📄 খারেজিদের পলায়ন এবং ইবনে আব্বাস রা.-এর মুনাজারা-বিতর্ক
হজরত আলি যখন তাঁর বাহিনীর সাথে সিফফিন হতে কুফা ফিরে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই খারেজিরা আলি রা.-এর বাহিনীর বহু লোক নিয়ে তাঁর থেকে পৃথক হয়ে যায়। তাদের সংখ্যা কতেক বর্ণনামতে ১০ হাজারের কিছু বেশি।৩৪ কিছু কিছু বর্ণনা তাদের সংখ্যা ১২ হাজার বলে উল্লেখ করেছে।* আরেক বর্ণনামতে তাদের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার।৩৫ কেউ কেউ ১৪ হাজার বলেও মত পোষণ করেছেন।৩৬ তদ্রূপ কোনো কোনো বর্ণনায় এই সংখ্যা ২০ হাজারও বলা হয়েছে। তবে এই বর্ণনাটি সনদবিহীন।৩৭
যাইহোক, এসব লোক কুফা পৌঁছার পূর্বে আলি রা.-এর বাহিনী থেকে কয়েক স্থানে পৃথক হয়। বাহিনী থেকে এই লোকদের চলে যাওয়া হজরত আলি রা.-এর জন্য বেশ দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবুও তিনি তাঁর অনুগত অবশিষ্ট বাহিনী নিয়ে চললেন এবং কুফা পৌঁছে গেলেন। সেখানে পৌঁছার পর তিনি সংবাদ পেলেন—খারেজিরা একটি সংগঠিত দল গঠন করেছে। তারা নামাজের জন্য একজন আমির এবং যুদ্ধের জন্য আরেকজন আমির নির্ধারণ করেছে। তারা শিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমনের দাবি করছে এবং আল্লাহর জন্য বায়আত করছে। এই সংবাদ পেয়ে আলি রা. আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। কেননা, এটা মুসলিম জামাত থেকে পৃথক হয়ে যাবার লক্ষণ। তারা যত অন্যায়ই করুক—আলি রা. মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন এরা যেন মুসলিম বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এই লক্ষ্যে তিনি খারেজিদের সঙ্গে মুনাজারা বা বিতর্ক করার জন্য হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-কে তাদের কাছে পাঠান।
আসুন, স্বয়ং ইবনে আব্বাস রা.-এর মুখে বিস্তারিত শুনি। তিনি বলেন, আমি তাদের কাছে চললাম। ইয়ামেনের তৈরি একটি সুন্দর জামা পরিধান করলাম। মাথা আঁচড়ালাম। ঠিক দুপুরের সময় তাদের কাছে পৌঁছলাম। তখন তারা একটি ঘরে সমবেত। উল্লেখ্য, ইবনে আব্বাস রা. ছিলেন একজন সুদর্শন উচ্চকণ্ঠী ব্যক্তি। তিনি বলেন, তারা আমাকে দেখে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে বলল, 'হে ইবনে আব্বাস, এই জামাটি কেমন?' আমি বললাম, 'এই জামার কারণে আমাকে দোষী ভেব না। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উত্তম হতে উত্তম জামা পরিধান করতে দেখেছি। কুরআনে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে-
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّذِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِي لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ
"আপনি বলুন, আল্লাহর সাজ-সজ্জা, যা তিনি বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র খাদ্রবস্তুসমূহকে কে হারাম করেছে? আপনি বলুন, এসব নেয়ামত আসলে পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্যে এবং কেয়ামতের দিন খাঁটিভাবে তাদেরই জন্য। এমনিভাবে আমি আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি তাদের জন্য; যারা বুঝে।" -সুরা আরাফ: আয়াত ৩২।
তারা বলল, 'ইবনে আব্বাস, আপনি কেন এসেছেন?' আমি বললাম, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই, তাঁর জামাতা এবং তাঁর ওপর প্রথম পর্যায়ে ইমান পোষণকারী; অর্থাৎ, আলির প্রতি এমন চরম মনোভাব পোষণ করছেন কেন? অথচ তাঁদের সামনে কুরআন অবতীর্ণ হতো। আপনাদের চেয়ে তাঁরা কুরআনের অর্থ ও মর্ম ভালো বুঝেন। আপনাদের মাঝে তো এমন ব্যক্তি নেই। আমি আপনাদের ও তাঁর চিন্তাধারার সাথে পরিচিত হতে এসেছি।' একথা শুনে কিছু লোক পৃথক হয়ে আমার কাছে এলো। আমি বললাম, 'রাসুলের সাহাবা এবং আলি রা.-এর সাথে আপনাদের বিরুদ্ধবাদী আচরণের হেতু কী?' তারা বলল, 'আমরা তার তিনটি কাজের বদলা নিতে চাই।' আমি বললাম, 'সে তিনটি কাজ কী কী?' তারা বলল:
১. 'সিফফিনের যুদ্ধক্ষেত্রে আবু মুসা আশআরি ও আমর ইবনুল আসকে সালিশ নিযুক্ত করে তিনি আল্লাহর দীনের ব্যাপারে মানুষকে বিচারক নিযুক্ত করেছেন।
২. আয়েশা ও মুআবিয়ার সাথে তিনি যুদ্ধ করেছেন; কিন্তু তাদের ধন-সম্পদ গনিমত হিসেবে এবং যুদ্ধবন্দিদেরকে দাস-দাসী হিসেবে গ্রহণ করেননি।
৩. মুসলমানরা তার হাতে বায়আত গ্রহণ করে তাকে আমির হিসেবে মেনে নেওয়া সত্ত্বেও তিনি "আমিরুল মুমিনিন” উপাধি পরিহার করেছেন।'
জবাবে ইবনে আব্বাস বললেন, 'যদি আমি আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিস থেকে এমন কিছু কথা আপনাদের সামনে পেশ করতে পারি; যা আপনারা অস্বীকার করতে পারেন না, তাহলে আপনারা যে বিশ্বাসের ওপর আছেন তা থেকে প্রত্যাবর্তন করবেন কি?'
তারা সম্মতিসূচক জবাব দিলে আমি বললাম, 'আপনাদের অভিযোগ; তিনি দীনের ব্যাপারে মানুষকে বিচারক নিযুক্ত করে অপরাধ করেছেন। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنتُمْ حُرُمٌ وَمَن قَتَلَهُ مِنكُم مُتعَمِّدًا فَجَزَاء مِثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِّنكُمْ هَدُيَّا بَالِغَ الْكَعْبَةِ
“হে ইমানদারগণ, তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকার করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি স্বেচ্ছায় কোনো কিছু শিকার করে, তাহলে তোমাদের অন্তর্গত দুইজন সুবিচারক সে সম্পর্কে যে আদেশ করে, সে অনুযায়ী অনুরূপ একটি পশু বিনিময় হিসেবে কাবায় উপস্থিত করবে।” -সুরা মায়েদা : আয়াত ৯৫।
আল্লাহর নামে আমি শপথ করে বলছি, চার দিরহাম মূল্যের একটি নিহত খরগোশের ব্যাপারে বিচারক নিয়োগ করা থেকে মানুষের রক্ত ও জীবন রক্ষা এবং তাদের পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ মীমাংসার উদ্দেশ্যে মানুষকে বিচারক নিয়োগ করা অধিক যুক্তিসংগত নয় কি?
আরও শোনো, স্ত্রী ও তার স্বামীর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ﴿وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا ﴾
"যদি তাদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হওয়ার মতো পরিস্থিতিরই আশঙ্কা করো, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত করবে। তারা উভয়ের মীমাংসা চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসা ও মিলমিশের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছু সম্পর্কে অবহিত।" -সুরা নিসা আয়াত ৩৫।
আপনাদেরকে আল্লাহর নামে আমি শপথ করে বলছি, মুসলমানদের মাঝে সমঝোতা এবং পারস্পরিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ রোধে বিচারক নির্ধারণ করা উত্তম নাকি মহিলার লজ্জাস্থানের ক্ষেত্রে বিচারক নির্ধারণ করা উত্তম?'
তারা বলল, 'হ্যাঁ, মানুষের রক্তের নিরাপত্তা ও তাদের পারস্পরিক বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য বিচারক নিয়োগ অধিক সংগত।' ইবনে আব্বাস বললেন, 'আমরা তাহলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম?' তারা বলল, 'হ্যাঁ।'
ইবনে আব্বাস রা. বললেন, 'আপনারা বলছেন আলি যুদ্ধ করেছেন আয়েশা ও মুআবিয়ার বিরুদ্ধে; কিন্তু তাদের বন্দি করে দাস-দাসী বানাননি। আপনারা কি চান আপনাদের মা আয়েশাকে দাসী বানানো হোক এবং অন্যান্য দাসীদের সাথে যেমন আচরণ করা হয় তাঁর সাথেও তেমন করা হোক? উত্তরে যদি "হ্যাঁ" বলেন, তাহলে আপনারা কাফের হয়ে যাবেন। (কারণ, শরিয়তে দাসীর সাথে স্ত্রীর ন্যায় আচরণ বৈধ।) আর যদি বলেন, আয়েশা আমাদের "মা" নন, তাহলেও আপনারা কাফের হবেন। কারণ, আল্লাহ বলছেন,
﴿ النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ ﴾
“নবি মুমিনদের ওপর তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিকতর স্নেহশীল এবং তাঁর সহধর্মিনীগণ তাদের জননী।” -সূরা আহজাব : আয়াত ৩৬।
এখন এ দুটি জবাবের যেকোনো একটি আপনারা বেছে নিন।'
তারপর আমি বললাম, 'আমরা তাহলে এ ব্যাপারেও সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম'? তারা বলল, 'হ্যাঁ'।
সবশেষে আমি বললাম, 'আলি “আমিরুল মুমিনিন” উপাধিটি পরিহার করেছেন-আপনারা এ অভিযোগ তুলেছেন। অথচ হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মক্কার মুশরিকদের মধ্যে যে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়, তাতে "মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ" বাক্যটি লেখা হলে কুরাইশরা বলেছিল-আমরা যদি বিশ্বাসই করতাম আপনি আল্লাহর রাসুল, তাহলে আমরা আপনার কাবা শরিফে পৌঁছার পথে প্রতিবন্ধক হতাম না বা আপনার সাথে সংঘর্ষেও লিপ্ত হতাম না। আপনি বরং এ বাক্যটির পরিবর্তে "মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহ” কথাটি লিখুন। সেদিন কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা বলতে বলতে তাদের দাবি মেনে নিয়েছিলেন-"আল্লাহর কসম! আমি সুনিশ্চিতভাবে বলছি আমি আল্লাহর রাসুল; তা তোমরা আমাকে যতই অস্বীকার করো না কেন।” আলি ঠিক একই কারণে "আমিরুল মুমিনিন" উপাধিটি পরিহার করেছেন। কারণ, মুআবিয়া যদি তাঁকে "আমিরুল মুমিনিন"" বলে স্বীকারই করে নিতেন, তাহলে তো কোনো বিরোধই থাকত না।'
এ কথার পর আমি বললাম, 'তাহলে আমরা এ ব্যাপারেও সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম?' তারা বলল, 'হ্যাঁ'।
হজরত আলির পক্ষত্যাগীদের সাথে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের এ জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় তারা তৃপ্ত হলো এবং তাঁর বলিষ্ঠ যুক্তিকে তারা অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিল। এ সাক্ষাৎকারের পর ২ হাজার লোক আবার আলির দলে প্রত্যাবর্তন করে এবং অবশিষ্ট লোক আলির শত্রুতায় হঠকারী সিদ্ধান্তে অটল থাকে। তারা যুদ্ধে করে নিজেদের ভ্রষ্ট মতবাদ নিয়ে। মুহাজির ও আনসারগণ তাদের হত্যা করেন।**
**ইবনে আব্বাস ও খারেজিদের মুনাজারা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ও উপদেশ**
১. বেদআতি ও কাফের-মুশরিক প্রতিপক্ষের সাথে বিতর্কের জন্য যোগ্য আলেম মনোনয়ন : আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. তাঁর চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-কে মুনাজারার জন্য মনোনীত করেন। তিনি ছিলেন 'উম্মতের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী' এবং কুরআনের ব্যাখ্যাকারক। তাঁকে মনোনয়নের কারণ হচ্ছে, প্রতিপক্ষ নিজেদের আকিদা প্রমাণে কুরআন থেকে দলিল দিয়ে থাকে। সুতরাং এই মুনাজারায় এমন একজন লোককে মনোনীত করা চাই, যে কুরআন ও তার মর্ম-উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত। নিঃসংকোচে বলা যায়- ইবনে আব্বাস রা. উক্ত মুনাজারায় বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। নিষ্ঠাপূর্ণ ও সহিষ্ণু মনোভাব, প্রতিপক্ষের সাথে কোমল আচরণ ও অবিচলতার সাথে তিনি তাদের সাথে বিতর্ক করেন। তাঁর ভেতর ছিল না আত্মম্ভরিতা ও যুদ্ধংদেহী দৃশ্য। তিনি উভয় পক্ষের কথা শুনেছেন উদার মনে। দৃঢ় প্রমাণের নিরিখে নিজের অভিমত ব্যক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।
২. বিতর্কের পূর্বে শর্তাবলিতে ঐকমত্য : যেভাবে আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি বিন আবি তালিব রা. এবং তাঁর প্রতিপক্ষ; অর্থাৎ, খারেজিরা এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছিলেন যে, আল্লাহর কিতাব ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহমতে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে, অনুরূপভাবে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-ও শর্ত জুড়ে দিয়ে বললেন, 'যদি আমি আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিস থেকে এমন কিছু কথা আপনাদের সামনে পেশ করতে পারি যা আপনারা অস্বীকার করতে পারেন না, তাহলে আপনারা যে বিশ্বাসের ওপর আছেন তা থেকে প্রত্যাবর্তন করবেন কি?' এই শর্ত থাকা সত্ত্বেও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. মুনাজারার শুরু করার পূর্বে পুনরায় একথা পুনরাবৃত্তি করে স্বীকারোক্তি নেন।
৩. প্রতিপক্ষের প্রমাণাদি সম্পর্কে অবগতি ও আত্মস্থকরণ : বিতর্ক শুরুর পূর্বে প্রতিপক্ষের প্রমাণাদি সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা রাখা চাই; যাতে উত্তরদানে সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকা যায়। আমাদের বিশ্বাস, আলি রা. মুনাজারার পূর্বে তাদের দলিল-প্রমাণ সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং তাঁর সাথিদেরকে কীভাবে জবাব দেওয়া হবে-সে সম্পর্কে বুঝিয়েছেন।
৪. প্রতিপক্ষের চিন্তাধারা পর্যায়ক্রমে খণ্ডন: প্রতিপক্ষের চিন্তাধারা পর্যায়ক্রমে একটি একটি করে খণ্ডন করা চাই; যাতে তাদের কোনো প্রমাণ অবশিষ্ট না থাকে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর কথোপকথনে আমরা দেখতে পাই-তিনি যখন একটি দলিলের জবাব সম্পন্ন করে যাচ্ছেন, তখন তাদের জিজ্ঞেস করছেন, 'আমি কি আমার প্রমাণ দ্বারা তোমাদের যুক্তি খণ্ডন করতে পারলাম?'
৫. বিতর্কের শুরুতে এমন ভূমিকা উপস্থাপন করা; যার ফলে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব হয়: আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. মুনাজারা শুরু করার পূর্বে বললেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই, তাঁর জামাতা এবং তাঁর ওপর প্রথম পর্যায়ে ইমান পোষণকারী ব্যক্তি; অর্থাৎ, আলির প্রতি এমন চরম মনোভাব পোষণ করছেন কেন? অথচ তাঁদের সামনে কুরআন অবতীর্ণ হতো। আপনাদের চেয়ে তাঁরা কুরআনের অর্থ ও মর্ম ভালো বুঝেন। আপনাদের মাঝে তো এমন ব্যক্তি নেই।'৩৯
৬. মুনাজারার সময় প্রতিপক্ষের অভিমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন: প্রতিপক্ষের রায়কে সম্মান জানানো আবশ্যক; যাতে প্রত্যেকের কথা গভীরভাবে শোনা সম্ভব হয়। খারেজিদের সাথে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর বিতর্কের মাঝে খুব স্পষ্টভাবে আমরা তা দেখতে পাই।৪০
৭. মুনাজারার মাধ্যমে সহস্রাধিক খারেজির হকের পথে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ: সহস্রাধিক খারেজির ওপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ তাওফিক নসিব হয়। তারা প্রত্যাবর্তন করে সত্যের দিকে। ফলে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে ৪ হাজারেরও কম খারেজি অংশ নিতে পেরেছে। তাদের সত্যের পথে প্রত্যাবর্তনের পেছনে প্রথমত আল্লাহর তাওফিক মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। দ্বিতীয়ত ইবনে আব্বাস রা.-এর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও শক্তিশালী দলিলের আলোকে তাদের অনেকের সন্দেহ দূরীভূত হয়ে যায়। তিনি ওইসব আয়াতের তাফসিরের আলোকে জবাব দেন, যা ছিল তাদের মতে বিশুদ্ধ। কুরআনের মর্ম স্পষ্টকারী সুন্নাত দ্বারা খারেজিদের দলিলাদির অসারতা তুলে ধরেছেন তিনি।৪১
৮. ইবনে আব্বাস রা.-এর উক্তি-'তাদের (সাহাবাদের) কোনো সদস্য তো তোমাদের মাঝে নেই': এটা ইবনে আব্বাস রা.-এর স্পষ্ট বক্তব্য। তিনি বলেছেন, 'খারেজিদের মধ্যে তো রাসুলের কোনো সাহাবি নেই।' ইবনে আব্বাস রা.-এর এ কথায় খারেজিদের কেউ আপত্তি তুলতে পারেনি। এই বর্ণনাটি বিশুদ্ধ ও প্রমাণিত। আমার জানামতে আহলে সুন্নাত আলেমগণের কেউ এমন বলেননি যে, খারেজিদের মধ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কতেক সাহাবি ছিলেন। সেখানে সাহাবি ছিলেন—এটা খারেজিদের বানোয়াট উক্তি। এর কোনো সঠিক তথ্য তাদের কাছে নেই।
৯. মুনাজারাকালে ঐকমত্যে পৌঁছা পয়েন্ট হিসেব রাখা : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর কথামালায় এমনটিও দেখা যায় যে, তিনি বললেন, 'যদি আমি আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিস থেকে এমন কিছু কথা আপনাদের সামনে পেশ করতে পারি, যা আপনারা অস্বীকার করতে পারেন না; তাহলে আপনারা যে বিশ্বাসের ওপর আছেন তা থেকে কি প্রত্যাবর্তন করবেন?' জবাবে তারা বলল, 'হ্যাঁ'। এই কথোপকথনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। সেটা হলো, বিতর্কে বিবদমান উভয় পক্ষ ঐকমত্যসম্পন্ন পয়েন্টে রাজি হওয়া আবশ্যক; যাতে করে মুনাজারা শেষে সঠিক ফলাফলে পৌঁছা সহজতর হয়।
টিকাঃ
৩৪ তারিখে বাগদাদ: ১/১৬০।
* আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া ৭/২৮০, ২৮১ [সনদ বিশুদ্ধ]; মাজমাউজ জাওয়ায়িদ: ৬/২৩৫।
৩৫ মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক: ১০/১৫৭, ১৬০ [সনদ হাসান]।
৩৬ তারিখে খলিফা: ১৯২।
৩৭ তারিখে খলিফা: ১৯২।
** নাসায়ি প্রণীত ও আহমাদ আল বালুশি সম্পাদিত খাসায়িসু আমিরিল মুমিনিন আলি বিন আবি তালিব: ২০০ (সনদ হাসান)।
৩৯ খাসায়িসু আমিরিল মুমিনিন আলি বিন আবি তালিব: ১৯৭ [সনদ হাসান]।
৪০ মানহাজু আলি বিন আবি তালিব ফিদ দাওয়াতি ইলাল্লাহ: ৩৯৯।
৪১ আবদুল হামিদ আলী প্রণীত খিলাফাতু আলি: ৩০৭।
📄 মুনাজারার জন্য আলি রা.-এর বের হওয়া এবং কুফায় তাদের সাথে তাঁর আচরণ, পুনরায় তাদের দলত্যাগ
হজরত ইবনে আব্বাস রা.-এর মুনাজারার ফলে খারেজিদের মধ্য হতে ২ হাজার লোক ফিরে আসে। এরপর আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. নিজেই খারেজিদের কাছে যান এবং তাদের সাথে কথা বলেন। যার ফলে তারা কুফায় ফিরে আসে। কিন্তু এই ঐক্য বেশি সময় টেকেনি। তার কারণ হচ্ছে, কথোপকথনের সময় তারা আলি রা. সম্পর্কে ভেবে নিয়েছিল যে, তিনি সালিশি ঘটনা থেকে রুজু করেছেন; অর্থাৎ, ফিরে এসেছেন এবং নিজ ভুলের জন্য তওবা করেছেন। অথচ এসবই ছিল তাদের খামখেয়ালি। এই খেয়ালিপনা তারা মানুষের মাঝে প্রচারও করছিল। এরই প্রেক্ষিতে আশআস ইবনে কায়স আল কিন্দি আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর কাছে এসে বলতে লাগল-মানুষ পরস্পর বলাবলি করছে, তাদের কারণে আপনি কুফরি থেকে ফিরে এসেছেন! একথা শুনে আলি রা. জুমআর দিন খুতবা দিলেন। হামদ ও সালাতের পর তিনি খারেজি মতাদর্শী লোকদের সাথে তাঁর মতানৈক্যের স্বরূপ উন্মোচন করেন।৪২
এক বর্ণনায় এসেছে; এমন সময়ে এক লোক এসে বলল, لا حكم إلا الله 'আল্লাহ ছাড়া কারও হুকুম নেই'। অতঃপর মসজিদের বিভিন্ন অংশে তারা لا حكم إلا الله স্লোগান দিতে দাঁড়াতে আরম্ভ করে। তিনি হাত দ্বারা তাদের বসতে বলেন। তিনি আরও বলেন, لا حكم إلا الله ঠিক আছে। কিন্তু এর দ্বারা তোমাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। আমি তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছি।৪৩
এভাবে তিনি মিম্বর থেকেই হাতের ইশারায় তাদের বসে যেতে আহ্বান জানান। সে সময় এক ব্যক্তি তার কানে দুই আঙুল ঢুকিয়ে কুরআনের এই আয়াত পড়তে লাগল-
لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ)
'যদি আল্লাহর শরিক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবেন।' -সুরা জুমার: আয়াত ৬৫।
আমিরুল মুমিনিন তার জবাব দিলেন এই আয়াতের মাধ্যমে-
فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَا يَسْتَخِفَّنَّكَ الَّذِينَ لَا يُوقِنُونَ)
'অতএব, আপনি সবর করুন। আল্লাহর ওয়াদা সত্য। যারা বিশ্বাসী নয়, তারা যেন আপনাকে বিচলিত করতে না পারে।'- সুরা রুম: আয়াত ৬০।
এরপর আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. চরমপন্থী এই দলটি সম্পর্কে নিজের ন্যায়নিষ্ঠ ও প্রজ্ঞাদীপ্ত নীতির ঘোষণা দিলেন। তিনি বললেন, 'যতক্ষণ তোমরা আমাদের সঙ্গে থাকবে, ততক্ষণ তোমরা তিনটি অধিকার পাবে:
* যতক্ষণ তোমরা আল্লাহর জিকর করবে, ততক্ষণ আমরা তোমাদের মসজিদে নামাজ পড়তে বাধা দেবো না।
* যতক্ষণ তোমরা আমাদের সঙ্গে একসাথে যুদ্ধ করবে, ততক্ষণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জনে তোমাদের বাধা থাকবে না।
* যতক্ষণ তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করবে না, ততক্ষণ আমরা তোমাদের বিরুদ্ধ লড়াই করব না।'**
যতক্ষণ পর্যন্ত ওরা খলিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করবে বা সাধারণ মুসলমানদের দল থেকে বেরিয়ে না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. তাদেরকে উপরোক্ত তিনটি অধিকার দেন। পাশাপাশি ইসলামি আকিদার ব্যাপারে তিনি তাদের স্বতন্ত্র চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে হস্তক্ষেপ করেননি।
তাদেরকে ইসলাম হতে বের করে দেননি; বরং মতবিরোধের অধিকার প্রদান করেন। তার মানে এই নয় যে, এই মতবিরোধ দলান্ধতা ও অস্ত্রবাজির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তিনি তাদের পিছু ধাওয়া করেননি। তাদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরও নিয়োগ দেননি। তাদের বাকস্বাধীনতায় কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করেননি। তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন তারা যেন এই ধোঁকা থেকে মুক্তি পায়। সত্যের উন্মেষ যেন তাদের হাতছাড়া না হয়।
একবার তিনি এক ঘোষণাকারীর মাধ্যমে নির্দেশ জারি করলেন, আমিরুল মুমিনিনের দরবারে যেন কেবল ওইসব লোক প্রবেশ করে, যারা পবিত্র কুরআন বহন করে। (হাফেজে কুরআন)।
আমিরুল মুমিনিনের দরবার হাফেজদের সমাগমে পরিপূর্ণ হয়ে গেলে তিনি পবিত্র কুরআনের একটি কপি এনে সবার সম্মুখে রাখলেন। এরপর তিনি হাতের আঙুল দ্বারা পবিত্র কুরআনের ওপর জোরে টোকা মেরে বললেন, 'ওহে কুরআন! তুমি লোকদেরকে তোমার কথা জানাও।'
উপস্থিত লোকজন আলিকে বলল, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি পবিত্র কুরআনের কপির কাছে এ কী জিজ্ঞেস করছেন? ও তো কাগজ আর কালি ছাড়া কিছু নয়। আমরা তো ওর মধ্যে যা দেখি তা নিয়ে কথা বলছি। তাহলে এরূপ করার উদ্দেশ্য কী?' তিনি জবাবে বললেন, 'তোমাদের ওইসব সাথি; যারা আমার থেকে পৃথক হয়ে অবস্থান নিয়েছে, তাদের ও আমার মাঝে মহান আল্লাহর কিতাব রয়েছে। মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে একজন পুরুষ ও একজন নারীর ব্যাপারে বলেছেন,
﴿ وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِن يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ bَيْنَهُمَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا ﴾
"যদি তাদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হওয়ার মতো পরিস্থিতিরই আশঙ্কা করো, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত করবে। তারা উভয়ের মীমাংসা চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসা ও মিলমিশের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছু সম্পর্কে অবহিত।" -সূরা নিসা আয়াত ৩৫।
সেক্ষেত্রে হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমস্ত উম্মতের রক্ত ও সম্মান একজন নারী ও একজন পুরুষের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তারা আমার ওপর আরও অভিযোগ এনেছে; আমি মুআবিয়াকে যে চুক্তিপত্র লিখে দিয়েছি, তাতে লিখেছি- "আলি বিন আবি তালিব"। এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য হলো, হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহাইল ইবনে আমর এলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নিজ কওমের সাথে সন্ধিপত্র লেখেন, তখন আমরা তথায় উপস্থিত ছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে লিখলেন بسم الله الرحمن الرحيم। সুহাইল আপত্তি জানিয়ে বলল, “আমি بسم الله الرحمن الرحيم রাজি নই”। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "তাহলে কীভাবে লিখব”? সুহাইল বলল, “লিখবেন باسمك اللهم"। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "তা-ই লেখো”। সুহাইল সেভাবেই লেখল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “এখন লেখো—এই সন্ধিপত্র; যা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সম্পাদন করলেন"। সুহাইল বলল, “আমি যদি জানতাম আপনি আল্লাহর রাসুল, তাহলে তো আপনার সাথে আমার কোনো বিরোধই থাকত না"। অবশেষে লেখা হলো—"এই সন্ধিপত্র; যা আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মাদ কুরাইশদের সাথে সম্পাদন করল"। মহান আল্লাহ আপন কিতাবে ইরশাদ করেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا "যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।" -সুরা আহজাব : আয়াত ২১/৪৫
হজরত আলি রা.-এর এই বক্তব্য শোনার পর খারেজিরা নিশ্চিত হয়ে গেল আলি রা. আবু মুসা আশআরি রা.-কে সালিশ; অর্থাৎ, ফয়সালাকারী (নিজের প্রতিনিধি) মেনে নেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। খারেজিরা স্বীয় দৃষ্টিভঙ্গি; অর্থাৎ, 'সালিশ অস্বীকারের' বিষয়টি পুনরায় উপস্থাপন করল। কিন্তু আলি রা. তা অস্বীকার করলেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন, 'এখন আমাদের এই পদক্ষেপ হবে প্রতিশ্রুতিভঙ্গ ও গাদ্দারির নামান্তর। আমাদের এবং তাদের মাঝে চুক্তিনামা লেখা হয়ে গেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللَّهِ إِذَا عَاهَدتُّمْ وَلَا تَنقُضُوا الأَيْمَانَ بَعْدَ تَوْكِيدِهَا وَقَدْ جَعَلْتُمُ اللَّهَ عَلَيْكُمْ كَفِيلًا إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ
“আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করার পর সে অঙ্গীকার পূর্ণ করো এবং পাকাপাকি কসম করার পর তা ভঙ্গ করো না; অথচ তোমরা আল্লাহকে জামিন করেছ। তোমরা যা করো আল্লাহ তা জানেন।"" -সুরা নাহল: আয়াত ৯১।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে খারেজিরা হজরত আলি রা.-এর সঙ্গ ছেড়ে দিলো। তারা আমির মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নিল নিজেদের মাঝে। এ লক্ষ্যে সকল খারেজি সমবেত হয় আবদুল্লাহ ইবনে ওহাব রাসিবির ঘরে। ইবনে ওহাব তাদের উদ্দেশে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দেয়। দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত হতে, আখেরাত ও জান্নাতের প্রতি লালায়িত হতে এবং ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ করতে তাদেরকে উৎসাহিত করে। এরপর সে তাদেরকে বলে—'সালিশের যে ব্যবস্থা করা হয়েছে তা সুস্পষ্ট জুলুম। আমরা এ সালিশ মানি না। যে জনপদের অধিবাসীরা জালিম, সে জনপদ থেকে আমাদের ভাইদের বের করে পার্শ্ববর্তী এই পাহাড়ের কোনো ঘাঁটিতে কিংবা কোনো শহরে নিয়ে চল।'
এরপর হারকুস ইবনে জুহাইর ভাষণ দিতে দাঁড়ায়। মহান আল্লাহর প্রশংসা করার পর বলে-'এই নশ্বর দুনিয়ার সম্পদ খুবই কম। শীঘ্রই এখান থেকে সবাইকে চলে যেতে হবে। এখানকার সৌন্দর্য ও চাকচিক্য যেন তোমাদেরকে আকর্ষণ করতে না পারে। সত্যের দাবি ও জুলুমের উচ্ছেদ কামনা থেকে কোনো কিছুই যেন তোমাদের ফিরিয়ে না রাখে।
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا وَالَّذِينَ هُم مُّحْسِنُونَ﴾
"নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা পরহেজগার এবং যারা সৎকর্ম করে।"" -সূরা নাহল: আয়াত ১২৮।
এরপর হামজা ইবনে সিনান আসাদি উঠে বলল, 'ভাইসব, তোমরা যা চিন্তা ও উপলব্ধি করেছ এটাই আসল চিন্তা-উপলব্ধি। আর তোমরা যা আলোচনা করছ, এটাই সত্য-সঠিক। এখন এ কাজ পরিচালনার জন্য তোমাদের মধ্য হতে একজনকে আমির নিযুক্ত করো। তোমাদের একটা স্থান দরকার। একটা পতাকার দরকার; যাকে কেন্দ্র করে তোমরা পরিচালিত হবে এবং যার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে।'
সিনানের ঘোষণামতে তারা তাদের নেতা জাইদ ইবনে হাসান তায়ি'র নিকট আমির পদ গ্রহণ করার প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু এ পদ গ্রহণ করতে সে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর পর্যায়ক্রমে হারকুস ইবনে জুহাইর, হামজা ইবনে সিনান ও শুরাইহ ইবনে আবু আওফা আবাসির নিকট আমিরের পদ গ্রহণ করার প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু সকলেই এ দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে। অবশেষে তারা আবদুল্লাহ ইবনে ওহাব রাসিবির কাছে প্রস্তাব দিলে সে গ্রহণ করে এবং বলে, 'আল্লাহর কসম! দুনিয়ার লোভে অমি এ পদ গ্রহণ করছি না। আর মৃত্যু থেকে পালাবার ভয়ে ছাড়তেও পারছি না।'৪৬
এরপর তাদের দ্বিতীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় জায়দ ইবনে হাসান তায়ি সানাসির ঘরে। সেখানে ইবনে ওহাব তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধে তৎপর হতে উদ্বুদ্ধ করে। এ উপলক্ষে সে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত পড়ে শোনায়। যথা:
﴿يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ﴾
'হে দাউদ, আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব, তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়সঙ্গতভাবে রাজত্ব করো এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না। তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি; এ কারণে যে, তারা হিসাবদিবসকে ভুলে যায়।'-সুরা সাদ: আয়াত ২৬।
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ) 'যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের।' -সূরা মায়েদা: আয়াত ৪৪। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ) 'যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই জালেম।' -সূরা মায়েদা : আয়াত ৪৫। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ﴾ 'যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই পাপাচারী।' -সূরা মায়েদা : আয়াত ৪৭।
এরপর সে বলল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমাদের একই কিবলার অনুসারী; যাদের কাছে আমরা দাওয়াত পৌঁছাতে চাই, তারা নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে চলছে। কিতাবের বিধানকে উপেক্ষা করছে এবং কথায় ও কাজে জুলুমের আশ্রয় নিয়েছে। এদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুমিনদের ওপর ফরজ।'
এ ভাষণ শুনে আবদুল্লাহ ইবনে শাজারাহ আসসুলামি নামের জনৈক খারেজি ক্রন্দন করতে থাকে। এরপর সে তাদেরকে যুদ্ধে বেরিয়ে পড়ার জন্য উত্তেজনাকর ভাষণ দেয়। ভাষণে বলে, 'আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমরা ওদের মুখে ও কপালে তলোয়ার মারো। যদি তোমরা আল্লাহর ইচ্ছার বিজয় লাভ করো, তাহলে তিনি তোমাদেরকে তার হুকুম পালনকারীদের সমান সওয়াব দেবেন। আর যদি তোমরা মারা যাও, তাহলে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের দিকে যাওয়ার চেয়ে অধিক ফজিলতের কাজ আর কী থাকতে পারে? '**
হাফেজ ইবনে কাসির রাহ. খারেজিদের মন-মস্তিস্কে শয়তানের উপরোক্ত প্ররোচনার বিষয় আলোকপাতের পর লিখেন, খারেজিরা ছিল বনি আদমের মধ্যে এক ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। পবিত্র সেই সত্তা, যিনি তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে তাঁর সৃষ্টিকে বিভিন্ন রূপ দান করেছেন এবং তাঁর মহাশক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
জনৈক প্রাচীন মনীষী কতই-না ভালো উক্তি করেছেন। তিনি বলেছেন, পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে খারেজিদের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে-
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا أُولَئِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ وَلِقَائِهِ فَحَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَلَا نُقِيمُ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَزْنَا
'বলুন, আমি কি তোমাদেরকে সেসব লোকের সংবাদ দেবো, যারা কর্মের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। তারাই সে লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিবজীবনে বিভ্রান্ত হয়, অথচ তারা মনে করে—তারা সৎকর্ম করেছে। তারাই সে লোক, যারা তাদের পালনকর্তার নিদর্শনাবলি এবং তার সাথে সাক্ষাতের বিষয় অস্বীকার করে। ফলে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। সুতরাং কেয়ামতের দিন তাদের জন্য আমি কোনো গুরুত্ব স্থির করব না।' -সুরা কাহাফ : আয়াত ১০৫।
মোটকথা, খারেজিদের এ দলটি ভ্রান্তির ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত। কথায় ও কাজে তারা অত্যন্ত রুষ্ট ও রুক্ষ্ম। আলোচনা শেষে তারা ঐকমত্যে পৌঁছে যে, মুসলমানদের এ এলাকা ছেড়ে মাদায়েন শহরে চলে যাবে। তাদের যুক্তি-মাদায়েন শহর তারা দখল করে সেখানে নিরাপত্তা-দুর্গ তৈরি করবে। সেখান থেকে বসরা ও অন্যান্য স্থানে তাদের সম-আদর্শের যেসব লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাদেরকে এখানে জড়ো করবে।
এই পরিকল্পনা যখন প্রায় চূড়ান্ত তখন জায়দ ইবনে হাসান তায়ি বলল, 'তোমরা মাদায়েন দখল করতে পারবে না। সেখানে দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী আছে। তাদেরকে তোমরা কিছুতেই পর্যুদস্ত করতে পারবে না। তারা তোমাদের তাড়িয়ে দেবে। বরং আমার পরামর্শ হলো, তোমরা তোমাদের সকল সাথি-বন্ধুদের নিয়ে জাওখি পুলের কাছে সমবেত হতে বলো।' জায়দ আরও বলল, 'কুফা থেকে তোমরা দলবদ্ধভাবে বের হয়ো না; বরং একজন একজন করে বের হও; যাতে কেউ তোমাদের বিষয়টি বুঝতে না পারে।' এ পরামর্শ সকলের পছন্দ হয়।
তাই তারা বসরা ও অন্যান্য স্থানে বসবাসকারী তাদের অনুসারীদের নিকট পত্রসহ লোক পাঠাল; যেন তারা দ্রুত 'নাহরে' গিয়ে সমবেত হয়। শত্রুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ একক শক্তিতে পরিণত হওয়ার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর তারা পর্যায়ক্রমে একে একে বের হয়ে যায়। কেউ যাতে তাদের উদ্দেশ্য জানতে পেরে বাধা দিতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়।
নিজেদের পিতা-মাতা, মামা-খালাসহ সকল পর্যায়ের আত্মীয়দের পশ্চাতে ফেলে এই সুধারণা নিয়ে তারা পৃথক হয়ে যায় যে, এর দ্বারাই আসমান- জমিনের প্রতিপালক তাদের ওপর সন্তুষ্ট হবেন। বস্তুত এটা ছিল তাদের চরম মূর্খতা এবং ইলম ও জ্ঞানের স্বল্পতারই পবিচায়ক। ওরা বুঝতে পারেনি-এটা ছিল তাদের ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ। সকল কবিরা গোনাহের মধ্যে মারাত্মক কবিরা গোনাহ। মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। অভিশপ্ত শয়তানই তাদের নিকট এ জঘন্য কাজকে আকর্ষণীয় ভালো কাজ হিসেবে দেখায়। শয়তান যখন আসমান থেকে বিতাড়িত হয়, তখনই সে পিতা আদমের বিরুদ্ধে এবং তার পরে তাঁর সন্তানদের বিরুদ্ধে জীবনব্যাপী শত্রুতার সিদ্ধান্ত নেয়। মহান আল্লাহর নিকট আমরা শয়তানের ধোঁকা থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রার্থনা জানাই।
রওনা হয়ে আসা লোকদের একটি দল তাদের সন্তান ও ভাইদেরকে ভয়- ভীতি ও তিরস্কার করে ফিরিয়ে দেয়। তবে তাদের এক অংশ স্থির থেকে যায় আর কিছু অংশ পালিয়ে খারেজিদের সাথে মিলিত হয়ে চিরস্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অবিশষ্টরা ওই স্থানে চলে যায়।
বসরা ও অন্যান্য জায়গায় যাদের কাছে পত্র দেওয়া হয়েছিল তারা এদের কাছে চলে আসে। এভাবে তাদের সকল জনশক্তি নাহরাওয়ানে এসে একত্রিত হয়। এখানে তারা বিরাট শক্তি ও প্রতিরোধ-ক্ষমতা গড়ে তোলে।৪৮
এদিকে সালিশ যখন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারল না, তখন আলি রা. নাহরাওয়ানে সমবেত খারেজিদের নামে একটি চিঠি পাঠালেন। তিনি লিখলেন, 'সালিশ চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। ব্যাপারটি এখানেই শেষ। সুতরাং তোমরা পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসো এবং আমাদের সঙ্গে সিরিয়াবাসীর বিরুদ্ধে লড়াই করো।' কিন্তু খারেজিরা এই বলে তা প্রত্যাখ্যান করল যে, 'যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আপনার কুফরি স্বীকার না করবেন এবং সে ব্যাপারে তওবা না করবেন, ততক্ষণ আমরা ফিরে আসব না।' আলি রা. এ ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানালেন।৪৯
আরেক বর্ণনায় এসেছে, আলি রা.-এর চিঠি পেয়ে তারা জবাবে লিখল, 'আপনি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রাগ করেননি; বরং আপনার নিজের স্বার্থের জন্যে রাগ করেছেন। কাজেই আপনি যদি নিজেকে কাফের বলে স্বীকার করেন এবং সেজন্য তওবা করেন, তবে আমরা আপনার এ আহ্বান নিয়ে বিবেচনা করব। অন্যথায় আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ঘোষণা দিচ্ছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ চুক্তি ভঙ্গকারীদেরকে পছন্দ করেন না।'
আলি রা. তাদের চিঠি পাঠ করে তাদের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলেন। এখন তিনি সিরিয়ার বিরুদ্ধে মোকাবিলা করতে দৃঢ়-সংকল্প গ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, খারেজিদের পক্ষ থেকে আলি রা.-কে কাফের বলা এবং তাঁর কাছে তওবা চাওয়ার ঘোষণা ওইসব বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত নয়। তবুও এটা অবশ্য বলা যেতে পারে যে, এসব বর্ণনা আলি ও উসমান রা.-কে কাফের বলা এবং এর প্রেক্ষিতে অন্যান্য مسلمانوں দুর্দশায় নিক্ষেপ করা-সংক্রান্ত বর্ণনারই প্রতিধ্বনি বহন করে।৫০
টিকাঃ
৪২ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১৫/৩১২-৩১৩ (ইরাআতুল গালিল: ৮/১১৮ গ্রন্থে খায়খ আলবানি রাহ, বর্ণনাটি বিশুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন।। মারবিয়াতু আবি মিখনাফ ফি তারিখিত তাবারি: ৪৫২।
৪৩ মারবিয়াতু আবি মিখনাফ ফি তারিখিত তাবারি: ৪৫২।
** মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১৫/৩২৭-৩২৮; ইমাম শাফেয়ি প্রণীত আল উম: ৪/১৩৬; তারিখে তাবারি: ৫/৬৮৮ [সনদ জয়িফ। আলবানি রাহ. বলেন, এই সনদের অন্যান্য সাক্ষী ও অনুগামী রয়েছে। ইরাআতুল গালিল: ৮/১১৭]
৪৫ মুসনাদে আহমাদ: ২/৬৫৬ [আহমাদ শাকের বলেছেন, সনদ বিশুদ্ধ]।
৪৬ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৭/৩১২; তারিখে তাবারি : ৫/৬৮৯।
** আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৩১২।
৪৮ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৭/৩১২, ৩১৩।
৪৯ আনসাবুল আশরাফ: ২/৬৩ (বর্ণনাটির সনদ জয়িফ হলেও এর অন্যান্য অনুগামী সাক্ষ্য রয়েছে)।
৫০ আবদুল হামিদ আলি প্রণীত খিলাফাতু আলি ইবনে আবি তালিব: ৩১৯।
📄 আলি রা.-এর যুদ্ধের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফেকহি মাসায়িল
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর জ্ঞানের গভীরতা ও ফেকহি বুৎপত্তি এতো উঁচু পর্যায়ের ছিল যে, তিনি সার্বিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতার আলোকে শরয়ি মূলনীতি ও বিধানাবলি প্রণয়ন ও চয়ন করতে পারতেন। এরই * প্রেক্ষিতে তিনি মুসলমানদের ইমামের সাথে বিদ্রোহকারীদের হত্যার ব্যাপারে শরয়ি মূলনীতি উদ্ভাবন করেন। পরবর্তী সময়কার সুন্নাহ ও ফিকহের ইমামগণ বিদ্রোহীদের ব্যাপারে তাঁর পদক্ষেপ ও দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা ব্যাপক উপকৃত হন। তারা এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত ফেকহি মূলনীতি ও বিধান উদ্ভাবন ও বিন্যস্ত করেন। একপর্যায়ে অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম একথা বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, প্রতিপক্ষের সাথে যদি আলি রা.-এর যুদ্ধ না হতো, তাহলে আহলে কিবলা (মুসলমান)-দের সাথে যুদ্ধের ব্যাপারে শরয়ি বিধান অজানা থেকে যেত। একথা স্বয়ং আলি রা. হতেও বর্ণিত আছে। তিনি বলতেন, 'আপনাদের কী মনে হয়, আমি যদি মানুষের দৃষ্টি থেকে আড়ালে থাকতাম তাহলে আজ এদের সাথে এমন কাজ কে আদায় করত?'*
আহনাফ যখন আলি রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আলি, বসরায় আমাদের স্বজাতিরা ভাবছে; আপনি যদি আগামীতে তাদের ওপর বিজয়ী হন, তবে তাদের পুরুষদের হত্যা করে ফেলবেন এবং নারীদের বন্দি বানাবেন।' আলি রা. তখন বললেন, 'আমার মতো মানুষের দ্বারা এ কাজ কখনো হবে না। কাফের ও মুরতাদ ছাড়া অন্য কারও বিরুদ্ধে কি এমনটি করা বৈধ?'
যাইহোক, তাঁর উপরোক্ত উক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতে বলা যায়, কাফের- মুরতাদদের স্থলে আহলে কিবলার বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাঝে কয়েক ধরনের পার্থক্য রয়েছে। যার বিবরণ নিম্নরূপ:
১. বিদ্রোহী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে কেবল তাদের ভয় দেখানো; প্রাণে মেরে ফেলা নয়। কেননা, তাদের হত্যা করা মূল সমাধান নয়; বরং আনুগত্যে ফিরিয়ে আনা এবং অন্যায়-অনাচার প্রতিহত করাই এর মূল লক্ষ্য।৯০
২. যদি বিদ্রোহীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাদের গোলাম, শিশু ও নারীরাও লড়াইয়ে অংশ নেয়, তখন সবার জন্য প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীন পুরুষের বিধান আরোপিত হবে। তারা আক্রমণে উদ্ধত হলে হত্যা করা হবে। পলায়নের ক্ষেত্রে ছেড়ে দেওয়া হবে। কারণ, তাদের সাথে লড়াইয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের অনিষ্ট হতে অন্যদের মুক্তি দেওয়া। পক্ষান্তরে মুরতাদ ও কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইকালে আক্রমণ ও পশ্চাৎপসারণ-উভয় ক্ষেত্রেই তাদের হত্যা করা যাবে।৯১
৩. বিদ্রোহীরা কোনো কারণে যদি লড়াই থামিয়ে দেয়; চাই আনুগত্য স্বীকারের মাধ্যমে বা অস্ত্র রেখে দেওয়ার মাধ্যমে, পরাজয় বরণের ফলে, আহত হওয়ায়, কোনোরূপ ব্যাধির কারণে কিংবা বন্দি হবার ভয়ে-সর্বাবস্থায় তাদের আহতদের আক্রমণ করা এবং বন্দিদের হত্যা করা বৈধ নয়। পক্ষান্তরে মুশরিক ও মুরতাদদের কেউ আহত হলে তাকে আক্রমণ এবং বন্দিদের হত্যা বৈধ।
মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ গ্রন্থে আলি রা.-এর বর্ণনা এসেছে; তিনি উষ্ট্রীর যুদ্ধের দিন বলেছেন, 'পলাতক কারও পিছু ধাওয়া করবে না। আহত কাউকে আক্রমণ করবে না। যে অস্ত্র ফেলে দেবে সে নিরাপত্তা পাবে। '৯২
আবদুর রাজ্জাক-এর বর্ণনায় এসেছে; আলি রা. তাঁর ঘোষককে ঘোষণা দিতে বলেন। সে বসরার দিন ঘোষণা দেয়, 'পলাতক কাউকে পিছু ধাওয়া করবে না। আহত কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করবে না। কোনো বন্দিকে হত্যা করবে না। যে ব্যক্তি তার ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে বা অস্ত্র ফেলে দেবে, সে নিরাপদে থাকবে।' আলি রা. তাদের ফেলে যাওয়া সম্পদ হতে কিছুই গ্রহণ করেননি।
উষ্ট্রীর যুদ্ধের দিন তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, 'পলাতক কাউকে পিছু ধাওয়া করবে না। আহত কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করবে না। কোনো বন্দিকে হত্যা করবে না। মহিলাদের দিকে তাকাবে না; যদিও সে তোমাদের মন্দ বলে এবং তোমাদের নেতাদের গালমন্দ করে। জাহেলি যুদ্ধের সংস্কৃতি সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। তাদের পুরুষেরা কোনো মহিলাকে লাঠি বা ডাণ্ডা দিয়ে পেটালে, সেই মহিলা এবং তার সন্তানকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করা হতো। '১৪
আবু উমাম বাহিলি বলেন, আমি সিফফিন যুদ্ধে উপস্থিত ছিলাম। ওরা (আলি রা.-এর সঙ্গীরা) আহত কাউকে আক্রমণ করত না। পলাতক কাউকে হত্যা করত না। নিহত কাউকে ফাঁসি দিত না।১৫
৪. বন্দি অবস্থায় বিদ্রোহী বন্দিকে বিদ্রোহী হিসেবে গণ্য করা হবে। তার ব্যাপারে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না-করার নিশ্চয়তা থাকলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। আর কারও ব্যাপারে যদি নিশ্চিত হওয়া না যায়, তবে যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত তাকে বন্দি করে রাখা হবে, অতঃপর তাকে মুক্ত করে দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে তাকে আর বন্দি করে রাখার প্রয়োজন নেই। পক্ষান্তরে কাফের বন্দিকে পরেও কয়েদখানায় রাখা হবে।৯৬
৫. বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য কোনো মুশরিকের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়া যাবে না, চাই সেই মুশরিক জিম্মি হোক বা চুক্তিবদ্ধ। পক্ষান্তরে মুরতাদ-কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইকালে তাদের সাহায্য নেওয়া যাবে।৯৭
৬. তাদের সাথে সাময়িক কোনো সন্ধি করা যাবে না। সম্পদের বিনিময়ে যুদ্ধ বন্ধ রাখার ঘোষণাও দেওয়া যাবে না। তৎসময়কার ইমাম যদি সাময়িক সন্ধি করে নেয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। যথাসময়ে মোকাবিলা করতে অক্ষম হলে শক্তি সঞ্চয় করে পরে মোকাবিলা করতে হবে। সম্পদের বিনিময়ে যুদ্ধ বন্ধের সন্ধি করলে এই সন্ধি অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। সম্পদের দিকে লক্ষ রাখতে হবে; সেগুলো যদি সদকা বা ফাইয়ের অংশ হয়, তবে তা ফেরত দেওয়া যাবে না; বরং সদকাগুলো সদকা গ্রহণকারীদের মাঝে বিতরণ করে দিতে হবে এবং ফাইয়ের সম্পদ তার অধিকারীর মাঝে বণ্টন করে দিতে হবে। যদি সেই সম্পদ কেবল তাদের নিজ উপার্জনেরই হয়, তাহলে ইমাম তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না; বরং সেগুলো তাদেরকে ফেরত দিতে হবে। কেননা, আলি রা. উষ্ট্রীর যুদ্ধে অংশ নেওয়া লোকদের সম্পদ নিজের জন্য বৈধ মনে করেননি।
৭. বিদ্রোহীরা যদি যুক্তিযুক্ত কোনো কারণে ইমামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তবে ইমামকে তাদের সাথে পত্রের আদান-প্রদান করতে হবে। যদি তারা নিজেদের ওপর কোনো জুলুমের বিষয় দেখিয়ে দেয়, তবে ইমামের উচিত তা দূর করা। কোনো সন্দেহ করে থাকলে তা স্পষ্টকরণ ও নিরসনও তাঁর কর্তব্য। যেমন, আলি রা. খারেজিদের সন্দেহ দূর করেছেন। ফলে বহুসংখ্যক খারেজি মুসলিম জামাতে ফিরে আসে। সুতরাং সন্দেহ নিরসনের পর তারা ফিরে এলে তো ভালো, অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ইমাম এবং مسلمانوں ওপর ওয়াজিব।
৮. বাহ্যত যদি বিদ্রোহীরা ইমামের আনুগত্য করে থাকে, পৃথক হয়ে কোথাও সমবেত হয়ে না থাকে এবং তাদেরকে গ্রেফতার করা সহজ হয়; সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যাবে না। বরং গ্রেফতার করে তাদেরকে বিচারালয়ে সোপর্দ করতে হবে। বিচারক যথাযথ ফয়সালা দেবেন। তবে সে যাবতীয় শরয়ি ও মানবিক অধিকারপ্রাপ্ত হবে।
৯. বিদ্রোহীদের সাথে এমন ধরনের যুদ্ধ বৈধ নয়, যা দ্বারা সাধারণ লোকদের জান-মালের হানি ঘটে। যেমন: তাদের বসতিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া, কামান দ্বারা গুলিবর্ষণ করা, বৃক্ষ ও বাসস্থান পুড়িয়ে ফেলা ও ধ্বংস করা। পক্ষান্তরে কাফের-মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালে এসব বৈধ। কেননা, দারুল ইসলামে এসব নিষিদ্ধ; চাই গুটিকয়েক লোকই হোক না কেন। অবশ্য যদি এর বিকল্প না থাকে; যেমন : বিদ্রোহীদের দুর্গে অবস্থান নেওয়া এবং অস্ত্র ফেলে না দেওয়া ইত্যাদি; সেক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ি রাহ.-এর মতানুসারে তাদের ওপর কামানের গোলাবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ বৈধ।১০২
১০. বিদ্রোহীদের সম্পদ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা এবং তাদের সন্তানদের বন্দি করা বৈধ নয়। কেননা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'কোনো মুসলমানের সম্পদ তার অনিচ্ছায় গ্রহণ করা বৈধ নয়। '১০৩
আলি রা.-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি উষ্ট্রীর যুদ্ধের দিন বলেছেন, 'যে ব্যক্তি নিজের কোনো সম্পদ আমাদের লোকদের কাছে পাবে, সে যেন তা নিয়ে নেয়। '১০৪
পরবর্তী সময়ে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি খারেজিদের জন্য আপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা বলে, 'আলি মুআবিয়া ও তার সাথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে; অথচ তাদের গালমন্দ করেনি। তাদের সম্পদ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করেনি। তাদের রক্ত যদি বৈধ হয়ে থাকে, তবে তাদের সম্পদ বৈধ হবে না কেন? সম্পদ হারাম হয়ে থাকলে রক্তও হারাম। সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে কেন যুদ্ধ করা হলো?'
ইবনে আব্বাস রা. তাদের সাথে মুনাজারা করার সময় এই অভিযোগের জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'তোমরা কি স্বীয় মা; অর্থাৎ, আয়েশা রা.-কে গালমন্দ করা পছন্দ করবে? তাঁদের কাছ থেকে যা গ্রহণ করা তোমরা বৈধ মনে করো, তাঁর কাছ থেকেও কি তা গ্রহণ করা বৈধ মনে করবে? আর যদি তোমরা বলো যে, তিনি আমাদের "মা" নন, তাহলে তো তোমরা কুফরি করে বসলে। আর যদি তাকে “মা” হিসেবে মেনে থাকো, তবে কি তাঁকে "বাঁদি” বানাতে চাও? এটাও তো কুফরি।'১০৫
আল্লামা ইবনে কুদামা রাহ. এই ঘটনার আলোকে লিখেন, বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধের লক্ষ্য হচ্ছে তাদের নিরুৎসাহিত করা এবং হকের দিকে ডেকে আনা। কুফরির ভিত্তিতে তাদের সাথে যুদ্ধ করা হচ্ছে না। অতএব, তাদের জান, মাল, ইজ্জত-আব্রুর ওপর ওই পরিমাণ হস্তক্ষেপ করা যাবে, যা দ্বারা তারা পিছু সরে আসে। যেমনটি হামলাকারী ও ডাকাতদের বেলায় করা হয়ে থাকে। তাদের সম্পদ ও সন্তান নিজ নিজ স্থানে বহাল থাকবে। অর্থাৎ, তাতে হস্তক্ষেপ হারাম হিসেবে বিবেচিত হবে।১০৬
অবশ্য আলি রা.-এর দৃষ্টিভঙ্গির দিকে তাকিয়ে এটুকু বলা যেতে পারে যে, তাদের অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে। যেমন ইবনে আবি শাইবাহ আবুল বুখতারি হতে বর্ণনা করেছেন, উষ্ট্রীবাহিনী পরাজয় বরণ করলে আলি রা. বলেন, 'যারা বাহিনীর বাইরে অবস্থান করছে তাদের অনুসন্ধান করবে না। তাদের যেসব অস্ত্র ও সওয়ারি তোমরা পেয়েছ তা তোমাদের।'১০৭
আরেক বর্ণনায় আছে; তিনি বলেছেন, 'বাহিনীর অভ্যন্তরে পড়ে থাকা সম্পদ ব্যতীত অন্য কোনো সম্পদে কিছুতেই হস্তক্ষেপ করবে না।'১০৮
১১. নিহত বিদ্রোহীদের গোসল দিতে হবে। কাফন পরাতে হবে এবং জানাজার নামাজ পড়াতে হবে। কেননা, ইমাম শাফেয়ি রাহ. এবং আসহাবুর রায়-এর মতাদর্শমতে সে মুসলমান।১০৯
১২. বিদ্রোহী গোষ্ঠী যদি বেদআতি না হয়, তাহলে তাকে ফাসেক বলা যাবে না। مسلمانوں ইমাম এবং বিচারকদের বিরুদ্ধে তার বিদ্রোহকে তার ইজতেহাদি ভুল হিসেবে সাব্যস্ত করা হবে। তাদের বিধান হবে মুজতাহিদ ফকিহদের অনুরূপ। তাদের মধ্যকার নীতিবান সদস্য সাক্ষ্য দিলে ইমাম শাফেয়ির ভাষ্য অনুসারে তার সাক্ষ্য ধর্তব্য হবে। কিন্তু যদি খারেজি ও বেদআতিরা ইমামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, সেক্ষেত্রে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা, তারা ফাসেক।১১০
১৩. ন্যায়নিষ্ঠ ইমামের জন্য নিজের রক্ত-সম্পর্কীয় বিদ্রোহী আত্মীয়কে হত্যা করা বৈধ। কেননা, তিনি তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করছেন না। এই হত্যা তার ওপর হদ তথা শরয়ি শাস্তি আরোপের মতো। তবুও তাকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত।১১১
১৪. কোনো শহরে বিদ্রোহীদের আধিপত্য দেখা দিলে এবং সেখানে যদি তারা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় খারাজ, জাকাত ও জিজিয়া ইত্যাদি উসুলের পাশাপাশি শরয়ি শান্তিও কার্যকর করে; পরবর্তী সময়ে অবস্থার পরিবর্তন ঘটলে হকপন্থীরা যদি সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, তাহলে তারা অতীতে উসুলকৃত সম্পদের কিছুই গ্রহণ করতে পারবেন না। কেননা, উষ্ট্রীর যুদ্ধের পর বসরাবাসীর ওপর আলি রা.-এর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি অতীতে সেখানকার উসুলকৃত কোনো সম্পদ চাননি।১১২
১৫. বিদ্রোহী ও হকপন্থীদের উত্তরাধিকারীর বিধান: কোনো নিহত বিদ্রোহী কোনো হকপন্থীর উত্তরাধিকার হতে পারবেন না। তদ্রূপ নিহত কোনো হকপন্থীর উত্তরাধিকারও কোনো বিদ্রোহী হতে পারবে না।
কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'হত্যাকারী উত্তরাধিকার হতে পারবে না। ১১৩ আবু হানিফা রাহ. বলেন, 'আমি হকপন্থীদেরকে বিদ্রোহীর উত্তরাধিকার বলতে পারি; কিন্তু কোনো বিদ্রোহীকে হকপন্থীদের উত্তরাধিকার বলতে পারি না।'
ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. বলেন, 'আমি পরস্পর একে অন্যের উত্তরাধিকার বলি। কেননা, উভয়ের হত্যা তাদের ইজতেহাদি ভুলের ওপর নির্ভরশীল। ১১৪ ইমাম নববি রাহ.-ও এই অভিমত পোষণ করেছেন। ১১৫
১৬. বিদ্রোহীদের যদি হত্যা বিনে থামানো না যায়, সেক্ষেত্রে তাদের হত্যা করা হবে। হত্যাকারী এক্ষেত্রে গোনাহগার হবেন না। তার ওপর জামানত বা কাফফারা ওয়াজিব হবে না। কেননা, সে শরয়ি বিধানের আলোকে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং আল্লাহকে সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হত্যা করেছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
فَقَاتِلُوا الَّذِي تَبْغِي حَتى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ
'তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে; যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে।' -সূরা হুজুরাত : আয়াত ৯।
কোনো মুসলমানের ওপর যদি প্রাণসংহারক আক্রমণ করা হয়, তাহলে হত্যা ছাড়া বিকল্প পাওয়া না-যাবার শর্তে নিজের প্রতিরক্ষায় আক্রমণকারীকে হত্যা করা বৈধ।
অনুরূপভাবে যুদ্ধের সময় হকপন্থীরা বিদ্রোহীদের যেসব সম্পদ বিনষ্ট করেছে, তার জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।১১৬ তদ্রূপ ইমাম নববি রাহ.-এর বিশুদ্ধ ভাষ্যমতে, বিদ্রোহীরা যদি যুদ্ধের সময় হকপন্থীদের জান- মালের ক্ষতি সাধন করে, তারও কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।১১৭ এর প্রমাণ হচ্ছে সাহাবায়ে কেরামগণের ইজমা-যা জুহরির সনদে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, প্রথম ফিতনা দেখা দিলে সেসময় রাসুলের সাহাবিগণ বেঁচে ছিলেন। তম্মধ্যে বদরে অংশগ্রহণকারী সাহাবাও ছিলেন। তাঁরা সবাই এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কুরআনের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে পরস্পর হত্যা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণে কারও কাছ থেকে কিসাস নেওয়া হবে না এবং কারও সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া যাবে না।১১৮
আবদুর রাজ্জাক-এর বর্ণনায় এসেছে, প্রথম ফিতনা দেখা দিলে সেসময় রাসুলের সাহাবিগণ বেঁচে ছিলেন। তম্মধ্যে বদরে অংশগ্রহণকারী সাহাবাও ছিলেন। তারা সবাই এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কুরআনের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে কোনো মহিলাকে বন্দি করা এবং তার লজ্জাস্থান বৈধ- জ্ঞানকারীর ওপর শরয়ি শাস্তি পতিত হবে না। এ লক্ষ্যে কারও রক্ত বৈধ জ্ঞানকারীর কাছ থেকে কিসাস নেওয়া হবে না। একই উদ্দেশ্যে অন্যের সম্পদ বৈধকারীর কাছ থেকে সম্পদ ফিরিয়ে নেওয়া হবে না। হ্যাঁ, যদি এমন কোনো বস্তু থাকে যা তার মালিকের কাছে পরিচিত, তবে তা তার মালিককে ফেরত দিতে হবে।১১৯
টিকাঃ
* আল বাকিল্লানি প্রণীত আততামহিদ: ২৯৯; তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ: ২/২৯৫।
* মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক। ১০/১২৪।
৯০ আল মুগনি: ৮/১০৮, ১২৬।
৯১ আল মুগনি: ৮/১১০; আল আহকামুস সুলতানিয়া: ৬০।
৯২ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১০/২৩৬; ফাতহুল বারি: ১৩/৫৭ [সনদ বিশুদ্ধ)।
১৪ নাসবুর রায়াহ: ৩/৪৬৩।
১৫ আল মুসতাদরাক: ২/১৫৫ [সনদ হাসান। জাহাবি রাহ. সহমত ব্যক্ত করেছেন]।
১৬ আল আহকামুস সুলতানিয়া: ৬০।
১৭ আল আহকামুস সুলতানিয়া: ৬০।
** বায়হাকি প্রণীত আসসুনানুল কুবরা: ৮/১৮০।
১০০ মাজমুউল ফাতাওয়া: ৪/৪৫০।
** আল আহকামুস সুলতানিয়া: ৫৮।
১০২ ইবনে কুদামা প্রণীত আল মুগনি: ৮/১১০।
১০০ সুনানে দারাকুতনি: ৩/২৬।
১০০ আল মুগনি: ৮/১১৫।
১০৫ বায়হাকি প্রণীত আসসুনানুল কুবরা: ৮/১৭৯; নাসায়ি প্রণীত খাসায়িসু আমিরিল মুমিনিন : ১৯৭ [সনদ হাসান)।
১০৬ তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ : ২/৩০০।
১০৭ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ১৫/২৬৩।
১০৮ তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ: ২/৩০০।
১০৯ তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ: ২/৩০১।
১১০ আল মুগনি: ৮/১১৮; তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ: ২/৩০১।
১১১ আল মুগনি: ৮/১১৮; তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ: ২/৩০১।
১১২ আল মুগনি: ৮/১১৯; তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ: ২/৩০২।
১১৩ সুনানে ইবনে মাজাহ: ২/৮৮৩।
১১৪ আল আহকামুস সুলতানিয়া: ৫৮।
১১৫ শারহুন নববি আলা সহিহ মুসলিম: ৭/১১০।
১১৬ আল মুগনি: ৮/১১৯
১১৭ শারহুন নববি আলা সহিহ মুসলিম: ৭/১৭০।
১১৮ বায়হাকি প্রণীত আসসুনানুল কুবরা: ৮/১৭৪-এর বিশুদ্ধ সূত্রে তাহকিকু মাওয়াকিফিস সাহাবাহ : ২/৩০২।
১১৯ মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক: ১০/১২১।
📄 নাহরাওয়ান অভিযানের ফলাফল
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. নাহরাওয়ানে খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ করা এ ব্যাপারে শক্তিশালী দলিল ও স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, সিরিয়াবাসীর বিরুদ্ধে তাঁর রণপরিকল্পনা নিশ্চয় সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। মুআবিয়া রা.-এর মোকাবিলায় তিনি ছিলেন হকের অধিক নিকটবর্তী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত। তিনি বলেছেন,
تَمْرُقُ مَارِقَةُ عِنْدَ فُرْقَةٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ ، يَقْتُلُهَا أَوْلَى الطَّائِفَتَيْنِ بالحق
'মুসলমানদের মতবিরোধের সময় একটি সম্প্রদায় পৃথক হয়ে যাবে। তাদেরকে ওই দলটি হত্যা করবে যারা হকের অধিক নিকটবর্তী।১৭১
এটা নিশ্চিত বিষয় যে, আলি রা.-এর বাহিনী সিরিয়াবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তুলনামূলক অধিক সম্মানের অধিকারী। কেননা, উপরোক্ত হাদিস এবং আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-এর শাহাদত ইত্যাদি স্পষ্ট প্রমাণাদি দ্বারা তিনি নিজ সঠিকতার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন। বাস্তবতা তো এমনই সম্ভাবনাময়; কিন্তু ফলাফল এর বিপরীত দেখা যাচ্ছিল। আলি রা.-এর পরিকল্পনা ছিল খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধশেষে সিরিয়াবাসীর ওপর আক্রমণ পরিচালনা করবেন। কেননা, সিরিয়াকে নিজ খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত করা এবং উম্মতের ঐক্য ফিরিয়ে আনা ছিল খেলাফতের বুনিয়াদি দাবি। এই লক্ষ্য অর্জনে চেষ্টারও প্রয়োজন।
খারেজিদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধের উদ্দেশ্যও এটা ছিল যে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সেনাক্যাম্প ও ঘাঁটিগুলো যেন নিরাপদে থাকে। অতর্কিত দুষ্কৃতিকারীরা যেন আমাদের অনুপস্থিতিতে দারুল খেলাফতে উপস্থিত মুসলিম শিশু ও নারীদের ওপর হামলা চালাতে না পারে। কিন্তু কী আর করা! বায়ু তো সবসময় নৌকার বিপরীত দিকেই প্রবাহিত হয়। পরিকল্পনামাফিক তিনি সিরিয়ায় যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারলেন না; এর পূর্বেই শহিদ হয়ে গেলেন।
আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ছিল। কারণ, একদিকে যেমন খারেজিদের বিদ্রোহ নির্মূল করতে হয়েছে, অন্যদিকে উষ্ট্রী, সিফফিন ও নাহরাওয়ানের অভিযানগুলোতে অংশ নিয়ে ইরাকিরা এতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে, বাড়তি আর কোনো যুদ্ধে যেতে তারা প্রস্তুতি নিতে পারছিল না। তারা যুদ্ধকে ঘৃণা করতে লাগল। বিশেষত সিফফিনে সিরিয়াবাসীর বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধে তারা ব্যাপক পর্যুদস্ত হয়েছে। অন্যদের সঙ্গে যুদ্ধে তারা তেমন অভিজ্ঞ ছিল না। এ ছাড়া এক মুহূর্তের চিন্তা-ভাবনার সুযোগ না পাওয়ায় এতিম হয়েছে ইরাকবাসীর অসংখ্য শিশু। নারীরা হয়েছে বিধবা। একটি নিষ্ফল যুদ্ধ ছাড়া কিছুই তাদের হাতে আসেনি।
ওই সময়ে আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা. এবং তাঁর সাথিরা যে সন্ধি ও সালিশকে স্বাগত জানিয়েছেন, সেটা যদি না হতো তবে মুসলিমবিশ্ব বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতো—যা কল্পনাও করা দুষ্কর। কেবল এ কারণেই আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর সাথিরা পুনরায় সিরিয়ায় সেনা প্রেরণের প্রতি আগ্রহবোধ করছিলেন না। যদিও তারা নিশ্চিত ছিলেন যে, হজরত আলি রা.-ই হকের ওপর রয়েছেন।১৭২
এ ছাড়া আলি রা.-এর পথের কাঁটাস্বরূপ দেখা দেয় আরেক ফিতনা। সেই দিনগুলোতে এমন একটি ফেরকার অভ্যুদয় ঘটে, যারা আলি রা.-এর মান- মর্যাদাকে প্রভুত্বের আসনে পৌঁছাতে বদ্ধপরিকর। খারেজিদের বিপরীতে ছিল এই ফেরকার দৃষ্টিভঙ্গি।১৭৩
অথচ বাস্তবতা এমন নয়। বরং ওই ফেরকার লক্ষ্য ছিল, ভ্রান্ত এই আকিদার মাধ্যমে কেবল আলি রা.-এর বাহিনীই নয়; বরং গোটা মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করে দেওয়া এবং ইসলামের শিকড় সমূলে উৎপাটন করা।১৭৪ এই অপশক্তিটির চ্যালেঞ্জও আলি রা. সম্পূর্ণ শক্তি, প্রত্যয় ও সাহসের সাথে মোকাবিলা করেন। এরা আপন লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়।
যাইহোক, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আলি রা.-এর বাহিনী থেকে খারেজিদের বেরিয়ে যাওয়া এবং তৎপরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ফলে তাঁর সামরিক শক্তি বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে পর্যায়ক্রমে এক এক করে কাছে-দূরের বহু লোক আলি রা.-এর খেলাফত থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। খুরাইজ ইবনে রাশেদ; অন্য উক্তিমতে যার নাম হারিস ইবনে রাশেদ—সে ছিল আলি রা. কর্তৃক নিযুক্ত আহওয়াজ এলাকার গভর্নর। সে তার গোত্র বনু নাজিয়ার লোকদেরকে আলি রা.-এর খেলাফতের বিরুদ্ধে প্ররোচনা দেয়। বহু লোক তার ডাকে সাড়া দেয়। সে তার অধীনস্থ বহু শহরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং লুণ্ঠন করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ। আলি রা. মাকিল ইবনে কায়স আররিয়াহির নেতৃত্বে তার মোকাবিলার জন্য বাহিনী প্রেরণ করেন। তিনি খুরাইজ ইবনে রাশেদকে পরাজিত করে হত্যা করেন।১৭৫
দেশের এমন অরাজক পরিস্থিতি দেখে খারাজদাতারাও আলি রা.-এর খেলাফতকে দুর্বল করে দিতে সচেষ্ট হয়; যাতে খারাজ দেওয়া হতে মুক্তি পাওয়া যায়। আহওয়াজের অধিবাসীরা তো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গই করে ফেলে। এমতাবস্থায় আলি রা.-এর আরও অধিক পরিমাণে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সমরশক্তি ক্ষয় হবে—এটা স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে ইমাম শাবি রাহ. হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, আলি রা. যখন নাহরাওয়ানদের হত্যা করেন তখন বিপুলসংখ্যক লোক তাঁর বিরুদ্ধে চলে যায়। তাঁর আশপাশের লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং বনু নাজিয়াহ বিরোধিতা শুরু করে। এ সুযোগে ইবনুল হাজরামি বসরায় অভিযান চালায়। পাহাড়ী লোকেরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যারা খারাজ দিত তারা খারাজ দেওয়া বন্ধ করতে উদ্যত হয়। পারস্যবাসী সাহল ইবনে হুনাইফকে সেখান থেকে বের করে দেয়। তিনি ছিলেন আলি রা. কর্তৃক নিযুক্ত পারস্যের শাসনকর্তা।১৭৬
অন্যদিকে হজরত মুআবিয়া রা. গোপনে-প্রকাশ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে হজরত আলি রা.-এর সামরিক শক্তি দুর্বল করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া তিনি যখন আলি রা.-এর খেলাফতের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দেখতে পেলেন, তখন এই সুযোগ কাজে লাগাতে আগ্রহী হন। এ লক্ষ্যে তিনি আমর ইবনুল আস রা.-এর নেতৃত্বে মিসর অভিমুখে সেনাবহর প্রেরণ করেন। সেখানে তিনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ওই এলাকা নিজের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। আমর রা.-এর এই বিজয় এবং মুআবিয়া রা.-এর এই রাজনৈতিক সফলতার পেছনে কয়েকটি কারণ ও উপকরণ রয়েছে। যথা:
* খারেজিদের বিরুদ্ধে আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রা.-এর জড়িয়ে যাওয়া।
* আলি রা. কর্তৃক নিযুক্ত মিসরের গভর্নর মুহাম্মাদ ইবনে আবি বকর তাঁর প্রাক্তন স্থলাভিষিক্ত কায়স ইবনে সাআদ ইবনে উবাদাহ আনসারির মতো দূরদর্শী না হওয়া। তিনি উসমান রা.-এর হত্যাকারীদের বিচারপ্রত্যাশীদের সাথে প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেন। এক্ষেত্রে তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন; যেমনটি তার পূর্ববর্তী গভর্নর দিতে পেরেছিলেন। ফলে তিনি উসমান হত্যার বদলাপ্রত্যাশীদের কাছে পরাজয় বরণ করেন।
* মুআবিয়া রা. এবং উসমান রা. হত্যার বিচারপ্রত্যাশীদের চিন্তা-চেতনা অভিন্ন হওয়া। এই ঐকমত্যপূর্ণ রায়ের ফলে সহজেই মিসরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়।১৭৭
* আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর খেলাফতের রাজধানী মিসর থেকে দূরে এবং সিরিয়ার নিকটবর্তী হওয়া।
মিসরের ভৌগলিক অবস্থান যেহেতু সিনা'র সড়কের সীমান্তে সিরিয়ার ভূখণ্ডের সাথে লাগোয়া, তাই তা প্রাকৃতিকভাবে মনস্তাত্ত্বিক নৈকট্য বয়ে আনে। মিসরে মুআবিয়া রা.-এর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর তাঁর সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তিনি এতে ক্ষান্ত হননি; বরং আরব উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চল তথা মক্কা, মদিনা ও ইয়ামেন ইত্যাদি অঞ্চলেও নিজের সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে লাগলেন। কিন্তু আলি রা. যখন সামরিক প্রতিরক্ষার চেষ্টা করেন, তখন তাঁর বাহিনী ভগ্ন মনোরথে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।১৭৮
এ ছাড়া হজরত মুআবিয়া রা. বিভিন্ন গোত্রের নেতা এবং আলি রা.-এর গভর্নরদেরকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালান। যেমন, কায়স ইবনে সাআদ রা. যিনি আলি রা. কর্তৃক নিযুক্ত মিসরের গভর্নর ছিলেন; তাঁকে তিনি নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু সফল হননি।১৭৯ তবে এটুকু অবশ্যই হয়েছে যে, আলি রা.-এর উপদেষ্টা ও তাঁর সাথিদের কাছে কায়স রা.-কে সন্দেহভাজন বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আলি রা. তাঁকে অপসারণ করেন। পরে কায়স ইবনে সাআদের এই অপসারণ মুআবিয়া রা.-এর পক্ষে অনেক বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। অনুরূপভাবে তিনি পারস্যের গভর্নর জিয়াদ ইবনে আবিয়াকেও নিজের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছেন; কিন্তু সফল হননি।১৮০
মোটকথা, মুআবিয়া রা. বিভিন্ন গোত্রপ্রধান ও গভর্নরদের প্রতি নিজের অনুগ্রহ ও ভবিষ্যতে উত্তম পদের প্রতিশ্রুতির দেন। এটা তাঁদের ওপর প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া এরা দিনদিন মুআবিয়া রা.-এর সফলতা প্রত্যক্ষ করছিল। ফলে একপর্যায়ে দেখা গেল আলি রা.-এর খেলাফতের কাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো; যা তিনি নিজেই তাঁর এক ভাষণে স্বীকার করেছেন-
'আমি জেনেছি; বুসর ইয়ামেনে প্রবেশ করেছে। আল্লাহর কসম! খুব শীঘ্রই ওই দল তোমাদের ওপর বিজয় লাভ করবে। আর তোমাদের ওপর তাদের বিজয়ের কারণ হলো, তোমরা তোমাদের ইমামের বিরুদ্ধাচরণ করো, আর তারা তাদের ইমামের আনুগত্য করে। তোমরা খেয়ানত করো, আর তারা আমানত রক্ষা করে। তোমরা ভাঙার কাজে লিপ্ত আর তারা গড়ার কাজে ব্যাপৃত। আমি অমুককে পাঠিয়েছিলাম; সে খেয়ানত করেছে ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অমুককে পাঠালাম; সে-ও খেয়ানত করল ও বিশ্বাসঘাতকতা করল এবং মালগুলো মুআবিয়ার নিকট পাঠিয়ে দিলো। তোমাদেরকে একটি পাত্রের আমানতদার বানালেও সেক্ষেত্রে আমার এখন আশঙ্কা হচ্ছে।
হে আল্লাহ, আপনি ওদেরকে নিকৃষ্ট বানিয়েছেন, তাই ওরা আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে। আপনি ওদেরকে অপছন্দ করেন, তাই ওরা আমাকে অপছন্দ করে। হে আল্লাহ, ওদেরকে আমার থেকে নিষ্কৃতি দিন এবং আমাকেও ওদের থেকে মুক্ত করুন। '১৮১
টিকাঃ
১৭১ সহিহ মুসলিম: ২/৭৪৫, ৭৪৬।
১৭২ আবদুল হামিদ আলি প্রণীত খিলাফাত আলি বিন আবি তালিব: ৩৪৫।
১৭৩ আবদুল হামিদ আলি প্রণীত খিলাফাত আলি বিন আবি তালিব: ৩৪৫।
১৭৪ মুসতাফা হালামি প্রণীত নিযামুল খিলাফাতি ফিল ফিকরিল ইসলামি : ১৫, ১৬।
১৭৫ আবদুল হামিদ আলি প্রণীত খিলাফাতু আলি বিন আবি তালিব: ৩৫০; তারিখে তাবারি: ৬/২৭-৪৭।
১৭৬ তারিখে তাবারি: ৬/৫৩।
১৭৭ মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক, তাবাকাতে ইবনে সাআদ: ৩/৮৩; আবদুল হামিদ আলি প্রণীত খিলাফাত আলি বিন আবি তালিব : ৩৫১ সনদ বিশুদ্ধ।
১৭৮ তারিখে খলিফা: ১৯৮ [সনদবিহীন]।
১৭৯ ওয়ালাইয়াতু মিসর: ৪৫-৪৬।
১৮০ আল ইসতিয়াব: ২/৫২৫-৫২৬।
১৮১ বুখারি প্রণীত আততারিখুস সাগির: ১/১২৫ সনদ বিচ্ছিন্ন। তবে এর অন্যান্য সাক্ষ্য রয়েছে।