাবাসীর ওপর আলি রা.-এর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি অতীতে সেখানকার উসুলকৃত কোনো সম্পদ চাননি।১১২
১৫. বিদ্রোহী ও হকপন্থীদের উত্তরাধিকারীর বিধান: কোনো নিহত বিদ্রোহী কোনো হকপন্থীর উত্তরাধিকার হতে পারবেন না। তদ্রূপ নিহত কোনো হকপন্থীর উত্তরাধিকারও কোনো বিদ্রোহী হতে পারবে না।
কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'হত্যাকারী উত্তরাধিকার হতে পারবে না। ১১৩ আবু হানিফা রাহ. বলেন, 'আমি হকপন্থীদেরকে বিদ্রোহীর উত্তরাধিকার বলতে পারি; কিন্তু কোনো বিদ্রোহীকে হকপন্থীদের উত্তরাধিকার বলতে পারি না।'
ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. বলেন, 'আমি পরস্পর একে অন্যের উত্তরাধিকার বলি। কেননা, উভয়ের হত্যা তাদের ইজতেহাদি ভুলের ওপর নির্ভরশীল। ১১৪ ইমাম নববি রাহ.-ও এই অভিমত পোষণ করেছেন। ১১৫
১৬. বিদ্রোহীদের যদি হত্যা বিনে থামানো না যায়, সেক্ষেত্রে তাদের হত্যা করা হবে। হত্যাকারী এক্ষেত্রে গোনাহগার হবেন না। তার ওপর জামানত বা কাফফারা ওয়াজিব হবে না। কেননা, সে শরয়ি বিধানের আলোকে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং আল্লাহকে সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হত্যা করেছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
فَقَاتِلُوا الَّذِي تَبْغِي حَتى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ
'তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে; যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে।' -সূরা হুজুরাত : আয়াত ৯।
কোনো মুসলমানের ওপর যদি প্রাণসংহারক আক্রমণ করা হয়, তাহলে হত্যা ছাড়া বিকল্প পাওয়া না-যাবার শর্তে নিজের প্রতিরক্ষায় আক্রমণকারীকে হত্যা করা বৈধ।
অনুরূপভাবে যুদ্ধের সময় হকপন্থীরা বিদ্রোহীদের যেসব সম্পদ বিনষ্ট করেছে, তার জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।১১৬ তদ্রূপ ইমাম নববি রাহ.-এর বিশুদ্ধ ভাষ্যমতে, বিদ্রোহীরা যদি যুদ্ধের সময় হকপন্থীদের জান- মালের ক্ষতি সাধন করে, তারও কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।১১৭ এর প্রমাণ হচ্ছে সাহাবায়ে কেরামগণের ইজমা-যা জুহরির সনদে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, প্রথম ফিতনা দেখা দিলে সেসময় রাসুলের সাহাবিগণ বেঁচে ছিলেন। তম্মধ্যে বদরে অংশগ্রহণকারী সাহাবাও ছিলেন। তাঁরা সবাই এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কুরআনের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে পরস্পর হত্যা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণে কারও কাছ থেকে কিসাস নেওয়া হবে না এবং কারও সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া যাবে না।১১৮
আবদুর রাজ্জাক-এর বর্ণনায় এসেছে, প্রথম ফিতনা দেখা দিলে সেসময় রাসুলের সাহাবিগণ বেঁচে ছিলেন। তম্মধ্যে বদরে অংশগ্রহণকারী সাহাবাও ছিলেন। তারা সবাই এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কুরআনের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে কোনো মহিলাকে বন্দি করা এবং তার লজ্জাস্থান বৈধ- জ্ঞানকারীর ওপর শরয়ি শাস্তি পতিত হবে না। এ লক্ষ্যে কারও রক্ত বৈধ জ্ঞানকারীর কাছ থেকে কিসাস নেওয়া হবে না। একই উদ্দেশ্যে অন্যের সম্পদ বৈধকারীর কাছ থেকে সম্পদ ফিরিয়ে নেওয়া হবে না। হ্যাঁ, যদি এমন কোনো বস্তু থাকে যা তার মালিকের কাছে পরিচিত, তবে তা তার মালিককে ফেরত দিতে হবে।১১৯
টিকাঃ
* আল বাকিল্লানি প্রণীত আততামহিদ: ২৯৯; তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ: ২/২৯৫।
* মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক। ১০/১২৪।
৯০ আল মুগনি: ৮/১০৮, ১২৬।
৯১ আল মুগনি: ৮/১১০; আল আহকামুস সুলতানিয়া: ৬০।
৯২ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১০/২৩৬; ফাতহুল বারি: ১৩/৫৭ [সনদ বিশুদ্ধ)।
১৪ নাসবুর রায়াহ: ৩/৪৬৩।
১৫ আল মুসতাদরাক: ২/১৫৫ [সনদ হাসান। জাহাবি রাহ. সহমত ব্যক্ত করেছেন]।
১৬ আল আহকামুস সুলতানিয়া: ৬০।
১৭ আল আহকামুস সুলতানিয়া: ৬০।
** বায়হাকি প্রণীত আসসুনানুল কুবরা: ৮/১৮০।
১০০ মাজমুউল ফাতাওয়া: ৪/৪৫০।
** আল আহকামুস সুলতানিয়া: ৫৮।
১০২ ইবনে কুদামা প্রণীত আল মুগনি: ৮/১১০।
১০০ সুনানে দারাকুতনি: ৩/২৬।
১০০ আল মুগনি: ৮/১১৫।
১০৫ বায়হাকি প্রণীত আসসুনানুল কুবরা: ৮/১৭৯; নাসায়ি প্রণীত খাসায়িসু আমিরিল মুমিনিন : ১৯৭ [সনদ হাসান)।
১০৬ তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ : ২/৩০০।
১০৭ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১৫/২৬৩।
১০৮ তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ: ২/৩০০।
১০৯ তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ: ২/৩০১।
১১০ আল মুগনি: ৮/১১৮; তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ: ২/৩০১।
১১১ আল মুগনি: ৮/১১৮; তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ: ২/৩০১।
১১২ আল মুগনি: ৮/১১৯; তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ: ২/৩০২।
১১৩ সুনানে ইবনে মাজাহ: ২/৮৮৩।
১১৪ আল আহকামুস সুলতানিয়া: ৫৮।
১১৫ শারহুন নববি আলা সহিহ মুসলিম: ৭/১১০।
১১৬ আল মুগনি: ৮/১১৯
১১৭ শারহুন নববি আলা সহিহ মুসলিম: ৭/১৭০।
১১৮ বায়হাকি প্রণীত আসসুনানুল কুবরা: ৮/১৭৪-এর বিশুদ্ধ সূত্রে তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ : ২/৩০২।
১১৯ মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক: ১০/১২১।
📄 নাহরাওয়ান অভিযানের ফলাফল
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. নাহরাওয়ানে খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ করা এ ব্যাপারে শক্তিশালী দলিল ও স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, সিরিয়াবাসীর বিরুদ্ধে তাঁর রণপরিকল্পনা নিশ্চয় সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। মুআবিয়া রা.-এর মোকাবিলায় তিনি ছিলেন হকের অধিক নিকটবর্তী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত। তিনি বলেছেন,
تَمْرُقُ مَارِقَةُ عِنْدَ فُرْقَةٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ ، يَقْتُلُهَا أَوْلَى الطَّائِفَتَيْنِ بالحق
'মুসলমানদের মতবিরোধের সময় একটি সম্প্রদায় পৃথক হয়ে যাবে। তাদেরকে ওই দলটি হত্যা করবে যারা হকের অধিক নিকটবর্তী।১৭১
এটা নিশ্চিত বিষয় যে, আলি রা.-এর বাহিনী সিরিয়াবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তুলনামূলক অধিক সম্মানের অধিকারী। কেননা, উপরোক্ত হাদিস এবং আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-এর শাহাদত ইত্যাদি স্পষ্ট প্রমাণাদি দ্বারা তিনি নিজ সঠিকতার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন। বাস্তবতা তো এমনই সম্ভাবনাময়; কিন্তু ফলাফল এর বিপরীত দেখা যাচ্ছিল। আলি রা.-এর পরিকল্পনা ছিল খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধশেষে সিরিয়াবাসীর ওপর আক্রমণ পরিচালনা করবেন। কেননা, সিরিয়াকে নিজ খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত করা এবং উম্মতের ঐক্য ফিরিয়ে আনা ছিল খেলাফতের বুনিয়াদি দাবি। এই লক্ষ্য অর্জনে চেষ্টারও প্রয়োজন।
খারেজিদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধের উদ্দেশ্যও এটা ছিল যে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সেনাক্যাম্প ও ঘাঁটিগুলো যেন নিরাপদে থাকে। অতর্কিত দুষ্কৃতিকারীরা যেন আমাদের অনুপস্থিতিতে দারুল খেলাফতে উপস্থিত মুসলিম শিশু ও নারীদের ওপর হামলা চালাতে না পারে। কিন্তু কী আর করা! বায়ু তো সবসময় নৌকার বিপরীত দিকেই প্রবাহিত হয়। পরিকল্পনামাফিক তিনি সিরিয়ায় যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারলেন না; এর পূর্বেই শহিদ হয়ে গেলেন।
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ছিল। কারণ, একদিকে যেমন খারেজিদের বিদ্রোহ নির্মূল করতে হয়েছে, অন্যদিকে উষ্ট্রী, সিফফিন ও নাহরাওয়ানের অভিযানগুলোতে অংশ নিয়ে ইরাকিরা এতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে, বাড়তি আর কোনো যুদ্ধে যেতে তারা প্রস্তুতি নিতে পারছিল না। তারা যুদ্ধকে ঘৃণা করতে লাগল। বিশেষত সিফফিনে সিরিয়াবাসীর বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধে তারা ব্যাপক পর্যুদস্ত হয়েছে। অন্যদের সঙ্গে যুদ্ধে তারা তেমন অভিজ্ঞ ছিল না। এ ছাড়া এক মুহূর্তের চিন্তা-ভাবনার সুযোগ না পাওয়ায় এতিম হয়েছে ইরাকবাসীর অসংখ্য শিশু। নারীরা হয়েছে বিধবা। একটি নিষ্ফল যুদ্ধ ছাড়া কিছুই তাদের হাতে আসেনি।
ওই সময়ে আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. এবং তাঁর সাথিরা যে সন্ধি ও সালিশকে স্বাগত জানিয়েছেন, সেটা যদি না হতো তবে মুসলিমবিশ্ব বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতো—যা কল্পনাও করা দুষ্কর। কেবল এ কারণেই আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর সাথিরা পুনরায় সিরিয়ায় সেনা প্রেরণের প্রতি আগ্রহবোধ করছিলেন না। যদিও তারা নিশ্চিত ছিলেন যে, হজরত আলি রা.-ই হকের ওপর রয়েছেন।১৭২
এ ছাড়া আলি রা.-এর পথের কাঁটাস্বরূপ দেখা দেয় আরেক ফিতনা। সেই দিনগুলোতে এমন একটি ফেরকার অভ্যুদয় ঘটে, যারা আলি রা.-এর মান- মর্যাদাকে প্রভুত্বের আসনে পৌঁছাতে বদ্ধপরিকর। খারেজিদের বিপরীতে ছিল এই ফেরকার দৃষ্টিভঙ্গি।১৭৩
অথচ বাস্তবতা এমন নয়। বরং ওই ফেরকার লক্ষ্য ছিল, ভ্রান্ত এই আকিদার মাধ্যমে কেবল আলি রা.-এর বাহিনীই নয়; বরং গোটা মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করে দেওয়া এবং ইসলামের শিকড় সমূলে উৎপাটন করা।১৭৪ এই অপশক্তিটির চ্যালেঞ্জও আলি রা. সম্পূর্ণ শক্তি, প্রত্যয় ও সাহসের সাথে মোকাবিলা করেন। এরা আপন লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়।
যাইহোক, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আলি রা.-এর বাহিনী থেকে খারেজিদের বেরিয়ে যাওয়া এবং তৎপরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ফলে তাঁর সামরিক শক্তি বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে পর্যায়ক্রমে এক এক করে কাছে-দূরের বহু লোক আলি রা.-এর খেলাফত থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। খুরাইজ ইবনে রাশেদ; অন্য উক্তিমতে যার নাম হারিস ইবনে রাশেদ—সে ছিল আলি রা. কর্তৃক নিযুক্ত আহওয়াজ এলাকার গভর্নর। সে তার গোত্র বনু নাজিয়ার লোকদেরকে আলি রা.-এর খেলাফতের বিরুদ্ধে প্ররোচনা দেয়। বহু লোক তার ডাকে সাড়া দেয়। সে তার অধীনস্থ বহু শহরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং লুণ্ঠন করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ। আলি রা. মাকিল ইবনে কায়স আররিয়াহির নেতৃত্বে তার মোকাবিলার জন্য বাহিনী প্রেরণ করেন। তিনি খুরাইজ ইবনে রাশেদকে পরাজিত করে হত্যা করেন।১৭৫
দেশের এমন অরাজক পরিস্থিতি দেখে খারাজদাতারাও আলি রা.-এর খেলাফতকে দুর্বল করে দিতে সচেষ্ট হয়; যাতে খারাজ দেওয়া হতে মুক্তি পাওয়া যায়। আহওয়াজের অধিবাসীরা তো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গই করে ফেলে। এমতাবস্থায় আলি রা.-এর আরও অধিক পরিমাণে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সমরশক্তি ক্ষয় হবে—এটা স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে ইমাম শাবি রাহ. হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, আলি রা. যখন নাহরাওয়ানদের হত্যা করেন তখন বিপুলসংখ্যক লোক তাঁর বিরুদ্ধে চলে যায়। তাঁর আশপাশের লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং বনু নাজিয়াহ বিরোধিতা শুরু করে। এ সুযোগে ইবনুল হাজরামি বসরায় অভিযান চালায়। পাহাড়ী লোকেরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যারা খারাজ দিত তারা খারাজ দেওয়া বন্ধ করতে উদ্যত হয়। পারস্যবাসী সাহল ইবনে হুনাইফকে সেখান থেকে বের করে দেয়। তিনি ছিলেন আলি রা. কর্তৃক নিযুক্ত পারস্যের শাসনকর্তা।১৭৬
অন্যদিকে হজরত মুআবিয়া রা. গোপনে-প্রকাশ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে হজরত আলি রা.-এর সামরিক শক্তি দুর্বল করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া তিনি যখন আলি রা.-এর খেলাফতের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দেখতে পেলেন, তখন এই সুযোগ কাজে লাগাতে আগ্রহী হন। এ লক্ষ্যে তিনি আমর ইবনুল আস রা.-এর নেতৃত্বে মিসর অভিমুখে সেনাবহর প্রেরণ করেন। সেখানে তিনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ওই এলাকা নিজের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। আমর রা.-এর এই বিজয় এবং মুআবিয়া রা.-এর এই রাজনৈতিক সফলতার পেছনে কয়েকটি কারণ ও উপকরণ রয়েছে। যথা:
* খারেজিদের বিরুদ্ধে আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর জড়িয়ে যাওয়া।
* আলি রা. কর্তৃক নিযুক্ত মিসরের গভর্নর মুহাম্মাদ ইবনে আবি বকর তাঁর প্রাক্তন স্থলাভিষিক্ত কায়স ইবনে সাআদ ইবনে উবাদাহ আনসারির মতো দূরদর্শী না হওয়া। তিনি উসমান রা.-এর হত্যাকারীদের বিচারপ্রত্যাশীদের সাথে প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেন। এক্ষেত্রে তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন; যেমনটি তার পূর্ববর্তী গভর্নর দিতে পেরেছিলেন। ফলে তিনি উসমান হত্যার বদলাপ্রত্যাশীদের কাছে পরাজয় বরণ করেন।
* মুআবিয়া রা. এবং উসমান রা. হত্যার বিচারপ্রত্যাশীদের চিন্তা-চেতনা অভিন্ন হওয়া। এই ঐকমত্যপূর্ণ রায়ের ফলে সহজেই মিসরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়।১৭৭
* আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর খেলাফতের রাজধানী মিসর থেকে দূরে এবং সিরিয়ার নিকটবর্তী হওয়া।
মিসরের ভৌগলিক অবস্থান যেহেতু সিনা'র সড়কের সীমান্তে সিরিয়ার ভূখণ্ডের সাথে লাগোয়া, তাই তা প্রাকৃতিকভাবে মনস্তাত্ত্বিক নৈকট্য বয়ে আনে। মিসরে মুআবিয়া রা.-এর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর তাঁর সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তিনি এতে ক্ষান্ত হননি; বরং আরব উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চল তথা মক্কা, মদিনা ও ইয়ামেন ইত্যাদি অঞ্চলেও নিজের সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে লাগলেন। কিন্তু আলি রা. যখন সামরিক প্রতিরক্ষার চেষ্টা করেন, তখন তাঁর বাহিনী ভগ্ন মনোরথে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।১৭৮
এ ছাড়া হজরত মুআবিয়া রা. বিভিন্ন গোত্রের নেতা এবং আলি রা.-এর গভর্নরদেরকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালান। যেমন, কায়স ইবনে সাআদ রা. যিনি আলি রা. কর্তৃক নিযুক্ত মিসরের গভর্নর ছিলেন; তাঁকে তিনি নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু সফল হননি।১৭৯ তবে এটুকু অবশ্যই হয়েছে যে, আলি রা.-এর উপদেষ্টা ও তাঁর সাথিদের কাছে কায়স রা.-কে সন্দেহভাজন বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আলি রা. তাঁকে অপসারণ করেন। পরে কায়স ইবনে সাআদের এই অপসারণ মুআবিয়া রা.-এর পক্ষে অনেক বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। অনুরূপভাবে তিনি পারস্যের গভর্নর জিয়াদ ইবনে আবিয়াকেও নিজের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছেন; কিন্তু সফল হননি।১৮০
মোটকথা, মুআবিয়া রা. বিভিন্ন গোত্রপ্রধান ও গভর্নরদের প্রতি নিজের অনুগ্রহ ও ভবিষ্যতে উত্তম পদের প্রতিশ্রুতির দেন। এটা তাঁদের ওপর প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া এরা দিনদিন মুআবিয়া রা.-এর সফলতা প্রত্যক্ষ করছিল। ফলে একপর্যায়ে দেখা গেল আলি রা.-এর খেলাফতের কাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো; যা তিনি নিজেই তাঁর এক ভাষণে স্বীকার করেছেন-
'আমি জেনেছি; বুসর ইয়ামেনে প্রবেশ করেছে। আল্লাহর কসম! খুব শীঘ্রই ওই দল তোমাদের ওপর বিজয় লাভ করবে। আর তোমাদের ওপর তাদের বিজয়ের কারণ হলো, তোমরা তোমাদের ইমামের বিরুদ্ধাচরণ করো, আর তারা তাদের ইমামের আনুগত্য করে। তোমরা খেয়ানত করো, আর তারা আমানত রক্ষা করে। তোমরা ভাঙার কাজে লিপ্ত আর তারা গড়ার কাজে ব্যাপৃত। আমি অমুককে পাঠিয়েছিলাম; সে খেয়ানত করেছে ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অমুককে পাঠালাম; সে-ও খেয়ানত করল ও বিশ্বাসঘাতকতা করল এবং মালগুলো মুআবিয়ার নিকট পাঠিয়ে দিলো। তোমাদেরকে একটি পাত্রের আমানতদার বানালেও সেক্ষেত্রে আমার এখন আশঙ্কা হচ্ছে।
হে আল্লাহ, আপনি ওদেরকে নিকৃষ্ট বানিয়েছেন, তাই ওরা আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে। আপনি ওদেরকে অপছন্দ করেন, তাই ওরা আমাকে অপছন্দ করে। হে আল্লাহ, ওদেরকে আমার থেকে নিষ্কৃতি দিন এবং আমাকেও ওদের থেকে মুক্ত করুন। '১৮১
টিকাঃ
১৭১ সহিহ মুসলিম: ২/৭৪৫, ৭৪৬।
১৭২ আবদুল হামিদ আলি প্রণীত খিলাফাত আলি বিন আবি তালিব: ৩৪৫।
১৭৩ আবদুল হামিদ আলি প্রণীত খিলাফাত আলি বিন আবি তালিব: ৩৪৫।
১৭৪ মুসতাফা হালামি প্রণীত নিযামুল খিলাফাতি ফিল ফিকরিল ইসলামি : ১৫, ১৬।
১৭৫ আবদুল হামিদ আলি প্রণীত খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৩৫০; তারিখে তাবারি: ৬/২৭-৪৭।
১৭৬ তারিখে তাবারি: ৬/৫৩।
১৭৭ মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক, তাবাকাতে ইবনে সাআদ: ৩/৮৩; আবদুল হামিদ আলি প্রণীত খিলাফাত আলি বিন আবি তালিব : ৩৫১ সনদ বিশুদ্ধ।
১৭৮ তারিখে খলিফা: ১৯৮ [সনদবিহীন]।
১৭৯ ওয়ালাইয়াতু মিসর: ৪৫-৪৬।
১৮০ আল ইসতিয়াব: ২/৫২৫-৫২৬।
১৮১ বুখারি প্রণীত আততারিখুস সাগির: ১/১২৫ সনদ বিচ্ছিন্ন। তবে এর অন্যান্য সাক্ষ্য রয়েছে।
📄 নিজ বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য আলি রা.-এর উদ্দীপ্তকরণ ও মুআবিয়া রা.-এর সাথে মুবাহিসার সন্ধি
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. উপরোল্লেখিত সমস্যার মুখোমুখি, সৈনিকদের নিস্তেজতা এবং যুদ্ধের প্রতি জনগণের অনিহা সত্ত্বেও মাথা নোয়াননি। বরং পরিপূর্ণ বিচক্ষণতা, যথাযথ প্রমাণ ও সাহিত্যপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি তাঁর সৈনিকদের সাহস যুগিয়ে যাচ্ছিলেন। এ ব্যাপারে রণ-উদ্দীপনা ও আত্মমর্যাদাবোধ-জাগৃতিমূলক যেসব ভাষণ প্রসিদ্ধ আছে, সাহিত্যের ইতিহাসে সেগুলো অত্যন্ত উঁচু স্থান দখল করে আছে। এগুলো তিনি কল্পনাবিলাসী হয়ে বলেননি; বরং সেটা ছিল এমন এক বাস্তবতা; যা তিনি নিজেই প্রত্যক্ষ করেছেন। সেসব ভাষণ ওই মর্মবিদারী পরিস্থিতিরই স্মারক বহন করে।
যখন তাঁর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ও সীমান্ত-অঞ্চলে সিরিয়ান বাহিনী আক্রমণ করে তখন তিনি এই ভাষণ দেন—
'হামদ ও সালাতের পর। জিহাদ হচ্ছে জান্নাতের ফটকসমূহের মধ্যে একটি ফটক। যে ব্যক্তি জেনেবুঝে এর থেকে বিমুখ থাকবে, আল্লাহ তাআলা তাকে অপদস্থতার পোশাক পরাবেন। দুর্দশার পাহাড় তার মাথায় ভেঙে পড়বে। হীনতা ও বেইজ্জতিই তার ললাট-লিখন। পর্দা পড়ে যাবে তার অন্তরে। তাকে বঞ্চিত করা হবে তার ন্যায্য অধিকার থেকে। সে ন্যায় ও ইনসাফ থেকে বঞ্চিত থেকে যাবে।
আমি তোমাদেরকে দিবানিশি সিরীয়দের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বলে আসছি। তোমাদের বারবার বলছি, ওরা তোমাদের ওপর আক্রমণের পূর্বে তোমরা তাদের ওপর চড়াও হও। কেননা, যে জাতির ওপর আক্রমণ করা হয় এবং যে এলাকায় তাদের শত্রুদের পা পৌছে যায়, তারা অপদস্থ ও পরাজিত না হয়ে পারে না। কিন্তু তোমরা আমার কথায় মোটেই কর্ণপাত করলে না। হাতের ওপর হাত রেখেই বসে রইলে। আমার উপদেশ তোমরা কঠিন মনে করলে। হাসি-ঠাট্টায় আমার কথা উড়িয়ে দিলে। এই উদাসীনতার যে কুফল, তা তোমাদের সামনেই। তোমাদের এলাকায় শত্রুরা চড়াও হয়েছে। দেখো, গামিদের ভাইয়ের (সুফইয়ান ইবনে আউফ গামিদি) ঘোড়া আনবারে১৮২ এসে পৌঁছেছে। আমার কাছে সংবাদ এসেছে, ওইসব লোক মুসলমান এবং জিম্মি নারীদের কাঁকন, বালা ও চুল পর্যন্ত তুলে নিয়ে গেছে। ওরা হত্যা ও নৃশংসতার বাজার বেশ গরম করে চলেছে। নিজ অভিষ্ট লক্ষ্যে তারা সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে ফিরে গেছে। অথচ তাদের কোনো লোক বিন্দু-পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হলো না। এরপরও যদি কোনো মুসলমান আফসোস আর দুঃখের কথা বলে, তবে সে আমার কাছে আর তিরষ্কারের উপযুক্ত থাকবে না; বরং এমন মৃত্যু অহেতুক।
কী আশ্চর্যের কথা! একটি সম্প্রদায় বাতিল হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের স্বার্থ পুরোপুরি আদায় করে নিতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর তোমরা হকের ওপর থাকা সত্ত্বেও হীনম্মন্যতায় ভুগছ! পরিতাপের বিষয়-তোমরা শত্রুদের নিশানায় পড়ে গেছ। মনমতো ওরা তোমাদের ওপর তির চালাবে। তোমরা হয়ে পড়বে তাদের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। ইচ্ছেমতো তারা তোমাদের ওপর লুণ্ঠন চালাবে। অথচ তোমাদের আত্মমর্যাদাবোধ সম্পূর্ণরূপে মরে গেছে। তোমাদের এলাকায় খুন-খারাবির হাট জমে উঠেছে, অথচ এদিকে তোমাদের কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই! তোমাদের ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে, অথচ চুপ করে বসে আছ তোমরা। শত্রুর হামলার মুখোমুখী হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতিরোধে তোমাদের কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ঘোষণা দিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতা করা হচ্ছে, অথচ তোমাদের অন্তরে মোটেই ব্যথা সৃষ্টি হচ্ছে না। গ্রীষ্মকালে তোমাদেরকে সিরিয়া অভিমুখে পাঠাতে চাইলে তোমরা বলো-"এখন খুব গরম। আমাদের কিছু অবকাশ দিন। উষ্ণতা কমলে আমরা বেরোব।" কিন্তু যখন শীতকাল আসে, তখন কঠিন শৈত্যপ্রবাহের আপত্তি তুলে বলো-"শীত কমলে আমরা বেরোব।" না তোমরা গরমের তাপ সহ্য করতে পারো, না ঠান্ডা। তোমরা যখন গরম আর শীত থেকেই পলায়ন করো, তবে তো নিশ্চয় তরবারি থেকেও পলায়ন করবে।
হে ওইসব লোক-যাদেরকে দেখতে পুরুষের মতো মনে হয়, অথচ তোমরা পুরুষ নও! আমার ইচ্ছে করে, আল্লাহ তাআলা যদি আমাকে তোমাদের মাঝ থেকে তুলে নিতেন! তোমাদের চেহারাও আমি আর দেখতে চাই না। তোমাদের সাথে তো এখন আমার আর কোনো সম্পর্কই নেই। আল্লাহর শপথ! আমি ভীষণ লজ্জিত। তোমরা আমার অন্তরকে ক্রুব্ধ-বিক্ষুব্ধ করে তুলেছ। তোমরা আমাকে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছিয়ে দিতে চাও। তোমরা আমার সাথে গাদ্দারি করেছ। আমার নির্দেশ অমান্য করে, আমাকে ছেড়ে দিয়ে আমার সকল পরিকল্পনা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছ। যার কারণে কুরাইশরা আজ বলছে-আবু তালিবের ছেলে বীর তো বটে; কিন্তু সে রণকৌশল জানে না। আল্লাহ তাদের কল্যাণ করুন। তাদের মধ্যে কেউই আমার চেয়ে অধিক সমর-অভিজ্ঞতা ও রণদক্ষতার অধিকারী নয়। যুদ্ধ সম্পর্কে যে পরিমাণ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমার অর্জিত হয়েছে, আর কেউ তা অর্জন করতে পারেনি। ২০ বছর বয়সে পৌঁছতে না পৌঁছতেই রণদক্ষতা আমার অর্জন হয়। এখন আমার বয়স প্রায় ৬০ বছর। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো রায় বা পরামর্শ কাজে পরিণত করা না যাবে, ততক্ষণ সেই রায় বা পরামর্শ কোনো সুফল বয়ে আনবে না। '১৮৩
প্রকৃতপক্ষে আলি রা.-এর এই ভাষণ ছিল একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। যা তিনি এমন এক জাতির মাথায় নিক্ষেপ করেছিলেন, যারা তাঁকে তাঁর জিহাদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে বঞ্চিত রেখেছেন। যে উদ্দেশ্য তিনি বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন, তারা সে পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি তাঁর ধারণা এবং পরে তার বিপরীত ফলাফল দেখে দুঃখে-ক্ষোভে এমন উন্নত ও সাহিত্যপূর্ণ ভাষ্যে নিজের আবেগ প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষণ ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি কোনো ধরনের সন্দেহ, সংশয় ও রাখঢাক রাখেননি।১৮৪
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলে নয়; তা হচ্ছে—আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর খেলাফতের ব্যাপারে তাঁর যে ভাষণ বর্ণিত আছে এবং খেলাফতের বাহ্যিক গুণাবলির বিপরীতে ইতিহাসের যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে ভাষণটি তিনি দিয়েছিলেন নাহরাওয়ানে অভিযানের পর। তখনকার করুণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েন। সেই দুঃখের কথাই প্রতিভাত হয়েছে তাঁর ভাষণে। তিনি জাতির পূর্বাপর অবস্থা প্রত্যক্ষ করে খুবই দুঃখ পান। মনোকষ্টে ভোগেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, তাঁর প্রতি সম্পৃক্ত অধিকাংশ ভাষণ বিশুদ্ধ সূত্রে বিবৃত নয়। কয়েকজন আলেম নাহজুল বালাগায় উল্লিখিত আলি রা.-এর ভাষণের ব্যাপারে বলেছেন, এগুলো সব শারিফ আররাজি'র বানোয়াট ভাষণ।১৮৫ সুতরাং ঐতিহাসিক সূত্রের আলোকে সেগুলো উপস্থাপনে আমাদের আরও দূরদর্শী ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে।
এতদ্ভিন্ন আরেকটি প্রেক্ষিতেও আলি রা. তাঁর লোকদেরকে যুদ্ধের প্রতি উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। সেটা হলো, তিনি তাঁর সাথিদেরকে নিজের ফাজায়েল, মর্যাদা এবং ইসলামে তাঁর উঁচু মর্যাদার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন। যারা এই দৃশ্য দেখছিল তারা বলছেন—আলি রা. উম্মুক্ত প্রান্তরে মানুষকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওই ফরমানের সূত্রে সাহায্যের জন্য ডাকছিলেন যে, কে আছ! জনাকীর্ণ দিনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একথা বলতে শুনেছ—'তোমরা কি জানো না, আমি মুমিনদের কাছে তাদের প্রাণাধিক প্রিয়?' লোকেরা বলল, 'হ্যাঁ, কেন নয়'? তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তাহলে আমি যার বন্ধু, আলিও তার বন্ধু। হে আল্লাহ, যে তাঁকে বন্ধু বানাবে, তুমি তাঁর প্রিয় হয়ে যাও। আর যে তাঁর সাথে বিদ্বেষ পোষণ করবে, তুমি তার শত্রু হয়ে যাও।'
একথা শুনে ১২ জন লোক মতান্তরে ১৬ জন লোক দাডিয়ে একথার সত্যতা ব্যাপারে সাক্ষ্য দেয়।১৮৬
হজরত আলি রা.-এর এই ভূমিকা আমাদেরকে হজরত উসমান রা.-এর জীবনের শেষ সময়কার স্মৃতি তাজা করে দেয়-যখন দুষ্কৃতিকারীরা তাঁকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। আর তিনি তাঁর ফাজায়েল ও মর্যাদার সাক্ষী তাঁর সামনে উপস্থিত সাহাবাদের কাছ থেকে নিচ্ছিলেন। যেন তিনি বলতে চাচ্ছিলেন-যার এমন মহৎ মর্যাদা, ইসলামের তরে যার এমন ত্যাগ; তাঁর বদলা কি এমন হতে পারে?
যাইহোক, এসব উদ্দীপনা ও অনবরত চেষ্টার পরও আলি রা. নিজ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হননি। অর্থাৎ, দেশের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, সৈনিকদের অসন্তুষ্টি, তাদের পারস্পরিক অসহযোগী মনোভাব ও আত্মম্ভরিতার ফলে সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে ৪০ হিজরিতে মুআবিয়া বিন আবি সুফইয়ান রা.-এর সাথে এ শর্তে সন্ধি করতে রাজি হয়ে যান যে, ইরাক আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আর সিরিয়া তাঁর (মুআবিয়া) নিয়ন্ত্রণে থাকবে। উভয়ের মধ্যে কেউই অন্যের কাজে সামরিক হস্তক্ষেপ, অতর্কিত আক্রমণ বা যুদ্ধের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। তাবারি রাহ. তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে লিখেন-
'৪০ হিজরি সনে আলি ও মুআবিয়ার মধ্যে অনেক পত্র লেখালেখির পর সন্ধিচুক্তি সাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে বলা হয়—উভয় পক্ষের মধ্যে আর কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হবে না। ইরাকের কর্তৃত্ব থাকবে আলির হাতে এবং সিরিয়ার কর্তৃত্ব থাকবে মুআবিয়ার হাতে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর হামলা, সৈন্য চালনা ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম গ্রহণ করবে না।১৮৭
টিকাঃ
১৮২ ফুরাতে পূর্ব তীরে অবস্থিত শহর।
১৮৩ আল জাহিয প্রণীত আল বায়ান ওয়াত তিবয়ান: ২৩৮, ২৩৯।
১৮৪ নায়েফ মারুফ প্রণীত আল আদাবুল ইসলামি : ৫৯।
১৮৫ মিযানুল ইতিদাল ৩/১২৪; খিলাফাত আলি বিন আবি তালিব: ৩৫৫।
১৮৬ ফাজায়িলুস সাহাবাহ: ২/৭০৫ [সনদ বিশুদ্ধ)।
১৮৭ তারিখে তাবারি: ৬/৫৬।
📄 শাহাদাত প্রার্থনার দুআ
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. হজরত মুআবিয়া রা.-এর সাথে সন্ধিচুক্তি তো করে নিয়েছেন; কিন্তু মনে হচ্ছিল এই সন্ধিচুক্তি বেশি দিন টেকেনি। কেননা, যে বছর আলি রা. শহিদ হন, ওই বছর মুআবিয়া রা. হেজাজ ও ইয়ামেন ইত্যাদি এলাকায় বুসর বিন আরতাতকে সামরিক বাহিনী দিয়ে প্রেরণ করেন।১৮৮
যাইহোক, যখন আলি রা. নিজের বাহিনীকে নিজ লক্ষ্য পূরণে নিয়ে যেতে সক্ষম হলেন না এবং তাদের পিছুটান ও হীনম্মন্যতা দেখতে পেলেন, তখন তিনি বেঁচে থাকার চাইতে মৃত্যুকে প্রাধান্য দিলেন। আল্লাহর দিকে মনোযোগী হলেন এবং দ্রুত এই নশ্বর পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নেওয়ার জন্য দুআ করতে লাগলেন। তিনি একদিন খুতবা দিতে গিয়ে বলেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي قَدْ سَئِمْتُهُمْ وَسَئِمُونِي وَمَلَلْتُهُمْ وَمَلُّونِي, فَأَرِحْنِي مِنْهُمْ وَأَرِحْهُمْ مِنِّي
'হে আল্লাহ, আমি এদের নিরাশ করেছি। তারাও আমাকে নিরাশ করেছে। সুতরাং তুমি তাদের কাছ থেকে আমাকে মুক্তি দাও এবং তাদেরকেও আমার কাছ থেকে মুক্তি দাও।'
অতঃপর দাড়িতে নিজ হাত রাখলেন। বলতে লাগলেন, 'তোমাদের সবচে নিকৃষ্ট লোক (খুনি)-এর জন্য আর কোনো বাধা নেই যে, সে এটাকে (দাড়ি) রক্তে রঞ্জিত করবে।'১৮৯
তিনি তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে খুবই কায়মনোবাক্যে দুআ করতেন। জুনদুবের বর্ণনা- লোকজন আলি রা.-এর কাছে সমবেত হলে তিনি বললেন, 'হে আল্লাহ, আমি তাদের পরাজিত করেছি, তারাও আমাকে পরাজিত করেছে। আমি তাদের ঘৃণা করেছি, তারাও আমাকে ঘৃণা করেছে। সুতরাং আপনি তাদেরকে আমার হতে এবং আমাকে তাদের হতে মুক্তি দিন।১৯০
অন্য বর্ণনায় এসেছে; আবু সালিহ বলেন, আলি রা. তাঁর মাথায় মাসহাফ রেখেছিলেন। আমি তখন তাঁর কাছে উপস্থিত ছিলাম। আমি পৃষ্ঠা উল্টানোর আওয়াজ শুনলাম। তিনি দুআ করছিলেন-
'হে আল্লাহ, আমি ওদের কাছে তা-ই চেয়েছি যা এই কুরআনে আছে। কিন্তু তারা তা আমাকে দেয়নি। হে আল্লাহ, আমি তাদের কষ্ট দিয়েছি, তারাও আমাকে কষ্ট দিয়েছে। আমি তাদের ঘৃণা করেছি, তারাও আমাকে ঘৃণা করেছে। তারা আমাকে এমন বিষয়ে বাধ্য করেছে যা আমার অপছন্দনীয়। সুতরাং আপনি তাদেরকে আমার স্থলে আমার চেয়েও মন্দ শাসক অধিষ্ঠিত করুন। আর আমাকে তার পরিবর্তে তাদের চেয়ে ভালো লোক দান করুন। ওদের মন এমনভাবে গলিয়ে দিন, লবণ যেমন পানিতে গলে যায়।১৯১
এক বর্ণনামতে, এই দুআর মাত্র তিনদিন পর তিনি শাহাদত বরণ করেন।১৯২
হজরত হাসান ইবনে আলি রা. বলেন, আমাকে আলি রা. বলেছেন-আজ রাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনার উম্মত আমার সাথে খুবই ঝগড়া ও বক্রতার আচরণ করছে।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি তাদের বদদুআ করো।' তখন আমি এই দুআ করলাম, 'হে আল্লাহ, এর বদলাস্বরূপ আপনি আমাকে এদের চেয়ে ভালো মানুষদের সঙ্গী বানান, আর তাদেরকে আমার স্থলে আমার চেয়ে মন্দ শাসক অধিষ্ঠিত করুন।' হাসান রা. বলেন, এরপর তিনি বাইরে গেলেন এবং এক লোক তাঁকে শহিদ করে দিলো।১৯৩
টিকাঃ
১৮৮ বুখারি প্রণীত আততারিখুস সাগির: ১/৪১; খিলাফাত আলি বিন আবি তালিব: ৪৩১।
১৮৯ মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক: ১০/১৫৪ সনদ বিশুদ্ধা: তাবাকাত: ৩/৪ সনদ বিশুদ্ধ।
১৯০ ইবনে আবি আসিম প্রণীত আল আহাদ ওয়াল মাসানি: ১/৩৭ [সনদ বিশুদ্ধ]; খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৪৩২।
১৯১ সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/১৪৪।
১৯২ খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব : ৪০২।
১৯৩ জাহাবি প্রণীত তারিখুল ইসলাম আহদিল খুলাফাইর রাশিদিন : ৬৪৯।