📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 সেনাপতি নিয়োগ ও বাহিনী প্রেরণ

📄 সেনাপতি নিয়োগ ও বাহিনী প্রেরণ


আবু বকর রা. শামে বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। লোকজনকে জিহাদের দাওয়াত দেন এবং এ উদ্দেশ্যে তিনি চারটি বাহিনী প্রস্তুত করেন :

১. ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ানের বাহিনী
এটিই ছিল সেই প্রথম বাহিনী, যারা শাম অভিমুখে এগিয়ে গিয়েছিল। ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ানের দায়িত্ব ছিল, দামেশক জয় করার পর অপর তিনটি বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা। ইয়াজিদের বাহিনীতে প্রথমদিকে সেনাসংখ্যা ছিল ৩ হাজার। এরপর খলিফা আরও সাহায্যকারী মুজাহিদ পাঠিয়েছিলেন। ফলে তাঁর বাহিনীর সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৭ হাজার। ইয়াজিদের বাহিনী পাঠানোর আগে আবু বকর রা. প্রভাব বিস্তারকারী গুরুত্বপূর্ণ যে উপদেশ দিয়েছিলেন, তা ছিল যুদ্ধ ও সন্ধির ব্যাপারে স্পষ্ট প্রজ্ঞাপূর্ণ। তিনি পায়ে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে ইয়াজিদকে বিদায় জানান এবং উপদেশস্বরূপ বলেন,

আমি তোমাকে পরীক্ষা করতে শাসক নিযুক্ত করছি। তোমার অভিজ্ঞতা যাচাই করব। তোমাকে অভিজ্ঞ করে তুলব। যদি সুচারুরূপে দায়িত্ব পরিচালনা করতে পারো, তাহলে তোমাকে পুনরায় ওই কাজে নিযুক্ত করব। আরও বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেবো; কিন্তু ত্রুটি করলে তোমাকে পদচ্যুত করব। আল্লাহভীতিকে আবশ্যকীয় বিষয় হিসেবে ধারণ করবে। তিনি তোমার ভেতরটা সেভাবে দেখে থাকেন, যেভাবে বাহ্য অবস্থা দেখে থাকেন। সে ব্যক্তি আল্লাহর অনুগ্রহের অধিক দাবিদার, যে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বের দাবি বেশি করে আদায় করে থাকে। সে-ই আল্লাহর নৈকট্যধন্য, যে নিজের কাজকর্মের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্যপ্রার্থী হয়।

আমি খালিদের জায়গায় তোমাকে নিযুক্ত করেছি। সাবধান, জাহিলিয়াতের সাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে বেঁচে থাকবে। আল্লাহর কাছে এমন লোক চূড়ান্ত পর্যায়ের ঘৃণিত। নিজ বাহিনীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে। তাদের কল্যাণের অঙ্গীকার দেবে। যখন উপদেশ দেবে, সংক্ষিপ্ততা অবলম্বন করবে। কারণ, কথা লম্বা হয়ে গেলে তাতে অপ্রয়োজনীয় বিষয় এসে যায়। নিজেকে ঠিক রাখবে, তখন মানুষও তোমার জন্য ঠিক হয়ে যাবে। সালাতসমূহ যথাসময়ে রুকু-সিজদার সঙ্গে পূর্ণরূপে আদায় করবে। সালাতে বিনয় ও নম্রতাকে গুরুত্ব দেবে। শত্রুবাহিনীর কোনো দূত এলে সম্মান করবে এবং দ্রুত বিদায় করে দেবে। তারা যাতে তোমার সেনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য নিয়ে যেতে না পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। নিজেদের কোনো বিষয় তাদের সামনে প্রকাশ করবে না। তারা যেন তোমার কোনো দুর্বলতা জানতে না পারে, সে ব্যাপারে চৌকশ থাকবে। তাদেরকে সেনাবাহিনীর মধ্যখানে রাখবে, যাতে মুসলিমবাহিনীর শক্তি দেখে ভীত হয়ে পড়ে। তাদের সঙ্গে নিজের লোকদের আলাপ জমাতে নিষেধ করবে। নিজেই তাদের সঙ্গে কথা বলবে। কখনো রহস্য উন্মোচন করবে না। যখন পরামর্শ নেবে, সত্য কথা বলবে; তাহলে সঠিক পরামর্শ পাবে। পরামর্শকদের থেকে কোনো ঘটনা গোপন করবে না, নতুবা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সাথিদের সঙ্গে রাতে কথাবার্তা বলবে, তাহলে দিনের সংবাদ জানতে পারবে। এমতাবস্থায় তোমার সামনে থেকে পর্দা সরে যাবে। নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীতে বেশিসংখ্যক সদস্য রাখবে। সেনাবাহিনীর মধ্যে তাদের ছড়িয়ে দেবে। আগাম না জানিয়ে আচমকা মাঝেমধ্যে তাদের কাছে যাবে। যাকে দায়িত্ব পালনে গুরুত্বহীন পাবে, তাকে খুব শাসাবে। বাড়াবাড়িহীন শাস্তি দেবে। রাতে পাহারার দায়িত্ব বণ্টন করে দেবে এবং প্রথম প্রহরের কর্তব্যপালন শেষ রাতের কর্তব্যপালন থেকে কিছুটা বেশি রাখবে। দিনের কাছাকাছি হওয়ায় এই পর্যায়টা হয়ে থাকে সহজ। শাস্তিযোগ্য ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে ভয় করবে না। এ ক্ষেত্রে নম্র ব্যবহার করবে না। হ্যাঁ, শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্রুততার আশ্রয় নেবে না; বরং (শাস্তি না দেওয়ার) অজুহাতের সন্ধানে থাকবে।

নিজের বাহিনী সম্পর্কে বেখবর থাকবে না, নাহয় তারা নষ্ট হয়ে যাবে। তবে পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়ে তাদের হেনস্তা করবে না। তাদের গোপন বিষয় মানুষের কাছে প্রকাশ করবে না। তাদের বাহ্য আচরণকেই যথেষ্ট মনে করবে। বেকারশ্রেণির মানুষের সঙ্গে উঠাবসা করবে না। সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গেই উঠাবসা রাখবে। শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলার সময় দৃঢ়তা দেখাবে, ভীরুতা প্রদর্শন করবে না। গনিমতের সম্পদে খিয়ানত থেকে বেঁচে থাকবে। এটা মানুষকে অভাবগ্রস্ত করে তোলে, বিজয় ও সাহায্য রুখে দেয়। তোমরা এমন মানুষেরও সাক্ষাৎ পাবে, যারা ইবাদতখানায় ইবাদতে লিপ্ত, তাদেরকে তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেবে।

আল্লামা ইবনু আসির রাহ. বলেন, এটা হচ্ছে শাসকদের উদ্দেশে সর্বোত্তম উপদেশ। ৩৮৩

২. এই উপদেশসমূহের শিক্ষণীয় দিক

• নেতৃত্ব ও পদ কোনো চিরস্থায়ী অধিকার নয়; বরং এটি উত্তম কৃতিত্ব, সফল দায়িত্ব সম্পাদনের পুরস্কার। যদি কেউ সুন্দর কৃতিত্ব দেখাতে না পারে, দায়িত্ব সম্পাদনে অলসতা দেখায়, তাহলে প্রয়োজনে তাকে পদচ্যুত করতে হবে।

এই অনুভূতি একজন মানুষকে মানগত দিক দিয়ে শীর্ষে পৌঁছাতে অধিক শ্রম ও শক্তি ব্যয়ের প্রতি উৎসাহ জোগায়। যখন তার অনুভূতিতে এটা বসে যাবে যে, সে যা-ই করুক না কেন, তাকে তার পদ থেকে হটিয়ে দেওয়ার মতো কেউ নেই, তখন তার কাজে আলস্য এসে যাওয়া ও দুনিয়ার প্রতি তার ঝুঁকে পড়া অবধারিত হয়ে যায়। এতে দায়িত্ব আদায়ে ত্রুটি আসে। আর অধীনদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাসাদ, দুষ্কর্ম, মতবিরোধ ও ঝগড়া বেড়ে যায়।

• আমলের ক্ষেত্রে তাকওয়া হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আল্লাহ তাআলা বান্দার বাহির-ভেতর সম্পর্কে সম্যক অবহিত। তারা নিজেদের গুপ্ত বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করলে বাহ্য অবস্থায়ও তাকওয়া অবলম্বন করবে। আর এভাবে শাসকশ্রেণি ফ্যাসাদ ও অরাজকতা থেকে দূরে থাকতে সক্ষম হবে, যা সাধারণত লাগামহীন জজবার কারণে সৃষ্ট হয়ে থাকে, যেখানে আল্লাহভীতি মোটেও পাওয়া যায় না।

• ওয়াজ-নসিহতের ক্ষেত্রে কথা সংক্ষিপ্ত করার ব্যাপারে লক্ষ রাখা দরকার। নতুবা মূল কথা ভুলে যাওয়া এবং উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলার প্রবল আশঙ্কা থাকে। শ্রোতারা বক্তব্য দ্বারা উপকৃত হওয়ার পরিবর্তে বক্তব্যের ভাষালংকারে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে বক্তব্যের মধ্যে যদি সাহিত্যের সৌন্দর্য বা উপস্থাপনার সৌকর্য না থাকে, তাহলে শ্রোতা বিরক্ত হয়ে উঠবে। তখন বক্তার বক্তব্য তার কানে ঢুকে না।

• যদি দায়িত্বশীল নিজেকে সংশোধন করে, নিজের দোষত্রুটির ব্যাপারে সতর্ক থাকে, নিজেকে অন্যদের আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলে, তাহলে তার নিজের পরিবর্তনই অন্য মানুষের সংশোধনের জন্য নিয়ামক হয়ে উঠবে।

• বাহ্যিক ও অন্তরঙ্গভাবে সালাতসহ ইবাদতগুলোকে তার সঠিক অবস্থান থেকে আদায়ের প্রতি যত্নবান হওয়া দরকার। বাহ্যত সালাতকে পূর্ণতার সঙ্গে আদায়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে সালাতের রুকনগুলো যথাযথভাবে আদায় করা; আর অন্তরঙ্গতার অর্থ হচ্ছে একাগ্রতার সঙ্গে আদায় করা। এভাবে সালাত আদায়ের মাধ্যমেই জমিনে আল্লাহর জিকিরের দায়িত্ব আদায় হয়ে থাকে। এ ধরনের সালাতই মানুষের কাজ ও ব্যবহারকে সংস্কার করতে পারে। অন্তরে শক্তি বাড়ায়। আত্মাকে প্রশান্ত করে। বিপদাপদে মুসলিমদের আশ্রয় গণ্য হয়।

• শত্রুবাহিনীর দূত এলে তাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করা উচিত। তবে মুসলিমবাহিনীর রহস্য সম্পর্কে তাদের অবহিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। তাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক ব্যবহার মূলত একপ্রকার দাওয়াহ। এর মাধ্যমে শত্রুদের কাছে মুসলিমদের উত্তম আচরণের বার্তা পৌঁছে যায়। তবে সৌজন্য এ পর্যায়ের হবে না, যার ফলে শত্রুরা মুসলিমদের রহস্য সম্পর্কে অবগত হয়ে যায়। তাদের সামনে মুসলিমদের শক্তিমত্তা তুলে ধরা দরকার, যাতে তারা দেশে গিয়ে নিজের জাতিকে মুসলিমদের ব্যাপারে ভয় প্রদর্শন করে। এভাবে শত্রুরা যেন আগে থেকেই মুসলিমদের ব্যাপারে ভীত হয়ে পড়ে।

• রহস্যগুলো সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় গোপন রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বিশেষত যেসব গোপনীয়তা মুসলিমদের স্বার্থ ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট। এতে অলসতা করা যাবে না। মানুষ যতক্ষণ কোনো গোপনীয়তা তার মনের ভেতর লুকিয়ে রাখতে পারে, ততক্ষণ সে বিচক্ষণ গণ্য হয়; কিন্তু যখন তার গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যায়, তখন সব বিষয় তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, সব ছত্রখান হয়ে যায়।

• পরামর্শ গ্রহণের যথার্থতা পরামর্শের পরিণতি নিয়ে চিন্তাভাবনা থেকে শ্রেয়তর। পরামর্শদাতা তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন ও পরামর্শ প্রদানে অভিজ্ঞ থাকলেও যে বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে, সেটা পরামর্শ গ্রহণকারীর কাছে স্পষ্ট না থাকলে পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে কোনো কল্যাণ অর্জন সম্ভব নয়। পরামর্শ গ্রহণকারী যদি বিষয় টা পরামর্শদাতার কাছে বিস্তারিত না বলে, তাহলে সে প্রকারান্তরে নিজের ওপরই জুলুম করল। এ ধরনের পরামর্শগ্রহণ অর্থহীন।

• নেতা ও দায়িত্বশীলদের জন্য তাঁদের অধীনদের সঙ্গে মিলেমিশে চলা দরকার, যাতে তাদের সম্পর্কে জ্ঞাত থাকা যায়। এতে তাদের সমস্যাবলি শোনা ও এর যথাযথ সমাধান সহজ হয়। যে-সকল নেতা ও দায়িত্বশীল কেবল উচ্চপদস্থ লোকদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সাধারণ লোকদের সঙ্গ এড়িয়ে চলে, তারা তথ্যের আদ্যোপান্ত জানতে ব্যর্থ হয়। তারা কেবল ওই বিশেষ লোকদের দেওয়া সংবাদই জানতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত হতে পারে। এ ছাড়া এ কারণে অনেক সময় ভুল বিষয় সামনে এসে যেতে পারে।

• মুসলিমদের নিরাপত্তার জন্য পাহারার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে শঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে। তবে নিরাপত্তারক্ষী ও প্রহরীদের ওপর ভরসা করে থাকা উচিত হবে না; বরং এদের পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যাতে তাদের অলসতার কারণে মুসলিমদের কোনো ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে।

• নির্দেশ অমান্যকারীদের শাস্তিপ্রদানের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের মধ্যপন্থা অবলম্বন করা উচিত। তবে অভিযুক্ত প্রমাণিতদের শাস্তিপ্রদানে কোনো প্রকার অবহেলা করা যাবে না। এতে অতিরিক্ত বিরোধিতা এবং নির্দেশ অমান্য করায় তারা দুঃসাহসী হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোরতা পরিহার আবশ্যক। নতুবা তাদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে, তারা দলবাজির উদ্যোগী হয়ে উঠতে পারে। শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে কৌশল, ভারসাম্য, দূরদর্শিতা ও চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন, যাতে দীক্ষার উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যায় এবং কোনো প্রকার ফ্যাসাদ কিংবা অসন্তোষ সৃষ্টি না হয়।

• দায়িত্বশীলদের সতর্ক থাকা অপরিহার্য। তার কর্তৃত্বের ভেতরে যা কিছু সংঘটিত হয়, তা জানা থাকতে হবে। জনগণ যেন বুঝতে পারে তাদের বিষয় গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। এমন হলে ভালোকাজ সম্পাদনকারীদের অন্তরে অধিকতর সুধারণার জন্ম নেবে এবং মন্দকাজে জড়িতরা মন্দকাজ থেকে বিরত থাকবে। তবে লক্ষ রাখতে হবে, অধীনদের মধ্যে গোয়েন্দাগিরি চালানো যাবে না। এতে প্রকারান্তরে তাদের অপমানিত করা হয়। ফলে তাদের অন্তর থেকে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও কৃতজ্ঞতাবোধ উধাও হয়ে যাবে; অথচ এটাই শাসক ও শাসিতের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখে। সম্পর্ক যতক্ষণ অটুট থাকবে ততক্ষণ সত্যবিভ্রান্ত লোকজন এমন বিরোধিতার সুযোগ পাবে না, যার ফলে সমাজে ফ্যাসাদ ও অরাজকতা বিরাজ করে। যখন এই সম্পর্ক ভেঙে যাবে, মন্দকাজ থেকে বিরতকারী কেউ থাকবে না, তখন বিষয়টার সমাধান কঠিন হয়ে পড়বে। এর জন্য বিশাল শক্তির প্রয়োজন। এটা এমন বিষয়, যার অনিষ্ট একেবারে স্বতঃসিদ্ধ।

• সেনাপতি ও কমান্ডারদের জন্য শত্রুর মোকাবিলায় দৃঢ়তা প্রদর্শন জরুরি। কোনো অবস্থায়ই ভীরুতা প্রদর্শন করা যাবে না। নেতাদের ভীরুতা সাধারণ সেনাদের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। এর পরিণতি হয় পরাজয় ও লজ্জা। যুদ্ধ ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে নেতার জন্য দুঃসাহস প্রদর্শন আবশ্যক। নেতাদের দুর্বলতা তাদের অধীনকে দুর্বল করে ফেলবে। এতে কাজ আদায়ের গতি হ্রাস পাবে। ফলাফল মন্দ হবে।

• সেনাপতি ও কমান্ডাররা গনিমতের সম্পদে কোনো প্রকার খিয়ানত করতে পারবে না। গনিমত বণ্টনের আগে এর থেকে কিছুই গ্রহণ করবে না। যুদ্ধময়দান ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলদের জন্য এমন কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ আদায় করা যাবে না, যা শরিয়তসিদ্ধ নয়। যেমন: এমন কোনো হাদিয়া-তুহফা গ্রহণ, যার উদ্দেশ্য হয় দায়িত্বশীলকে প্রভাবিত করা, সত্য থেকে বিচ্যুত করা। এটাও একধরনের খিয়ানত। এই খিয়ানতের পরিণতি হচ্ছে দরিদ্রতা ও অভাব এবং বিজয় ও সাহস থেকে বঞ্চিতি।
• উপর্যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ থেকেই অনুধাবন করা যায়—আবু বকর রা. সবসময় মুসলিমদের কল্যাণচিন্তা লালন করতেন। সেনাপতিরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন, তিনি তা ভালোভাবে জানতেন। তারা এ থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পেতে পারেন, সে ব্যাপারে তাদের সঠিক সমাধানে সাহায্য করতেন।

এ উপদেশ এবং এর মতো আরও অসংখ্য উপদেশ আবু বকরের অবস্থানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করে। আপনি তাঁর রাষ্ট্রপরিচালনার ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখতে পাবেন, তিনি রাজনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও দক্ষ ছিলেন। মনে হবে তিনি নিজেই যেন সেনাপতি ও কমান্ডারদের সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত। আর যখন তাঁর নম্রতা ও স্নেহ-ভালোবাসা দেখবেন, তখন মনে হবে তিনি যেন দরদি দায়ি। তিনি মুমিনদের ব্যাপারে ছিলেন দয়ালু। সত্য ও উত্তম কর্ম সম্পাদনকারীদের মর্যাদাদানকারী। যোগ্যতা ও ক্ষমতার অধিকারীদের ব্যাপারে অবগত। আল্লাহর শত্রু কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর।৩৮৪

৩. শুরাহবিল ইবনু হাসানার বাহিনী
ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ানের বাহিনী পাঠানোর তিন দিন পর শুরাহবিল ইবনু হাসানার বাহিনী পাঠান। সেদিন তিনি শুরাহবিলকে বিদায় দিতে গিয়ে বলেন, 'শুরাহবিল, আমি ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ানকে যেসব উপদেশ দিয়েছি, সেগুলো তুমি শুনেছ?' শুরাহবিল বলেন, 'জি, অবশ্যই।' আবু বকর বলেন, 'আমি তোমাকেও সেসব উপদেশ দিচ্ছি। এ ছাড়া আরও কিছু উপদেশ দিচ্ছি, যা ইয়াজিদকে দিইনি। আমি তোমাকে যথাসময়ে সালাত আদায়, যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় কিংবা শাহাদাত পর্যন্ত দৃঢ়পদ থাকা, রোগীদের দেখাশোনা করা, জানাজায় অংশগ্রহণ এবং সর্বাবস্থায় অধিকহারে আল্লাহর জিকিরের উপদেশ দিচ্ছি।' শুরাহবিল বলেন, 'আল্লাহ সাহায্যকারী। আল্লাহর যা ইচ্ছা, তা-ই হয়ে থাকে। ১৩৮৫

শুরাহবিলের সেনাদলের সংখ্যা ছিল ৩ থেকে ৪ হাজার। আবু বকর তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, 'প্রথমে তাবুক ও বালকায় যাবে, এরপর বসরা অভিমুখে রওনা হবে। সেটাই হবে তোমার শেষ গন্তব্য।' তিনি তখন বালকার দিকে এগোতে থাকেন। তাঁর বাহিনীকে উল্লেখযোগ্য কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। শুরাহবিলবাহিনী আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের বাহিনীর বাম পাশ এবং আমর ইবনুল আসের ডান পাশ হয়ে পথ অতিক্রম করে বালকায় পৌঁছায়। এরপর বসরায় গিয়ে শহরটা অবরোধ করে, তবে বসরা জয় করা সম্ভব হয়নি। কারণ, এটা ছিল রোমানদের সংরক্ষিত সুদৃঢ় একটা কেন্দ্র। ৩৮৬

৪. আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের বাহিনী
আবু বকর রা. আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে বাহিনীসহ পাঠানোর ইচ্ছা করলে তাঁকে বিদায় জানাতে গিয়ে বলেন, 'ওই ব্যক্তির মতো আমার কথাগুলো শোনো, যে আনুগত্য ও আমলের নিয়তে শুনে থাকে। অভিজাত ব্যক্তিবর্গ, সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য, সৎকর্মপরায়ণ মুসলিম ও জাহিলি যুগের বীরপুরুষদের নিয়ে তুমি বের হচ্ছ। এরা তখন দলান্ধ হয়ে যুদ্ধ করত; আর এখন প্রতিদানের আশায় যুদ্ধ করছে। আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো, সাহায্যকারী হিসেবে তিনিই যথেষ্ট। তাঁর ওপর ভরসা করো, তাঁর ওপর নির্ভর করাটাই সবচেয়ে উত্তম। ইনশাআল্লাহ কাল তুমি রওনা হয়ে যাবে। '৩৮৭

তাঁর বাহিনীর সদস্যও ছিল ৩ থেকে ৪ হাজারের মধ্যে। এই বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল হিমস। আবু উবায়দা মদিনা থেকে রওনা হয়ে ওয়াদিউল কুরা হয়ে হিজরে (মাদায়িনে সালিহ) পৌঁছান। সেখান থেকে প্রথমে 'জাতে মানার', তারপর জিজা এবং সেখান থেকে মোয়াব পৌঁছান। সেখানে শত্রুদের বিরুদ্ধে তাঁর সংঘর্ষ হয়। অবশেষে তাদের সঙ্গে সন্ধি করেন। সিরিয়ায় সংঘটিত সন্ধির মধ্যে এটাই ছিল প্রথম সন্ধি। এরপর তিনি জাবিয়ার দিকে এগিয়ে যান। ৩৮৮ এই বাহিনী ছিল প্রথম বাহিনীর ডান ও দ্বিতীয় বাহিনীর বাম বাহু। ৩৮৯

আবু উবায়দার সঙ্গে ছিলেন আরবের বিখ্যাত বাহাদুর কায়েস ইবনু হুবায়রা ইবনু মাসউদ মুরাদি। আবু উবায়দা রওনার আগে আবু বকর তাঁকে উপদেশস্বরূপ বলছিলেন, 'তোমার সঙ্গে যাচ্ছে আরববিখ্যাত উঁচুমানের একজন বাহাদুর। তাঁকে সঙ্গে রাখবে এবং তাঁর সঙ্গে নম্র আচরণ করবে। তাঁকে এ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করবে যে, তুমি তাঁর অমুখাপেক্ষী নও। তাঁকে সাধারণজন মনে করবে না। ফলে তুমি তাঁর দ্বারা উপকৃত হবে এবং শত্রুর মোকাবিলায় তাঁর প্রচেষ্টা তোমাকে উপকৃত করবে।'

এরপর আবু বকর রা. কায়েস ইবনু হুবায়রাকে ডেকে বলেন, 'আমি তোমাকে আমিনুল উম্মাহ আবু উবায়দার সঙ্গে পাঠাচ্ছি। তিনি এমন ব্যক্তি, তাঁর ওপর যদি অত্যাচার করা হয়, তবু তিনি অত্যাচার করেন না, দুর্ব্যবহার করলে ক্ষমা করে দেন। সম্পর্কচ্ছেদ করলে সেই সম্পর্ক প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করেন। তিনি মুমিনদের ওপর দয়ালু ও কাফিরদের বিপরীতে পাথরের মতো কঠিন। তুমি তাঁর নির্দেশ অমান্য করবে না। তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করবে না। তিনি তোমাকে কল্যাণের নির্দেশই দেবেন। আমি তাঁকে তোমার কথা বলে দিয়েছি। তিনি তাকওয়া ছাড়া অন্য কিছুর নির্দেশ দেবেন না। আমরা শুনেছি, তুমি একজন বাহাদুর ও অভিজাত ব্যক্তি। তুমি তোমার শক্তিমত্তাকে ইসলাম ও মুসলিমদের স্বার্থে ব্যবহার করবে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে, যারা আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করে, আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে অংশীদার স্থাপন করে। আল্লাহ এতেই উত্তম প্রতিদান, সম্মান ও বিজয় রেখেছেন।'

আবু বকরের উপদেশ শুনে কায়েস ইবনু হুবায়রা বলেন, 'যদি আপনি বেঁচে থাকেন, তাহলে আমার ব্যাপারে মুসলিমদের নিরাপত্তার ও কাফিরদের ধ্বংসকল্পে সচেষ্ট থাকার মতো অন্তর প্রশান্তকারী সুসংবাদই শুনবেন।' আবু বকর তখন বলেন, 'আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন। তুমি এমনটাই করতে থাকো।' এরপর তিনি যখন জানতে পারেন, হুবায়রা জাবিয়ার মল্লযুদ্ধে দুই রোমান-জেনারেলকে মৃত্যুর ঘাটে পৌঁছে দিয়েছেন, তখন তিনি আনন্দ চিত্তে বলেন, 'কায়েস তাঁর ওয়াদা সত্য প্রমাণিত করে দেখিয়েছে। ৩৯০

এখানে আমরা দেখতে পাই, আবু বকর রা. কায়েস ইবনু হুবায়রাকে উৎসাহ জুগিয়ে তাঁর ভেতরে থাকা শক্তি কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। তাঁর ভেতরের বীরত্বকে জাগিয়ে তুলে ইসলামের খিদমত ও জিহাদে লাগিয়ে দিতে সচেষ্ট ছিলেন। নিঃসন্দেহে বীরপুরুষদের প্রশংসা তাদের ভেতরগত শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। তারা নিজেদের মধ্যে শক্তিমত্তা অনুভব করে থাকেন। আর এটা আত্মোৎসর্গের প্রতি তাদের আরও উৎসাহী করে। ৩৯১

৫. আমর ইবনুল আসের বাহিনী

আবু বকর রা. আমর ইবনুল আসের সঙ্গে একটা বাহিনী ফিলিস্তিনে পাঠিয়ে দেন। তিনি তাঁকে এই অধিকার দেন যে, চাইলে আপনি সেই কাজ করতে পারবেন, যে কাজের দায়িত্ব আপনাকে রাসুল ﷺ অর্পণ করেছিলেন। ৩৯২ আর চাইলে সেই কাজও গ্রহণ করতে পারেন, যা দুনিয়া-আখিরাতের জন্য কল্যাণকর। তবে গৃহীত কাজটা আপনার কাছে পছন্দনীয় হতে হবে। উত্তরে তিনি এই মর্মে চিঠি লেখেন,

আমি ইসলামি তিরসমূহের অন্যতম তির। এই তির পরিচালনা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব আপনার। আপনি ভেবে দেখুন, কোন তিরটা বেশি শক্তিশালী ও ভয়ংকর। আপনি যেটা ইচ্ছা নির্দ্বিধায় সেটা চালিয়ে দিন। ৩৯৩

এরপর আমর ইবনুল আস রা. মদিনায় এলে আবু বকর রা. তাঁকে নির্দেশ দেন, 'আপনি মদিনার বাইরে গিয়ে শিবির স্থাপন করুন, যাতে লোকজন আপনার সঙ্গে যোগ দিতে পারে।' তখন কুরাইশের নেতৃস্থানীয় বহু লোক তাঁর বাহিনীতে যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে হারিস ইবনু হিশাম, সুহাইল ইবনু আমর এবং ইকরিমা রা.-ও ছিলেন। বিদায় জানাতে গিয়ে আবু বকর রা. তাঁকে বলেন, 'আমর, আপনি অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ এবং সিদ্ধান্তগ্রহণে দক্ষ ব্যক্তি। এ ছাড়া আপনার প্রচুর যুদ্ধাভিজ্ঞতা রয়েছে। আপনি কুরাইশের অভিজাত ও পুণ্যবানদের নিয়ে আপন ভাইদের সহায়তায় যাচ্ছেন। অতএব, তাঁদের কল্যাণকামনায় ত্রুটি করবেন না। তাঁদের উত্তম পরামর্শগুলো ফেলে দেবেন না। আপনার যুদ্ধবিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো পরিণাম বিবেচনায় হয়ে থাকে প্রশংসাযোগ্য ও বরকতময়।' আমর বলেন, 'আমার ব্যাপারে আপনার যে সুধারণা রয়েছে, ইনশাআল্লাহ আমি এর বাস্তবায়ন করে দেখানোর চেষ্টা করব।'৩৯৪

এরপর তিনি বাহিনী নিয়ে রওনা হয়ে যান। তাঁর বাহিনীর সেনাসংখ্যা ছিল ৬ থেকে ৭ হাজারের মধ্যে। তাঁদের গন্তব্য ছিল ফিলিস্তিন। এই বাহিনী লোহিত সাগরের তীর ধরে মৃতসাগরের নিকটবর্তী 'আরবা' উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছায়। আমর রা. ১ হাজার সেনার একটা বাহিনীকে আবদুল্লাহ ইবনু উমর ইবনুল খাত্তাবের নেতৃত্বে রোমানদের দিকে পাঠান। এই বাহিনী এগিয়ে গিয়ে রোমানদের একটা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে তাদের পরাজিত করে। এরপর বেশকিছু বন্দিকে নিয়ে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসে।

আমর রা. বন্দিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারেন, রুওয়াইসের নেতৃত্বে রোমানদের একটা বাহিনী মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমর তাঁর বাহিনীকে প্রস্তুত করেন। ফলে রোমানরা মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করলে তারা সহজেই সে হামলা রুখে দিতে সক্ষম হন। আক্রমণকারী বাহিনীকে পিছু হটে যেতে বাধ্য করেন। এরপর সংঘবদ্ধভাবে তাদের ওপর চড়াও হলে তারা পালাতে শুরু করে। তারা যখন পালাচ্ছিল, তখন মুসলিমবাহিনী তাদের ধাওয়া করে হাজার হাজার সেনাকে হত্যা করে। এভাবেই পূর্ণ বিজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধটা সমাপ্ত হয়। ৩৯৫

আবু বকর রা. সেনাপতিদের এই নির্দেশ দিয়েছিলেন—প্রত্যেকেই যেন অন্যের পথ এড়িয়ে চলেন। তাঁর ধারণামতে এর মধ্যেই কল্যাণ ছিল। তিনি আসলে এখানে নবি ইয়াকুব আ.-এর সুন্নাহ অনুসরণ করেছিলেন, ৩৯৬ যিনি তাঁর সন্তানদের বলেছিলেন,

আমার ছেলেরা, তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ না করে ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারি না।। বিধান আল্লাহরই। আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং যারা নির্ভর করতে চায়, তারা আল্লাহর ওপরই নির্ভর করুক। [সুরা ইউসুফ: ৬৭]

টিকাঃ
১. খালিদ ইবনু সায়িদ রা. পদত্যাগপত্র দিলে আবু বকর রা. সেটি গ্রহণ করেন।
২. আল-কামিল, ইবনু আসির: ২/৬৪-৬৫।
৩. আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৯২-১৯৭।
৪. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ১৫।
৫. আবু বাকরিনিস সিদ্দিক, নাজার আল হাদিসি: ৬২
৬. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ১৭।
৭. আল কামিল, ইবনু আসির: ২/৬৬।
৮. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া ওয়াদ দিফাইয়াহ ইনদাল মুসলিমিন, নাহাদ আব্বাসি: ১৪১
৯. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ২৬-২৭।
১০. আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/২০৬।
১১. তিনি কুজাআ অঞ্চলের সাদাকা উসুলের জিম্মাদার ছিলেন।
১২. ইতমামুল ওয়াফা বি সিরাতিল খুলাফা: ৫৫।
১৩. ফুতুহুশ শাম, বালাজুরি: ৪৮-৫১।
১৪. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া ওয়াদ দিফাইয়াহ ইনদাল মুসলিমিন: ১৪৩।
১৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৪।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 খালিদকে শামে প্রেরণ এবং আজনাদায়ন ও ইয়ারমুকযুদ্ধ

📄 খালিদকে শামে প্রেরণ এবং আজনাদায়ন ও ইয়ারমুকযুদ্ধ


১. আজনাদায়নযুদ্ধের পটভূমি ও শামের মুসলিমবাহিনীর পক্ষ থেকে খলিফার কাছে চিঠি
শামের মুসলিমবাহিনী রোমানবাহিনীর প্রতিটা পদক্ষেপের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছিল। অবস্থার ভয়াবহতা অনুমান করে জাওলান এলাকায় তারা নেতাদের একটা সভা আহ্বান করে। সভা শেষে আবু উবায়দা অবস্থার ভয়াবহতা জানিয়ে খলিফার কাছে চিঠি লেখেন। সভায় নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়েছিল :
• অধিকৃত এলাকাগুলো আপাতত শূন্য করা হোক।
• রোমানদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করার সুবিধার্থে মুসলিম সেনাদলকে একীভূত করা হোক।
• মুসলিমদের সঙ্গে চূড়ান্ত যুদ্ধে উপনীত হতে তাদের বাধ্য করা হোক।

আমর ইবনুল আস রা. যুদ্ধের জন্য ইয়ারমুক প্রান্তরের নাম প্রস্তাব করেন। এরপর মুসলিমবাহিনী সেখানে একত্রিত হয়। আবু বকরের সিদ্ধান্তও ছিল আমর ইবনুল আসের সিদ্ধান্তের অনুরূপ।

নেতৃবর্গ এই সিদ্ধান্তেও উপনীত হয়েছিলেন যে, আপাতত শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে না জড়িয়ে সবাই ইয়ারমুক প্রান্তরে এসে সমবেত হবেন। সুতরাং হিমস থেকে আবু উবায়দা রা., বালকা (জর্দান) থেকে শুরাহবিল ইবনু হাসানা ও শাম থেকে ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। এদিকে আমর ইবনুল আসও ফিলিস্তিন থেকে ধীরলয়ে প্রত্যাগমন শুরু করেন। কিন্তু রোমানবাহিনী তাঁকে পেছন দিক থেকে তাড়া করছিল, এ কারণে তিনি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের আগমনের আগে ফিরে আসা নিশ্চিত করতে পারেননি। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাঁকে বিরে সাবা নামক স্থানে রোমানদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে হয়। এর ফলেই সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক আজনাদায়নযুদ্ধ।

আবু বকরের কাছে আবু উবায়দার চিঠি পৌঁছলে তিনি নির্দেশ দেন, 'তোমরা ইয়ারমুক প্রান্তরে সমবেত হয়ে অশ্বারোহী বাহিনীকে গ্রাম ও বস্তি এলাকায় ছড়িয়ে দাও। রোমানদের রসদপত্র আসার পথ বন্ধ করে দাও। আমার পরবর্তী নির্দেশ না পৌঁছা পর্যন্ত শহর অবরোধ করবে না। তবে শত্রুরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে শক্তপায়ে লড়াই চালিয়ে যাবে। আমি তোমাদের কাছে আরও অতিরিক্ত সেনা পাঠাচ্ছি।' ১৩৯৯

অন্য এক বর্ণনায় আছে, তিনি বলছিলেন, 'তোমাদের মতো মানুষ সংখ্যাস্বল্পতার কারণে পরাজিত হতে পারে না। ১০ হাজার লোকের একটা বাহিনীও তাদের গুনাহের কারণে পরাজিত হতে পারে। অতএব, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবে। তোমাদের প্রত্যেকেই যেন নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে ইয়ারমুক প্রান্তরে চলে আসে।' আবু বকর রা. বাহিনী চতুষ্টয়কে ইয়ারমুকে পৌঁছে সব বাহিনীকে এক হওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে মুশরিকদের হামলার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া সহজ হয়।' তিনি আরও বলেন, 'তোমরা আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী। যারা তাঁর দীনের সাহায্য করে, তিনি তাদের সাহায্য করেন। যারা দূরে থাকে, আল্লাহও তাদের সঙ্গ ছেড়ে দেন। ১৪০০

২. খালিদকে শামে রওনার নির্দেশ
আবু বকরের নির্দেশের আলোকে আমরা দেখতে পাই, তিনি সবসময় মুসলিমবাহিনীর বিজয় ও আধিপত্যের জন্য আল্লাহর আনুগত্যকেই ভিত্তি মনে করতেন; আর পরাজয় ও লজ্জা গুনাহের প্রতিক্রিয়া মনে করতেন। রোমানরা যাতে পৃথক পৃথকভাবে ধ্বংস করে দিতে না পারে, এ জন্য তিনি মুসলিমবাহিনীকে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেন। ইয়ারমুক প্রান্তরকে ঘাঁটি বানানোর নির্দেশ এ কথা প্রমাণ করে যে, তিনি সমকালের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। অবস্থানগত সুবিধার কথা তাঁর ভালো করেই জানা ছিল। এটা তাঁর সামরিক প্রজ্ঞার বড় এক নিদর্শন। তিনি এই নির্দেশনাও জারি করেছিলেন, 'খালিদ যেন ইরাক থেকে তাঁর বাহিনী নিয়ে শামে পৌঁছে সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।'

তখন শামে এমন এক নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল অনেক বেশি, যার একার মধ্যেই রয়েছে আবু উবায়দার শক্তি ও যোগ্যতা, ইবনুল আসের তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ইকরিমার দক্ষতা এবং ইয়াজিদের এগিয়ে যাওয়ার অদম্য স্পৃহা, যিনি হবেন কুশলী যোদ্ধা ও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। ৪০১

এসব গুণের প্রতি লক্ষ রেখেই আবু বকরের দৃষ্টি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের দিকে নিবদ্ধ হয়। খালিদ রা. খলিফার নির্দেশ কার্যকর করতে বাহিনীসহ সেই বিভীষিকাময় মরুভূমি পাড়ি দিয়ে দ্রুত শামে পৌঁছে যান। সে ছিল ইতিহাসের তাক লাগানো এক বিরল ঘটনা। পেছনে আমরা এর বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে এসেছি।

এদিকে খলিফার পক্ষ থেকেও অব্যাহতভাবে সেনাসহায়তা আসছিল। তাঁর পরিকল্পনাগুলো ছিল বেশ সফল পরিকল্পনা। তিনি শত্রুদের বস্তুগত ও চিন্তাগত সব ধরনের কৌশলের জবাব দিতে থাকেন, যেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল তাদের অবস্থান গুঁড়িয়ে দেওয়া। আবু বকর রা. বলছিলেন, 'আমরা খালিদের মাধ্যমে রোমানবাহিনীকে তাদের শয়তানি পরিকল্পনা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করব।'৪০২

৩. শামে বাহিনী প্রেরণে আবু বকরের সামরিক প্রজ্ঞা
আবু বকরের গৃহীত এ পদক্ষেপ থেকে নিম্নোক্ত বিষয়াবলি সামনে আসে :
* শামের চারটি মুসলিমবাহিনী এক বাহিনীর আকার ধারণ করবে।
* সকল নেতা হবেন খালিদের নেতৃত্বের অধীন।
* সমবেত হওয়ার স্থান নির্ধারণ।

এর দ্বারা এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, আবু বকর রা. সেনাবাহিনী পরিচালনার যোগ্যতা রাখতেন। মদিনা থেকে পাঠানো তাঁর সাহায্যবাহিনী দলবদ্ধভাবে না গিয়ে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাঁরা বর্শা অথবা পাখার রূপ ধারণ করে অগ্রসর হচ্ছিল, যে পদ্ধতিকে আধুনিক পরিভাষায় বিক্ষিপ্ত চলাচল বলা হয়। চূড়ান্ত যুদ্ধের সময় তিনি সবাইকে একত্রিত করেন। এর মাধ্যমে সেনাপরিচালনায় তাঁর দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়; যাকে বর্তমান সামরিক ভাষায় Strategy বা কুশলী সেনাপরিচালনা বলা হয়ে থাকে। ৪০৩

৪. আবু উয়দার প্রতি আবু বকরের চিঠি
আবু বকর রা. খালিদকে ইরাক থেকে শামে গিয়ে সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর নেতৃত্বভার গ্রহণের নির্দেশ প্রদানের পর আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে এ ব্যাপারে অবগত করেন। এর কারণ উল্লেখপূর্বক খালিদের আনুগত্য প্রদর্শনের নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর কাছে চিঠি লেখেন,

শামে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব খালিদের হাতে বুঝিয়ে দিয়েছি। তুমি এর বিরোধিতা না করে আনুগত্য প্রদর্শন করবে। আমি তাঁকে তোমার সেনাপ্রধান নিয়োগ দিয়েছি। যদিও আমি জানি, তুমি তাঁর থেকে শ্রেষ্ঠ। তবে আমি মনে করি, সামরিক জ্ঞানে সে তোমার থেকে এগিয়ে। আল্লাহ তাআলা আমার ও তোমার পক্ষ থেকে দীনের কাজ নিন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

৫. আবু উবায়দার নামে খালিদের চিঠি
এ ছাড়া ইরাক থেকে ইমান ও তাকওয়ার বার্তা নিয়ে আবু উবায়দার নামে খালিদের পক্ষ থেকেও একটা চিঠি এসে পৌঁছায়। চিঠির ভাষ্য ছিল এমন,

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পক্ষ থেকে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের নামে। আমি আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।

হামদ ও সালাতের পর,
আমি আমার ও আপনার জন্য ভয়ের দিনে নিরাপত্তা এবং দুনিয়ার জীবনে পাপ থেকে বেঁচে থাকার প্রার্থনা করছি। আমার কাছে আল্লাহর রাসুলের খলিফার চিঠি এসে পৌঁছেছে। চিঠিতে তিনি আমাকে শামে পৌঁছে সেখানকার সব মুসলিমবাহিনীর দায়িত্বগ্রহণের নির্দেশ পাঠিয়েছেন।

আল্লাহর শপথ, আমি কখনো তাঁর কাছে এমন আবেদন করিনি। এটা আমার আকাঙ্ক্ষাও ছিল না। এ ব্যাপারে আমি তাঁর কাছে কোনো চিঠিও পাঠাইনি। আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন, আপনি আপনার পদে নিয়োজিত থাকবেন। আপনার কোনো নির্দেশ লঙ্ঘন করা হবে না। আপনার কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হবে না। আপনাকে এড়িয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। অবশ্যই আপনি সর্বজনমান্য নেতাদের একজন। আপনার শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। আপনার সিদ্ধান্ত থেকে অমুখাপেক্ষী থাকা যায় না। আমার ও আপনার ওপর আল্লাহ যে অনুগ্রহ করেছেন, তা যেন তিনি পূর্ণতায় পৌঁছান। আমাদের উভয়কে যেন জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।৪০৪

৬. শামের মুজাহিদদের প্রতি খালিদের চিঠি
একইভাবে খালিদ রা. শামে অবস্থানরত মুজাহিদদের নামেও একটা চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি তাঁদের উদ্দেশে বলেন,

হামদ ও সালাতের পর,
যে আল্লাহ ইসলামের মাধ্যমে আমাদের সম্মানিত করেছেন, দীনের মাধ্যমে আমাদের যে আভিজাত্য প্রদান করেছেন, তাঁর নবি মুহাম্মাদ - এর মাধ্যমে যেভাবে আমাদের মর্যাদামণ্ডিত করেছেন, ইমানের মাধ্যমে আমাদের যে সম্মান দান করেছেন, সেই আল্লাহর রহমত আমাদের ওপর অত্যন্ত প্রশস্ত। আমরা তাঁর নিয়ামতের সাগরে ডুবে আছি। আমরা সেই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদের ওপর তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করে দেন। হে আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহর প্রশংসা করুন, তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করুন। তিনি আপনাদের আরও দান করবেন। আল্লাহর কাছেই অনুগ্রহপ্রার্থী হোন, তিনি অনুগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেবেন। আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে জীবন অতিবাহিত করুন। আমার কাছে আল্লাহর রাসুলের খলিফার নির্দেশনামা পৌঁছেছে। এতে তিনি আমাকে আপনাদের পাশে পৌঁছার নির্দেশ দিয়েছেন। মনে করুন, আমার ঘোড়া মুজাহিদদের নিয়ে আপনাদের কাছে পৌঁছে গেছে। অতএব, আল্লাহর ওয়াদার পূর্ণতা এবং উত্তম সাওয়াবপ্রাপ্তির ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যান। আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের ইমানের ওপর হিফাজত রাখুন। আমাদের ও আপনাদের ইসলামের ওপর অটল রাখুন। সকল মুজাহিদকে উত্তম প্রতিদান দিন। ওয়াসসালামু আলাইকুম।

আমর ইবনু তুফায়েল ইবনু আমর আজদি চিঠি দুটি নিয়ে শামে মুসলিমদের কাছে পৌঁছান। তখন মুসলিমরা জাবিয়া প্রান্তরে অবস্থান করছিলেন। চিঠি পড়ে তাদের শোনানো হয়। আবু উবায়দার উদ্দেশে লিখিত চিঠিটাও তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। সেটা পড়ে তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাঁর রাসুলের খলিফার সিদ্ধান্তে বরকত দিন এবং খালিদকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখুন। '৪০৫

৭. খালিদ ও আবু উবায়দার সৌহার্দ্য
দুই মহান সেনাপতির এমন আচরণের মাধ্যমে মূলত ইসলামি ভ্রাতৃত্বের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়, যা একমাত্র নিখাদ তাওহিদের মাধ্যমে অস্তিত্বে এসে মানুষকে উত্তম চরিত্রে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে। এ ছিল সাহাবিদের বিশেষ মর্যাদা। ইরাকে বিপুল বিজয়ও খালিদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারেনি। তাঁর মধ্যে কোনো প্রকার অহমিকা জাগাতে পারেনি; বরং দেখা যাচ্ছে তিনি নিজের ওপর আবু উবায়দার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিচ্ছেন, তাঁর আনুগত্য গ্রহণের স্বীকৃতি দিচ্ছেন।

অপরদিকে দেখা যায়, আবু উবায়দাও খলিফার এই নির্দেশকে বরকতময় আখ্যা দিচ্ছেন। খালিদকে উদার চিত্তে স্বাগত জানাচ্ছেন। এগুলোই প্রমাণ করে যে, খালিদ ও আবু উবায়দারা ছিলেন প্রবৃত্তিপরায়ণতার অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁরা সবসময় জনগণের কল্যাণকেই অগ্রাধিকার দিতেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এর মধ্যে শাসক, যুদ্ধের নেতা, আলিম, দায়ি ও মুবাল্লিগদের জন্য নেতৃত্ব নির্বাচন এবং প্রয়োজনে তাদের পদচ্যুত করার মধ্যে রয়েছে বিশাল শিক্ষা।

টিকাঃ
১৩৯৯. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৪৮।
১৪০০. তারিখুত তাবারি: ৪/২১১।
৪০১. তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম: ৩৫৯-৩৬০।
৪০২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৫।
৪০৩. আল-ফাল্গুল আসকারিয়িল ইসলামি : ৮৯; আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., আল হাদিসি: ৬০।
৪০৪. মাজমুআতুল ওয়াসায়িকিস সিয়াসিয়া: ৩৯২-৩৯৩।
৪০৫. ফুতুহুশ শাম আজদি: ৬৮-৭২- হুমায়দি।
৪০৬. আত-তারিখুল ইসলামি: হুমায়দি: ৯/২৩১।

১. আজনাদায়নযুদ্ধের পটভূমি ও শামের মুসলিমবাহিনীর পক্ষ থেকে খলিফার কাছে চিঠি
শামের মুসলিমবাহিনী রোমানবাহিনীর প্রতিটা পদক্ষেপের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছিল। অবস্থার ভয়াবহতা অনুমান করে জাওলান এলাকায় তারা নেতাদের একটা সভা আহ্বান করে। সভা শেষে আবু উবায়দা অবস্থার ভয়াবহতা জানিয়ে খলিফার কাছে চিঠি লেখেন। সভায় নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়েছিল :
• অধিকৃত এলাকাগুলো আপাতত শূন্য করা হোক।
• রোমানদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করার সুবিধার্থে মুসলিম সেনাদলকে একীভূত করা হোক।
• মুসলিমদের সঙ্গে চূড়ান্ত যুদ্ধে উপনীত হতে তাদের বাধ্য করা হোক।

আমর ইবনুল আস রা. যুদ্ধের জন্য ইয়ারমুক প্রান্তরের নাম প্রস্তাব করেন। এরপর মুসলিমবাহিনী সেখানে একত্রিত হয়। আবু বকরের সিদ্ধান্তও ছিল আমর ইবনুল আসের সিদ্ধান্তের অনুরূপ।

নেতৃবর্গ এই সিদ্ধান্তেও উপনীত হয়েছিলেন যে, আপাতত শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে না জড়িয়ে সবাই ইয়ারমুক প্রান্তরে এসে সমবেত হবেন। সুতরাং হিমস থেকে আবু উবায়দা রা., বালকা (জর্দান) থেকে শুরাহবিল ইবনু হাসানা ও শাম থেকে ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। এদিকে আমর ইবনুল আসও ফিলিস্তিন থেকে ধীরলয়ে প্রত্যাগমন শুরু করেন। কিন্তু রোমানবাহিনী তাঁকে পেছন দিক থেকে তাড়া করছিল, এ কারণে তিনি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের আগমনের আগে ফিরে আসা নিশ্চিত করতে পারেননি। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাঁকে বিরে সাবা নামক স্থানে রোমানদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে হয়। এর ফলেই সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক আজনাদায়নযুদ্ধ।

আবু বকরের কাছে আবু উবায়দার চিঠি পৌঁছলে তিনি নির্দেশ দেন, 'তোমরা ইয়ারমুক প্রান্তরে সমবেত হয়ে অশ্বারোহী বাহিনীকে গ্রাম ও বস্তি এলাকায় ছড়িয়ে দাও। রোমানদের রসদপত্র আসার পথ বন্ধ করে দাও। আমার পরবর্তী নির্দেশ না পৌঁছা পর্যন্ত শহর অবরোধ করবে না। তবে শত্রুরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে শক্তপায়ে লড়াই চালিয়ে যাবে। আমি তোমাদের কাছে আরও অতিরিক্ত সেনা পাঠাচ্ছি।' ১৩৯৯

অন্য এক বর্ণনায় আছে, তিনি বলছিলেন, 'তোমাদের মতো মানুষ সংখ্যাস্বল্পতার কারণে পরাজিত হতে পারে না। ১০ হাজার লোকের একটা বাহিনীও তাদের গুনাহের কারণে পরাজিত হতে পারে। অতএব, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবে। তোমাদের প্রত্যেকেই যেন নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে ইয়ারমুক প্রান্তরে চলে আসে।' আবু বকর রা. বাহিনী চতুষ্টয়কে ইয়ারমুকে পৌঁছে সব বাহিনীকে এক হওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে মুশরিকদের হামলার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া সহজ হয়।' তিনি আরও বলেন, 'তোমরা আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী। যারা তাঁর দীনের সাহায্য করে, তিনি তাদের সাহায্য করেন। যারা দূরে থাকে, আল্লাহও তাদের সঙ্গ ছেড়ে দেন। ১৪০০

২. খালিদকে শামে রওনার নির্দেশ
আবু বকরের নির্দেশের আলোকে আমরা দেখতে পাই, তিনি সবসময় মুসলিমবাহিনীর বিজয় ও আধিপত্যের জন্য আল্লাহর আনুগত্যকেই ভিত্তি মনে করতেন; আর পরাজয় ও লজ্জা গুনাহের প্রতিক্রিয়া মনে করতেন। রোমানরা যাতে পৃথক পৃথকভাবে ধ্বংস করে দিতে না পারে, এ জন্য তিনি মুসলিমবাহিনীকে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেন। ইয়ারমুক প্রান্তরকে ঘাঁটি বানানোর নির্দেশ এ কথা প্রমাণ করে যে, তিনি সমকালের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। অবস্থানগত সুবিধার কথা তাঁর ভালো করেই জানা ছিল। এটা তাঁর সামরিক প্রজ্ঞার বড় এক নিদর্শন। তিনি এই নির্দেশনাও জারি করেছিলেন, 'খালিদ যেন ইরাক থেকে তাঁর বাহিনী নিয়ে শামে পৌঁছে সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।'

তখন শামে এমন এক নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল অনেক বেশি, যার একার মধ্যেই রয়েছে আবু উবায়দার শক্তি ও যোগ্যতা, ইবনুল আসের তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ইকরিমার দক্ষতা এবং ইয়াজিদের এগিয়ে যাওয়ার অদম্য স্পৃহা, যিনি হবেন কুশলী যোদ্ধা ও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। ৪০১

এসব গুণের প্রতি লক্ষ রেখেই আবু বকরের দৃষ্টি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের দিকে নিবদ্ধ হয়। খালিদ রা. খলিফার নির্দেশ কার্যকর করতে বাহিনীসহ সেই বিভীষিকাময় মরুভূমি পাড়ি দিয়ে দ্রুত শামে পৌঁছে যান। সে ছিল ইতিহাসের তাক লাগানো এক বিরল ঘটনা। পেছনে আমরা এর বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে এসেছি।

এদিকে খলিফার পক্ষ থেকেও অব্যাহতভাবে সেনাসহায়তা আসছিল। তাঁর পরিকল্পনাগুলো ছিল বেশ সফল পরিকল্পনা। তিনি শত্রুদের বস্তুগত ও চিন্তাগত সব ধরনের কৌশলের জবাব দিতে থাকেন, যেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল তাদের অবস্থান গুঁড়িয়ে দেওয়া। আবু বকর রা. বলছিলেন, 'আমরা খালিদের মাধ্যমে রোমানবাহিনীকে তাদের শয়তানি পরিকল্পনা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করব।'৪০২

৩. শামে বাহিনী প্রেরণে আবু বকরের সামরিক প্রজ্ঞা
আবু বকরের গৃহীত এ পদক্ষেপ থেকে নিম্নোক্ত বিষয়াবলি সামনে আসে :
* শামের চারটি মুসলিমবাহিনী এক বাহিনীর আকার ধারণ করবে।
* সকল নেতা হবেন খালিদের নেতৃত্বের অধীন।
* সমবেত হওয়ার স্থান নির্ধারণ।

এর দ্বারা এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, আবু বকর রা. সেনাবাহিনী পরিচালনার যোগ্যতা রাখতেন। মদিনা থেকে পাঠানো তাঁর সাহায্যবাহিনী দলবদ্ধভাবে না গিয়ে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাঁরা বর্শা অথবা পাখার রূপ ধারণ করে অগ্রসর হচ্ছিল, যে পদ্ধতিকে আধুনিক পরিভাষায় বিক্ষিপ্ত চলাচল বলা হয়। চূড়ান্ত যুদ্ধের সময় তিনি সবাইকে একত্রিত করেন। এর মাধ্যমে সেনাপরিচালনায় তাঁর দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়; যাকে বর্তমান সামরিক ভাষায় Strategy বা কুশলী সেনাপরিচালনা বলা হয়ে থাকে। ৪০৩

৪. আবু উয়দার প্রতি আবু বকরের চিঠি
আবু বকর রা. খালিদকে ইরাক থেকে শামে গিয়ে সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর নেতৃত্বভার গ্রহণের নির্দেশ প্রদানের পর আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে এ ব্যাপারে অবগত করেন। এর কারণ উল্লেখপূর্বক খালিদের আনুগত্য প্রদর্শনের নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর কাছে চিঠি লেখেন,

শামে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব খালিদের হাতে বুঝিয়ে দিয়েছি। তুমি এর বিরোধিতা না করে আনুগত্য প্রদর্শন করবে। আমি তাঁকে তোমার সেনাপ্রধান নিয়োগ দিয়েছি। যদিও আমি জানি, তুমি তাঁর থেকে শ্রেষ্ঠ। তবে আমি মনে করি, সামরিক জ্ঞানে সে তোমার থেকে এগিয়ে। আল্লাহ তাআলা আমার ও তোমার পক্ষ থেকে দীনের কাজ নিন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

৫. আবু উবায়দার নামে খালিদের চিঠি
এ ছাড়া ইরাক থেকে ইমান ও তাকওয়ার বার্তা নিয়ে আবু উবায়দার নামে খালিদের পক্ষ থেকেও একটা চিঠি এসে পৌঁছায়। চিঠির ভাষ্য ছিল এমন,

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পক্ষ থেকে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের নামে। আমি আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।

হামদ ও সালাতের পর,
আমি আমার ও আপনার জন্য ভয়ের দিনে নিরাপত্তা এবং দুনিয়ার জীবনে পাপ থেকে বেঁচে থাকার প্রার্থনা করছি। আমার কাছে আল্লাহর রাসুলের খলিফার চিঠি এসে পৌঁছেছে। চিঠিতে তিনি আমাকে শামে পৌঁছে সেখানকার সব মুসলিমবাহিনীর দায়িত্বগ্রহণের নির্দেশ পাঠিয়েছেন।

আল্লাহর শপথ, আমি কখনো তাঁর কাছে এমন আবেদন করিনি। এটা আমার আকাঙ্ক্ষাও ছিল না। এ ব্যাপারে আমি তাঁর কাছে কোনো চিঠিও পাঠাইনি। আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন, আপনি আপনার পদে নিয়োজিত থাকবেন। আপনার কোনো নির্দেশ লঙ্ঘন করা হবে না। আপনার কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হবে না। আপনাকে এড়িয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। অবশ্যই আপনি সর্বজনমান্য নেতাদের একজন। আপনার শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। আপনার সিদ্ধান্ত থেকে অমুখাপেক্ষী থাকা যায় না। আমার ও আপনার ওপর আল্লাহ যে অনুগ্রহ করেছেন, তা যেন তিনি পূর্ণতায় পৌঁছান। আমাদের উভয়কে যেন জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।৪০৪

৬. শামের মুজাহিদদের প্রতি খালিদের চিঠি
একইভাবে খালিদ রা. শামে অবস্থানরত মুজাহিদদের নামেও একটা চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি তাঁদের উদ্দেশে বলেন,

হামদ ও সালাতের পর,
যে আল্লাহ ইসলামের মাধ্যমে আমাদের সম্মানিত করেছেন, দীনের মাধ্যমে আমাদের যে আভিজাত্য প্রদান করেছেন, তাঁর নবি মুহাম্মাদ - এর মাধ্যমে যেভাবে আমাদের মর্যাদামণ্ডিত করেছেন, ইমানের মাধ্যমে আমাদের যে সম্মান দান করেছেন, সেই আল্লাহর রহমত আমাদের ওপর অত্যন্ত প্রশস্ত। আমরা তাঁর নিয়ামতের সাগরে ডুবে আছি। আমরা সেই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদের ওপর তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করে দেন। হে আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহর প্রশংসা করুন, তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করুন। তিনি আপনাদের আরও দান করবেন। আল্লাহর কাছেই অনুগ্রহপ্রার্থী হোন, তিনি অনুগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেবেন। আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে জীবন অতিবাহিত করুন। আমার কাছে আল্লাহর রাসুলের খলিফার নির্দেশনামা পৌঁছেছে। এতে তিনি আমাকে আপনাদের পাশে পৌঁছার নির্দেশ দিয়েছেন। মনে করুন, আমার ঘোড়া মুজাহিদদের নিয়ে আপনাদের কাছে পৌঁছে গেছে। অতএব, আল্লাহর ওয়াদার পূর্ণতা এবং উত্তম সাওয়াবপ্রাপ্তির ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যান। আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের ইমানের ওপর হিফাজত রাখুন। আমাদের ও আপনাদের ইসলামের ওপর অটল রাখুন। সকল মুজাহিদকে উত্তম প্রতিদান দিন। ওয়াসসালামু আলাইকুম।

আমর ইবনু তুফায়েল ইবনু আমর আজদি চিঠি দুটি নিয়ে শামে মুসলিমদের কাছে পৌঁছান। তখন মুসলিমরা জাবিয়া প্রান্তরে অবস্থান করছিলেন। চিঠি পড়ে তাদের শোনানো হয়। আবু উবায়দার উদ্দেশে লিখিত চিঠিটাও তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। সেটা পড়ে তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাঁর রাসুলের খলিফার সিদ্ধান্তে বরকত দিন এবং খালিদকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখুন। '৪০৫

৭. খালিদ ও আবু উবায়দার সৌহার্দ্য
দুই মহান সেনাপতির এমন আচরণের মাধ্যমে মূলত ইসলামি ভ্রাতৃত্বের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়, যা একমাত্র নিখাদ তাওহিদের মাধ্যমে অস্তিত্বে এসে মানুষকে উত্তম চরিত্রে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে। এ ছিল সাহাবিদের বিশেষ মর্যাদা। ইরাকে বিপুল বিজয়ও খালিদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারেনি। তাঁর মধ্যে কোনো প্রকার অহমিকা জাগাতে পারেনি; বরং দেখা যাচ্ছে তিনি নিজের ওপর আবু উবায়দার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিচ্ছেন, তাঁর আনুগত্য গ্রহণের স্বীকৃতি দিচ্ছেন।

অপরদিকে দেখা যায়, আবু উবায়দাও খলিফার এই নির্দেশকে বরকতময় আখ্যা দিচ্ছেন। খালিদকে উদার চিত্তে স্বাগত জানাচ্ছেন। এগুলোই প্রমাণ করে যে, খালিদ ও আবু উবায়দারা ছিলেন প্রবৃত্তিপরায়ণতার অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁরা সবসময় জনগণের কল্যাণকেই অগ্রাধিকার দিতেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এর মধ্যে শাসক, যুদ্ধের নেতা, আলিম, দায়ি ও মুবাল্লিগদের জন্য নেতৃত্ব নির্বাচন এবং প্রয়োজনে তাদের পদচ্যুত করার মধ্যে রয়েছে বিশাল শিক্ষা।

টিকাঃ
১৩৯৯. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৪৮।
১৪০০. তারিখুত তাবারি: ৪/২১১।
৪০১. তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম: ৩৫৯-৩৬০।
৪০২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৫।
৪০৩. আল-ফাল্গুল আসকারিয়িল ইসলামি : ৮৯; আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., আল হাদিসি: ৬০।
৪০৪. মাজমুআতুল ওয়াসায়িকিস সিয়াসিয়া: ৩৯২-৩৯৩।
৪০৫. ফুতুহুশ শাম আজদি: ৬৮-৭২- হুমায়দি।
৪০৬. আত-তারিখুল ইসলামি: হুমায়দি: ৯/২৩১।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 আজনাদায়নযুদ্ধ

📄 আজনাদায়নযুদ্ধ


খালিদ রা. শামে পৌঁছেই বসরা জয় করেন। এরপর তিনি মুসলিম সেনাপতিত্রয় তথা আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, শুরাহবিল ইবনু হাসানা এবং ইয়াজিদ আবি সুফিয়ানের সঙ্গে মিলিত হন। সেখানে পৌঁছেই সামরিক অবস্থা পর্যালোচনা করেন। তাঁদের থেকে সূক্ষ্ম বিষয়াদি সম্পর্কে অবহিত হন। এ ছাড়া আমর ইবনুল আসের অবস্থান সম্পর্কেও জেনে নেন, যিনি তখন সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর কাছে দ্রুত পৌঁছার জন্য জর্দান নদীর তীরবর্তী রোমানবাহিনীর মোকাবিলা এড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন; কিন্তু শত্রুবাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতিসহ তাঁকে ধাওয়া করে চলছিল বিধায় তাঁর পৌঁছতে দেরি হচ্ছিল। তারা তাঁকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করছিল।

তবে আমর রা. ছিলেন এ ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন। তিনি ভালো করেই জানতেন, এমতাবস্থায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া হবে সম্পূর্ণ বোকামি। কারণ, তাঁর বাহিনীর সংখ্যা মাত্র ৭ হাজারের মতো; অথচ রোমানবাহিনী ছিল এর কয়েকগুণ বেশি। খালিদ রা. সেখানে পৌঁছে সামরিক বিষয়াদি পর্যবেক্ষণের পর এ সিদ্ধান্তে যান যে, এখন তাঁর সামনে দুটি বিষয় রয়েছে :

১. হয় তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে আমর ইবনুল আসের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হবেন। এরপর রোমানবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাদের ধ্বংস করে ফিলিস্তিনে তাঁর অবস্থান মজবুত করবেন।

২. নিজ অবস্থানে থেকে আমর ইবনুল আসকে তাঁর সঙ্গে এসে মিলিত হওয়ার কথা বলবেন। আর রোমানদের সেই বাহিনীর অপেক্ষায় বসে থাকবেন, যারা শাম থেকে ইতিমধ্যে রওনা হয়ে গেছে। তারা চলে এলে পরে চূড়ান্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন।

খালিদ রা. প্রথম বিষয়টা অগ্রাধিকার দেন। এর অন্যতম কারণ ছিল, তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, ফিলিস্তিন অধিকার করতে পারলে প্রয়োজনে মুসলিমদের পিছু হটার পথ উন্মুক্ত থাকবে। তাদের কেন্দ্রগুলোও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ থাকবে। এমতাবস্থায় তাঁরা রোমানদের যেকোনো সময় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবেন। শত্রুরাও পেছন থেকে মুসলিমবাহিনীর ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকবে। কারণ, তখন তাঁর বাহিনীর একাংশ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে এবং একাংশ তাঁদের নিরাপত্তা জুগিয়ে যেতে পারবে।

সুতরাং খালিদ রা. সেনাদের নিয়ে ফিলিস্তিন অভিমুখে রওনা দেন এবং আমর ইবনুল আসকে চিঠি পাঠিয়ে বলেন, তিনি যেন রোমানবাহিনীকে ধোঁকায় ফেলে তাঁর বাহিনীর কাছে নিয়ে আসেন। এরপর সবাই মিলে একসঙ্গে তাদের ওপর হামলা করবেন। খালিদের নির্দেশ পেয়ে আমর ইবনুল আস আজনাদায়নে এসে পৌঁছান। ৪০৭

১. খালিদ ও আমরের সামরিক প্রজ্ঞা
আমর ইবনুল আসের বাহিনী যখন খালিদের বাহিনীর কাছে এসে পৌঁছায়, তখন মুসলিমবাহিনীর সেনাসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩০ হাজারে। খালিদ তাঁর বাহিনী নিয়ে উপযুক্ত সময়েই ময়দানে হাজির হন। একপর্যায়ে রোমানদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে খালিদ ও আমরের সামরিক প্রজ্ঞা বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাঁরা ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিশেষজ্ঞ বাহাদুরদের সমন্বয়ে আলাদা একটা ইউনিট গঠন করে রাখেন। তাঁরা যুদ্ধের একপর্যায়ে শত্রুবাহিনীর ব্যূহ পর্যুদস্ত করে রোমান-জেনারেলের কাছাকাছি পৌঁছে তাদের নিঃশেষ করে ফেলেন। জেনারেলের মৃত্যুর পরপরই রোমানবাহিনী দিগ্বিদিক পালিয়ে যেতে থাকে।

শামের আজনাদায়ন প্রান্তরের লড়াই ছিল মুসলিম ও রোমানদের মধ্যকার প্রথম বৃহৎ লড়াই। যখন হিমসে অবস্থানরত রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে তার বিশাল বাহিনীর পর্যুদস্ত হওয়ার সংবাদ পৌঁছায়, তখন সে অবস্থার ভয়াবহতা ভালো করেই অনুধাবন করতে পারে। ৪০৮

২. খালিদ কর্তৃক খলিফার কাছে আজনাদায়ন বিজয়ের সংবাদ
এদিকে খালিদ মদিনায় অবস্থানরত খলিফা আবু বকরকে আজনাদায়নের বিজয়ের সংবাদ পাঠিয়ে বলেন,

আল্লাহর রাসুলের খলিফা বরাবরে আল্লাহর তরবারি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পক্ষ থেকে। আমি সেই মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।

হামদ ও সালাতের পর,
আল্লাহর রাসুলের খলিফা, আমি আপনাকে সংবাদ দিচ্ছি, আমরা শত্রুর মোকাবিলায় নেমেছিলাম। তারা আজনাদায়ন প্রান্তরে আমাদের বিরুদ্ধে বিশাল একটা বাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়েছিল। তারা তাদের ক্রুশ উত্তোলন করেছিল। তাদের কিতাব মেলে ধরেছিল। তারা শপথ করে বলেছিল, আমাদের ধ্বংস করে ছাড়বে অথবা তাদের দেশ থেকে আমাদের বের করে স্বস্তির নিশ্বাস নেবে; কোনো অবস্থায়ই তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাবে না। এদিকে তখন আমরাও আল্লাহর ওপর নির্ভর করে দৃঢ়পায়ে তাদের মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে যাই। বর্শা দ্বারা তাদের ওপর হামলে পড়ি। এরপর তরবারি ধারণ করে এগিয়ে যাই। প্রতিটা উপত্যকা, মাঠ ও পথে আমরা তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ি। আমি আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি তাঁর দীনকে বিজয়ী করেছেন। শত্রুবাহিনীকে লাঞ্ছিত-অপদস্থ করেছেন। তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেছেন।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

আবু বকর রা. চিঠি পেয়ে অত্যন্ত প্রীত হন এবং বলেন, 'যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি মুসলিমদের বিজয়ী করেছেন এবং আমার চক্ষু শীতল করে দিয়েছেন। '৪০৯

টিকাঃ
৪০৭. 'আজনাদায়ন' ফিলিস্তিনের পাশেরই একটি এলাকা। আল-মুজাম, ইয়াকুত হামাবি: ১/২০৩।
৪০৮. আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., নাজার আল হাদিসি: ৭০-৭১।
৪০৯. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ৮৪-৯৩।

খালিদ রা. শামে পৌঁছেই বসরা জয় করেন। এরপর তিনি মুসলিম সেনাপতিত্রয় তথা আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, শুরাহবিল ইবনু হাসানা এবং ইয়াজিদ আবি সুফিয়ানের সঙ্গে মিলিত হন। সেখানে পৌঁছেই সামরিক অবস্থা পর্যালোচনা করেন। তাঁদের থেকে সূক্ষ্ম বিষয়াদি সম্পর্কে অবহিত হন। এ ছাড়া আমর ইবনুল আসের অবস্থান সম্পর্কেও জেনে নেন, যিনি তখন সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর কাছে দ্রুত পৌঁছার জন্য জর্দান নদীর তীরবর্তী রোমানবাহিনীর মোকাবিলা এড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন; কিন্তু শত্রুবাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতিসহ তাঁকে ধাওয়া করে চলছিল বিধায় তাঁর পৌঁছতে দেরি হচ্ছিল। তারা তাঁকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করছিল।

তবে আমর রা. ছিলেন এ ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন। তিনি ভালো করেই জানতেন, এমতাবস্থায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া হবে সম্পূর্ণ বোকামি। কারণ, তাঁর বাহিনীর সংখ্যা মাত্র ৭ হাজারের মতো; অথচ রোমানবাহিনী ছিল এর কয়েকগুণ বেশি। খালিদ রা. সেখানে পৌঁছে সামরিক বিষয়াদি পর্যবেক্ষণের পর এ সিদ্ধান্তে যান যে, এখন তাঁর সামনে দুটি বিষয় রয়েছে :

১. হয় তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে আমর ইবনুল আসের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হবেন। এরপর রোমানবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাদের ধ্বংস করে ফিলিস্তিনে তাঁর অবস্থান মজবুত করবেন।

২. নিজ অবস্থানে থেকে আমর ইবনুল আসকে তাঁর সঙ্গে এসে মিলিত হওয়ার কথা বলবেন। আর রোমানদের সেই বাহিনীর অপেক্ষায় বসে থাকবেন, যারা শাম থেকে ইতিমধ্যে রওনা হয়ে গেছে। তারা চলে এলে পরে চূড়ান্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন।

খালিদ রা. প্রথম বিষয়টা অগ্রাধিকার দেন। এর অন্যতম কারণ ছিল, তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, ফিলিস্তিন অধিকার করতে পারলে প্রয়োজনে মুসলিমদের পিছু হটার পথ উন্মুক্ত থাকবে। তাদের কেন্দ্রগুলোও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ থাকবে। এমতাবস্থায় তাঁরা রোমানদের যেকোনো সময় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবেন। শত্রুরাও পেছন থেকে মুসলিমবাহিনীর ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকবে। কারণ, তখন তাঁর বাহিনীর একাংশ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে এবং একাংশ তাঁদের নিরাপত্তা জুগিয়ে যেতে পারবে।

সুতরাং খালিদ রা. সেনাদের নিয়ে ফিলিস্তিন অভিমুখে রওনা দেন এবং আমর ইবনুল আসকে চিঠি পাঠিয়ে বলেন, তিনি যেন রোমানবাহিনীকে ধোঁকায় ফেলে তাঁর বাহিনীর কাছে নিয়ে আসেন। এরপর সবাই মিলে একসঙ্গে তাদের ওপর হামলা করবেন। খালিদের নির্দেশ পেয়ে আমর ইবনুল আস আজনাদায়নে এসে পৌঁছান। ৪০৭

১. খালিদ ও আমরের সামরিক প্রজ্ঞা
আমর ইবনুল আসের বাহিনী যখন খালিদের বাহিনীর কাছে এসে পৌঁছায়, তখন মুসলিমবাহিনীর সেনাসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩০ হাজারে। খালিদ তাঁর বাহিনী নিয়ে উপযুক্ত সময়েই ময়দানে হাজির হন। একপর্যায়ে রোমানদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে খালিদ ও আমরের সামরিক প্রজ্ঞা বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাঁরা ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিশেষজ্ঞ বাহাদুরদের সমন্বয়ে আলাদা একটা ইউনিট গঠন করে রাখেন। তাঁরা যুদ্ধের একপর্যায়ে শত্রুবাহিনীর ব্যূহ পর্যুদস্ত করে রোমান-জেনারেলের কাছাকাছি পৌঁছে তাদের নিঃশেষ করে ফেলেন। জেনারেলের মৃত্যুর পরপরই রোমানবাহিনী দিগ্বিদিক পালিয়ে যেতে থাকে।

শামের আজনাদায়ন প্রান্তরের লড়াই ছিল মুসলিম ও রোমানদের মধ্যকার প্রথম বৃহৎ লড়াই। যখন হিমসে অবস্থানরত রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে তার বিশাল বাহিনীর পর্যুদস্ত হওয়ার সংবাদ পৌঁছায়, তখন সে অবস্থার ভয়াবহতা ভালো করেই অনুধাবন করতে পারে। ৪০৮

২. খালিদ কর্তৃক খলিফার কাছে আজনাদায়ন বিজয়ের সংবাদ
এদিকে খালিদ মদিনায় অবস্থানরত খলিফা আবু বকরকে আজনাদায়নের বিজয়ের সংবাদ পাঠিয়ে বলেন,

আল্লাহর রাসুলের খলিফা বরাবরে আল্লাহর তরবারি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পক্ষ থেকে। আমি সেই মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।

হামদ ও সালাতের পর,
আল্লাহর রাসুলের খলিফা, আমি আপনাকে সংবাদ দিচ্ছি, আমরা শত্রুর মোকাবিলায় নেমেছিলাম। তারা আজনাদায়ন প্রান্তরে আমাদের বিরুদ্ধে বিশাল একটা বাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়েছিল। তারা তাদের ক্রুশ উত্তোলন করেছিল। তাদের কিতাব মেলে ধরেছিল। তারা শপথ করে বলেছিল, আমাদের ধ্বংস করে ছাড়বে অথবা তাদের দেশ থেকে আমাদের বের করে স্বস্তির নিশ্বাস নেবে; কোনো অবস্থায়ই তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাবে না। এদিকে তখন আমরাও আল্লাহর ওপর নির্ভর করে দৃঢ়পায়ে তাদের মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে যাই। বর্শা দ্বারা তাদের ওপর হামলে পড়ি। এরপর তরবারি ধারণ করে এগিয়ে যাই। প্রতিটা উপত্যকা, মাঠ ও পথে আমরা তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ি। আমি আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি তাঁর দীনকে বিজয়ী করেছেন। শত্রুবাহিনীকে লাঞ্ছিত-অপদস্থ করেছেন। তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেছেন।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

আবু বকর রা. চিঠি পেয়ে অত্যন্ত প্রীত হন এবং বলেন, 'যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি মুসলিমদের বিজয়ী করেছেন এবং আমার চক্ষু শীতল করে দিয়েছেন। '৪০৯

টিকাঃ
৪০৭. 'আজনাদায়ন' ফিলিস্তিনের পাশেরই একটি এলাকা। আল-মুজাম, ইয়াকুত হামাবি: ১/২০৩।
৪০৮. আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., নাজার আল হাদিসি: ৭০-৭১।
৪০৯. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ৮৪-৯৩।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 ইয়ারমুকের যুদ্ধ

📄 ইয়ারমুকের যুদ্ধ


আজনাদায়ন প্রান্তরে রোমানরা লজ্জাজনক পরাজয়ের শিকার হয়। মুসলিমরা বিশাল বিজয় অর্জনের পর তাদের সেনাদল নিয়ে ফিরে আসেন। তারা অনেকটা প্রশান্ত চিত্তে খলিফার নির্দেশমতো ইয়ারমুক প্রান্তরে কাজে লেগে যান। এদিকে রোমানবাহিনী তাদের জেনারেল থিয়োডরের নেতৃত্বে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারাও একটা বিশাল প্রশস্ত মাঠে এসে শিবির স্থাপন করে, যেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা ছিল সংকীর্ণ। তারা ইয়ারমুকের একেবারে পাশে ওয়াকুসা নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেছিল।

১. উভয় বাহিনীর সেনাসংখ্যা
• মুসলিমবাহিনী : খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বাধীন মুসলিমবাহিনীর সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার। কোনো কোনো বর্ণনামতে তাঁদের সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার。
• রোমানবাহিনী : থিয়োডরের নেতৃত্বে রোমানবাহিনীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার।

২. যুদ্ধের আগে
মুসলিমরা খালিদের নেতৃত্বে ইয়ারমুক পৌঁছে সেখানে শিবির স্থাপন করেন; আর রোমানরা নদীর দক্ষিণ তীরে তাদের সেনাসমাবেশ ঘটায়। এই অবস্থায় আমর ইবনুল আস মুসলিমবাহিনীকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘মুসলিমরা, সুসংবাদ নাও। আল্লাহর শপথ, রোমানরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে; আর অবরুদ্ধরা খুব কম ক্ষেত্রেই বিজয় অর্জন করতে পারে।’৪১০ খালিদ রা. এই যুদ্ধে সম্পূর্ণ নতুন কৌশলে সেনাব্যূহ রচনা করেন, যা ইতিপূর্বে আরবদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত।৪১১

• ফিরকা (ছোট বাহিনী) : এটা ১০ থেকে ২০ কুরদুস পর্যন্ত হয়ে থাকত। এর একজন আলাদা অধিনায়ক থাকতেন।
• কুরদুস : ১ হাজার সেনার একটা ইউনিট, যার একজন পৃথক নেতা থাকত।৪১২
খালিদ রা. এই প্রক্রিয়ায় বাহিনীকে ৪০ সারিতে বিন্যস্ত করেন।
• কালব (মধ্যবাহিনী) : এটা ছিল ১৮ কুরদুসের সমন্বয়ে ঘটিত। এর নেতৃত্ব ছিল আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের হাতে। তাঁর সহযোগিতায় ছিলেন ইকরিমা ইবনু আবি জাহল ও কা'কা ইবনু আমর রা.।
• মায়মানা (ডান বাহু) : এটা ছিল ১০ কুরদুসের সমন্বয়ে ঘটিত। এর নেতৃত্বভার ছিল আমর ইবনুল আসের কাঁধে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন শুরাহবিল ইবনু হাসানা রা.।
• মায়সারা (বাম বাহু) : এটাও ছিল ১০ কুরদুস বিশিষ্ট। এর নেতৃত্বে ছিলেন ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান রা.।
• তালিয়া (অগ্রবর্তী বাহিনী): এরা ছিল অশ্বারোহীদের দ্বারা গঠিত নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী। এদের দায়িত্ব ছিল মুসলিমবাহিনীর দেখাশোনা ও শত্রুবাহিনীর ওপর কড়া দৃষ্টি রাখা। তাই এদের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম。
• সাকা (পশ্চাদ্‌দ্বাহিনী) : এই বাহিনী ছিল ৫ কুরদুস তথা ৫ হাজার যোদ্ধার সমন্বয়ে ঘটিত। এর নেতৃত্বে ছিলেন সায়িদ ইবনু জায়েদ রা.। এই বাহিনীর দায়িত্ব ছিল সাধারণত প্রশাসনিক দিকগুলোর ওপর নজর রাখা। এর কাজি ছিলেন আবুদ দারদা রা.; আর খাবার-পানি, গনিমত একত্রিত করাসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা.। মিকদাদ ইবনু আসওয়াদ রা. ছিলেন কারির ভূমিকায়। তিনি সেনাবাহিনীর সামনে জিহাদ-সংক্রান্ত আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতেন, যাতে মুজাহিদদের মধ্যে আধ্যাত্মিক শক্তির স্ফুরণ ঘটে। সেনাবাহিনীর বক্তা হিসেবে নিযুক্ত হন আবু সুফিয়ান ইবনু হারব রা.। তিনি প্রত্যেক সারিতে গিয়ে সেনাবাহিনীকে উদ্দীপ্ত করতেন। ৪১৩ আর সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. বড় বড় সাহাবিকে নিয়ে সেনাবাহিনীর ঠিক মধ্যখানে অবস্থান করছিলেন।

মুসলিমবাহিনী খালিদের নেতৃত্বে তাঁদের প্রস্তুতি সেরে নিয়েছিল। প্রত্যেক নেতা নিজ নিজ সেনাদলের সামনে উপস্থিত হয়ে জিহাদের ব্যাপারে তাদের উৎসাহিত করতে থাকেন। মুসলিমবাহিনীর নেতারা জানতেন, এই যুদ্ধ এক বিশাল প্রতিফল বহন করতে যাচ্ছে। এটা হবে ইতিহাসের মোড় নির্ধারণী এক যুদ্ধ। রোমানবাহিনীও মনে করছিল, 'এই যুদ্ধের পরাজয় হবে পুরো শাম অঞ্চলের পরাজয়। যদি আমরা যুদ্ধে হেরে যাই, তাহলে শামের সব দরজা মুসলিমদের জন্য খুলে যাবে। তাদের সামনে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তখন তাদের জন্য এশিয়া-ইউরোপ বিজয় একেবারে সহজ হয়ে যাবে।'৪১৪

৩. ইমানি প্রস্তুতি
ইমান ও কুফরের বাহিনী যখন পরস্পর মুখোমুখি হয়, তখন একে অন্যকে দ্বৈরথের আহ্বান জানায়। এমতাবস্থায় আবু উবায়দা রা. মুসলিমদের উপদেশ দিয়ে বলছিলেন, 'আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহর দীনের সাহায্য করো। আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন। মুসলিমরা, ধৈর্যসহকারে কাজ করো। ধৈর্য হচ্ছে কুফর থেকে মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। লজ্জা পরাজয় ও বিনাশের কারণ। নিজেদের সারি থেকে পিছু হটবে না। আগে বেড়ে শত্রুর ওপর হামলা করবে না। বর্শাগুলো সঠিক আঙ্গিকে ধরে রেখে ঢাল দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে। নীরবতা অবলম্বন করবে। মনে মনে আল্লাহর জিকির করতে থাকবে। আমি নির্দেশ দেওয়ার পরই তোমরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে।'

এরপর সাহাবি মুআজ ইবনু জাবাল রা. লোকজনকে উপদেশস্বরূপ বলেন, 'কুরআনধারী মুসলিমরা, আল্লাহর কিতাবের হিফাজতকারীরা, হিদায়াতের সাহায্যকারীরা, হকের পতাকাবাহীরা, আল্লাহর রহমত ও জান্নাত কেবল আশা-আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হয় না, আল্লাহ তাঁর সুমহান রহমত ও সাহায্য কেবল সত্যবাদীদেরই দান করে থাকেন। তোমরা কি আল্লাহর ঘোষণা শোনোনি-"তোমাদের যারা ইমান আনে এবং সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন; তিনি অবশ্যই তাদের প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেভাবে প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদের।” [সুরা নূর: ৫৫]

আল্লাহ তোমাদের ওপর রহম করুন। তোমাদের তিনি পলায়নকারী হিসেবে দেখছেন, এ থেকে লজ্জা অনুভব করো। তিনি ছাড়া তোমাদের সম্মান ও বিজয়দানকারী কেউ নেই।'

সাহাবি আমর ইবনুল আস রা. বলছিলেন, 'মুসলিমরা, দৃষ্টি অবনত রাখবে। হাঁটু গেড়ে বসে থাকবে। বর্শাগুলো সোজা রাখবে। শত্রুরা যখন হামলা চালাবে, তাদের একটু ছাড় দেবে, যতক্ষণ-না তারা তোমাদের বর্শার পাল্লায় এসে পৌঁছায়। এরপর বাঘের মতো তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। শপথ সেই সত্তার, যিনি সত্যকে ভালোবাসেন, যিনি প্রতিদান দেন, যিনি মিথ্যাকে অপছন্দ করেন এবং মিথ্যার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছেন, যিনি ভালোর প্রতিদান ভালো দিয়েই করেন। আমি শুনেছি, মুসলিমরা অচিরেই একের পর এক বস্তি, একের পর এক মহল্লা জয় করবে। অতএব, ওদের সেনাধিক্য দেখে ভয় করেবে না। তোমরা যদি দৃঢ়পদে যুদ্ধ করো, তাহলে ওরা পাখির মতো উড়ে যাবে।'

সাহাবি আবু সুফিয়ান রা. বলছিলেন, 'মুসলিমরা, এ মুহূর্তে তোমরা পরিবার-পরিজন এবং আমিরুল মুমিনিনের পক্ষ থেকে পাঠানো সাহায্যবাহিনী থেকে দূরে অবস্থান করছ। আল্লাহর শপথ, তোমরা এমন এক বাহিনীর মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে আছ, যাদের সংখ্যা তোমাদের থেকে অনেক বেশি। যারা অত্যন্ত কঠিন প্রতিপক্ষ। তারা আছে নিজেদের সন্তানাদি এবং মালসামানার পাশে, নিজেদের দেশে। আল্লাহ তোমাদের তখনই সাহায্য করবেন, যখন তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট হবেন। যখন তোমরা কঠিন অবস্থায় ধৈর্যধারণ করবে, নিজেদের তরবারি দ্বারা নিজেদের হিফাজত করবে, একে অন্যকে সাহায্য করবে- এটাই তোমাদের জন্য মুক্তির মাধ্যম হতে পারে।'

এরপর তিনি মহিলাদের কাছে যান। তাদেরও যথাযথ উপদেশ দিয়ে বলেন, ৪১৫ 'মুসলিমরা, সেই জিনিস এসে গেছে, যা তোমরা প্রত্যক্ষ করছ। শোনো, এই তো তোমাদের সামনে নবিজি ও জান্নাত। তোমাদের সামনে রয়েছে শয়তান ও জাহান্নাম।' এরপর তিনি নিজের জায়গায় ফিরে যান। ৪১৬

সেই মুহূর্তে আবু হুরায়রা রা. লোকজনকে উপদেশস্বরূপ বলছিলেন, 'হে লোকজন, আয়াতলোচনা হুর ও জান্নাতের দিকে এগিয়ে চলো। তোমরা আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছ, সেই জায়গাই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান। সাবধান, ধৈর্যধারণকারীদের জন্যই রয়েছে সবচেয়ে উঁচু অবস্থান।'

ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান প্রতিটা কুরদুসে গিয়ে বলতেন, 'আল্লাহ, আল্লাহ, তোমরা আরবদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধকারী এবং ইসলামের সহায়তাকারী। তোমাদের শত্রুরা রোমের নিরাপত্তারক্ষী এবং শিরকের সাহায্যকারী। হে আল্লাহ, এটা তোমার দীন। আল্লাহ, তোমার বান্দাদের ওপর সাহায্য অবতরণ করো। ১৪১৭

আরবের এক খ্রিষ্টান খালিদ রা.-কে লক্ষ করে বলে, 'রোমানরা সংখ্যায় কতই-না বেশি এবং মুসলিমরা কতই-না কম!' উত্তরে খালিদ বলেন, 'তোমার ধ্বংস হোক, তুমি কি আমাকে রোমানদের সংখ্যাধিক্যের ভয় দেখাচ্ছ? আমাদের কাছে জনসংখ্যার কোনো মূল্য নেই। মূল লক্ষ্য তো হলো শত্রুকে পরাজয় ও লজ্জা উপহার দেওয়া এবং আল্লাহর বিজয় ও সাহায্য অর্জন করা। আল্লাহর শপথ, আমার তো মন চাইছে, আজ যদি আমার আশকার *১৮ সুস্থ থাকত আর শত্রুবাহিনী দ্বিগুণের চেয়ে বেশি হতো।'

মুআজ ইবনু জাবাল পাদরি ও যাজকদের আওয়াজ শুনলে বলে ওঠেন, 'আল্লাহ, শত্রুর পা টলিয়ে দিন। তাদের অন্তরগুলো সন্ত্রস্ত করে দিন। আমাদের ওপর প্রশান্তি বর্ষণ করুন। তাওহিদের ওপর আমাদের স্থির রাখুন। জিহাদ প্রিয়তম বৃত্তি বানিয়ে দিন এবং আপনার সিদ্ধান্তে আমাদের সন্তুষ্ট করে তুলুন। '৪১৯

সাত. রোম
রোমানরা তাদের অহংকার ও দৌরাত্ম্য নিয়ে কালো বাদলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে মাঠের ওপর ছেয়ে যায় এবং ভীষণ চ্যাঁচামেচি শুরু করে। পাদরি ও যাজকরা ইনজিল পাঠ করে তাদের সেনাদের উদ্দীপ্ত করে তুলছিল। ৪২০ তারা ইয়ারমুকের পাশে ওয়াকুসা নামক স্থানে জমায়েত হয়; কিন্তু উপত্যকাটা তাদের জন্য পরিখা হয়ে ওঠে。

রোমানরাও কুশলী সেনাবিন্যাস করে। তারা দুটি লাইনে সেনাবিন্যাস করে প্রতি পাঁচজনকে বৃত্তাকারে রাখে। মধ্যখানে ছিল যথেষ্ট ফাঁকা। দ্বিতীয় সারি ছিল প্রথম সারি থেকে পেছনের দিকে। এ ছাড়া যুদ্ধে তারা যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করে :
১. তিরন্দাজদের সম্মুখভাগে রেখেছিল। তাদের দায়িত্ব ছিল তির ছুড়ে যুদ্ধের সূচনা করেই ডান, বাম ও পেছনে চলে যাওয়া।
২. ডান ও বাম বাহুতে ছিল অশ্বারোহী বাহিনী। এদের দায়িত্ব ছিল তিরন্দাজরা পেছনে সরে যাওয়া পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা ও সহায়তা প্রদান।
৩. কুরদুস, (পদাতিক) এদের দায়িত্ব ছিল আক্রমণ জোরদার করে তোলা।
৪. সম্মুখসারিতে ছিল জেনারেল জারজাহ; আর ডান বাহুর সেনাপতি ছিল দারকিস। ৪২১

১. যুদ্ধপূর্ব সংলাপ
উভয় বাহিনী একে অন্যের পাশে পৌঁছে গেলে মুসলিমবাহিনী থেকে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ ও ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান রোমানদের দিকে এগিয়ে যান। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন জিরার ইবনুল আজওয়ার ও হারিস ইবনু হিশাম। তাঁরা বলছিলেন, 'আমরা তোমাদের নেতার সঙ্গে কথা বলতে চাই।' থিয়োডরের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাতের অনুমতি প্রদান করা হয়। সে তখন একটা রেশমি তাঁবুতে বসা ছিল। সাহাবিরা বলেন, 'আমরা এমন তাঁবুতে বসা বৈধ মনে করি না।' সে রেশমের গালিচা বিছিয়ে দেয়। তাঁরা তাতে বসতে অস্বীকার করে নিজেদের পছন্দমতো জায়গা দেখে বসে পড়েন। সন্ধি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়; কিন্তু সে আলোচনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ফলে তাঁরা আল্লাহর দীনের দিকে তাদের আহ্বান জানিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন।'

ওয়ালিদ ইবনু মুসলিম বর্ণনা করেন; বাহান খালিদের কাছে প্রস্তাব দেয়— 'এসো, আমরা উভয় বাহিনীর মধ্যখানে বসে সন্ধি নিয়ে আলোচনা করি।' খালিদ বেরিয়ে এলে বাহান তাঁকে বলে, 'জানি, নানাবিধ কষ্ট ও ক্ষুধা দেশ থেকে তোমাদের বেরিয়ে পড়তে বাধ্য করেছে! এসো, আমরা তোমাদের প্রত্যেকের হাতে ১০টা করে দিনার, পোশাক ও খাদ্যদ্রব্য ধরিয়ে দিই; আর তোমরা নিজের দেশে চলে যাও! চাইলে পরবর্তী বছরও তোমাদের এই পরিমাণ সাহায্য পাঠিয়ে দেওয়া হবে।' খালিদ বলেন, 'তুমি যা ভাবছ, ব্যাপার আসলে তা নয়। এখানে আসার কারণ হচ্ছে, আমরা মূলত রক্তপিপাসু জাতি। জানতে পেরেছি, রোমানদের রক্ত নাকি খুব সুস্বাদু। এ জন্যই আমরা এখানে ছুটে এসেছি।' খালিদের জবাব শুনে বাহানের সঙ্গীরা বলে ওঠে, 'আরবদের ব্যাপারে আমরা এমনটাই শুনে এসেছি।'

২. যুদ্ধের সূচনা
যুদ্ধপ্রস্তুতি সম্পন্নের পর খালিদ রা. মধ্যসারির উভয় বাহুতে নিযুক্ত ইকরিমা ও কা'কার দিকে এগিয়ে এসে তাঁদের আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দেন। তাঁরা উভয়ে তখন রণসংগীত গেয়ে গেয়ে এগোচ্ছিলেন। মধ্যমাঠে পৌঁছেই তাঁরা দ্বৈতযুদ্ধের আহ্বান জানান। রোমান বাহাদুররা বেরিয়ে আসে। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। খালিদ রা. তাঁর কুরদুস (১ হাজার সেনার বাহিনী) নিয়ে সেনাসারির মধ্যভাগে চলে আসেন। মুজাহিদরা তাঁর সামনে অবস্থান নিয়ে শত্রুর ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিলেন; আর তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যথাযথ নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। ৪২২

৩. রণাঙ্গনে রোমান সেনাপতি জারজাহর ইসলামগ্রহণ
রোমানবাহিনীর বড় সেনাপতি জারজাহ বেরিয়ে এসে খালিদকে ডাক দেয়। তিনি তার পাশেই চলে যান। এতটাই কাছে যান, উভয়ের ঘোড়ার ঘাড় পরস্পর মিলে যায়। জারজাহ তাঁকে বলে, 'খালিদ, আমি আপনাকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করব, আপনি কি আমাকে সঠিক তথ্য দেবেন? দয়া করে মিথ্যা বলবেন না, মিথ্যা বলা একজন স্বাধীন মানুষের জন্য লজ্জার বিষয়। এ ছাড়া আমাকে ধোঁকায়ও ফেলবেন না। অভিজাত ব্যক্তিরা আল্লাহর দিকে নত লোকদের ধোঁকা দিতে পারে না। আল্লাহ কি আপনাদের নবির কাছে আসমান থেকে কোনো তরবারি পাঠিয়েছেন, যা তিনি আপনাকে দান করে গেছেন? যার ফলে আপনি কখনোই পরাজিত হন না?'
-না।
-তাহলে আপনার নাম 'সাইফুল্লাহ' কেন?
-আল্লাহ আমাদের কাছে তাঁর নবিকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি দীনের পথে আমাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন আমাদের কিছুসংখ্যক মানুষ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর অনুসরণ করে; আর কিছুসংখ্যক সাড়া না দিয়ে তাঁকে মিথ্যা প্রতিপাদন করে। এরপর আল্লাহ আমাদের হিদায়াত দেন। আমরা তাঁর হাতে বায়আত হই। আল্লাহর ৪২২ নবি আমাকে লক্ষ করে বলেন, 'তুমি আল্লাহর তরবারিসমূহের একটি, যা আল্লাহ মুশরিকদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।' তিনি আমার জন্য বিজয় ও সাহায্যের দুআ করে গেছেন। এ কারণে আমার নাম হয়ে গেছে 'সাইফুল্লাহ'। আমি মুসলিমদের মধ্যে মুশরিকদের ওপর সবচেয়ে কঠোর।

- আপনারা মানুষকে কীসের দিকে আহ্বান করেন?
- আমরা মানুষকে 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল,' এই সাক্ষ্য প্রদানের আহ্বান জানাই এবং আল্লাহর রাসুল যা কিছু নিয়ে এসেছেন, সেগুলো স্বীকার করার আহ্বান করে থাকি।
- যারা আপনাদের দাওয়াত গ্রহণ করে না, তাদের ব্যাপারে আপনাদের সিদ্ধান্ত কী?
- তারা জিজয়া প্রদান করবে, আমরা তাদের নিরাপত্তাভার নেব।
- যদি তারা জিজয়া দিতে রাজি না হয়?
- আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি।
- আজ যদি কেউ আপনাদের দীনে প্রবেশ করে, তার অবস্থান কী হবে?
- আল্লাহ আমাদের ওপর যা ফরজ করেছেন, সেসব ব্যাপারে তার অবস্থান হবে ঠিক আমাদের মতো। আমাদের এখানে উঁচু-নীচু, প্রথম ও শেষ এসবের কোনো ভেদাভেদ নেই।
-আজ যে আপনাদের দীনে প্রবেশ করবে, সে কি আপনাদের সমান প্রতিদান পাবে?
-হ্যাঁ; বরং বেশিই পাবে।
- আপনাদের সমান হবে কীভাবে? অথচ আপনারা এ ব্যাপারে কতই-না অগ্রগামী?
- আমরা এই দীন কবুল করেছি। নবির হাতে বায়আত হয়েছি। তিনি যতদিন আমাদের মধ্যে জীবিত ছিলেন, ততদিন তাঁর কাছে ঐশী-নির্দেশনা আসত। তিনি আমাদের সেই কিতাবের সংবাদ দিতেন, মুজিজা দেখাতেন, আমরা যারা তা দেখেছি, শুনেছি, আমাদের জন্য তাঁর আনুগত্য প্রদর্শন ও বায়আতগ্রহণ জরুরি ছিল। কিন্তু আমরা যা দেখেছি ও শুনেছি, তোমরা তো তা দেখোনি বা শোনোনি, তাই তোমাদের যারা নিষ্ঠ চিত্তে ইসলামগ্রহণ করবে, সে আমাদের থেকে উত্তমই পরিগণিত হবে।
-(জারজাহ চিৎকার দিয়ে বলে) আল্লাহর দোহাই, আপনি সত্য বলছেন! আমাকে প্রতারিত করছেন না তো?
-আল্লাহর শপথ, আমি সত্য কথা বলেছি। তুমি আমাকে যে বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছ, এর ওপর আল্লাহ সাক্ষী।

এ কথা শুনে জারজাহ তার ঢাল ঘুরিয়ে খালিদের সঙ্গী হয়ে যায়। এরপর সে আবেদন করে, 'আমাকে ইসলাম শিক্ষা দিন।' খালিদ তাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের তাঁবুতে চলে আসেন। তাকে গোসল করার নির্দেশ দেন। এরপর দুই রাকআত সালাত পড়ান। জারজাহ খালিদের সঙ্গে চলে আসতেই রোমানরা আক্রমণ তীব্র করে তোলে। ফলে প্রথমদিকে মুসলিমদের পা টলতে শুরু করে। ইকরিমা ইবনু আবি জাহল আর হারিস ইবনু হিশামের নেতৃত্বে শুধু প্রতিরক্ষাবাহিনী তাদের অবস্থানে অবিচল থাকে। ৪২৩

৪. মুসলিম ডান বাহুতে রোমান বাম বাহুর আক্রমণ
অন্ধকার রাতের মতোই রোমানবাহিনী মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে এগিয়ে আসছিল। তাদের বাম বাহু মুসলিমদের ডান বাহুর ওপর আক্রমণ করে বসে। ফলে মুসলিমবাহিনীর মধ্যসারি ডান বাহুর সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। রোমানবাহিনী মুসলিমদের বিক্ষিপ্ত করে দিয়ে একেবারে পেছনের সারি পর্যন্ত পৌঁছে যেতে সমর্থ হয়। এ দৃশ্য দেখে মুআজ ইবনু জাবাল মুসলিমদের উদ্দেশে চিৎকার দিয়ে বলতে থাকেন, 'আল্লাহর বান্দারা, এরা তোমাদের ওপর বিজয়ী হতে আক্রোশে ফেটে পড়ছে। আল্লাহর শপথ, তোমাদের ধৈর্য আর অবিচলতাই ওদের ফিরিয়ে দিতে পারে।' এরপর তিনি ঘোড়া থেকে নেমে বলেন, 'যে আমার ঘোড়া নিয়ে লড়তে ইচ্ছুক, সে ঘোড়াটা নিয়ে নিক!' তিনি নিজে পদাতিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। ৪২৪

আজদ, মাজহাজ, হাজারামাউত ও খাওলানের লোকজন বীরত্ব ও দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই করে শত্রুবাহিনীর অগ্রযাত্রা রুখে দিতে সক্ষম হয়। রোমানরা পাহাড়-উঁচু আক্রমণের ঢেউ তুলে মুসলিমবাহিনীর ডান বাহু ও মধ্যসারির দিকে চলে আসে। এমতাবস্থায় মুসলিমবাহিনীর একটা দল পৃথক হয়ে শিবিরের দিকে চলে যায়। তবে বড় একটা দল তাদের অবস্থানে অনড় থেকে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে। জুবায়দের লোকজন শুরুতে বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলেও পরে আবার জড়ো হয়ে যায়। তারা তখন দিক পালটে তীব্রগতিতে শত্রুর ওপর হামলে পড়ে ওদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। বিক্ষিপ্ত হওয়া মুসলিমদের পিছুধাওয়া থেকেও ওদের বিরত রাখতে সমর্থ হয়। যারা শিবিরের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিল, মুসলিম বীরাঙ্গনারা লাঠি ও পাথর হাতে তাদের স্বাগত জানাচ্ছিল। ফলে ওরা পুনরায় নিজেদের সারি বিন্যস্ত করে নেয়। ৪২৫ ইকরিমা ইবনু আবি জাহল বলেন, 'আমি আল্লাহর রাসুলের সঙ্গে অনেক যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আজ কি আমি পলায়ন করতে পারি?' এরপর তিনি ঘোষণা দেন, 'কে আছ মৃত্যুর বায়আতকারী?' তাঁর চাচা জিরার ইবনুল আজওয়ার ও হারিস ইবনু হিশাম তখন ৪০০ অশ্বারোহী নিয়ে তাঁর হাতে বায়আত হন। তাঁরা তখন খালিদের সামনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যান। একপর্যায়ে সবাই আহত হয়ে পড়েন। অনেকে শাহাদাতবরণ করেন। শহিদদের একজন ছিলেন জিরার ইবনুল আজওয়ার। ৪২৬

ওয়াকিদিসহ কতিপয় ইতিহাসবিদের বর্ণনায় রয়েছে, জিরার আহত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে গেলে তিনি পানি পান করতে চাচ্ছিলেন। যখন তাঁর কাছে পানি নিয়ে যাওয়া হয়, তখন দেখতে পান আরেক আহত ব্যক্তি পানির দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে আছে। তিনি পানিবাহককে বলেন, 'আগে ওকে পান করিয়ে এসো!' দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনিও অনুরূপ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে বলেন, আগে ওকে পান করিয়ে এসো!' তৃতীয় ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। শুধু তা-ই নয়, মুসলিম ভাইকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এ প্রবণতা থেকে তাঁরা সবাই পানির বদলে শাহাদাতের শরাবে চুমুক দেন। রাজিআল্লাহু আনহুম আজমাইন।

বলা হয়ে থাকে, সেদিন যিনি প্রথমে শাহাদাতবরণ করেন, তিনি ইতিপূর্বে আবু উবায়দার কাছে গিয়ে বলেছিলেন, 'আমি সব প্রস্তুতি সেরে নিয়েছি। রাসুলের সঙ্গে কি আপনার কোনো কাজ আছে?' জবাবে আমিনুল উম্মাহ বলেন, 'রাসুল ﷺ-কে আমার সালাম দেবে আর বলবে, আল্লাহর রাসুল, আমাদের প্রতিপালক আমাদের সঙ্গে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তা সত্য পেয়েছি।'

এরপর ওই মুজাহিদ যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকেন এবং একপর্যায়ে শাহাদাতের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। সকল মানুষ নিজেদের পতাকার নিচে অবস্থান করে দৃঢ়পায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। রোমানরা চাকার মতো চারদিকে ঘুরছিল। সেদিন ইয়ারমুকের রণাঙ্গনে কেবল কর্তিত মস্তক, বলবান বাহু আর কবজিগুলোই উড়তে দেখা যাচ্ছিল। ৪২৭

৫. রোমান ডান বাহুর মুসলিমদের বাম বাহুতে আক্রমণ
কানাতিরের নেতৃত্বে রোমানদের ডান বাহু মুসলিম বাম বাহুর ওপর হামলে পড়ে। মুসলিম বাম বাহুতে ছিল কিনানা, কায়েস, খুসআম, জুজাম, কুজাআ, আমিরা ও গাসসান গোত্রসমূহের লোকজন। তাঁদের বাধ্য হয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে যেতে হয়। রোমানরা তখন পিছিয়ে যাওয়া মুসলিমদের ওপর আছড়ে পড়ে ধাওয়া শুরু করে। ধাওয়া খেয়ে মুসলিমরা শিবিরের কাছাকাছি পৌঁছলে ওদিক থেকে মুসলিম বীরাঙ্গনারা লাঠি ও পাথর হাতে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। মহিলারা পাথর ছুড়ে বলছিলেন, 'ইসলাম, মা আর স্ত্রীদের ইজ্জত কোথায় চলে গেল? তোমরা কাফিরদের জন্য আমাদের রেখে কোন দিকে পালিয়ে যাচ্ছ?'

নারীরা যখন এভাবে তাঁদের পৌরুষ ধরে নাড়া দেন, তখন তাঁদের চেতনা ফিরে আসে। তাঁরা যারপরনাই লজ্জিত হয়ে পুনরায় রণাঙ্গনে গিয়ে দৃঢ়পায়ে লড়তে থাকেন। রোমানদের বিপুলসংখ্যক লোক নিহত হয়েছিল। একপর্যায়ে মুসলিমদের একাংশের সেনাপতি সায়েদ ইবনু জায়েদ শাহাদাতবরণ করেন। তখন রোমানদের বাম বাহু ফের মুসলিম ডান বাহুর ওপর আক্রমণে তৎপর হয়ে ওঠে। তারা আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ওপর হামলা করে তাঁদের প্রায় অবরুদ্ধ করে ফেলে; কিন্তু আমরের বাহিনী অত্যন্ত দৃঢ়পদে মোকাবিলা করতে থাকে। তারপরও রোমানরা মুসলিমবাহিনীর শিবিরে পৌঁছে যেতে সমর্থ হয়।

এ অবস্থা দেখে মুসলিম নারীরা পুনরায় পাহাড় থেকে নেমে এসে পাথর ছুড়তে থাকেন। তাঁরা পুরুষ-যোদ্ধাদের ভর্ৎসনা করে বলছিলেন, 'যদি তোমরা আমাদের নিরাপত্তা দিতে না পারো, তাহলে তোমরা আমাদের স্বামী নও।' এর ফলে মুসলিমরা নবপ্রেরণায় উদ্দীপিত হয়ে ওঠেন। পুনরায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। তাঁরা তখন রোমানদের ওপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন যে, শত্রুবাহিনী এখান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ৪২৮

৬. পালানোর পথ করে দেওয়া এবং পদাতিক বাহিনীকে ধ্বংস
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে রোমানদের সেই বাম বাহুর ওপর ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে বসেন, যারা মুসলিমবাহিনীর ডান বাহুকে মধ্যভাগের দিকে ঠেলে নিয়ে আসছিল। তিনি তখন মুসলিমবাহিনীর উদ্দেশে বলছিলেন, 'আল্লাহর শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ; তোমরা যা দেখেছ এ ছাড়া তাদের কাছে এখন ধৈর্য আর শক্তি বলতে কিছুই নেই। আমার বিশ্বাস, ওদের গর্দানগুলোও আল্লাহ তোমাদের কবজায় দিয়ে দেবেন।'

এরপর তিনি অশ্বারোহীদের সঙ্গে নিয়ে রোমানদের ১ লাখ বাহিনীর মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। আক্রমণের ক্ষিপ্রতায় শত্রুবাহিনী ছত্রখান হয়ে যায়। মুসলিমরা সম্মিলিত হামলা চালালে তারা একেবারে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। এরপর তাঁরা ওদের পিছু ধাওয়া শুরু করেন। ৪২৯ মুসলিমবাহিনীর ডান বাহু পলায়নপর রোমানদের পালানোর পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। তারা তখন ইয়ারমুক উপত্যকা ও জারকা নদীর মধ্যবর্তী স্থানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এরপরও যুদ্ধ তুমুল গতিতেই চলছিল। মুসলিমরা ইমানের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে চলছিলেন। কঠিন হামলা চালিয়ে রোমানদের অশ্বারোহী বাহিনীকে পদাতিকদের পাশ থেকে সরিয়ে দিতে সফল হন। এরপর তাদের ওপর হামলে পড়েন। ধাওয়া করে ক্লান্ত করে তোলেন।

রোমান অশ্বারোহীরা তখন পালানোর পথ খুঁজছিল। খালিদ রা. আমর ইবনুল আসকে নির্দেশ দেন, 'ওদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন।' তিনি তা-ই করেন। সুযোগ পেতেই রোমানবাহিনীর ডানায় যেন পালক গজিয়ে ওঠে। তারা দ্রুত পালিয়ে যায়। তাদের পদাতিক বাহিনী তখন অশ্বারোহী বাহিনীর সাহায্য-বঞ্চিত হয়ে পড়ে। এদের শেকলবন্দি করে পরিখার দিকে নিয়ে আসা হয়। তাদের অবস্থা ছিল বিধ্বস্ত দেয়ালের মতো। রাতের আঁধারে টেনে-হিঁচড়ে পরিখার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এতে তারা উপত্যকায় মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছিল। তাদের একজনকে হত্যা করার সঙ্গে সঙ্গে শেকলে বাঁধা সবাই পড়ে যেত। এ পর্যায়ে মুসলিমরা তাদের বড় একটা দলকে হত্যা করতে সক্ষম হন। নিহতদের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২০ হাজারের মতো। তবে তাদের কিছুসংখ্যক ফাহাল ও দামেশকের দিকে পালিয়ে যায়।৪৩০

পরাজিতদের মোকাবিলায় ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে যান। তিনি অত্যন্ত জোরদার আক্রমণ পরিচালনা করেন। তাঁর পিতা তখন তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি ইয়াজিদকে ডেকে বলেন, 'আমার কলিজার টুকরো, খোদাভীতি ও ধৈর্য অবলম্বন করো। আজ এই উপত্যকায় উপস্থিত সকল মুসলিমের ওপর যুদ্ধ জরুরি। মুসলিমবাহিনীর নেতৃত্বে তোমার মতো যাঁরা আছে, তাঁদের ওপর তো অগ্রাধিকারভিত্তিতে জরুরি হবে। প্রিয় ছেলে, আল্লাহকে ভয় করো। তোমার সঙ্গীদের কেউ যেন আল্লাহর শত্রুদের মোকাবিলায় ধৈর্য ও দৃঢ়তায় তোমাকে ছাড়িয়ে না যায়।' ইয়াজিদ জবাবে বলেন, 'জি আব্বা, ইনশাআল্লাহ তা-ই হবে।' এরপর তিনি অবিচলভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যান। এ সময় ইয়াজিদ ছিলেন মুসলিমবাহিনীর মধ্যসারির দিকে। ৪৩১

সায়িদ ইবনুল মুসাইয়িব রা. তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন; 'ইয়ারমুকের দিন নীরবতা ছেয়ে গিয়েছিল। আমরা হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনতে পাই। আওয়াজটা পুরো শিবির থেকেই শোনা যাচ্ছিল। সেটা ছিল- 'আল্লাহর সাহায্য, নিকটে এসে যাও। হে মুসলিমরা, অনড় হয়ে যাও।' আমরা চেয়ে দেখি, সেই আওয়াজদাতা ছিলেন আবু সুফিয়ান রা.। তিনি তাঁর পুত্র ইয়াজিদের পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছিলেন। মুসলিমরা মাগরিব ও ইশার সালাত পিছিয়ে দেন। একপর্যায়ে বিজয় হাতের মুঠোয় আসে। খালিদ রা. রোমান সেনাপতি হিরাক্লিয়াসের ভাই থিয়োডরের তাঁবুতে রাতযাপন করেন। সে পলায়নকারীদের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। অশ্বারোহীরা খালিদের তাঁবুর আশেপাশে টহল দিচ্ছিল। রোমানদের যারাই ওদিকে আসত, তাদের হত্যা করে ফেলা হতো। সকাল পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। থিয়োডরকেও একসময় হত্যা করা হয়। সেদিন তার তাঁবুতে ছিল ৩০টা শামিয়ানা, ৩০টা রেশমের সূর্যরশ্মি প্রতিরোধক। এ ছাড়া ছিল প্রচুর কার্পেট, রেশমের জামাকাপড় ও পর্দা। সেখানে যেসব সম্পদ ছিল, সকাল হলে মুসলিমরা তা গনিমত হিসেবে নিয়ে নেন।৪৩২

৭. যুদ্ধের ফল
এ যুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার মুসলিমযোদ্ধা শহিদ হন। তাঁদের মধ্যে ইকরিমা ইবনু আবি জাহল, তাঁর পুত্র আমর, সালমা ইবনু হিশাম, আমর ইবনু সায়িদ, আবান ইবনু সায়িদসহ রাসুলের সাহাবি, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গও অন্তর্ভুক্ত। অপরদিকে রোমানদের নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার। এদের মধ্যে ৮০ হাজার ছিল শেকলবদ্ধ আর বাকিরা ছিল শেকলবিহীন।৪৩৩

এই বিশাল বিজয় মুসলিমদের আনন্দিত করে তুললেও খলিফা আবু বকরের মৃত্যুসংবাদ সে আনন্দ মাটি করে দেয়। তাঁর ইনতিকালে তাঁরা চিন্তিত হয়ে পড়েন।

আট. আবু বকরের ইনতিকাল, উমরের খিলাফতগ্রহণ ও খালিদের অপসারণ
১. উমরকে খলিফা নির্ধারণ ও আবু বকরের ইনতিকাল
১৩ হিজরির জুমাদাস সানি মাসে খলিফাতুর রাসুল আবু বকর রা. অসুস্থ হন এবং এ অসুস্থতা নিয়েই ২২ জুমাদাল উখরা সোমবার দিবাগত রাতে ইনতিকাল করেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা যখন ক্রমেই অবনতি হচ্ছিল, তখন একসময় তিনি বুঝে নেন, তাঁর বেলা ফুরিয়ে এসেছে। ফলে শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদের সঙ্গে আলোচনা করে খিলাফতের গুরুভার উমর রা.-এর হাতে অর্পণ করেন। রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চলাকালে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে খলিফা আবু বকরের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছেছিল; কিন্তু তিনি সংবাদটা তখনই মুসলিমদের না জানিয়ে চেপে রাখেন, যাতে মুসলিমবাহিনী মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে না পড়ে। বিজয় পূর্ণতায় পৌঁছার পরই সংবাদটা তাঁদের সামনে প্রকাশ করেন।

২. খলিফা উমর কর্তৃক খালিদকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি
এদিকে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. খলিফা হওয়ার পরপরই শামে খালিদের পরিবর্তে আবু উবায়দাকে সেনাপতি নিয়োগের ফরমান পাঠান। খালিদ আমিরুল মুমিনিনের এই ফরমানকে সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করেন। এরপর খলিফাতুর রাসুলের ইনতিকালে মুসলিমদের পক্ষ থেকে শোকপ্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আবু বকরকে মৃত্যু দান করেছেন। তিনি ছিলেন আমার কাছে উমরের চেয়ে প্রিয়। সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি উমর রা.-কে খলিফা বানিয়েছেন। তিনি আবু বকরের চেয়ে আমার কাছে ছিলেন অপ্রিয়; অথচ আল্লাহ আমার ওপর তাঁকে পছন্দ করা জরুরি করে দিয়েছেন।'৪৩৪ এরপর খলিফা উমরের নির্দেশমতো আবু উবায়দা রা. সেনাবাহিনীর নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন।

উমর রা. খিলাফতের দায়িত্ব হাতে নেওয়ার পর আবু বকরের শাসনামলে নিযুক্ত অনেক প্রাদেশিক গভর্নর, কর্মকর্তা ও সেনাপতিকে অপসারণ করে নতুন দায়িত্বশীল নিয়োগ দেন। এটা খলিফা উমরের ইজতিহাদি বিষয় ছিল। এ হিসেবে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকেও তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিলে সঙ্গে সঙ্গেই খালিদ রা. তা মেনে নেন।

৩. কা'কা ইবনু আমরের কবিতা
ইয়ারমুকের যুদ্ধ প্রসঙ্গে আরবের কবিদের মধ্যে কা'কা ইবনু আমরের কবিতাগুলো হচ্ছে,
দেখোনি কি ইয়ারমুকে আমরা তেমন বিজয়ই লাভ করেছি
যেমন বিজয় লাভ করেছি ইতিপূর্বে ইরাকে।
কুমার ঘোড়ায় চড়ে মাদায়েন ও মারজ আস-সাফারের
স্বাধীন এলাকাগুলো করেছি জয়।
সেই বসরাও জয় করেছিলাম, কা-কা-কারীদের কাছে
যে শহরের আঙিনায় পা রাখা ছিল নিষিদ্ধ।
যারাই সামনে আসছিল তাদের হত্যা করছিলাম
ধারালো তরবারির মাধ্যমে গনিমত কুড়িয়ে নিচ্ছিলাম।
আমরা ইয়ারমুকে রোমানদের হত্যা করেছিলাম।
তারা আমাদের দুর্বলদের সমকক্ষতাও প্রদর্শন করতে পারেনি।
আমরা ধারালো তরবারির মাধ্যমে ওয়াকুসা প্রান্তরে
ওদের বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে দিয়েছিলাম।
সেই ভোরে যখন ভিড় জমেছিল,
তখন তারা এমন জিনিস আস্বাদন করে,
যা ছিল ভীষণ তিক্ত।

৪. রোমানদের পরাজয়
যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে সম্রাট হিরাক্লিয়াস মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বেঁচে যাওয়া তার ভগ্নমনোরথ সেনারা ইনতাকিয়ায় (এন্টিয়ক) গিয়ে পৌঁছলে সে তাদের বলে ওঠে,
-তোমরা ধ্বংস হও! বলো দেখি, তোমরা যাদের মোকাবিলায় লড়ছিলে, তারা কি তোমাদের মতোই মানুষ ছিল না?
-জি, অবশ্যই ছিল।
-সংখ্যায় তোমরা বেশি ছিলে নাকি তারা?
-প্রতিটা জায়গায়ই আমরা তাদের কয়েকগুণ বেশি ছিলাম।
-তারপরও তোমরা পরাজিত হলে কেন?

তখন তাদের এক প্রবীণ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলতে থাকে, 'তারা বিজয়ী হয়েছে; কারণ তারা দিনে থাকে রোজাদার আর রাতে থাকে আল্লাহর দরবারে দণ্ডায়মান। তারা অঙ্গীকার পূরণ করে। কল্যাণের দাওয়াত দেয় এবং অকল্যাণ ও অসত্য থেকে বিরত রাখে। একে অন্যের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করে। আর আমাদের পরাজয়ের কারণ হচ্ছে— আমরা মদপান করি, ব্যভিচার করি, বিভিন্ন হারাম কাজে লিপ্ত হই। ওয়াদা ভঙ্গ করি। অত্যাচার-অনাচার করি। অন্যায় কাজের নির্দেশ প্রদান করি। আল্লাহ যেসব কাজে অসন্তুষ্ট হন, মানুষকে তা থেকে বিরত রাখি না। জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করি।' হিরাক্লিয়াস তখন বলে ওঠে, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি সঠিক বলেছ।'

টিকাঃ
৪১০. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৩।
৪১১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৮।
৪১২. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৪।
৪১৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৮।
৪১৪. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৪।
৪১৫. তারিখু দিমাশক: ২/১২৫।
৪১৬. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৬৩।
৪১৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১০।
*১৮. খালিদের ঘোড়া। শামের কঠিন মরুভূমি পাড়ি দিতে গিয়ে তাঁর প্রিয় ঘোড়া আশকারের খুর জখম হয়ে গিয়েছিল।
৪১৯. আবু বাকরিন রাজুলুদ দাওলাহ: ৮৮।
৪২০. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৬৩।
৪২১. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৬।
৪২২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১০।
৪২৩. প্রাগুক্ত: ৭/১৩।
৪২৪. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৯।
৪২৫. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ২২২; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১৯।
৪২৬. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৭০।
৪২৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১২।
৪২৮. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৭৪।
৪২৯. তারতিব ওয়া তাহজিব আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৭১- ফুতুহুল বুলদান, আজদি: ১৭১।
৪৩০. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া ওয়াদ দিফাইয়াহ ইনদাল মুসলিমিন: ১৭৫।
৪৩১. ফুতুহুল বুলদান, আজদি: ২২৮।
৪৩২. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৭৩।
৪৩৩. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৭৯।
৪৩৪. তারিখু দিমাশক: ২/১২৬।

আজনাদায়ন প্রান্তরে রোমানরা লজ্জাজনক পরাজয়ের শিকার হয়। মুসলিমরা বিশাল বিজয় অর্জনের পর তাদের সেনাদল নিয়ে ফিরে আসেন। তারা অনেকটা প্রশান্ত চিত্তে খলিফার নির্দেশমতো ইয়ারমুক প্রান্তরে কাজে লেগে যান। এদিকে রোমানবাহিনী তাদের জেনারেল থিয়োডরের নেতৃত্বে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারাও একটা বিশাল প্রশস্ত মাঠে এসে শিবির স্থাপন করে, যেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা ছিল সংকীর্ণ। তারা ইয়ারমুকের একেবারে পাশে ওয়াকুসা নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেছিল।

১. উভয় বাহিনীর সেনাসংখ্যা
• মুসলিমবাহিনী : খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বাধীন মুসলিমবাহিনীর সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার। কোনো কোনো বর্ণনামতে তাঁদের সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার。
• রোমানবাহিনী : থিয়োডরের নেতৃত্বে রোমানবাহিনীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার।

২. যুদ্ধের আগে
মুসলিমরা খালিদের নেতৃত্বে ইয়ারমুক পৌঁছে সেখানে শিবির স্থাপন করেন; আর রোমানরা নদীর দক্ষিণ তীরে তাদের সেনাসমাবেশ ঘটায়। এই অবস্থায় আমর ইবনুল আস মুসলিমবাহিনীকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘মুসলিমরা, সুসংবাদ নাও। আল্লাহর শপথ, রোমানরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে; আর অবরুদ্ধরা খুব কম ক্ষেত্রেই বিজয় অর্জন করতে পারে।’৪১০ খালিদ রা. এই যুদ্ধে সম্পূর্ণ নতুন কৌশলে সেনাব্যূহ রচনা করেন, যা ইতিপূর্বে আরবদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত।৪১১

• ফিরকা (ছোট বাহিনী) : এটা ১০ থেকে ২০ কুরদুস পর্যন্ত হয়ে থাকত। এর একজন আলাদা অধিনায়ক থাকতেন।
• কুরদুস : ১ হাজার সেনার একটা ইউনিট, যার একজন পৃথক নেতা থাকত।৪১২
খালিদ রা. এই প্রক্রিয়ায় বাহিনীকে ৪০ সারিতে বিন্যস্ত করেন।
• কালব (মধ্যবাহিনী) : এটা ছিল ১৮ কুরদুসের সমন্বয়ে ঘটিত। এর নেতৃত্ব ছিল আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের হাতে। তাঁর সহযোগিতায় ছিলেন ইকরিমা ইবনু আবি জাহল ও কা'কা ইবনু আমর রা.।
• মায়মানা (ডান বাহু) : এটা ছিল ১০ কুরদুসের সমন্বয়ে ঘটিত। এর নেতৃত্বভার ছিল আমর ইবনুল আসের কাঁধে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন শুরাহবিল ইবনু হাসানা রা.।
• মায়সারা (বাম বাহু) : এটাও ছিল ১০ কুরদুস বিশিষ্ট। এর নেতৃত্বে ছিলেন ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান রা.।
• তালিয়া (অগ্রবর্তী বাহিনী): এরা ছিল অশ্বারোহীদের দ্বারা গঠিত নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী। এদের দায়িত্ব ছিল মুসলিমবাহিনীর দেখাশোনা ও শত্রুবাহিনীর ওপর কড়া দৃষ্টি রাখা। তাই এদের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম。
• সাকা (পশ্চাদ্‌দ্বাহিনী) : এই বাহিনী ছিল ৫ কুরদুস তথা ৫ হাজার যোদ্ধার সমন্বয়ে ঘটিত। এর নেতৃত্বে ছিলেন সায়িদ ইবনু জায়েদ রা.। এই বাহিনীর দায়িত্ব ছিল সাধারণত প্রশাসনিক দিকগুলোর ওপর নজর রাখা। এর কাজি ছিলেন আবুদ দারদা রা.; আর খাবার-পানি, গনিমত একত্রিত করাসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা.। মিকদাদ ইবনু আসওয়াদ রা. ছিলেন কারির ভূমিকায়। তিনি সেনাবাহিনীর সামনে জিহাদ-সংক্রান্ত আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতেন, যাতে মুজাহিদদের মধ্যে আধ্যাত্মিক শক্তির স্ফুরণ ঘটে। সেনাবাহিনীর বক্তা হিসেবে নিযুক্ত হন আবু সুফিয়ান ইবনু হারব রা.। তিনি প্রত্যেক সারিতে গিয়ে সেনাবাহিনীকে উদ্দীপ্ত করতেন। ৪১৩ আর সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. বড় বড় সাহাবিকে নিয়ে সেনাবাহিনীর ঠিক মধ্যখানে অবস্থান করছিলেন।

মুসলিমবাহিনী খালিদের নেতৃত্বে তাঁদের প্রস্তুতি সেরে নিয়েছিল। প্রত্যেক নেতা নিজ নিজ সেনাদলের সামনে উপস্থিত হয়ে জিহাদের ব্যাপারে তাদের উৎসাহিত করতে থাকেন। মুসলিমবাহিনীর নেতারা জানতেন, এই যুদ্ধ এক বিশাল প্রতিফল বহন করতে যাচ্ছে। এটা হবে ইতিহাসের মোড় নির্ধারণী এক যুদ্ধ। রোমানবাহিনীও মনে করছিল, 'এই যুদ্ধের পরাজয় হবে পুরো শাম অঞ্চলের পরাজয়। যদি আমরা যুদ্ধে হেরে যাই, তাহলে শামের সব দরজা মুসলিমদের জন্য খুলে যাবে। তাদের সামনে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তখন তাদের জন্য এশিয়া-ইউরোপ বিজয় একেবারে সহজ হয়ে যাবে।'৪১৪

৩. ইমানি প্রস্তুতি
ইমান ও কুফরের বাহিনী যখন পরস্পর মুখোমুখি হয়, তখন একে অন্যকে দ্বৈরথের আহ্বান জানায়। এমতাবস্থায় আবু উবায়দা রা. মুসলিমদের উপদেশ দিয়ে বলছিলেন, 'আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহর দীনের সাহায্য করো। আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন। মুসলিমরা, ধৈর্যসহকারে কাজ করো। ধৈর্য হচ্ছে কুফর থেকে মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। লজ্জা পরাজয় ও বিনাশের কারণ। নিজেদের সারি থেকে পিছু হটবে না। আগে বেড়ে শত্রুর ওপর হামলা করবে না। বর্শাগুলো সঠিক আঙ্গিকে ধরে রেখে ঢাল দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে। নীরবতা অবলম্বন করবে। মনে মনে আল্লাহর জিকির করতে থাকবে। আমি নির্দেশ দেওয়ার পরই তোমরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে।'

এরপর সাহাবি মুআজ ইবনু জাবাল রা. লোকজনকে উপদেশস্বরূপ বলেন, 'কুরআনধারী মুসলিমরা, আল্লাহর কিতাবের হিফাজতকারীরা, হিদায়াতের সাহায্যকারীরা, হকের পতাকাবাহীরা, আল্লাহর রহমত ও জান্নাত কেবল আশা-আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হয় না, আল্লাহ তাঁর সুমহান রহমত ও সাহায্য কেবল সত্যবাদীদেরই দান করে থাকেন। তোমরা কি আল্লাহর ঘোষণা শোনোনি-"তোমাদের যারা ইমান আনে এবং সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন; তিনি অবশ্যই তাদের প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেভাবে প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদের।” [সুরা নূর: ৫৫]

আল্লাহ তোমাদের ওপর রহম করুন। তোমাদের তিনি পলায়নকারী হিসেবে দেখছেন, এ থেকে লজ্জা অনুভব করো। তিনি ছাড়া তোমাদের সম্মান ও বিজয়দানকারী কেউ নেই।'

সাহাবি আমর ইবনুল আস রা. বলছিলেন, 'মুসলিমরা, দৃষ্টি অবনত রাখবে। হাঁটু গেড়ে বসে থাকবে। বর্শাগুলো সোজা রাখবে। শত্রুরা যখন হামলা চালাবে, তাদের একটু ছাড় দেবে, যতক্ষণ-না তারা তোমাদের বর্শার পাল্লায় এসে পৌঁছায়। এরপর বাঘের মতো তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। শপথ সেই সত্তার, যিনি সত্যকে ভালোবাসেন, যিনি প্রতিদান দেন, যিনি মিথ্যাকে অপছন্দ করেন এবং মিথ্যার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছেন, যিনি ভালোর প্রতিদান ভালো দিয়েই করেন। আমি শুনেছি, মুসলিমরা অচিরেই একের পর এক বস্তি, একের পর এক মহল্লা জয় করবে। অতএব, ওদের সেনাধিক্য দেখে ভয় করেবে না। তোমরা যদি দৃঢ়পদে যুদ্ধ করো, তাহলে ওরা পাখির মতো উড়ে যাবে।'

সাহাবি আবু সুফিয়ান রা. বলছিলেন, 'মুসলিমরা, এ মুহূর্তে তোমরা পরিবার-পরিজন এবং আমিরুল মুমিনিনের পক্ষ থেকে পাঠানো সাহায্যবাহিনী থেকে দূরে অবস্থান করছ। আল্লাহর শপথ, তোমরা এমন এক বাহিনীর মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে আছ, যাদের সংখ্যা তোমাদের থেকে অনেক বেশি। যারা অত্যন্ত কঠিন প্রতিপক্ষ। তারা আছে নিজেদের সন্তানাদি এবং মালসামানার পাশে, নিজেদের দেশে। আল্লাহ তোমাদের তখনই সাহায্য করবেন, যখন তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট হবেন। যখন তোমরা কঠিন অবস্থায় ধৈর্যধারণ করবে, নিজেদের তরবারি দ্বারা নিজেদের হিফাজত করবে, একে অন্যকে সাহায্য করবে- এটাই তোমাদের জন্য মুক্তির মাধ্যম হতে পারে।'

এরপর তিনি মহিলাদের কাছে যান। তাদেরও যথাযথ উপদেশ দিয়ে বলেন, ৪১৫ 'মুসলিমরা, সেই জিনিস এসে গেছে, যা তোমরা প্রত্যক্ষ করছ। শোনো, এই তো তোমাদের সামনে নবিজি ও জান্নাত। তোমাদের সামনে রয়েছে শয়তান ও জাহান্নাম।' এরপর তিনি নিজের জায়গায় ফিরে যান। ৪১৬

সেই মুহূর্তে আবু হুরায়রা রা. লোকজনকে উপদেশস্বরূপ বলছিলেন, 'হে লোকজন, আয়াতলোচনা হুর ও জান্নাতের দিকে এগিয়ে চলো। তোমরা আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছ, সেই জায়গাই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান। সাবধান, ধৈর্যধারণকারীদের জন্যই রয়েছে সবচেয়ে উঁচু অবস্থান।'

ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান প্রতিটা কুরদুসে গিয়ে বলতেন, 'আল্লাহ, আল্লাহ, তোমরা আরবদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধকারী এবং ইসলামের সহায়তাকারী। তোমাদের শত্রুরা রোমের নিরাপত্তারক্ষী এবং শিরকের সাহায্যকারী। হে আল্লাহ, এটা তোমার দীন। আল্লাহ, তোমার বান্দাদের ওপর সাহায্য অবতরণ করো। ১৪১৭

আরবের এক খ্রিষ্টান খালিদ রা.-কে লক্ষ করে বলে, 'রোমানরা সংখ্যায় কতই-না বেশি এবং মুসলিমরা কতই-না কম!' উত্তরে খালিদ বলেন, 'তোমার ধ্বংস হোক, তুমি কি আমাকে রোমানদের সংখ্যাধিক্যের ভয় দেখাচ্ছ? আমাদের কাছে জনসংখ্যার কোনো মূল্য নেই। মূল লক্ষ্য তো হলো শত্রুকে পরাজয় ও লজ্জা উপহার দেওয়া এবং আল্লাহর বিজয় ও সাহায্য অর্জন করা। আল্লাহর শপথ, আমার তো মন চাইছে, আজ যদি আমার আশকার *১৮ সুস্থ থাকত আর শত্রুবাহিনী দ্বিগুণের চেয়ে বেশি হতো।'

মুআজ ইবনু জাবাল পাদরি ও যাজকদের আওয়াজ শুনলে বলে ওঠেন, 'আল্লাহ, শত্রুর পা টলিয়ে দিন। তাদের অন্তরগুলো সন্ত্রস্ত করে দিন। আমাদের ওপর প্রশান্তি বর্ষণ করুন। তাওহিদের ওপর আমাদের স্থির রাখুন। জিহাদ প্রিয়তম বৃত্তি বানিয়ে দিন এবং আপনার সিদ্ধান্তে আমাদের সন্তুষ্ট করে তুলুন। '৪১৯

সাত. রোম
রোমানরা তাদের অহংকার ও দৌরাত্ম্য নিয়ে কালো বাদলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে মাঠের ওপর ছেয়ে যায় এবং ভীষণ চ্যাঁচামেচি শুরু করে। পাদরি ও যাজকরা ইনজিল পাঠ করে তাদের সেনাদের উদ্দীপ্ত করে তুলছিল। ৪২০ তারা ইয়ারমুকের পাশে ওয়াকুসা নামক স্থানে জমায়েত হয়; কিন্তু উপত্যকাটা তাদের জন্য পরিখা হয়ে ওঠে。

রোমানরাও কুশলী সেনাবিন্যাস করে। তারা দুটি লাইনে সেনাবিন্যাস করে প্রতি পাঁচজনকে বৃত্তাকারে রাখে। মধ্যখানে ছিল যথেষ্ট ফাঁকা। দ্বিতীয় সারি ছিল প্রথম সারি থেকে পেছনের দিকে। এ ছাড়া যুদ্ধে তারা যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করে :
১. তিরন্দাজদের সম্মুখভাগে রেখেছিল। তাদের দায়িত্ব ছিল তির ছুড়ে যুদ্ধের সূচনা করেই ডান, বাম ও পেছনে চলে যাওয়া।
২. ডান ও বাম বাহুতে ছিল অশ্বারোহী বাহিনী। এদের দায়িত্ব ছিল তিরন্দাজরা পেছনে সরে যাওয়া পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা ও সহায়তা প্রদান।
৩. কুরদুস, (পদাতিক) এদের দায়িত্ব ছিল আক্রমণ জোরদার করে তোলা।
৪. সম্মুখসারিতে ছিল জেনারেল জারজাহ; আর ডান বাহুর সেনাপতি ছিল দারকিস। ৪২১

১. যুদ্ধপূর্ব সংলাপ
উভয় বাহিনী একে অন্যের পাশে পৌঁছে গেলে মুসলিমবাহিনী থেকে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ ও ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান রোমানদের দিকে এগিয়ে যান। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন জিরার ইবনুল আজওয়ার ও হারিস ইবনু হিশাম। তাঁরা বলছিলেন, 'আমরা তোমাদের নেতার সঙ্গে কথা বলতে চাই।' থিয়োডরের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাতের অনুমতি প্রদান করা হয়। সে তখন একটা রেশমি তাঁবুতে বসা ছিল। সাহাবিরা বলেন, 'আমরা এমন তাঁবুতে বসা বৈধ মনে করি না।' সে রেশমের গালিচা বিছিয়ে দেয়। তাঁরা তাতে বসতে অস্বীকার করে নিজেদের পছন্দমতো জায়গা দেখে বসে পড়েন। সন্ধি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়; কিন্তু সে আলোচনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ফলে তাঁরা আল্লাহর দীনের দিকে তাদের আহ্বান জানিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন।'

ওয়ালিদ ইবনু মুসলিম বর্ণনা করেন; বাহান খালিদের কাছে প্রস্তাব দেয়— 'এসো, আমরা উভয় বাহিনীর মধ্যখানে বসে সন্ধি নিয়ে আলোচনা করি।' খালিদ বেরিয়ে এলে বাহান তাঁকে বলে, 'জানি, নানাবিধ কষ্ট ও ক্ষুধা দেশ থেকে তোমাদের বেরিয়ে পড়তে বাধ্য করেছে! এসো, আমরা তোমাদের প্রত্যেকের হাতে ১০টা করে দিনার, পোশাক ও খাদ্যদ্রব্য ধরিয়ে দিই; আর তোমরা নিজের দেশে চলে যাও! চাইলে পরবর্তী বছরও তোমাদের এই পরিমাণ সাহায্য পাঠিয়ে দেওয়া হবে।' খালিদ বলেন, 'তুমি যা ভাবছ, ব্যাপার আসলে তা নয়। এখানে আসার কারণ হচ্ছে, আমরা মূলত রক্তপিপাসু জাতি। জানতে পেরেছি, রোমানদের রক্ত নাকি খুব সুস্বাদু। এ জন্যই আমরা এখানে ছুটে এসেছি।' খালিদের জবাব শুনে বাহানের সঙ্গীরা বলে ওঠে, 'আরবদের ব্যাপারে আমরা এমনটাই শুনে এসেছি।'

২. যুদ্ধের সূচনা
যুদ্ধপ্রস্তুতি সম্পন্নের পর খালিদ রা. মধ্যসারির উভয় বাহুতে নিযুক্ত ইকরিমা ও কা'কার দিকে এগিয়ে এসে তাঁদের আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দেন। তাঁরা উভয়ে তখন রণসংগীত গেয়ে গেয়ে এগোচ্ছিলেন। মধ্যমাঠে পৌঁছেই তাঁরা দ্বৈতযুদ্ধের আহ্বান জানান। রোমান বাহাদুররা বেরিয়ে আসে। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। খালিদ রা. তাঁর কুরদুস (১ হাজার সেনার বাহিনী) নিয়ে সেনাসারির মধ্যভাগে চলে আসেন। মুজাহিদরা তাঁর সামনে অবস্থান নিয়ে শত্রুর ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিলেন; আর তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যথাযথ নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। ৪২২

৩. রণাঙ্গনে রোমান সেনাপতি জারজাহর ইসলামগ্রহণ
রোমানবাহিনীর বড় সেনাপতি জারজাহ বেরিয়ে এসে খালিদকে ডাক দেয়। তিনি তার পাশেই চলে যান। এতটাই কাছে যান, উভয়ের ঘোড়ার ঘাড় পরস্পর মিলে যায়। জারজাহ তাঁকে বলে, 'খালিদ, আমি আপনাকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করব, আপনি কি আমাকে সঠিক তথ্য দেবেন? দয়া করে মিথ্যা বলবেন না, মিথ্যা বলা একজন স্বাধীন মানুষের জন্য লজ্জার বিষয়। এ ছাড়া আমাকে ধোঁকায়ও ফেলবেন না। অভিজাত ব্যক্তিরা আল্লাহর দিকে নত লোকদের ধোঁকা দিতে পারে না। আল্লাহ কি আপনাদের নবির কাছে আসমান থেকে কোনো তরবারি পাঠিয়েছেন, যা তিনি আপনাকে দান করে গেছেন? যার ফলে আপনি কখনোই পরাজিত হন না?'
-না।
-তাহলে আপনার নাম 'সাইফুল্লাহ' কেন?
-আল্লাহ আমাদের কাছে তাঁর নবিকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি দীনের পথে আমাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন আমাদের কিছুসংখ্যক মানুষ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর অনুসরণ করে; আর কিছুসংখ্যক সাড়া না দিয়ে তাঁকে মিথ্যা প্রতিপাদন করে। এরপর আল্লাহ আমাদের হিদায়াত দেন। আমরা তাঁর হাতে বায়আত হই। আল্লাহর ৪২২ নবি আমাকে লক্ষ করে বলেন, 'তুমি আল্লাহর তরবারিসমূহের একটি, যা আল্লাহ মুশরিকদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।' তিনি আমার জন্য বিজয় ও সাহায্যের দুআ করে গেছেন। এ কারণে আমার নাম হয়ে গেছে 'সাইফুল্লাহ'। আমি মুসলিমদের মধ্যে মুশরিকদের ওপর সবচেয়ে কঠোর।

- আপনারা মানুষকে কীসের দিকে আহ্বান করেন?
- আমরা মানুষকে 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল,' এই সাক্ষ্য প্রদানের আহ্বান জানাই এবং আল্লাহর রাসুল যা কিছু নিয়ে এসেছেন, সেগুলো স্বীকার করার আহ্বান করে থাকি।
- যারা আপনাদের দাওয়াত গ্রহণ করে না, তাদের ব্যাপারে আপনাদের সিদ্ধান্ত কী?
- তারা জিজয়া প্রদান করবে, আমরা তাদের নিরাপত্তাভার নেব।
- যদি তারা জিজয়া দিতে রাজি না হয়?
- আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি।
- আজ যদি কেউ আপনাদের দীনে প্রবেশ করে, তার অবস্থান কী হবে?
- আল্লাহ আমাদের ওপর যা ফরজ করেছেন, সেসব ব্যাপারে তার অবস্থান হবে ঠিক আমাদের মতো। আমাদের এখানে উঁচু-নীচু, প্রথম ও শেষ এসবের কোনো ভেদাভেদ নেই।
-আজ যে আপনাদের দীনে প্রবেশ করবে, সে কি আপনাদের সমান প্রতিদান পাবে?
-হ্যাঁ; বরং বেশিই পাবে।
- আপনাদের সমান হবে কীভাবে? অথচ আপনারা এ ব্যাপারে কতই-না অগ্রগামী?
- আমরা এই দীন কবুল করেছি। নবির হাতে বায়আত হয়েছি। তিনি যতদিন আমাদের মধ্যে জীবিত ছিলেন, ততদিন তাঁর কাছে ঐশী-নির্দেশনা আসত। তিনি আমাদের সেই কিতাবের সংবাদ দিতেন, মুজিজা দেখাতেন, আমরা যারা তা দেখেছি, শুনেছি, আমাদের জন্য তাঁর আনুগত্য প্রদর্শন ও বায়আতগ্রহণ জরুরি ছিল। কিন্তু আমরা যা দেখেছি ও শুনেছি, তোমরা তো তা দেখোনি বা শোনোনি, তাই তোমাদের যারা নিষ্ঠ চিত্তে ইসলামগ্রহণ করবে, সে আমাদের থেকে উত্তমই পরিগণিত হবে।
-(জারজাহ চিৎকার দিয়ে বলে) আল্লাহর দোহাই, আপনি সত্য বলছেন! আমাকে প্রতারিত করছেন না তো?
-আল্লাহর শপথ, আমি সত্য কথা বলেছি। তুমি আমাকে যে বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছ, এর ওপর আল্লাহ সাক্ষী।

এ কথা শুনে জারজাহ তার ঢাল ঘুরিয়ে খালিদের সঙ্গী হয়ে যায়। এরপর সে আবেদন করে, 'আমাকে ইসলাম শিক্ষা দিন।' খালিদ তাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের তাঁবুতে চলে আসেন। তাকে গোসল করার নির্দেশ দেন। এরপর দুই রাকআত সালাত পড়ান। জারজাহ খালিদের সঙ্গে চলে আসতেই রোমানরা আক্রমণ তীব্র করে তোলে। ফলে প্রথমদিকে মুসলিমদের পা টলতে শুরু করে। ইকরিমা ইবনু আবি জাহল আর হারিস ইবনু হিশামের নেতৃত্বে শুধু প্রতিরক্ষাবাহিনী তাদের অবস্থানে অবিচল থাকে। ৪২৩

৪. মুসলিম ডান বাহুতে রোমান বাম বাহুর আক্রমণ
অন্ধকার রাতের মতোই রোমানবাহিনী মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে এগিয়ে আসছিল। তাদের বাম বাহু মুসলিমদের ডান বাহুর ওপর আক্রমণ করে বসে। ফলে মুসলিমবাহিনীর মধ্যসারি ডান বাহুর সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। রোমানবাহিনী মুসলিমদের বিক্ষিপ্ত করে দিয়ে একেবারে পেছনের সারি পর্যন্ত পৌঁছে যেতে সমর্থ হয়। এ দৃশ্য দেখে মুআজ ইবনু জাবাল মুসলিমদের উদ্দেশে চিৎকার দিয়ে বলতে থাকেন, 'আল্লাহর বান্দারা, এরা তোমাদের ওপর বিজয়ী হতে আক্রোশে ফেটে পড়ছে। আল্লাহর শপথ, তোমাদের ধৈর্য আর অবিচলতাই ওদের ফিরিয়ে দিতে পারে।' এরপর তিনি ঘোড়া থেকে নেমে বলেন, 'যে আমার ঘোড়া নিয়ে লড়তে ইচ্ছুক, সে ঘোড়াটা নিয়ে নিক!' তিনি নিজে পদাতিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। ৪২৪

আজদ, মাজহাজ, হাজারামাউত ও খাওলানের লোকজন বীরত্ব ও দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই করে শত্রুবাহিনীর অগ্রযাত্রা রুখে দিতে সক্ষম হয়। রোমানরা পাহাড়-উঁচু আক্রমণের ঢেউ তুলে মুসলিমবাহিনীর ডান বাহু ও মধ্যসারির দিকে চলে আসে। এমতাবস্থায় মুসলিমবাহিনীর একটা দল পৃথক হয়ে শিবিরের দিকে চলে যায়। তবে বড় একটা দল তাদের অবস্থানে অনড় থেকে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে। জুবায়দের লোকজন শুরুতে বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলেও পরে আবার জড়ো হয়ে যায়। তারা তখন দিক পালটে তীব্রগতিতে শত্রুর ওপর হামলে পড়ে ওদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। বিক্ষিপ্ত হওয়া মুসলিমদের পিছুধাওয়া থেকেও ওদের বিরত রাখতে সমর্থ হয়। যারা শিবিরের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিল, মুসলিম বীরাঙ্গনারা লাঠি ও পাথর হাতে তাদের স্বাগত জানাচ্ছিল। ফলে ওরা পুনরায় নিজেদের সারি বিন্যস্ত করে নেয়। ৪২৫ ইকরিমা ইবনু আবি জাহল বলেন, 'আমি আল্লাহর রাসুলের সঙ্গে অনেক যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আজ কি আমি পলায়ন করতে পারি?' এরপর তিনি ঘোষণা দেন, 'কে আছ মৃত্যুর বায়আতকারী?' তাঁর চাচা জিরার ইবনুল আজওয়ার ও হারিস ইবনু হিশাম তখন ৪০০ অশ্বারোহী নিয়ে তাঁর হাতে বায়আত হন। তাঁরা তখন খালিদের সামনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যান। একপর্যায়ে সবাই আহত হয়ে পড়েন। অনেকে শাহাদাতবরণ করেন। শহিদদের একজন ছিলেন জিরার ইবনুল আজওয়ার। ৪২৬

ওয়াকিদিসহ কতিপয় ইতিহাসবিদের বর্ণনায় রয়েছে, জিরার আহত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে গেলে তিনি পানি পান করতে চাচ্ছিলেন। যখন তাঁর কাছে পানি নিয়ে যাওয়া হয়, তখন দেখতে পান আরেক আহত ব্যক্তি পানির দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে আছে। তিনি পানিবাহককে বলেন, 'আগে ওকে পান করিয়ে এসো!' দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনিও অনুরূপ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে বলেন, আগে ওকে পান করিয়ে এসো!' তৃতীয় ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। শুধু তা-ই নয়, মুসলিম ভাইকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এ প্রবণতা থেকে তাঁরা সবাই পানির বদলে শাহাদাতের শরাবে চুমুক দেন। রাজিআল্লাহু আনহুম আজমাইন।

বলা হয়ে থাকে, সেদিন যিনি প্রথমে শাহাদাতবরণ করেন, তিনি ইতিপূর্বে আবু উবায়দার কাছে গিয়ে বলেছিলেন, 'আমি সব প্রস্তুতি সেরে নিয়েছি। রাসুলের সঙ্গে কি আপনার কোনো কাজ আছে?' জবাবে আমিনুল উম্মাহ বলেন, 'রাসুল ﷺ-কে আমার সালাম দেবে আর বলবে, আল্লাহর রাসুল, আমাদের প্রতিপালক আমাদের সঙ্গে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তা সত্য পেয়েছি।'

এরপর ওই মুজাহিদ যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকেন এবং একপর্যায়ে শাহাদাতের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। সকল মানুষ নিজেদের পতাকার নিচে অবস্থান করে দৃঢ়পায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। রোমানরা চাকার মতো চারদিকে ঘুরছিল। সেদিন ইয়ারমুকের রণাঙ্গনে কেবল কর্তিত মস্তক, বলবান বাহু আর কবজিগুলোই উড়তে দেখা যাচ্ছিল। ৪২৭

৫. রোমান ডান বাহুর মুসলিমদের বাম বাহুতে আক্রমণ
কানাতিরের নেতৃত্বে রোমানদের ডান বাহু মুসলিম বাম বাহুর ওপর হামলে পড়ে। মুসলিম বাম বাহুতে ছিল কিনানা, কায়েস, খুসআম, জুজাম, কুজাআ, আমিরা ও গাসসান গোত্রসমূহের লোকজন। তাঁদের বাধ্য হয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে যেতে হয়। রোমানরা তখন পিছিয়ে যাওয়া মুসলিমদের ওপর আছড়ে পড়ে ধাওয়া শুরু করে। ধাওয়া খেয়ে মুসলিমরা শিবিরের কাছাকাছি পৌঁছলে ওদিক থেকে মুসলিম বীরাঙ্গনারা লাঠি ও পাথর হাতে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। মহিলারা পাথর ছুড়ে বলছিলেন, 'ইসলাম, মা আর স্ত্রীদের ইজ্জত কোথায় চলে গেল? তোমরা কাফিরদের জন্য আমাদের রেখে কোন দিকে পালিয়ে যাচ্ছ?'

নারীরা যখন এভাবে তাঁদের পৌরুষ ধরে নাড়া দেন, তখন তাঁদের চেতনা ফিরে আসে। তাঁরা যারপরনাই লজ্জিত হয়ে পুনরায় রণাঙ্গনে গিয়ে দৃঢ়পায়ে লড়তে থাকেন। রোমানদের বিপুলসংখ্যক লোক নিহত হয়েছিল। একপর্যায়ে মুসলিমদের একাংশের সেনাপতি সায়েদ ইবনু জায়েদ শাহাদাতবরণ করেন। তখন রোমানদের বাম বাহু ফের মুসলিম ডান বাহুর ওপর আক্রমণে তৎপর হয়ে ওঠে। তারা আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ওপর হামলা করে তাঁদের প্রায় অবরুদ্ধ করে ফেলে; কিন্তু আমরের বাহিনী অত্যন্ত দৃঢ়পদে মোকাবিলা করতে থাকে। তারপরও রোমানরা মুসলিমবাহিনীর শিবিরে পৌঁছে যেতে সমর্থ হয়।

এ অবস্থা দেখে মুসলিম নারীরা পুনরায় পাহাড় থেকে নেমে এসে পাথর ছুড়তে থাকেন। তাঁরা পুরুষ-যোদ্ধাদের ভর্ৎসনা করে বলছিলেন, 'যদি তোমরা আমাদের নিরাপত্তা দিতে না পারো, তাহলে তোমরা আমাদের স্বামী নও।' এর ফলে মুসলিমরা নবপ্রেরণায় উদ্দীপিত হয়ে ওঠেন। পুনরায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। তাঁরা তখন রোমানদের ওপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন যে, শত্রুবাহিনী এখান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ৪২৮

৬. পালানোর পথ করে দেওয়া এবং পদাতিক বাহিনীকে ধ্বংস
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে রোমানদের সেই বাম বাহুর ওপর ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে বসেন, যারা মুসলিমবাহিনীর ডান বাহুকে মধ্যভাগের দিকে ঠেলে নিয়ে আসছিল। তিনি তখন মুসলিমবাহিনীর উদ্দেশে বলছিলেন, 'আল্লাহর শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ; তোমরা যা দেখেছ এ ছাড়া তাদের কাছে এখন ধৈর্য আর শক্তি বলতে কিছুই নেই। আমার বিশ্বাস, ওদের গর্দানগুলোও আল্লাহ তোমাদের কবজায় দিয়ে দেবেন।'

এরপর তিনি অশ্বারোহীদের সঙ্গে নিয়ে রোমানদের ১ লাখ বাহিনীর মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। আক্রমণের ক্ষিপ্রতায় শত্রুবাহিনী ছত্রখান হয়ে যায়। মুসলিমরা সম্মিলিত হামলা চালালে তারা একেবারে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। এরপর তাঁরা ওদের পিছু ধাওয়া শুরু করেন। ৪২৯ মুসলিমবাহিনীর ডান বাহু পলায়নপর রোমানদের পালানোর পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। তারা তখন ইয়ারমুক উপত্যকা ও জারকা নদীর মধ্যবর্তী স্থানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এরপরও যুদ্ধ তুমুল গতিতেই চলছিল। মুসলিমরা ইমানের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে চলছিলেন। কঠিন হামলা চালিয়ে রোমানদের অশ্বারোহী বাহিনীকে পদাতিকদের পাশ থেকে সরিয়ে দিতে সফল হন। এরপর তাদের ওপর হামলে পড়েন। ধাওয়া করে ক্লান্ত করে তোলেন।

রোমান অশ্বারোহীরা তখন পালানোর পথ খুঁজছিল। খালিদ রা. আমর ইবনুল আসকে নির্দেশ দেন, 'ওদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন।' তিনি তা-ই করেন। সুযোগ পেতেই রোমানবাহিনীর ডানায় যেন পালক গজিয়ে ওঠে। তারা দ্রুত পালিয়ে যায়। তাদের পদাতিক বাহিনী তখন অশ্বারোহী বাহিনীর সাহায্য-বঞ্চিত হয়ে পড়ে। এদের শেকলবন্দি করে পরিখার দিকে নিয়ে আসা হয়। তাদের অবস্থা ছিল বিধ্বস্ত দেয়ালের মতো। রাতের আঁধারে টেনে-হিঁচড়ে পরিখার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এতে তারা উপত্যকায় মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছিল। তাদের একজনকে হত্যা করার সঙ্গে সঙ্গে শেকলে বাঁধা সবাই পড়ে যেত। এ পর্যায়ে মুসলিমরা তাদের বড় একটা দলকে হত্যা করতে সক্ষম হন। নিহতদের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২০ হাজারের মতো। তবে তাদের কিছুসংখ্যক ফাহাল ও দামেশকের দিকে পালিয়ে যায়।৪৩০

পরাজিতদের মোকাবিলায় ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে যান। তিনি অত্যন্ত জোরদার আক্রমণ পরিচালনা করেন। তাঁর পিতা তখন তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি ইয়াজিদকে ডেকে বলেন, 'আমার কলিজার টুকরো, খোদাভীতি ও ধৈর্য অবলম্বন করো। আজ এই উপত্যকায় উপস্থিত সকল মুসলিমের ওপর যুদ্ধ জরুরি। মুসলিমবাহিনীর নেতৃত্বে তোমার মতো যাঁরা আছে, তাঁদের ওপর তো অগ্রাধিকারভিত্তিতে জরুরি হবে। প্রিয় ছেলে, আল্লাহকে ভয় করো। তোমার সঙ্গীদের কেউ যেন আল্লাহর শত্রুদের মোকাবিলায় ধৈর্য ও দৃঢ়তায় তোমাকে ছাড়িয়ে না যায়।' ইয়াজিদ জবাবে বলেন, 'জি আব্বা, ইনশাআল্লাহ তা-ই হবে।' এরপর তিনি অবিচলভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যান। এ সময় ইয়াজিদ ছিলেন মুসলিমবাহিনীর মধ্যসারির দিকে। ৪৩১

সায়িদ ইবনুল মুসাইয়িব রা. তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন; 'ইয়ারমুকের দিন নীরবতা ছেয়ে গিয়েছিল। আমরা হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনতে পাই। আওয়াজটা পুরো শিবির থেকেই শোনা যাচ্ছিল। সেটা ছিল- 'আল্লাহর সাহায্য, নিকটে এসে যাও। হে মুসলিমরা, অনড় হয়ে যাও।' আমরা চেয়ে দেখি, সেই আওয়াজদাতা ছিলেন আবু সুফিয়ান রা.। তিনি তাঁর পুত্র ইয়াজিদের পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছিলেন। মুসলিমরা মাগরিব ও ইশার সালাত পিছিয়ে দেন। একপর্যায়ে বিজয় হাতের মুঠোয় আসে। খালিদ রা. রোমান সেনাপতি হিরাক্লিয়াসের ভাই থিয়োডরের তাঁবুতে রাতযাপন করেন। সে পলায়নকারীদের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। অশ্বারোহীরা খালিদের তাঁবুর আশেপাশে টহল দিচ্ছিল। রোমানদের যারাই ওদিকে আসত, তাদের হত্যা করে ফেলা হতো। সকাল পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। থিয়োডরকেও একসময় হত্যা করা হয়। সেদিন তার তাঁবুতে ছিল ৩০টা শামিয়ানা, ৩০টা রেশমের সূর্যরশ্মি প্রতিরোধক। এ ছাড়া ছিল প্রচুর কার্পেট, রেশমের জামাকাপড় ও পর্দা। সেখানে যেসব সম্পদ ছিল, সকাল হলে মুসলিমরা তা গনিমত হিসেবে নিয়ে নেন।৪৩২

৭. যুদ্ধের ফল
এ যুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার মুসলিমযোদ্ধা শহিদ হন। তাঁদের মধ্যে ইকরিমা ইবনু আবি জাহল, তাঁর পুত্র আমর, সালমা ইবনু হিশাম, আমর ইবনু সায়িদ, আবান ইবনু সায়িদসহ রাসুলের সাহাবি, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গও অন্তর্ভুক্ত। অপরদিকে রোমানদের নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার। এদের মধ্যে ৮০ হাজার ছিল শেকলবদ্ধ আর বাকিরা ছিল শেকলবিহীন।৪৩৩

এই বিশাল বিজয় মুসলিমদের আনন্দিত করে তুললেও খলিফা আবু বকরের মৃত্যুসংবাদ সে আনন্দ মাটি করে দেয়। তাঁর ইনতিকালে তাঁরা চিন্তিত হয়ে পড়েন।

আট. আবু বকরের ইনতিকাল, উমরের খিলাফতগ্রহণ ও খালিদের অপসারণ
১. উমরকে খলিফা নির্ধারণ ও আবু বকরের ইনতিকাল
১৩ হিজরির জুমাদাস সানি মাসে খলিফাতুর রাসুল আবু বকর রা. অসুস্থ হন এবং এ অসুস্থতা নিয়েই ২২ জুমাদাল উখরা সোমবার দিবাগত রাতে ইনতিকাল করেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা যখন ক্রমেই অবনতি হচ্ছিল, তখন একসময় তিনি বুঝে নেন, তাঁর বেলা ফুরিয়ে এসেছে। ফলে শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদের সঙ্গে আলোচনা করে খিলাফতের গুরুভার উমর রা.-এর হাতে অর্পণ করেন। রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চলাকালে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের কাছে খলিফা আবু বকরের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছেছিল; কিন্তু তিনি সংবাদটা তখনই মুসলিমদের না জানিয়ে চেপে রাখেন, যাতে মুসলিমবাহিনী মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে না পড়ে। বিজয় পূর্ণতায় পৌঁছার পরই সংবাদটা তাঁদের সামনে প্রকাশ করেন।

২. খলিফা উমর কর্তৃক খালিদকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি
এদিকে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. খলিফা হওয়ার পরপরই শামে খালিদের পরিবর্তে আবু উবায়দাকে সেনাপতি নিয়োগের ফরমান পাঠান। খালিদ আমিরুল মুমিনিনের এই ফরমানকে সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করেন। এরপর খলিফাতুর রাসুলের ইনতিকালে মুসলিমদের পক্ষ থেকে শোকপ্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আবু বকরকে মৃত্যু দান করেছেন। তিনি ছিলেন আমার কাছে উমরের চেয়ে প্রিয়। সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি উমর রা.-কে খলিফা বানিয়েছেন। তিনি আবু বকরের চেয়ে আমার কাছে ছিলেন অপ্রিয়; অথচ আল্লাহ আমার ওপর তাঁকে পছন্দ করা জরুরি করে দিয়েছেন।'৪৩৪ এরপর খলিফা উমরের নির্দেশমতো আবু উবায়দা রা. সেনাবাহিনীর নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন।

উমর রা. খিলাফতের দায়িত্ব হাতে নেওয়ার পর আবু বকরের শাসনামলে নিযুক্ত অনেক প্রাদেশিক গভর্নর, কর্মকর্তা ও সেনাপতিকে অপসারণ করে নতুন দায়িত্বশীল নিয়োগ দেন। এটা খলিফা উমরের ইজতিহাদি বিষয় ছিল। এ হিসেবে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকেও তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিলে সঙ্গে সঙ্গেই খালিদ রা. তা মেনে নেন।

৩. কা'কা ইবনু আমরের কবিতা
ইয়ারমুকের যুদ্ধ প্রসঙ্গে আরবের কবিদের মধ্যে কা'কা ইবনু আমরের কবিতাগুলো হচ্ছে,
দেখোনি কি ইয়ারমুকে আমরা তেমন বিজয়ই লাভ করেছি
যেমন বিজয় লাভ করেছি ইতিপূর্বে ইরাকে।
কুমার ঘোড়ায় চড়ে মাদায়েন ও মারজ আস-সাফারের
স্বাধীন এলাকাগুলো করেছি জয়।
সেই বসরাও জয় করেছিলাম, কা-কা-কারীদের কাছে
যে শহরের আঙিনায় পা রাখা ছিল নিষিদ্ধ।
যারাই সামনে আসছিল তাদের হত্যা করছিলাম
ধারালো তরবারির মাধ্যমে গনিমত কুড়িয়ে নিচ্ছিলাম।
আমরা ইয়ারমুকে রোমানদের হত্যা করেছিলাম।
তারা আমাদের দুর্বলদের সমকক্ষতাও প্রদর্শন করতে পারেনি।
আমরা ধারালো তরবারির মাধ্যমে ওয়াকুসা প্রান্তরে
ওদের বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে দিয়েছিলাম।
সেই ভোরে যখন ভিড় জমেছিল,
তখন তারা এমন জিনিস আস্বাদন করে,
যা ছিল ভীষণ তিক্ত।

৪. রোমানদের পরাজয়
যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে সম্রাট হিরাক্লিয়াস মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বেঁচে যাওয়া তার ভগ্নমনোরথ সেনারা ইনতাকিয়ায় (এন্টিয়ক) গিয়ে পৌঁছলে সে তাদের বলে ওঠে,
-তোমরা ধ্বংস হও! বলো দেখি, তোমরা যাদের মোকাবিলায় লড়ছিলে, তারা কি তোমাদের মতোই মানুষ ছিল না?
-জি, অবশ্যই ছিল।
-সংখ্যায় তোমরা বেশি ছিলে নাকি তারা?
-প্রতিটা জায়গায়ই আমরা তাদের কয়েকগুণ বেশি ছিলাম।
-তারপরও তোমরা পরাজিত হলে কেন?

তখন তাদের এক প্রবীণ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলতে থাকে, 'তারা বিজয়ী হয়েছে; কারণ তারা দিনে থাকে রোজাদার আর রাতে থাকে আল্লাহর দরবারে দণ্ডায়মান। তারা অঙ্গীকার পূরণ করে। কল্যাণের দাওয়াত দেয় এবং অকল্যাণ ও অসত্য থেকে বিরত রাখে। একে অন্যের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করে। আর আমাদের পরাজয়ের কারণ হচ্ছে— আমরা মদপান করি, ব্যভিচার করি, বিভিন্ন হারাম কাজে লিপ্ত হই। ওয়াদা ভঙ্গ করি। অত্যাচার-অনাচার করি। অন্যায় কাজের নির্দেশ প্রদান করি। আল্লাহ যেসব কাজে অসন্তুষ্ট হন, মানুষকে তা থেকে বিরত রাখি না। জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করি।' হিরাক্লিয়াস তখন বলে ওঠে, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি সঠিক বলেছ।'

টিকাঃ
৪১০. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৩।
৪১১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৮।
৪১২. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৪।
৪১৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৮।
৪১৪. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৪।
৪১৫. তারিখু দিমাশক: ২/১২৫।
৪১৬. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৬৩।
৪১৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১০।
*১৮. খালিদের ঘোড়া। শামের কঠিন মরুভূমি পাড়ি দিতে গিয়ে তাঁর প্রিয় ঘোড়া আশকারের খুর জখম হয়ে গিয়েছিল।
৪১৯. আবু বাকরিন রাজুলুদ দাওলাহ: ৮৮।
৪২০. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৬৩।
৪২১. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৬।
৪২২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১০।
৪২৩. প্রাগুক্ত: ৭/১৩।
৪২৪. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৬৯।
৪২৫. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ২২২; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১৯।
৪২৬. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৭০।
৪২৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১২।
৪২৮. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৭৪।
৪২৯. তারতিব ওয়া তাহজিব আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৭১- ফুতুহুল বুলদান, আজদি: ১৭১।
৪৩০. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া ওয়াদ দিফাইয়াহ ইনদাল মুসলিমিন: ১৭৫।
৪৩১. ফুতুহুল বুলদান, আজদি: ২২৮।
৪৩২. তারতিবু ও তাহজিবুল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৭৩।
৪৩৩. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৭৯।
৪৩৪. তারিখু দিমাশক: ২/১২৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00