📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 অভিযানের নেপথ্যে

📄 অভিযানের নেপথ্যে


আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. খারেজিদেরকে তাদের মতাদর্শ নিয়ে এই শর্তে থাকতে দেন যে, তারা অন্যায়ভাবে কারও রক্ত ঝরাতে পারবে না। সাধারণ জনগণকে ভীতসন্ত্রস্ত করতে পারবে না। কোনো মুসাফিরের পথ আটকাতে পারবে না। যদি এই শর্তাবলির ব্যত্যয় ঘটে তবে যুদ্ধই হবে এর সমাধান। কিন্তু খারেজিরা তাদের প্রতিপক্ষকে কাফের আখ্যা দেওয়ার প্রেক্ষিতে তাদের রক্ত ও সম্পদ বৈধ মনে করতে লাগল। তারা مسلمانوں রক্ত ঝরাতে আরম্ভ করল অন্যায়ভাবে। তাদের এসব অন্যায়-অনাচার সম্পর্কে বহু বর্ণনা রয়েছে। তবে সর্বাধিক বিশুদ্ধ বর্ণনা হচ্ছে যেটা প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনা করেছে। এই লোক শুরুতে ছিল খারেজি। পরে তওবা করে ফিরে আসে। তার বর্ণনা—আমি নাহরওয়ালাদের সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড আমার ভালো লাগল না। তবুও তাদের ভয়ে আমার ভালো না-লাগার বিষয়টি গোপন রাখতে বাধ্য হই। কেননা, তখন তারা আমাকে হত্যা করবে—এই আশঙ্কা ছিল আমার।
একদিন তাদের একটি দলের সাথে একটি গ্রাম দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলাম। আমাদের এবং ওই গ্রামের মাঝখানে অন্তরায় ছিল একটি খাল। অতর্কিত এক ব্যক্তি স্বীয় চাদর পেঁচিয়ে অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গ্রামের বাইরে বের হলো। আমাদের দলের লোকজন তাকে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি সম্ভবত আমাদের দেখে ভয় পেয়েছ?' সে বলল, 'হ্যাঁ'। তারা বলল, 'ভয় পেয়ো না।' আমি মনে মনে বললাম, নিশ্চয় এরা এই লোককে চিনে ফেলেছে। অতঃপর তারা জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কি আল্লাহর রাসুলের সাহাবি খাব্বাবের ছেলে'? তিনি বলল, 'হ্যাঁ'। তারা বলল, 'তুমি তোমার পিতার থেকে যে হাদিসটি শুনেছ তা আমাদেরকে শোনাও।'
তিনি বললেন, 'আমি আমার পিতার কাছে শুনেছি; তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন- "শীঘ্রই এমন সময় আসবে যখন ঘরে অবস্থানকারী ব্যক্তি দণ্ডায়মান ব্যক্তি থেকে ভালো অবস্থায় থাকবে। আর দণ্ডায়মান ব্যক্তি হেঁটে চলা ব্যক্তি থেকে ভালো অবস্থায় থাকবে। আবার হেঁটে চলা ব্যক্তি দৌড়ে চলা ব্যক্তি থেকে ভালো অবস্থায় থাকবে।"১৫১
এরপর তারা তাঁর এবং তাঁর একজন বাঁদির হাতে বেড়ি পরিয়ে সাথে নিয়ে চলল। পথিমধ্যে একটি খেজুর গাছ থেকে একটি খেজুর পড়তে দেখে দলের একজন খেজুরটি উঠিয়ে মুখে পুরে দেয়। অন্য একজন তাকে বলল, 'খেজুরটি তুমি খেয়ে ফেললে, অথচ মালিকের অনুমতিও নাওনি; মূল্যও দাওনি।' তখন সে ব্যক্তি মুখের ভেতর থেকে খেজুরটি ফেলে দিলো। আরও কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর জনৈক জিম্মির একটি শূকর দেখে তাদের একজন শূকরটিকে মেরে চামড়া ছিলে ফেলল। অন্য একজন তাকে বলল, 'তুমি এ কাজ করলে কেন? এটা কোনো জিম্মির মালিকানাধীন শূকর হতে পারে।'
এরপর আবদুল্লাহ ইবনে খাব্বাব বললেন, 'আমি কি তোমাদেরকে ওই কথা বলব না, যা তোমার দৃষ্টিতে এটা অপেক্ষা পবিত্র ও সম্মানযোগ্য?' তারা বলল, 'অবশ্যই বলবে'। তিনি বললেন, 'আমি একজন মুসলমান। আমি ইসলামে কোনো প্রকার বেদআত আবিষ্কার করিনি। তোমরা আমাকে নিরাপত্তা দিয়ে বলেছ-ভয় পেয়ো না।'
এতসত্ত্বেও তারা আবদুল্লাহ ইবনে খাব্বাবকে নদীর কাছে টেনে নিয়ে গলা কেটে শহিদ করে দেয়।
বর্ণনাকারী বলেন, আমি তাঁর রক্ত পানিতে এমনভাবে জমাটবদ্ধ হয়ে বয়ে যেতে দেখলাম, যেভাবে পানিতে ছিঁড়ে যাওয়া জুতার ফিতা ভেসে ভেসে অদৃশ্য হয়ে যায়। এরপর তারা তাঁর স্ত্রীর কাছে যায়। স্ত্রী তাদের বলল, 'আমি অন্তঃসত্ত্বা, আল্লাহকে ভয় করো।' পাষণ্ডরা তাঁর কোনো কথায় কর্ণপাত না করে তাঁকে জবাই করে পেট ফেঁড়ে সন্তান বের করে দেয়।
বর্ণনাকারী বলেন, আমি তাদের চেয়ে অভিশপ্ত আর কোনো জাতি দেখিনি। তাই সুযোগ পেয়ে তাদের দল থেকে বেরিয়ে এসেছি।৫২
খারেজিরা এক রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। গর্ভবতী নারীর পেট কেটে সন্তান বের করে ফেলা এবং বকরির মতো আবদুল্লাহ ইবনে খাব্বাবকে জবাই করা সাধারণ বিষয় নয়। এরা এতেই ক্ষান্ত হলো না; বরং জনগণকে হত্যার হুমকিও দিয়ে যাচ্ছে। তাদের এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ অনাচার দেখে তাদের নিজেদেরই কিছু লোক ব্যাপারটা সহজে নিতে পারল না। তারা বলল, 'তোমাদের সর্বনাশ হোক! এ জন্য আমরা আলিকে ছেড়ে তোমাদের সঙ্গ দিইনি'।৫৩
যাইহোক, ক্রমেই বেড়ে চলল খারেজিদের এমন ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা। তবুও আলি রা. তাদের হত্যার পদক্ষেপ নেননি। তিনি তাদের কাছে নিজের প্রতিনিধি পাঠালেন। বললেন, 'কিসাস নেওয়ার জন্য হত্যাকারীকে যেন আমাদের কাছে সোপর্দ করে দেওয়া হয়।' জবাবে তারা চরম ঔদ্ধত্য ও ধৃষ্টতা দেখায়। তারা বলল, 'আমরা সবাই হত্যাকারী। '৫৪
এমতাবস্থায় হজরত আলি রা. ৩৮ হিজরি সনে যে বাহিনী সিরিয়া অভিযানের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত রেখেছিলেন, তাঁদের নিয়ে খারেজিদের উদ্দেশে চললেন।৫৫ নাহরাওয়ান নদীর পশ্চিমতীরে বাহিনী অবতরণ করালেন। অন্যদিকে নাহরাওয়ান শহরের পূর্বদিকে ছিল খারেজিদের ক্যাম্প।৫৬

টিকাঃ
১৫১ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১৫/৩১০, ৩১১ [সনদ বিশুদ্ধ)।
৫২ মাজমাউজ জাওয়ায়িদ: ৬/১৩৭, ১৩৮ [সনদ বিশুদ্ধ]।
৫৩ মাজমাউজ জাওয়ায়িদ ওয়া মামবাউল ফাওয়ায়িদ: ৬/২৩৭, ২৩৮ [সনদ বিশুদ্ধ]।
৫৪ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১৫/৩০৮, ৩০৯ [সনদ বিশুদ্ধ]।
৫৫ আনসাবুল আশরাফ: ২/৬৩ [সনদে অজ্ঞাত রাবি আছেন। দ্রষ্টব্য- আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতে আলি: ৩২২]।
৫৬ তারিখে বাগদাদ: ১/২০৫, ২০৬।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 যুদ্ধের জন্য বাহিনীকে আলি রা.-এর উদ্বুদ্ধকরণ

📄 যুদ্ধের জন্য বাহিনীকে আলি রা.-এর উদ্বুদ্ধকরণ


আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. ভালো করে জানতেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে গোষ্ঠী সম্পর্কে দীন থেকে বেরিয়ে যাবার ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তারা হচ্ছে এই খারেজি সম্প্রদায়। অতএব, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসের মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরাম এবং তাঁর সঙ্গীদেরকে তাদের বিরুদ্ধ লড়াই করার জন্য উদ্দীপনা যোগাচ্ছিলেন। তাদের মুখোমুখী হয়ে বিপদশঙ্কুল পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রেরণা দিতে গিয়ে তিনি এই হাদিসটি শোনাচ্ছিলেন। বলছিলেন, 'হে লোকসকল, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
يَخْرُجُ قَوْمٌ مِنْ أُمَّتِي يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لَيْسَ قِرَاءَتِكُمْ إِلَى قِرَاءَتِهِمْ بِشَيْءٍ وَلَا صَلَاتِكُمْ إِلَى صَلَاتِهِمْ بِشَيْءٍ وَلَا صِيَامُكُمْ إِلَى صِيَامِهِمْ بِشَيْءٍ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ يَحْسِبُونَ أَنَّهُ لَهُمْ وَهُوَ عَلَيْهِمْ لَا تَجَاوِزُ صَلَاتُهُمْ تَرَاقِيَهُمْ يَمْرُقُونَ مِنَ الإِسْلَامِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ
"আমার উম্মতের মধ্যে এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা কুরআন পাঠ করবে। তোমাদের পাঠ তাদের পাঠের তুলনায় নিম্নমানের হবে। অনুরূপভাবে তাদের নামাজ ও রোজার তুলনায় তোমাদের নামাজ-রোজা সামান্য বলে মনে হবে। কুরআন পাঠ করে তারা ধারণা করবে এতে তাদের খুব লাভ হচ্ছে। অথচ এটা তাদের জন্য ক্ষতির কারণই হবে। তাদের নামাজ তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না। তারা ইসলাম থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমন তীর বেরিয়ে যায় শিকার থেকে।"
আর যে সৈন্যদল তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে সে সৈন্যদল যদি তাঁদের নবির মাধ্যমে কৃত ওয়াদা সম্পর্কে জানতে পারত, তাহলে তাঁরা এই কাজের (পুরস্কারের) ওপরই ভরসা করে বসে থাকত।
দলটির চিহ্ন হলো, তাদের মধ্যে এমন এক লোক থাকবে, যার বাহুর অগ্রভাগে স্ত্রীলোকের স্তনের বোটার ন্যায় একটি মাংসপেশী থাকবে। এর ওপর থাকবে সাদা পশম।
আলি রা. বলেন, 'অতএব তোমরা মুআবিয়া ও সিরিয়ার অধিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাচ্ছ; অপরদিকে তোমরা নিজেদের সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদের পেছনে এদের (খারেজি) রেখে যাচ্ছ। আল্লাহর শপথ! আমার বিশ্বাস, এরাই হচ্ছে সেই সম্প্রদায় (যাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করার ব্যাপারে তোমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে)। কেননা, এরা অবৈধভাবে রক্তপাত ঘটিয়েছে এবং মানুষের গবাদি পশু লুট করেছে। সুতরাং আল্লাহর নাম নিয়ে যাত্রা শুরু করো। '৫৭
নাহরাওয়ানের দিন হজরত আলি রা. বলেছেন, 'আমাকে মারিকিন; অর্থাৎ, দীনত্যাগী মানুষদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর এরা মারিকিনদের অন্তর্ভুক্ত। '৫৮
আলি রা. নাহরাওয়ানের এপাড়ে; অর্থাৎ, পূর্বপাশে খারেজিদের বিপরীতে সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দেন। বলেন, 'খারেজিরা যতক্ষণ নদী পার হয়ে পশ্চিম দিকে না আসবে ততক্ষণ লড়াই শুরু করবে না।' তিনি একজন দূত পাঠালেন তাদের কাছে। বললেন, 'তাদেরকে ফিরে যেতে বলো।' হজরত বারা ইবনে আজেব রা.-কে এ লক্ষ্যে প্রেরণ করা হয়। তিনি তিনদিন ধরে তাদের বোঝালেন; কিন্তু তারা তা মান্য করল না।৫৯
এভাবে আলি রা. খারেজিদের কাছে কয়েকজন দূত পাঠান। দূতেরা আসা- যাওয়া করতে লাগল। দেখা গেল, একজন দূতকে তারা হত্যাই করে ফেলেছে এবং তাঁর লাশ নদীর পূর্বপাশে ফেলে দিয়েছে।৬০
খারেজিদের অনাচার আর বাড়াবাড়ি সীমা অতিক্রম করে চলল। যুদ্ধ ঠেকানো ও সন্ধির সমুদয় পথ রুদ্ধ। তারা হকের পথে আহ্বানকারীদের যাবতীয় প্রচেষ্টাকে খুবই দাম্ভিকতার সাথে প্রত্যাহার করল এবং যুদ্ধের জন্য জেদ ধরে বসল। এমতাবস্থায় আলি রা. নিজ বাহিনী সজ্জিত করে অভিযানের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিলেন।৬১

টিকাঃ
৫৭ সহিহ মুসলিম: ৭৪৮, ৭৪৯।
৫৮ আবু আসিম প্রণীত আসসুন্নাহ, গবেষক আলবানি বলেন, হাদিসটি বিশুদ্ধ তবে সনদ দুর্বল। কিন্তু এর অন্যান্য সাক্ষ্য রয়েছে। খিলাফাতু আলি: ৩২৩।
৫৯ বায়হাকি প্রণীত আসসুনানুল কুবরা: ৮/১৯৭; আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতু আলি : ৩২৪।
৬০ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১৫/৩২৫, ৩২৭।
৬১ আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতু আলি: ৩২৪।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 যুদ্ধের সূচনা

📄 যুদ্ধের সূচনা


খারেজিরা আলি রা.-এর দিকে অগ্রসর হলো। আলি রা. তাঁর অশ্বারোহী বাহিনী সম্মুখে রাখলেন। তাঁদের কাছে রাখলেন তিরন্দাজ বাহিনী। আর পদাতিক বাহিনী রাখলেন অশ্বারোহীদের পশ্চাতে। এরপর তিনি তাঁর সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেন, 'ওরা তোমাদের ওপর হামলা শুরু না করা পর্যন্ত তোমরা সংযত থাকবে।'
إلى الجنة الرواح الرواح لا حكم إلا الله ، বলতো বলতে কারও বিচারের অধিকার নেই। চলো চলো জান্নাতে চলো'
আলি রা.-এর বাহিনীর সম্মুখভাগে অশ্বারোহী দলের ওপর আক্রমণ চালিয়ে দিলো। এ আক্রমণ তাঁদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিলো। এমনকি এদের একদল মাইমানায় এবং অপর দল মাইসারায় চলে গেল। এবার তাদের মোকাবিলা করল তিরন্দাজ বাহিনী। এরা তাদের মুখের ওপর তির ছুঁড়তে লাগল। মাইমানাহ ও মাইসারাহ থেকে এদের সাহায্যে এগিয়ে আসে অশ্বারোহী দল। পদাতিক বাহিনীও বর্শা ও তরবারি নিয়ে দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ল। এভাবে ত্রিমুখী আক্রমণ চালিয়ে খারেজিদের সমূলে বিনাশ করে দেওয়া হয়। তাদের মৃতদেহগুলো অশ্বের খুরের নিচে পড়ে থাকে। যুদ্ধে খারেজিদের নেতৃবৃন্দ যথা: আবদুল্লাহ ইবনে ওহাব, হারকুস ইবনে জুহাইর, শুরাইহ ইবনে আওফা ও আবদুল্লাহ ইবনে সাখবুরাহ সুলামি নিহত হয়।৬৩
হজরত আবু আইয়ুব আনসারি রা. বলেন, যুদ্ধের সময় এক খারেজিকে আমি বর্শা মারি। বর্শা তার পেট ভেদ করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর দুশমন, দোজখের সুসংবাদ গ্রহণ করো।' সে বলল, 'অচিরেই তুমি জানতে পারবে; আমাদের মধ্যে দোজখে যাওয়ার অধিক যোগ্য কে?'৬৪
বহু খারেজি আত্মসমর্পণ করে এই যুদ্ধে। কেননা, তারা তাদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে ওহাবের মুখে এমন একটি কথা বলতে শুনেছে, যা দ্বারা তার পরিণাম সম্পর্কে সৃষ্টি হয়েছে ধুম্রজাল। তার ভেতর থেকে আসছিল মন্দ পরিণামের গন্ধ। সে এমন উক্তিটি ওই সময় করে যখন আলি রা. তাঁর তরবারি দ্বারা একজন খারেজিকে আঘাত করেছেন। সে বলল, 'খোশ আমদেদ! কতই-না উত্তম জান্নাতের সফর!' তার একথা শুনে আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব বলতে লাগল, 'জানা নেই জান্নাতের সফর নাকি জাহান্নামের। '৬৫
আবদুল্লাহ ইবনে ওহাবের এই উক্তি শুনে বনু সাআদের ফারওয়া ইবনে নাওফেল বলল, 'এই লোক ধোঁকায় পতিত হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, সে নিজেই সন্দেহে পতিত।' অতঃপর সে তার সঙ্গীদের নিয়ে ১ হাজার খারেজির সাথে আবু আইয়ুব আনসারি রা.-এর ঝাণ্ডার নিচে আশ্রয় নেয়। পরে পর্যায়ক্রমে আত্মসমর্পণ করে এখানে চলে আসে বহুসংখ্যক খারেজি।৬৬
চূড়ান্ত এই লড়াইয়ের মেয়াদ ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা-যা সংঘটিত হয় ৬৭ হিজরির সফর মাসে। সংক্ষিপ্ত এই সময়টাতে খারেজিদের বিশাল একটি অংশ ধূলিসাৎ হয়ে যায়। অন্যদিকে সহিহ মুসলিম-এর বর্ণনায় জায়দ ইবনে ওহাবের ভাষ্যমতে, আলি রা.-এর বাহিনীর মাত্র ২ জন লোক ৬৮ 'হাসান' সনদের আরেক বর্ণনামতে মোট ১২ বা ১৩ জন লোক শহিদ হন।৬৯ তৃতীয় আরেকটি বিশুদ্ধ বর্ণনায় এসেছে; আবু মাজলাজ বলেছেন, মুসলমান অর্থাৎ, আলি রা.-এর বাহিনীর মাত্র ৯ জন লোক শহিদ হয়। তিনি বলেন, এর সত্যতা যাচাই করতে চাইলে আবু বারজা'র কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করো। তিনি ওই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।৭০
এদিকে খারেজিদের ব্যাপারে বর্ণিত বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা প্রতীয়মান হয়- তাদের সকলেই নিহত হয়।” তবে মাসউদির অভিমত, খুবই নগণ্যসংখ্যক লোক; যাদের পরিমাণ ১০-এর চেয়ে কম-বেঁচে যেতে সক্ষম হয়। করুণ অপদস্থতার মুখে তারা পলায়ন করতে বাধ্য হয়।৭২

টিকাঃ
৬২ মুহাম্মাদ কিনান প্রণীত তারিখুল খিলাফাতির রাশিদা : ৪২৫, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া হতে ঈষৎ সংক্ষেপিত।
৬৩ মুহাম্মাদ কিনান প্রণীত তারিখুল খিলাফাতির রাশিদা: ৪২৫।
৬৪ মুহাম্মাদ কিনান প্রণীত তারিখুল খিলাফাতির রাশিদা: ৪২৫।
৬৫ আল কামিল-আখবারুল খাওয়ারিজ: ২১; আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতু আলি: ৩১৫।
৬৬ আল কামিল-আখবারুল খাওয়ারিজ: ২১।
৬৭ আনসাবুল আশরাফ: ২/৬৩ [সনদে একজন অজ্ঞাত রাবি রয়েছেন]।
৬৮ সহিহ মুসলিম: ২/৭৪৮।
৬৯ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ : ৫/৩১১; তারিখে খলিফা : ১৯৭ [সনদ হাসান]।
৭০ আল মারিফাতু ওয়াত তারিখ: ৩/৩১৫; তারিখে বাগদাদ ১/১৮২।
৭১ আল কামিল- আখবারুল খাওয়ারিজ ৩৩৮।
৭২ তারিখে খলিফা: ১৯৮; খিলাফাতু আলি: ৩২৯।

📘 খারেজী উৎপত্তি চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ > 📄 স্তনের বোঁটায় ন্যায় মাংসপেশী ও বেঁটে হাতবিশিষ্ট লোক!

📄 স্তনের বোঁটায় ন্যায় মাংসপেশী ও বেঁটে হাতবিশিষ্ট লোক!


স্তনের বোটার ন্যায় মাংসপেশীবিশিষ্ট লোকটি কে ছিল? তার ব্যক্তিত্বের নির্ধারণে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। তম্মধ্যে কিছু বর্ণনার সনদ দুর্বল, কিছু বর্ণনার সনদ শক্তিশালী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসে স্তনের বোটার ন্যায় মাংসপেশীবিশিষ্ট লোকের কয়েকটি আকৃতির কথা এসেছে। যেমন, সে ছিল কালো চেহারাবিশিষ্ট।৭৩
আরেক বর্ণনামতে, সে ছিল হাবশি। হাত বেঁটে। খুবই ক্ষুদ্রাকৃতির; যেন কাঁধ হাতে বাহু পর্যন্ত তার দৈর্ঘ্য। অথবা কনুইয়ের নিচে হাতের আর অংশ ছিল না এবং বাহুর ডগা; অর্থাৎ, শেষ অংশ স্তনের বোঁটার মতো। তার ওপর ছিল সাদা পশম। বাহুও তেমনই ঢিলেঢালা, থলথলে ও গোশতে ভরা; যেন সেখানে হাড্ডির লেশমাত্র নেই। তার কোনো স্থিরতা ছিল না। এদিক-ওদিক হেলেদুলে থাকত। হাতের ব্যাপারে যে তিনটি শব্দ এসেছে, সবগুলোর অর্থ বেঁটে হাতবিশিষ্ট।৭৪
উপরোক্ত আকৃতিবিশিষ্ট লোকটির নাম কী? এ ব্যাপারে যারা হারকুস (সোয়াদ দ্বারা) ইবনে জুহাইর আস সাদির কথা বলেছে, তাদের ধারণা ভুল।৭৫ কারণ, হারকুস ছিল একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি। ইসলামি বিজয়- অভিযানে তার কৃতিত্ব রয়েছে। সে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অংশ নেয়। জামালে সুগরা অভিযানের পর যেখানে জুবাইর ও তালহা রা. বসরায় উসমান হত্যাকারীদের হত্যা করেছিলেন, এই লোক তখন ময়দান ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই হারকুসই খারেজিদের গুটিকয়েক নেতাদের একজন হিসেবে গণ্য হয়।৭৬ হ্যাঁ, এটুকু বলা যেতে পারে যে, এক বর্ণনায় তার নাম এসেছে হারকুস (সিন দ্বারা)। তার জন্ম সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য জানা যায় না। এক বর্ণনায় তার পিতৃত্বের পরিচয় এসেছে 'মালেক'। তার বিবরণ হচ্ছে, আলি রা.-এর নির্দেশে লড়াই সমাপ্তির পর তাকে সন্ধান করে আলি রা.-এর কাছে নিয়ে আসা হয়। তখন তিনি বলেছেন, 'আল্লাহু আকবার! তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার পিতার নাম বলতে পারো?' লোকজন বলতে লাগল, 'তার নাম "মালেক”।' আলি রা. জিজ্ঞেস করলেন, 'সে কার ছেলে?' কেউ তার পিতার নাম বলতে পারল না।৭৭
ইতিহাসবিদ তাবারি রাহ. বিশুদ্ধ সূত্রে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি লিখেছেন, স্তনের বোটার মতো মাংসপেশীবিশিষ্ট লোকটির নাম নাফে। অনুরূপ বর্ণনা মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ ও সুনানে আবি দাউদেও এসেছে। কিন্তু উভয়টির সনদ অভিন্ন। সুতরাং তিনটি উৎসে একই বর্ণনা একই সনদে পাওয়া যাচ্ছে।৭৮

টিকাঃ
৭৩ মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক: ১০/১৪৬।
৭৪ আননিহায়া ফি গারিবিল হাদিস: ১/১২, ১৩; ফাতহুল বারি: ১২/২৯৪, ২৯৫।
৭৫ আল মিলাল ওয়ান নিহাল: ১/১১৫।
৭৬ ফাতহুল বারি: ১২/২৯২; আল ইসাবাহ: ১৫/১৩৯।
৭৭ আল ফাতহুর রাব্বানি আলা মুসনাদিল ইমাম আহমাদ: ২৩/১১৫ [সনদ হাসান]; আল বিদায়া ওয়াননিহায়া: ৭/২৯৪, ২৯৫।
৭৮ আবদুল হামিদ প্রণীত খিলাফাতে আলি ইবনে আবি তালিব : ৩৩৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00