📄 ফিরাজের যুদ্ধ
খালিদ রা. ইরাকে ইসলামের বিজয়পতাকা উড়িয়ে আরব গোত্রগুলোকে অনুগত করার পর ফিরাজের দিকে যাওয়ার সংকল্প করেন। এলাকাটা ছিল শাম, ইরাক ও জাজিরার সীমান্তবর্তী। এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের পিঠ নিরাপদ রাখা, যাতে সাওয়াদ থেকে ইরান অভিমুখে এগিয়ে গেলে পেছন থেকে কেউ হামলে পড়ার আশঙ্কা না থাকে; কিন্তু মুসলিমরা ফিরাজে সেনাসমাবেশ ঘটালে রোমানরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা পার্শ্ববর্তী পারসিক যুবকদের সাহায্য চায়। যেহেতু মুসলিমরা পারস্যবাসীর প্রভাব-প্রতিপত্তি ধুলোয় মিশিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের অপমানিত করে ছেড়েছিলেন, এ জন্য তারা মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি দেখে জ্বলে ভস্ম হচ্ছিল। তাই তারা রোমানদের সাহায্যের আবেদন লুফে নেয়। আজন্ম শত্রুদের সহায়তায় প্রস্তুত হয়ে ওঠে। একইভাবে রোমানরা আরব গোত্র তাগলিব, নিমার ও ইয়াদের কাছেও সাহায্য চাইলে তারাও রোমানদের ডাকে সাড়া দেয়। কারণ, তারা তখনো তাদের গোত্রের লোকজনসহ নেতাদের হত্যার শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
এভাবে এই যুদ্ধে মুসলিমদের বিপরীতে রোম, পারস্য ও আরবদের ত্রিশক্তির সম্মিলন ঘটে। সম্মিলিত এই বাহিনী ফুরাতের তীরে এসে পৌঁছলে মুসলিমদের উদ্দেশে বলে, 'হয়তো তোমরা নদী পার হয়ে এসো, অথবা আমাদের আসতে বলো।' খালিদ রা. বলেন, 'তোমরাই চলে এসো।' তারা বলে, 'তোমরা এখান থেকে একটু পেছনে সরে যাও, আমরা আসছি।' খালিদ বলেন, 'এমনটা হবে না। তোমরা নদী পার হয়ে নিচু ভূমিতে চলে এসো।' ঘটনাটা ১২ হিজরির ১৫ জুলকাদায় ঘটে।
রোমান ও পারস্যবাহিনী একে অন্যকে বলছিল, 'নিজ দেশকে বাঁচাও। এই ব্যক্তি দীনের জন্য লড়ছে আর সে খুবই মেধাবী। আল্লাহর শপথ, এই ব্যক্তিই বিজয়ী হবে এবং আমরা তার বিপরীতে লজ্জিত ও অপমানিত হব।' এরপরও তারা এ থেকে শিক্ষা নেয়নি। তারা নদী পার হয়। পুরো বাহিনী চলে আসার পর রোমানরা বলতে থাকে, 'সবাই পৃথক হয়ে যাও, যাতে আমরা উপলব্ধি করতে পারি, কোনটা ভালো এবং কোনটা মন্দ; আর বিপদ কোন দিক থেকে এগিয়ে আসছে।' সুতরাং তা-ই করা হয়। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। আল্লাহ রোমানদের ভাগ্যে পরাজয় নির্ধারণ করেন।
খালিদ রা. বলেন, 'ওদের ওপর হামলে পড়ো এবং একটুও অবকাশ দিয়ো না।' অশ্বারোহীরা বর্শার জোরে ওদের এক একটা দলকে মুসলিমদের বাগে এনে হত্যা করে ফেলতেন। এই যুদ্ধে শত্রুবাহিনীর ১ লাখ সেনা নিহত হয়। খালিদ রা. ফিরাজে ১০ দিন অবস্থান করেন। এরপর মুসলিমবাহিনীকে হিরায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন。
এভাবেই মুসলিমরা প্রথমবারের মতো দুই পরাশক্তিসহ আরবদের যৌথ হামলার মোকাবিলা করেন; কিন্তু তারপরও তাঁরাই বিজয়ী হন। যদিও যুদ্ধটা অন্য বড় বড় যুদ্ধের মতো তেমন খ্যাতি ও প্রচার পায়নি, তথাপি নিঃসন্দেহে যুদ্ধটা ছিল ইতিহাসের মোড়নির্ধারক একটা যুদ্ধ। এ যুদ্ধের মাধ্যমে শত্রুদের—চাই তারা রোমান হোক কিংবা ইরানি অথবা আরব—ভেতরগত শক্তি একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়। ইরাকে খালিদ রা. যে যুদ্ধ-শেকল গঠন করেছিলেন, এটা ছিল সেই শেকলের শেষ কড়া。
এ যুদ্ধের পর ইরানিদের গৌরব ও জাঁকজমক একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। এরপর মুসলিমদের ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো তাদের এমন কোনো যুদ্ধ-ক্ষমতা আর বাকি থাকেনি। এই যুদ্ধ সম্পর্কে কা'কার বক্তব্য ছিল,
ফিরাজে আমরা রোমান ও পারস্যের যৌথবাহিনীর মোকাবিলা করেছি, যারা ইসলামের অগ্রতৎপরতায় অস্থির হয়ে পড়েছিল। আমরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাদের বাহিনীকে ধ্বংস করে দিই, আমরা বনু রিজামের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছি। মুসলিমবাহিনী অটল পাথরের মতো অবস্থান নেয়, আমরা শত্রুদের মাঠে-চরা বকরির মতো পেয়েছিলাম。
টিকাঃ
তারিখুত তাবারি: ৪/২০১。
৩৪৬ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৭৩。
৩৪৭ খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ৩৬。
৩৪৮ মাআরিকু খালিদিবনিল ওয়ালিদ জিদ্দাল ফুরুসি, আবদুল জাব্বার সামরায়ি: ১২৩。