📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 রোমে হামলার সিদ্ধান্ত ও সুসংবাদসমূহ

📄 রোমে হামলার সিদ্ধান্ত ও সুসংবাদসমূহ


১. রোমযুদ্ধের ব্যাপারে আবু বকরের পরামর্শসভা আহ্বান

ক. শীর্ষ সাহাবিদের নিয়ে আবু বকরের পরামর্শসভা
শাম অভিমুখে সেনা পাঠানোর অভিপ্রায়ে আবু বকর রা. শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শসভা আহ্বান করেন। এ জন্য উমর, উসমান, আলি, তালহা, জুবায়ের, আবদুর রহমান ইবনু আওফ, সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা.-সহ বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বড় বড় সাহাবিকে সমবেত করেন। পরামর্শসভার শুরুতে আবু বকর রা. তাঁদের বলেন, 'আল্লাহর নিয়ামত অসংখ্য। মানুষের সৎকাজ এর বিনিময় হতে পারে না। আল্লাহর অসংখ্য প্রশংসা ও শুকরিয়া যে, তিনি আপনাদের এক কালিমার ওপর জড়ো করেছেন। পরস্পরে ঐক্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন। ইসলামের দিকে পথপ্রদর্শন করেছেন। শয়তানকে আপনাদের থেকে দূরে রেখেছেন। আপনাদের ব্যাপারে শয়তানের এই আশা নেই যে, আপনারা শিরকে লিপ্ত হবেন কিংবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ইলাহ স্থির করবেন। সব আরব মিলে এক জাতি, একই মা-বাবার সন্তান। আমি ইচ্ছা করেছি, শামের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য আপনাদের নির্দেশ দেবো। যে মৃত্যুবরণ করবে, সে তো শাহাদাতের মৃত্যুবরণ করবে। পুণ্যবানদের জন্য আল্লাহর কাছে যা আছে, তা-ই উত্তম। যারা জীবিত থাকবে, তারা আল্লাহর দীনের প্রতিরক্ষার জন্যই জীবিত থাকবে। আল্লাহর কাছে মুজাহিদদের প্রতিদান নিশ্চিত করে নেবে। এটা হচ্ছে আমার মত। এখন আপনারা এ ব্যাপারে নিজ নিজ মত ব্যক্ত করুন।'

তাঁর বক্তব্য শেষ হলে কথা বলতে প্রথমে উমর রা. উঠে দাঁড়ান। তিনি আল্লাহর প্রশংসার পর নবিজির ওপর সালাত পাঠ করে বলেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ যাকে চান তাকে পুণ্যকাজের জন্য চয়ন করেন। আল্লাহর শপথ, আপনি প্রতিটি কল্যাণকাজে আমাদের চেয়ে এগিয়ে থাকেন। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা কেবল তাঁকেই কল্যাণ দান করেন। আল্লাহর শপথ, আমি এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছিলাম; কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা বোধহয় ভিন্ন ছিল। আপনি এখন বিষয়টি আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। আপনি সঠিক চিন্তাভাবনা করছেন। আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান করুন। হিদায়াতের পথে পরিচালিত করুন। অশ্বারোহীর পর অশ্বারোহী, পদাতিকের পর পদাতিক ও দলের পর দল পাঠান। আল্লাহ তাঁর দীনের সাহায্য করবেন। ইসলাম ও মুসলিমদের সম্মান দান করবেন। আল্লাহ তাঁর রাসুলের সঙ্গে যে ওয়াদা করেছেন, তা অবশ্যই পূর্ণ করবেন।'

পরে আবদুর রাহমান ইবনু আওফ রা. দাঁড়িয়ে বলেন, 'আল্লাহর রাসুলের খলিফা, রোমানরা অত্যন্ত শক্তিমান জাতি। আল্লাহর শপথ, আমার মতে আপনি সেখানে একসঙ্গে পুরো বাহিনী পাঠাবেন না; বরং শাম-সীমান্তে ছোট ছোট দলে বাহিনী পাঠান। তারা পর্যায়ক্রমে ওদের ওপর আক্রমণ চালাবে। এভাবেই তাদের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে, তাদের ভূখণ্ড আমাদের দখলে চলে আসবে এবং তাদের সঙ্গে যুদ্ধে শক্তিমত্তা তৈরি হবে। পাশাপাশি আপনি ইয়ামেনবাসী এবং রাবিয়া ও মুজারের লোকদের আপনার পাশে জড়ো করুন। এরপর হয় আপনি নিজে অথবা অন্য কোনো সেনাপতি পাঠিয়ে তাদের ওপর হামলা পরিচালনা করুন।' তাঁর কথা বলা শেষ হলে মজলিস কিছুক্ষণ নীরব থাকে। কেউ কোনো কথা বলেননি। আবু বকর রা. তখন তাঁদের বলেন, 'আল্লাহ আপনাদের ওপর রহম করুন, আপনাদের মতামত কী?'

তখন উসমান রা. দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা এবং নবিজির ওপর দুরুদ পাঠ করে বলতে থাকেন, 'আপনি দীনের একজন কল্যাণকামী। মুসলিমদের ওপর অত্যন্ত দয়ালু। আপনি যখন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং পরিণামের দিক দিয়ে এটাকে কল্যাণকর মনে করেছেন, তখন আমার মত হচ্ছে, আপনি নির্ভয়ে তা বাস্তবায়ন করুন। আমরা যেমন আপনার ধারণাকে সংকীর্ণ মনে করি না, তেমনি আপনার নিষ্ঠাকে প্রশ্নবিদ্ধ করব না।' তাঁর এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে তালহা, জুবায়ের, সাআদ, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, সায়েদ ইবনু জায়েদ রা.-সহ সকল আনসার ও মুহাজির সাহাবি একবাক্যে বলে ওঠেন, 'উসমান সঠিক বলেছেন। আপনি আপনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করুন। আমরা আপনার কথা শুনব, মানব। আপনার সিদ্ধান্তকে কখনো প্রশ্নবিদ্ধ করব না।'

সাহাবিরা এভাবে কথাবার্তা বলছিলেন; কিন্তু আলি রা. ছিলেন সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। আবু বকর রা. তখন তাঁকে বলেন, 'আবুল হাসান, আপনি কী বলেন?' জবাবে আলি বলেন, 'আপনি একজন বরকতময় ব্যক্তি। আপনার সিদ্ধান্ত ও পরামর্শে বরকত নিহিত। যদি আপনি নিজে তাদের বিরুদ্ধে বের হন কিংবা অন্য কাউকে পাঠান, তাহলে ইনশাআল্লাহ মুসলিমরা বিজয় ও সাহায্যপ্রাপ্ত হবে।' আবু বকর বলেন, 'আল্লাহ আপনাদের সুসংবাদ শুনতে দিন। আপনি এটা কীভাবে জানলেন?' আলি বলেন, 'আমি নবিজিকে বলতে শুনেছি- “এই দীন বরাবর তার বিরুদ্ধবাদীদের ওপর বিজয়ী থাকবে; আর কিয়ামত পর্যন্ত এই দীন স্বীকারকারীরা বিজয়ী থাকবে।”

আলির মুখে হাদিসটি শুনে তিনি বলেন, 'আপনি যা শুনিয়েছেন, তা কতই-না প্রিয়! আপনি আমাকে আনন্দিত করে তুলেছেন। আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে আপনাকেও আনন্দিত করুন।' এরপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা এবং নবিজির ওপর দুরুদ পাঠ করে বলেন, 'লোকসকল, আল্লাহ ইসলামের মাধ্যমে আপনাদের পুরস্কৃত করেছেন; আর জিহাদের মাধ্যমে সম্মান দান করেছেন। এই দীনের মাধ্যমে অন্যসব ধর্মাবলম্বীর ওপর আপনাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন। অতএব, আল্লাহর বান্দারা, শামে রোমানদের ওপর আক্রমণের জন্য তৈরি হোন। আমি আপনাদের সেনাপতি নির্ধারণ করে দেবো। তাদের যুদ্ধ-পতাকা দেবো। আপনারা আপনাদের রবের আনুগত্য করুন। নিয়ত ও জীবনকে শুদ্ধ করুন। হালাল খাবার ভক্ষণ করুন। কারণ, আল্লাহ তো তাদের সঙ্গেই থাকেন, যারা মুত্তাকি এবং যারা সৎকাজ করে। ১৩৭১

এর পর তিনি বিলাল রা.-কে লোকজনের মধ্যে ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দেন। বিলাল তখন এই বলে ঘোষণা দেন, 'মুসলিমরা, তোমরা শামে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নাও। ১৩৭২

খ. পরামর্শসভা গুরুত্বপূর্ণ দিক
• এই পরামর্শসভা থেকে আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে আবু বকরের কার্যপদ্ধতি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, তিনি ততক্ষণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেন না, যতক্ষণ-না কর্তৃত্ব ও সমাধানের যোগ্যতাধারী সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। এরপর আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে যে সিদ্ধান্তই সামনে আসত, সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিতেন। এটি রাসুলের সুন্নাহ। সিরাতের গ্রন্থসমূহে আমরা এমন অনেক দৃষ্টান্ত খুঁজে পাই, যেখানে তিনি এমন কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতেন।

• এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করলে আমাদের সামনে এ সত্যই প্রতিভাত হয়ে ওঠে যে, রোমে আক্রমণের ব্যাপারে সাহাবিদের সর্বসম্মত অভিমত পাওয়া গিয়েছিল। অবশ্য আক্রমণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাঁদের মতভিন্নতা ছিল। উমরের মত ছিল, 'বাহিনীর পর বাহিনী পাঠানো, যাতে শামে মুসলিমদের এমন এক বিশাল বাহিনী জড়ো হয়ে যায়, যারা শত্রুদের রুখে দাঁড়াবে।' আবদুর রাহমান ইবনু আওফের মত ছিল, 'প্রথমে ছোট ছোট বাহিনীর মাধ্যমে আক্রমণ গড়ে তোলা হোক, যারা শামে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে মদিনায় আসা-যাওয়া করবে। এরপর যখন শত্রুরা ভীত ও দুর্বল হয়ে পড়বে, তখন বিশাল বাহিনী নিয়ে হামলে পড়া যাবে।' আবু বকর রা. আক্রমণের ক্ষেত্রে উমরের মতকে অগ্রাধিকার দেন; আর ইয়ামেনবাসী ও আরবের বিভিন্ন গোত্রের সহায়তা চাওয়ার ক্ষেত্রে আবদুর রাহমান ইবনু আওফের মত দ্বারা উপকৃত হন।৩৭৩

২. ইয়ামেনবাসীকে যুদ্ধে বেরোনোর নির্দেশসংবলিত চিঠি
আবু বকর রা. পত্রযোগে ইয়ামেনবাসীকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। তাঁর সে চিঠির ভাষ্য ছিল,

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আল্লাহর রাসুলের খলিফার পক্ষ থেকে ইয়ামেনের সে-সকল মুমিন মুসলিমের প্রতি, যাদের এই চিঠি পড়ে শোনানো হবে। আসসালামু আলাইকুম।

আমি আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। নিঃসন্দেহে আল্লাহ ইমানদারদের ওপর জিহাদ ফরজ করেছেন। তাদের নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন জিহাদের জন্য বের হয়-চাই চলাফেরা তার ওপর ভারী হোক কিংবা হালকা। আল্লাহর রাস্তায় যেন তারা জানমাল দ্বারা জিহাদ করে। কারণ, জিহাদ হচ্ছে ফরজ ইবাদত। আল্লাহর কাছে এর অনেক বড় সাওয়াব রয়েছে। আমরা শামে রোমানদের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য মুসলিমদের আহ্বান করছি। যারা দ্রুত বেরিয়ে এসেছেন, তাদের নিয়ত সঠিক। এর জন্য রয়েছে বিশাল পুণ্য।

আল্লাহর বান্দারা, তোমরাও জিহাদের দিকে দ্রুত বেরিয়ে এসো। নিজেদের নিয়ত ঠিক করে নাও। তোমাদের জন্য দুটি কল্যাণের একটি নিশ্চিত— হয় তোমরা শাহাদাতবরণ করবে, নতুবা বিজয় ও গনিমত নিয়ে ফিরবে।

আল্লাহ তাআলা বান্দার কাজ ছাড়া কেবল কথায় সন্তুষ্ট হন না। আল্লাহর শত্রুদের সঙ্গে ততক্ষণ যুদ্ধ চলতে থাকবে, যতক্ষণ-না তারা সত্য গ্রহণ করে, কুরআনের নির্দেশের স্বীকৃতি দেয়।

আল্লাহ তোমাদের দীনকে হিফাজত করুন। তোমাদের অন্তরসমূহ হিদায়াতপ্রাপ্ত করুন। তোমাদের আমলসমূহ পবিত্র করুন। ধৈর্যধারণকারী মুজাহিদদের সাওয়াব তোমাদের দান করুন।৩৭৪

আবু বকর রা. আনাস ইবনু মালিকের মাধ্যমে চিঠিটা পাঠিয়েছিলেন। এ চিঠির মাধ্যমে মুসলিমদের এক পতাকাতলে নিয়ে আসা ও জিহাদের প্রতি তাঁদের উৎসাহ প্রদানের কৃতিত্ব প্রকাশ পায়। এটাকেই সেনাবাহিনীর সদস্যপদে সাধারণ ভর্তি নামে অভিহিত করা যায়।৩৭৫ ইয়ামেনবাসীর নামে আবু বকরের এ চিঠি পাঠানোর ফলে সেখানকার বিপুলসংখ্যক মানুষ চারদিক থেকে স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্ট চিত্তে যুদ্ধের ময়দানে বেরিয়ে পড়েন।

খলিফার প্রতিনিধি হিসেবে আনাস রা. ইয়ামেনের প্রতিটা গোত্রের কাছে যেতেন এবং সেটা পড়ে শোনাতেন। যুদ্ধে দ্রুত বেরোতে আগ্রহ জোগাতেন। তিনি বলেন, যারাই চিঠির আহ্বান শুনেছে, তারাই আমাকে সন্তোষজনক উত্তর দিয়েছে। তারা বলছিল, 'আমরা বেরিয়ে পড়ছি।' একপর্যায়ে জুল-কিলার কাছে গিয়ে তাঁকে চিঠিটা পড়ে শোনাই। তখনই তিনি নিজের ঘোড়া ও অস্ত্র চেয়ে পাঠান। এরপর পুরো গোত্রে চক্কর দিয়ে যুবকদের অবিলম্বে বেরিয়ে আসার নির্দেশ দেন। দেখতে দেখতে ইয়ামেনের বিপুলসংখ্যক মানুষ তাঁর ডাকে সাড়া দেয়। তিনি তখন তাদের বলেন, 'তোমাদের কল্যাণকামী ভাইয়েরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও বিশাল প্রতিদানের প্রতি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছেন। অতএব, যারা এই পুণ্যকাজে অংশগ্রহণে আগ্রহী, তারা আমাদের সঙ্গে দ্রুত বেরিয়ে পড়ো।৩৭৬

আনাস রা. ১২ হিজরির ১১ রজব মদিনায় পৌঁছে আবু বকরকে ইয়ামেনবাসীর আগমনের সুসংবাদ দেন। তিনি বলেন, 'ইয়ামেনের বাহাদুর, দুঃসাহসী অশ্বারোহীরা বিক্ষিপ্ত চুল ও ধুলোমলিন অবস্থায় আপনার কাছে চলে আসছে। তারা তাদের মালসামানা এবং নারী-শিশুদের সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছে।' আনাস রা. ফিরে আসার অল্প কদিনের মধ্যেই অর্থাৎ, ১২ হিজরির ১৬ রজব জুল-কিলা হিমইয়ারি তাঁর গোত্রের লোকজনকে নিয়ে মদিনায় এসে পৌঁছান। এই নিঃশর্ত গ্রহণযোগ্যতা কেবল হিমইয়ারিদেরই বৈশিষ্ট্য ছিল। না; বরং ইয়ামেন থেকে যারাই মদিনায় এসেছিল, তাদের সবার অবস্থাই ছিল এমন। উদাহরণত, হামাদানের লোকজন হামজা ইবনু মালিকের নেতৃত্বে ২ হাজারের অধিক যোদ্ধা নিয়ে মদিনায় আসে।৩৭৭

ইয়ামেনবাসী মদিনায় আসার পর মসজিদে নববিতে আবু বকরের সঙ্গে যখন সাক্ষাৎ করে এবং তাঁর থেকে কুরআনের বাণী শুনতে পায়, তখন আল্লাহর ভয়ে তাদের অন্তরে কম্পন শুরু হয়ে যায়। তারা তখন নিজেদের ধরে রাখতে পারেনি। তাদের কাঁদতে দেখে আবু বকরও কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্নাবিজড়িত কণ্ঠেই বলেন, 'আমরাও তো এমন ছিলাম; কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের অন্তর পাষাণ হয়ে গেছে। ৩৭৮

৩. জুল-কিলার খোদাভীরুতা
জুল-কিলা যখন আবু বকরের প্রতি তাকিয়ে দেখেন, তিনি একজন শীর্ণকায় বুড়ো। চেহারা মাংসল নয়। গায়ে মোটা কাপড়, চাকচিক্যহীন; কিন্তু চেহারা থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে ইবাদত ও আল্লাহভীতির দ্যুতি। জুল-কিলা যখন ইয়ামেন থেকে আবু বকরের কাছে আসেন, তখন তাঁর আশেপাশে ছিল ১ হাজার অশ্বারোহী গোলাম। মাথায় ছিল মুকুট। তাঁর জামার মূল্যবান পাথরগুলো দ্যুতি ছড়াচ্ছিল। তাঁর চাদরে সোনালি সুতোর ওপর মণিমাণিক্যখচিত ছিল। তিনি ও তাঁর সাথিরা আবু বকরের দুনিয়াবিমুখতা, পরহেজগারি আর সাধারণ বেশভূষা দেখে একেবারে হতবাক হয়ে পড়েন। তাঁরা তখনই সেসব পোশাক খুলে আবু বকরের মতো সাধারণ বেশ ধারণ করেন।

জুল-কিলা আবু বকরকে দেখে বেশ প্রভাবিত হন। তিনি তাঁর মতো পোশাক গায়ে চড়িয়ে নেন। একদিন লোকজন তাঁকে মদিনার বাজারে দেখতে পায়—তাঁর কাঁধে রয়েছে বকরির চামড়া। গোত্রের লোকজন তাঁকে এমন অবস্থায় দেখতে পেয়ে একেবারে অস্থির হয়ে ওঠে। তাঁকে বলতে থাকে, 'আপনি তো দেখি মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে আমাদের অপমানিত করে ছাড়বেন।' জুল-কিলা তাদের বলেন, 'আপনারা কি চান, জাহিলিয়াতের সময় আমি যেমন অহংকারী আর দাম্ভিক ছিলাম, এখনো তেমন থেকে যাই? আল্লাহর শপথ, এমনটা হতেই পারে না। দুনিয়ার জীবনে কেবল আল্লাহর আনুগত্য, বিনয় আর পরহেজগারিই থাকতে পারে। '৩৭৯

জুল-কিলা হিমইয়ারি যা করেছিলেন, ইয়ামেনের অন্য বাদশাহরাও তা থেকে পিছিয়ে ছিলেন না। তাঁরাও তাঁদের পোশাক আর মূল্যবান পাথরখচিত মুকুটগুলো শরীর থেকে নামিয়ে নিয়েছিলেন। মণিমুক্তাখচিত মখমলের মিহি কাপড়গুলোও ছুড়ে ফেলেন। এরপর মদিনার বাজার থেকে মোটা কাপড়ের পোশাক কিনে গায়ে জড়িয়ে নেন। আবু বকর রা. তাঁদের সেই মূল্যবান পোশাকগুলো বায়তুলমালে জমা করেন। ৩৮০

রাসুলের পর নিজের জীবনে ইসলাম বাস্তবায়নকারীদের মধ্যে আবু বকরই ছিলেন সবার শীর্ষে। তিনি যুগোপযোগী ভাষায় মানুষকে আল্লাহর দীনের দিকে আহ্বান জানাতেন। সবচেয়ে কার্যকর উপদেশ তো তা-ই, যা মানুষ কেবল কানে না শুনে চর্মচক্ষে দেখতে পায়। উত্তম উপদেশকারী তো সে-ই, যে জিহ্বার ভাষায় উপদেশ না দিয়ে কাজের ভাষায় উপদেশ দিয়ে থাকে।

ইয়ামেনের বাদশাহরা যখন দেখতে পান আবু বকর রা. - পুরো জাজিরাতুল আরব যাঁর নির্দেশে চলে—অতি সাধারণ পোশাক ও পাগড়ি পরে মদিনার বাজারে ঘোরাফেরা করেন, তখন তাঁরা এই বাস্তবতার সন্ধান পেয়ে যান যে, কারুকার্যখচিত পোশাকের চেয়ে আও বড় কিছু রয়ে গেছে; আর সেটা হচ্ছে মহান ব্যক্তিত্ব। তাই তাঁরা আবু বকরের সাযুজ্য অবলম্বনে দ্রুত মনোযোগ দেন। তাঁরা তখন মুকুট ও কারুকার্যখচিত পোশাক পরা অবস্থায় আবু বকরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে লজ্জা অনুভব করতে থাকেন। তাঁর সামনে নিজেদের ছোট অনুভব করতে থাকেন। তাঁরা তাঁদের আত্মম্ভরিতা ও অহংকার দূরে ছুড়ে ফেলেন। যেভাবে ছোট ছোট তারকা সূর্যের মোকাবিলায় ম্লান হয়ে আসে, আবু বকরের সামনে তাঁদের অবস্থাও হয় অনুরূপ। আল্লাহ আবু বকরের ওপর রহম করুন। তিনি বিনয়ে ছিলেন অনেক ঊর্ধ্বে এবং মর্যাদার অনুপাতে ছিলেন একেবারে বিনয়ী। ৩৮১

টিকাঃ
১. এই অর্থসংবলিত অনেক বর্ণনা বিভিন্ন সাহাবির থেকে বর্ণিত হয়েছ। দ্র. সহিহ বুখারি, আল-ইতিসাম: ৭৩১১। সহিহ মুসলিম, আল-ইমারাহ অধ্যায়: ১৫৩৩।
২. তারিখু দিমাশক, ইবনু আসাকির: ২/৬৩-৬৫- হুমায়দি।
৩. আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি: ৯/১৮৮।
৪. তারিখু ফুতুহিশ শাম, বালাজুরি: ৪৮; তাহজিবু তারিখি দিমাশক: ১/১২৯।
৫. তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম: ২৯৪।
৬. আল-কামিল, ইবনু আসির ২/৬৪; আল-ইয়ামান ফি সাদরিল ইসলাম: ৩০১-৩০২।
৭. আল-ইয়ামান ফি সাদরিল ইসলাম: ৩০২।
৮. আস-সিদ্দিক আওয়ালুল খুলাফা ১১৪; আবু বকর, তানতাবি: ২১৮।
৯. মুরুজুজ জাহাব, মাসউদি: ২/৩০৫।
১০. তারিখু দিমাশক: ২/১২৫।
১১. আত-তারিখুল ইসলামি: ১০/৩১৯।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 সেনাপতি নিয়োগ ও বাহিনী প্রেরণ

📄 সেনাপতি নিয়োগ ও বাহিনী প্রেরণ


আবু বকর রা. শামে বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। লোকজনকে জিহাদের দাওয়াত দেন এবং এ উদ্দেশ্যে তিনি চারটি বাহিনী প্রস্তুত করেন :

১. ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ানের বাহিনী
এটিই ছিল সেই প্রথম বাহিনী, যারা শাম অভিমুখে এগিয়ে গিয়েছিল। ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ানের দায়িত্ব ছিল, দামেশক জয় করার পর অপর তিনটি বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা। ইয়াজিদের বাহিনীতে প্রথমদিকে সেনাসংখ্যা ছিল ৩ হাজার। এরপর খলিফা আরও সাহায্যকারী মুজাহিদ পাঠিয়েছিলেন। ফলে তাঁর বাহিনীর সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৭ হাজার। ইয়াজিদের বাহিনী পাঠানোর আগে আবু বকর রা. প্রভাব বিস্তারকারী গুরুত্বপূর্ণ যে উপদেশ দিয়েছিলেন, তা ছিল যুদ্ধ ও সন্ধির ব্যাপারে স্পষ্ট প্রজ্ঞাপূর্ণ। তিনি পায়ে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে ইয়াজিদকে বিদায় জানান এবং উপদেশস্বরূপ বলেন,

আমি তোমাকে পরীক্ষা করতে শাসক নিযুক্ত করছি। তোমার অভিজ্ঞতা যাচাই করব। তোমাকে অভিজ্ঞ করে তুলব। যদি সুচারুরূপে দায়িত্ব পরিচালনা করতে পারো, তাহলে তোমাকে পুনরায় ওই কাজে নিযুক্ত করব। আরও বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেবো; কিন্তু ত্রুটি করলে তোমাকে পদচ্যুত করব। আল্লাহভীতিকে আবশ্যকীয় বিষয় হিসেবে ধারণ করবে। তিনি তোমার ভেতরটা সেভাবে দেখে থাকেন, যেভাবে বাহ্য অবস্থা দেখে থাকেন। সে ব্যক্তি আল্লাহর অনুগ্রহের অধিক দাবিদার, যে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বের দাবি বেশি করে আদায় করে থাকে। সে-ই আল্লাহর নৈকট্যধন্য, যে নিজের কাজকর্মের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্যপ্রার্থী হয়।

আমি খালিদের জায়গায় তোমাকে নিযুক্ত করেছি। সাবধান, জাহিলিয়াতের সাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে বেঁচে থাকবে। আল্লাহর কাছে এমন লোক চূড়ান্ত পর্যায়ের ঘৃণিত। নিজ বাহিনীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে। তাদের কল্যাণের অঙ্গীকার দেবে। যখন উপদেশ দেবে, সংক্ষিপ্ততা অবলম্বন করবে। কারণ, কথা লম্বা হয়ে গেলে তাতে অপ্রয়োজনীয় বিষয় এসে যায়। নিজেকে ঠিক রাখবে, তখন মানুষও তোমার জন্য ঠিক হয়ে যাবে। সালাতসমূহ যথাসময়ে রুকু-সিজদার সঙ্গে পূর্ণরূপে আদায় করবে। সালাতে বিনয় ও নম্রতাকে গুরুত্ব দেবে। শত্রুবাহিনীর কোনো দূত এলে সম্মান করবে এবং দ্রুত বিদায় করে দেবে। তারা যাতে তোমার সেনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য নিয়ে যেতে না পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। নিজেদের কোনো বিষয় তাদের সামনে প্রকাশ করবে না। তারা যেন তোমার কোনো দুর্বলতা জানতে না পারে, সে ব্যাপারে চৌকশ থাকবে। তাদেরকে সেনাবাহিনীর মধ্যখানে রাখবে, যাতে মুসলিমবাহিনীর শক্তি দেখে ভীত হয়ে পড়ে। তাদের সঙ্গে নিজের লোকদের আলাপ জমাতে নিষেধ করবে। নিজেই তাদের সঙ্গে কথা বলবে। কখনো রহস্য উন্মোচন করবে না। যখন পরামর্শ নেবে, সত্য কথা বলবে; তাহলে সঠিক পরামর্শ পাবে। পরামর্শকদের থেকে কোনো ঘটনা গোপন করবে না, নতুবা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সাথিদের সঙ্গে রাতে কথাবার্তা বলবে, তাহলে দিনের সংবাদ জানতে পারবে। এমতাবস্থায় তোমার সামনে থেকে পর্দা সরে যাবে। নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীতে বেশিসংখ্যক সদস্য রাখবে। সেনাবাহিনীর মধ্যে তাদের ছড়িয়ে দেবে। আগাম না জানিয়ে আচমকা মাঝেমধ্যে তাদের কাছে যাবে। যাকে দায়িত্ব পালনে গুরুত্বহীন পাবে, তাকে খুব শাসাবে। বাড়াবাড়িহীন শাস্তি দেবে। রাতে পাহারার দায়িত্ব বণ্টন করে দেবে এবং প্রথম প্রহরের কর্তব্যপালন শেষ রাতের কর্তব্যপালন থেকে কিছুটা বেশি রাখবে। দিনের কাছাকাছি হওয়ায় এই পর্যায়টা হয়ে থাকে সহজ। শাস্তিযোগ্য ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে ভয় করবে না। এ ক্ষেত্রে নম্র ব্যবহার করবে না। হ্যাঁ, শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্রুততার আশ্রয় নেবে না; বরং (শাস্তি না দেওয়ার) অজুহাতের সন্ধানে থাকবে।

নিজের বাহিনী সম্পর্কে বেখবর থাকবে না, নাহয় তারা নষ্ট হয়ে যাবে। তবে পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়ে তাদের হেনস্তা করবে না। তাদের গোপন বিষয় মানুষের কাছে প্রকাশ করবে না। তাদের বাহ্য আচরণকেই যথেষ্ট মনে করবে। বেকারশ্রেণির মানুষের সঙ্গে উঠাবসা করবে না। সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গেই উঠাবসা রাখবে। শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলার সময় দৃঢ়তা দেখাবে, ভীরুতা প্রদর্শন করবে না। গনিমতের সম্পদে খিয়ানত থেকে বেঁচে থাকবে। এটা মানুষকে অভাবগ্রস্ত করে তোলে, বিজয় ও সাহায্য রুখে দেয়। তোমরা এমন মানুষেরও সাক্ষাৎ পাবে, যারা ইবাদতখানায় ইবাদতে লিপ্ত, তাদেরকে তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেবে।

আল্লামা ইবনু আসির রাহ. বলেন, এটা হচ্ছে শাসকদের উদ্দেশে সর্বোত্তম উপদেশ। ৩৮৩

২. এই উপদেশসমূহের শিক্ষণীয় দিক

• নেতৃত্ব ও পদ কোনো চিরস্থায়ী অধিকার নয়; বরং এটি উত্তম কৃতিত্ব, সফল দায়িত্ব সম্পাদনের পুরস্কার। যদি কেউ সুন্দর কৃতিত্ব দেখাতে না পারে, দায়িত্ব সম্পাদনে অলসতা দেখায়, তাহলে প্রয়োজনে তাকে পদচ্যুত করতে হবে।

এই অনুভূতি একজন মানুষকে মানগত দিক দিয়ে শীর্ষে পৌঁছাতে অধিক শ্রম ও শক্তি ব্যয়ের প্রতি উৎসাহ জোগায়। যখন তার অনুভূতিতে এটা বসে যাবে যে, সে যা-ই করুক না কেন, তাকে তার পদ থেকে হটিয়ে দেওয়ার মতো কেউ নেই, তখন তার কাজে আলস্য এসে যাওয়া ও দুনিয়ার প্রতি তার ঝুঁকে পড়া অবধারিত হয়ে যায়। এতে দায়িত্ব আদায়ে ত্রুটি আসে। আর অধীনদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাসাদ, দুষ্কর্ম, মতবিরোধ ও ঝগড়া বেড়ে যায়।

• আমলের ক্ষেত্রে তাকওয়া হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আল্লাহ তাআলা বান্দার বাহির-ভেতর সম্পর্কে সম্যক অবহিত। তারা নিজেদের গুপ্ত বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করলে বাহ্য অবস্থায়ও তাকওয়া অবলম্বন করবে। আর এভাবে শাসকশ্রেণি ফ্যাসাদ ও অরাজকতা থেকে দূরে থাকতে সক্ষম হবে, যা সাধারণত লাগামহীন জজবার কারণে সৃষ্ট হয়ে থাকে, যেখানে আল্লাহভীতি মোটেও পাওয়া যায় না।

• ওয়াজ-নসিহতের ক্ষেত্রে কথা সংক্ষিপ্ত করার ব্যাপারে লক্ষ রাখা দরকার। নতুবা মূল কথা ভুলে যাওয়া এবং উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলার প্রবল আশঙ্কা থাকে। শ্রোতারা বক্তব্য দ্বারা উপকৃত হওয়ার পরিবর্তে বক্তব্যের ভাষালংকারে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে বক্তব্যের মধ্যে যদি সাহিত্যের সৌন্দর্য বা উপস্থাপনার সৌকর্য না থাকে, তাহলে শ্রোতা বিরক্ত হয়ে উঠবে। তখন বক্তার বক্তব্য তার কানে ঢুকে না।

• যদি দায়িত্বশীল নিজেকে সংশোধন করে, নিজের দোষত্রুটির ব্যাপারে সতর্ক থাকে, নিজেকে অন্যদের আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলে, তাহলে তার নিজের পরিবর্তনই অন্য মানুষের সংশোধনের জন্য নিয়ামক হয়ে উঠবে।

• বাহ্যিক ও অন্তরঙ্গভাবে সালাতসহ ইবাদতগুলোকে তার সঠিক অবস্থান থেকে আদায়ের প্রতি যত্নবান হওয়া দরকার। বাহ্যত সালাতকে পূর্ণতার সঙ্গে আদায়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে সালাতের রুকনগুলো যথাযথভাবে আদায় করা; আর অন্তরঙ্গতার অর্থ হচ্ছে একাগ্রতার সঙ্গে আদায় করা। এভাবে সালাত আদায়ের মাধ্যমেই জমিনে আল্লাহর জিকিরের দায়িত্ব আদায় হয়ে থাকে। এ ধরনের সালাতই মানুষের কাজ ও ব্যবহারকে সংস্কার করতে পারে। অন্তরে শক্তি বাড়ায়। আত্মাকে প্রশান্ত করে। বিপদাপদে মুসলিমদের আশ্রয় গণ্য হয়।

• শত্রুবাহিনীর দূত এলে তাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করা উচিত। তবে মুসলিমবাহিনীর রহস্য সম্পর্কে তাদের অবহিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। তাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক ব্যবহার মূলত একপ্রকার দাওয়াহ। এর মাধ্যমে শত্রুদের কাছে মুসলিমদের উত্তম আচরণের বার্তা পৌঁছে যায়। তবে সৌজন্য এ পর্যায়ের হবে না, যার ফলে শত্রুরা মুসলিমদের রহস্য সম্পর্কে অবগত হয়ে যায়। তাদের সামনে মুসলিমদের শক্তিমত্তা তুলে ধরা দরকার, যাতে তারা দেশে গিয়ে নিজের জাতিকে মুসলিমদের ব্যাপারে ভয় প্রদর্শন করে। এভাবে শত্রুরা যেন আগে থেকেই মুসলিমদের ব্যাপারে ভীত হয়ে পড়ে।

• রহস্যগুলো সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় গোপন রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বিশেষত যেসব গোপনীয়তা মুসলিমদের স্বার্থ ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট। এতে অলসতা করা যাবে না। মানুষ যতক্ষণ কোনো গোপনীয়তা তার মনের ভেতর লুকিয়ে রাখতে পারে, ততক্ষণ সে বিচক্ষণ গণ্য হয়; কিন্তু যখন তার গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যায়, তখন সব বিষয় তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, সব ছত্রখান হয়ে যায়।

• পরামর্শ গ্রহণের যথার্থতা পরামর্শের পরিণতি নিয়ে চিন্তাভাবনা থেকে শ্রেয়তর। পরামর্শদাতা তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন ও পরামর্শ প্রদানে অভিজ্ঞ থাকলেও যে বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে, সেটা পরামর্শ গ্রহণকারীর কাছে স্পষ্ট না থাকলে পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে কোনো কল্যাণ অর্জন সম্ভব নয়। পরামর্শ গ্রহণকারী যদি বিষয় টা পরামর্শদাতার কাছে বিস্তারিত না বলে, তাহলে সে প্রকারান্তরে নিজের ওপরই জুলুম করল। এ ধরনের পরামর্শগ্রহণ অর্থহীন।

• নেতা ও দায়িত্বশীলদের জন্য তাঁদের অধীনদের সঙ্গে মিলেমিশে চলা দরকার, যাতে তাদের সম্পর্কে জ্ঞাত থাকা যায়। এতে তাদের সমস্যাবলি শোনা ও এর যথাযথ সমাধান সহজ হয়। যে-সকল নেতা ও দায়িত্বশীল কেবল উচ্চপদস্থ লোকদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সাধারণ লোকদের সঙ্গ এড়িয়ে চলে, তারা তথ্যের আদ্যোপান্ত জানতে ব্যর্থ হয়। তারা কেবল ওই বিশেষ লোকদের দেওয়া সংবাদই জানতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত হতে পারে। এ ছাড়া এ কারণে অনেক সময় ভুল বিষয় সামনে এসে যেতে পারে।

• মুসলিমদের নিরাপত্তার জন্য পাহারার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে শঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে। তবে নিরাপত্তারক্ষী ও প্রহরীদের ওপর ভরসা করে থাকা উচিত হবে না; বরং এদের পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যাতে তাদের অলসতার কারণে মুসলিমদের কোনো ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে।

• নির্দেশ অমান্যকারীদের শাস্তিপ্রদানের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের মধ্যপন্থা অবলম্বন করা উচিত। তবে অভিযুক্ত প্রমাণিতদের শাস্তিপ্রদানে কোনো প্রকার অবহেলা করা যাবে না। এতে অতিরিক্ত বিরোধিতা এবং নির্দেশ অমান্য করায় তারা দুঃসাহসী হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোরতা পরিহার আবশ্যক। নতুবা তাদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে, তারা দলবাজির উদ্যোগী হয়ে উঠতে পারে। শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে কৌশল, ভারসাম্য, দূরদর্শিতা ও চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন, যাতে দীক্ষার উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যায় এবং কোনো প্রকার ফ্যাসাদ কিংবা অসন্তোষ সৃষ্টি না হয়।

• দায়িত্বশীলদের সতর্ক থাকা অপরিহার্য। তার কর্তৃত্বের ভেতরে যা কিছু সংঘটিত হয়, তা জানা থাকতে হবে। জনগণ যেন বুঝতে পারে তাদের বিষয় গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। এমন হলে ভালোকাজ সম্পাদনকারীদের অন্তরে অধিকতর সুধারণার জন্ম নেবে এবং মন্দকাজে জড়িতরা মন্দকাজ থেকে বিরত থাকবে। তবে লক্ষ রাখতে হবে, অধীনদের মধ্যে গোয়েন্দাগিরি চালানো যাবে না। এতে প্রকারান্তরে তাদের অপমানিত করা হয়। ফলে তাদের অন্তর থেকে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও কৃতজ্ঞতাবোধ উধাও হয়ে যাবে; অথচ এটাই শাসক ও শাসিতের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখে। সম্পর্ক যতক্ষণ অটুট থাকবে ততক্ষণ সত্যবিভ্রান্ত লোকজন এমন বিরোধিতার সুযোগ পাবে না, যার ফলে সমাজে ফ্যাসাদ ও অরাজকতা বিরাজ করে। যখন এই সম্পর্ক ভেঙে যাবে, মন্দকাজ থেকে বিরতকারী কেউ থাকবে না, তখন বিষয়টার সমাধান কঠিন হয়ে পড়বে। এর জন্য বিশাল শক্তির প্রয়োজন। এটা এমন বিষয়, যার অনিষ্ট একেবারে স্বতঃসিদ্ধ।

• সেনাপতি ও কমান্ডারদের জন্য শত্রুর মোকাবিলায় দৃঢ়তা প্রদর্শন জরুরি। কোনো অবস্থায়ই ভীরুতা প্রদর্শন করা যাবে না। নেতাদের ভীরুতা সাধারণ সেনাদের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। এর পরিণতি হয় পরাজয় ও লজ্জা। যুদ্ধ ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে নেতার জন্য দুঃসাহস প্রদর্শন আবশ্যক। নেতাদের দুর্বলতা তাদের অধীনকে দুর্বল করে ফেলবে। এতে কাজ আদায়ের গতি হ্রাস পাবে। ফলাফল মন্দ হবে।

• সেনাপতি ও কমান্ডাররা গনিমতের সম্পদে কোনো প্রকার খিয়ানত করতে পারবে না। গনিমত বণ্টনের আগে এর থেকে কিছুই গ্রহণ করবে না। যুদ্ধময়দান ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলদের জন্য এমন কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ আদায় করা যাবে না, যা শরিয়তসিদ্ধ নয়। যেমন: এমন কোনো হাদিয়া-তুহফা গ্রহণ, যার উদ্দেশ্য হয় দায়িত্বশীলকে প্রভাবিত করা, সত্য থেকে বিচ্যুত করা। এটাও একধরনের খিয়ানত। এই খিয়ানতের পরিণতি হচ্ছে দরিদ্রতা ও অভাব এবং বিজয় ও সাহস থেকে বঞ্চিতি।
• উপর্যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ থেকেই অনুধাবন করা যায়—আবু বকর রা. সবসময় মুসলিমদের কল্যাণচিন্তা লালন করতেন। সেনাপতিরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন, তিনি তা ভালোভাবে জানতেন। তারা এ থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পেতে পারেন, সে ব্যাপারে তাদের সঠিক সমাধানে সাহায্য করতেন।

এ উপদেশ এবং এর মতো আরও অসংখ্য উপদেশ আবু বকরের অবস্থানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করে। আপনি তাঁর রাষ্ট্রপরিচালনার ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখতে পাবেন, তিনি রাজনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও দক্ষ ছিলেন। মনে হবে তিনি নিজেই যেন সেনাপতি ও কমান্ডারদের সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত। আর যখন তাঁর নম্রতা ও স্নেহ-ভালোবাসা দেখবেন, তখন মনে হবে তিনি যেন দরদি দায়ি। তিনি মুমিনদের ব্যাপারে ছিলেন দয়ালু। সত্য ও উত্তম কর্ম সম্পাদনকারীদের মর্যাদাদানকারী। যোগ্যতা ও ক্ষমতার অধিকারীদের ব্যাপারে অবগত। আল্লাহর শত্রু কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর।৩৮৪

৩. শুরাহবিল ইবনু হাসানার বাহিনী
ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ানের বাহিনী পাঠানোর তিন দিন পর শুরাহবিল ইবনু হাসানার বাহিনী পাঠান। সেদিন তিনি শুরাহবিলকে বিদায় দিতে গিয়ে বলেন, 'শুরাহবিল, আমি ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ানকে যেসব উপদেশ দিয়েছি, সেগুলো তুমি শুনেছ?' শুরাহবিল বলেন, 'জি, অবশ্যই।' আবু বকর বলেন, 'আমি তোমাকেও সেসব উপদেশ দিচ্ছি। এ ছাড়া আরও কিছু উপদেশ দিচ্ছি, যা ইয়াজিদকে দিইনি। আমি তোমাকে যথাসময়ে সালাত আদায়, যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় কিংবা শাহাদাত পর্যন্ত দৃঢ়পদ থাকা, রোগীদের দেখাশোনা করা, জানাজায় অংশগ্রহণ এবং সর্বাবস্থায় অধিকহারে আল্লাহর জিকিরের উপদেশ দিচ্ছি।' শুরাহবিল বলেন, 'আল্লাহ সাহায্যকারী। আল্লাহর যা ইচ্ছা, তা-ই হয়ে থাকে। ১৩৮৫

শুরাহবিলের সেনাদলের সংখ্যা ছিল ৩ থেকে ৪ হাজার। আবু বকর তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, 'প্রথমে তাবুক ও বালকায় যাবে, এরপর বসরা অভিমুখে রওনা হবে। সেটাই হবে তোমার শেষ গন্তব্য।' তিনি তখন বালকার দিকে এগোতে থাকেন। তাঁর বাহিনীকে উল্লেখযোগ্য কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। শুরাহবিলবাহিনী আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের বাহিনীর বাম পাশ এবং আমর ইবনুল আসের ডান পাশ হয়ে পথ অতিক্রম করে বালকায় পৌঁছায়। এরপর বসরায় গিয়ে শহরটা অবরোধ করে, তবে বসরা জয় করা সম্ভব হয়নি। কারণ, এটা ছিল রোমানদের সংরক্ষিত সুদৃঢ় একটা কেন্দ্র। ৩৮৬

৪. আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের বাহিনী
আবু বকর রা. আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে বাহিনীসহ পাঠানোর ইচ্ছা করলে তাঁকে বিদায় জানাতে গিয়ে বলেন, 'ওই ব্যক্তির মতো আমার কথাগুলো শোনো, যে আনুগত্য ও আমলের নিয়তে শুনে থাকে। অভিজাত ব্যক্তিবর্গ, সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য, সৎকর্মপরায়ণ মুসলিম ও জাহিলি যুগের বীরপুরুষদের নিয়ে তুমি বের হচ্ছ। এরা তখন দলান্ধ হয়ে যুদ্ধ করত; আর এখন প্রতিদানের আশায় যুদ্ধ করছে। আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো, সাহায্যকারী হিসেবে তিনিই যথেষ্ট। তাঁর ওপর ভরসা করো, তাঁর ওপর নির্ভর করাটাই সবচেয়ে উত্তম। ইনশাআল্লাহ কাল তুমি রওনা হয়ে যাবে। '৩৮৭

তাঁর বাহিনীর সদস্যও ছিল ৩ থেকে ৪ হাজারের মধ্যে। এই বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল হিমস। আবু উবায়দা মদিনা থেকে রওনা হয়ে ওয়াদিউল কুরা হয়ে হিজরে (মাদায়িনে সালিহ) পৌঁছান। সেখান থেকে প্রথমে 'জাতে মানার', তারপর জিজা এবং সেখান থেকে মোয়াব পৌঁছান। সেখানে শত্রুদের বিরুদ্ধে তাঁর সংঘর্ষ হয়। অবশেষে তাদের সঙ্গে সন্ধি করেন। সিরিয়ায় সংঘটিত সন্ধির মধ্যে এটাই ছিল প্রথম সন্ধি। এরপর তিনি জাবিয়ার দিকে এগিয়ে যান। ৩৮৮ এই বাহিনী ছিল প্রথম বাহিনীর ডান ও দ্বিতীয় বাহিনীর বাম বাহু। ৩৮৯

আবু উবায়দার সঙ্গে ছিলেন আরবের বিখ্যাত বাহাদুর কায়েস ইবনু হুবায়রা ইবনু মাসউদ মুরাদি। আবু উবায়দা রওনার আগে আবু বকর তাঁকে উপদেশস্বরূপ বলছিলেন, 'তোমার সঙ্গে যাচ্ছে আরববিখ্যাত উঁচুমানের একজন বাহাদুর। তাঁকে সঙ্গে রাখবে এবং তাঁর সঙ্গে নম্র আচরণ করবে। তাঁকে এ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করবে যে, তুমি তাঁর অমুখাপেক্ষী নও। তাঁকে সাধারণজন মনে করবে না। ফলে তুমি তাঁর দ্বারা উপকৃত হবে এবং শত্রুর মোকাবিলায় তাঁর প্রচেষ্টা তোমাকে উপকৃত করবে।'

এরপর আবু বকর রা. কায়েস ইবনু হুবায়রাকে ডেকে বলেন, 'আমি তোমাকে আমিনুল উম্মাহ আবু উবায়দার সঙ্গে পাঠাচ্ছি। তিনি এমন ব্যক্তি, তাঁর ওপর যদি অত্যাচার করা হয়, তবু তিনি অত্যাচার করেন না, দুর্ব্যবহার করলে ক্ষমা করে দেন। সম্পর্কচ্ছেদ করলে সেই সম্পর্ক প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করেন। তিনি মুমিনদের ওপর দয়ালু ও কাফিরদের বিপরীতে পাথরের মতো কঠিন। তুমি তাঁর নির্দেশ অমান্য করবে না। তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করবে না। তিনি তোমাকে কল্যাণের নির্দেশই দেবেন। আমি তাঁকে তোমার কথা বলে দিয়েছি। তিনি তাকওয়া ছাড়া অন্য কিছুর নির্দেশ দেবেন না। আমরা শুনেছি, তুমি একজন বাহাদুর ও অভিজাত ব্যক্তি। তুমি তোমার শক্তিমত্তাকে ইসলাম ও মুসলিমদের স্বার্থে ব্যবহার করবে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে, যারা আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করে, আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে অংশীদার স্থাপন করে। আল্লাহ এতেই উত্তম প্রতিদান, সম্মান ও বিজয় রেখেছেন।'

আবু বকরের উপদেশ শুনে কায়েস ইবনু হুবায়রা বলেন, 'যদি আপনি বেঁচে থাকেন, তাহলে আমার ব্যাপারে মুসলিমদের নিরাপত্তার ও কাফিরদের ধ্বংসকল্পে সচেষ্ট থাকার মতো অন্তর প্রশান্তকারী সুসংবাদই শুনবেন।' আবু বকর তখন বলেন, 'আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন। তুমি এমনটাই করতে থাকো।' এরপর তিনি যখন জানতে পারেন, হুবায়রা জাবিয়ার মল্লযুদ্ধে দুই রোমান-জেনারেলকে মৃত্যুর ঘাটে পৌঁছে দিয়েছেন, তখন তিনি আনন্দ চিত্তে বলেন, 'কায়েস তাঁর ওয়াদা সত্য প্রমাণিত করে দেখিয়েছে। ৩৯০

এখানে আমরা দেখতে পাই, আবু বকর রা. কায়েস ইবনু হুবায়রাকে উৎসাহ জুগিয়ে তাঁর ভেতরে থাকা শক্তি কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। তাঁর ভেতরের বীরত্বকে জাগিয়ে তুলে ইসলামের খিদমত ও জিহাদে লাগিয়ে দিতে সচেষ্ট ছিলেন। নিঃসন্দেহে বীরপুরুষদের প্রশংসা তাদের ভেতরগত শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। তারা নিজেদের মধ্যে শক্তিমত্তা অনুভব করে থাকেন। আর এটা আত্মোৎসর্গের প্রতি তাদের আরও উৎসাহী করে। ৩৯১

৫. আমর ইবনুল আসের বাহিনী

আবু বকর রা. আমর ইবনুল আসের সঙ্গে একটা বাহিনী ফিলিস্তিনে পাঠিয়ে দেন। তিনি তাঁকে এই অধিকার দেন যে, চাইলে আপনি সেই কাজ করতে পারবেন, যে কাজের দায়িত্ব আপনাকে রাসুল ﷺ অর্পণ করেছিলেন। ৩৯২ আর চাইলে সেই কাজও গ্রহণ করতে পারেন, যা দুনিয়া-আখিরাতের জন্য কল্যাণকর। তবে গৃহীত কাজটা আপনার কাছে পছন্দনীয় হতে হবে। উত্তরে তিনি এই মর্মে চিঠি লেখেন,

আমি ইসলামি তিরসমূহের অন্যতম তির। এই তির পরিচালনা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব আপনার। আপনি ভেবে দেখুন, কোন তিরটা বেশি শক্তিশালী ও ভয়ংকর। আপনি যেটা ইচ্ছা নির্দ্বিধায় সেটা চালিয়ে দিন। ৩৯৩

এরপর আমর ইবনুল আস রা. মদিনায় এলে আবু বকর রা. তাঁকে নির্দেশ দেন, 'আপনি মদিনার বাইরে গিয়ে শিবির স্থাপন করুন, যাতে লোকজন আপনার সঙ্গে যোগ দিতে পারে।' তখন কুরাইশের নেতৃস্থানীয় বহু লোক তাঁর বাহিনীতে যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে হারিস ইবনু হিশাম, সুহাইল ইবনু আমর এবং ইকরিমা রা.-ও ছিলেন। বিদায় জানাতে গিয়ে আবু বকর রা. তাঁকে বলেন, 'আমর, আপনি অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ এবং সিদ্ধান্তগ্রহণে দক্ষ ব্যক্তি। এ ছাড়া আপনার প্রচুর যুদ্ধাভিজ্ঞতা রয়েছে। আপনি কুরাইশের অভিজাত ও পুণ্যবানদের নিয়ে আপন ভাইদের সহায়তায় যাচ্ছেন। অতএব, তাঁদের কল্যাণকামনায় ত্রুটি করবেন না। তাঁদের উত্তম পরামর্শগুলো ফেলে দেবেন না। আপনার যুদ্ধবিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো পরিণাম বিবেচনায় হয়ে থাকে প্রশংসাযোগ্য ও বরকতময়।' আমর বলেন, 'আমার ব্যাপারে আপনার যে সুধারণা রয়েছে, ইনশাআল্লাহ আমি এর বাস্তবায়ন করে দেখানোর চেষ্টা করব।'৩৯৪

এরপর তিনি বাহিনী নিয়ে রওনা হয়ে যান। তাঁর বাহিনীর সেনাসংখ্যা ছিল ৬ থেকে ৭ হাজারের মধ্যে। তাঁদের গন্তব্য ছিল ফিলিস্তিন। এই বাহিনী লোহিত সাগরের তীর ধরে মৃতসাগরের নিকটবর্তী 'আরবা' উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছায়। আমর রা. ১ হাজার সেনার একটা বাহিনীকে আবদুল্লাহ ইবনু উমর ইবনুল খাত্তাবের নেতৃত্বে রোমানদের দিকে পাঠান। এই বাহিনী এগিয়ে গিয়ে রোমানদের একটা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে তাদের পরাজিত করে। এরপর বেশকিছু বন্দিকে নিয়ে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসে।

আমর রা. বন্দিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারেন, রুওয়াইসের নেতৃত্বে রোমানদের একটা বাহিনী মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমর তাঁর বাহিনীকে প্রস্তুত করেন। ফলে রোমানরা মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করলে তারা সহজেই সে হামলা রুখে দিতে সক্ষম হন। আক্রমণকারী বাহিনীকে পিছু হটে যেতে বাধ্য করেন। এরপর সংঘবদ্ধভাবে তাদের ওপর চড়াও হলে তারা পালাতে শুরু করে। তারা যখন পালাচ্ছিল, তখন মুসলিমবাহিনী তাদের ধাওয়া করে হাজার হাজার সেনাকে হত্যা করে। এভাবেই পূর্ণ বিজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধটা সমাপ্ত হয়। ৩৯৫

আবু বকর রা. সেনাপতিদের এই নির্দেশ দিয়েছিলেন—প্রত্যেকেই যেন অন্যের পথ এড়িয়ে চলেন। তাঁর ধারণামতে এর মধ্যেই কল্যাণ ছিল। তিনি আসলে এখানে নবি ইয়াকুব আ.-এর সুন্নাহ অনুসরণ করেছিলেন, ৩৯৬ যিনি তাঁর সন্তানদের বলেছিলেন,

আমার ছেলেরা, তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ না করে ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারি না।। বিধান আল্লাহরই। আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং যারা নির্ভর করতে চায়, তারা আল্লাহর ওপরই নির্ভর করুক। [সুরা ইউসুফ: ৬৭]

টিকাঃ
১. খালিদ ইবনু সায়িদ রা. পদত্যাগপত্র দিলে আবু বকর রা. সেটি গ্রহণ করেন।
২. আল-কামিল, ইবনু আসির: ২/৬৪-৬৫।
৩. আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৯২-১৯৭।
৪. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ১৫।
৫. আবু বাকরিনিস সিদ্দিক, নাজার আল হাদিসি: ৬২
৬. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ১৭।
৭. আল কামিল, ইবনু আসির: ২/৬৬।
৮. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া ওয়াদ দিফাইয়াহ ইনদাল মুসলিমিন, নাহাদ আব্বাসি: ১৪১
৯. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ২৬-২৭।
১০. আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/২০৬।
১১. তিনি কুজাআ অঞ্চলের সাদাকা উসুলের জিম্মাদার ছিলেন।
১২. ইতমামুল ওয়াফা বি সিরাতিল খুলাফা: ৫৫।
১৩. ফুতুহুশ শাম, বালাজুরি: ৪৮-৫১।
১৪. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া ওয়াদ দিফাইয়াহ ইনদাল মুসলিমিন: ১৪৩।
১৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৪।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 খালিদকে শামে প্রেরণ এবং আজনাদায়ন ও ইয়ারমুকযুদ্ধ

📄 খালিদকে শামে প্রেরণ এবং আজনাদায়ন ও ইয়ারমুকযুদ্ধ


১. আজনাদায়নযুদ্ধের পটভূমি ও শামের মুসলিমবাহিনীর পক্ষ থেকে খলিফার কাছে চিঠি
শামের মুসলিমবাহিনী রোমানবাহিনীর প্রতিটা পদক্ষেপের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছিল। অবস্থার ভয়াবহতা অনুমান করে জাওলান এলাকায় তারা নেতাদের একটা সভা আহ্বান করে। সভা শেষে আবু উবায়দা অবস্থার ভয়াবহতা জানিয়ে খলিফার কাছে চিঠি লেখেন। সভায় নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়েছিল :
• অধিকৃত এলাকাগুলো আপাতত শূন্য করা হোক।
• রোমানদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করার সুবিধার্থে মুসলিম সেনাদলকে একীভূত করা হোক।
• মুসলিমদের সঙ্গে চূড়ান্ত যুদ্ধে উপনীত হতে তাদের বাধ্য করা হোক।

আমর ইবনুল আস রা. যুদ্ধের জন্য ইয়ারমুক প্রান্তরের নাম প্রস্তাব করেন। এরপর মুসলিমবাহিনী সেখানে একত্রিত হয়। আবু বকরের সিদ্ধান্তও ছিল আমর ইবনুল আসের সিদ্ধান্তের অনুরূপ।

নেতৃবর্গ এই সিদ্ধান্তেও উপনীত হয়েছিলেন যে, আপাতত শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে না জড়িয়ে সবাই ইয়ারমুক প্রান্তরে এসে সমবেত হবেন। সুতরাং হিমস থেকে আবু উবায়দা রা., বালকা (জর্দান) থেকে শুরাহবিল ইবনু হাসানা ও শাম থেকে ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। এদিকে আমর ইবনুল আসও ফিলিস্তিন থেকে ধীরলয়ে প্রত্যাগমন শুরু করেন। কিন্তু রোমানবাহিনী তাঁকে পেছন দিক থেকে তাড়া করছিল, এ কারণে তিনি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের আগমনের আগে ফিরে আসা নিশ্চিত করতে পারেননি। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাঁকে বিরে সাবা নামক স্থানে রোমানদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে হয়। এর ফলেই সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক আজনাদায়নযুদ্ধ।

আবু বকরের কাছে আবু উবায়দার চিঠি পৌঁছলে তিনি নির্দেশ দেন, 'তোমরা ইয়ারমুক প্রান্তরে সমবেত হয়ে অশ্বারোহী বাহিনীকে গ্রাম ও বস্তি এলাকায় ছড়িয়ে দাও। রোমানদের রসদপত্র আসার পথ বন্ধ করে দাও। আমার পরবর্তী নির্দেশ না পৌঁছা পর্যন্ত শহর অবরোধ করবে না। তবে শত্রুরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে শক্তপায়ে লড়াই চালিয়ে যাবে। আমি তোমাদের কাছে আরও অতিরিক্ত সেনা পাঠাচ্ছি।' ১৩৯৯

অন্য এক বর্ণনায় আছে, তিনি বলছিলেন, 'তোমাদের মতো মানুষ সংখ্যাস্বল্পতার কারণে পরাজিত হতে পারে না। ১০ হাজার লোকের একটা বাহিনীও তাদের গুনাহের কারণে পরাজিত হতে পারে। অতএব, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবে। তোমাদের প্রত্যেকেই যেন নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে ইয়ারমুক প্রান্তরে চলে আসে।' আবু বকর রা. বাহিনী চতুষ্টয়কে ইয়ারমুকে পৌঁছে সব বাহিনীকে এক হওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে মুশরিকদের হামলার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া সহজ হয়।' তিনি আরও বলেন, 'তোমরা আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী। যারা তাঁর দীনের সাহায্য করে, তিনি তাদের সাহায্য করেন। যারা দূরে থাকে, আল্লাহও তাদের সঙ্গ ছেড়ে দেন। ১৪০০

২. খালিদকে শামে রওনার নির্দেশ
আবু বকরের নির্দেশের আলোকে আমরা দেখতে পাই, তিনি সবসময় মুসলিমবাহিনীর বিজয় ও আধিপত্যের জন্য আল্লাহর আনুগত্যকেই ভিত্তি মনে করতেন; আর পরাজয় ও লজ্জা গুনাহের প্রতিক্রিয়া মনে করতেন। রোমানরা যাতে পৃথক পৃথকভাবে ধ্বংস করে দিতে না পারে, এ জন্য তিনি মুসলিমবাহিনীকে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেন। ইয়ারমুক প্রান্তরকে ঘাঁটি বানানোর নির্দেশ এ কথা প্রমাণ করে যে, তিনি সমকালের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। অবস্থানগত সুবিধার কথা তাঁর ভালো করেই জানা ছিল। এটা তাঁর সামরিক প্রজ্ঞার বড় এক নিদর্শন। তিনি এই নির্দেশনাও জারি করেছিলেন, 'খালিদ যেন ইরাক থেকে তাঁর বাহিনী নিয়ে শামে পৌঁছে সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।'

তখন শামে এমন এক নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল অনেক বেশি, যার একার মধ্যেই রয়েছে আবু উবায়দার শক্তি ও যোগ্যতা, ইবনুল আসের তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ইকরিমার দক্ষতা এবং ইয়াজিদের এগিয়ে যাওয়ার অদম্য স্পৃহা, যিনি হবেন কুশলী যোদ্ধা ও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। ৪০১

এসব গুণের প্রতি লক্ষ রেখেই আবু বকরের দৃষ্টি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের দিকে নিবদ্ধ হয়। খালিদ রা. খলিফার নির্দেশ কার্যকর করতে বাহিনীসহ সেই বিভীষিকাময় মরুভূমি পাড়ি দিয়ে দ্রুত শামে পৌঁছে যান। সে ছিল ইতিহাসের তাক লাগানো এক বিরল ঘটনা। পেছনে আমরা এর বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে এসেছি।

এদিকে খলিফার পক্ষ থেকেও অব্যাহতভাবে সেনাসহায়তা আসছিল। তাঁর পরিকল্পনাগুলো ছিল বেশ সফল পরিকল্পনা। তিনি শত্রুদের বস্তুগত ও চিন্তাগত সব ধরনের কৌশলের জবাব দিতে থাকেন, যেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল তাদের অবস্থান গুঁড়িয়ে দেওয়া। আবু বকর রা. বলছিলেন, 'আমরা খালিদের মাধ্যমে রোমানবাহিনীকে তাদের শয়তানি পরিকল্পনা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করব।'৪০২

৩. শামে বাহিনী প্রেরণে আবু বকরের সামরিক প্রজ্ঞা
আবু বকরের গৃহীত এ পদক্ষেপ থেকে নিম্নোক্ত বিষয়াবলি সামনে আসে :
* শামের চারটি মুসলিমবাহিনী এক বাহিনীর আকার ধারণ করবে।
* সকল নেতা হবেন খালিদের নেতৃত্বের অধীন।
* সমবেত হওয়ার স্থান নির্ধারণ।

এর দ্বারা এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, আবু বকর রা. সেনাবাহিনী পরিচালনার যোগ্যতা রাখতেন। মদিনা থেকে পাঠানো তাঁর সাহায্যবাহিনী দলবদ্ধভাবে না গিয়ে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাঁরা বর্শা অথবা পাখার রূপ ধারণ করে অগ্রসর হচ্ছিল, যে পদ্ধতিকে আধুনিক পরিভাষায় বিক্ষিপ্ত চলাচল বলা হয়। চূড়ান্ত যুদ্ধের সময় তিনি সবাইকে একত্রিত করেন। এর মাধ্যমে সেনাপরিচালনায় তাঁর দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়; যাকে বর্তমান সামরিক ভাষায় Strategy বা কুশলী সেনাপরিচালনা বলা হয়ে থাকে। ৪০৩

৪. আবু উয়দার প্রতি আবু বকরের চিঠি
আবু বকর রা. খালিদকে ইরাক থেকে শামে গিয়ে সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর নেতৃত্বভার গ্রহণের নির্দেশ প্রদানের পর আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে এ ব্যাপারে অবগত করেন। এর কারণ উল্লেখপূর্বক খালিদের আনুগত্য প্রদর্শনের নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর কাছে চিঠি লেখেন,

শামে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব খালিদের হাতে বুঝিয়ে দিয়েছি। তুমি এর বিরোধিতা না করে আনুগত্য প্রদর্শন করবে। আমি তাঁকে তোমার সেনাপ্রধান নিয়োগ দিয়েছি। যদিও আমি জানি, তুমি তাঁর থেকে শ্রেষ্ঠ। তবে আমি মনে করি, সামরিক জ্ঞানে সে তোমার থেকে এগিয়ে। আল্লাহ তাআলা আমার ও তোমার পক্ষ থেকে দীনের কাজ নিন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

৫. আবু উবায়দার নামে খালিদের চিঠি
এ ছাড়া ইরাক থেকে ইমান ও তাকওয়ার বার্তা নিয়ে আবু উবায়দার নামে খালিদের পক্ষ থেকেও একটা চিঠি এসে পৌঁছায়। চিঠির ভাষ্য ছিল এমন,

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পক্ষ থেকে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের নামে। আমি আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।

হামদ ও সালাতের পর,
আমি আমার ও আপনার জন্য ভয়ের দিনে নিরাপত্তা এবং দুনিয়ার জীবনে পাপ থেকে বেঁচে থাকার প্রার্থনা করছি। আমার কাছে আল্লাহর রাসুলের খলিফার চিঠি এসে পৌঁছেছে। চিঠিতে তিনি আমাকে শামে পৌঁছে সেখানকার সব মুসলিমবাহিনীর দায়িত্বগ্রহণের নির্দেশ পাঠিয়েছেন।

আল্লাহর শপথ, আমি কখনো তাঁর কাছে এমন আবেদন করিনি। এটা আমার আকাঙ্ক্ষাও ছিল না। এ ব্যাপারে আমি তাঁর কাছে কোনো চিঠিও পাঠাইনি। আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন, আপনি আপনার পদে নিয়োজিত থাকবেন। আপনার কোনো নির্দেশ লঙ্ঘন করা হবে না। আপনার কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হবে না। আপনাকে এড়িয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। অবশ্যই আপনি সর্বজনমান্য নেতাদের একজন। আপনার শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। আপনার সিদ্ধান্ত থেকে অমুখাপেক্ষী থাকা যায় না। আমার ও আপনার ওপর আল্লাহ যে অনুগ্রহ করেছেন, তা যেন তিনি পূর্ণতায় পৌঁছান। আমাদের উভয়কে যেন জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।৪০৪

৬. শামের মুজাহিদদের প্রতি খালিদের চিঠি
একইভাবে খালিদ রা. শামে অবস্থানরত মুজাহিদদের নামেও একটা চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি তাঁদের উদ্দেশে বলেন,

হামদ ও সালাতের পর,
যে আল্লাহ ইসলামের মাধ্যমে আমাদের সম্মানিত করেছেন, দীনের মাধ্যমে আমাদের যে আভিজাত্য প্রদান করেছেন, তাঁর নবি মুহাম্মাদ - এর মাধ্যমে যেভাবে আমাদের মর্যাদামণ্ডিত করেছেন, ইমানের মাধ্যমে আমাদের যে সম্মান দান করেছেন, সেই আল্লাহর রহমত আমাদের ওপর অত্যন্ত প্রশস্ত। আমরা তাঁর নিয়ামতের সাগরে ডুবে আছি। আমরা সেই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদের ওপর তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করে দেন। হে আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহর প্রশংসা করুন, তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করুন। তিনি আপনাদের আরও দান করবেন। আল্লাহর কাছেই অনুগ্রহপ্রার্থী হোন, তিনি অনুগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেবেন। আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে জীবন অতিবাহিত করুন। আমার কাছে আল্লাহর রাসুলের খলিফার নির্দেশনামা পৌঁছেছে। এতে তিনি আমাকে আপনাদের পাশে পৌঁছার নির্দেশ দিয়েছেন। মনে করুন, আমার ঘোড়া মুজাহিদদের নিয়ে আপনাদের কাছে পৌঁছে গেছে। অতএব, আল্লাহর ওয়াদার পূর্ণতা এবং উত্তম সাওয়াবপ্রাপ্তির ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যান। আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের ইমানের ওপর হিফাজত রাখুন। আমাদের ও আপনাদের ইসলামের ওপর অটল রাখুন। সকল মুজাহিদকে উত্তম প্রতিদান দিন। ওয়াসসালামু আলাইকুম।

আমর ইবনু তুফায়েল ইবনু আমর আজদি চিঠি দুটি নিয়ে শামে মুসলিমদের কাছে পৌঁছান। তখন মুসলিমরা জাবিয়া প্রান্তরে অবস্থান করছিলেন। চিঠি পড়ে তাদের শোনানো হয়। আবু উবায়দার উদ্দেশে লিখিত চিঠিটাও তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। সেটা পড়ে তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাঁর রাসুলের খলিফার সিদ্ধান্তে বরকত দিন এবং খালিদকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখুন। '৪০৫

৭. খালিদ ও আবু উবায়দার সৌহার্দ্য
দুই মহান সেনাপতির এমন আচরণের মাধ্যমে মূলত ইসলামি ভ্রাতৃত্বের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়, যা একমাত্র নিখাদ তাওহিদের মাধ্যমে অস্তিত্বে এসে মানুষকে উত্তম চরিত্রে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে। এ ছিল সাহাবিদের বিশেষ মর্যাদা। ইরাকে বিপুল বিজয়ও খালিদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারেনি। তাঁর মধ্যে কোনো প্রকার অহমিকা জাগাতে পারেনি; বরং দেখা যাচ্ছে তিনি নিজের ওপর আবু উবায়দার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিচ্ছেন, তাঁর আনুগত্য গ্রহণের স্বীকৃতি দিচ্ছেন।

অপরদিকে দেখা যায়, আবু উবায়দাও খলিফার এই নির্দেশকে বরকতময় আখ্যা দিচ্ছেন। খালিদকে উদার চিত্তে স্বাগত জানাচ্ছেন। এগুলোই প্রমাণ করে যে, খালিদ ও আবু উবায়দারা ছিলেন প্রবৃত্তিপরায়ণতার অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁরা সবসময় জনগণের কল্যাণকেই অগ্রাধিকার দিতেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এর মধ্যে শাসক, যুদ্ধের নেতা, আলিম, দায়ি ও মুবাল্লিগদের জন্য নেতৃত্ব নির্বাচন এবং প্রয়োজনে তাদের পদচ্যুত করার মধ্যে রয়েছে বিশাল শিক্ষা।

টিকাঃ
১৩৯৯. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৪৮।
১৪০০. তারিখুত তাবারি: ৪/২১১।
৪০১. তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম: ৩৫৯-৩৬০।
৪০২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৫।
৪০৩. আল-ফাল্গুল আসকারিয়িল ইসলামি : ৮৯; আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., আল হাদিসি: ৬০।
৪০৪. মাজমুআতুল ওয়াসায়িকিস সিয়াসিয়া: ৩৯২-৩৯৩।
৪০৫. ফুতুহুশ শাম আজদি: ৬৮-৭২- হুমায়দি।
৪০৬. আত-তারিখুল ইসলামি: হুমায়দি: ৯/২৩১।

১. আজনাদায়নযুদ্ধের পটভূমি ও শামের মুসলিমবাহিনীর পক্ষ থেকে খলিফার কাছে চিঠি
শামের মুসলিমবাহিনী রোমানবাহিনীর প্রতিটা পদক্ষেপের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছিল। অবস্থার ভয়াবহতা অনুমান করে জাওলান এলাকায় তারা নেতাদের একটা সভা আহ্বান করে। সভা শেষে আবু উবায়দা অবস্থার ভয়াবহতা জানিয়ে খলিফার কাছে চিঠি লেখেন। সভায় নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়েছিল :
• অধিকৃত এলাকাগুলো আপাতত শূন্য করা হোক।
• রোমানদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করার সুবিধার্থে মুসলিম সেনাদলকে একীভূত করা হোক।
• মুসলিমদের সঙ্গে চূড়ান্ত যুদ্ধে উপনীত হতে তাদের বাধ্য করা হোক।

আমর ইবনুল আস রা. যুদ্ধের জন্য ইয়ারমুক প্রান্তরের নাম প্রস্তাব করেন। এরপর মুসলিমবাহিনী সেখানে একত্রিত হয়। আবু বকরের সিদ্ধান্তও ছিল আমর ইবনুল আসের সিদ্ধান্তের অনুরূপ।

নেতৃবর্গ এই সিদ্ধান্তেও উপনীত হয়েছিলেন যে, আপাতত শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে না জড়িয়ে সবাই ইয়ারমুক প্রান্তরে এসে সমবেত হবেন। সুতরাং হিমস থেকে আবু উবায়দা রা., বালকা (জর্দান) থেকে শুরাহবিল ইবনু হাসানা ও শাম থেকে ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। এদিকে আমর ইবনুল আসও ফিলিস্তিন থেকে ধীরলয়ে প্রত্যাগমন শুরু করেন। কিন্তু রোমানবাহিনী তাঁকে পেছন দিক থেকে তাড়া করছিল, এ কারণে তিনি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের আগমনের আগে ফিরে আসা নিশ্চিত করতে পারেননি। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাঁকে বিরে সাবা নামক স্থানে রোমানদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে হয়। এর ফলেই সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক আজনাদায়নযুদ্ধ।

আবু বকরের কাছে আবু উবায়দার চিঠি পৌঁছলে তিনি নির্দেশ দেন, 'তোমরা ইয়ারমুক প্রান্তরে সমবেত হয়ে অশ্বারোহী বাহিনীকে গ্রাম ও বস্তি এলাকায় ছড়িয়ে দাও। রোমানদের রসদপত্র আসার পথ বন্ধ করে দাও। আমার পরবর্তী নির্দেশ না পৌঁছা পর্যন্ত শহর অবরোধ করবে না। তবে শত্রুরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে শক্তপায়ে লড়াই চালিয়ে যাবে। আমি তোমাদের কাছে আরও অতিরিক্ত সেনা পাঠাচ্ছি।' ১৩৯৯

অন্য এক বর্ণনায় আছে, তিনি বলছিলেন, 'তোমাদের মতো মানুষ সংখ্যাস্বল্পতার কারণে পরাজিত হতে পারে না। ১০ হাজার লোকের একটা বাহিনীও তাদের গুনাহের কারণে পরাজিত হতে পারে। অতএব, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবে। তোমাদের প্রত্যেকেই যেন নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে ইয়ারমুক প্রান্তরে চলে আসে।' আবু বকর রা. বাহিনী চতুষ্টয়কে ইয়ারমুকে পৌঁছে সব বাহিনীকে এক হওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে মুশরিকদের হামলার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া সহজ হয়।' তিনি আরও বলেন, 'তোমরা আল্লাহর দীনের সাহায্যকারী। যারা তাঁর দীনের সাহায্য করে, তিনি তাদের সাহায্য করেন। যারা দূরে থাকে, আল্লাহও তাদের সঙ্গ ছেড়ে দেন। ১৪০০

২. খালিদকে শামে রওনার নির্দেশ
আবু বকরের নির্দেশের আলোকে আমরা দেখতে পাই, তিনি সবসময় মুসলিমবাহিনীর বিজয় ও আধিপত্যের জন্য আল্লাহর আনুগত্যকেই ভিত্তি মনে করতেন; আর পরাজয় ও লজ্জা গুনাহের প্রতিক্রিয়া মনে করতেন। রোমানরা যাতে পৃথক পৃথকভাবে ধ্বংস করে দিতে না পারে, এ জন্য তিনি মুসলিমবাহিনীকে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেন। ইয়ারমুক প্রান্তরকে ঘাঁটি বানানোর নির্দেশ এ কথা প্রমাণ করে যে, তিনি সমকালের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। অবস্থানগত সুবিধার কথা তাঁর ভালো করেই জানা ছিল। এটা তাঁর সামরিক প্রজ্ঞার বড় এক নিদর্শন। তিনি এই নির্দেশনাও জারি করেছিলেন, 'খালিদ যেন ইরাক থেকে তাঁর বাহিনী নিয়ে শামে পৌঁছে সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।'

তখন শামে এমন এক নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল অনেক বেশি, যার একার মধ্যেই রয়েছে আবু উবায়দার শক্তি ও যোগ্যতা, ইবনুল আসের তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ইকরিমার দক্ষতা এবং ইয়াজিদের এগিয়ে যাওয়ার অদম্য স্পৃহা, যিনি হবেন কুশলী যোদ্ধা ও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। ৪০১

এসব গুণের প্রতি লক্ষ রেখেই আবু বকরের দৃষ্টি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের দিকে নিবদ্ধ হয়। খালিদ রা. খলিফার নির্দেশ কার্যকর করতে বাহিনীসহ সেই বিভীষিকাময় মরুভূমি পাড়ি দিয়ে দ্রুত শামে পৌঁছে যান। সে ছিল ইতিহাসের তাক লাগানো এক বিরল ঘটনা। পেছনে আমরা এর বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে এসেছি।

এদিকে খলিফার পক্ষ থেকেও অব্যাহতভাবে সেনাসহায়তা আসছিল। তাঁর পরিকল্পনাগুলো ছিল বেশ সফল পরিকল্পনা। তিনি শত্রুদের বস্তুগত ও চিন্তাগত সব ধরনের কৌশলের জবাব দিতে থাকেন, যেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল তাদের অবস্থান গুঁড়িয়ে দেওয়া। আবু বকর রা. বলছিলেন, 'আমরা খালিদের মাধ্যমে রোমানবাহিনীকে তাদের শয়তানি পরিকল্পনা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করব।'৪০২

৩. শামে বাহিনী প্রেরণে আবু বকরের সামরিক প্রজ্ঞা
আবু বকরের গৃহীত এ পদক্ষেপ থেকে নিম্নোক্ত বিষয়াবলি সামনে আসে :
* শামের চারটি মুসলিমবাহিনী এক বাহিনীর আকার ধারণ করবে।
* সকল নেতা হবেন খালিদের নেতৃত্বের অধীন।
* সমবেত হওয়ার স্থান নির্ধারণ।

এর দ্বারা এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, আবু বকর রা. সেনাবাহিনী পরিচালনার যোগ্যতা রাখতেন। মদিনা থেকে পাঠানো তাঁর সাহায্যবাহিনী দলবদ্ধভাবে না গিয়ে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাঁরা বর্শা অথবা পাখার রূপ ধারণ করে অগ্রসর হচ্ছিল, যে পদ্ধতিকে আধুনিক পরিভাষায় বিক্ষিপ্ত চলাচল বলা হয়। চূড়ান্ত যুদ্ধের সময় তিনি সবাইকে একত্রিত করেন। এর মাধ্যমে সেনাপরিচালনায় তাঁর দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়; যাকে বর্তমান সামরিক ভাষায় Strategy বা কুশলী সেনাপরিচালনা বলা হয়ে থাকে। ৪০৩

৪. আবু উয়দার প্রতি আবু বকরের চিঠি
আবু বকর রা. খালিদকে ইরাক থেকে শামে গিয়ে সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর নেতৃত্বভার গ্রহণের নির্দেশ প্রদানের পর আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে এ ব্যাপারে অবগত করেন। এর কারণ উল্লেখপূর্বক খালিদের আনুগত্য প্রদর্শনের নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর কাছে চিঠি লেখেন,

শামে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব খালিদের হাতে বুঝিয়ে দিয়েছি। তুমি এর বিরোধিতা না করে আনুগত্য প্রদর্শন করবে। আমি তাঁকে তোমার সেনাপ্রধান নিয়োগ দিয়েছি। যদিও আমি জানি, তুমি তাঁর থেকে শ্রেষ্ঠ। তবে আমি মনে করি, সামরিক জ্ঞানে সে তোমার থেকে এগিয়ে। আল্লাহ তাআলা আমার ও তোমার পক্ষ থেকে দীনের কাজ নিন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

৫. আবু উবায়দার নামে খালিদের চিঠি
এ ছাড়া ইরাক থেকে ইমান ও তাকওয়ার বার্তা নিয়ে আবু উবায়দার নামে খালিদের পক্ষ থেকেও একটা চিঠি এসে পৌঁছায়। চিঠির ভাষ্য ছিল এমন,

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পক্ষ থেকে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের নামে। আমি আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।

হামদ ও সালাতের পর,
আমি আমার ও আপনার জন্য ভয়ের দিনে নিরাপত্তা এবং দুনিয়ার জীবনে পাপ থেকে বেঁচে থাকার প্রার্থনা করছি। আমার কাছে আল্লাহর রাসুলের খলিফার চিঠি এসে পৌঁছেছে। চিঠিতে তিনি আমাকে শামে পৌঁছে সেখানকার সব মুসলিমবাহিনীর দায়িত্বগ্রহণের নির্দেশ পাঠিয়েছেন।

আল্লাহর শপথ, আমি কখনো তাঁর কাছে এমন আবেদন করিনি। এটা আমার আকাঙ্ক্ষাও ছিল না। এ ব্যাপারে আমি তাঁর কাছে কোনো চিঠিও পাঠাইনি। আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন, আপনি আপনার পদে নিয়োজিত থাকবেন। আপনার কোনো নির্দেশ লঙ্ঘন করা হবে না। আপনার কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হবে না। আপনাকে এড়িয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। অবশ্যই আপনি সর্বজনমান্য নেতাদের একজন। আপনার শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। আপনার সিদ্ধান্ত থেকে অমুখাপেক্ষী থাকা যায় না। আমার ও আপনার ওপর আল্লাহ যে অনুগ্রহ করেছেন, তা যেন তিনি পূর্ণতায় পৌঁছান। আমাদের উভয়কে যেন জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।৪০৪

৬. শামের মুজাহিদদের প্রতি খালিদের চিঠি
একইভাবে খালিদ রা. শামে অবস্থানরত মুজাহিদদের নামেও একটা চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি তাঁদের উদ্দেশে বলেন,

হামদ ও সালাতের পর,
যে আল্লাহ ইসলামের মাধ্যমে আমাদের সম্মানিত করেছেন, দীনের মাধ্যমে আমাদের যে আভিজাত্য প্রদান করেছেন, তাঁর নবি মুহাম্মাদ - এর মাধ্যমে যেভাবে আমাদের মর্যাদামণ্ডিত করেছেন, ইমানের মাধ্যমে আমাদের যে সম্মান দান করেছেন, সেই আল্লাহর রহমত আমাদের ওপর অত্যন্ত প্রশস্ত। আমরা তাঁর নিয়ামতের সাগরে ডুবে আছি। আমরা সেই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদের ওপর তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করে দেন। হে আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহর প্রশংসা করুন, তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করুন। তিনি আপনাদের আরও দান করবেন। আল্লাহর কাছেই অনুগ্রহপ্রার্থী হোন, তিনি অনুগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেবেন। আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে জীবন অতিবাহিত করুন। আমার কাছে আল্লাহর রাসুলের খলিফার নির্দেশনামা পৌঁছেছে। এতে তিনি আমাকে আপনাদের পাশে পৌঁছার নির্দেশ দিয়েছেন। মনে করুন, আমার ঘোড়া মুজাহিদদের নিয়ে আপনাদের কাছে পৌঁছে গেছে। অতএব, আল্লাহর ওয়াদার পূর্ণতা এবং উত্তম সাওয়াবপ্রাপ্তির ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যান। আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের ইমানের ওপর হিফাজত রাখুন। আমাদের ও আপনাদের ইসলামের ওপর অটল রাখুন। সকল মুজাহিদকে উত্তম প্রতিদান দিন। ওয়াসসালামু আলাইকুম।

আমর ইবনু তুফায়েল ইবনু আমর আজদি চিঠি দুটি নিয়ে শামে মুসলিমদের কাছে পৌঁছান। তখন মুসলিমরা জাবিয়া প্রান্তরে অবস্থান করছিলেন। চিঠি পড়ে তাদের শোনানো হয়। আবু উবায়দার উদ্দেশে লিখিত চিঠিটাও তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। সেটা পড়ে তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাঁর রাসুলের খলিফার সিদ্ধান্তে বরকত দিন এবং খালিদকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখুন। '৪০৫

৭. খালিদ ও আবু উবায়দার সৌহার্দ্য
দুই মহান সেনাপতির এমন আচরণের মাধ্যমে মূলত ইসলামি ভ্রাতৃত্বের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়, যা একমাত্র নিখাদ তাওহিদের মাধ্যমে অস্তিত্বে এসে মানুষকে উত্তম চরিত্রে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে। এ ছিল সাহাবিদের বিশেষ মর্যাদা। ইরাকে বিপুল বিজয়ও খালিদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারেনি। তাঁর মধ্যে কোনো প্রকার অহমিকা জাগাতে পারেনি; বরং দেখা যাচ্ছে তিনি নিজের ওপর আবু উবায়দার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিচ্ছেন, তাঁর আনুগত্য গ্রহণের স্বীকৃতি দিচ্ছেন।

অপরদিকে দেখা যায়, আবু উবায়দাও খলিফার এই নির্দেশকে বরকতময় আখ্যা দিচ্ছেন। খালিদকে উদার চিত্তে স্বাগত জানাচ্ছেন। এগুলোই প্রমাণ করে যে, খালিদ ও আবু উবায়দারা ছিলেন প্রবৃত্তিপরায়ণতার অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁরা সবসময় জনগণের কল্যাণকেই অগ্রাধিকার দিতেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এর মধ্যে শাসক, যুদ্ধের নেতা, আলিম, দায়ি ও মুবাল্লিগদের জন্য নেতৃত্ব নির্বাচন এবং প্রয়োজনে তাদের পদচ্যুত করার মধ্যে রয়েছে বিশাল শিক্ষা।

টিকাঃ
১৩৯৯. আল-আমালিয়াতুত তারিজিয়া: ১৪৮।
১৪০০. তারিখুত তাবারি: ৪/২১১।
৪০১. তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম: ৩৫৯-৩৬০।
৪০২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/৫।
৪০৩. আল-ফাল্গুল আসকারিয়িল ইসলামি : ৮৯; আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., আল হাদিসি: ৬০।
৪০৪. মাজমুআতুল ওয়াসায়িকিস সিয়াসিয়া: ৩৯২-৩৯৩।
৪০৫. ফুতুহুশ শাম আজদি: ৬৮-৭২- হুমায়দি।
৪০৬. আত-তারিখুল ইসলামি: হুমায়দি: ৯/২৩১।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 আজনাদায়নযুদ্ধ

📄 আজনাদায়নযুদ্ধ


খালিদ রা. শামে পৌঁছেই বসরা জয় করেন। এরপর তিনি মুসলিম সেনাপতিত্রয় তথা আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, শুরাহবিল ইবনু হাসানা এবং ইয়াজিদ আবি সুফিয়ানের সঙ্গে মিলিত হন। সেখানে পৌঁছেই সামরিক অবস্থা পর্যালোচনা করেন। তাঁদের থেকে সূক্ষ্ম বিষয়াদি সম্পর্কে অবহিত হন। এ ছাড়া আমর ইবনুল আসের অবস্থান সম্পর্কেও জেনে নেন, যিনি তখন সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর কাছে দ্রুত পৌঁছার জন্য জর্দান নদীর তীরবর্তী রোমানবাহিনীর মোকাবিলা এড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন; কিন্তু শত্রুবাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতিসহ তাঁকে ধাওয়া করে চলছিল বিধায় তাঁর পৌঁছতে দেরি হচ্ছিল। তারা তাঁকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করছিল।

তবে আমর রা. ছিলেন এ ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন। তিনি ভালো করেই জানতেন, এমতাবস্থায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া হবে সম্পূর্ণ বোকামি। কারণ, তাঁর বাহিনীর সংখ্যা মাত্র ৭ হাজারের মতো; অথচ রোমানবাহিনী ছিল এর কয়েকগুণ বেশি। খালিদ রা. সেখানে পৌঁছে সামরিক বিষয়াদি পর্যবেক্ষণের পর এ সিদ্ধান্তে যান যে, এখন তাঁর সামনে দুটি বিষয় রয়েছে :

১. হয় তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে আমর ইবনুল আসের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হবেন। এরপর রোমানবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাদের ধ্বংস করে ফিলিস্তিনে তাঁর অবস্থান মজবুত করবেন।

২. নিজ অবস্থানে থেকে আমর ইবনুল আসকে তাঁর সঙ্গে এসে মিলিত হওয়ার কথা বলবেন। আর রোমানদের সেই বাহিনীর অপেক্ষায় বসে থাকবেন, যারা শাম থেকে ইতিমধ্যে রওনা হয়ে গেছে। তারা চলে এলে পরে চূড়ান্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন।

খালিদ রা. প্রথম বিষয়টা অগ্রাধিকার দেন। এর অন্যতম কারণ ছিল, তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, ফিলিস্তিন অধিকার করতে পারলে প্রয়োজনে মুসলিমদের পিছু হটার পথ উন্মুক্ত থাকবে। তাদের কেন্দ্রগুলোও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ থাকবে। এমতাবস্থায় তাঁরা রোমানদের যেকোনো সময় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবেন। শত্রুরাও পেছন থেকে মুসলিমবাহিনীর ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকবে। কারণ, তখন তাঁর বাহিনীর একাংশ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে এবং একাংশ তাঁদের নিরাপত্তা জুগিয়ে যেতে পারবে।

সুতরাং খালিদ রা. সেনাদের নিয়ে ফিলিস্তিন অভিমুখে রওনা দেন এবং আমর ইবনুল আসকে চিঠি পাঠিয়ে বলেন, তিনি যেন রোমানবাহিনীকে ধোঁকায় ফেলে তাঁর বাহিনীর কাছে নিয়ে আসেন। এরপর সবাই মিলে একসঙ্গে তাদের ওপর হামলা করবেন। খালিদের নির্দেশ পেয়ে আমর ইবনুল আস আজনাদায়নে এসে পৌঁছান। ৪০৭

১. খালিদ ও আমরের সামরিক প্রজ্ঞা
আমর ইবনুল আসের বাহিনী যখন খালিদের বাহিনীর কাছে এসে পৌঁছায়, তখন মুসলিমবাহিনীর সেনাসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩০ হাজারে। খালিদ তাঁর বাহিনী নিয়ে উপযুক্ত সময়েই ময়দানে হাজির হন। একপর্যায়ে রোমানদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে খালিদ ও আমরের সামরিক প্রজ্ঞা বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাঁরা ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিশেষজ্ঞ বাহাদুরদের সমন্বয়ে আলাদা একটা ইউনিট গঠন করে রাখেন। তাঁরা যুদ্ধের একপর্যায়ে শত্রুবাহিনীর ব্যূহ পর্যুদস্ত করে রোমান-জেনারেলের কাছাকাছি পৌঁছে তাদের নিঃশেষ করে ফেলেন। জেনারেলের মৃত্যুর পরপরই রোমানবাহিনী দিগ্বিদিক পালিয়ে যেতে থাকে।

শামের আজনাদায়ন প্রান্তরের লড়াই ছিল মুসলিম ও রোমানদের মধ্যকার প্রথম বৃহৎ লড়াই। যখন হিমসে অবস্থানরত রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে তার বিশাল বাহিনীর পর্যুদস্ত হওয়ার সংবাদ পৌঁছায়, তখন সে অবস্থার ভয়াবহতা ভালো করেই অনুধাবন করতে পারে। ৪০৮

২. খালিদ কর্তৃক খলিফার কাছে আজনাদায়ন বিজয়ের সংবাদ
এদিকে খালিদ মদিনায় অবস্থানরত খলিফা আবু বকরকে আজনাদায়নের বিজয়ের সংবাদ পাঠিয়ে বলেন,

আল্লাহর রাসুলের খলিফা বরাবরে আল্লাহর তরবারি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পক্ষ থেকে। আমি সেই মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।

হামদ ও সালাতের পর,
আল্লাহর রাসুলের খলিফা, আমি আপনাকে সংবাদ দিচ্ছি, আমরা শত্রুর মোকাবিলায় নেমেছিলাম। তারা আজনাদায়ন প্রান্তরে আমাদের বিরুদ্ধে বিশাল একটা বাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়েছিল। তারা তাদের ক্রুশ উত্তোলন করেছিল। তাদের কিতাব মেলে ধরেছিল। তারা শপথ করে বলেছিল, আমাদের ধ্বংস করে ছাড়বে অথবা তাদের দেশ থেকে আমাদের বের করে স্বস্তির নিশ্বাস নেবে; কোনো অবস্থায়ই তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাবে না। এদিকে তখন আমরাও আল্লাহর ওপর নির্ভর করে দৃঢ়পায়ে তাদের মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে যাই। বর্শা দ্বারা তাদের ওপর হামলে পড়ি। এরপর তরবারি ধারণ করে এগিয়ে যাই। প্রতিটা উপত্যকা, মাঠ ও পথে আমরা তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ি। আমি আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি তাঁর দীনকে বিজয়ী করেছেন। শত্রুবাহিনীকে লাঞ্ছিত-অপদস্থ করেছেন। তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেছেন।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

আবু বকর রা. চিঠি পেয়ে অত্যন্ত প্রীত হন এবং বলেন, 'যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি মুসলিমদের বিজয়ী করেছেন এবং আমার চক্ষু শীতল করে দিয়েছেন। '৪০৯

টিকাঃ
৪০৭. 'আজনাদায়ন' ফিলিস্তিনের পাশেরই একটি এলাকা। আল-মুজাম, ইয়াকুত হামাবি: ১/২০৩।
৪০৮. আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., নাজার আল হাদিসি: ৭০-৭১।
৪০৯. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ৮৪-৯৩।

খালিদ রা. শামে পৌঁছেই বসরা জয় করেন। এরপর তিনি মুসলিম সেনাপতিত্রয় তথা আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, শুরাহবিল ইবনু হাসানা এবং ইয়াজিদ আবি সুফিয়ানের সঙ্গে মিলিত হন। সেখানে পৌঁছেই সামরিক অবস্থা পর্যালোচনা করেন। তাঁদের থেকে সূক্ষ্ম বিষয়াদি সম্পর্কে অবহিত হন। এ ছাড়া আমর ইবনুল আসের অবস্থান সম্পর্কেও জেনে নেন, যিনি তখন সম্মিলিত মুসলিমবাহিনীর কাছে দ্রুত পৌঁছার জন্য জর্দান নদীর তীরবর্তী রোমানবাহিনীর মোকাবিলা এড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন; কিন্তু শত্রুবাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতিসহ তাঁকে ধাওয়া করে চলছিল বিধায় তাঁর পৌঁছতে দেরি হচ্ছিল। তারা তাঁকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করছিল।

তবে আমর রা. ছিলেন এ ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন। তিনি ভালো করেই জানতেন, এমতাবস্থায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া হবে সম্পূর্ণ বোকামি। কারণ, তাঁর বাহিনীর সংখ্যা মাত্র ৭ হাজারের মতো; অথচ রোমানবাহিনী ছিল এর কয়েকগুণ বেশি। খালিদ রা. সেখানে পৌঁছে সামরিক বিষয়াদি পর্যবেক্ষণের পর এ সিদ্ধান্তে যান যে, এখন তাঁর সামনে দুটি বিষয় রয়েছে :

১. হয় তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে আমর ইবনুল আসের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হবেন। এরপর রোমানবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাদের ধ্বংস করে ফিলিস্তিনে তাঁর অবস্থান মজবুত করবেন।

২. নিজ অবস্থানে থেকে আমর ইবনুল আসকে তাঁর সঙ্গে এসে মিলিত হওয়ার কথা বলবেন। আর রোমানদের সেই বাহিনীর অপেক্ষায় বসে থাকবেন, যারা শাম থেকে ইতিমধ্যে রওনা হয়ে গেছে। তারা চলে এলে পরে চূড়ান্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন।

খালিদ রা. প্রথম বিষয়টা অগ্রাধিকার দেন। এর অন্যতম কারণ ছিল, তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, ফিলিস্তিন অধিকার করতে পারলে প্রয়োজনে মুসলিমদের পিছু হটার পথ উন্মুক্ত থাকবে। তাদের কেন্দ্রগুলোও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ থাকবে। এমতাবস্থায় তাঁরা রোমানদের যেকোনো সময় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবেন। শত্রুরাও পেছন থেকে মুসলিমবাহিনীর ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকবে। কারণ, তখন তাঁর বাহিনীর একাংশ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে এবং একাংশ তাঁদের নিরাপত্তা জুগিয়ে যেতে পারবে।

সুতরাং খালিদ রা. সেনাদের নিয়ে ফিলিস্তিন অভিমুখে রওনা দেন এবং আমর ইবনুল আসকে চিঠি পাঠিয়ে বলেন, তিনি যেন রোমানবাহিনীকে ধোঁকায় ফেলে তাঁর বাহিনীর কাছে নিয়ে আসেন। এরপর সবাই মিলে একসঙ্গে তাদের ওপর হামলা করবেন। খালিদের নির্দেশ পেয়ে আমর ইবনুল আস আজনাদায়নে এসে পৌঁছান। ৪০৭

১. খালিদ ও আমরের সামরিক প্রজ্ঞা
আমর ইবনুল আসের বাহিনী যখন খালিদের বাহিনীর কাছে এসে পৌঁছায়, তখন মুসলিমবাহিনীর সেনাসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩০ হাজারে। খালিদ তাঁর বাহিনী নিয়ে উপযুক্ত সময়েই ময়দানে হাজির হন। একপর্যায়ে রোমানদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে খালিদ ও আমরের সামরিক প্রজ্ঞা বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাঁরা ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিশেষজ্ঞ বাহাদুরদের সমন্বয়ে আলাদা একটা ইউনিট গঠন করে রাখেন। তাঁরা যুদ্ধের একপর্যায়ে শত্রুবাহিনীর ব্যূহ পর্যুদস্ত করে রোমান-জেনারেলের কাছাকাছি পৌঁছে তাদের নিঃশেষ করে ফেলেন। জেনারেলের মৃত্যুর পরপরই রোমানবাহিনী দিগ্বিদিক পালিয়ে যেতে থাকে।

শামের আজনাদায়ন প্রান্তরের লড়াই ছিল মুসলিম ও রোমানদের মধ্যকার প্রথম বৃহৎ লড়াই। যখন হিমসে অবস্থানরত রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে তার বিশাল বাহিনীর পর্যুদস্ত হওয়ার সংবাদ পৌঁছায়, তখন সে অবস্থার ভয়াবহতা ভালো করেই অনুধাবন করতে পারে। ৪০৮

২. খালিদ কর্তৃক খলিফার কাছে আজনাদায়ন বিজয়ের সংবাদ
এদিকে খালিদ মদিনায় অবস্থানরত খলিফা আবু বকরকে আজনাদায়নের বিজয়ের সংবাদ পাঠিয়ে বলেন,

আল্লাহর রাসুলের খলিফা বরাবরে আল্লাহর তরবারি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পক্ষ থেকে। আমি সেই মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।

হামদ ও সালাতের পর,
আল্লাহর রাসুলের খলিফা, আমি আপনাকে সংবাদ দিচ্ছি, আমরা শত্রুর মোকাবিলায় নেমেছিলাম। তারা আজনাদায়ন প্রান্তরে আমাদের বিরুদ্ধে বিশাল একটা বাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়েছিল। তারা তাদের ক্রুশ উত্তোলন করেছিল। তাদের কিতাব মেলে ধরেছিল। তারা শপথ করে বলেছিল, আমাদের ধ্বংস করে ছাড়বে অথবা তাদের দেশ থেকে আমাদের বের করে স্বস্তির নিশ্বাস নেবে; কোনো অবস্থায়ই তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাবে না। এদিকে তখন আমরাও আল্লাহর ওপর নির্ভর করে দৃঢ়পায়ে তাদের মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে যাই। বর্শা দ্বারা তাদের ওপর হামলে পড়ি। এরপর তরবারি ধারণ করে এগিয়ে যাই। প্রতিটা উপত্যকা, মাঠ ও পথে আমরা তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ি। আমি আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি তাঁর দীনকে বিজয়ী করেছেন। শত্রুবাহিনীকে লাঞ্ছিত-অপদস্থ করেছেন। তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেছেন।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

আবু বকর রা. চিঠি পেয়ে অত্যন্ত প্রীত হন এবং বলেন, 'যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি মুসলিমদের বিজয়ী করেছেন এবং আমার চক্ষু শীতল করে দিয়েছেন। '৪০৯

টিকাঃ
৪০৭. 'আজনাদায়ন' ফিলিস্তিনের পাশেরই একটি এলাকা। আল-মুজাম, ইয়াকুত হামাবি: ১/২০৩।
৪০৮. আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., নাজার আল হাদিসি: ৭০-৭১।
৪০৯. ফুতুহুশ শাম, আজদি: ৮৪-৯৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00