📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 যুদ্ধের সূচনা

📄 যুদ্ধের সূচনা


খারেজিরা আলি রা.-এর দিকে অগ্রসর হলো। আলি রা. তাঁর অশ্বারোহী বাহিনী সম্মুখে রাখলেন। তাঁদের কাছে রাখলেন তিরন্দাজ বাহিনী। আর পদাতিক বাহিনী রাখলেন অশ্বারোহীদের পশ্চাতে। এরপর তিনি তাঁর সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেন, 'ওরা তোমাদের ওপর হামলা শুরু না করা পর্যন্ত তোমরা সংযত থাকবে।'
إلى الجنة الرواح الرواح لا حكم إلا الله ، বলতো বলতে কারও বিচারের অধিকার নেই। চলো চলো জান্নাতে চলো'
আলি রা.-এর বাহিনীর সম্মুখভাগে অশ্বারোহী দলের ওপর আক্রমণ চালিয়ে দিলো। এ আক্রমণ তাঁদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিলো। এমনকি এদের একদল মাইমানায় এবং অপর দল মাইসারায় চলে গেল। এবার তাদের মোকাবিলা করল তিরন্দাজ বাহিনী। এরা তাদের মুখের ওপর তির ছুঁড়তে লাগল। মাইমানাহ ও মাইসারাহ থেকে এদের সাহায্যে এগিয়ে আসে অশ্বারোহী দল। পদাতিক বাহিনীও বর্শা ও তরবারি নিয়ে দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ল। এভাবে ত্রিমুখী আক্রমণ চালিয়ে খারেজিদের সমূলে বিনাশ করে দেওয়া হয়। তাদের মৃতদেহগুলো অশ্বের খুরের নিচে পড়ে থাকে। যুদ্ধে খারেজিদের নেতৃবৃন্দ যথা: আবদুল্লাহ ইবনে ওহাব, হারকুস ইবনে জুহাইর, শুরাইহ ইবনে আওফা ও আবদুল্লাহ ইবনে সাখবুরাহ সুলামি নিহত হয়।৬৩
হজরত আবু আইয়ুব আনসারি রা. বলেন, যুদ্ধের সময় এক খারেজিকে আমি বর্শা মারি। বর্শা তার পেট ভেদ করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর দুশমন, দোজখের সুসংবাদ গ্রহণ করো।' সে বলল, 'অচিরেই তুমি জানতে পারবে; আমাদের মধ্যে দোজখে যাওয়ার অধিক যোগ্য কে?'৬৪
বহু খারেজি আত্মসমর্পণ করে এই যুদ্ধে। কেননা, তারা তাদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে ওহাবের মুখে এমন একটি কথা বলতে শুনেছে, যা দ্বারা তার পরিণাম সম্পর্কে সৃষ্টি হয়েছে ধুম্রজাল। তার ভেতর থেকে আসছিল মন্দ পরিণামের গন্ধ। সে এমন উক্তিটি ওই সময় করে যখন আলি রা. তাঁর তরবারি দ্বারা একজন খারেজিকে আঘাত করেছেন। সে বলল, 'খোশ আমদেদ! কতই-না উত্তম জান্নাতের সফর!' তার একথা শুনে আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব বলতে লাগল, 'জানা নেই জান্নাতের সফর নাকি জাহান্নামের। '৬৫
আবদুল্লাহ ইবনে ওহাবের এই উক্তি শুনে বনু সাআদের ফারওয়া ইবনে নাওফেল বলল, 'এই লোক ধোঁকায় পতিত হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, সে নিজেই সন্দেহে পতিত।' অতঃপর সে তার সঙ্গীদের নিয়ে ১ হাজার খারেজির সাথে আবু আইয়ুব আনসারি রা.-এর ঝাণ্ডার নিচে আশ্রয় নেয়। পরে পর্যায়ক্রমে আত্মসমর্পণ করে এখানে চলে আসে বহুসংখ্যক খারেজি।৬৬
চূড়ান্ত এই লড়াইয়ের মেয়াদ ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা-যা সংঘটিত হয় ৬৭ হিজরির সফর মাসে। সংক্ষিপ্ত এই সময়টাতে খারেজিদের বিশাল একটি অংশ ধূলিসাৎ হয়ে যায়। অন্যদিকে সহিহ মুসলিম-এর বর্ণনায় জায়দ ইবনে ওহাবের ভাষ্যমতে, আলি রা.-এর বাহিনীর মাত্র ২ জন লোক ৬৮ 'হাসান' সনদের আরেক বর্ণনামতে মোট ১২ বা ১৩ জন লোক শহিদ হন।৬৯ তৃতীয় আরেকটি বিশুদ্ধ বর্ণনায় এসেছে; আবু মাজলাজ বলেছেন, মুসলমান অর্থাৎ, আলি রা.-এর বাহিনীর মাত্র ৯ জন লোক শহিদ হয়। তিনি বলেন, এর সত্যতা যাচাই করতে চাইলে আবু বারজা'র কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করো। তিনি ওই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।৭০
এদিকে খারেজিদের ব্যাপারে বর্ণিত বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা প্রতীয়মান হয়- তাদের সকলেই নিহত হয়।” তবে মাসউদির অভিমত, খুবই নগণ্যসংখ্যক লোক; যাদের পরিমাণ ১০-এর চেয়ে কম-বেঁচে যেতে সক্ষম হয়। করুণ অপদস্থতার মুখে তারা পলায়ন করতে বাধ্য হয়।৭২

টিকাঃ
৬২ মুহাম্মাদ কিনান প্রণীত তারিখুল খিলাফাতির রাশিদা : ৪২৫, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া হতে ঈষৎ সংক্ষেপিত।
৬৩ মুহাম্মাদ কিনান প্রণীত তারিখুল খিলাফাতির রাশিদা: ৪২৫।
৬৪ মুহাম্মাদ কিনান প্রণীত তারিখুল খিলাফাতির রাশিদা: ৪২৫।
৬৫ আল কামিল-আখবারুল খাওয়ারিজ: ২১; আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতু আলি: ৩১৫।
৬৬ আল কামিল-আখবারুল খাওয়ারিজ: ২১।
৬৭ আনসাবুল আশরাফ: ২/৬৩ [সনদে একজন অজ্ঞাত রাবি রয়েছেন]।
৬৮ সহিহ মুসলিম: ২/৭৪৮।
৬৯ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ : ৫/৩১১; তারিখে খলিফা : ১৯৭ [সনদ হাসান]।
৭০ আল মারিফাতু ওয়াত তারিখ: ৩/৩১৫; তারিখে বাগদাদ ১/১৮২।
৭১ আল কামিল- আখবারুল খাওয়ারিজ ৩৩৮।
৭২ তারিখে খলিফা: ১৯৮; খিলাফাতু আলি: ৩২৯।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 স্তনের বোঁটায় ন্যায় মাংসপেশী ও বেঁটে হাতবিশিষ্ট লোক!

📄 স্তনের বোঁটায় ন্যায় মাংসপেশী ও বেঁটে হাতবিশিষ্ট লোক!


স্তনের বোটার ন্যায় মাংসপেশীবিশিষ্ট লোকটি কে ছিল? তার ব্যক্তিত্বের নির্ধারণে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। তম্মধ্যে কিছু বর্ণনার সনদ দুর্বল, কিছু বর্ণনার সনদ শক্তিশালী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসে স্তনের বোটার ন্যায় মাংসপেশীবিশিষ্ট লোকের কয়েকটি আকৃতির কথা এসেছে। যেমন, সে ছিল কালো চেহারাবিশিষ্ট।৭৩
আরেক বর্ণনামতে, সে ছিল হাবশি। হাত বেঁটে। খুবই ক্ষুদ্রাকৃতির; যেন কাঁধ হাতে বাহু পর্যন্ত তার দৈর্ঘ্য। অথবা কনুইয়ের নিচে হাতের আর অংশ ছিল না এবং বাহুর ডগা; অর্থাৎ, শেষ অংশ স্তনের বোঁটার মতো। তার ওপর ছিল সাদা পশম। বাহুও তেমনই ঢিলেঢালা, থলথলে ও গোশতে ভরা; যেন সেখানে হাড্ডির লেশমাত্র নেই। তার কোনো স্থিরতা ছিল না। এদিক-ওদিক হেলেদুলে থাকত। হাতের ব্যাপারে যে তিনটি শব্দ এসেছে, সবগুলোর অর্থ বেঁটে হাতবিশিষ্ট।৭৪
উপরোক্ত আকৃতিবিশিষ্ট লোকটির নাম কী? এ ব্যাপারে যারা হারকুস (সোয়াদ দ্বারা) ইবনে জুহাইর আস সাদির কথা বলেছে, তাদের ধারণা ভুল।৭৫ কারণ, হারকুস ছিল একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি। ইসলামি বিজয়- অভিযানে তার কৃতিত্ব রয়েছে। সে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অংশ নেয়। জামালে সুগরা অভিযানের পর যেখানে জুবাইর ও তালহা রা. বসরায় উসমান হত্যাকারীদের হত্যা করেছিলেন, এই লোক তখন ময়দান ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই হারকুসই খারেজিদের গুটিকয়েক নেতাদের একজন হিসেবে গণ্য হয়।৭৬ হ্যাঁ, এটুকু বলা যেতে পারে যে, এক বর্ণনায় তার নাম এসেছে হারকুস (সিন দ্বারা)। তার জন্ম সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য জানা যায় না। এক বর্ণনায় তার পিতৃত্বের পরিচয় এসেছে 'মালেক'। তার বিবরণ হচ্ছে, আলি রা.-এর নির্দেশে লড়াই সমাপ্তির পর তাকে সন্ধান করে আলি রা.-এর কাছে নিয়ে আসা হয়। তখন তিনি বলেছেন, 'আল্লাহু আকবার! তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার পিতার নাম বলতে পারো?' লোকজন বলতে লাগল, 'তার নাম "মালেক”।' আলি রা. জিজ্ঞেস করলেন, 'সে কার ছেলে?' কেউ তার পিতার নাম বলতে পারল না।৭৭
ইতিহাসবিদ তাবারি রাহ. বিশুদ্ধ সূত্রে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি লিখেছেন, স্তনের বোটার মতো মাংসপেশীবিশিষ্ট লোকটির নাম নাফে। অনুরূপ বর্ণনা মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ ও সুনানে আবি দাউদেও এসেছে। কিন্তু উভয়টির সনদ অভিন্ন। সুতরাং তিনটি উৎসে একই বর্ণনা একই সনদে পাওয়া যাচ্ছে।৭৮

টিকাঃ
৭৩ মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক: ১০/১৪৬।
৭৪ আননিহায়া ফি গারিবিল হাদিস: ১/১২, ১৩; ফাতহুল বারি: ১২/২৯৪, ২৯৫।
৭৫ আল মিলাল ওয়ান নিহাল: ১/১১৫।
৭৬ ফাতহুল বারি: ১২/২৯২; আল ইসাবাহ: ১৫/১৩৯।
৭৭ আল ফাতহুর রাব্বানি আলা মুসনাদিল ইমাম আহমাদ: ২৩/১১৫ [সনদ হাসান]; আল বিদায়া ওয়াননিহায়া: ৭/২৯৪, ২৯৫।
৭৮ আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতে আলি ইবনে আবি তালিব : ৩৩৪।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 তার হত্যায় আলি রা.-এর বাহিনীতে প্রভাব

📄 তার হত্যায় আলি রা.-এর বাহিনীতে প্রভাব


হজরত আলি রা. খারেজিদের ভ্রষ্ট চিন্তাধারার সূচনাতেই তাদের ব্যাপারে আলোচনা করেছিলেন। অধিকাংশ আলোচনায় তিনি স্তনের বোটার মতো মাংসপেশীবিশিষ্ট লোকের কথা উল্লেখ করতেন। এভাবে চূড়ান্ত লড়াই শেষে তিনি বেঁটে হাতবিশিষ্ট লোকটির সন্ধান করতে তাঁর সঙ্গীদের নির্দেশ দেন। কেননা, প্রতিপক্ষের মাঝে তার অস্তিত্বই আমাদের সততা ও সঠিকতার প্রমাণ। অনেক অনুসন্ধানের পর সেই লাশটি নাহরাওয়ান নদীর তীরে অন্যান্য লাশের সাথে পাওয়া যায়। লাশগুলো একটি আরেকটির উপর পড়ে ছিল। আলি রা. বললেন, 'এগুলো পৃথক করো'। দেখা গেল সবার নিচে মাটির সাথে সেই বেঁটে হাতবিশিষ্ট লোকটির লাশ পড়ে আছে। তিনি 'আল্লাহু আকবার' বলে উঠলেন। বললেন, 'আল্লাহ তাআলা সত্য বলেছেন এবং তাঁর রাসুল তাবলিগের হক আদায় করেছেন।' অতঃপর তিনি শুকরিয়াস্বরূপ সেজদা আদায় করেন। তাঁকে দেখে অন্যরাও শুকরিয়ার সেজদা আদায় করেন। খুশির রেখা ফুটে ওঠে সকলের চেহারায়।৭৯

টিকাঃ
৭৯ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ৫/৩১৭, ৩১৯ [সনদ বিশুদ্ধ)।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 খারেজিদের সাথে আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর আচরণ

📄 খারেজিদের সাথে আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর আচরণ


আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. যুদ্ধের পূর্বে ও পরে খারেজিদের সাথে مسلمانوں মতো আচরণ করেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথে তিনি তার বাহিনীর মাঝে ঘোষণা দেন- 'পলাতক কাউকে ধাওয়া করবে না। আহত কাউকে হত্যা করবে না। বিকৃত করবে না কারও চেহারা।'
আবু ওয়ায়েল নামে খ্যাত বিশিষ্ট ফকিহ তাবেয়ি শাকিক বিন সালামাহ হজরত আলি রা.-এর সাথে সবক'টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন, আলি রা. জঙ্গে জামাল ও নাহরাওয়ান যুদ্ধের সময় কাউকে গালি দেননি।৮০ তিনি নাহরাওয়ান ছেড়ে আসা প্রতিপক্ষের মাঝে সাধারণ ঘোষণা দেন-'যে তার সামানপত্র চিনতে পারে, সে যেন তা নিয়ে নেয়।' লোকেরা এসে নিজ সামানপত্র নিয়ে যায়। শেষে একটি পাতিল অবশিষ্ট থাকে। সেটাও এক ব্যক্তি এসে নিয়ে যায়। এই বর্ণনা বিভিন্ন সনদে বিবৃত আছে।৮১
আলি রা. খারেজিদের যুদ্ধ-উপকরণ ছাড়া অন্য কোনো সম্পদ তাঁর বাহিনীর লোকদের মাঝে গনিমত তথা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে বণ্টন করেননি। তিনি খারেজিদের কাফের বলেননি। কেননা, যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে তিনি তাদেরকে মুসলিম জামাতে ফিরিয়ে আনতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। তাদের বহুভাবে বুঝিয়েছেন। সতর্ক করেছেন যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে। ফলে বহু লোক ফিরে আসে। আল্লামা ইবনে কুদামা বলেন, 'তিনি এই পন্থা অবলম্বনের কারণ হচ্ছে, তাদের ভ্রষ্ট চিন্তাধারা দূরীভূত করা; হত্যা নয়। তারা তা মেনে নিলে সেটা হতো যুদ্ধের চেয়ে উত্তম উদ্যোগ। কেননা, যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে উভয় পক্ষেরই। অতএব, তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে খারেজিরা مسلمانوں একটি ফেরকা। বহু আলেম এই অভিমত পোষণ করেছেন।৮২
অবশ্য সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. তাদের ফাসেক হিসেবে অভিহিত করেছেন। মুসআব ইবনে সাআদ বলেন, আমি আমার আব্বাকে নিম্নের আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম,
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا * الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
'বলুন, আমি কি তোমাদেরকে সেসব লোকের সংবাদ দেবো, যারা কর্মের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। তারাই সে লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিবজীবনে বিভ্রান্ত হয়; অথচ তারা মনে করে তারা সৎকর্ম করেছে।' -সুরা কাহাফ: আয়াত ১০৩, ১০৪।
এই আয়াত দ্বারা কি 'হারুরি' লোকজন উদ্দেশ্য? তিনি বললেন, 'না; বরং এর দ্বারা আহলে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিষ্টান উদ্দেশ্য। ইহুদিরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। আর খ্রিষ্টানরা জান্নাত অস্বীকার করে বলেছে, সেখানে পানাহার-সামগ্রী নেই।' তবে 'হারুরি' লোকদের আলোচনা এসেছে নিম্নের আয়াতে-
﴿وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ الَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ mīṯāqihi وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ)
'তিনি অনুরূপ উপমা দ্বারা অসৎ ব্যক্তিবর্গ ছাড়া কাউকে বিপথগামী করেন না। (বিপথগামী ওরাই) যারা আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ তাআলা যা অবিচ্ছিন্ন রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন, তা ছিন্ন করে, আর পৃথিবীর বুকে অশান্তি সৃষ্টি করে। ওরা যথার্থই ক্ষতিগ্রস্ত।' -সুরা বাকারা: আয়াত ২৬, ২৭/
যাইহোক, হজরত সাআদ রা. তাদেরকে ফাসেক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।৮৩ সাআদ রা. সম্পর্কে আরও একটি বর্ণনা এমন আছে-যখন তাঁকে ওদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়; তখন তিনি বলেন, 'ওরা এমন জাতি, যারা হবে বক্র প্রকৃতির। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে বক্রতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন।'৮৪
হজরত আলি রা.-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'ওইসব লোক কি কাফের?' তিনি বললেন, 'তারা কুফরির অভিযোগ এনে সঙ্গ ত্যাগ করেছে।' অতঃপর জিজ্ঞেস করা হলো, 'তারা কি মুনাফিক?' তিনি বললেন, 'মুনাফিকরা তো আল্লাহর জিকর খুব কম করে থাকে।' পরে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'তাহলে তারা কারা?' জবাবে তিনি বললেন, 'ওরা এমন জাতি, যারা আমাদের সাথে বিদ্রোহ করেছে এবং আমরা তাদের হত্যা করেছি।'
অন্য বর্ণনায় জবাবটি এসেছে এভাবে-তারা এমন জাতি, যারা আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। আমাদেরকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য করা হয়েছে।
তৃতীয় বর্ণনামতে-তারা এমন এক জাতি, যারা ফিতনায় পতিত হয়েছে; ফলে তারা অন্ধ ও বধিরের মতো রয়ে গেছে।৮৫
অনুরূপভাবে তিনি তাঁর বাহিনী এবং গোটা মুসলিম জাতিকে নসিহত করতে গিয়ে বলেন, 'বিদ্রোহীরা যদি ন্যায়নিষ্ঠ ইমামের বিরোধিতা করে, তাহলে তাদের হত্যা করো। যদি জালেম ইমামের বিরোধিতা করে, তাহলে তাদের হত্যা করো না। কেননা, তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে।৮৬
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং উষ্ট্রীর ও সিফফিনে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের মাঝে যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। উষ্ট্রী ও সিফফিন যুদ্ধের কারণে তিনি বেশ অনুতপ্ত ছিলেন। লজ্জায় অশ্রু ঝরিয়েছেন। কিন্তু খারেজিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি বেশ শান্তি পান।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন, শরয়ি ভাষ্য ও ইজমা উভয়ের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করে দিয়েছে। তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্পষ্ট ভাষ্যের আলোকে খারেজিদের হত্যা করেছেন। এতে তিনি তৃপ্ত ও সন্তুষ্ট ছিলেন। সাহাবাদের মধ্যে কেউই এক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেননি। অন্যদিকে সিফফিনের যুদ্ধের ব্যাপারে তিনি নিজেই অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন এবং অনুতাপে দগ্ধ হয়েছেন।৮৭

টিকাঃ
৮০ বায়হাকি প্রণীত আসসুনানুল কুবরা : ৮/১৮২।
৮১ এই বর্ণনা বিভিন্ন সনদে বিবৃত আছে।
৮২ বহু আলেম এই অভিমত পোষণ করেছেন।
৮৩ সহিহ বুখারি ফাতহুল বারিসহ ৫/৮৪২।
৮৪ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১৫/৩২৪, ৩২৫; শাতিবি প্রণীত আল ইতিসাম: ১/৬২।
৮৫ মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক: ১০/১৫০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১৫/৩২২ (সনদ বিশুদ্ধ)।
৮৬ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১৫/৩২০; ফাতহুল বারি: ১২/৩০১।
৮৭ মাজমুউল ফাতাওয়া : ২৮/৫১৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00