📄 আজনাদায়নযুদ্ধ
খালিদ রা. শামে পৌঁছেই বসরা জয় করেন। এরপর তিনি মুসলিম সেনাপতিত্রয় তথা আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, শুরাহবিল ইবনু হাসানা এবং ইয়াজিদ আবি সুফিয়ানের সঙ্গে মিলিত হন। সেখানে পৌঁছেই সামরিক অবস্থা পর্যালোচনা করেন। তাঁদের থেকে সূক্ষ্ম বিষয়াদি সম্পর্কে অবহিত হন। এ ছাড়া আমর ইবনুল আসের অবস্থান সম্পর্কেও জেনে নেন, যিনি তখন সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর কাছে দ্রুত পৌঁছার জন্য জর্দান নদীর তীরবর্তী রোমানবাহিনীর মোকাবিলা এড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন; কিন্তু শত্রুবাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতিসহ তাঁকে ধাওয়া করে চলছিল বিধায় তাঁর পৌঁছতে দেরি হচ্ছিল। তারা তাঁকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করছিল।
তবে আমর রা. ছিলেন এ ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন। তিনি ভালো করেই জানতেন, এমতাবস্থায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া হবে সম্পূর্ণ বোকামি। কারণ, তাঁর বাহিনীর সংখ্যা মাত্র ৭ হাজারের মতো; অথচ রোমানবাহিনী ছিল এর কয়েকগুণ বেশি। খালিদ রা. সেখানে পৌঁছে সামরিক বিষয়াদি পর্যবেক্ষণের পর এ সিদ্ধান্তে যান যে, এখন তাঁর সামনে দুটি বিষয় রয়েছে :
১. হয় তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে আমর ইবনুল আসের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হবেন। এরপর রোমানবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাদের ধ্বংস করে ফিলিস্তিনে তাঁর অবস্থান মজবুত করবেন।
২. নিজ অবস্থানে থেকে আমর ইবনুল আসকে তাঁর সঙ্গে এসে মিলিত হওয়ার কথা বলবেন। আর রোমানদের সেই বাহিনীর অপেক্ষায় বসে থাকবেন, যারা শাম থেকে ইতিমধ্যে রওনা হয়ে গেছে। তারা চলে এলে পরে চূড়ান্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন।
খালিদ রা. প্রথম বিষয়টা অগ্রাধিকার দেন। এর অন্যতম কারণ ছিল, তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, ফিলিস্তিন অধিকার করতে পারলে প্রয়োজনে মুসলিমদের পিছু হটার পথ উন্মুক্ত থাকবে। তাদের কেন্দ্রগুলোও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ থাকবে। এমতাবস্থায় তাঁরা রোমানদের যেকোনো সময় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবেন। শত্রুরাও পেছন থেকে মুসলিমবাহিনীর ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকবে। কারণ, তখন তাঁর বাহিনীর একাংশ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে এবং একাংশ তাঁদের নিরাপত্তা জুগিয়ে যেতে পারবে।
সুতরাং খালিদ রা. সেনাদের নিয়ে ফিলিস্তিন অভিমুখে রওনা দেন এবং আমর ইবনুল আসকে চিঠি পাঠিয়ে বলেন, তিনি যেন রোমানবাহিনীকে ধোঁকায় ফেলে তাঁর বাহিনীর কাছে নিয়ে আসেন। এরপর সবাই মিলে একসঙ্গে তাদের ওপর হামলা করবেন। খালিদের নির্দেশ পেয়ে আমর ইবনুল আস আজনাদায়নে এসে পৌঁছান। ৪০৭
১. খালিদ ও আমরের সামরিক প্রজ্ঞা
আমর ইবনুল আসের বাহিনী যখন খালিদের বাহিনীর কাছে এসে পৌঁছায়, তখন মুসলিমবাহিনীর সেনাসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩০ হাজারে। খালিদ তাঁর বাহিনী নিয়ে উপযুক্ত সময়েই ময়দানে হাজির হন। একপর্যায়ে রোমানদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে খালিদ ও আমরের সামরিক প্রজ্ঞা বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাঁরা ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিশেষজ্ঞ বাহাদুরদের সমন্বয়ে আলাদা একটা ইউনিট গঠন করে রাখেন। তাঁরা যুদ্ধের একপর্যায়ে শত্রুবাহিনীর ব্যূহ পর্যুদস্ত করে রোমান-জেনারেলের কাছাকাছি পৌঁছে তাদের নিঃশেষ করে ফেলেন। জেনারেলের মৃত্যুর পরপরই রোমানবাহিনী দিগ্বিদিক পালিয়ে যেতে থাকে।
শামের আজনাদায়ন প্রান্তরের লড়াই ছিল মুসলিম ও রোমানদের মধ্যকার প্রথম বৃহৎ লড়াই। যখন হিমসে অবস্থানরত রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে তার বিশাল বাহিনীর পর্যুদস্ত হওয়ার সংবাদ পৌঁছায়, তখন সে অবস্থার ভয়াবহতা ভালো করেই অনুধাবন করতে পারে। ৪০৮
২. খালিদ কর্তৃক খলিফার কাছে আজনাদায়ন বিজয়ের সংবাদ
এদিকে খালিদ মদিনায় অবস্থানরত খলিফা আবু বকরকে আজনাদায়নের বিজয়ের সংবাদ পাঠিয়ে বলেন,
আল্লাহর রাসুলের খলিফা বরাবরে আল্লাহর তরবারি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পক্ষ থেকে। আমি সেই মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।
হামদ ও সালাতের পর,
আল্লাহর রাসুলের খলিফা, আমি আপনাকে সংবাদ দিচ্ছি, আমরা শত্রুর মোকাবিলায় নেমেছিলাম। তারা আজনাদায়ন প্রান্তরে আমাদের বিরুদ্ধে বিশাল একটা বাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়েছিল। তারা তাদের ক্রুশ উত্তোলন করেছিল। তাদের কিতাব মেলে ধরেছিল। তারা শপথ করে বলেছিল, আমাদের ধ্বংস করে ছাড়বে অথবা তাদের দেশ থেকে আমাদের বের করে স্বস্তির নিশ্বাস নেবে; কোনো অবস্থায়ই তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাবে না। এদিকে তখন আমরাও আল্লাহর ওপর নির্ভর করে দৃঢ়পায়ে তাদের মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে যাই। বর্শা দ্বারা তাদের ওপর হামলে পড়ি। এরপর তরবারি ধারণ করে এগিয়ে যাই। প্রতিটা উপত্যকা, মাঠ ও পথে আমরা তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ি। আমি আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি তাঁর দীনকে বিজয়ী করেছেন। শত্রুবাহিনীকে লাঞ্ছিত-অপদস্থ করেছেন। তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেছেন।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আবু বকর রা. চিঠি পেয়ে অত্যন্ত প্রীত হন এবং বলেন, 'যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি মুসলিমদের বিজয়ী করেছেন এবং আমার চক্ষু শীতল করে দিয়েছেন। '৪০৯
টিকাঃ
৪০৭. 'আজনাদায়ন' ফিলিস্তিনের পাশেরই একটি এলাকা। আল-মুজাম, ইয়াকুত হামাবি: ১/২০৩।
৪০৮. আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., নাজার আল হাদিসি: ৭০-৭১।
৪০৯. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ৮৪-৯৩।
খালিদ রা. শামে পৌঁছেই বসরা জয় করেন। এরপর তিনি মুসলিম সেনাপতিত্রয় তথা আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, শুরাহবিল ইবনু হাসানা এবং ইয়াজিদ আবি সুফিয়ানের সঙ্গে মিলিত হন। সেখানে পৌঁছেই সামরিক অবস্থা পর্যালোচনা করেন। তাঁদের থেকে সূক্ষ্ম বিষয়াদি সম্পর্কে অবহিত হন। এ ছাড়া আমর ইবনুল আসের অবস্থান সম্পর্কেও জেনে নেন, যিনি তখন সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর কাছে দ্রুত পৌঁছার জন্য জর্দান নদীর তীরবর্তী রোমানবাহিনীর মোকাবিলা এড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন; কিন্তু শত্রুবাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতিসহ তাঁকে ধাওয়া করে চলছিল বিধায় তাঁর পৌঁছতে দেরি হচ্ছিল। তারা তাঁকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করছিল।
তবে আমর রা. ছিলেন এ ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন। তিনি ভালো করেই জানতেন, এমতাবস্থায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া হবে সম্পূর্ণ বোকামি। কারণ, তাঁর বাহিনীর সংখ্যা মাত্র ৭ হাজারের মতো; অথচ রোমানবাহিনী ছিল এর কয়েকগুণ বেশি। খালিদ রা. সেখানে পৌঁছে সামরিক বিষয়াদি পর্যবেক্ষণের পর এ সিদ্ধান্তে যান যে, এখন তাঁর সামনে দুটি বিষয় রয়েছে :
১. হয় তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে আমর ইবনুল আসের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হবেন। এরপর রোমানবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাদের ধ্বংস করে ফিলিস্তিনে তাঁর অবস্থান মজবুত করবেন।
২. নিজ অবস্থানে থেকে আমর ইবনুল আসকে তাঁর সঙ্গে এসে মিলিত হওয়ার কথা বলবেন। আর রোমানদের সেই বাহিনীর অপেক্ষায় বসে থাকবেন, যারা শাম থেকে ইতিমধ্যে রওনা হয়ে গেছে। তারা চলে এলে পরে চূড়ান্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন।
খালিদ রা. প্রথম বিষয়টা অগ্রাধিকার দেন। এর অন্যতম কারণ ছিল, তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, ফিলিস্তিন অধিকার করতে পারলে প্রয়োজনে মুসলিমদের পিছু হটার পথ উন্মুক্ত থাকবে। তাদের কেন্দ্রগুলোও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ থাকবে। এমতাবস্থায় তাঁরা রোমানদের যেকোনো সময় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবেন। শত্রুরাও পেছন থেকে মুসলিমবাহিনীর ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকবে। কারণ, তখন তাঁর বাহিনীর একাংশ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে এবং একাংশ তাঁদের নিরাপত্তা জুগিয়ে যেতে পারবে।
সুতরাং খালিদ রা. সেনাদের নিয়ে ফিলিস্তিন অভিমুখে রওনা দেন এবং আমর ইবনুল আসকে চিঠি পাঠিয়ে বলেন, তিনি যেন রোমানবাহিনীকে ধোঁকায় ফেলে তাঁর বাহিনীর কাছে নিয়ে আসেন। এরপর সবাই মিলে একসঙ্গে তাদের ওপর হামলা করবেন। খালিদের নির্দেশ পেয়ে আমর ইবনুল আস আজনাদায়নে এসে পৌঁছান। ৪০৭
১. খালিদ ও আমরের সামরিক প্রজ্ঞা
আমর ইবনুল আসের বাহিনী যখন খালিদের বাহিনীর কাছে এসে পৌঁছায়, তখন মুসলিমবাহিনীর সেনাসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩০ হাজারে। খালিদ তাঁর বাহিনী নিয়ে উপযুক্ত সময়েই ময়দানে হাজির হন। একপর্যায়ে রোমানদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে খালিদ ও আমরের সামরিক প্রজ্ঞা বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাঁরা ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিশেষজ্ঞ বাহাদুরদের সমন্বয়ে আলাদা একটা ইউনিট গঠন করে রাখেন। তাঁরা যুদ্ধের একপর্যায়ে শত্রুবাহিনীর ব্যূহ পর্যুদস্ত করে রোমান-জেনারেলের কাছাকাছি পৌঁছে তাদের নিঃশেষ করে ফেলেন। জেনারেলের মৃত্যুর পরপরই রোমানবাহিনী দিগ্বিদিক পালিয়ে যেতে থাকে।
শামের আজনাদায়ন প্রান্তরের লড়াই ছিল মুসলিম ও রোমানদের মধ্যকার প্রথম বৃহৎ লড়াই। যখন হিমসে অবস্থানরত রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে তার বিশাল বাহিনীর পর্যুদস্ত হওয়ার সংবাদ পৌঁছায়, তখন সে অবস্থার ভয়াবহতা ভালো করেই অনুধাবন করতে পারে। ৪০৮
২. খালিদ কর্তৃক খলিফার কাছে আজনাদায়ন বিজয়ের সংবাদ
এদিকে খালিদ মদিনায় অবস্থানরত খলিফা আবু বকরকে আজনাদায়নের বিজয়ের সংবাদ পাঠিয়ে বলেন,
আল্লাহর রাসুলের খলিফা বরাবরে আল্লাহর তরবারি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পক্ষ থেকে। আমি সেই মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।
হামদ ও সালাতের পর,
আল্লাহর রাসুলের খলিফা, আমি আপনাকে সংবাদ দিচ্ছি, আমরা শত্রুর মোকাবিলায় নেমেছিলাম। তারা আজনাদায়ন প্রান্তরে আমাদের বিরুদ্ধে বিশাল একটা বাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়েছিল। তারা তাদের ক্রুশ উত্তোলন করেছিল। তাদের কিতাব মেলে ধরেছিল। তারা শপথ করে বলেছিল, আমাদের ধ্বংস করে ছাড়বে অথবা তাদের দেশ থেকে আমাদের বের করে স্বস্তির নিশ্বাস নেবে; কোনো অবস্থায়ই তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাবে না। এদিকে তখন আমরাও আল্লাহর ওপর নির্ভর করে দৃঢ়পায়ে তাদের মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে যাই। বর্শা দ্বারা তাদের ওপর হামলে পড়ি। এরপর তরবারি ধারণ করে এগিয়ে যাই। প্রতিটা উপত্যকা, মাঠ ও পথে আমরা তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ি। আমি আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি তাঁর দীনকে বিজয়ী করেছেন। শত্রুবাহিনীকে লাঞ্ছিত-অপদস্থ করেছেন। তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেছেন।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আবু বকর রা. চিঠি পেয়ে অত্যন্ত প্রীত হন এবং বলেন, 'যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি মুসলিমদের বিজয়ী করেছেন এবং আমার চক্ষু শীতল করে দিয়েছেন। '৪০৯
টিকাঃ
৪০৭. 'আজনাদায়ন' ফিলিস্তিনের পাশেরই একটি এলাকা। আল-মুজাম, ইয়াকুত হামাবি: ১/২০৩।
৪০৮. আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., নাজার আল হাদিসি: ৭০-৭১।
৪০৯. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ৮৪-৯৩।
📄 ইয়ারমুকের যুদ্ধ
আজনাদায়ন প্রান্তরে রোমানরা লজ্জাজনক পরাজয়ের শিকার হয়। মুসলিমরা বিশাল বিজয় অর্জনের পর তাদের সেনাদল নিয়ে ফিরে আসেন। তারা অনেকটা প্রশান্ত চিত্তে খলিফার নির্দেশমতো ইয়ারমুক প্রান্তরে কাজে লেগে যান। এদিকে রোমানবাহিনী তাদের জেনারেল থিয়োডরের নেতৃত্বে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারাও একটা বিশাল প্রশস্ত মাঠে এসে শিবির স্থাপন করে, যেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা ছিল সংকীর্ণ। তারা ইয়ারমুকের একেবারে পাশে ওয়াকুসা নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেছিল।
১. উভয় বাহিনীর সেনাসংখ্যা
• মুসলিমবাহিনী : খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বাধীন মুসলিমবাহিনীর সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার। কোনো কোনো বর্ণনামতে তাঁদের সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার。
• রোমানবাহিনী : থিয়োডরের নেতৃত্বে রোমানবাহিনীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার।
২. যুদ্ধের আগে
মুসলিমরা খালিদের নেতৃত্বে ইয়ারমুক পৌঁছে সেখানে শিবির স্থাপন করেন; আর রোমানরা নদীর দক্ষিণ তীরে তাদের সেনাসমাবেশ ঘটায়। এই অবস্থায় আমর ইবনুল আস মুসলিমবাহিনীকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘মুসলিমরা, সুসংবাদ নাও। আল্লাহর শপথ, রোমানরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে; আর অবরুদ্ধরা খুব কম ক্ষেত্রেই বিজয় অর্জন করতে পারে।’৪১০ খালিদ রা. এই যুদ্ধে সম্পূর্ণ নতুন কৌশলে সেনাব্যূহ রচনা করেন, যা ইতিপূর্বে আরবদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত।৪১১
• ফিরকা (ছোট বাহিনী) : এটা ১০ থেকে ২০ কুরদুস পর্যন্ত হয়ে থাকত। এর একজন আলাদা অধিনায়ক থাকতেন।
• কুরদুস : ১ হাজার সেনার একটা ইউনিট, যার একজন পৃথক নেতা থাকত।৪১২
খালিদ রা. এই প্রক্রিয়ায় বাহিনীকে ৪০ সারিতে বিন্যস্ত করেন।
• কালব (মধ্যবাহিনী) : এটা ছিল ১৮ কুরদুসের সমন্বয়ে ঘটিত। এর নেতৃত্ব ছিল আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের হাতে। তাঁর সহযোগিতায় ছিলেন ইকরিমা ইবনু আবি জাহল ও কা'কা ইবনু আমর রা.।
• মায়মানা (ডান বাহু) : এটা ছিল ১০ কুরদুসের সমন্বয়ে ঘটিত। এর নেতৃত্বভার ছিল আমর ইবনুল আসের কাঁধে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন শুরাহবিল ইবনু হাসানা রা.।
• মায়সারা (বাম বাহু) : এটাও ছিল ১০ কুরদুস বিশিষ্ট। এর নেতৃত্বে ছিলেন ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান রা.।
• তালিয়া (অগ্রবর্তী বাহিনী): এরা ছিল অশ্বারোহীদের দ্বারা গঠিত নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী। এদের দায়িত্ব ছিল মুসলিমবাহিনীর দেখাশোনা ও শত্রুবাহিনীর ওপর কড়া দৃষ্টি রাখা। তাই এদের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম。
• সাকা (পশ্চাদ্দ্বাহিনী) : এই বাহিনী ছিল ৫ কুরদুস তথা ৫ হাজার যোদ্ধার সমন্বয়ে ঘটিত। এর নেতৃত্বে ছিলেন সায়িদ ইবনু জায়েদ রা.। এই বাহিনীর দায়িত্ব ছিল সাধারণত প্রশাসনিক দিকগুলোর ওপর নজর রাখা। এর কাজি ছিলেন আবুদ দারদা রা.; আর খাবার-পানি, গনিমত একত্রিত করাসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা.। মিকদাদ ইবনু আসওয়াদ রা. ছিলেন কারির ভূমিকায়। তিনি সেনাবাহিনীর সামনে জিহাদ-সংক্রান্ত আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতেন, যাতে মুজাহিদদের মধ্যে আধ্যাত্মিক শক্তির স্ফুরণ ঘটে। সেনাবাহিনীর বক্তা হিসেবে নিযুক্ত হন আবু সুফিয়ান ইবনু হারব রা.। তিনি প্রত্যেক সারিতে গিয়ে সেনাবাহিনীকে উদ্দীপ্ত করতেন। ৪১৩ আর সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. বড় বড় সাহাবিকে নিয়ে সেনাবাহিনীর ঠিক মধ্যখানে অবস্থান করছিলেন।
মুসলিমবাহিনী খালিদের নেতৃত্বে তাঁদের প্রস্তুতি সেরে নিয়েছিল। প্রত্যেক নেতা নিজ নিজ সেনাদলের সামনে উপস্থিত হয়ে জিহাদের ব্যাপারে তাদের উৎসাহিত করতে থাকেন। মুসলিমবাহিনীর নেতারা জানতেন, এই যুদ্ধ এক বিশাল প্রতিফল বহন করতে যাচ্ছে। এটা হবে ইতিহাসের মোড় নির্ধারণী এক যুদ্ধ। রোমানবাহিনীও মনে করছিল, 'এই যুদ্ধের পরাজয় হবে পুরো শাম অঞ্চলের পরাজয়। যদি আমরা যুদ্ধে হেরে যাই, তাহলে শামের সব দরজা মুসলিমদের জন্য খুলে যাবে। তাদের সামনে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তখন তাদের জন্য এশিয়া-ইউরোপ বিজয় একেবারে সহজ হয়ে যাবে।'৪১৪
৩. ইমানি প্রস্তুতি
ইমান ও কুফরের বাহিনী যখন পরস্পর মুখোমুখি হয়, তখন একে অন্যকে দ্বৈরথের আহ্বান জানায়। এমতাবস্থায় আবু উবায়দা রা. মুসলিমদের উপদেশ দিয়ে বলছিলেন, 'আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহর দীনের সাহায্য করো। আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন। মুসলিমরা, ধৈর্যসহকারে কাজ করো। ধৈর্য হচ্ছে কুফর থেকে মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। লজ্জা পরাজয় ও বিনাশের কারণ। নিজেদের সারি থেকে পিছু হটবে না। আগে বেড়ে শত্রুর ওপর হামলা করবে না। বর্শাগুলো সঠিক আঙ্গিকে ধরে রেখে ঢাল দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে। নীরবতা অবলম্বন করবে। মনে মনে আল্লাহর জিকির করতে থাকবে। আমি নির্দেশ দেওয়ার পরই তোমরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে।'
এরপর সাহাবি মুআজ ইবনু জাবাল রা. লোকজনকে উপদেশস্বরূপ বলেন, 'কুরআনধারী মুসলিমরা, আল্লাহর কিতাবের হিফাজতকারীরা, হিদায়াতের সাহায্যকারীরা, হকের পতাকাবাহীরা, আল্লাহর রহমত ও জান্নাত কেবল আশা-আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হয় না, আল্লাহ তাঁর সুমহান রহমত ও সাহায্য কেবল সত্যবাদীদেরই দান করে থাকেন। তোমরা কি আল্লাহর ঘোষণা শোনোনি-"তোমাদের যারা ইমান আনে এবং সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন; তিনি অবশ্যই তাদের প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেভাবে প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদের।” [সুরা নূর: ৫৫]
আল্লাহ তোমাদের ওপর রহম করুন। তোমাদের তিনি পলায়নকারী হিসেবে দেখছেন, এ থেকে লজ্জা অনুভব করো। তিনি ছাড়া তোমাদের সম্মান ও বিজয়দানকারী কেউ নেই।'
সাহাবি আমর ইবনুল আস রা. বলছিলেন, 'মুসলিমরা, দৃষ্টি অবনত রাখবে। হাঁটু গেড়ে বসে থাকবে। বর্শাগুলো সোজা রাখবে। শত্রুরা যখন হামলা চালাবে, তাদের একটু ছাড় দেবে, যতক্ষণ-না তারা তোমাদের বর্শার পাল্লায় এসে পৌঁছায়। এরপর বাঘের মতো তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। শপথ সেই সত্তার, যিনি সত্যকে ভালোবাসেন, যিনি প্রতিদান দেন, যিনি মিথ্যাকে অপছন্দ করেন এবং মিথ্যার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছেন, যিনি ভালোর প্রতিদান ভালো দিয়েই করেন। আমি শুনেছি, মুসলিমরা অচিরেই একের পর এক বস্তি, একের পর এক মহল্লা জয় করবে। অতএব, ওদের সেনাধিক্য দেখে ভয় করেবে না। তোমরা যদি দৃঢ়পদে যুদ্ধ করো, তাহলে ওরা পাখির মতো উড়ে যাবে।'
সাহাবি আবু সুফিয়ান রা. বলছিলেন, 'মুসলিমরা, এ মুহূর্তে তোমরা পরিবার-পরিজন এবং আমিরুল মুমিনিনের পক্ষ থেকে পাঠানো সাহায্যবাহিনী থেকে দূরে অবস্থান করছ। আল্লাহর শপথ, তোমরা এমন এক বাহিনীর মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে আছ, যাদের সংখ্যা তোমাদের থেকে অনেক বেশি। যারা অত্যন্ত কঠিন প্রতিপক্ষ। তারা আছে নিজেদের সন্তানাদি এবং মালসামানার পাশে, নিজেদের দেশে। আল্লাহ তোমাদের তখনই সাহায্য করবেন, যখন তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট হবেন। যখন তোমরা কঠিন অবস্থায় ধৈর্যধারণ করবে, নিজেদের তরবারি দ্বারা নিজেদের হিফাজত করবে, একে অন্যকে সাহায্য করবে- এটাই তোমাদের জন্য মুক্তির মাধ্যম হতে পারে।'
এরপর তিনি মহিলাদের কাছে যান। তাদেরও যথাযথ উপদেশ দিয়ে বলেন, ৪১৫ 'মুসলিমরা, সেই জিনিস এসে গেছে, যা তোমরা প্রত্যক্ষ করছ। শোনো, এই তো তোমাদের সামনে নবিজি ও জান্নাত। তোমাদের সামনে রয়েছে শয়তান ও জাহান্নাম।' এরপর তিনি নিজের জায়গায় ফিরে যান। ৪১৬
সেই মুহূর্তে আবু হুরায়রা রা. লোকজনকে উপদেশস্বরূপ বলছিলেন, 'হে লোকজন, আয়াতলোচনা হুর ও জান্নাতের দিকে এগিয়ে চলো। তোমরা আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছ, সেই জায়গাই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান। সাবধান, ধৈর্যধারণকারীদের জন্যই রয়েছে সবচেয়ে উঁচু অবস্থান।'
ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান প্রতিটা কুরদুসে গিয়ে বলতেন, 'আল্লাহ, আল্লাহ, তোমরা আরবদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধকারী এবং ইসলামের সহায়তাকারী। তোমাদের শত্রুরা রোমের নিরাপত্তারক্ষী এবং শিরকের সাহায্যকারী। হে আল্লাহ, এটা তোমার দীন। আল্লাহ, তোমার বান্দাদের ওপর সাহায্য অবতরণ করো। ১৪১৭
আরবের এক খ্রিষ্টান খালিদ রা.-কে লক্ষ করে বলে, 'রোমানরা সংখ্যায় কতই-না বেশি এবং মুসলিমরা কতই-না কম!' উত্তরে খালিদ বলেন, 'তোমার ধ্বংস হোক, তুমি কি আমাকে রোমানদের সংখ্যাধিক্যের ভয় দেখাচ্ছ? আমাদের কাছে জনসংখ্যার কোনো মূল্য নেই। মূল লক্ষ্য তো হলো শত্রুকে পরাজয় ও লজ্জা উপহার দেওয়া এবং আল্লাহর বিজয় ও সাহায্য অর্জন করা। আল্লাহর শপথ, আমার তো মন চাইছে, আজ যদি আমার আশকার *১৮ সুস্থ থাকত আর শত্রুবাহিনী দ্বিগুণের চেয়ে বেশি হতো।'
মুআজ ইবনু জাবাল পাদরি ও যাজকদের আওয়াজ শুনলে বলে ওঠেন, 'আল্লাহ, শত্রুর পা টলিয়ে দিন। তাদের অন্তরগুলো সন্ত্রস্ত করে দিন। আমাদের ওপর প্রশান্তি বর্ষণ করুন। তাওহিদের ওপর আমাদের স্থির রাখুন। জিহাদ প্রিয়তম বৃত্তি বানিয়ে দিন এবং আপনার সিদ্ধান্তে আমাদের সন্তুষ্ট করে তুলুন। '৪১৯
সাত. রোম
রোমানরা তাদের অহংকার ও দৌরাত্ম্য নিয়ে কালো বাদলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে মাঠের ওপর ছেয়ে যায় এবং ভীষণ চ্যাঁচামেচি শুরু করে। পাদরি ও যাজকরা ইনজিল পাঠ করে তাদের সেনাদের উদ্দীপ্ত করে তুলছিল। ৪২০ তারা ইয়ারমুকের পাশে ওয়াকুসা নামক স্থানে জমায়েত হয়; কিন্তু উপত্যকাটা তাদের জন্য পরিখা হয়ে ওঠে。
রোমানরাও কুশলী সেনাবিন্যাস করে। তারা দুটি লাইনে সেনাবিন্যাস করে প্রতি পাঁচজনকে বৃত্তাকারে রাখে। মধ্যখানে ছিল যথেষ্ট ফাঁকা। দ্বিতীয় সারি ছিল প্রথম সারি থেকে পেছনের দিকে। এ ছাড়া যুদ্ধে তারা যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করে :
১. তিরন্দাজদের সম্মুখভাগে রেখেছিল। তাদের দায়িত্ব ছিল তির ছুড়ে যুদ্ধের সূচনা করেই ডান, বাম ও পেছনে চলে যাওয়া।
২. ডান ও বাম বাহুতে ছিল অশ্বারোহী বাহিনী। এদের দায়িত্ব ছিল তিরন্দাজরা পেছনে সরে যাওয়া পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা ও সহায়তা প্রদান।
৩. কুরদুস, (পদাতিক) এদের দায়িত্ব ছিল আক্রমণ জোরদার করে তোলা।
৪. সম্মুখসারিতে ছিল জেনারেল জারজাহ; আর ডান বাহুর সেনাপতি ছিল দারকিস। ৪২১
১. যুদ্ধপূর্ব সংলাপ
উভয় বাহিনী একে অন্যের পাশে পৌঁছে গেলে মুসলিমবাহিনী থেকে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ ও ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান রোমানদের দিকে এগিয়ে যান। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন জিরার ইবনুল আজওয়ার ও হারিস ইবনু হিশাম। তাঁরা বলছিলেন, 'আমরা তোমাদের নেতার সঙ্গে কথা বলতে চাই।' থিয়োডরের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাতের অনুমতি প্রদান করা হয়। সে তখন একটা রেশমি তাঁবুতে বসা ছিল। সাহাবিরা বলেন, 'আমরা এমন তাঁবুতে বসা বৈধ মনে করি না।' সে রেশমের গালিচা বিছিয়ে দেয়। তাঁরা তাতে বসতে অস্বীকার করে নিজেদের পছন্দমতো জায়গা দেখে বসে পড়েন। সন্ধি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়; কিন্তু সে আলোচনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ফলে তাঁরা আল্লাহর দীনের দিকে তাদের আহ্বান জানিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন।'
ওয়ালিদ ইবনু মুসলিম বর্ণনা করেন; বাহান খালিদের কাছে প্রস্তাব দেয়— 'এসো, আমরা উভয় বাহিনীর মধ্যখানে বসে সন্ধি নিয়ে আলোচনা করি।' খালিদ বেরিয়ে এলে বাহান তাঁকে বলে, 'জানি, নানাবিধ কষ্ট ও ক্ষুধা দেশ থেকে তোমাদের বেরিয়ে পড়তে বাধ্য করেছে! এসো, আমরা তোমাদের প্রত্যেকের হাতে ১০টা করে দিনার, পোশাক ও খাদ্যদ্রব্য ধরিয়ে দিই; আর তোমরা নিজের দেশে চলে যাও! চাইলে পরবর্তী বছরও তোমাদের এই পরিমাণ সাহায্য পাঠিয়ে দেওয়া হবে।' খালিদ বলেন, 'তুমি যা ভাবছ, ব্যাপার আসলে তা নয়। এখানে আসার কারণ হচ্ছে, আমরা মূলত রক্তপিপাসু জাতি। জানতে পেরেছি, রোমানদের রক্ত নাকি খুব সুস্বাদু। এ জন্যই আমরা এখানে ছুটে এসেছি।' খালিদের জবাব শুনে বাহানের সঙ্গীরা বলে ওঠে, 'আরবদের ব্যাপারে আমরা এমনটাই শুনে এসেছি।'
২. যুদ্ধের সূচনা
যুদ্ধপ্রস্তুতি সম্পন্নের পর খালিদ রা. মধ্যসারির উভয় বাহুতে নিযুক্ত ইকরিমা ও কা'কার দিকে এগিয়ে এসে তাঁদের আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দেন। তাঁরা উভয়ে তখন রণসংগীত গেয়ে গেয়ে এগোচ্ছিলেন। মধ্যমাঠে পৌঁছেই তাঁরা দ্বৈতযুদ্ধের আহ্বান জানান। রোমান বাহাদুররা বেরিয়ে আসে। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। খালিদ রা. তাঁর কুরদুস (১ হাজার সেনার বাহিনী) নিয়ে সেনাসারির মধ্যভাগে চলে আসেন। মুজাহিদরা তাঁর সামনে অবস্থান নিয়ে শত্রুর ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিলেন; আর তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যথাযথ নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। ৪২২
৩. রণাঙ্গনে রোমান সেনাপতি জারজাহর ইসলামগ্রহণ
রোমানবাহিনীর বড় সেনাপতি জারজাহ বেরিয়ে এসে খালিদকে ডাক দেয়। তিনি তার পাশেই চলে যান। এতটাই কাছে যান, উভয়ের ঘোড়ার ঘাড় পরস্পর মিলে যায়। জারজাহ তাঁকে বলে, 'খালিদ, আমি আপনাকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করব, আপনি কি আমাকে সঠিক তথ্য দেবেন? দয়া করে মিথ্যা বলবেন না, মিথ্যা বলা একজন স্বাধীন মানুষের জন্য লজ্জার বিষয়। এ ছাড়া আমাকে ধোঁকায়ও ফেলবেন না। অভিজাত ব্যক্তিরা আল্লাহর দিকে নত লোকদের ধোঁকা দিতে পারে না। আল্লাহ কি আপনাদের নবির কাছে আসমান থেকে কোনো তরবারি পাঠিয়েছেন, যা তিনি আপনাকে দান করে গেছেন? যার ফলে আপনি কখনোই পরাজিত হন না?'
-না।
-তাহলে আপনার নাম 'সাইফুল্লাহ' কেন?
-আল্লাহ আমাদের কাছে তাঁর নবিকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি দীনের পথে আমাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন আমাদের কিছুসংখ্যক মানুষ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর অনুসরণ করে; আর কিছুসংখ্যক সাড়া না দিয়ে তাঁকে মিথ্যা প্রতিপাদন করে। এরপর আল্লাহ আমাদের হিদায়াত দেন। আমরা তাঁর হাতে বায়আত হই। আল্লাহর ৪২২ নবি আমাকে লক্ষ করে বলেন, 'তুমি আল্লাহর তরবারিসমূহের একটি, যা আল্লাহ মুশরিকদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।' তিনি আমার জন্য বিজয় ও সাহায্যের দুআ করে গেছেন। এ কারণে আমার নাম হয়ে গেছে 'সাইফুল্লাহ'। আমি মুসলিমদের মধ্যে মুশরিকদের ওপর সবচেয়ে কঠোর।
- আপনারা মানুষকে কীসের দিকে আহ্বান করেন?
- আমরা মানুষকে 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল,' এই সাক্ষ্য প্রদানের আহ্বান জানাই এবং আল্লাহর রাসুল যা কিছু নিয়ে এসেছেন, সেগুলো স্বীকার করার আহ্বান করে থাকি।
- যারা আপনাদের দাওয়াত গ্রহণ করে না, তাদের ব্যাপারে আপনাদের সিদ্ধান্ত কী?
- তারা জিজয়া প্রদান করবে, আমরা তাদের নিরাপত্তাভার নেব।
- যদি তারা জিজয়া দিতে রাজি না হয়?
- আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি।
- আজ যদি কেউ আপনাদের দীনে প্রবেশ করে, তার অবস্থান কী হবে?
- আল্লাহ আমাদের ওপর যা ফরজ করেছেন, সেসব ব্যাপারে তার অবস্থান হবে ঠিক আমাদের মতো। আমাদের এখানে উঁচু-নীচু, প্রথম ও শেষ এসবের কোনো ভেদাভেদ নেই।
-আজ যে আপনাদের দীনে প্রবেশ করবে, সে কি আপনাদের সমান প্রতিদান পাবে?
-হ্যাঁ; বরং বেশিই পাবে।
- আপনাদের সমান হবে কীভাবে? অথচ আপনারা এ ব্যাপারে কতই-না অগ্রগামী?
- আমরা এই দীন কবুল করেছি। নবির হাতে বায়আত হয়েছি। তিনি যতদিন আমাদের মধ্যে জীবিত ছিলেন, ততদিন তাঁর কাছে ঐশী-নির্দেশনা আসত। তিনি আমাদের সেই কিতাবের সংবাদ দিতেন, মুজিজা দেখাতেন, আমরা যারা তা দেখেছি, শুনেছি, আমাদের জন্য তাঁর আনুগত্য প্রদর্শন ও বায়আতগ্রহণ জরুরি ছিল। কিন্তু আমরা যা দেখেছি ও শুনেছি, তোমরা তো তা দেখোনি বা শোনোনি, তাই তোমাদের যারা নিষ্ঠ চিত্তে ইসলামগ্রহণ করবে, সে আমাদের থেকে উত্তমই পরিগণিত হবে।
-(জারজাহ চিৎকার দিয়ে বলে) আল্লাহর দোহাই, আপনি সত্য বলছেন! আমাকে প্রতারিত করছেন না তো?
-আল্লাহর শপথ, আমি সত্য কথা বলেছি। তুমি আমাকে যে বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছ, এর ওপর আল্লাহ সাক্ষী।
এ কথা শুনে জারজাহ তার ঢাল ঘুরিয়ে খালিদের সঙ্গী হয়ে যায়। এরপর সে আবেদন করে, 'আমাকে ইসলাম শিক্ষা দিন।' খালিদ তাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের তাঁবুতে চলে আসেন। তাকে গোসল করার নির্দেশ দেন। এরপর দুই রাকআত সালাত পড়ান। জারজাহ খালিদের সঙ্গে চলে আসতেই রোমানরা আক্রমণ তীব্র করে তোলে। ফলে প্রথমদিকে মুসলিমদের পা টলতে শুরু করে। ইকরিমা ইবনু আবি জাহল আর হারিস ইবনু হিশামের নেতৃত্বে শুধু প্রতিরক্ষাবাহিনী তাদের অবস্থানে অবিচল থাকে। ৪২৩
৪. মুসলিম ডান বাহুতে রোমান বাম বাহুর আক্রমণ
অন্ধকার রাতের মতোই রোমানবাহিনী মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে এগিয়ে আসছিল। তাদের বাম বাহু মুসলিমদের ডান বাহুর ওপর আক্রমণ করে বসে। ফলে মুসলিমবাহিনীর মধ্যসারি ডান বাহুর সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। রোমানবাহিনী মুসলিমদের বিক্ষিপ্ত করে দিয়ে একেবারে পেছনের সারি পর্যন্ত পৌঁছে যেতে সমর্থ হয়। এ দৃশ্য দেখে মুআজ ইবনু জাবাল মুসলিমদের উদ্দেশে চিৎকার দিয়ে বলতে থাকেন, 'আল্লাহর বান্দারা, এরা তোমাদের ওপর বিজয়ী হতে আক্রোশে ফেটে পড়ছে। আল্লাহর শপথ, তোমাদের ধৈর্য আর অবিচলতাই ওদের ফিরিয়ে দিতে পারে।' এরপর তিনি ঘোড়া থেকে নেমে বলেন, 'যে আমার ঘোড়া নিয়ে লড়তে ইচ্ছুক, সে ঘোড়াটা নিয়ে নিক!' তিনি নিজে পদাতিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। ৪২৪
আজদ, মাজহাজ, হাজারামাউত ও খাওলানের লোকজন বীরত্ব ও দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই করে শত্রুবাহিনীর অগ্রযাত্রা রুখে দিতে সক্ষম হয়। রোমানরা পাহাড়-উঁচু আক্রমণের ঢেউ তুলে মুসলিমবাহিনীর ডান বাহু ও মধ্যসারির দিকে চলে আসে। এমতাবস্থায় মুসলিমবাহিনীর একটা দল পৃথক হয়ে শিবিরের দিকে চলে যায়। তবে বড় একটা দল তাদের অবস্থানে অনড় থেকে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে। জুবায়দের লোকজন শুরুতে বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলেও পরে আবার জড়ো হয়ে যায়। তারা তখন দিক পালটে তীব্রগতিতে শত্রুর ওপর হামলে পড়ে ওদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। বিক্ষিপ্ত হওয়া মুসলিমদের পিছুধাওয়া থেকেও ওদের বিরত রাখতে সমর্থ হয়। যারা শিবিরের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিল, মুসলিম বীরাঙ্গনারা লাঠি ও পাথর হাতে তাদের স্বাগত জানাচ্ছিল। ফলে ওরা পুনরায় নিজেদের সারি বিন্যস্ত করে নেয়। ৪২৫ ইকরিমা ইবনু আবি জাহল বলেন, 'আমি আল্লাহর রাসুলের সঙ্গে অনেক যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আজ কি আমি পলায়ন করতে পারি?' এরপর তিনি ঘোষণা দেন, 'কে আছ মৃত্যুর বায়আতকারী?' তাঁর চাচা জিরার ইবনুল আজওয়ার ও হারিস ইবনু হিশাম তখন ৪০০ অশ্বারোহী নিয়ে তাঁর হাতে বায়আত হন। তাঁরা তখন খালিদের সামনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যান। একপর্যায়ে সবাই আহত হয়ে পড়েন। অনেকে শাহাদাতবরণ করেন। শহিদদের একজন ছিলেন জিরার ইবনুল আজওয়ার। ৪২৬
ওয়াকিদিসহ কতিপয় ইতিহাসবিদের বর্ণনায় রয়েছে, জিরার আহত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে গেলে তিনি পানি পান করতে চাচ্ছিলেন। যখন তাঁর কাছে পানি নিয়ে যাওয়া হয়, তখন দেখতে পান আরেক আহত ব্যক্তি পানির দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে আছে। তিনি পানিবাহককে বলেন, 'আগে ওকে পান করিয়ে এসো!' দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনিও অনুরূপ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে বলেন, আগে ওকে পান করিয়ে এসো!' তৃতীয় ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। শুধু তা-ই নয়, মুসলিম ভাইকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এ প্রবণতা থেকে তাঁরা সবাই পানির বদলে শাহাদাতের শরাবে চুমুক দেন। রাজিআল্লাহু আনহুম আজমাইন।
বলা হয়ে থাকে, সেদিন যিনি প্রথমে শাহাদাতবরণ করেন, তিনি ইতিপূর্বে আবু উবায়দার কাছে গিয়ে বলেছিলেন, 'আমি সব প্রস্তুতি সেরে নিয়েছি। রাসুলের সঙ্গে কি আপনার কোনো কাজ আছে?' জবাবে আমিনুল উম্মাহ বলেন, 'রাসুল ﷺ-কে আমার সালাম দেবে আর বলবে, আল্লাহর রাসুল, আমাদের প্রতিপালক আমাদের সঙ্গে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তা সত্য পেয়েছি।'
এরপর ওই মুজাহিদ যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকেন এবং একপর্যায়ে শাহাদাতের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। সকল মানুষ নিজেদের পতাকার নিচে অবস্থান করে দৃঢ়পায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। রোমানরা চাকার মতো চারদিকে ঘুরছিল। সেদিন ইয়ারমুকের রণাঙ্গনে কেবল কর্তিত মস্তক, বলবান বাহু আর কবজিগুলোই উড়তে দেখা যাচ্ছিল। ৪২৭
৫. রোমান ডান বাহুর মুসলিমদের বাম বাহুতে আক্রমণ
কানাতিরের নেতৃত্বে রোমানদের ডান বাহু মুসলিম বাম বাহুর ওপর হামলে পড়ে। মুসলিম বাম বাহুতে ছিল কিনানা, কায়েস, খুসআম, জুজাম, কুজাআ, আমিরা ও গাসসান গোত্রসমূহের লোকজন। তাঁদের বাধ্য হয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে যেতে হয়। রোমানরা তখন পিছিয়ে যাওয়া মুসলিমদের ওপর আছড়ে পড়ে ধাওয়া শুরু করে। ধাওয়া খেয়ে মুসলিমরা শিবিরের কাছাকাছি পৌঁছলে ওদিক থেকে মুসলিম বীরাঙ্গনারা লাঠি ও পাথর হাতে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। মহিলারা পাথর ছুড়ে বলছিলেন, 'ইসলাম, মা আর স্ত্রীদের ইজ্জত কোথায় চলে গেল? তোমরা কাফিরদের জন্য আমাদের রেখে কোন দিকে পালিয়ে যাচ্ছ?'
নারীরা যখন এভাবে তাঁদের পৌরুষ ধরে নাড়া দেন, তখন তাঁদের চেতনা ফিরে আসে। তাঁরা যারপরনাই লজ্জিত হয়ে পুনরায় রণাঙ্গনে গিয়ে দৃঢ়পায়ে লড়তে থাকেন। রোমানদের বিপুলসংখ্যক লোক নিহত হয়েছিল। একপর্যায়ে মুসলিমদের একাংশের সেনাপতি সায়েদ ইবনু জায়েদ শাহাদাতবরণ করেন। তখন রোমানদের বাম বাহু ফের মুসলিম ডান বাহুর ওপর আক্রমণে তৎপর হয়ে ওঠে। তারা আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ওপর হামলা করে তাঁদের প্রায় অবরুদ্ধ করে ফেলে; কিন্তু আমরের বাহিনী অত্যন্ত দৃঢ়পদে মোকাবিলা করতে থাকে। তারপরও রোমানরা মুসলিমবাহিনীর শিবিরে পৌঁছে যেতে সমর্থ হয়।
এ অবস্থা দেখে মুসলিম নারীরা পুনরায় পাহাড় থেকে নেমে এসে পাথর ছুড়তে থাকেন। তাঁরা পুরুষ-যোদ্ধাদের ভর্ৎসনা করে বলছিলেন, 'যদি তোমরা আমাদের নিরাপত্তা দিতে না পারো, তাহলে তোমরা আমাদের স্বামী নও।' এর ফলে মুসলিমরা নবপ্রেরণায় উদ্দীপিত হয়ে ওঠেন। পুনরায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। তাঁরা তখন রোমানদের ওপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন যে, শত্রুবাহিনী এখান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ৪২৮
৬. পালানোর পথ করে দেওয়া এবং পদাতিক বাহিনীকে ধ্বংস
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে রোমানদের সেই বাম বাহুর ওপর ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে বসেন, যারা মুসলিমবাহিনীর ডান বাহুকে মধ্যভাগের দিকে ঠেলে নিয়ে আসছিল। তিনি তখন মুসলিমবাহিনীর উদ্দেশে বলছিলেন, 'আল্লাহর শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ; তোমরা যা দেখেছ এ ছাড়া তাদের কাছে এখন ধৈর্য আর শক্তি বলতে কিছুই নেই। আমার বিশ্বাস, ওদের গর্দানগুলোও আল্লাহ তোমাদের কবজায় দিয়ে দেবেন।'
এরপর তিনি অশ্বারোহীদের সঙ্গে নিয়ে রোমানদের ১ লাখ বাহিনীর মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। আক্রমণের ক্ষিপ্রতায় শত্রুবাহিনী ছত্রখান হয়ে যায়। মুসলিমরা সম্মিলিত হামলা চালালে তারা একেবারে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। এরপর তাঁরা ওদের পিছু ধাওয়া শুরু করেন। ৪২৯ মুসলিমবাহিনীর ডান বাহু পলায়নপর রোমানদের পালানোর পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। তারা তখন ইয়ারমুক উপত্যকা ও জারকা নদীর মধ্যবর্তী স্থানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এরপরও যুদ্ধ তুমুল গতিতেই চলছিল। মুসলিমরা ইমানের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে চলছিলেন। কঠিন হামলা চালিয়ে রোমানদের অশ্বারোহী বাহিনীকে পদাতিকদের পাশ থেকে সরিয়ে দিতে সফল হন। এরপর তাদের ওপর হামলে পড়েন। ধাওয়া করে ক্লান্ত করে তোলেন।
রোমান অশ্বারোহীরা তখন পালানোর পথ খুঁজছিল। খালিদ রা. আমর ইবনুল আসকে নির্দেশ দেন, 'ওদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন।' তিনি তা-ই করেন। সুযোগ পেতেই রোমানবাহিনীর ডানায় যেন পালক গজিয়ে ওঠে। তারা দ্রুত পালিয়ে যায়। তাদের পদাতিক বাহিনী তখন অশ্বারোহী বাহিনীর সাহায্য-বঞ্চিত হয়ে পড়ে। এদের শেকলবন্দি করে পরিখার দিকে নিয়ে আসা হয়। তাদের অবস্থা ছিল বিধ্বস্ত দেয়ালের মতো। রাতের আঁধারে টেনে-হিঁচড়ে পরিখার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এতে তারা উপত্যকায় মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছিল। তাদের একজনকে হত্যা করার সঙ্গে সঙ্গে শেকলে বাঁধা সবাই পড়ে যেত। এ পর্যায়ে মুসলিমরা তাদের বড় একটা দলকে হত্যা করতে সক্ষম হন। নিহতদের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২০ হাজারের মতো। তবে তাদের কিছুসংখ্যক ফাহাল ও দামেশকের দিকে পালিয়ে যায়।৪৩০
পরাজিতদের মোকাবিলায় ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে যান। তিনি অত্যন্ত জোরদার আক্রমণ পরিচালনা করেন। তাঁর পিতা তখন তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি ইয়াজিদকে ডেকে বলেন, 'আমার কলিজার টুকরো, খোদাভীতি ও ধৈর্য অবলম্বন করো। আজ এই উপত্যকায় উপস্থিত সকল মুসলিমের ওপর যুদ্ধ জরুরি। মুসলিমবাহিনীর নেতৃত্বে তোমার মতো যাঁরা আছে, তাঁদের ওপর তো অগ্রাধিকারভিত্তিতে জরুরি হবে। প্রিয় ছেলে, আল্লাহকে ভয় করো। তোমার সঙ্গীদের কেউ যেন আল্লাহর শত্রুদের মোকাবিলায় ধৈর্য ও দৃঢ়তায় তোমাকে ছাড়িয়ে না যায়।' ইয়াজিদ জবাবে বলেন, 'জি আব্বা, ইনশাআল্লাহ তা-ই হবে।' এরপর তিনি অবিচলভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যান। এ সময় ইয়াজিদ ছিলেন মুসলিমবাহিনীর মধ্যসারির দিকে। ৪৩১
সায়িদ ইবনুল মুসাইয়িব রা. তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন; 'ইয়ারমুকের দিন নীরবতা ছেয়ে গিয়েছিল। আমরা হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনতে পাই। আওয়াজটা পুরো শিবির থেকেই শোনা যাচ্ছিল। সেটা ছিল- 'আল্লাহর সাহায্য, নিকটে এসে যাও। হে মুসলিমরা, অনড় হয়ে যাও।' আমরা চেয়ে দেখি, সেই আওয়াজদাতা ছিলেন আবু সুফিয়ান রা.। তিনি তাঁর পুত্র ইয়াজিদের পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছিলেন। মুসলিমরা মাগরিব ও ইশার সালাত পিছিয়ে দেন। একপর্যায়ে বিজয় হাতের মুঠোয় আসে। খালিদ রা. রোমান সেনাপতি হিরাক্লিয়াসের ভাই থিয়োডরের তাঁবুতে রাতযাপন করেন। সে পলায়নকারীদের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। অশ্বারোহীরা খালিদের তাঁবুর আশেপাশে টহল দিচ্ছিল। রোমানদের যারাই ওদিকে আসত, তাদের হত্যা করে ফেলা হতো। সকাল পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। থিয়োডরকেও একসময় হত্যা করা হয়। সেদিন তার তাঁবুতে ছিল ৩০টা শামিয়ানা, ৩০টা রেশমের সূর্যরশ্মি প্রতিরোধক। এ ছাড়া ছিল প্রচুর কার্পেট, রেশমের জামাকাপড় ও পর্দা। সেখানে যেসব সম্পদ ছিল, সকাল হলে মুসলিমরা তা গনিমত হিসেবে নিয়ে নেন।৪৩২
৭. যুদ্ধের ফল
এ যুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার মুসলিমযোদ্ধা শহিদ হন। তাঁদের মধ্যে ইকরিমা ইবনু আবি জাহল, তাঁর পুত্র আমর, সালমা ইবনু হিশাম, আমর ইবনু সায়িদ, আবান ইবনু সায়িদসহ রাসুলের সাহাবি, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গও অন্তর্ভুক্ত। অপরদিকে রোমানদের নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার। এদের মধ্যে ৮০ হাজার ছিল শেকলবদ্ধ আর বাকিরা ছিল শেকলবিহীন।৪৩৩
এই বিশাল বিজয় মুসলিমদের আনন্দিত করে তুললেও খলিফা আবু বকরের মৃত্যুসংবাদ সে আনন্দ মাটি করে দেয়। তাঁর ইনতিকালে তাঁরা চিন্তিত হয়ে পড়েন।
আট. আবু বকরের ইনতিকাল, উমরের খিলাফতগ্রহণ ও খালিদের অপসারণ
১. উমরকে খলিফা নির্ধারণ ও আবু বকরের ইনতিকাল
১৩ হিজরির জুমাদাস সানি মাসে খলিফাতুর রাসুল আবু বকর রা. অসুস্থ হন এবং এ অসুস্থতা নিয়েই ২২ জুমাদাল উখরা সোমবার দিবাগত রাতে ইনতিকাল করেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা যখন ক্রমেই অবনতি হচ্ছিল, তখন একসময় তিনি বুঝে নেন, তাঁর বেলা ফুরিয়ে এসেছে। ফলে শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদের সঙ্গে আলোচনা করে খিলাফতের গুরুভার উমর রা.-এর হাতে অর্পণ করেন। রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চলাকালে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে খলিফা আবু বকরের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছেছিল; কিন্তু তিনি সংবাদটা তখনই মুসলিমদের না জানিয়ে চেপে রাখেন, যাতে মুসলিমবাহিনী মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে না পড়ে। বিজয় পূর্ণতায় পৌঁছার পরই সংবাদটা তাঁদের সামনে প্রকাশ করেন।
২. খলিফা উমর কর্তৃক খালিদকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি
এদিকে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. খলিফা হওয়ার পরপরই শামে খালিদের পরিবর্তে আবু উবায়দাকে সেনাপতি নিয়োগের ফরমান পাঠান। খালিদ আমিরুল মুমিনিনের এই ফরমানকে সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করেন। এরপর খলিফাতুর রাসুলের ইনতিকালে মুসলিমদের পক্ষ থেকে শোকপ্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আবু বকরকে মৃত্যু দান করেছেন। তিনি ছিলেন আমার কাছে উমরের চেয়ে প্রিয়। সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি উমর রা.-কে খলিফা বানিয়েছেন। তিনি আবু বকরের চেয়ে আমার কাছে ছিলেন অপ্রিয়; অথচ আল্লাহ আমার ওপর তাঁকে পছন্দ করা জরুরি করে দিয়েছেন।'৪৩৪ এরপর খলিফা উমরের নির্দেশমতো আবু উবায়দা রা. সেনাবাহিনীর নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন।
উমর রা. খিলাফতের দায়িত্ব হাতে নেওয়ার পর আবু বকরের শাসনামলে নিযুক্ত অনেক প্রাদেশিক গভর্নর, কর্মকর্তা ও সেনাপতিকে অপসারণ করে নতুন দায়িত্বশীল নিয়োগ দেন। এটা খলিফা উমরের ইজতিহাদি বিষয় ছিল। এ হিসেবে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকেও তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিলে সঙ্গে সঙ্গেই খালিদ রা. তা মেনে নেন।
৩. কা'কা ইবনু আমরের কবিতা
ইয়ারমুকের যুদ্ধ প্রসঙ্গে আরবের কবিদের মধ্যে কা'কা ইবনু আমরের কবিতাগুলো হচ্ছে,
দেখোনি কি ইয়ারমুকে আমরা তেমন বিজয়ই লাভ করেছি
যেমন বিজয় লাভ করেছি ইতিপূর্বে ইরাকে।
কুমার ঘোড়ায় চড়ে মাদায়েন ও মারজ আস-সাফারের
স্বাধীন এলাকাগুলো করেছি জয়।
সেই বসরাও জয় করেছিলাম, কা-কা-কারীদের কাছে
যে শহরের আঙিনায় পা রাখা ছিল নিষিদ্ধ।
যারাই সামনে আসছিল তাদের হত্যা করছিলাম
ধারালো তরবারির মাধ্যমে গনিমত কুড়িয়ে নিচ্ছিলাম।
আমরা ইয়ারমুকে রোমানদের হত্যা করেছিলাম।
তারা আমাদের দুর্বলদের সমকক্ষতাও প্রদর্শন করতে পারেনি।
আমরা ধারালো তরবারির মাধ্যমে ওয়াকুসা প্রান্তরে
ওদের বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে দিয়েছিলাম।
সেই ভোরে যখন ভিড় জমেছিল,
তখন তারা এমন জিনিস আস্বাদন করে,
যা ছিল ভীষণ তিক্ত।
৪. রোমানদের পরাজয়
যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে সম্রাট হিরাক্লিয়াস মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বেঁচে যাওয়া তার ভগ্নমনোরথ সেনারা ইনতাকিয়ায় (এন্টিয়ক) গিয়ে পৌঁছলে সে তাদের বলে ওঠে,
-তোমরা ধ্বংস হও! বলো দেখি, তোমরা যাদের মোকাবিলায় লড়ছিলে, তারা কি তোমাদের মতোই মানুষ ছিল না?
-জি, অবশ্যই ছিল।
-সংখ্যায় তোমরা বেশি ছিলে নাকি তারা?
-প্রতিটা জায়গায়ই আমরা তাদের কয়েকগুণ বেশি ছিলাম।
-তারপরও তোমরা পরাজিত হলে কেন?
তখন তাদের এক প্রবীণ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলতে থাকে, 'তারা বিজয়ী হয়েছে; কারণ তারা দিনে থাকে রোজাদার আর রাতে থাকে আল্লাহর দরবারে দণ্ডায়মান। তারা অঙ্গীকার পূরণ করে। কল্যাণের দাওয়াত দেয় এবং অকল্যাণ ও অসত্য থেকে বিরত রাখে। একে অন্যের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করে। আর আমাদের পরাজয়ের কারণ হচ্ছে— আমরা মদপান করি, ব্যভিচার করি, বিভিন্ন হারাম কাজে লিপ্ত হই। ওয়াদা ভঙ্গ করি। অত্যাচার-অনাচার করি। অন্যায় কাজের নির্দেশ প্রদান করি। আল্লাহ যেসব কাজে অসন্তুষ্ট হন, মানুষকে তা থেকে বিরত রাখি না। জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করি।' হিরাক্লিয়াস তখন বলে ওঠে, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি সঠিক বলেছ।'
টিকাঃ
৪১০. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৩।
৪১১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৮।
৪১২. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৪।
৪১৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৮।
৪১৪. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৪।
৪১৫. তারিখু দিমাশক: ২/১২৫।
৪১৬. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৬৩।
৪১৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১০।
*১৮. খালিদের ঘোড়া। শামের কঠিন মরুভূমি পাড়ি দিতে গিয়ে তাঁর প্রিয় ঘোড়া আশকারের খুর জখম হয়ে গিয়েছিল।
৪১৯. আবু বাকরিন রাজুলুদ দাওলাহ: ৮৮।
৪২০. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৬৩।
৪২১. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৬।
৪২২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১০।
৪২৩. প্রাগুক্ত: ৭/১৩।
৪২৪. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৯।
৪২৫. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ২২২; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১৯।
৪২৬. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৭০।
৪২৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১২।
৪২৮. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৭৪।
৪২৯. তারতিব ওয়া তাহজিব আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৭১- ফুতুহুল বুলদান, আজদি: ১৭১।
৪৩০. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া ওয়াদ দিফাইয়াহ ইনদাল মুসলিমিন: ১৭৫।
৪৩১. ফুতুহুল বুলদান, আজদি: ২২৮।
৪৩২. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৭৩।
৪৩৩. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৭৯।
৪৩৪. তারিখু দিমাশক: ২/১২৬।
আজনাদায়ন প্রান্তরে রোমানরা লজ্জাজনক পরাজয়ের শিকার হয়। মুসলিমরা বিশাল বিজয় অর্জনের পর তাদের সেনাদল নিয়ে ফিরে আসেন। তারা অনেকটা প্রশান্ত চিত্তে খলিফার নির্দেশমতো ইয়ারমুক প্রান্তরে কাজে লেগে যান। এদিকে রোমানবাহিনী তাদের জেনারেল থিয়োডরের নেতৃত্বে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারাও একটা বিশাল প্রশস্ত মাঠে এসে শিবির স্থাপন করে, যেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা ছিল সংকীর্ণ। তারা ইয়ারমুকের একেবারে পাশে ওয়াকুসা নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেছিল।
১. উভয় বাহিনীর সেনাসংখ্যা
• মুসলিমবাহিনী : খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বাধীন মুসলিমবাহিনীর সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার। কোনো কোনো বর্ণনামতে তাঁদের সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার。
• রোমানবাহিনী : থিয়োডরের নেতৃত্বে রোমানবাহিনীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার।
২. যুদ্ধের আগে
মুসলিমরা খালিদের নেতৃত্বে ইয়ারমুক পৌঁছে সেখানে শিবির স্থাপন করেন; আর রোমানরা নদীর দক্ষিণ তীরে তাদের সেনাসমাবেশ ঘটায়। এই অবস্থায় আমর ইবনুল আস মুসলিমবাহিনীকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘মুসলিমরা, সুসংবাদ নাও। আল্লাহর শপথ, রোমানরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে; আর অবরুদ্ধরা খুব কম ক্ষেত্রেই বিজয় অর্জন করতে পারে।’৪১০ খালিদ রা. এই যুদ্ধে সম্পূর্ণ নতুন কৌশলে সেনাব্যূহ রচনা করেন, যা ইতিপূর্বে আরবদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত।৪১১
• ফিরকা (ছোট বাহিনী) : এটা ১০ থেকে ২০ কুরদুস পর্যন্ত হয়ে থাকত। এর একজন আলাদা অধিনায়ক থাকতেন।
• কুরদুস : ১ হাজার সেনার একটা ইউনিট, যার একজন পৃথক নেতা থাকত।৪১২
খালিদ রা. এই প্রক্রিয়ায় বাহিনীকে ৪০ সারিতে বিন্যস্ত করেন।
• কালব (মধ্যবাহিনী) : এটা ছিল ১৮ কুরদুসের সমন্বয়ে ঘটিত। এর নেতৃত্ব ছিল আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের হাতে। তাঁর সহযোগিতায় ছিলেন ইকরিমা ইবনু আবি জাহল ও কা'কা ইবনু আমর রা.।
• মায়মানা (ডান বাহু) : এটা ছিল ১০ কুরদুসের সমন্বয়ে ঘটিত। এর নেতৃত্বভার ছিল আমর ইবনুল আসের কাঁধে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন শুরাহবিল ইবনু হাসানা রা.।
• মায়সারা (বাম বাহু) : এটাও ছিল ১০ কুরদুস বিশিষ্ট। এর নেতৃত্বে ছিলেন ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান রা.।
• তালিয়া (অগ্রবর্তী বাহিনী): এরা ছিল অশ্বারোহীদের দ্বারা গঠিত নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী। এদের দায়িত্ব ছিল মুসলিমবাহিনীর দেখাশোনা ও শত্রুবাহিনীর ওপর কড়া দৃষ্টি রাখা। তাই এদের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম。
• সাকা (পশ্চাদ্দ্বাহিনী) : এই বাহিনী ছিল ৫ কুরদুস তথা ৫ হাজার যোদ্ধার সমন্বয়ে ঘটিত। এর নেতৃত্বে ছিলেন সায়িদ ইবনু জায়েদ রা.। এই বাহিনীর দায়িত্ব ছিল সাধারণত প্রশাসনিক দিকগুলোর ওপর নজর রাখা। এর কাজি ছিলেন আবুদ দারদা রা.; আর খাবার-পানি, গনিমত একত্রিত করাসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা.। মিকদাদ ইবনু আসওয়াদ রা. ছিলেন কারির ভূমিকায়। তিনি সেনাবাহিনীর সামনে জিহাদ-সংক্রান্ত আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতেন, যাতে মুজাহিদদের মধ্যে আধ্যাত্মিক শক্তির স্ফুরণ ঘটে। সেনাবাহিনীর বক্তা হিসেবে নিযুক্ত হন আবু সুফিয়ান ইবনু হারব রা.। তিনি প্রত্যেক সারিতে গিয়ে সেনাবাহিনীকে উদ্দীপ্ত করতেন। ৪১৩ আর সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. বড় বড় সাহাবিকে নিয়ে সেনাবাহিনীর ঠিক মধ্যখানে অবস্থান করছিলেন।
মুসলিমবাহিনী খালিদের নেতৃত্বে তাঁদের প্রস্তুতি সেরে নিয়েছিল। প্রত্যেক নেতা নিজ নিজ সেনাদলের সামনে উপস্থিত হয়ে জিহাদের ব্যাপারে তাদের উৎসাহিত করতে থাকেন। মুসলিমবাহিনীর নেতারা জানতেন, এই যুদ্ধ এক বিশাল প্রতিফল বহন করতে যাচ্ছে। এটা হবে ইতিহাসের মোড় নির্ধারণী এক যুদ্ধ। রোমানবাহিনীও মনে করছিল, 'এই যুদ্ধের পরাজয় হবে পুরো শাম অঞ্চলের পরাজয়। যদি আমরা যুদ্ধে হেরে যাই, তাহলে শামের সব দরজা মুসলিমদের জন্য খুলে যাবে। তাদের সামনে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তখন তাদের জন্য এশিয়া-ইউরোপ বিজয় একেবারে সহজ হয়ে যাবে।'৪১৪
৩. ইমানি প্রস্তুতি
ইমান ও কুফরের বাহিনী যখন পরস্পর মুখোমুখি হয়, তখন একে অন্যকে দ্বৈরথের আহ্বান জানায়। এমতাবস্থায় আবু উবায়দা রা. মুসলিমদের উপদেশ দিয়ে বলছিলেন, 'আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহর দীনের সাহায্য করো। আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন। মুসলিমরা, ধৈর্যসহকারে কাজ করো। ধৈর্য হচ্ছে কুফর থেকে মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। লজ্জা পরাজয় ও বিনাশের কারণ। নিজেদের সারি থেকে পিছু হটবে না। আগে বেড়ে শত্রুর ওপর হামলা করবে না। বর্শাগুলো সঠিক আঙ্গিকে ধরে রেখে ঢাল দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে। নীরবতা অবলম্বন করবে। মনে মনে আল্লাহর জিকির করতে থাকবে। আমি নির্দেশ দেওয়ার পরই তোমরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে।'
এরপর সাহাবি মুআজ ইবনু জাবাল রা. লোকজনকে উপদেশস্বরূপ বলেন, 'কুরআনধারী মুসলিমরা, আল্লাহর কিতাবের হিফাজতকারীরা, হিদায়াতের সাহায্যকারীরা, হকের পতাকাবাহীরা, আল্লাহর রহমত ও জান্নাত কেবল আশা-আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হয় না, আল্লাহ তাঁর সুমহান রহমত ও সাহায্য কেবল সত্যবাদীদেরই দান করে থাকেন। তোমরা কি আল্লাহর ঘোষণা শোনোনি-"তোমাদের যারা ইমান আনে এবং সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন; তিনি অবশ্যই তাদের প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেভাবে প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদের।” [সুরা নূর: ৫৫]
আল্লাহ তোমাদের ওপর রহম করুন। তোমাদের তিনি পলায়নকারী হিসেবে দেখছেন, এ থেকে লজ্জা অনুভব করো। তিনি ছাড়া তোমাদের সম্মান ও বিজয়দানকারী কেউ নেই।'
সাহাবি আমর ইবনুল আস রা. বলছিলেন, 'মুসলিমরা, দৃষ্টি অবনত রাখবে। হাঁটু গেড়ে বসে থাকবে। বর্শাগুলো সোজা রাখবে। শত্রুরা যখন হামলা চালাবে, তাদের একটু ছাড় দেবে, যতক্ষণ-না তারা তোমাদের বর্শার পাল্লায় এসে পৌঁছায়। এরপর বাঘের মতো তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। শপথ সেই সত্তার, যিনি সত্যকে ভালোবাসেন, যিনি প্রতিদান দেন, যিনি মিথ্যাকে অপছন্দ করেন এবং মিথ্যার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছেন, যিনি ভালোর প্রতিদান ভালো দিয়েই করেন। আমি শুনেছি, মুসলিমরা অচিরেই একের পর এক বস্তি, একের পর এক মহল্লা জয় করবে। অতএব, ওদের সেনাধিক্য দেখে ভয় করেবে না। তোমরা যদি দৃঢ়পদে যুদ্ধ করো, তাহলে ওরা পাখির মতো উড়ে যাবে।'
সাহাবি আবু সুফিয়ান রা. বলছিলেন, 'মুসলিমরা, এ মুহূর্তে তোমরা পরিবার-পরিজন এবং আমিরুল মুমিনিনের পক্ষ থেকে পাঠানো সাহায্যবাহিনী থেকে দূরে অবস্থান করছ। আল্লাহর শপথ, তোমরা এমন এক বাহিনীর মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে আছ, যাদের সংখ্যা তোমাদের থেকে অনেক বেশি। যারা অত্যন্ত কঠিন প্রতিপক্ষ। তারা আছে নিজেদের সন্তানাদি এবং মালসামানার পাশে, নিজেদের দেশে। আল্লাহ তোমাদের তখনই সাহায্য করবেন, যখন তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট হবেন। যখন তোমরা কঠিন অবস্থায় ধৈর্যধারণ করবে, নিজেদের তরবারি দ্বারা নিজেদের হিফাজত করবে, একে অন্যকে সাহায্য করবে- এটাই তোমাদের জন্য মুক্তির মাধ্যম হতে পারে।'
এরপর তিনি মহিলাদের কাছে যান। তাদেরও যথাযথ উপদেশ দিয়ে বলেন, ৪১৫ 'মুসলিমরা, সেই জিনিস এসে গেছে, যা তোমরা প্রত্যক্ষ করছ। শোনো, এই তো তোমাদের সামনে নবিজি ও জান্নাত। তোমাদের সামনে রয়েছে শয়তান ও জাহান্নাম।' এরপর তিনি নিজের জায়গায় ফিরে যান। ৪১৬
সেই মুহূর্তে আবু হুরায়রা রা. লোকজনকে উপদেশস্বরূপ বলছিলেন, 'হে লোকজন, আয়াতলোচনা হুর ও জান্নাতের দিকে এগিয়ে চলো। তোমরা আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছ, সেই জায়গাই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান। সাবধান, ধৈর্যধারণকারীদের জন্যই রয়েছে সবচেয়ে উঁচু অবস্থান।'
ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান প্রতিটা কুরদুসে গিয়ে বলতেন, 'আল্লাহ, আল্লাহ, তোমরা আরবদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধকারী এবং ইসলামের সহায়তাকারী। তোমাদের শত্রুরা রোমের নিরাপত্তারক্ষী এবং শিরকের সাহায্যকারী। হে আল্লাহ, এটা তোমার দীন। আল্লাহ, তোমার বান্দাদের ওপর সাহায্য অবতরণ করো। ১৪১৭
আরবের এক খ্রিষ্টান খালিদ রা.-কে লক্ষ করে বলে, 'রোমানরা সংখ্যায় কতই-না বেশি এবং মুসলিমরা কতই-না কম!' উত্তরে খালিদ বলেন, 'তোমার ধ্বংস হোক, তুমি কি আমাকে রোমানদের সংখ্যাধিক্যের ভয় দেখাচ্ছ? আমাদের কাছে জনসংখ্যার কোনো মূল্য নেই। মূল লক্ষ্য তো হলো শত্রুকে পরাজয় ও লজ্জা উপহার দেওয়া এবং আল্লাহর বিজয় ও সাহায্য অর্জন করা। আল্লাহর শপথ, আমার তো মন চাইছে, আজ যদি আমার আশকার *১৮ সুস্থ থাকত আর শত্রুবাহিনী দ্বিগুণের চেয়ে বেশি হতো।'
মুআজ ইবনু জাবাল পাদরি ও যাজকদের আওয়াজ শুনলে বলে ওঠেন, 'আল্লাহ, শত্রুর পা টলিয়ে দিন। তাদের অন্তরগুলো সন্ত্রস্ত করে দিন। আমাদের ওপর প্রশান্তি বর্ষণ করুন। তাওহিদের ওপর আমাদের স্থির রাখুন। জিহাদ প্রিয়তম বৃত্তি বানিয়ে দিন এবং আপনার সিদ্ধান্তে আমাদের সন্তুষ্ট করে তুলুন। '৪১৯
সাত. রোম
রোমানরা তাদের অহংকার ও দৌরাত্ম্য নিয়ে কালো বাদলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে মাঠের ওপর ছেয়ে যায় এবং ভীষণ চ্যাঁচামেচি শুরু করে। পাদরি ও যাজকরা ইনজিল পাঠ করে তাদের সেনাদের উদ্দীপ্ত করে তুলছিল। ৪২০ তারা ইয়ারমুকের পাশে ওয়াকুসা নামক স্থানে জমায়েত হয়; কিন্তু উপত্যকাটা তাদের জন্য পরিখা হয়ে ওঠে。
রোমানরাও কুশলী সেনাবিন্যাস করে। তারা দুটি লাইনে সেনাবিন্যাস করে প্রতি পাঁচজনকে বৃত্তাকারে রাখে। মধ্যখানে ছিল যথেষ্ট ফাঁকা। দ্বিতীয় সারি ছিল প্রথম সারি থেকে পেছনের দিকে। এ ছাড়া যুদ্ধে তারা যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করে :
১. তিরন্দাজদের সম্মুখভাগে রেখেছিল। তাদের দায়িত্ব ছিল তির ছুড়ে যুদ্ধের সূচনা করেই ডান, বাম ও পেছনে চলে যাওয়া।
২. ডান ও বাম বাহুতে ছিল অশ্বারোহী বাহিনী। এদের দায়িত্ব ছিল তিরন্দাজরা পেছনে সরে যাওয়া পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা ও সহায়তা প্রদান।
৩. কুরদুস, (পদাতিক) এদের দায়িত্ব ছিল আক্রমণ জোরদার করে তোলা।
৪. সম্মুখসারিতে ছিল জেনারেল জারজাহ; আর ডান বাহুর সেনাপতি ছিল দারকিস। ৪২১
১. যুদ্ধপূর্ব সংলাপ
উভয় বাহিনী একে অন্যের পাশে পৌঁছে গেলে মুসলিমবাহিনী থেকে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ ও ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান রোমানদের দিকে এগিয়ে যান। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন জিরার ইবনুল আজওয়ার ও হারিস ইবনু হিশাম। তাঁরা বলছিলেন, 'আমরা তোমাদের নেতার সঙ্গে কথা বলতে চাই।' থিয়োডরের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাতের অনুমতি প্রদান করা হয়। সে তখন একটা রেশমি তাঁবুতে বসা ছিল। সাহাবিরা বলেন, 'আমরা এমন তাঁবুতে বসা বৈধ মনে করি না।' সে রেশমের গালিচা বিছিয়ে দেয়। তাঁরা তাতে বসতে অস্বীকার করে নিজেদের পছন্দমতো জায়গা দেখে বসে পড়েন। সন্ধি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়; কিন্তু সে আলোচনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ফলে তাঁরা আল্লাহর দীনের দিকে তাদের আহ্বান জানিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন।'
ওয়ালিদ ইবনু মুসলিম বর্ণনা করেন; বাহান খালিদের কাছে প্রস্তাব দেয়— 'এসো, আমরা উভয় বাহিনীর মধ্যখানে বসে সন্ধি নিয়ে আলোচনা করি।' খালিদ বেরিয়ে এলে বাহান তাঁকে বলে, 'জানি, নানাবিধ কষ্ট ও ক্ষুধা দেশ থেকে তোমাদের বেরিয়ে পড়তে বাধ্য করেছে! এসো, আমরা তোমাদের প্রত্যেকের হাতে ১০টা করে দিনার, পোশাক ও খাদ্যদ্রব্য ধরিয়ে দিই; আর তোমরা নিজের দেশে চলে যাও! চাইলে পরবর্তী বছরও তোমাদের এই পরিমাণ সাহায্য পাঠিয়ে দেওয়া হবে।' খালিদ বলেন, 'তুমি যা ভাবছ, ব্যাপার আসলে তা নয়। এখানে আসার কারণ হচ্ছে, আমরা মূলত রক্তপিপাসু জাতি। জানতে পেরেছি, রোমানদের রক্ত নাকি খুব সুস্বাদু। এ জন্যই আমরা এখানে ছুটে এসেছি।' খালিদের জবাব শুনে বাহানের সঙ্গীরা বলে ওঠে, 'আরবদের ব্যাপারে আমরা এমনটাই শুনে এসেছি।'
২. যুদ্ধের সূচনা
যুদ্ধপ্রস্তুতি সম্পন্নের পর খালিদ রা. মধ্যসারির উভয় বাহুতে নিযুক্ত ইকরিমা ও কা'কার দিকে এগিয়ে এসে তাঁদের আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দেন। তাঁরা উভয়ে তখন রণসংগীত গেয়ে গেয়ে এগোচ্ছিলেন। মধ্যমাঠে পৌঁছেই তাঁরা দ্বৈতযুদ্ধের আহ্বান জানান। রোমান বাহাদুররা বেরিয়ে আসে। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। খালিদ রা. তাঁর কুরদুস (১ হাজার সেনার বাহিনী) নিয়ে সেনাসারির মধ্যভাগে চলে আসেন। মুজাহিদরা তাঁর সামনে অবস্থান নিয়ে শত্রুর ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিলেন; আর তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যথাযথ নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। ৪২২
৩. রণাঙ্গনে রোমান সেনাপতি জারজাহর ইসলামগ্রহণ
রোমানবাহিনীর বড় সেনাপতি জারজাহ বেরিয়ে এসে খালিদকে ডাক দেয়। তিনি তার পাশেই চলে যান। এতটাই কাছে যান, উভয়ের ঘোড়ার ঘাড় পরস্পর মিলে যায়। জারজাহ তাঁকে বলে, 'খালিদ, আমি আপনাকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করব, আপনি কি আমাকে সঠিক তথ্য দেবেন? দয়া করে মিথ্যা বলবেন না, মিথ্যা বলা একজন স্বাধীন মানুষের জন্য লজ্জার বিষয়। এ ছাড়া আমাকে ধোঁকায়ও ফেলবেন না। অভিজাত ব্যক্তিরা আল্লাহর দিকে নত লোকদের ধোঁকা দিতে পারে না। আল্লাহ কি আপনাদের নবির কাছে আসমান থেকে কোনো তরবারি পাঠিয়েছেন, যা তিনি আপনাকে দান করে গেছেন? যার ফলে আপনি কখনোই পরাজিত হন না?'
-না।
-তাহলে আপনার নাম 'সাইফুল্লাহ' কেন?
-আল্লাহ আমাদের কাছে তাঁর নবিকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি দীনের পথে আমাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন আমাদের কিছুসংখ্যক মানুষ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর অনুসরণ করে; আর কিছুসংখ্যক সাড়া না দিয়ে তাঁকে মিথ্যা প্রতিপাদন করে। এরপর আল্লাহ আমাদের হিদায়াত দেন। আমরা তাঁর হাতে বায়আত হই। আল্লাহর ৪২২ নবি আমাকে লক্ষ করে বলেন, 'তুমি আল্লাহর তরবারিসমূহের একটি, যা আল্লাহ মুশরিকদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।' তিনি আমার জন্য বিজয় ও সাহায্যের দুআ করে গেছেন। এ কারণে আমার নাম হয়ে গেছে 'সাইফুল্লাহ'। আমি মুসলিমদের মধ্যে মুশরিকদের ওপর সবচেয়ে কঠোর।
- আপনারা মানুষকে কীসের দিকে আহ্বান করেন?
- আমরা মানুষকে 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল,' এই সাক্ষ্য প্রদানের আহ্বান জানাই এবং আল্লাহর রাসুল যা কিছু নিয়ে এসেছেন, সেগুলো স্বীকার করার আহ্বান করে থাকি।
- যারা আপনাদের দাওয়াত গ্রহণ করে না, তাদের ব্যাপারে আপনাদের সিদ্ধান্ত কী?
- তারা জিজয়া প্রদান করবে, আমরা তাদের নিরাপত্তাভার নেব।
- যদি তারা জিজয়া দিতে রাজি না হয়?
- আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি।
- আজ যদি কেউ আপনাদের দীনে প্রবেশ করে, তার অবস্থান কী হবে?
- আল্লাহ আমাদের ওপর যা ফরজ করেছেন, সেসব ব্যাপারে তার অবস্থান হবে ঠিক আমাদের মতো। আমাদের এখানে উঁচু-নীচু, প্রথম ও শেষ এসবের কোনো ভেদাভেদ নেই।
-আজ যে আপনাদের দীনে প্রবেশ করবে, সে কি আপনাদের সমান প্রতিদান পাবে?
-হ্যাঁ; বরং বেশিই পাবে।
- আপনাদের সমান হবে কীভাবে? অথচ আপনারা এ ব্যাপারে কতই-না অগ্রগামী?
- আমরা এই দীন কবুল করেছি। নবির হাতে বায়আত হয়েছি। তিনি যতদিন আমাদের মধ্যে জীবিত ছিলেন, ততদিন তাঁর কাছে ঐশী-নির্দেশনা আসত। তিনি আমাদের সেই কিতাবের সংবাদ দিতেন, মুজিজা দেখাতেন, আমরা যারা তা দেখেছি, শুনেছি, আমাদের জন্য তাঁর আনুগত্য প্রদর্শন ও বায়আতগ্রহণ জরুরি ছিল। কিন্তু আমরা যা দেখেছি ও শুনেছি, তোমরা তো তা দেখোনি বা শোনোনি, তাই তোমাদের যারা নিষ্ঠ চিত্তে ইসলামগ্রহণ করবে, সে আমাদের থেকে উত্তমই পরিগণিত হবে।
-(জারজাহ চিৎকার দিয়ে বলে) আল্লাহর দোহাই, আপনি সত্য বলছেন! আমাকে প্রতারিত করছেন না তো?
-আল্লাহর শপথ, আমি সত্য কথা বলেছি। তুমি আমাকে যে বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছ, এর ওপর আল্লাহ সাক্ষী।
এ কথা শুনে জারজাহ তার ঢাল ঘুরিয়ে খালিদের সঙ্গী হয়ে যায়। এরপর সে আবেদন করে, 'আমাকে ইসলাম শিক্ষা দিন।' খালিদ তাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের তাঁবুতে চলে আসেন। তাকে গোসল করার নির্দেশ দেন। এরপর দুই রাকআত সালাত পড়ান। জারজাহ খালিদের সঙ্গে চলে আসতেই রোমানরা আক্রমণ তীব্র করে তোলে। ফলে প্রথমদিকে মুসলিমদের পা টলতে শুরু করে। ইকরিমা ইবনু আবি জাহল আর হারিস ইবনু হিশামের নেতৃত্বে শুধু প্রতিরক্ষাবাহিনী তাদের অবস্থানে অবিচল থাকে। ৪২৩
৪. মুসলিম ডান বাহুতে রোমান বাম বাহুর আক্রমণ
অন্ধকার রাতের মতোই রোমানবাহিনী মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে এগিয়ে আসছিল। তাদের বাম বাহু মুসলিমদের ডান বাহুর ওপর আক্রমণ করে বসে। ফলে মুসলিমবাহিনীর মধ্যসারি ডান বাহুর সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। রোমানবাহিনী মুসলিমদের বিক্ষিপ্ত করে দিয়ে একেবারে পেছনের সারি পর্যন্ত পৌঁছে যেতে সমর্থ হয়। এ দৃশ্য দেখে মুআজ ইবনু জাবাল মুসলিমদের উদ্দেশে চিৎকার দিয়ে বলতে থাকেন, 'আল্লাহর বান্দারা, এরা তোমাদের ওপর বিজয়ী হতে আক্রোশে ফেটে পড়ছে। আল্লাহর শপথ, তোমাদের ধৈর্য আর অবিচলতাই ওদের ফিরিয়ে দিতে পারে।' এরপর তিনি ঘোড়া থেকে নেমে বলেন, 'যে আমার ঘোড়া নিয়ে লড়তে ইচ্ছুক, সে ঘোড়াটা নিয়ে নিক!' তিনি নিজে পদাতিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। ৪২৪
আজদ, মাজহাজ, হাজারামাউত ও খাওলানের লোকজন বীরত্ব ও দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই করে শত্রুবাহিনীর অগ্রযাত্রা রুখে দিতে সক্ষম হয়। রোমানরা পাহাড়-উঁচু আক্রমণের ঢেউ তুলে মুসলিমবাহিনীর ডান বাহু ও মধ্যসারির দিকে চলে আসে। এমতাবস্থায় মুসলিমবাহিনীর একটা দল পৃথক হয়ে শিবিরের দিকে চলে যায়। তবে বড় একটা দল তাদের অবস্থানে অনড় থেকে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে। জুবায়দের লোকজন শুরুতে বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলেও পরে আবার জড়ো হয়ে যায়। তারা তখন দিক পালটে তীব্রগতিতে শত্রুর ওপর হামলে পড়ে ওদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। বিক্ষিপ্ত হওয়া মুসলিমদের পিছুধাওয়া থেকেও ওদের বিরত রাখতে সমর্থ হয়। যারা শিবিরের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিল, মুসলিম বীরাঙ্গনারা লাঠি ও পাথর হাতে তাদের স্বাগত জানাচ্ছিল। ফলে ওরা পুনরায় নিজেদের সারি বিন্যস্ত করে নেয়। ৪২৫ ইকরিমা ইবনু আবি জাহল বলেন, 'আমি আল্লাহর রাসুলের সঙ্গে অনেক যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আজ কি আমি পলায়ন করতে পারি?' এরপর তিনি ঘোষণা দেন, 'কে আছ মৃত্যুর বায়আতকারী?' তাঁর চাচা জিরার ইবনুল আজওয়ার ও হারিস ইবনু হিশাম তখন ৪০০ অশ্বারোহী নিয়ে তাঁর হাতে বায়আত হন। তাঁরা তখন খালিদের সামনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যান। একপর্যায়ে সবাই আহত হয়ে পড়েন। অনেকে শাহাদাতবরণ করেন। শহিদদের একজন ছিলেন জিরার ইবনুল আজওয়ার। ৪২৬
ওয়াকিদিসহ কতিপয় ইতিহাসবিদের বর্ণনায় রয়েছে, জিরার আহত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে গেলে তিনি পানি পান করতে চাচ্ছিলেন। যখন তাঁর কাছে পানি নিয়ে যাওয়া হয়, তখন দেখতে পান আরেক আহত ব্যক্তি পানির দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে আছে। তিনি পানিবাহককে বলেন, 'আগে ওকে পান করিয়ে এসো!' দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনিও অনুরূপ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে বলেন, আগে ওকে পান করিয়ে এসো!' তৃতীয় ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। শুধু তা-ই নয়, মুসলিম ভাইকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এ প্রবণতা থেকে তাঁরা সবাই পানির বদলে শাহাদাতের শরাবে চুমুক দেন। রাজিআল্লাহু আনহুম আজমাইন।
বলা হয়ে থাকে, সেদিন যিনি প্রথমে শাহাদাতবরণ করেন, তিনি ইতিপূর্বে আবু উবায়দার কাছে গিয়ে বলেছিলেন, 'আমি সব প্রস্তুতি সেরে নিয়েছি। রাসুলের সঙ্গে কি আপনার কোনো কাজ আছে?' জবাবে আমিনুল উম্মাহ বলেন, 'রাসুল ﷺ-কে আমার সালাম দেবে আর বলবে, আল্লাহর রাসুল, আমাদের প্রতিপালক আমাদের সঙ্গে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তা সত্য পেয়েছি।'
এরপর ওই মুজাহিদ যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকেন এবং একপর্যায়ে শাহাদাতের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। সকল মানুষ নিজেদের পতাকার নিচে অবস্থান করে দৃঢ়পায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। রোমানরা চাকার মতো চারদিকে ঘুরছিল। সেদিন ইয়ারমুকের রণাঙ্গনে কেবল কর্তিত মস্তক, বলবান বাহু আর কবজিগুলোই উড়তে দেখা যাচ্ছিল। ৪২৭
৫. রোমান ডান বাহুর মুসলিমদের বাম বাহুতে আক্রমণ
কানাতিরের নেতৃত্বে রোমানদের ডান বাহু মুসলিম বাম বাহুর ওপর হামলে পড়ে। মুসলিম বাম বাহুতে ছিল কিনানা, কায়েস, খুসআম, জুজাম, কুজাআ, আমিরা ও গাসসান গোত্রসমূহের লোকজন। তাঁদের বাধ্য হয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে যেতে হয়। রোমানরা তখন পিছিয়ে যাওয়া মুসলিমদের ওপর আছড়ে পড়ে ধাওয়া শুরু করে। ধাওয়া খেয়ে মুসলিমরা শিবিরের কাছাকাছি পৌঁছলে ওদিক থেকে মুসলিম বীরাঙ্গনারা লাঠি ও পাথর হাতে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। মহিলারা পাথর ছুড়ে বলছিলেন, 'ইসলাম, মা আর স্ত্রীদের ইজ্জত কোথায় চলে গেল? তোমরা কাফিরদের জন্য আমাদের রেখে কোন দিকে পালিয়ে যাচ্ছ?'
নারীরা যখন এভাবে তাঁদের পৌরুষ ধরে নাড়া দেন, তখন তাঁদের চেতনা ফিরে আসে। তাঁরা যারপরনাই লজ্জিত হয়ে পুনরায় রণাঙ্গনে গিয়ে দৃঢ়পায়ে লড়তে থাকেন। রোমানদের বিপুলসংখ্যক লোক নিহত হয়েছিল। একপর্যায়ে মুসলিমদের একাংশের সেনাপতি সায়েদ ইবনু জায়েদ শাহাদাতবরণ করেন। তখন রোমানদের বাম বাহু ফের মুসলিম ডান বাহুর ওপর আক্রমণে তৎপর হয়ে ওঠে। তারা আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ওপর হামলা করে তাঁদের প্রায় অবরুদ্ধ করে ফেলে; কিন্তু আমরের বাহিনী অত্যন্ত দৃঢ়পদে মোকাবিলা করতে থাকে। তারপরও রোমানরা মুসলিমবাহিনীর শিবিরে পৌঁছে যেতে সমর্থ হয়।
এ অবস্থা দেখে মুসলিম নারীরা পুনরায় পাহাড় থেকে নেমে এসে পাথর ছুড়তে থাকেন। তাঁরা পুরুষ-যোদ্ধাদের ভর্ৎসনা করে বলছিলেন, 'যদি তোমরা আমাদের নিরাপত্তা দিতে না পারো, তাহলে তোমরা আমাদের স্বামী নও।' এর ফলে মুসলিমরা নবপ্রেরণায় উদ্দীপিত হয়ে ওঠেন। পুনরায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। তাঁরা তখন রোমানদের ওপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন যে, শত্রুবাহিনী এখান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ৪২৮
৬. পালানোর পথ করে দেওয়া এবং পদাতিক বাহিনীকে ধ্বংস
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে রোমানদের সেই বাম বাহুর ওপর ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে বসেন, যারা মুসলিমবাহিনীর ডান বাহুকে মধ্যভাগের দিকে ঠেলে নিয়ে আসছিল। তিনি তখন মুসলিমবাহিনীর উদ্দেশে বলছিলেন, 'আল্লাহর শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ; তোমরা যা দেখেছ এ ছাড়া তাদের কাছে এখন ধৈর্য আর শক্তি বলতে কিছুই নেই। আমার বিশ্বাস, ওদের গর্দানগুলোও আল্লাহ তোমাদের কবজায় দিয়ে দেবেন।'
এরপর তিনি অশ্বারোহীদের সঙ্গে নিয়ে রোমানদের ১ লাখ বাহিনীর মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। আক্রমণের ক্ষিপ্রতায় শত্রুবাহিনী ছত্রখান হয়ে যায়। মুসলিমরা সম্মিলিত হামলা চালালে তারা একেবারে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। এরপর তাঁরা ওদের পিছু ধাওয়া শুরু করেন। ৪২৯ মুসলিমবাহিনীর ডান বাহু পলায়নপর রোমানদের পালানোর পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। তারা তখন ইয়ারমুক উপত্যকা ও জারকা নদীর মধ্যবর্তী স্থানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এরপরও যুদ্ধ তুমুল গতিতেই চলছিল। মুসলিমরা ইমানের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে চলছিলেন। কঠিন হামলা চালিয়ে রোমানদের অশ্বারোহী বাহিনীকে পদাতিকদের পাশ থেকে সরিয়ে দিতে সফল হন। এরপর তাদের ওপর হামলে পড়েন। ধাওয়া করে ক্লান্ত করে তোলেন।
রোমান অশ্বারোহীরা তখন পালানোর পথ খুঁজছিল। খালিদ রা. আমর ইবনুল আসকে নির্দেশ দেন, 'ওদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন।' তিনি তা-ই করেন। সুযোগ পেতেই রোমানবাহিনীর ডানায় যেন পালক গজিয়ে ওঠে। তারা দ্রুত পালিয়ে যায়। তাদের পদাতিক বাহিনী তখন অশ্বারোহী বাহিনীর সাহায্য-বঞ্চিত হয়ে পড়ে। এদের শেকলবন্দি করে পরিখার দিকে নিয়ে আসা হয়। তাদের অবস্থা ছিল বিধ্বস্ত দেয়ালের মতো। রাতের আঁধারে টেনে-হিঁচড়ে পরিখার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এতে তারা উপত্যকায় মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছিল। তাদের একজনকে হত্যা করার সঙ্গে সঙ্গে শেকলে বাঁধা সবাই পড়ে যেত। এ পর্যায়ে মুসলিমরা তাদের বড় একটা দলকে হত্যা করতে সক্ষম হন। নিহতদের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২০ হাজারের মতো। তবে তাদের কিছুসংখ্যক ফাহাল ও দামেশকের দিকে পালিয়ে যায়।৪৩০
পরাজিতদের মোকাবিলায় ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে যান। তিনি অত্যন্ত জোরদার আক্রমণ পরিচালনা করেন। তাঁর পিতা তখন তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি ইয়াজিদকে ডেকে বলেন, 'আমার কলিজার টুকরো, খোদাভীতি ও ধৈর্য অবলম্বন করো। আজ এই উপত্যকায় উপস্থিত সকল মুসলিমের ওপর যুদ্ধ জরুরি। মুসলিমবাহিনীর নেতৃত্বে তোমার মতো যাঁরা আছে, তাঁদের ওপর তো অগ্রাধিকারভিত্তিতে জরুরি হবে। প্রিয় ছেলে, আল্লাহকে ভয় করো। তোমার সঙ্গীদের কেউ যেন আল্লাহর শত্রুদের মোকাবিলায় ধৈর্য ও দৃঢ়তায় তোমাকে ছাড়িয়ে না যায়।' ইয়াজিদ জবাবে বলেন, 'জি আব্বা, ইনশাআল্লাহ তা-ই হবে।' এরপর তিনি অবিচলভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যান। এ সময় ইয়াজিদ ছিলেন মুসলিমবাহিনীর মধ্যসারির দিকে। ৪৩১
সায়িদ ইবনুল মুসাইয়িব রা. তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন; 'ইয়ারমুকের দিন নীরবতা ছেয়ে গিয়েছিল। আমরা হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনতে পাই। আওয়াজটা পুরো শিবির থেকেই শোনা যাচ্ছিল। সেটা ছিল- 'আল্লাহর সাহায্য, নিকটে এসে যাও। হে মুসলিমরা, অনড় হয়ে যাও।' আমরা চেয়ে দেখি, সেই আওয়াজদাতা ছিলেন আবু সুফিয়ান রা.। তিনি তাঁর পুত্র ইয়াজিদের পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছিলেন। মুসলিমরা মাগরিব ও ইশার সালাত পিছিয়ে দেন। একপর্যায়ে বিজয় হাতের মুঠোয় আসে। খালিদ রা. রোমান সেনাপতি হিরাক্লিয়াসের ভাই থিয়োডরের তাঁবুতে রাতযাপন করেন। সে পলায়নকারীদের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। অশ্বারোহীরা খালিদের তাঁবুর আশেপাশে টহল দিচ্ছিল। রোমানদের যারাই ওদিকে আসত, তাদের হত্যা করে ফেলা হতো। সকাল পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। থিয়োডরকেও একসময় হত্যা করা হয়। সেদিন তার তাঁবুতে ছিল ৩০টা শামিয়ানা, ৩০টা রেশমের সূর্যরশ্মি প্রতিরোধক। এ ছাড়া ছিল প্রচুর কার্পেট, রেশমের জামাকাপড় ও পর্দা। সেখানে যেসব সম্পদ ছিল, সকাল হলে মুসলিমরা তা গনিমত হিসেবে নিয়ে নেন।৪৩২
৭. যুদ্ধের ফল
এ যুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার মুসলিমযোদ্ধা শহিদ হন। তাঁদের মধ্যে ইকরিমা ইবনু আবি জাহল, তাঁর পুত্র আমর, সালমা ইবনু হিশাম, আমর ইবনু সায়িদ, আবান ইবনু সায়িদসহ রাসুলের সাহাবি, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গও অন্তর্ভুক্ত। অপরদিকে রোমানদের নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার। এদের মধ্যে ৮০ হাজার ছিল শেকলবদ্ধ আর বাকিরা ছিল শেকলবিহীন।৪৩৩
এই বিশাল বিজয় মুসলিমদের আনন্দিত করে তুললেও খলিফা আবু বকরের মৃত্যুসংবাদ সে আনন্দ মাটি করে দেয়। তাঁর ইনতিকালে তাঁরা চিন্তিত হয়ে পড়েন।
আট. আবু বকরের ইনতিকাল, উমরের খিলাফতগ্রহণ ও খালিদের অপসারণ
১. উমরকে খলিফা নির্ধারণ ও আবু বকরের ইনতিকাল
১৩ হিজরির জুমাদাস সানি মাসে খলিফাতুর রাসুল আবু বকর রা. অসুস্থ হন এবং এ অসুস্থতা নিয়েই ২২ জুমাদাল উখরা সোমবার দিবাগত রাতে ইনতিকাল করেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা যখন ক্রমেই অবনতি হচ্ছিল, তখন একসময় তিনি বুঝে নেন, তাঁর বেলা ফুরিয়ে এসেছে। ফলে শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদের সঙ্গে আলোচনা করে খিলাফতের গুরুভার উমর রা.-এর হাতে অর্পণ করেন। রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চলাকালে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে খলিফা আবু বকরের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছেছিল; কিন্তু তিনি সংবাদটা তখনই মুসলিমদের না জানিয়ে চেপে রাখেন, যাতে মুসলিমবাহিনী মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে না পড়ে। বিজয় পূর্ণতায় পৌঁছার পরই সংবাদটা তাঁদের সামনে প্রকাশ করেন।
২. খলিফা উমর কর্তৃক খালিদকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি
এদিকে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. খলিফা হওয়ার পরপরই শামে খালিদের পরিবর্তে আবু উবায়দাকে সেনাপতি নিয়োগের ফরমান পাঠান। খালিদ আমিরুল মুমিনিনের এই ফরমানকে সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করেন। এরপর খলিফাতুর রাসুলের ইনতিকালে মুসলিমদের পক্ষ থেকে শোকপ্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আবু বকরকে মৃত্যু দান করেছেন। তিনি ছিলেন আমার কাছে উমরের চেয়ে প্রিয়। সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি উমর রা.-কে খলিফা বানিয়েছেন। তিনি আবু বকরের চেয়ে আমার কাছে ছিলেন অপ্রিয়; অথচ আল্লাহ আমার ওপর তাঁকে পছন্দ করা জরুরি করে দিয়েছেন।'৪৩৪ এরপর খলিফা উমরের নির্দেশমতো আবু উবায়দা রা. সেনাবাহিনীর নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন।
উমর রা. খিলাফতের দায়িত্ব হাতে নেওয়ার পর আবু বকরের শাসনামলে নিযুক্ত অনেক প্রাদেশিক গভর্নর, কর্মকর্তা ও সেনাপতিকে অপসারণ করে নতুন দায়িত্বশীল নিয়োগ দেন। এটা খলিফা উমরের ইজতিহাদি বিষয় ছিল। এ হিসেবে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকেও তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিলে সঙ্গে সঙ্গেই খালিদ রা. তা মেনে নেন।
৩. কা'কা ইবনু আমরের কবিতা
ইয়ারমুকের যুদ্ধ প্রসঙ্গে আরবের কবিদের মধ্যে কা'কা ইবনু আমরের কবিতাগুলো হচ্ছে,
দেখোনি কি ইয়ারমুকে আমরা তেমন বিজয়ই লাভ করেছি
যেমন বিজয় লাভ করেছি ইতিপূর্বে ইরাকে।
কুমার ঘোড়ায় চড়ে মাদায়েন ও মারজ আস-সাফারের
স্বাধীন এলাকাগুলো করেছি জয়।
সেই বসরাও জয় করেছিলাম, কা-কা-কারীদের কাছে
যে শহরের আঙিনায় পা রাখা ছিল নিষিদ্ধ।
যারাই সামনে আসছিল তাদের হত্যা করছিলাম
ধারালো তরবারির মাধ্যমে গনিমত কুড়িয়ে নিচ্ছিলাম।
আমরা ইয়ারমুকে রোমানদের হত্যা করেছিলাম।
তারা আমাদের দুর্বলদের সমকক্ষতাও প্রদর্শন করতে পারেনি।
আমরা ধারালো তরবারির মাধ্যমে ওয়াকুসা প্রান্তরে
ওদের বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে দিয়েছিলাম।
সেই ভোরে যখন ভিড় জমেছিল,
তখন তারা এমন জিনিস আস্বাদন করে,
যা ছিল ভীষণ তিক্ত।
৪. রোমানদের পরাজয়
যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে সম্রাট হিরাক্লিয়াস মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বেঁচে যাওয়া তার ভগ্নমনোরথ সেনারা ইনতাকিয়ায় (এন্টিয়ক) গিয়ে পৌঁছলে সে তাদের বলে ওঠে,
-তোমরা ধ্বংস হও! বলো দেখি, তোমরা যাদের মোকাবিলায় লড়ছিলে, তারা কি তোমাদের মতোই মানুষ ছিল না?
-জি, অবশ্যই ছিল।
-সংখ্যায় তোমরা বেশি ছিলে নাকি তারা?
-প্রতিটা জায়গায়ই আমরা তাদের কয়েকগুণ বেশি ছিলাম।
-তারপরও তোমরা পরাজিত হলে কেন?
তখন তাদের এক প্রবীণ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলতে থাকে, 'তারা বিজয়ী হয়েছে; কারণ তারা দিনে থাকে রোজাদার আর রাতে থাকে আল্লাহর দরবারে দণ্ডায়মান। তারা অঙ্গীকার পূরণ করে। কল্যাণের দাওয়াত দেয় এবং অকল্যাণ ও অসত্য থেকে বিরত রাখে। একে অন্যের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করে। আর আমাদের পরাজয়ের কারণ হচ্ছে— আমরা মদপান করি, ব্যভিচার করি, বিভিন্ন হারাম কাজে লিপ্ত হই। ওয়াদা ভঙ্গ করি। অত্যাচার-অনাচার করি। অন্যায় কাজের নির্দেশ প্রদান করি। আল্লাহ যেসব কাজে অসন্তুষ্ট হন, মানুষকে তা থেকে বিরত রাখি না। জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করি।' হিরাক্লিয়াস তখন বলে ওঠে, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি সঠিক বলেছ।'
টিকাঃ
৪১০. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৩।
৪১১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৮।
৪১২. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৪।
৪১৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৮।
৪১৪. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৪।
৪১৫. তারিখু দিমাশক: ২/১২৫।
৪১৬. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৬৩।
৪১৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১০।
*১৮. খালিদের ঘোড়া। শামের কঠিন মরুভূমি পাড়ি দিতে গিয়ে তাঁর প্রিয় ঘোড়া আশকারের খুর জখম হয়ে গিয়েছিল।
৪১৯. আবু বাকরিন রাজুলুদ দাওলাহ: ৮৮।
৪২০. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৬৩।
৪২১. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৬।
৪২২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১০।
৪২৩. প্রাগুক্ত: ৭/১৩।
৪২৪. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৯।
৪২৫. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ২২২; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১৯।
৪২৬. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৭০।
৪২৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১২।
৪২৮. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৭৪।
৪২৯. তারতিব ওয়া তাহজিব আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৭১- ফুতুহুল বুলদান, আজদি: ১৭১।
৪৩০. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া ওয়াদ দিফাইয়াহ ইনদাল মুসলিমিন: ১৭৫।
৪৩১. ফুতুহুল বুলদান, আজদি: ২২৮।
৪৩২. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৭৩।
৪৩৩. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৭৯।
৪৩৪. তারিখু দিমাশক: ২/১২৬।