📄 আইনুত তামার
খালিদ আনবারে জিবরিকান ইবনু বদরকে স্থলাভিষিক্ত করে আইনুত তামারের দিকে বেরিয়ে পড়েন। সেখানে গিয়ে দেখতে পান আক্কা ইবনু আবি আক্কা, নামির, তাগলিব, ইয়াদ গোত্রসহ তাদের সহযোগীরা এক বিশাল বাহিনী নিয়ে অবস্থান করছে। তাদের সঙ্গে পারস্যবাহিনী নিয়ে যোগ দিয়েছে সেনাপতি মিহরান। আক্কা মিহরানের কাছে আবেদন করেছিল, তাকে যেন খালিদের বিরুদ্ধে মোকাবিলায় ছেড়ে দেওয়া হয়। সে তাকে বলেছিল, 'আরবরাই আরবদের বিরুদ্ধে কৌশল সম্পর্কে বেশি অবহিত। অতএব, আপনি আমাকে তাঁর সঙ্গে বোঝাপড়া করার সুযোগ দিন।' মিহরান বলে, 'ঠিক আছে, তুমি তাঁর মোকাবিলায় চলে যাও, সাহায্যের প্রয়োজন পড়লে আমরা আছি।'
পারসিকরা তাদের অধিনায়কের এই সিদ্ধান্তে সমালোচনামুখর হয়ে ওঠে, তখন সে তাদের বলে, 'ওকে তার অবস্থায় ছেড়ে দাও। যদি সে খালিদের ওপর বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারে, তাহলে সেটা তো তোমাদেরই বিজয়; আর সে পরাজিত হলে তো আমরা নিজ শক্তিতেই খালিদের মোকাবিলা করব। এমতাবস্থায় নিশ্চয় সে থাকবে পরিশ্রান্ত ও দুর্বল; আর আমরা থাকব তাজাদম।' এ কথা শুনে তারা তার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা স্বীকার করে। এদিকে খালিদ রা. আক্কার মোকাবিলায় বেরিয়ে পড়েন। উভয় বাহিনী মুখোমুখি হলে খালিদ তাঁর ডান ও বামের বাহিনীকে বলেন, 'তোমরা নিজ নিজ অবস্থানে অটল থাকবে; আমি আক্রমণ চালাচ্ছি।' এ ছাড়া তিনি তাঁর প্রতিরক্ষাবাহিনীকে নির্দেশ দেন, 'তোমরা আমার পেছনে থাকবে।'
এরপর তিনি আক্কার ওপর হামলা করেন। আক্কা তখনো তার সারিবিন্যাসে ব্যস্ত ছিল। মুসলিম যোদ্ধারা আক্কাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এলে তার বাহিনী যুদ্ধ ছাড়াই পালিয়ে যায়। তখন তাদের বড় একটা অংশকে গ্রেপ্তার করা হয়। অপরদিকে মিহরান যখন জানতে পারে, আক্কা যুদ্ধ ছাড়াই গ্রেপ্তার হয়েছে এবং তার বাহিনী পালিয়ে ছত্রখান হয়ে গেছে, তখন সে-ও দুর্গ ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরাজিত আরবরা যখন দেখতে পায় দুর্গ শূন্য এবং সেখানে পারস্যবাহিনীর উপস্থিতি নেই, তখন তারা দুর্গে প্রবেশ করে সেখানে আশ্রয় নেয়। খালিদ সেখানে গিয়ে দুর্গ অবরোধ করে ফেলেন; কিন্তু একসময় তারা খালিদের নির্দেশে দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়। খালিদ আক্কাসহ তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া এবং তাঁর নির্দেশে দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসা লোকজন সবাইকে হত্যার নির্দেশ দেন।
এভাবে মুসলিমবাহিনী দুর্গের সবকিছু গনিমত হিসেবে নিয়ে নেয়। দুর্গের অভ্যন্তরে একটা গির্জায় দরজা বন্ধ করে ৪০ জন বালক ইনজিল অধ্যয়ন করছিল, তিনি দরজা ভেঙে তাদের বন্দি করে আমিরদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। এদের মধ্যে উসমান ইবনু আফফানের দাস হুমরানও ছিলেন। তাকে তিনি গনিমতের খুমুস থেকে পেয়েছিলেন। আরেকজন ছিলেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সিরিনের পিতা সিরিন। তিনি আনাস ইবনু মালিকের ভাগে পড়েছিলেন। এরপর খালিদ গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ খলিফার দরবারে পাঠিয়ে দেন।
এরপর আবু বকর রা. ওয়ালিদ ইবনু উকবাকে ইয়াজ ইবনু গানামের সাহায্যে পাঠিয়ে দেন। ইয়াজ তখন দাওমাতুল জান্দাল অবরোধরত। ওয়ালিদ দেখতে পান, ইয়াজ ইরাকের প্রান্তিক একটা অঞ্চলে শত্রুদের অবরোধ করে আছেন। এদিকে শত্রুবাহিনীও তাঁর চলে আসার সব পথ বন্ধ করে রাখায় তিনিও অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন। চরম বিপদের মুহূর্তে সাহায্য পেয়ে ইয়াজ ইবনু গানাম রা. ওয়ালিদ ইবনু উকবাকে বলেছিলেন, 'অনেক ছোট সিদ্ধান্তও অনেক সময় বড় বাহিনীর চেয়ে উত্তম হয়ে থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনি আমাকে কী পরামর্শ দেবেন?' উকবা বলেন, 'আপনি খালিদকে আরও কিছু সেনাসহায়তা পাঠাতে বলুন।' ইয়াজ চিঠি পাঠালে খালিদ চিঠিটা আইনুত তামারের যুদ্ধের পরক্ষণেই হাতে পেয়েছিলেন। জবাবে তিনি লিখে পাঠান, 'আমরা আপনার দিকে চলে আসার ইচ্ছা করেছি।' এ ছাড়া তিনি এই পঙ্ক্তিও লিখে পাঠান,
অপেক্ষা করুন, আপনার কাছে কতিপয় অশ্বারোহী বাঘ চলে আসছে, তাদের তরবারিগুলো চকচক করছে এবং তারা দলে দলে আসছে。
📄 দাওমাতুল জাদাল ও খালিদ সম্পর্কে তাঁর শত্রুর সাক্ষ্য
খালিদ রা. আইনুত তামারে উয়াইম ইবনু কাহিল আসলামিকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে দাওমাতুল জান্দাল অভিমুখে বেরিয়ে পড়েন। দাওমাতুল জান্দালবাসী তাঁর আগমনের সংবাদ পেয়ে তাদের সহযোগী গোত্র বাহরা, কালব, গাসসান ও তান্নুখিদের সাহায্য চায়। তখন দাওমাতুল জান্দাল দুই নেতার কর্তৃত্বে ছিল। একজন ছিল আকিদার ইবনু আবদিল মালিক, অপরজন জুদি ইবনু রাবিআ। তাদের মধ্যে তখন মতবিরোধ দেখা দেয়। আকিদার বলছিল, 'আমি খালিদকে তোমার চেয়ে বেশি জানি। তাঁর থেকে পয়মন্ত কেউ নেই। আমাদের মধ্যে যুদ্ধে তার ওপর বিজয়ী হওয়ার মতো কেউ নেই। সংখ্যায় বেশি হোক কিংবা কম, খালিদের চেহারা দর্শনেই তাঁর প্রতিপক্ষ বাহিনী পরাজয়বরণ করে নেয়। অতএব, তুমি আমার সিদ্ধান্ত মেনে নাও এবং খালিদের সঙ্গে সন্ধির চেষ্টা করো।' কিন্তু লোকজন আকিদারের কথা মানতে রাজি হয়নি। আকিদার বলে, 'তাহলে আমিও খালিদের বিপরীতে তোমাদের সঙ্গ দিতে রাজি নই। তোমরা তোমাদের বিষয়টা ভালো জানো。
এ হচ্ছে খালিদ সম্পর্কে তাঁর শত্রুর সাক্ষ্য। আর সত্য সাক্ষ্য তো তা-ই, যা শত্রু স্বীকার করে থাকে। তাবুকযুদ্ধে রাসুল যখন খালিদকে আকিদারের দিকে পাঠিয়েছিলেন, তখন তিনি তাকে বন্দি করে নিয়ে এসেছিলেন। নবিজি দয়াপরবশ হয়ে সেদিন তাকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তবে তার থেকে 'মুসলমানের মোকাবিলায় আসবে না' মর্মে একটা অঙ্গীকার নিয়েছিলেন; কিন্তু সে অঙ্গীকারের কোনো মর্যাদা রাখেনি। ফলে খালিদের আগমন-সংবাদ পেয়ে সে গোত্রকে ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। খালিদ দাওমাতুল জান্দালের পথে থাকতেই খবরটা পেয়ে গেলে তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসতে আসিম ইবনু আমরকে পাঠান। আসিম তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এলে খালিদ আগের প্রতিশ্রুতিভঙ্গের শাস্তিস্বরূপ তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। এভাবেই আল্লাহ তাকে তার গাদ্দারির জন্য ধ্বংস করেন। তার কোনো তদবির তাকদিরকে প্রতিহত করতে পারেনি。
খালিদ রা. দাওমাতুল জান্দালে পৌঁছেই সেখানকার অধিবাসীসহ তাদের সহযোগী গোত্র বাহরা, কালব ও তান্নুখিদের অবরোধ করেন। তখন একদিকে ছিল তাঁর বাহিনী, অপরদিকে ছিল ইয়াজ ইবনু গানামের বাহিনী। জুদি ইবনু রাবিআ তার বাহিনী নিয়ে খালিদের দিকে এগিয়ে আসে। অপরদিকে ইবনু হাদরিজান ও ইবনু আবহাম ইয়াজ ইবনু গানামের দিকে এগিয়ে যায়। খালিদ জুদির বাহিনীকে পরাস্ত করে ফেলেন। তবে ইয়াজ ইবনু গানাম রা.-কে তাঁর প্রতিপক্ষ বাহিনীর ওপর বিজয় অর্জনে বেশ বেগ পেতে হয়। পরাজিতরা পালিয়ে দুর্গে আশ্রয় নিতে চেয়েছিল; কিন্তু তাদের পৌঁছার আগেই দুর্গ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। সেখানে তখন তিলধারণের জায়গাও ছিল না। ভেতরের লোকজন তাই দরজা বন্ধ করে দেয়। তারা নিজেদের বাহিনীর লোকজনকে অসহায় অবস্থায় ময়দানে রেখে এসেছিল। খালিদ রা. দুর্গের দরজা উপড়ে ফেলে ভেতরে ঢুকে পড়েন। এরপর সেখানে থাকা বহুসংখ্যক শত্রুকে হত্যা করেন。
দাওমাতুল জান্দাল বিজয়ের ফলে মুসলিমবাহিনী বিশ্বের উদীয়মান শক্তি বিবেচিত হতে থাকে। দাওমাতুল জান্দালের অবস্থান এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে তিন দিকে রাস্তা বেরিয়ে গেছে। দক্ষিণে আরব উপদ্বীপের দিকে, উত্তর-পূর্বে ইরাকের দিকে এবং উত্তর-পশ্চিমে শামের দিকে। স্বাভাবিকভাবেই এলাকাটা ছিল আবু বকর এবং ইরাকের ময়দানে যুদ্ধরত ও শাম-সীমান্তে অবস্থানকারী তাঁর বাহিনীর অন্যতম লক্ষ্য। এ কারণেই ইয়াজ ইবনু গানাম এখান থেকে অন্য কোথাও সরে যাননি। তিনি সেখানে অবস্থান করেই খালিদের অপেক্ষা করছিলেন। যদি দাওমাতুল জান্দাল বিজিত না হতো, তাহলে ইরাকজয়ী মুসলিমদের জন্য বড়ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যেত。
এভাবেই খালিদ রা. দাওমাতুল জান্দালযুদ্ধে ইয়াজকে সহায়তা দিতে সমর্থ হন। যেখানে খালিদ কর্তৃক দক্ষিণ-ইরাকের যুদ্ধসমূহে তাঁর দ্রুত আক্রমণসামর্থ্য স্বল্প সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শত্রুর অন্তরে ভীতি জাগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল, সেখানে দীর্ঘ সময়ব্যাপী অবরুদ্ধপ্রায় অবস্থায় ইয়াজের ধৈর্যসহ বসে থাকা এ কথারই স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, মুসলিমবাহিনী ধৈর্য, দৃঢ়তা, পরকালের কল্যাণ-আকাঙ্ক্ষা এবং আল্লাহর সাহায্য লাভ ও সম্পূর্ণভাবে তাঁর ওপর ভরসা করার গুণে গুণান্বিত ছিলেন। আর এই গুণাবলি তাঁদের মধ্যে পুরোমাত্রায় ছিল।
ইয়াজ ছিলেন শীর্ষস্থানীয় মুহাজির ও কুরাইশ নেতাদের অন্যতম ব্যক্তি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার ও দানশীল। খলিফাসহ গভর্নররাও তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতেন। ছিলেন ইয়ারমুকযুদ্ধের সেনাপতিদের একজন। আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের সোনাবাহিনীর সম্মুখসারির নেতৃত্বে ছিলেন। এরপর তিনি শাম ও ইরাকের মধ্যবর্তী জাজিরা অঞ্চলটা পুরোপুরিভাবে জয় করে নিয়েছিলেন। আবু উবায়দা রা. তাঁর ইনতিকালের সময় ইয়াজকে শামে নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন। উমর রা.-ও তাঁকে ওই পদে বহাল রাখেন। এর পর যখন যে বিজয়াভিযানের প্রয়োজন পড়ত, তাঁকে সেদিকে পাঠিয়ে দেওয়া হতো。
টিকাঃ
৩৩১ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩৫৪।
প্রাগুক্ত: ৬/৩৫৫; তারিখুত তাবারি: ৪/১৯৫।
আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৬৩।
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ২৩১।
তারিখুত তাবারি: ৪/১৯৬; আবু বাকরিনিস সিদ্দিক, খালিদ আল জুনাবি: ৫৪।
📄 হুসায়িদের যুদ্ধ
খালিদ রা. আকরা ইবনু হাবিসকে আনবার ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে নিজে দাওমাতুল জান্দালে অবস্থান করেন। সেখানে অবস্থানের ফলে পারস্যবাসী তাঁর ব্যাপারে ভুল ধারণায় পড়ে যায়। তাদের অন্তরে তখন লালসার জন্ম নেয়। এ ছাড়া এই অঞ্চলের আরবরাও পারস্যবাসীর সঙ্গে পত্রযোগাযোগের মাধ্যমে চক্রান্তে লিপ্ত হয়। খালিদের ওপর তারা ভীষণ খেপা ছিল। তারা আক্কার মৃত্যুর দুঃখ ভুলতে পারছিল না। তাই রুজমাহার রুজবাকে সঙ্গে নিয়ে বাগদাদ থেকে আনবারের দিকে এগিয়ে আসে। এরপর হুসায়িদ ও খানাফিসে জড়ো হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
সংবাদটা আনবারের নেতৃত্বে থাকা জিবরিকান ইবনু বদরের কাছে দ্রুত পৌঁছে যায়। তিনি তৎক্ষণাৎ খালিদ মনোনীত হিরার গভর্নর কা'কা ইবনু আমরের কাছে সাহায্যপ্রার্থী হন। কা'কাও আবাদ ইবনু ফাদাকি সাদিকে (আবু লায়লা) জিবরিকানের সাহায্যে হুসায়িদে দ্রুত পাঠিয়ে দেন। একইভাবে তিনি উরওয়া ইবনু জাদ আল বারকিকে তাঁর সাহায্যে পাঠিয়ে দেন। তবে উরওয়াকে নির্দেশ দেন, 'তুমি খানাফিসে চলে যাবে।' দাওমাতুল জান্দালে থাকা খালিদের কাছে যখন এ সংবাদ পৌঁছায় যে, কতিপয় আরব গোত্র বিদ্রোহে মেতে উঠছে এবং তারা রুজবার সঙ্গ দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে, তখন তিনি হিরায় কা'কার স্থলে ইয়াজ ইবনু গানামকে গভর্নর নিযুক্ত করে কা'কাকে হুসায়িদের গভর্নর করে পাঠান।
এদিকে রুজবা কা'কার এগিয়ে আসার সংবাদ পেয়ে রুজমাহারের কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠায়। আবেদনে সাড়া দিয়ে বুজমাহার নিজে তার সঙ্গে এসে যোগ দেয়। এরপর মুসলিমবাহিনী পারস্যবাহিনীর সঙ্গে এক ভয়াবহ যুদ্ধ জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধে শত্রুবাহিনীর প্রচুর সদস্য নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে রুজমাহার ও রুজবা ছিল। মুসলিমরা বিপুল গনিমত লাভ করেন। কা'কা ইবনু আমর এ যুদ্ধ সম্পর্কে বলছিলেন,
কেউ কি আছে, যে আসমার কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দেবে, তোমার স্বামী অনারব নেতা রুজমাহার ও রুজবার কেচ্ছা শেষ করে দিয়েছে। আমরা ভোরেই হুসায়িদ প্রান্তরে ওদের ওপর হামলে পড়েছিলাম আর হিন্দি তীক্ষ্ণধার তরবারির মাধ্যমে ওদের মাথা ওড়াচ্ছিলাম।
টিকাঃ
৩৩৬ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক, নাজার আল হাদিসি ও খালিদ আল জুনাবি: ৫৪।
সপ্ত আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৬৪。
আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩৫৫।
আল-কামিল ফিত তারিখ: ২/৫৯।
আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., খালিদ আল জুনাবি ও নাজার আল হাদিসি: ৫৫।
📄 মুসায়্যাখের যুদ্ধ
হুসায়িদের সংবাদ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর খালিদ রা. তাঁর বাহিনীকে হাওরানের নিকট মুসায়াখে নির্দিষ্ট সময়ে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন। যথাসময়ে পুরো বাহিনী উপস্থিত হলে রাতের ভেতরে কতিপয় গোত্রের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালান। তাদের প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত করেন। এরপর খালিদ রা. দিয়ারু বকরের অন্তর্গত রাক্কা ও জুমাইলের পার্শ্ববর্তী সানি নামক স্থানে কতিপয় গোত্র একত্রিত হয়ে মুসলিমদের ওপর আক্রমণ চালানোর তৎপরতা চালাচ্ছে মর্মে সংবাদ পেলে আচমকা বিভিন্ন দিক থেকে সানি অঞ্চলে ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুবাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে বিক্ষিপ্ত করে দেন। একইভাবে জুমাইলে সমবেত শত্রুদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদেরও বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেন。
আদি ইবনু হাতিমের বর্ণনা; এ যুদ্ধে আমরা হারকুস ইবনু নুমান নামিরি নামের একব্যক্তির কাছে উপস্থিত হই। তার সঙ্গে ছিল তার ছেলে, মেয়ে ও স্ত্রী। তাদের সামনে রাখা ছিল মদের পেয়ালা। আমরা তার কাছে গেলে সে তাদের বলে, 'জনমের মতো পান করে নাও। মনে হচ্ছে, এরপর আর পান করার কোনো সুযোগ পাবে না।' তারা সবাই মদ পান করতে থাকলে হারকুস বলতে থাকে,
সাবধান, মাজাভাঙা বিপদ নেমে আসার আগেই পান সেরে নাও। এই ভীষণ বিপদ থেকে জাতির মুক্তির আশা সুদূর পরাহত। মৃত্যুর আগে বিপদ আমাদের ভাগ্যবিধিতে পরিণত হয়ে গেছে; এমন বিপদ, যা কোনো অবস্থায়ই টলমান নয়。
এ অবস্থায়ই এক অশ্বারোহী এগিয়ে এসে তার ঘাড়ে আঘাত হানলে মস্তকটা উড়ে মদের পেয়ালায় গিয়ে পড়ে। আমরা তার স্ত্রী-সন্তানদের পাকড়াও করে নিই। এরপর তার সন্তানদের হত্যা করা হয়。
এ যুদ্ধে এমন দুজন মানুষকে হত্যা করা হয়, যারা ইসলামগ্রহণ করে নিয়েছিল এবং আবু বকর রা. কর্তৃক নিরাপত্তাপ্রাপ্তও ছিল; কিন্তু মুসলিমদের তা জানা ছিল না। যখন আবু বকরের কাছে তাদের হত্যার সংবাদ পৌঁছায়, তখন তিনি তাদের দিয়াত (রক্তপণ) আদায় করেন এবং তাঁদের সন্তানদের ব্যাপারে কিছু উপদেশ দেন। তিনি তাদের সম্পর্কে বলেছিলেন, 'যারা ইসলামগ্রহণের পর দারুল হারবে বসবাস করে, তাদের পরিণতি এমন হয়েই থাকে। অর্থাৎ, মুশরিকদের সঙ্গে সন্নিহিত হয়ে বসবাস করাটা তাদেরই অন্যায়।'
টিকাঃ
৩৪১ তারিখুত তাবারি: ৪/১৯৯-২০০।
৩৪২ প্রাগুক্ত: ৪/১৯৯; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯/৫৩৩।
৩৪৩ তারিখুত তাবারি: ৪/১৯৯।
৩৪৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/৩৫৬।