📄 খালিদকে সেনাপতির দায়িত্ব থেকে অপসারণ
ইসলামের শত্রুরা সবসময় সুযোগ খুঁজে বেড়ায়। মুসলিমদের ক্ষতি করা যায়, এমন কোনো সুযোগই তাই হাতছাড়া করতে চায় না। তারা সাহাবিদের মধ্যে সংঘটিত ঘটনাবলির ভুল ব্যাখ্যা করে তাঁদের সম্মানে দাগ লাগাতে চেষ্টা করে। যখন তাদের শয়তানি উদ্দেশ্য পূরণে সফল হতে পারে না, তখন নিজেরাই এমন কিছু মনগড়া বর্ণনা তৈরি করে, যাতে পাঠকের অন্তরে সহজেই সাহাবিদের সম্পর্কে খারাপ ধারণা চলে আসে। এ লক্ষ্যেই তারা উমর ও খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পবিত্র সোনালি ইতিহাসকে কলঙ্কিত করতে মনগড়া বর্ণনাগুলো ছড়িয়ে দেয়। উমরের পক্ষ থেকে খালিদকে অপসারণের কারণগুলোর ভুল ব্যাখ্যা করে। ব্যক্তিত্ববান উভয় সাহাবির নামে ভিত্তিহীন অপবাদ লাগায়। তাঁদের বিরুদ্ধে এমন কিছু বর্ণনাকে দলিল বানায়, যার কোনো ভিত্তিই নেই এবং সত্যানুসন্ধানীদের কাছে এসব কথাবার্তা অসার-অবান্তর বলে গণ্য। ৪৪১ খালিদের অপসারণের ঘটনাবলি কোনো ধরনের রদবদল ছাড়া পূর্ণ সততার সঙ্গে বর্ণনা করব। তাঁর অপসারণ দুই স্থানে দুবার ঘটে। প্রত্যেকটার কারণও ছিল ভিন্ন ভিন্ন।
১. প্রথমবার অপসারণ
উমর রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে সিরিয়ার সেনাপ্রধান ও প্রধান প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করেন। এ অপসারণটা করা হয় আবু বকরের ইনতিকালের পর উমরের খিলাফতকালের একদম শুরুর দিকে ১৩ হিজরিতে। এর কারণ হচ্ছে, আবু বকর ও উমরের শাসনপদ্ধতিতে অনেকটা পার্থক্য ছিল। আবু বকরের শাসনপদ্ধতি ছিল- তিনি তাঁর গভর্নরদের রাষ্ট্রের সব ধরনের কাজে মানুষের একক ও সমষ্টিগত সদস্যের ওপর ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার শর্তে কার্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা—এটা নিজের হাতে হোক বা গভর্নরদের হাতে। খলিফার পক্ষ থেকে সকল গভর্নরের জন্য এ অনুমতি ছিল যে, রাজ্যের ছোট-बড় কাজে যেটা ভালো মনে হবে সেটাই করবে। এর জন্য চিঠির মাধ্যমে খলিফার পক্ষ থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। যতক্ষণ গভর্নর আর্থিক বা রাজ্যের অন্যান্য কাজে ইনসাফ বজায় রাখবে, তাকে তার দায়িত্ব থেকে অপসারণের প্রয়োজন নেই। ৪৪২
একবার উমর রা. আবু বকরকে বললেন, ‘আপনি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে চিঠি লিখে বলুন, তিনি যেন আপনার অনুমতি ছাড়া কাউকে একটা ছাগল বা উটও না দেন।’ আবু বকর খালিদের নামে এ আদেশ লিখে চিঠি পাঠান। উত্তরে খালিদ লেখেন, ‘আমি যেভাবে কাজ করছি সেভাবেই কাজ করতে দেন; নাহয় আপনি জানেন আর আপনার কাজ জানে।’
তাঁর এ উত্তর দেখে উমর তাঁকে অপসারণ করতে পরামর্শ দেন; ৪৪৩ কিন্তু আবু বকর তাঁকে তাঁর স্থানে বহাল রাখেন। ৪৪৪
এরপর উমর রা. যখন খলিফার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন তিনি তাঁর সংবিধানে গভর্নদের ইচ্ছা-স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে দেন। গভর্নরদের জন্য আবশ্যক করে দেন, গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ যখন সামনে আসবে, তখন সেটা সম্পর্কে খলিফাকে অবগত করতে হবে এবং কাজের যে ফল আসবে, সেটাও খলিফার আদেশক্রমে বাস্তবায়ন করবে।
তিনি মনে করতেন, খলিফা তাঁর দায়িত্বের ব্যাপারে এবং প্রজাদের ওপর অর্পিত গভর্নরদের দায়িত্বের ব্যাপারেও দায়িত্বশীল। আর এটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যে, কোনো গভর্নর যদি ভুলক্রমে ত্রুটি বা ক্ষতি করে বসে, তাহলে খলিফার এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, আমি তো সঠিকভাবে গভর্নর নির্বাচন করেছি।
তিনি খিলাফতের দায়িত্ব নেওয়ার সময় লোকদের সামনে দেওয়া ভাষণে বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের মাধ্যমে আমাকে পরীক্ষা করছেন। আর আমার মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা করছেন। আমার দুই সাথির (মুহাম্মাদ ও আবু বকর রা.) পর তিনি আমাকে বাকি রেখেছেন। আল্লাহর শপথ, তোমাদের কারও কোনো বিষয় যদি আমার কাছে পৌঁছায়; অথবা আমার কাছে পৌঁছতে কেউ বাধা দেয়, তাহলে আমি তার বদলা ও আমানত যথাযথভাবে পূরণ করব। গভর্নররা যদি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, তাহলে আমি তাদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করব; তারা অপরাধ করলে আমি তাদেরও কঠিন শাস্তি দেবো।'৪৪৫
উমর রা. জিজ্ঞেস করেন, 'আমি যদি সঠিক ব্যক্তিকে তোমাদের দায়িত্বশীল বানাই; আর তাকে যদি ইনসাফের আদেশ করি, তাহলে কি আমার দায়িত্ব পালন করা হয়ে যাবে?' লোকেরা বলেন, 'জি হ্যাঁ।' উমর বলেন, 'না; বরং ততক্ষণ আমার দায়িত্ব আদায় হবে না, যতক্ষণ আমি দেখব না যে, সে আমার কথামতো কাজ করেছে কি না।'৪৪৬
তিনি দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে আবু বকরের নির্ধারিত গভর্নরদের তাঁর প্রণীত সংবিধানমতো চালানোর চেষ্টা করেন। তাঁদের কেউ কেউ তাঁর এ নিয়মনীতি গ্রহণ করেন; আর কেউ কেউ মানতে অস্বীকৃতি জানান। অস্বীকারকারীদের মধ্যে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.-ও ছিলেন।৪৪৭
মালিক ইবনু আনাস রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, উমর দায়িত্ব গ্রহণের পর খালিদকে চিঠি লিখে বলেন, 'আমার অনুমতি ছাড়া কাউকে একটা উট বা ছাগলও দেবেন না।' খালিদ তাঁর উত্তরে বলেন, 'আমি যেভাবে কাজ করছি সেভাবে কাজ করতে দেন; নাহয় আপনার কাজ আপনাকে সোপর্দ করলাম।'
উমর বলেন, 'আমি আবু বকরকে যে জিনিসের দিকে ইঙ্গিত করেছিলাম, সেটা যদি এখন বাস্তবায়ন না করি, তাহলে আল্লাহর কাছে আমি সত্যবাদী থাকব না।' তারপরই তিনি খালিদকে অপসারণ করেন।৪৪৮
এরপর বার বার উমর রা. তাঁকে গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, 'আমার কাজে স্বাধীনতা থাকতে হবে। আমি যা ইচ্ছা করব।' কিন্তু উমর তাঁর এ সিদ্ধান্তের কারণে গভর্নর নিযুক্ত করা থেকে বিরত থেকেছেন।৪৪৯
সুতরাং জানা গেল, উমর সাংবিধানিক কারণেই খালিদকে অপসারণ করেন। শাসক তার সকল দায়িত্বশীলের ওপর দায়িত্বশীল। তার অধিকার আছে রাষ্ট্রের যেকোনো কাজে হস্তক্ষেপ করার। রাজনৈতিক জীবনে এ ধরনের ঘটনা কারও না কারও সঙ্গে ঘটবেই; এটা স্বাভাবিকতা। খালিদের অপসারণের ঘটনায় এমন কোনো নজরবিহীন কারণ পাওয়া যায়নি, যা সাব্যস্ত করতে অসার আর অগ্রহণযোগ্য বর্ণনার আশ্রয় নিতে হবে।
আরও একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, উমর রা. যে সময়টাতে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন সবাই পূর্ণ ব্যক্তিত্ববান মানুষ ছিলেন। নবুওয়াতের পরশে তাঁরা ছিলেন সুসংগঠিত। আর গভর্নরের জন্য প্রথমত একটা শর্ত হচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনার যাবতীয় শর্তের সঙ্গে যিনি একমত হতে পারবেন, তাকেই তিনি গভর্নরের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং উম্মতে মুসলিমা যতক্ষণ তার কাজে নিরাপদ ও শান্তিতে থাকবে, ততক্ষণ তিনি তার স্থানে বহাল থাকতে পারবেন। কেননা, কোনো শাসক বা গভর্নরের অধিকার ছিল না, আজীবন তার আসনে বহাল থাকতে পারবেন। বিশেষ করে খলিফা ও গভর্নরের মধ্যে শাসনপদ্ধতিতে মতানৈক্য দেখা দিলে তখন কাউকে অপসারণ করাটা দূষণীয় কিছু নয়।
ইতিহাসের ঘটনাবলি সাক্ষী, উমর রা. আল্লাহর তাওফিকে তাঁর পূর্ণ খিলাফতকালে অতুলনীয় সফলতা অর্জন করেন। একজনকে অপসারণ করে সঙ্গে সঙ্গে অন্যজনকে সে দায়িত্বে বসিয়ে দিতেন। যাকে পরে দায়িত্বে বসাতেন, তিনি আগের জনের চেয়ে কম উপযুক্ত হতেন না। আসল কথা হচ্ছে, এটা ইসলামের আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলার ফল, যার ভিত্তি এ কথার ওপর যে, তিনি সর্বদা উম্মতে মুসলিমার জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর এবং রাজনৈতিক গভীর যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদেরই দায়িত্ব প্রদান করতেন। ৪৫০
খালিদ রা. তাঁর অপসারণের চিঠি কোনো আপত্তি ছাড়াই অত্যন্ত মান্যতার সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং আবু উবায়দার নেতৃত্বে জিহাদ করতে থাকেন। আল্লাহ তাঁর হাতে কিন্নাসরিন বিজিত করেন। তারপর আবু উবায়দা খালিদকে সেখানকার আমির নিযুক্ত করে উমরের কাছে এ মর্মে চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি কিন্নাসরিন বিজয়ের বিস্তারিত আলোচনা করেন। উমর তাঁর চিঠি পড়ে বলেন, 'খালিদ নিজেকে নিজে সেখানের আমির বানিয়ে নিল। আল্লাহ আবু বকরের ওপর রহম করুন। তিনি আমার চেয়েও অধিক দূরদর্শী ছিলেন।'
সম্ভবত উমর রা. এটাই বলতে চাচ্ছেন যে, খালিদ স্বভাবগতভাবে সাহসিকতা ও যুদ্ধের বিষয়াদিতে খুবই পারদর্শী। যুদ্ধ, জিহাদ ও সংগ্রামের জন্য তিনি নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন।
ভয়ানক পরিস্থিতিতে প্রাণপণ লড়াই করে যেতে সামান্যতম চিন্তাও করেননি। তা সত্ত্বেও উমর রা. তাঁকে অপসারণের জন্য আবু বকরের কাছে অনেক অনুরোধ করেন; কিন্তু তিনি তাঁকে অপসারণ করেননি। সেটা হয়তো তাঁর প্রতি আবু বকরের এই দৃঢ় বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে, তিনি ছিলেন একজন বীরবাহাদুর ও কৌশলী যোদ্ধা। মুসলিমদের যে কজন হাতেগোনা সাহসী বীর আছেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। ৪৫১ খালিদ আবু উবায়দার নেতৃত্বে চার বছর ছিলেন। ইতিহাস সাক্ষী, কখনো কোনো বিষয়ে আবু উবায়দার সঙ্গে ইবনুল ওয়ালিদের মতপার্থক্য হয়নি। খালিদের মন থেকে তাঁকে অপসারণের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া (বেদনা) দূর করার ক্ষেত্রে আবু উবায়দার কৃতিত্ব অস্বীকার করার নয়। তিনি সর্বদা তাঁকে যথাযথ সম্মান করতেন। তাঁর কথাবার্তা-পরামর্শকে অন্যের তুলনায় অধিক গুরুত্ব দিতেন। অপসারণের পর তাঁকে বিভিন্ন যুদ্ধে অগ্রভাগে রাখার ফলে এতটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে যে, তাঁকে যুদ্ধের ময়দানে এক নজিরবিহীন সাহসের মূর্তপ্রতী হয়ে আবির্ভূত হতে দেখা যায়। দামেশক, কিন্নাসরিন ও ফিহল বিজয় তাঁর উচ্চ আত্মিক দীক্ষার স্বীকৃতি দেয়। এ কারণে তিনি খুব সহজে তাঁর অপসারণ মেনে নেন।
তিনি অপসারণের আগে ও পরে 'সাইফুল্লাহ' হয়েই বেঁচে ছিলেন। ৪৫২ ইতিহাস আবু উবায়দার সোনালি কথাগুলো আমাদের জন্য সংরক্ষিত রেখেছে, যে কথাগুলো তিনি খালিদের অপসারণের পর সহমর্মী হয়ে উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, 'আমি দুনিয়ার বাদশাহি চাই না, চাই না দুনিয়ার জন্য কাজ করতে। আপনি যা কিছু দেখছেন; এগুলোর ধ্বংস অনিবার্য। আমরা দুজন পরস্পর ভাই—উভয়ে মিলে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করতে চাই এবং এটাই সত্য। কারও জন্য এটা দূষণীয় নয় যে, তার দীনি ভাই তার ওপর প্রশাসক হবে। যারা প্রশাসক বা গভর্নর, তারা ভুলত্রুটি ও অপরাধের খুব কাছাকাছি থাকেন। কেবল আল্লাহ যাদের পরম করুণায় রক্ষা করেন, তারাই এসব ভুলত্রুটি থেকে বেঁচে থাকেন।'৪৫৩
আবু উবায়দা তাঁর অধীনে খালিদকে যুদ্ধে যাওয়ার আহ্বান করলে তিনি বলেন, 'ইনশাআল্লাহ, আমি উপস্থিত থাকব। আমি তো আপনার আহ্বানের অপেক্ষায় ছিলাম।' আবু উবায়দা বলেন, 'আবু সুলায়মান, আমি আপনাকে আদেশ করে খুবই লজ্জিত।' খালিদ বলেন, 'আমার ওপরে যদি একজন ছোট্ট বাচ্চাকেও আমির নিযুক্ত করা হতো, তাহলে আমি তার আদেশও যথাযথ মেনে চলতাম। আমি আপনার বিরোধিতা করব কোন যুক্তিতে? আপনার ইমান আমার আগের। আপনি আমার আগে ইসলামগ্রহণ করেছেন। ইসলামের অগ্রগামীদের সঙ্গে আপনিও অগ্রগামী। তাঁদের সঙ্গে খুব দ্রুত সময়ে আপনি ইসলামগ্রহণ করেছেন। রাসুল আপনাকে 'আমিন' উপাধি দিয়েছেন। আমি আপনার সমমর্যাদা ও সম্মান কী করে পাব! আপনার সামনে সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমি নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করেছি। আমি কখনো আপনার বিরোধিতা করব না এবং কোনো রাজ্য শাসনও করব না।'
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. এসব বলেই শুধু ক্ষান্ত হননি; বরং বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন এবং আদেশ পালনে দ্রুত বেরিয়েছেন। তাঁর কথা ও কাজে এটা পরিষ্কার যে, ধর্মীয় ও নৈতিক প্রেরণা খালিদ ও আবু উবায়দার কর্মক্ষেত্রে মুখ্যভূমিকা পালন করেছিল। মুসলিমবাহিনীর সেনাপতির দায়িত্ব থেকে অপসারণের ফলে খালিদের ব্যক্তিগত অবস্থা নেতা থেকে অনুগামীতে পরিবর্তন হওয়া সত্ত্বেও তিনি খলিফা ও গভর্নরকে আনুগত্যের নীতিমালা অনুসরণ করেছিলেন। ৪৫৪
খালিদের প্রথম অপসারণ এ কারণে ছিল না যে, তাঁর যোগ্যতা নিয়ে খলিফার কোনো সন্দেহ, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ক্ষোভ, তিনি শরিয়তের পবিত্র সীমা লঙ্ঘন করেছেন বা খালিদের কর্তব্যনিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতার ওপর কোনো কলঙ্কের দাগ পড়েছে; বরং সেটা ছিল দুজন মহাপুরুষ, দুজন প্রতিপত্তিসম্পন্ন ব্যক্তির গৃহীত দুটি ভিন্ন পদ্ধতি। তাঁদের প্রত্যেকেই ভেবেছিলেন যে, তাঁদের নিজস্ব পদ্ধতির বাস্তবায়ন ছিল অপরিহার্য। তাঁদের মধ্যে কোনো একজনকে ছাড় দিতে বা মেনে নিতে হতো, তাহলে অন্তরে কোনো রকম একগুঁয়েমি, বিরক্তি বা অসন্তোষ পোষণ না করে মুসলিমবাহিনীর সেনাপতিকেই খলিফার কাছে হার মানতে হতো। ৪৫৫
মহান আল্লাহর পথনির্দেশনায় উমর রা. আবু উবায়দা রা.-কে সিরিয়ার মুসলিমবাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করেন। ইয়ারমুকযুদ্ধের পর অঞ্চলটার প্রয়োজন ছিল যুদ্ধনিবৃত্তি, যেন হিংসা-বিদ্বেষ শেষ হয়, আঘাত আরোগ্য লাভ করে এবং অন্তরের পুনর্মিলন সাধিত হয়। আবু উবায়দা যখন সন্ধিস্থাপনের কোনো সুযোগ দেখতেন, তখন ত্বরান্বিত হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ছুটে চলতেন; কিন্তু প্রয়োজনের সময় তিনি যুদ্ধ থেকে পিছপা হননি। শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো পথ যদি থাকত, সেটা অনুসরণ করতেন। অন্যথায় জিহাদের প্রস্তুতি নিতেন।
সিরিয়াবাসী আবু উবায়দার ক্ষমাশীলতার কথা জানত। এ জন্য তারা আত্মসমর্পণ করতে তাঁর কাছে আসে। তারা অন্যের তুলনায় তাঁর মুখোমুখি হওয়া বেশি পছন্দ করত। উমরের নির্দেশে আবু উবায়দাকে সিরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিল। তাঁর নিযুক্তি ছিল প্রাদেশিক কল্যাণের স্বার্থে। ৪৫৬
২. দ্বিতীয়বার অপসারণ
১৭ হিজরিতে কিন্নাসরিনে খালিদকে দ্বিতীয়বার অপসারণ করা হয়। উমরের কাছে খবর পৌঁছায়, খালিদ ও ইয়াজ ইবনু গানাম বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে অনুপ্রবেশ করে বিপুল পরিমাণ গনিমত নিয়ে ফিরেছেন। খালিদের বদান্যতার আশায় লোকেরা দূরদূরান্ত থেকে তাঁর কাছে আসছে। লোকদের মধ্যে ছিল আশআস ইবনু কায়েস আল কিনদি। খালিদ রা. তাকে ১০ হাজার মুদ্রা দিয়েছিলেন। খালিদের কর্মকান্ডের কিছুই উমরের কাছে গোপন ছিল না।৪৫৭
উমর রা. তাঁর সেনাপতি আবু উবায়দার কাছে চিঠি লিখলেন। খালিদ রা. যে উৎস থেকে আশআসকে মোটা অঙ্কের সম্পদ দিয়েছেন, উমর তাঁকে তা অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়ে খালিদকে সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি দেন। তিনি তাঁকে মদিনায় ডেকে আবু উবায়দার উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। অবশেষে গনিমত থেকে ১০ হাজার মুদ্রা চুরির অপবাদ থেকে খালিদ নির্দোষ প্রমাণিত হন।৪৫৮
খালিদকে তাঁর অপসারণের কথা জানানো হলে তিনি সিরিয়াবাসীর কাছ থেকে বিদায় নেন। সেনাবাহিনী থেকে সেনাপতির বিচ্ছেদ-বেদনার সামান্যই তিনি দৃষ্টিগোচর করা শোভনীয় মনে করেছিলেন। তিনি যে ব্যথা অনুভব করেছিলেন, তা প্রকাশ পেয়েছিল জনসাধারণের উদ্দেশে তাঁর বিদায়ী কথামালায়— 'সিরিয়ায় শান্ত-সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমিরুল মুমিনিন আমাকে সিরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। এরপর তিনি আমাকে অপসারণ করেছেন।'
একজন তখন দাঁড়িয়ে বলল, 'ধৈর্য ধরুন সেনাপতি। কারণ, এখন তো ফিতনার সময়।' খালিদ বললেন, 'খাত্তাবের পুত্র যতদিন জীবিত, ততদিন ফিতনার অবকাশ নেই। ৪৫৯
এটি ছিল শক্তিশালী ও অভিভূতকারী ইমানের বহিঃপ্রকাশ। মুহাম্মাদ ﷺ-এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সাহাবিদের মধ্যে যাঁরা মনোনীত ছিলেন, কেবল তাঁরাই এমন ইমানের অধিকারী ছিলেন। কী সেই পারলৌকিক শক্তি, যা এমন রাশভারী পরিস্থিতিতেও খালিদকে দমিয়ে রেখেছিল। সেটা কী ছিল, যার কারণে তিনি এমন শান্তিপূর্ণ ও বিচক্ষণ জবাব দিয়েছিলেন? ৪৬০
উমরের খিলাফতের সমর্থনে খালিদের কথাগুলো শোনার পর লোকেরা শান্ত হয়ে গেল। তারা উপলব্ধি করল যে, তাদের অপসারিত সেনাপতি এমন ব্যক্তি নন, যিনি হতাশা ও বিপ্লব উদ্রেক করে নিজের গরিমা গড়ে তুলবেন; বরং গঠনমূলক ভূমিকা পালনের জন্য যাঁদের সৃষ্টি করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন তাঁদের একজন। যদি পরিস্থিতি কখনো তাঁদের কাছে নিজেদের গড়ে তোলা সাম্রাজ্য বা গৌরবও ভেঙে ফেলার দাবি জানায়, তখন তাঁরা আরও ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন।
খালিদ রা. মদিনায় গিয়ে উমরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। উমর রা. তখন তাঁর সম্মানে আবৃত্তি করেন,
তুমি বিজয়ের এমন গৌরবগাথা তৈরি করেছ,
যা তোমার মতো করে আর কেউ পারেনি।
কিন্তু বাস্তবতা কী? মানুষ আসলে যা করে,
সবকিছুর প্রকৃত কর্তাই মূলত আল্লাহ।
খালিদ উমরকে বললেন, 'হে উমর, আমি মুসলিমদের কাছে আপনার নামে অভিযোগ করেছি এবং আল্লাহর শপথ, আপনি আমার প্রতি সদয় নন।' উমর জিজ্ঞেস করলেন, 'এসব সম্পদ কোথা থেকে এসেছে?' তিনি বললেন, 'আমার গনিমতের অংশ থেকে। ৬০ হাজারের অতিরিক্ত যা থাকবে তা আপনার।' উমর সম্পদ গণনা করে ২০ হাজার মুদ্রা বেশি দেখে সেগুলো বায়তুলমালে জমা করেন। এরপর বলেন, 'হে খালিদ, আল্লাহর শপথ, আমি আল্লাহর জন্যই তোমাকে ভালোবাসি এবং আজকের পর তুমি আর কখনো আমার ওপর মনঃক্ষুণ্ণ হবে না।'
উমর রা. প্রদেশে চিঠি পাঠালেন, 'আমি খালিদকে এ জন্য অপসারণ করিনি যে, আমি তাঁর ওপর রাগান্বিত বা তিনি কোনো অসদাচরণ করেছেন; বরং লোকেরা তাঁর প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত হয়ে পড়েছিল। আমার ভয় হলো যে, আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে তাদের পরীক্ষা নেবেন। আমি চেয়েছিলাম তারা উপলব্ধি করুক যে, আল্লাহই একমাত্র সত্তা, যিনি বিজয় দান করেন; আর তারা যেন প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে বিভ্রান্তির শিকার না হয়। ১৪৬১
টিকাঃ
৪৪১. আবাতিল ইয়াজিব আন তুমহা মিনাত তারিখ, সালাহ আদ-দিন আল মুনাজ্জিদ: ১৩১।
৪৪২. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ৩২১-৩২২।
৪৪৩. আল-বিদায়াতু ওয়ান নিহায়াতু: ৭/১১৫।
৪৪৪. আত-তারিখুল ইসলামি: ১/১৪৬।
৪৪৫. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ৩৩১।
৪৪৬. আল-বিদায়াতু ওয়ান নিহায়াতু: ৭/৫১১।
৪৪৭. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ: ৩৩১।
৪৪৮. আল-বিদায়াতু ওয়ান নিহায়াতু: ৭/৫১১।
৪৪৯. আত-তারিখুল ইসলামি: ১/১৪৬।
৪৫০. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ: ৩৩৪।
৪৫১. আল-ফারুক: ২৮৩।
৪৫২. প্রাগুক্ত : ৩৪৬।
৪৫৩. প্রাগুক্ত : ৩২৩।
৪৫৪. নিজামুল হিকামি ফি আহদিল খুলাফায়ির রাশিদিন: ৮৩।
৪৫৫. আবাতিল ইয়াজিব আন-তুমহা মিনাত তারিখ: ১৩২।
৪৫৬. আবকারিয়াতু খালিদ, আল আক্কাদ: ১৫৪, ১৫৫-১৫৬।
৪৫৭. তারিখুত তাবারি: ৫/৪১।
৪৫৮. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ৩২৪।
৪৫৯. প্রাগুক্ত: ৩৪৭; আল-কামিল ফিত-তারিখ: ২/১৫৬।
৪৬০. খালিদ ইবনল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ৩৪৭।
১৪৬১. তারিখুত তাবারি: ৫/৪৩।
ইসলামের শত্রুরা সবসময় সুযোগ খুঁজে বেড়ায়। মুসলিমদের ক্ষতি করা যায়, এমন কোনো সুযোগই তাই হাতছাড়া করতে চায় না। তারা সাহাবিদের মধ্যে সংঘটিত ঘটনাবলির ভুল ব্যাখ্যা করে তাঁদের সম্মানে দাগ লাগাতে চেষ্টা করে। যখন তাদের শয়তানি উদ্দেশ্য পূরণে সফল হতে পারে না, তখন নিজেরাই এমন কিছু মনগড়া বর্ণনা তৈরি করে, যাতে পাঠকের অন্তরে সহজেই সাহাবিদের সম্পর্কে খারাপ ধারণা চলে আসে। এ লক্ষ্যেই তারা উমর ও খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পবিত্র সোনালি ইতিহাসকে কলঙ্কিত করতে মনগড়া বর্ণনাগুলো ছড়িয়ে দেয়। উমরের পক্ষ থেকে খালিদকে অপসারণের কারণগুলোর ভুল ব্যাখ্যা করে। ব্যক্তিত্ববান উভয় সাহাবির নামে ভিত্তিহীন অপবাদ লাগায়। তাঁদের বিরুদ্ধে এমন কিছু বর্ণনাকে দলিল বানায়, যার কোনো ভিত্তিই নেই এবং সত্যানুসন্ধানীদের কাছে এসব কথাবার্তা অসার-অবান্তর বলে গণ্য। ৪৪১ খালিদের অপসারণের ঘটনাবলি কোনো ধরনের রদবদল ছাড়া পূর্ণ সততার সঙ্গে বর্ণনা করব। তাঁর অপসারণ দুই স্থানে দুবার ঘটে। প্রত্যেকটার কারণও ছিল ভিন্ন ভিন্ন।
১. প্রথমবার অপসারণ
উমর রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে সিরিয়ার সেনাপ্রধান ও প্রধান প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করেন। এ অপসারণটা করা হয় আবু বকরের ইনতিকালের পর উমরের খিলাফতকালের একদম শুরুর দিকে ১৩ হিজরিতে। এর কারণ হচ্ছে, আবু বকর ও উমরের শাসনপদ্ধতিতে অনেকটা পার্থক্য ছিল। আবু বকরের শাসনপদ্ধতি ছিল- তিনি তাঁর গভর্নরদের রাষ্ট্রের সব ধরনের কাজে মানুষের একক ও সমষ্টিগত সদস্যের ওপর ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার শর্তে কার্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা—এটা নিজের হাতে হোক বা গভর্নরদের হাতে। খলিফার পক্ষ থেকে সকল গভর্নরের জন্য এ অনুমতি ছিল যে, রাজ্যের ছোট-बড় কাজে যেটা ভালো মনে হবে সেটাই করবে। এর জন্য চিঠির মাধ্যমে খলিফার পক্ষ থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। যতক্ষণ গভর্নর আর্থিক বা রাজ্যের অন্যান্য কাজে ইনসাফ বজায় রাখবে, তাকে তার দায়িত্ব থেকে অপসারণের প্রয়োজন নেই। ৪৪২
একবার উমর রা. আবু বকরকে বললেন, ‘আপনি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে চিঠি লিখে বলুন, তিনি যেন আপনার অনুমতি ছাড়া কাউকে একটা ছাগল বা উটও না দেন।’ আবু বকর খালিদের নামে এ আদেশ লিখে চিঠি পাঠান। উত্তরে খালিদ লেখেন, ‘আমি যেভাবে কাজ করছি সেভাবেই কাজ করতে দেন; নাহয় আপনি জানেন আর আপনার কাজ জানে।’
তাঁর এ উত্তর দেখে উমর তাঁকে অপসারণ করতে পরামর্শ দেন; ৪৪৩ কিন্তু আবু বকর তাঁকে তাঁর স্থানে বহাল রাখেন। ৪৪৪
এরপর উমর রা. যখন খলিফার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন তিনি তাঁর সংবিধানে গভর্নদের ইচ্ছা-স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে দেন। গভর্নরদের জন্য আবশ্যক করে দেন, গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ যখন সামনে আসবে, তখন সেটা সম্পর্কে খলিফাকে অবগত করতে হবে এবং কাজের যে ফল আসবে, সেটাও খলিফার আদেশক্রমে বাস্তবায়ন করবে।
তিনি মনে করতেন, খলিফা তাঁর দায়িত্বের ব্যাপারে এবং প্রজাদের ওপর অর্পিত গভর্নরদের দায়িত্বের ব্যাপারেও দায়িত্বশীল। আর এটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যে, কোনো গভর্নর যদি ভুলক্রমে ত্রুটি বা ক্ষতি করে বসে, তাহলে খলিফার এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, আমি তো সঠিকভাবে গভর্নর নির্বাচন করেছি।
তিনি খিলাফতের দায়িত্ব নেওয়ার সময় লোকদের সামনে দেওয়া ভাষণে বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের মাধ্যমে আমাকে পরীক্ষা করছেন। আর আমার মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা করছেন। আমার দুই সাথির (মুহাম্মাদ ও আবু বকর রা.) পর তিনি আমাকে বাকি রেখেছেন। আল্লাহর শপথ, তোমাদের কারও কোনো বিষয় যদি আমার কাছে পৌঁছায়; অথবা আমার কাছে পৌঁছতে কেউ বাধা দেয়, তাহলে আমি তার বদলা ও আমানত যথাযথভাবে পূরণ করব। গভর্নররা যদি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, তাহলে আমি তাদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করব; তারা অপরাধ করলে আমি তাদেরও কঠিন শাস্তি দেবো।'৪৪৫
উমর রা. জিজ্ঞেস করেন, 'আমি যদি সঠিক ব্যক্তিকে তোমাদের দায়িত্বশীল বানাই; আর তাকে যদি ইনসাফের আদেশ করি, তাহলে কি আমার দায়িত্ব পালন করা হয়ে যাবে?' লোকেরা বলেন, 'জি হ্যাঁ।' উমর বলেন, 'না; বরং ততক্ষণ আমার দায়িত্ব আদায় হবে না, যতক্ষণ আমি দেখব না যে, সে আমার কথামতো কাজ করেছে কি না।'৪৪৬
তিনি দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে আবু বকরের নির্ধারিত গভর্নরদের তাঁর প্রণীত সংবিধানমতো চালানোর চেষ্টা করেন। তাঁদের কেউ কেউ তাঁর এ নিয়মনীতি গ্রহণ করেন; আর কেউ কেউ মানতে অস্বীকৃতি জানান। অস্বীকারকারীদের মধ্যে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.-ও ছিলেন।৪৪৭
মালিক ইবনু আনাস রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, উমর দায়িত্ব গ্রহণের পর খালিদকে চিঠি লিখে বলেন, 'আমার অনুমতি ছাড়া কাউকে একটা উট বা ছাগলও দেবেন না।' খালিদ তাঁর উত্তরে বলেন, 'আমি যেভাবে কাজ করছি সেভাবে কাজ করতে দেন; নাহয় আপনার কাজ আপনাকে সোপর্দ করলাম।'
উমর বলেন, 'আমি আবু বকরকে যে জিনিসের দিকে ইঙ্গিত করেছিলাম, সেটা যদি এখন বাস্তবায়ন না করি, তাহলে আল্লাহর কাছে আমি সত্যবাদী থাকব না।' তারপরই তিনি খালিদকে অপসারণ করেন।৪৪৮
এরপর বার বার উমর রা. তাঁকে গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, 'আমার কাজে স্বাধীনতা থাকতে হবে। আমি যা ইচ্ছা করব।' কিন্তু উমর তাঁর এ সিদ্ধান্তের কারণে গভর্নর নিযুক্ত করা থেকে বিরত থেকেছেন।৪৪৯
সুতরাং জানা গেল, উমর সাংবিধানিক কারণেই খালিদকে অপসারণ করেন। শাসক তার সকল দায়িত্বশীলের ওপর দায়িত্বশীল। তার অধিকার আছে রাষ্ট্রের যেকোনো কাজে হস্তক্ষেপ করার। রাজনৈতিক জীবনে এ ধরনের ঘটনা কারও না কারও সঙ্গে ঘটবেই; এটা স্বাভাবিকতা। খালিদের অপসারণের ঘটনায় এমন কোনো নজরবিহীন কারণ পাওয়া যায়নি, যা সাব্যস্ত করতে অসার আর অগ্রহণযোগ্য বর্ণনার আশ্রয় নিতে হবে।
আরও একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, উমর রা. যে সময়টাতে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন সবাই পূর্ণ ব্যক্তিত্ববান মানুষ ছিলেন। নবুওয়াতের পরশে তাঁরা ছিলেন সুসংগঠিত। আর গভর্নরের জন্য প্রথমত একটা শর্ত হচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনার যাবতীয় শর্তের সঙ্গে যিনি একমত হতে পারবেন, তাকেই তিনি গভর্নরের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং উম্মতে মুসলিমা যতক্ষণ তার কাজে নিরাপদ ও শান্তিতে থাকবে, ততক্ষণ তিনি তার স্থানে বহাল থাকতে পারবেন। কেননা, কোনো শাসক বা গভর্নরের অধিকার ছিল না, আজীবন তার আসনে বহাল থাকতে পারবেন। বিশেষ করে খলিফা ও গভর্নরের মধ্যে শাসনপদ্ধতিতে মতানৈক্য দেখা দিলে তখন কাউকে অপসারণ করাটা দূষণীয় কিছু নয়।
ইতিহাসের ঘটনাবলি সাক্ষী, উমর রা. আল্লাহর তাওফিকে তাঁর পূর্ণ খিলাফতকালে অতুলনীয় সফলতা অর্জন করেন। একজনকে অপসারণ করে সঙ্গে সঙ্গে অন্যজনকে সে দায়িত্বে বসিয়ে দিতেন। যাকে পরে দায়িত্বে বসাতেন, তিনি আগের জনের চেয়ে কম উপযুক্ত হতেন না। আসল কথা হচ্ছে, এটা ইসলামের আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলার ফল, যার ভিত্তি এ কথার ওপর যে, তিনি সর্বদা উম্মতে মুসলিমার জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর এবং রাজনৈতিক গভীর যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদেরই দায়িত্ব প্রদান করতেন। ৪৫০
খালিদ রা. তাঁর অপসারণের চিঠি কোনো আপত্তি ছাড়াই অত্যন্ত মান্যতার সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং আবু উবায়দার নেতৃত্বে জিহাদ করতে থাকেন। আল্লাহ তাঁর হাতে কিন্নাসরিন বিজিত করেন। তারপর আবু উবায়দা খালিদকে সেখানকার আমির নিযুক্ত করে উমরের কাছে এ মর্মে চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি কিন্নাসরিন বিজয়ের বিস্তারিত আলোচনা করেন। উমর তাঁর চিঠি পড়ে বলেন, 'খালিদ নিজেকে নিজে সেখানের আমির বানিয়ে নিল। আল্লাহ আবু বকরের ওপর রহম করুন। তিনি আমার চেয়েও অধিক দূরদর্শী ছিলেন।'
সম্ভবত উমর রা. এটাই বলতে চাচ্ছেন যে, খালিদ স্বভাবগতভাবে সাহসিকতা ও যুদ্ধের বিষয়াদিতে খুবই পারদর্শী। যুদ্ধ, জিহাদ ও সংগ্রামের জন্য তিনি নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন।
ভয়ানক পরিস্থিতিতে প্রাণপণ লড়াই করে যেতে সামান্যতম চিন্তাও করেননি। তা সত্ত্বেও উমর রা. তাঁকে অপসারণের জন্য আবু বকরের কাছে অনেক অনুরোধ করেন; কিন্তু তিনি তাঁকে অপসারণ করেননি। সেটা হয়তো তাঁর প্রতি আবু বকরের এই দৃঢ় বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে, তিনি ছিলেন একজন বীরবাহাদুর ও কৌশলী যোদ্ধা। মুসলিমদের যে কজন হাতেগোনা সাহসী বীর আছেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। ৪৫১ খালিদ আবু উবায়দার নেতৃত্বে চার বছর ছিলেন। ইতিহাস সাক্ষী, কখনো কোনো বিষয়ে আবু উবায়দার সঙ্গে ইবনুল ওয়ালিদের মতপার্থক্য হয়নি। খালিদের মন থেকে তাঁকে অপসারণের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া (বেদনা) দূর করার ক্ষেত্রে আবু উবায়দার কৃতিত্ব অস্বীকার করার নয়। তিনি সর্বদা তাঁকে যথাযথ সম্মান করতেন। তাঁর কথাবার্তা-পরামর্শকে অন্যের তুলনায় অধিক গুরুত্ব দিতেন। অপসারণের পর তাঁকে বিভিন্ন যুদ্ধে অগ্রভাগে রাখার ফলে এতটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে যে, তাঁকে যুদ্ধের ময়দানে এক নজিরবিহীন সাহসের মূর্তপ্রতী হয়ে আবির্ভূত হতে দেখা যায়। দামেশক, কিন্নাসরিন ও ফিহল বিজয় তাঁর উচ্চ আত্মিক দীক্ষার স্বীকৃতি দেয়। এ কারণে তিনি খুব সহজে তাঁর অপসারণ মেনে নেন।
তিনি অপসারণের আগে ও পরে 'সাইফুল্লাহ' হয়েই বেঁচে ছিলেন। ৪৫২ ইতিহাস আবু উবায়দার সোনালি কথাগুলো আমাদের জন্য সংরক্ষিত রেখেছে, যে কথাগুলো তিনি খালিদের অপসারণের পর সহমর্মী হয়ে উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, 'আমি দুনিয়ার বাদশাহি চাই না, চাই না দুনিয়ার জন্য কাজ করতে। আপনি যা কিছু দেখছেন; এগুলোর ধ্বংস অনিবার্য। আমরা দুজন পরস্পর ভাই—উভয়ে মিলে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করতে চাই এবং এটাই সত্য। কারও জন্য এটা দূষণীয় নয় যে, তার দীনি ভাই তার ওপর প্রশাসক হবে। যারা প্রশাসক বা গভর্নর, তারা ভুলত্রুটি ও অপরাধের খুব কাছাকাছি থাকেন। কেবল আল্লাহ যাদের পরম করুণায় রক্ষা করেন, তারাই এসব ভুলত্রুটি থেকে বেঁচে থাকেন।'৪৫৩
আবু উবায়দা তাঁর অধীনে খালিদকে যুদ্ধে যাওয়ার আহ্বান করলে তিনি বলেন, 'ইনশাআল্লাহ, আমি উপস্থিত থাকব। আমি তো আপনার আহ্বানের অপেক্ষায় ছিলাম।' আবু উবায়দা বলেন, 'আবু সুলায়মান, আমি আপনাকে আদেশ করে খুবই লজ্জিত।' খালিদ বলেন, 'আমার ওপরে যদি একজন ছোট্ট বাচ্চাকেও আমির নিযুক্ত করা হতো, তাহলে আমি তার আদেশও যথাযথ মেনে চলতাম। আমি আপনার বিরোধিতা করব কোন যুক্তিতে? আপনার ইমান আমার আগের। আপনি আমার আগে ইসলামগ্রহণ করেছেন। ইসলামের অগ্রগামীদের সঙ্গে আপনিও অগ্রগামী। তাঁদের সঙ্গে খুব দ্রুত সময়ে আপনি ইসলামগ্রহণ করেছেন। রাসুল আপনাকে 'আমিন' উপাধি দিয়েছেন। আমি আপনার সমমর্যাদা ও সম্মান কী করে পাব! আপনার সামনে সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমি নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করেছি। আমি কখনো আপনার বিরোধিতা করব না এবং কোনো রাজ্য শাসনও করব না।'
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. এসব বলেই শুধু ক্ষান্ত হননি; বরং বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন এবং আদেশ পালনে দ্রুত বেরিয়েছেন। তাঁর কথা ও কাজে এটা পরিষ্কার যে, ধর্মীয় ও নৈতিক প্রেরণা খালিদ ও আবু উবায়দার কর্মক্ষেত্রে মুখ্যভূমিকা পালন করেছিল। মুসলিমবাহিনীর সেনাপতির দায়িত্ব থেকে অপসারণের ফলে খালিদের ব্যক্তিগত অবস্থা নেতা থেকে অনুগামীতে পরিবর্তন হওয়া সত্ত্বেও তিনি খলিফা ও গভর্নরকে আনুগত্যের নীতিমালা অনুসরণ করেছিলেন। ৪৫৪
খালিদের প্রথম অপসারণ এ কারণে ছিল না যে, তাঁর যোগ্যতা নিয়ে খলিফার কোনো সন্দেহ, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ক্ষোভ, তিনি শরিয়তের পবিত্র সীমা লঙ্ঘন করেছেন বা খালিদের কর্তব্যনিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতার ওপর কোনো কলঙ্কের দাগ পড়েছে; বরং সেটা ছিল দুজন মহাপুরুষ, দুজন প্রতিপত্তিসম্পন্ন ব্যক্তির গৃহীত দুটি ভিন্ন পদ্ধতি। তাঁদের প্রত্যেকেই ভেবেছিলেন যে, তাঁদের নিজস্ব পদ্ধতির বাস্তবায়ন ছিল অপরিহার্য। তাঁদের মধ্যে কোনো একজনকে ছাড় দিতে বা মেনে নিতে হতো, তাহলে অন্তরে কোনো রকম একগুঁয়েমি, বিরক্তি বা অসন্তোষ পোষণ না করে মুসলিমবাহিনীর সেনাপতিকেই খলিফার কাছে হার মানতে হতো। ৪৫৫
মহান আল্লাহর পথনির্দেশনায় উমর রা. আবু উবায়দা রা.-কে সিরিয়ার মুসলিমবাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করেন। ইয়ারমুকযুদ্ধের পর অঞ্চলটার প্রয়োজন ছিল যুদ্ধনিবৃত্তি, যেন হিংসা-বিদ্বেষ শেষ হয়, আঘাত আরোগ্য লাভ করে এবং অন্তরের পুনর্মিলন সাধিত হয়। আবু উবায়দা যখন সন্ধিস্থাপনের কোনো সুযোগ দেখতেন, তখন ত্বরান্বিত হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ছুটে চলতেন; কিন্তু প্রয়োজনের সময় তিনি যুদ্ধ থেকে পিছপা হননি। শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো পথ যদি থাকত, সেটা অনুসরণ করতেন। অন্যথায় জিহাদের প্রস্তুতি নিতেন।
সিরিয়াবাসী আবু উবায়দার ক্ষমাশীলতার কথা জানত। এ জন্য তারা আত্মসমর্পণ করতে তাঁর কাছে আসে। তারা অন্যের তুলনায় তাঁর মুখোমুখি হওয়া বেশি পছন্দ করত। উমরের নির্দেশে আবু উবায়দাকে সিরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিল। তাঁর নিযুক্তি ছিল প্রাদেশিক কল্যাণের স্বার্থে। ৪৫৬
২. দ্বিতীয়বার অপসারণ
১৭ হিজরিতে কিন্নাসরিনে খালিদকে দ্বিতীয়বার অপসারণ করা হয়। উমরের কাছে খবর পৌঁছায়, খালিদ ও ইয়াজ ইবনু গানাম বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে অনুপ্রবেশ করে বিপুল পরিমাণ গনিমত নিয়ে ফিরেছেন। খালিদের বদান্যতার আশায় লোকেরা দূরদূরান্ত থেকে তাঁর কাছে আসছে। লোকদের মধ্যে ছিল আশআস ইবনু কায়েস আল কিনদি। খালিদ রা. তাকে ১০ হাজার মুদ্রা দিয়েছিলেন। খালিদের কর্মকান্ডের কিছুই উমরের কাছে গোপন ছিল না।৪৫৭
উমর রা. তাঁর সেনাপতি আবু উবায়দার কাছে চিঠি লিখলেন। খালিদ রা. যে উৎস থেকে আশআসকে মোটা অঙ্কের সম্পদ দিয়েছেন, উমর তাঁকে তা অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়ে খালিদকে সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি দেন। তিনি তাঁকে মদিনায় ডেকে আবু উবায়দার উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। অবশেষে গনিমত থেকে ১০ হাজার মুদ্রা চুরির অপবাদ থেকে খালিদ নির্দোষ প্রমাণিত হন।৪৫৮
খালিদকে তাঁর অপসারণের কথা জানানো হলে তিনি সিরিয়াবাসীর কাছ থেকে বিদায় নেন। সেনাবাহিনী থেকে সেনাপতির বিচ্ছেদ-বেদনার সামান্যই তিনি দৃষ্টিগোচর করা শোভনীয় মনে করেছিলেন। তিনি যে ব্যথা অনুভব করেছিলেন, তা প্রকাশ পেয়েছিল জনসাধারণের উদ্দেশে তাঁর বিদায়ী কথামালায়— 'সিরিয়ায় শান্ত-সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমিরুল মুমিনিন আমাকে সিরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। এরপর তিনি আমাকে অপসারণ করেছেন।'
একজন তখন দাঁড়িয়ে বলল, 'ধৈর্য ধরুন সেনাপতি। কারণ, এখন তো ফিতনার সময়।' খালিদ বললেন, 'খাত্তাবের পুত্র যতদিন জীবিত, ততদিন ফিতনার অবকাশ নেই। ৪৫৯
এটি ছিল শক্তিশালী ও অভিভূতকারী ইমানের বহিঃপ্রকাশ। মুহাম্মাদ ﷺ-এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সাহাবিদের মধ্যে যাঁরা মনোনীত ছিলেন, কেবল তাঁরাই এমন ইমানের অধিকারী ছিলেন। কী সেই পারলৌকিক শক্তি, যা এমন রাশভারী পরিস্থিতিতেও খালিদকে দমিয়ে রেখেছিল। সেটা কী ছিল, যার কারণে তিনি এমন শান্তিপূর্ণ ও বিচক্ষণ জবাব দিয়েছিলেন? ৪৬০
উমরের খিলাফতের সমর্থনে খালিদের কথাগুলো শোনার পর লোকেরা শান্ত হয়ে গেল। তারা উপলব্ধি করল যে, তাদের অপসারিত সেনাপতি এমন ব্যক্তি নন, যিনি হতাশা ও বিপ্লব উদ্রেক করে নিজের গরিমা গড়ে তুলবেন; বরং গঠনমূলক ভূমিকা পালনের জন্য যাঁদের সৃষ্টি করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন তাঁদের একজন। যদি পরিস্থিতি কখনো তাঁদের কাছে নিজেদের গড়ে তোলা সাম্রাজ্য বা গৌরবও ভেঙে ফেলার দাবি জানায়, তখন তাঁরা আরও ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন।
খালিদ রা. মদিনায় গিয়ে উমরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। উমর রা. তখন তাঁর সম্মানে আবৃত্তি করেন,
তুমি বিজয়ের এমন গৌরবগাথা তৈরি করেছ,
যা তোমার মতো করে আর কেউ পারেনি।
কিন্তু বাস্তবতা কী? মানুষ আসলে যা করে,
সবকিছুর প্রকৃত কর্তাই মূলত আল্লাহ।
খালিদ উমরকে বললেন, 'হে উমর, আমি মুসলিমদের কাছে আপনার নামে অভিযোগ করেছি এবং আল্লাহর শপথ, আপনি আমার প্রতি সদয় নন।' উমর জিজ্ঞেস করলেন, 'এসব সম্পদ কোথা থেকে এসেছে?' তিনি বললেন, 'আমার গনিমতের অংশ থেকে। ৬০ হাজারের অতিরিক্ত যা থাকবে তা আপনার।' উমর সম্পদ গণনা করে ২০ হাজার মুদ্রা বেশি দেখে সেগুলো বায়তুলমালে জমা করেন। এরপর বলেন, 'হে খালিদ, আল্লাহর শপথ, আমি আল্লাহর জন্যই তোমাকে ভালোবাসি এবং আজকের পর তুমি আর কখনো আমার ওপর মনঃক্ষুণ্ণ হবে না।'
উমর রা. প্রদেশে চিঠি পাঠালেন, 'আমি খালিদকে এ জন্য অপসারণ করিনি যে, আমি তাঁর ওপর রাগান্বিত বা তিনি কোনো অসদাচরণ করেছেন; বরং লোকেরা তাঁর প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত হয়ে পড়েছিল। আমার ভয় হলো যে, আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে তাদের পরীক্ষা নেবেন। আমি চেয়েছিলাম তারা উপলব্ধি করুক যে, আল্লাহই একমাত্র সত্তা, যিনি বিজয় দান করেন; আর তারা যেন প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে বিভ্রান্তির শিকার না হয়। ১৪৬১
টিকাঃ
৪৪১. আবাতিল ইয়াজিব আন তুমহা মিনাত তারিখ, সালাহ আদ-দিন আল মুনাজ্জিদ: ১৩১।
৪৪২. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ৩২১-৩২২।
৪৪৩. আল-বিদায়াতু ওয়ান নিহায়াতু: ৭/১১৫।
৪৪৪. আত-তারিখুল ইসলামি: ১/১৪৬।
৪৪৫. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ৩৩১।
৪৪৬. আল-বিদায়াতু ওয়ান নিহায়াতু: ৭/৫১১।
৪৪৭. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ: ৩৩১।
৪৪৮. আল-বিদায়াতু ওয়ান নিহায়াতু: ৭/৫১১।
৪৪৯. আত-তারিখুল ইসলামি: ১/১৪৬।
৪৫০. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ: ৩৩৪।
৪৫১. আল-ফারুক: ২৮৩।
৪৫২. প্রাগুক্ত : ৩৪৬।
৪৫৩. প্রাগুক্ত : ৩২৩।
৪৫৪. নিজামুল হিকামি ফি আহদিল খুলাফায়ির রাশিদিন: ৮৩।
৪৫৫. আবাতিল ইয়াজিব আন-তুমহা মিনাত তারিখ: ১৩২।
৪৫৬. আবকারিয়াতু খালিদ, আল আক্কাদ: ১৫৪, ১৫৫-১৫৬।
৪৫৭. তারিখুত তাবারি: ৫/৪১।
৪৫৮. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ৩২৪।
৪৫৯. প্রাগুক্ত: ৩৪৭; আল-কামিল ফিত-তারিখ: ২/১৫৬।
৪৬০. খালিদ ইবনল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ৩৪৭।
১৪৬১. তারিখুত তাবারি: ৫/৪৩।
📄 সেনাপতির দায়িত্ব থেকে খালিদকে অপসারণের কারণ এবং এর কল্যাণকর কিছু দিক
উমরের রাষ্ট্রপরিচালনা পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে খালিদের অপসারণের কারণসমূহ আমরা সংক্ষেপে নিম্নে উপস্থাপন করতে পারি :
১. তাওহিদের সংরক্ষণ
উমরের কথা ছিল, 'লোকেরা তাঁর মাধ্যমে ফিতনায় নিপতিত হচ্ছিল। আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, এমন হয়ে যাবে না তো আবার যে, সাধারণ মানুষ তাঁর ওপরই ভরসা করে বসবে এবং তাঁর কারণে আল্লাহর পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে যাবে।' এ কথা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কারণে লোকেরা ফিতনায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলেন তিনি। তারা হয়তো এমন মনে করতে শুরু করবে, এই বিজয়ধারা ও সাহায্য খালিদের সঙ্গেই নির্দিষ্ট। এতে ক্ষতি হবে, আল্লাহর ওপর তাদের ইমান ও বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যাবে।
উমরের এই সতর্কতাগ্রহণমূলক পদক্ষেপ তাঁর প্রচেষ্টা ও ইচ্ছার বাস্তবায়ন ছিলমাত্র। তাঁর ইচ্ছা ছিল, সাম্রাজ্যের প্রতিটা স্তরে খালিস তাওহিদ ও ইসলামি আকিদাকে জীবন্ত করা। বিশেষ করে সে সময়টাতে, যখন আকিদা ও আকিদার শক্তির প্রতিপত্তিতেই মুসলিম সাম্রাজ্য তার শত্রুদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছিল। হতে পারত, খালিদের মতো মহান সেনাপতি অহংকারের বশবর্তী হয়ে নিজেও ফিতনায় নিপতিত হবেন, জনসাধারণকেও ফিতনায় আপতিত করবেন। আর নিজের শক্তি ও সাহসিকতাকে পরাক্রমশালী মনে করে বসবেন। এর পরিণাম যা হবে, খালিদ নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন; আর ইসলামি সাম্রাজ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবেন।
বাস্তবতা হচ্ছে, মুসলিমবাহিনীর নেতৃত্বের জন্য যে যোগ্যতার প্রয়োজন ছিল, সবই খালিদের মধ্যে ছিল। তিনি আপাদমস্তক তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত ছিলেন। এমতাবস্থায় যদিও উমরের সেই আশঙ্কা অভাবনীয় মনে হয়, তবে তাঁর মৃত্যুর পর অদূর ভবিষ্যতে খালিদের মতো মহান সেনাপতিকে ঘিরে কোনো ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না; এটাও একেবারে নিশ্চিত হওয়া যায় না। সবকিছু বিবেচনায় রেখেই মূলত খালিদের মতো মহান সেনাপতির যুদ্ধযুগেই ফিতনা মাথাচাড়া দেওয়ার সব পথ রুদ্ধ করে দেন উমর রা.।৪৬২
এটা তো সুস্পষ্ট বিষয় যে, একজন সাধারণ সেনাপতি, যিনি পুরোপুরিভাবে পরীক্ষিত নন এবং যার কীর্তির ঝুলিতেও তেমন কিছু নেই; তার বিপরীতে একজন যোগ্য, পরীক্ষিত ও কীর্তিমান সেনাপতির ক্ষেত্রে ফিতনার আশঙ্কা আসলেই বেশি থাকে। ৪৬৩ মিসরের কবি হাফিজ ইবরাহিম তাঁর কাব্যগ্রন্থে উমর ফারুকের এই আশঙ্কার দিকেই ইশারা করেছেন,
আর বলা হলো, হে ফারুক, আমাদের সঙ্গী (সেনাপতি)-এর ব্যাপারে
আপনি সঠিক ফায়সালা করেননি; অথচ ধনুকের মালিকই তাঁকে ধনুক দান করেছিলেন।
তখন উমর উত্তর দিলেন,
তাঁর কারণে মুসলিমরা ফিতনায় নিপতিত হবে বলে আমি আশঙ্কা করেছি।
আর যখন জনসাধারণ ফিতনায় নিপতিত হয়, তখন তা নির্বাপিত করবে, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না।৪৬৪
২. অর্থসম্পদ ব্যয়ের পদ্ধতি নিয়ে খালিদ ও উমরের মতানৈক্য
উমর রা. ভেবেছিলেন যে, দুর্বল ইমানের লোকদের অর্থসম্পদ ও উপহার দিয়ে মন জয় ও আকৃষ্ট করার সময় শেষ হয়ে এসেছে; ইসলামে আর এসব লোকের প্রয়োজন নেই এবং তাদের নিজেদের ইমান ও বিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায়। অন্যদিকে খালিদ রা. ভেবেছিলেন যে, যে-সকল সাহসী যোদ্ধা ও মুজাহিদ তাঁর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন, তাঁদের নিয়ত পুরোপুরি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ছিল না এবং এ সকল লোককে আরও দৃঢ়সংকল্প ও অনুপ্রাণিত করতে অর্থসম্পদের একটা অংশের প্রয়োজন ছিল।৪৬৫
উমর ভেবেছিলেন, মুহাজিরদের দরিদ্ররাই এ সম্পদের অধিক হকদার। তিনি আল জাবিইয়াতে খালিদ রা.-কে অপসারণের কারণসমূহ জনসাধারণের উদ্দেশে ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলেন, 'আমি তাঁকে বলেছিলাম, এ অর্থ-সম্পদ দরিদ্র মুহাজিরদের মধ্যে বণ্টন করতে; কিন্তু তিনি সামর্থ্যবান ও শক্তিশালী লোকদের মধ্যেও তা বণ্টন করেছেন। '৪৬৬
নিশ্চিতভাবেই উমর ও খালিদ উভয়ের নিজেদের অবস্থানের পেছনে শক্ত ভিত ছিল; কিন্তু উমর এমন কিছু বিষয় উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, যা খালিদ পারেননি। ৪৬৭
৩. প্রশাসনিক বিষয়ে উমর ও খালিদের কর্মপদ্ধতির তারতম্য
উমর দৃঢ়তার সঙ্গে বলতেন, প্রত্যেক ছোট-बড় বিষয়ে গভর্নরদের তাঁর অনুমতি নেওয়া উচিত। অন্যদিকে খালিদ ভাবতেন, জিহাদের ময়দানে তিনি পূর্ণ স্বাধীনতার অধিকারী ছিলেন। তাঁর কারও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। তিনি ভাবতেন, ময়দানে তিনি যেটা যথোচিত মনে করেন, তাঁকে সেটা করার স্বাধীনতা দেওয়া উচিত। কারণ, জিহাদের ময়দানে উপস্থিত ব্যক্তি যা দেখে, অনুপস্থিত ব্যক্তি তা দেখে না। ৪৬৮
সম্ভবত আরেকটা কারণ ছিল, নতুন নেতৃত্ব-প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেওয়া, যেন মুসলিম উম্মাহ খালিদ, মুসান্না ও আমর ইবনুল আসের মতো ধীশক্তিসম্পন্ন মহানায়কের জন্ম দিতে পারে। আরেকটা লক্ষ্য ছিল, জনসাধারণের মধ্যে বোধশক্তির উদয় ঘটানো যে, বিজয় একজনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়; সে যে-ই হোক না কেন। ৪৬৯
৪. খালিদের অপসারণের প্রতি মুসলিমসমাজের মনোভাব
খলিফা কর্তৃক তাঁর গভর্নরদের নিয়োগ ও অপসারণের অধিকার হিসেবে মুসলিমসমাজ এ অপসারণকে গ্রহণ করেছে। এ পদ্ধতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বা খলিফা কর্তৃক তাঁর গভর্নরদের নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা অস্বীকারের অধিকার কারও ছিল না।
বর্ণিত আছে; একবার মধ্যরাতে উমর রা. বাইরে বেরোলে আলকামা ইবনু উলাসাহ কিলাবির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। উমরের সঙ্গে খালিদের ভীষণ মিল থাকায় আলকামা ভেবেছিলেন তিনি খালিদ। তিনি বললেন, 'হে খালিদ, এই লোক আপনাকে অপসারণ করে হীন আচরণ করেছে। আমি আমার এক ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর কাছে কিছু চাইতে এসেছিলাম; কিন্তু তিনি যা করেছেন, তাই আমি তাঁর কাছে কখনো কোনোকিছু চাইব না।'
তিনি কী লুকোতে চেষ্টা করছেন, সেটা জানার জন্য উমর তাঁকে বললেন, 'বেশ, আমাকে আরও কিছু বলুন।' তিনি বললেন, 'আমাদের ওপর এ সকল মানুষের হক আছে, আমাদের তা আদায় করতে হবে এবং আল্লাহ আমাদের পুরস্কৃত করবেন।'
পরদিন সকালে আলকামা রা. যখন তাঁদের উভয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তখন উমর খালিদকে জিজ্ঞেস করলেন, 'গত রাতে আলকামা আপনাকে কী বলেছে?' খালিদ বললেন, 'আল্লাহর শপথ, তিনি কিছুই বলেননি।' তখন উমর জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কি শপথ করে এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছেন?'
আলকামা রা. মনঃক্ষুন্ন হয়ে ভাবলেন যে, গত রাতে তিনি খালিদ ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেননি। এরপর তিনি বলা শুরু করলেন, 'হে খালিদ, বলে ফেলুন।'
উমর আলকামার প্রতি উদার ছিলেন এবং তাঁর প্রয়োজন পূরণ করেছিলেন। তিনি বললেন, 'আপনার মতো চিন্তা করে— যদি এমন আরও লোকের সন্ধান মিলত— অর্থাৎ, যারা শাসকের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করা সত্ত্বেও তাঁকে মান্য করে, তাহলে তাঁরা আমার কাছে অমুক এবং অমুকের চেয়ে অধিক প্রিয় হতো।'৪৭০
মুসলিমসমাজে সবাই তাঁকে এত সম্মান ও আনুগত্য দেখানোর পরও কিছু অভিযোগ আসে তাঁর নামে। যেমন, জাবিইয়ায় উমর রা. যখন জনসাধারণের উদ্দেশে বলেছিলেন, 'আমি তোমাদের বলব যে, কেন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে আমি অপসারণ করেছি— আমি তাঁকে মুহাজির দরিদ্রদের মধ্যে এ অর্থ-সম্পদ বণ্টনের নির্দেশ দিয়েছিলাম; কিন্তু সামর্থ্যবান ও শক্তিশালীদের মধ্যে যারা উচ্চপদস্থ ও বাকপটু, তিনি তাদের এ সম্পদ দান করেছেন। ফলে আমি তাঁকে অপসারণ করে তাঁর স্থলে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে নিযুক্ত করেছি।' তখন আবু আমর ইবনুল আস ইবনু মুগিরা বলেন, 'হে উমর ইবনুল খাত্তাব, আল্লাহর শপথ, আপনি ইনসাফ করেননি। আল্লাহর রাসুলের নিযুক্ত একজন সেনাপতিকে আপনি অপসারণ করেছেন। রাসুল ﷺ যে তরবারি কোষমুক্ত করেছিলেন, আপনি তা কোষবদ্ধ করেছেন। রাসুল ﷺ যে ঝান্ডা উত্তোলন করেছেন, আপনি তা অবনমিত করেছেন। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে আপনার চাচাতো ভাইয়ের প্রতি ঈর্ষা প্রদর্শন করেছেন।'
উমর ইবনুল খাত্তাব বললেন, 'আপনার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং আপনি বয়সেও তরুণ। আপনার চাচাতো ভাইয়ের জন্যই আপনি ক্রুদ্ধ। '৪৭২
এভাবে উমর রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের চাচাতো ভাইয়ের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করলেন, যিনি খালিদের পক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে উমরকে পরশ্রীকাতরতার দোষে অভিযুক্ত করেছিলেন; কিন্তু তা সত্ত্বেও উমর ধৈর্যশীল ছিলেন।
টিকাঃ
৪৬২. আদ-দাওলাতুল ইসলামিয়া ফি আসরিল খুলাফায়ির রাশিদিন, হামদি শাহিন: ১৪৯।
৪৬৩. আবকারিয়াতু উমর: ১৫৮।
৪৬৪. হুরুবুল ইসলাম ফিশ শাম: ৫৬৬।
৪৬৫. আবাতিল ইয়াজিব: ১৩৪।
৪৬৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১১৫।
৪৬৭. আত-তারিখুল ইসলামি: ১১/১৪৭।
৪৬৮. আল-খিলাফা ওয়া খুলাফাউ রাশিদুন, সালিম আল বাহনাসাউই: ১৯৬।
৪৬৯. আবাতিল ইয়াজিব: ১৩৪।
৪৭০. আদ-দাউলাতুল ইসলামিয়াহ ফি আসর আল-খুলাফা আর রাশিদিন: ১৫১।
৪৭২. সহিহ আত-তাওসিক ফি সিরাতি ওয়া হায়াতিল ফারুক : ২১৯।
উমরের রাষ্ট্রপরিচালনা পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে খালিদের অপসারণের কারণসমূহ আমরা সংক্ষেপে নিম্নে উপস্থাপন করতে পারি :
১. তাওহিদের সংরক্ষণ
উমরের কথা ছিল, 'লোকেরা তাঁর মাধ্যমে ফিতনায় নিপতিত হচ্ছিল। আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, এমন হয়ে যাবে না তো আবার যে, সাধারণ মানুষ তাঁর ওপরই ভরসা করে বসবে এবং তাঁর কারণে আল্লাহর পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে যাবে।' এ কথা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কারণে লোকেরা ফিতনায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলেন তিনি। তারা হয়তো এমন মনে করতে শুরু করবে, এই বিজয়ধারা ও সাহায্য খালিদের সঙ্গেই নির্দিষ্ট। এতে ক্ষতি হবে, আল্লাহর ওপর তাদের ইমান ও বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যাবে।
উমরের এই সতর্কতাগ্রহণমূলক পদক্ষেপ তাঁর প্রচেষ্টা ও ইচ্ছার বাস্তবায়ন ছিলমাত্র। তাঁর ইচ্ছা ছিল, সাম্রাজ্যের প্রতিটা স্তরে খালিস তাওহিদ ও ইসলামি আকিদাকে জীবন্ত করা। বিশেষ করে সে সময়টাতে, যখন আকিদা ও আকিদার শক্তির প্রতিপত্তিতেই মুসলিম সাম্রাজ্য তার শত্রুদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছিল। হতে পারত, খালিদের মতো মহান সেনাপতি অহংকারের বশবর্তী হয়ে নিজেও ফিতনায় নিপতিত হবেন, জনসাধারণকেও ফিতনায় আপতিত করবেন। আর নিজের শক্তি ও সাহসিকতাকে পরাক্রমশালী মনে করে বসবেন। এর পরিণাম যা হবে, খালিদ নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন; আর ইসলামি সাম্রাজ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবেন।
বাস্তবতা হচ্ছে, মুসলিমবাহিনীর নেতৃত্বের জন্য যে যোগ্যতার প্রয়োজন ছিল, সবই খালিদের মধ্যে ছিল। তিনি আপাদমস্তক তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত ছিলেন। এমতাবস্থায় যদিও উমরের সেই আশঙ্কা অভাবনীয় মনে হয়, তবে তাঁর মৃত্যুর পর অদূর ভবিষ্যতে খালিদের মতো মহান সেনাপতিকে ঘিরে কোনো ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না; এটাও একেবারে নিশ্চিত হওয়া যায় না। সবকিছু বিবেচনায় রেখেই মূলত খালিদের মতো মহান সেনাপতির যুদ্ধযুগেই ফিতনা মাথাচাড়া দেওয়ার সব পথ রুদ্ধ করে দেন উমর রা.।৪৬২
এটা তো সুস্পষ্ট বিষয় যে, একজন সাধারণ সেনাপতি, যিনি পুরোপুরিভাবে পরীক্ষিত নন এবং যার কীর্তির ঝুলিতেও তেমন কিছু নেই; তার বিপরীতে একজন যোগ্য, পরীক্ষিত ও কীর্তিমান সেনাপতির ক্ষেত্রে ফিতনার আশঙ্কা আসলেই বেশি থাকে। ৪৬৩ মিসরের কবি হাফিজ ইবরাহিম তাঁর কাব্যগ্রন্থে উমর ফারুকের এই আশঙ্কার দিকেই ইশারা করেছেন,
আর বলা হলো, হে ফারুক, আমাদের সঙ্গী (সেনাপতি)-এর ব্যাপারে
আপনি সঠিক ফায়সালা করেননি; অথচ ধনুকের মালিকই তাঁকে ধনুক দান করেছিলেন।
তখন উমর উত্তর দিলেন,
তাঁর কারণে মুসলিমরা ফিতনায় নিপতিত হবে বলে আমি আশঙ্কা করেছি।
আর যখন জনসাধারণ ফিতনায় নিপতিত হয়, তখন তা নির্বাপিত করবে, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না।৪৬৪
২. অর্থসম্পদ ব্যয়ের পদ্ধতি নিয়ে খালিদ ও উমরের মতানৈক্য
উমর রা. ভেবেছিলেন যে, দুর্বল ইমানের লোকদের অর্থসম্পদ ও উপহার দিয়ে মন জয় ও আকৃষ্ট করার সময় শেষ হয়ে এসেছে; ইসলামে আর এসব লোকের প্রয়োজন নেই এবং তাদের নিজেদের ইমান ও বিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায়। অন্যদিকে খালিদ রা. ভেবেছিলেন যে, যে-সকল সাহসী যোদ্ধা ও মুজাহিদ তাঁর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন, তাঁদের নিয়ত পুরোপুরি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ছিল না এবং এ সকল লোককে আরও দৃঢ়সংকল্প ও অনুপ্রাণিত করতে অর্থসম্পদের একটা অংশের প্রয়োজন ছিল।৪৬৫
উমর ভেবেছিলেন, মুহাজিরদের দরিদ্ররাই এ সম্পদের অধিক হকদার। তিনি আল জাবিইয়াতে খালিদ রা.-কে অপসারণের কারণসমূহ জনসাধারণের উদ্দেশে ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলেন, 'আমি তাঁকে বলেছিলাম, এ অর্থ-সম্পদ দরিদ্র মুহাজিরদের মধ্যে বণ্টন করতে; কিন্তু তিনি সামর্থ্যবান ও শক্তিশালী লোকদের মধ্যেও তা বণ্টন করেছেন। '৪৬৬
নিশ্চিতভাবেই উমর ও খালিদ উভয়ের নিজেদের অবস্থানের পেছনে শক্ত ভিত ছিল; কিন্তু উমর এমন কিছু বিষয় উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, যা খালিদ পারেননি। ৪৬৭
৩. প্রশাসনিক বিষয়ে উমর ও খালিদের কর্মপদ্ধতির তারতম্য
উমর দৃঢ়তার সঙ্গে বলতেন, প্রত্যেক ছোট-बড় বিষয়ে গভর্নরদের তাঁর অনুমতি নেওয়া উচিত। অন্যদিকে খালিদ ভাবতেন, জিহাদের ময়দানে তিনি পূর্ণ স্বাধীনতার অধিকারী ছিলেন। তাঁর কারও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। তিনি ভাবতেন, ময়দানে তিনি যেটা যথোচিত মনে করেন, তাঁকে সেটা করার স্বাধীনতা দেওয়া উচিত। কারণ, জিহাদের ময়দানে উপস্থিত ব্যক্তি যা দেখে, অনুপস্থিত ব্যক্তি তা দেখে না। ৪৬৮
সম্ভবত আরেকটা কারণ ছিল, নতুন নেতৃত্ব-প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেওয়া, যেন মুসলিম উম্মাহ খালিদ, মুসান্না ও আমর ইবনুল আসের মতো ধীশক্তিসম্পন্ন মহানায়কের জন্ম দিতে পারে। আরেকটা লক্ষ্য ছিল, জনসাধারণের মধ্যে বোধশক্তির উদয় ঘটানো যে, বিজয় একজনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়; সে যে-ই হোক না কেন। ৪৬৯
৪. খালিদের অপসারণের প্রতি মুসলিমসমাজের মনোভাব
খলিফা কর্তৃক তাঁর গভর্নরদের নিয়োগ ও অপসারণের অধিকার হিসেবে মুসলিমসমাজ এ অপসারণকে গ্রহণ করেছে। এ পদ্ধতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বা খলিফা কর্তৃক তাঁর গভর্নরদের নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা অস্বীকারের অধিকার কারও ছিল না।
বর্ণিত আছে; একবার মধ্যরাতে উমর রা. বাইরে বেরোলে আলকামা ইবনু উলাসাহ কিলাবির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। উমরের সঙ্গে খালিদের ভীষণ মিল থাকায় আলকামা ভেবেছিলেন তিনি খালিদ। তিনি বললেন, 'হে খালিদ, এই লোক আপনাকে অপসারণ করে হীন আচরণ করেছে। আমি আমার এক ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর কাছে কিছু চাইতে এসেছিলাম; কিন্তু তিনি যা করেছেন, তাই আমি তাঁর কাছে কখনো কোনোকিছু চাইব না।'
তিনি কী লুকোতে চেষ্টা করছেন, সেটা জানার জন্য উমর তাঁকে বললেন, 'বেশ, আমাকে আরও কিছু বলুন।' তিনি বললেন, 'আমাদের ওপর এ সকল মানুষের হক আছে, আমাদের তা আদায় করতে হবে এবং আল্লাহ আমাদের পুরস্কৃত করবেন।'
পরদিন সকালে আলকামা রা. যখন তাঁদের উভয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তখন উমর খালিদকে জিজ্ঞেস করলেন, 'গত রাতে আলকামা আপনাকে কী বলেছে?' খালিদ বললেন, 'আল্লাহর শপথ, তিনি কিছুই বলেননি।' তখন উমর জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কি শপথ করে এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছেন?'
আলকামা রা. মনঃক্ষুন্ন হয়ে ভাবলেন যে, গত রাতে তিনি খালিদ ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেননি। এরপর তিনি বলা শুরু করলেন, 'হে খালিদ, বলে ফেলুন।'
উমর আলকামার প্রতি উদার ছিলেন এবং তাঁর প্রয়োজন পূরণ করেছিলেন। তিনি বললেন, 'আপনার মতো চিন্তা করে— যদি এমন আরও লোকের সন্ধান মিলত— অর্থাৎ, যারা শাসকের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করা সত্ত্বেও তাঁকে মান্য করে, তাহলে তাঁরা আমার কাছে অমুক এবং অমুকের চেয়ে অধিক প্রিয় হতো।'৪৭০
মুসলিমসমাজে সবাই তাঁকে এত সম্মান ও আনুগত্য দেখানোর পরও কিছু অভিযোগ আসে তাঁর নামে। যেমন, জাবিইয়ায় উমর রা. যখন জনসাধারণের উদ্দেশে বলেছিলেন, 'আমি তোমাদের বলব যে, কেন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে আমি অপসারণ করেছি— আমি তাঁকে মুহাজির দরিদ্রদের মধ্যে এ অর্থ-সম্পদ বণ্টনের নির্দেশ দিয়েছিলাম; কিন্তু সামর্থ্যবান ও শক্তিশালীদের মধ্যে যারা উচ্চপদস্থ ও বাকপটু, তিনি তাদের এ সম্পদ দান করেছেন। ফলে আমি তাঁকে অপসারণ করে তাঁর স্থলে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে নিযুক্ত করেছি।' তখন আবু আমর ইবনুল আস ইবনু মুগিরা বলেন, 'হে উমর ইবনুল খাত্তাব, আল্লাহর শপথ, আপনি ইনসাফ করেননি। আল্লাহর রাসুলের নিযুক্ত একজন সেনাপতিকে আপনি অপসারণ করেছেন। রাসুল ﷺ যে তরবারি কোষমুক্ত করেছিলেন, আপনি তা কোষবদ্ধ করেছেন। রাসুল ﷺ যে ঝান্ডা উত্তোলন করেছেন, আপনি তা অবনমিত করেছেন। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে আপনার চাচাতো ভাইয়ের প্রতি ঈর্ষা প্রদর্শন করেছেন।'
উমর ইবনুল খাত্তাব বললেন, 'আপনার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং আপনি বয়সেও তরুণ। আপনার চাচাতো ভাইয়ের জন্যই আপনি ক্রুদ্ধ। '৪৭২
এভাবে উমর রা. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের চাচাতো ভাইয়ের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করলেন, যিনি খালিদের পক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে উমরকে পরশ্রীকাতরতার দোষে অভিযুক্ত করেছিলেন; কিন্তু তা সত্ত্বেও উমর ধৈর্যশীল ছিলেন।
টিকাঃ
৪৬২. আদ-দাওলাতুল ইসলামিয়া ফি আসরিল খুলাফায়ির রাশিদিন, হামদি শাহিন: ১৪৯।
৪৬৩. আবকারিয়াতু উমর: ১৫৮।
৪৬৪. হুরুবুল ইসলাম ফিশ শাম: ৫৬৬।
৪৬৫. আবাতিল ইয়াজিব: ১৩৪।
৪৬৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১১৫।
৪৬৭. আত-তারিখুল ইসলামি: ১১/১৪৭।
৪৬৮. আল-খিলাফা ওয়া খুলাফাউ রাশিদুন, সালিম আল বাহনাসাউই: ১৯৬।
৪৬৯. আবাতিল ইয়াজিব: ১৩৪।
৪৭০. আদ-দাউলাতুল ইসলামিয়াহ ফি আসর আল-খুলাফা আর রাশিদিন: ১৫১।
৪৭২. সহিহ আত-তাওসিক ফি সিরাতি ওয়া হায়াতিল ফারুক : ২১৯।
📄 ইরাক ও পূর্বাঞ্চল বিজয়ের দ্বিতীয় ধাপ
আবু বকর সিদ্দিকের খিলাফতকালে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে ইরাকে যে বিজয়াভিযান সংঘটিত হয়, সেটা ছিল পূর্বাঞ্চলে ইসলামি বিজয়াভিযানের প্রথম ধাপ। আমি আবু বকর সিদ্দিক রা. : জীবন ও কর্ম গ্রন্থে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছি। যখন উমরের যুগ আসে, তখন তিনি সিদ্দিকি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যথাযথ প্রয়াস নেন। পূর্বাঞ্চলে বিজয়ের এই দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয় তাঁর শাসনামল থেকে।
১. আবু উবায়েদ সাকাফির নেতৃত্বে ইরাকযুদ্ধ
আবু বকর সিদ্দিক রা. ১৩ হিজরির ২৩ জুমাদাল উখরায় ইনতিকাল করেন। মঙ্গলবার রাতে তাঁকে দাফন করা হয়। পরদিন ভোরে উমর রা. লোকজনকে ইরাকযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করেন। এর সাওয়াব ও পুরস্কার সম্পর্কেও জানান; কিন্তু কেউই তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়নি। কারণ, পারসিকদের শক্তির দাপট এবং রণ-নৈপুণ্যের কারণে কেউই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে চাইত না। তিনি দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনও যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান; কিন্তু কেউই সাড়া দেয়নি। সেনাপতি মুসান্না রা. বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যে খালিদের হাতে ইরাকের একটা বিরাট অংশে আল্লাহ মুসলিমদের যে বিজয় দান করেছেন, তা উল্লেখ করেন। সেখানে যে ধনসম্পদ ও মালামাল মুসলিমদের হস্তগত হয়েছে, তা-ও তিনি সবাইকে অবহিত করেন; কিন্তু তৃতীয় দিনের আহ্বানেও কেউ সাড়া দেয়নি। চতুর্থ দিনের আহ্বানের পর প্রথম সাড়া দিয়ে যুদ্ধে যেতে সম্মতি দেন আবু উবায়েদ ইবনু মাসউদ সাকাফি। এরপর ক্রমশ লোকজন সাড়া দিতে শুরু করে। ৪৭৩
উমরের ডাকে আবু উবায়েদ সাকাফির পর সালিত ইবনু কায়েস আনসারি রা. লাব্বাইক বলেন। এরপর তিনি বলেন, 'আমিরুল মুমিনিন, পারসিকদের ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত আমরা শয়তানের ধোঁকায় ছিলাম। শুনে নিন, আমি, আমার চাচাতো ভাই আর যারা আমাদের সঙ্গে রয়েছে, সবাই আল্লাহর পথে প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।' ৪৭৪
সালিতের এই আত্মোৎসর্গী বক্তব্য মানুষকে উদ্দীপ্ত করে চেতনা জাগ্রত করে। পারসিকদের বিরুদ্ধ প্রাণপণ লড়াইয়ের জাগরণ সৃষ্টি হয় তখন। লোকজন খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবকে বলতে থাকে, 'আপনি কোনো একজন মুহাজির বা আনসার সাহাবিকে আমাদের আমির বানিয়ে দিন।'
উমর তখন বলেন, 'যে মানুষকে উদ্দীপ্ত করতে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে, সে-ই আমির হওয়ার অধিক উপযুক্ত; অন্য কেউ নন। সালিত যদি সামরিক বিষয়ে চঞ্চল চিত্তের অধিকারী না হতো, তবে তাঁকেই তোমাদের আমির বানিয়ে দিতাম। সুতরাং আবু উবায়েদ আমির হবে আর সালিত হবে উজির।' সবাই বিনা বাক্যে তা মেনে নেন। ৪৭৫
আরেক বর্ণনায় আছে; উমর রা. সবার ওপর সেনাপতির দায়িত্ব দেন আবু উবায়েদ সাকাফিকে। তিনি কিন্তু সাহাবি ছিলেন না। কেউ কেউ উমরকে জিজ্ঞেস করলেন যে, 'কোনো সাহাবিকে আপনি প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করলেন না কেন?' তিনি বললেন, 'যে প্রথমে সাড়া দিয়েছে, আমি তাঁকেই প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেছি। আপনারা তো দীনের সাহায্যে সবার আগে এগিয়ে এসেছেন; আর এই ঘটনায় সে আপনাদের সবার আগে এগিয়ে এসেছে। সবার আগে সাড়া দিয়েছে।' এরপর উমর রা. আবু উবায়েদ সাকাফিকে ডেকে ব্যক্তিগত ব্যাপারে খোদাভীতি, তাকওয়া অবলম্বন এবং সঙ্গী মুসলিম সেনাদের কল্যাণ-কামনার উপদেশ দিয়ে সব কাজে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করার নির্দেশ দেন। সালিত ইবনু কায়েসের সঙ্গেও পরামর্শ করার কথা বলেন। কারণ, সালিতের রয়েছে যুদ্ধ সম্বন্ধে বাস্তব অভিজ্ঞতা। ৪৭৬
উমর রা. আবু উবায়েদ রাহ.-কে উপদেশ দিয়ে আরও বলেন, 'রাসুলের সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করবে। নিজের সব কাজে তাঁদের শরিক রাখবে। কাজের ক্ষেত্রে দ্রুততার আশ্রয় নেবে না; বরং ধৈর্য ও বিচক্ষণতা দ্বারা সব কাজ সমাধা করবে। কেননা, এটা যুদ্ধ। যুদ্ধের সময় ধৈর্যশীল বিচক্ষণ লোকেরা সফল হতে পারে। আমি সালিতকে কেবল এ কারণে আমির বানাইনি যে, সে যুদ্ধের ব্যাপারে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করে থাকে। তীব্র প্রয়োজন দেখা না দিলে যুদ্ধক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। আল্লাহর শপথ, সে যদি চঞ্চল চিত্তের না হতো, তবে তাঁকেই আমির বানাতাম।'
এরপর তিনি বলেন, 'তুমি এমন এলাকার দিকে যাচ্ছ, যেখানকার মানুষ ধোঁকাবাজ, দাম্ভিক ও অহংকারী। বিশৃঙ্খলা আর মন্দপ্রবণতাও তাদের বেশি। কল্যাণ ও সৎকাজের তারা ধার ধারে না। এ ব্যাপারে তারা ততটা পরিচিতও নয়। সুতরাং তাদের ব্যাপারে চৌকান্না থাকবে। জবান নিয়ন্ত্রণে রাখবে। গোপন ভেদ কারও কাছে প্রকাশ করবে না। কেননা, গোপনীয় বিষয় যতক্ষণ গোপন থাকে, ততক্ষণ নিরাপদ। গোপন ভেদ প্রকাশ হয়ে গেলে অনেক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।'৪৭৭
এরপর তিনি মুসান্না ইবনুল হারিসা রা.-কে ইরাকে যেতে এবং আরও সেনার অপেক্ষা করতে নির্দেশ দিয়ে বলেন, 'যে-সকল স্বধর্মত্যাগী সত্যমনে তাওবা করে ইসলামে পুনরায় ফিরে আসবে, তাদের সঙ্গে নেবে। শত্রুর মোকাবিলার সময় তাদেরও সঙ্গে রাখবে।'
মুসান্না রা. তাঁদের সবাইকে নিয়ে দ্রুতবেগে সামনে এগিয়ে হিরা এলাকায় পৌঁছান। এদিকে উমর রা. ইরাক, পারস্য ও সিরিয়া অভিযানে বরাবর দৃষ্টি রেখে চলেছেন। বাহিনীর রসদপত্র পাঠাচ্ছেন। তাঁদের শিক্ষাদীক্ষা ও দীনি বিধানাবলির ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দিয়ে পাঠাচ্ছেন। উদ্ভূত সমস্যার আলোকে পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন। সব বিষয়ের পর্যবেক্ষণ ও দায়িত্ব রেখেছেন নিজ হাতে।
বস্তুত মুসলিমদের এই সেনাদল ইরাকের উদ্দেশে যাত্রা করে। তাঁদের সংখ্যা ৭ হাজার। খলিফা উমর রা. আবু উবায়েদকে লেখেন, 'খালিদের সঙ্গে ইরাক থেকে যে-সকল সেনা এসেছে, তাদের যেন পুনরায় ইরাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।' তিনি ৪ হাজার সেনার একটা বাহিনী প্রস্তুত করলেন। হাশিম ইবনু উতবাকে নেতা মনোনীত করে তাঁর তত্ত্বাবধানে ওই বাহিনী ইরাকে পাঠান।
মুসলিমদের এই বিশাল কাফেলা যখন ইরাকে সমবেত হয়, তখন তাঁরা জানতে পারেন যে, পারস্য সাম্রাজ্যে বড় ধরনের বিরোধ-বিশৃঙ্খলা চলছে। পারসিকরা তখন তাদের রাজা- রানি মনোনয়ন ও অপসারণ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। অবশেষে রানি আজার মিদাখতকে হত্যা করে কিসরার মেয়ে বুরানকে তারা ক্ষমতায় বসায়। রানি বুরান রুস্তম ইবনু ফারাখজাদ নামের এক সাহসী বীরযোদ্ধার কাছে ১০ বছরের জন্য রাজত্ব হস্তান্তর করে এই শর্তে যে, সে যুদ্ধ পরিচালনা করবে। এরপর রাজত্ব ফিরে আসবে কিসরার বংশধরদের কাছে। রুস্তম তা মেনে নেয়। এই রুস্তম ছিল জ্যোতির্বিদ। জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে তার ছিল পর্যাপ্ত জ্ঞান। একদিন তাকে বলা হয়েছিল, 'আপনি জানতেন যে, এই রাজত্ব আর পূর্ণতা পাবে না, স্থায়ী হবে না; তবু এটা গ্রহণে কীসে আপনাকে উৎসাহিত করল?' সে বলল, 'লোভ-লালসা আর মর্যাদালাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমাকে উৎসাহিত করেছে। ১৪৭৮
২. নামারিক, সাকাতিয়া ও বারুসমাযুদ্ধ
ক. ১৩ হিজরির নামারিকের যুদ্ধ
আবু উবায়েদ সাকাফি রাহ. ইরাক পৌঁছে সেখানকার সেনাপতির দায়িত্ব হাতে নেওয়ার পর এই যুদ্ধ সামনে আসে। প্রকৃতপক্ষে পারসিকদের উদ্দেশ্য ছিল এ যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী-অর্থাৎ, আবু উবায়েদ সাকাফিকে মানসিকভাবে দুর্বল করে রাখা; আর ইরাকবাসীর মনে সাহস জোগানো। বিজয়ের জন্য তাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। রুস্তম প্রথমেই রাজ্যের প্রতিটা জেলায় সরকারি দূত পাঠিয়ে লোকদের মধ্যে জাতীয়তা ও ধর্মীয় অনুভূতির নামে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দেয়, যাতে মুসলিম সেনাপতি পৌঁছার আগেই ফুরাতের সব জেলায় বিদ্রোহের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। মুসলিমদের তারা সামন-পেছন সব দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে। বিদ্রোহের ফলে মুসলিমদের অধিকৃত এলাকাগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। তাদের সেনাপতি জাবানকে ফুরাত তীরবর্তী এলাকায় আর নারসিকে কাসকার পৌঁছার নির্দেশ দেওয়া হয়। ইরাকের একটা বিস্তীর্ণ এলাকায় তার জায়গির ছিল। এই দুই পারসিক সেনাপতি দুই দিক দিয়ে এগোতে থাকে।
অন্যদিকে আবু উবায়েদ ও মুসান্না রা. হিরা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন; কিন্তু প্রতিপক্ষের বিরাট প্রস্তুতির সংবাদ পেয়ে খাকান নামক স্থানে পৌঁছে শিবির স্থাপন করেন। আবু উবায়েদ মুজাহিদদের ভালোভাবে সজ্জিত করে আক্রমণের জন্য তিনি নিজেই শত্রুদের দিকে অগ্রসর হন। নামারিকে উভয় বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। আল্লাহ পারসিকদের পরাজিত করেন। জাবান ও তাদের সেনাদলের ডান বাহুর নেতা মারদানশাহ তখন মুসলিমদের হাতে বন্দি হয়।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই উভয় সেনাপতি মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অনল ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ৪৭৯ জাবানকে গ্রেপ্তার করেন মুতার ইবনু ফিজ্জাহ তামিমি। তিনি জানতেন না যে, তাঁর বন্দি লোকটা সেনাপতি জাবান। গ্রেপ্তার হয়ে জাবান প্রতারণার আশ্রয় নেয়। সে বলে, 'আমার থেকে কিছু নিয়ে আমাকে ছেড়ে দাও।' অন্য মুসলিমরা তাকে আটক করে রাখেন। তাঁরা বলেন, 'এ-ই যে প্রধান সেনাপতি!' তাঁরা তাকে নিয়ে সর্বাধিনায়ক আবু উবায়েদের কাছে এসে বলেন, 'জাবানকে হত্যা করুন। কারণ, সে শত্রু-সৈন্যের প্রধান ব্যক্তি।' তিনি বলেন, 'আমি আল্লাহকে ভয় করি। তাকে আমরা কীভাবে হত্যা করব? অথচ আমাদেরই আরেক মুসলমান তাকে নিরাপত্তা দিয়েছে! মুসলিমরা পারস্পরিক সাহায্য ও হৃদ্যতার ক্ষেত্রে একটা দেহের মতো। যে দায়িত্ব একজন মুসলমান বহন করে, সেটা সকল মুসলিমের দায়িত্ব।' তাঁরা তাঁকে বলেছিলেন, 'জাবানকে হত্যা করুন। কারণ, সে শত্রু-সৈন্যের প্রধান ব্যক্তি।' উত্তরে আবু উবায়েদ বলেছিলেন, 'সে যদি সেনাপ্রধানও হয়, তবু আমি তাকে হত্যা করব না।' এরপর তিনি তাকে ছেড়ে দেন।৪৮০
এ ঘটনায় আবু উবায়েদ সাকাফির অবস্থান মুসলিমদের ক্ষমা করার মানসিকতা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিশ্চয় লোকদের মুসলিম বানানো এবং ইসলামের দিকে আকর্ষণবোধ জাগানোর ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ ছিল সুমহান। এরপর যেখানেই এ ঘটনা চর্চা হয় যে, মুসলিমরা ইরানি বাহিনীর সেনাপ্রধানকে শুধু এ জন্য মুক্তি দিয়েছে যে, মুসলিমদের নগণ্য-সাধারণ একব্যক্তি তাকে ফিদয়া নিয়ে মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এসব যখন ইরানিরা শুনছিল, ইসলাম আর তাদের মধ্যে যে যোজন যোজন দূরত্ব ছিল, তা কমতে শুরু করেছিল। সবাই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিতে ব্যাকুল হতে শুরু করেছিল। এটি মূলত ইসলামেরই মাহাত্ম্য যে, তা এমন কিছু মানুষ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে আমরা মুসান্না ইবনুল হারিসার গৌরবময় ভূমিকাও কিছুতেই ভুলতে পারি না। তিনি নিজেকে আবু উবায়েদের অনুগত করে দেন; অথচ তিনি হচ্ছেন ইরাকের প্রাক্তন সেনাপতি। আর আবু উবায়েদ প্রথমবারের মতো এখানে এসেছেন। এই আনুগত্যের রহস্য হচ্ছে, আমিরুল মুমিনিন আবু উবায়েদকে আমির বানিয়ে পাঠিয়েছেন। এ এক ঈর্ষণীয় ব্যাপার। মুসান্না রা. স্বভাবগতভাবেই এমন চারিত্রিক উৎকর্ষের অধিকারী। ইতিপূর্বে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের সঙ্গেও তিনি এমন আচরণ করেন। ইসলামের জন্য তাঁর ভালোবাসা ও আত্মোৎসর্গী মনোভাবের কোনো তুলনা হতে পারে না। তিনি সেনাপতি হন বা সাধারণ সেনা, সর্বাবস্থায় নিজের অনন্য চরিত্র মাধুরীর স্ফূরণ দেখিয়ে গেছেন। ৪৮১
খ. ইয়াওমুল আগওয়াস
কাদিসিয়াযুদ্ধের দ্বিতীয় দিনকে বলা হয় ইয়াওমুল আগওয়াস। এ দিন রাতে কা'কা ইবনু আমর তামিমির নেতৃত্বে সিরিয়াবাহিনীর একটা বহর কাদিসিয়া পৌঁছায়, যার বিবরণ হচ্ছে এমন—
আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সিরিয়ার আমির আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে নির্দেশ দেন, 'খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের সঙ্গে ইরাকের যে বাহিনী সিরিয়া গিয়েছিল, সেটা কাদিসিয়াযুদ্ধে মুসলিমদের সাহায্যে পাঠানো হোক।'
আবু উবায়দা উমরের নির্দেশমতো খালিদের সঙ্গে আসা বাহিনীকে ফেরত পাঠিয়ে তাঁকে নিজের কাছে রেখে দেন, যাতে প্রয়োজনের সময় তাঁর সহযোগিতা নেওয়া যায়। কাদিসিয়ার উদ্দেশে পাঠানো বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করেন সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাসের ভাতিজা হাশিম ইবনু উতবা ইবনু আবি ওয়াক্কাসকে। ইরাকি এই বাহিনী যখন খালিদের নেতৃত্বে ইরাক থেকে সিরিয়া আসে, তখন তাঁদের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার; কিন্তু ফেরার সময় সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ হাজার। তন্মধ্যে হাশিম ইবনু উতবা রা. ১ হাজার মুজাহিদের একটা বহর অগ্রবর্তী বাহিনী হিসেবে কা'কা ইবনু আমরের নেতৃত্বে কাদিসিয়ায় রওনা করান। ৪৮২
গ. কা'কা ইবনু আমরের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা
কা'কারা. তাঁর অগ্রবর্তী বাহিনী নিয়ে দ্রুতবেগে ইয়াওমুল আগওয়াসের ভোরে কাদিসিয়া পৌঁছে মুসলিমবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হন। তিনি মুসলিম সেনাদের হৃদয় থেকে ভয়ভীতি ও আতঙ্ক দূর করে তাঁদের মধ্যে সাহস সঞ্চারের চেষ্টা করেন। কৌশল হিসেবে তাঁর সঙ্গে থাকা সেনাদের ১০০ জনকে আলাদা আলাদা দলে ভাগ করে প্রত্যেক দলকে তাকবিরধ্বনি দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশের নির্দেশ দেন। বলেন, '১০ জন ১০ জন করে একেকটা দল একের পর এক তাকবির দিয়ে প্রবেশ করবে।' অর্থাৎ, এক দল চোখের আড়ালে চলে গেলে অপর দল সামনে এগোবে। সেনারা তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী ১০০ জনের প্রত্যেক দল ১০ জন করে তাকবির দিয়ে ময়দানে প্রবেশ করে। তাঁদের তাকবিরধ্বনি শুনে অন্যান্য সেনাও তাকবির দিতে শুরু করে। এতে মুসলমান সেনাদের মনে শক্তি ও সাহস বৃদ্ধি পায় এবং পারস্যবাহিনী হীনবল হয়ে পড়ে।
১ হাজার সেনার এই বাহিনীর আগমন তেমন বিশেষ কিছু ছিল না; কিন্তু এটা আল্লাহর বহু বড় এক অনুগ্রহ যে, কা'কার এমন অভিনব কৌশলে সবার মন থেকে সংখ্যার স্বল্পতার বিষয়টা একেবারেই দূরীভূত হয়ে যায়। কা'কা সহযোগী বাহিনীর আগমনের সুসংবাদ শুনিয়ে বলেন, 'হে লোকসকল, আমি এমন প্রাণোৎসর্গী বাহিনী নিয়ে আসছি, তারা যদি তোমাদের পর্যন্ত এসে পৌঁছায়, তবে অল্পসংখ্যক হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের হীনম্মন্যতার বিষয়টা যদি তারা জানতে পারত, তাহলে তাদের একেবারে দুর্বল সদস্যও তোমাদের আগে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইবে। তারা চাইবে, তোমাদের ওপর যেন মর্যাদার শীর্ষস্থান অর্জন করতে পারে। তোমরা আমাকে যেমন করতে দেখছ, তেমনই করো।'
এরপর কা'কা কাতার থেকে সামনে এসে বলেন, 'হে পারস্যবাহিনী, তোমাদের কে আছে, যে আমার সঙ্গে লাড়াই করবে?' এ কথা শুনে সেনাপতি জুলহাজিব বাহমন জাদবিয়া এগিয়ে এলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি কে?' উত্তরে সে বলে, 'আমি বাহমন জাদবিয়া।'
এটুকু শুনতেই কা'কার মানসপটে জেগে ওঠে জিসরযুদ্ধে তার কারণে মুসলিমদের দুর্ভোগের কথা। ইমানি চেতনায় উদ্বেলিত হয়ে তিনি বলেন, 'হে আবু উবায়েদের হত্যাকারী ও জিসরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, আমি তোর থেকে প্রতিশোধ নেবই!'
প্রতিপক্ষ লোকটা যদিও বিখ্যাত এক পারসিক সেনা-অধিনায়ক, তথাপি কা'কার প্রভাবপ্লাবী গর্জনে তার মনে ভীতির সঞ্চার হয়। খলিফা আবু বকর কা'কা সম্পর্কে বলতেন, 'কা'কার একটা গর্জনই ১ হাজার সেনাকে কুপোকাত করে দেওয়ার শক্তি রাখে। ১৪৮৩ তবে একজন লোক, সে যত বড় বীরই হোক না কেন, কী করে তাঁর সামনে অটল থাকতে পারে? অনতিবিলম্বে দু-জনে যুদ্ধে লিপ্ত হন। কা'কা নিমিষেই তাকে খতম করে দেন। ফলে পারস্যবাহিনীর মনোবল ক্রমশ ভেঙে যেতে থাকে; আর মুসলিমদের মনোবল প্রত্যয়দীপ্ত হতে থাকে। কেননা, জুলহাজিব ছিল পারস্যবাহিনীর ২০ হাজার সেনার অধিনায়ক।
কা'কা আবার বলেন, 'কে আছে আমার সঙ্গে যুদ্ধ করবে?' তখন পারস্য-সেনাপতি বিরজান ও বান্দুওয়ান ছুটে আসে। এ দৃশ্য দেখে মুসলিম সেনা হারিস ইবনু জুবইয়ান সামনে অগ্রসর হন। কা'কা বিরজানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে নিমিষেই তার দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। অনুরূপ হারিসও বান্দুয়ানের দেহ থেকে মস্তক আলাদা করে দেন। এভাবে কা'কা ভোরেই পারসিকদের পাঁচ অধিনায়কের দুজনকে খতম করে দেন। নিঃসন্দেহে পারস্যবাহিনীর জন্য এটা ছিল এক মস্তবড় ক্ষতি। এতে তারা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। মনোবল হারিয়ে পেছনে হটতে থাকে। পরে উভয় পক্ষের অশ্বারোহীদের মধ্যে যথারীতি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
কা'কা তখন বলা শুরু করেন, 'হে মুসলিমরা, তোমরা তরবারি দিয়ে তাদের মোকাবিলা করো। কেননা, লোকদের হত্যা করতেই এটা তৈরি করা হয়েছে।' এরপর লোকেরা তাঁর উপদেশ গ্রহণ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কা'কা সেদিন ৩০ জন সেনাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য ডেকে তাদের সবাইকে হত্যা করতে সক্ষম হন। যেখানেই শত্রুদের দেখা যেত, সেখানেই প্রবল আক্রমণে হামলে পড়তেন তিনি; আর কার্যসিদ্ধির পর এই কবিতা আবৃত্তি করতেন,
এই যুদ্ধে আমি তাদের উচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব
এবং নির্ভুল নিশানায় বর্শার বৃষ্টি নিক্ষেপ করব।
শত্রুদের শেষ ব্যক্তি বাজার জামহার হামজানিকে হত্যা করা হলে তার ব্যাপারে তিনি আবৃত্তি করেন,
আমি পূর্ণ উদ্যম ও শক্তিব্যয়ে তাকে মাটিতে চিৎ করে ফেলে দিয়েছি
এবং সূর্যের কিরণের মতো তার রক্ত ভূমিতে ছড়িয়ে পড়েছে-
ইয়াওমুল আগওয়াসের সময়-যখন পারসিকদের রাত
তাদের মধ্যে ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে এসেছিল।
টিকাঃ
৪৭৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/২৬।
৪৭৪. আল-ফুতুহ, ইবনু আসাম: ১/১৬৪; আল-আনসার ফিল আসরির রাশিদি: ২১৬।
৪৭৫. আল-আনসার ফিল আসরির রাশিদি: ২১৬।
৪৭৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/২৬।
৪৭৭. ইতমামুল ওয়াফা ফি সিরাতিল খুলাফা: ৬৫।
৪৭৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/২৭১।
৪৭৯. হারকাতুল ফাততিল ইসলামি: ৭২।
৪৮০. আল-কামিল ফিত তারিখ: ২/৮৭১।
৪৮১. আত-তারিখুল ইসলামি: ১০/৩৩৪।
৪৮২. তারিখুত তাবারি: ৪/৩৬৭; আত-তারিখুল ইসলামি: ১০/৩৬৭।
৪৮৩. আত-তারিখুল ইসলামি: ১০/৪৫৫।
আবু বকর সিদ্দিকের খিলাফতকালে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে ইরাকে যে বিজয়াভিযান সংঘটিত হয়, সেটা ছিল পূর্বাঞ্চলে ইসলামি বিজয়াভিযানের প্রথম ধাপ। আমি আবু বকর সিদ্দিক রা. : জীবন ও কর্ম গ্রন্থে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছি। যখন উমরের যুগ আসে, তখন তিনি সিদ্দিকি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যথাযথ প্রয়াস নেন। পূর্বাঞ্চলে বিজয়ের এই দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয় তাঁর শাসনামল থেকে।
১. আবু উবায়েদ সাকাফির নেতৃত্বে ইরাকযুদ্ধ
আবু বকর সিদ্দিক রা. ১৩ হিজরির ২৩ জুমাদাল উখরায় ইনতিকাল করেন। মঙ্গলবার রাতে তাঁকে দাফন করা হয়। পরদিন ভোরে উমর রা. লোকজনকে ইরাকযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করেন। এর সাওয়াব ও পুরস্কার সম্পর্কেও জানান; কিন্তু কেউই তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়নি। কারণ, পারসিকদের শক্তির দাপট এবং রণ-নৈপুণ্যের কারণে কেউই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে চাইত না। তিনি দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনও যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান; কিন্তু কেউই সাড়া দেয়নি। সেনাপতি মুসান্না রা. বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যে খালিদের হাতে ইরাকের একটা বিরাট অংশে আল্লাহ মুসলিমদের যে বিজয় দান করেছেন, তা উল্লেখ করেন। সেখানে যে ধনসম্পদ ও মালামাল মুসলিমদের হস্তগত হয়েছে, তা-ও তিনি সবাইকে অবহিত করেন; কিন্তু তৃতীয় দিনের আহ্বানেও কেউ সাড়া দেয়নি। চতুর্থ দিনের আহ্বানের পর প্রথম সাড়া দিয়ে যুদ্ধে যেতে সম্মতি দেন আবু উবায়েদ ইবনু মাসউদ সাকাফি। এরপর ক্রমশ লোকজন সাড়া দিতে শুরু করে। ৪৭৩
উমরের ডাকে আবু উবায়েদ সাকাফির পর সালিত ইবনু কায়েস আনসারি রা. লাব্বাইক বলেন। এরপর তিনি বলেন, 'আমিরুল মুমিনিন, পারসিকদের ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত আমরা শয়তানের ধোঁকায় ছিলাম। শুনে নিন, আমি, আমার চাচাতো ভাই আর যারা আমাদের সঙ্গে রয়েছে, সবাই আল্লাহর পথে প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।' ৪৭৪
সালিতের এই আত্মোৎসর্গী বক্তব্য মানুষকে উদ্দীপ্ত করে চেতনা জাগ্রত করে। পারসিকদের বিরুদ্ধ প্রাণপণ লড়াইয়ের জাগরণ সৃষ্টি হয় তখন। লোকজন খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবকে বলতে থাকে, 'আপনি কোনো একজন মুহাজির বা আনসার সাহাবিকে আমাদের আমির বানিয়ে দিন।'
উমর তখন বলেন, 'যে মানুষকে উদ্দীপ্ত করতে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে, সে-ই আমির হওয়ার অধিক উপযুক্ত; অন্য কেউ নন। সালিত যদি সামরিক বিষয়ে চঞ্চল চিত্তের অধিকারী না হতো, তবে তাঁকেই তোমাদের আমির বানিয়ে দিতাম। সুতরাং আবু উবায়েদ আমির হবে আর সালিত হবে উজির।' সবাই বিনা বাক্যে তা মেনে নেন। ৪৭৫
আরেক বর্ণনায় আছে; উমর রা. সবার ওপর সেনাপতির দায়িত্ব দেন আবু উবায়েদ সাকাফিকে। তিনি কিন্তু সাহাবি ছিলেন না। কেউ কেউ উমরকে জিজ্ঞেস করলেন যে, 'কোনো সাহাবিকে আপনি প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করলেন না কেন?' তিনি বললেন, 'যে প্রথমে সাড়া দিয়েছে, আমি তাঁকেই প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেছি। আপনারা তো দীনের সাহায্যে সবার আগে এগিয়ে এসেছেন; আর এই ঘটনায় সে আপনাদের সবার আগে এগিয়ে এসেছে। সবার আগে সাড়া দিয়েছে।' এরপর উমর রা. আবু উবায়েদ সাকাফিকে ডেকে ব্যক্তিগত ব্যাপারে খোদাভীতি, তাকওয়া অবলম্বন এবং সঙ্গী মুসলিম সেনাদের কল্যাণ-কামনার উপদেশ দিয়ে সব কাজে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করার নির্দেশ দেন। সালিত ইবনু কায়েসের সঙ্গেও পরামর্শ করার কথা বলেন। কারণ, সালিতের রয়েছে যুদ্ধ সম্বন্ধে বাস্তব অভিজ্ঞতা। ৪৭৬
উমর রা. আবু উবায়েদ রাহ.-কে উপদেশ দিয়ে আরও বলেন, 'রাসুলের সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করবে। নিজের সব কাজে তাঁদের শরিক রাখবে। কাজের ক্ষেত্রে দ্রুততার আশ্রয় নেবে না; বরং ধৈর্য ও বিচক্ষণতা দ্বারা সব কাজ সমাধা করবে। কেননা, এটা যুদ্ধ। যুদ্ধের সময় ধৈর্যশীল বিচক্ষণ লোকেরা সফল হতে পারে। আমি সালিতকে কেবল এ কারণে আমির বানাইনি যে, সে যুদ্ধের ব্যাপারে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করে থাকে। তীব্র প্রয়োজন দেখা না দিলে যুদ্ধক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। আল্লাহর শপথ, সে যদি চঞ্চল চিত্তের না হতো, তবে তাঁকেই আমির বানাতাম।'
এরপর তিনি বলেন, 'তুমি এমন এলাকার দিকে যাচ্ছ, যেখানকার মানুষ ধোঁকাবাজ, দাম্ভিক ও অহংকারী। বিশৃঙ্খলা আর মন্দপ্রবণতাও তাদের বেশি। কল্যাণ ও সৎকাজের তারা ধার ধারে না। এ ব্যাপারে তারা ততটা পরিচিতও নয়। সুতরাং তাদের ব্যাপারে চৌকান্না থাকবে। জবান নিয়ন্ত্রণে রাখবে। গোপন ভেদ কারও কাছে প্রকাশ করবে না। কেননা, গোপনীয় বিষয় যতক্ষণ গোপন থাকে, ততক্ষণ নিরাপদ। গোপন ভেদ প্রকাশ হয়ে গেলে অনেক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।'৪৭৭
এরপর তিনি মুসান্না ইবনুল হারিসা রা.-কে ইরাকে যেতে এবং আরও সেনার অপেক্ষা করতে নির্দেশ দিয়ে বলেন, 'যে-সকল স্বধর্মত্যাগী সত্যমনে তাওবা করে ইসলামে পুনরায় ফিরে আসবে, তাদের সঙ্গে নেবে। শত্রুর মোকাবিলার সময় তাদেরও সঙ্গে রাখবে।'
মুসান্না রা. তাঁদের সবাইকে নিয়ে দ্রুতবেগে সামনে এগিয়ে হিরা এলাকায় পৌঁছান। এদিকে উমর রা. ইরাক, পারস্য ও সিরিয়া অভিযানে বরাবর দৃষ্টি রেখে চলেছেন। বাহিনীর রসদপত্র পাঠাচ্ছেন। তাঁদের শিক্ষাদীক্ষা ও দীনি বিধানাবলির ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দিয়ে পাঠাচ্ছেন। উদ্ভূত সমস্যার আলোকে পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন। সব বিষয়ের পর্যবেক্ষণ ও দায়িত্ব রেখেছেন নিজ হাতে।
বস্তুত মুসলিমদের এই সেনাদল ইরাকের উদ্দেশে যাত্রা করে। তাঁদের সংখ্যা ৭ হাজার। খলিফা উমর রা. আবু উবায়েদকে লেখেন, 'খালিদের সঙ্গে ইরাক থেকে যে-সকল সেনা এসেছে, তাদের যেন পুনরায় ইরাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।' তিনি ৪ হাজার সেনার একটা বাহিনী প্রস্তুত করলেন। হাশিম ইবনু উতবাকে নেতা মনোনীত করে তাঁর তত্ত্বাবধানে ওই বাহিনী ইরাকে পাঠান।
মুসলিমদের এই বিশাল কাফেলা যখন ইরাকে সমবেত হয়, তখন তাঁরা জানতে পারেন যে, পারস্য সাম্রাজ্যে বড় ধরনের বিরোধ-বিশৃঙ্খলা চলছে। পারসিকরা তখন তাদের রাজা- রানি মনোনয়ন ও অপসারণ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। অবশেষে রানি আজার মিদাখতকে হত্যা করে কিসরার মেয়ে বুরানকে তারা ক্ষমতায় বসায়। রানি বুরান রুস্তম ইবনু ফারাখজাদ নামের এক সাহসী বীরযোদ্ধার কাছে ১০ বছরের জন্য রাজত্ব হস্তান্তর করে এই শর্তে যে, সে যুদ্ধ পরিচালনা করবে। এরপর রাজত্ব ফিরে আসবে কিসরার বংশধরদের কাছে। রুস্তম তা মেনে নেয়। এই রুস্তম ছিল জ্যোতির্বিদ। জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে তার ছিল পর্যাপ্ত জ্ঞান। একদিন তাকে বলা হয়েছিল, 'আপনি জানতেন যে, এই রাজত্ব আর পূর্ণতা পাবে না, স্থায়ী হবে না; তবু এটা গ্রহণে কীসে আপনাকে উৎসাহিত করল?' সে বলল, 'লোভ-লালসা আর মর্যাদালাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমাকে উৎসাহিত করেছে। ১৪৭৮
২. নামারিক, সাকাতিয়া ও বারুসমাযুদ্ধ
ক. ১৩ হিজরির নামারিকের যুদ্ধ
আবু উবায়েদ সাকাফি রাহ. ইরাক পৌঁছে সেখানকার সেনাপতির দায়িত্ব হাতে নেওয়ার পর এই যুদ্ধ সামনে আসে। প্রকৃতপক্ষে পারসিকদের উদ্দেশ্য ছিল এ যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী-অর্থাৎ, আবু উবায়েদ সাকাফিকে মানসিকভাবে দুর্বল করে রাখা; আর ইরাকবাসীর মনে সাহস জোগানো। বিজয়ের জন্য তাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। রুস্তম প্রথমেই রাজ্যের প্রতিটা জেলায় সরকারি দূত পাঠিয়ে লোকদের মধ্যে জাতীয়তা ও ধর্মীয় অনুভূতির নামে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দেয়, যাতে মুসলিম সেনাপতি পৌঁছার আগেই ফুরাতের সব জেলায় বিদ্রোহের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। মুসলিমদের তারা সামন-পেছন সব দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে। বিদ্রোহের ফলে মুসলিমদের অধিকৃত এলাকাগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। তাদের সেনাপতি জাবানকে ফুরাত তীরবর্তী এলাকায় আর নারসিকে কাসকার পৌঁছার নির্দেশ দেওয়া হয়। ইরাকের একটা বিস্তীর্ণ এলাকায় তার জায়গির ছিল। এই দুই পারসিক সেনাপতি দুই দিক দিয়ে এগোতে থাকে।
অন্যদিকে আবু উবায়েদ ও মুসান্না রা. হিরা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন; কিন্তু প্রতিপক্ষের বিরাট প্রস্তুতির সংবাদ পেয়ে খাকান নামক স্থানে পৌঁছে শিবির স্থাপন করেন। আবু উবায়েদ মুজাহিদদের ভালোভাবে সজ্জিত করে আক্রমণের জন্য তিনি নিজেই শত্রুদের দিকে অগ্রসর হন। নামারিকে উভয় বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। আল্লাহ পারসিকদের পরাজিত করেন। জাবান ও তাদের সেনাদলের ডান বাহুর নেতা মারদানশাহ তখন মুসলিমদের হাতে বন্দি হয়।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই উভয় সেনাপতি মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অনল ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ৪৭৯ জাবানকে গ্রেপ্তার করেন মুতার ইবনু ফিজ্জাহ তামিমি। তিনি জানতেন না যে, তাঁর বন্দি লোকটা সেনাপতি জাবান। গ্রেপ্তার হয়ে জাবান প্রতারণার আশ্রয় নেয়। সে বলে, 'আমার থেকে কিছু নিয়ে আমাকে ছেড়ে দাও।' অন্য মুসলিমরা তাকে আটক করে রাখেন। তাঁরা বলেন, 'এ-ই যে প্রধান সেনাপতি!' তাঁরা তাকে নিয়ে সর্বাধিনায়ক আবু উবায়েদের কাছে এসে বলেন, 'জাবানকে হত্যা করুন। কারণ, সে শত্রু-সৈন্যের প্রধান ব্যক্তি।' তিনি বলেন, 'আমি আল্লাহকে ভয় করি। তাকে আমরা কীভাবে হত্যা করব? অথচ আমাদেরই আরেক মুসলমান তাকে নিরাপত্তা দিয়েছে! মুসলিমরা পারস্পরিক সাহায্য ও হৃদ্যতার ক্ষেত্রে একটা দেহের মতো। যে দায়িত্ব একজন মুসলমান বহন করে, সেটা সকল মুসলিমের দায়িত্ব।' তাঁরা তাঁকে বলেছিলেন, 'জাবানকে হত্যা করুন। কারণ, সে শত্রু-সৈন্যের প্রধান ব্যক্তি।' উত্তরে আবু উবায়েদ বলেছিলেন, 'সে যদি সেনাপ্রধানও হয়, তবু আমি তাকে হত্যা করব না।' এরপর তিনি তাকে ছেড়ে দেন।৪৮০
এ ঘটনায় আবু উবায়েদ সাকাফির অবস্থান মুসলিমদের ক্ষমা করার মানসিকতা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিশ্চয় লোকদের মুসলিম বানানো এবং ইসলামের দিকে আকর্ষণবোধ জাগানোর ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ ছিল সুমহান। এরপর যেখানেই এ ঘটনা চর্চা হয় যে, মুসলিমরা ইরানি বাহিনীর সেনাপ্রধানকে শুধু এ জন্য মুক্তি দিয়েছে যে, মুসলিমদের নগণ্য-সাধারণ একব্যক্তি তাকে ফিদয়া নিয়ে মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এসব যখন ইরানিরা শুনছিল, ইসলাম আর তাদের মধ্যে যে যোজন যোজন দূরত্ব ছিল, তা কমতে শুরু করেছিল। সবাই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিতে ব্যাকুল হতে শুরু করেছিল। এটি মূলত ইসলামেরই মাহাত্ম্য যে, তা এমন কিছু মানুষ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে আমরা মুসান্না ইবনুল হারিসার গৌরবময় ভূমিকাও কিছুতেই ভুলতে পারি না। তিনি নিজেকে আবু উবায়েদের অনুগত করে দেন; অথচ তিনি হচ্ছেন ইরাকের প্রাক্তন সেনাপতি। আর আবু উবায়েদ প্রথমবারের মতো এখানে এসেছেন। এই আনুগত্যের রহস্য হচ্ছে, আমিরুল মুমিনিন আবু উবায়েদকে আমির বানিয়ে পাঠিয়েছেন। এ এক ঈর্ষণীয় ব্যাপার। মুসান্না রা. স্বভাবগতভাবেই এমন চারিত্রিক উৎকর্ষের অধিকারী। ইতিপূর্বে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের সঙ্গেও তিনি এমন আচরণ করেন। ইসলামের জন্য তাঁর ভালোবাসা ও আত্মোৎসর্গী মনোভাবের কোনো তুলনা হতে পারে না। তিনি সেনাপতি হন বা সাধারণ সেনা, সর্বাবস্থায় নিজের অনন্য চরিত্র মাধুরীর স্ফূরণ দেখিয়ে গেছেন। ৪৮১
খ. ইয়াওমুল আগওয়াস
কাদিসিয়াযুদ্ধের দ্বিতীয় দিনকে বলা হয় ইয়াওমুল আগওয়াস। এ দিন রাতে কা'কা ইবনু আমর তামিমির নেতৃত্বে সিরিয়াবাহিনীর একটা বহর কাদিসিয়া পৌঁছায়, যার বিবরণ হচ্ছে এমন—
আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সিরিয়ার আমির আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে নির্দেশ দেন, 'খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের সঙ্গে ইরাকের যে বাহিনী সিরিয়া গিয়েছিল, সেটা কাদিসিয়াযুদ্ধে মুসলিমদের সাহায্যে পাঠানো হোক।'
আবু উবায়দা উমরের নির্দেশমতো খালিদের সঙ্গে আসা বাহিনীকে ফেরত পাঠিয়ে তাঁকে নিজের কাছে রেখে দেন, যাতে প্রয়োজনের সময় তাঁর সহযোগিতা নেওয়া যায়। কাদিসিয়ার উদ্দেশে পাঠানো বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করেন সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাসের ভাতিজা হাশিম ইবনু উতবা ইবনু আবি ওয়াক্কাসকে। ইরাকি এই বাহিনী যখন খালিদের নেতৃত্বে ইরাক থেকে সিরিয়া আসে, তখন তাঁদের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার; কিন্তু ফেরার সময় সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ হাজার। তন্মধ্যে হাশিম ইবনু উতবা রা. ১ হাজার মুজাহিদের একটা বহর অগ্রবর্তী বাহিনী হিসেবে কা'কা ইবনু আমরের নেতৃত্বে কাদিসিয়ায় রওনা করান। ৪৮২
গ. কা'কা ইবনু আমরের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা
কা'কারা. তাঁর অগ্রবর্তী বাহিনী নিয়ে দ্রুতবেগে ইয়াওমুল আগওয়াসের ভোরে কাদিসিয়া পৌঁছে মুসলিমবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হন। তিনি মুসলিম সেনাদের হৃদয় থেকে ভয়ভীতি ও আতঙ্ক দূর করে তাঁদের মধ্যে সাহস সঞ্চারের চেষ্টা করেন। কৌশল হিসেবে তাঁর সঙ্গে থাকা সেনাদের ১০০ জনকে আলাদা আলাদা দলে ভাগ করে প্রত্যেক দলকে তাকবিরধ্বনি দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশের নির্দেশ দেন। বলেন, '১০ জন ১০ জন করে একেকটা দল একের পর এক তাকবির দিয়ে প্রবেশ করবে।' অর্থাৎ, এক দল চোখের আড়ালে চলে গেলে অপর দল সামনে এগোবে। সেনারা তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী ১০০ জনের প্রত্যেক দল ১০ জন করে তাকবির দিয়ে ময়দানে প্রবেশ করে। তাঁদের তাকবিরধ্বনি শুনে অন্যান্য সেনাও তাকবির দিতে শুরু করে। এতে মুসলমান সেনাদের মনে শক্তি ও সাহস বৃদ্ধি পায় এবং পারস্যবাহিনী হীনবল হয়ে পড়ে।
১ হাজার সেনার এই বাহিনীর আগমন তেমন বিশেষ কিছু ছিল না; কিন্তু এটা আল্লাহর বহু বড় এক অনুগ্রহ যে, কা'কার এমন অভিনব কৌশলে সবার মন থেকে সংখ্যার স্বল্পতার বিষয়টা একেবারেই দূরীভূত হয়ে যায়। কা'কা সহযোগী বাহিনীর আগমনের সুসংবাদ শুনিয়ে বলেন, 'হে লোকসকল, আমি এমন প্রাণোৎসর্গী বাহিনী নিয়ে আসছি, তারা যদি তোমাদের পর্যন্ত এসে পৌঁছায়, তবে অল্পসংখ্যক হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের হীনম্মন্যতার বিষয়টা যদি তারা জানতে পারত, তাহলে তাদের একেবারে দুর্বল সদস্যও তোমাদের আগে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইবে। তারা চাইবে, তোমাদের ওপর যেন মর্যাদার শীর্ষস্থান অর্জন করতে পারে। তোমরা আমাকে যেমন করতে দেখছ, তেমনই করো।'
এরপর কা'কা কাতার থেকে সামনে এসে বলেন, 'হে পারস্যবাহিনী, তোমাদের কে আছে, যে আমার সঙ্গে লাড়াই করবে?' এ কথা শুনে সেনাপতি জুলহাজিব বাহমন জাদবিয়া এগিয়ে এলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি কে?' উত্তরে সে বলে, 'আমি বাহমন জাদবিয়া।'
এটুকু শুনতেই কা'কার মানসপটে জেগে ওঠে জিসরযুদ্ধে তার কারণে মুসলিমদের দুর্ভোগের কথা। ইমানি চেতনায় উদ্বেলিত হয়ে তিনি বলেন, 'হে আবু উবায়েদের হত্যাকারী ও জিসরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, আমি তোর থেকে প্রতিশোধ নেবই!'
প্রতিপক্ষ লোকটা যদিও বিখ্যাত এক পারসিক সেনা-অধিনায়ক, তথাপি কা'কার প্রভাবপ্লাবী গর্জনে তার মনে ভীতির সঞ্চার হয়। খলিফা আবু বকর কা'কা সম্পর্কে বলতেন, 'কা'কার একটা গর্জনই ১ হাজার সেনাকে কুপোকাত করে দেওয়ার শক্তি রাখে। ১৪৮৩ তবে একজন লোক, সে যত বড় বীরই হোক না কেন, কী করে তাঁর সামনে অটল থাকতে পারে? অনতিবিলম্বে দু-জনে যুদ্ধে লিপ্ত হন। কা'কা নিমিষেই তাকে খতম করে দেন। ফলে পারস্যবাহিনীর মনোবল ক্রমশ ভেঙে যেতে থাকে; আর মুসলিমদের মনোবল প্রত্যয়দীপ্ত হতে থাকে। কেননা, জুলহাজিব ছিল পারস্যবাহিনীর ২০ হাজার সেনার অধিনায়ক।
কা'কা আবার বলেন, 'কে আছে আমার সঙ্গে যুদ্ধ করবে?' তখন পারস্য-সেনাপতি বিরজান ও বান্দুওয়ান ছুটে আসে। এ দৃশ্য দেখে মুসলিম সেনা হারিস ইবনু জুবইয়ান সামনে অগ্রসর হন। কা'কা বিরজানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে নিমিষেই তার দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। অনুরূপ হারিসও বান্দুয়ানের দেহ থেকে মস্তক আলাদা করে দেন। এভাবে কা'কা ভোরেই পারসিকদের পাঁচ অধিনায়কের দুজনকে খতম করে দেন। নিঃসন্দেহে পারস্যবাহিনীর জন্য এটা ছিল এক মস্তবড় ক্ষতি। এতে তারা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। মনোবল হারিয়ে পেছনে হটতে থাকে। পরে উভয় পক্ষের অশ্বারোহীদের মধ্যে যথারীতি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
কা'কা তখন বলা শুরু করেন, 'হে মুসলিমরা, তোমরা তরবারি দিয়ে তাদের মোকাবিলা করো। কেননা, লোকদের হত্যা করতেই এটা তৈরি করা হয়েছে।' এরপর লোকেরা তাঁর উপদেশ গ্রহণ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কা'কা সেদিন ৩০ জন সেনাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য ডেকে তাদের সবাইকে হত্যা করতে সক্ষম হন। যেখানেই শত্রুদের দেখা যেত, সেখানেই প্রবল আক্রমণে হামলে পড়তেন তিনি; আর কার্যসিদ্ধির পর এই কবিতা আবৃত্তি করতেন,
এই যুদ্ধে আমি তাদের উচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব
এবং নির্ভুল নিশানায় বর্শার বৃষ্টি নিক্ষেপ করব।
শত্রুদের শেষ ব্যক্তি বাজার জামহার হামজানিকে হত্যা করা হলে তার ব্যাপারে তিনি আবৃত্তি করেন,
আমি পূর্ণ উদ্যম ও শক্তিব্যয়ে তাকে মাটিতে চিৎ করে ফেলে দিয়েছি
এবং সূর্যের কিরণের মতো তার রক্ত ভূমিতে ছড়িয়ে পড়েছে-
ইয়াওমুল আগওয়াসের সময়-যখন পারসিকদের রাত
তাদের মধ্যে ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে এসেছিল।
টিকাঃ
৪৭৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/২৬।
৪৭৪. আল-ফুতুহ, ইবনু আসাম: ১/১৬৪; আল-আনসার ফিল আসরির রাশিদি: ২১৬।
৪৭৫. আল-আনসার ফিল আসরির রাশিদি: ২১৬।
৪৭৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/২৬।
৪৭৭. ইতমামুল ওয়াফা ফি সিরাতিল খুলাফা: ৬৫।
৪৭৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/২৭১।
৪৭৯. হারকাতুল ফাততিল ইসলামি: ৭২।
৪৮০. আল-কামিল ফিত তারিখ: ২/৮৭১।
৪৮১. আত-তারিখুল ইসলামি: ১০/৩৩৪।
৪৮২. তারিখুত তাবারি: ৪/৩৬৭; আত-তারিখুল ইসলামি: ১০/৩৬৭।
৪৮৩. আত-তারিখুল ইসলামি: ১০/৪৫৫।
📄 বিসান ও তাবারিয়া বিজয়
আবু উবায়দা ও খালিদ রা. আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাবের নির্দেশনামতো আপন আপন বাহিনী নিয়ে হিমসের দিকে যাত্রা করেন। শুরাহবিল ইবনু হাসানাকে আবু উবায়দা জর্ডানে তাঁর প্রতিনিধি নিয়োজিত করেন। শুরাহবিল তাঁর সঙ্গে আমর ইবনুল আসকে নিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হন এবং বিসান অবরোধ করেন। সেখানকার লোকেরা মোকাবিলায় এলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয় তাদের সঙ্গে। অসংখ্য রোমীয় নিহত হয়। পরিশেষে যেভাবে দামেশকে সন্ধি হয়েছিল, তদ্রুপ তারাও সন্ধি করে নেয়। শুরাহবিল তাদের ওপর জিজয়া-কর ও জমির খারাজ আরোপ করেন। আবুল আওয়ার আস-সুলামি রা. তাবারিয়াবাসীর সঙ্গেও তদ্রুপ আচরণ করেন। ৫০৭
টিকাঃ
৫০৭. তারতিব ওয়া তাহজিব আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬১।