📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 খারেজিদের সাথে আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর আচরণ

📄 খারেজিদের সাথে আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর আচরণ


আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. যুদ্ধের পূর্বে ও পরে খারেজিদের সাথে مسلمانوں মতো আচরণ করেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথে তিনি তার বাহিনীর মাঝে ঘোষণা দেন- 'পলাতক কাউকে ধাওয়া করবে না। আহত কাউকে হত্যা করবে না। বিকৃত করবে না কারও চেহারা।'
আবু ওয়ায়েল নামে খ্যাত বিশিষ্ট ফকিহ তাবেয়ি শাকিক বিন সালামাহ হজরত আলি রা.-এর সাথে সবক'টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন, আলি রা. জঙ্গে জামাল ও নাহরাওয়ান যুদ্ধের সময় কাউকে গালি দেননি।৮০ তিনি নাহরাওয়ান ছেড়ে আসা প্রতিপক্ষের মাঝে সাধারণ ঘোষণা দেন-'যে তার সামানপত্র চিনতে পারে, সে যেন তা নিয়ে নেয়।' লোকেরা এসে নিজ সামানপত্র নিয়ে যায়। শেষে একটি পাতিল অবশিষ্ট থাকে। সেটাও এক ব্যক্তি এসে নিয়ে যায়। এই বর্ণনা বিভিন্ন সনদে বিবৃত আছে।৮১
আলি রা. খারেজিদের যুদ্ধ-উপকরণ ছাড়া অন্য কোনো সম্পদ তাঁর বাহিনীর লোকদের মাঝে গনিমত তথা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে বণ্টন করেননি। তিনি খারেজিদের কাফের বলেননি। কেননা, যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে তিনি তাদেরকে মুসলিম জামাতে ফিরিয়ে আনতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। তাদের বহুভাবে বুঝিয়েছেন। সতর্ক করেছেন যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে। ফলে বহু লোক ফিরে আসে। আল্লামা ইবনে কুদামা বলেন, 'তিনি এই পন্থা অবলম্বনের কারণ হচ্ছে, তাদের ভ্রষ্ট চিন্তাধারা দূরীভূত করা; হত্যা নয়। তারা তা মেনে নিলে সেটা হতো যুদ্ধের চেয়ে উত্তম উদ্যোগ। কেননা, যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে উভয় পক্ষেরই। অতএব, তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে খারেজিরা مسلمانوں একটি ফেরকা। বহু আলেম এই অভিমত পোষণ করেছেন।৮২
অবশ্য সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. তাদের ফাসেক হিসেবে অভিহিত করেছেন। মুসআব ইবনে সাআদ বলেন, আমি আমার আব্বাকে নিম্নের আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম,
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا * الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
'বলুন, আমি কি তোমাদেরকে সেসব লোকের সংবাদ দেবো, যারা কর্মের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। তারাই সে লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিবজীবনে বিভ্রান্ত হয়; অথচ তারা মনে করে তারা সৎকর্ম করেছে।' -সুরা কাহাফ: আয়াত ১০৩, ১০৪।
এই আয়াত দ্বারা কি 'হারুরি' লোকজন উদ্দেশ্য? তিনি বললেন, 'না; বরং এর দ্বারা আহলে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিষ্টান উদ্দেশ্য। ইহুদিরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। আর খ্রিষ্টানরা জান্নাত অস্বীকার করে বলেছে, সেখানে পানাহার-সামগ্রী নেই।' তবে 'হারুরি' লোকদের আলোচনা এসেছে নিম্নের আয়াতে-
﴿وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ الَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ mīṯāqihi وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ)
'তিনি অনুরূপ উপমা দ্বারা অসৎ ব্যক্তিবর্গ ছাড়া কাউকে বিপথগামী করেন না। (বিপথগামী ওরাই) যারা আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ তাআলা যা অবিচ্ছিন্ন রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন, তা ছিন্ন করে, আর পৃথিবীর বুকে অশান্তি সৃষ্টি করে। ওরা যথার্থই ক্ষতিগ্রস্ত।' -সুরা বাকারা: আয়াত ২৬, ২৭/
যাইহোক, হজরত সাআদ রা. তাদেরকে ফাসেক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।৮৩ সাআদ রা. সম্পর্কে আরও একটি বর্ণনা এমন আছে-যখন তাঁকে ওদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়; তখন তিনি বলেন, 'ওরা এমন জাতি, যারা হবে বক্র প্রকৃতির। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে বক্রতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন।'৮৪
হজরত আলি রা.-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'ওইসব লোক কি কাফের?' তিনি বললেন, 'তারা কুফরির অভিযোগ এনে সঙ্গ ত্যাগ করেছে।' অতঃপর জিজ্ঞেস করা হলো, 'তারা কি মুনাফিক?' তিনি বললেন, 'মুনাফিকরা তো আল্লাহর জিকর খুব কম করে থাকে।' পরে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'তাহলে তারা কারা?' জবাবে তিনি বললেন, 'ওরা এমন জাতি, যারা আমাদের সাথে বিদ্রোহ করেছে এবং আমরা তাদের হত্যা করেছি।'
অন্য বর্ণনায় জবাবটি এসেছে এভাবে-তারা এমন জাতি, যারা আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। আমাদেরকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য করা হয়েছে।
তৃতীয় বর্ণনামতে-তারা এমন এক জাতি, যারা ফিতনায় পতিত হয়েছে; ফলে তারা অন্ধ ও বধিরের মতো রয়ে গেছে।৮৫
অনুরূপভাবে তিনি তাঁর বাহিনী এবং গোটা মুসলিম জাতিকে নসিহত করতে গিয়ে বলেন, 'বিদ্রোহীরা যদি ন্যায়নিষ্ঠ ইমামের বিরোধিতা করে, তাহলে তাদের হত্যা করো। যদি জালেম ইমামের বিরোধিতা করে, তাহলে তাদের হত্যা করো না। কেননা, তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে।৮৬
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং উষ্ট্রীর ও সিফফিনে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের মাঝে যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। উষ্ট্রী ও সিফফিন যুদ্ধের কারণে তিনি বেশ অনুতপ্ত ছিলেন। লজ্জায় অশ্রু ঝরিয়েছেন। কিন্তু খারেজিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি বেশ শান্তি পান।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন, শরয়ি ভাষ্য ও ইজমা উভয়ের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করে দিয়েছে। তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্পষ্ট ভাষ্যের আলোকে খারেজিদের হত্যা করেছেন। এতে তিনি তৃপ্ত ও সন্তুষ্ট ছিলেন। সাহাবাদের মধ্যে কেউই এক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেননি। অন্যদিকে সিফফিনের যুদ্ধের ব্যাপারে তিনি নিজেই অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন এবং অনুতাপে দগ্ধ হয়েছেন।৮৭

টিকাঃ
৮০ বায়হাকি প্রণীত আসসুনানুল কুবরা : ৮/১৮২।
৮১ এই বর্ণনা বিভিন্ন সনদে বিবৃত আছে।
৮২ বহু আলেম এই অভিমত পোষণ করেছেন।
৮৩ সহিহ বুখারি ফাতহুল বারিসহ ৫/৮৪২।
৮৪ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১৫/৩২৪, ৩২৫; শাতিবি প্রণীত আল ইতিসাম: ১/৬২।
৮৫ মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক: ১০/১৫০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১৫/৩২২ (সনদ বিশুদ্ধ)।
৮৬ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১৫/৩২০; ফাতহুল বারি: ১২/৩০১।
৮৭ মাজমুউল ফাতাওয়া : ২৮/৫১৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00