📄 মাজার (সানি) যুদ্ধ
হুরমুজ খালিদের চিঠিটা কিসরার দরবারে পাঠিয়ে দিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে কিসরা হুরমুজের সাহায্যে 'কারিনে'র নেতৃত্বে একটা বাহিনী পাঠিয়ে দেয়; কিন্তু হুরমুজ মুসলিমবাহিনীকে সাধারণ একটা বাহিনী মনে করে কারিন আসার আগেই আক্রমণ চালিয়ে বসে। ফলে বিপর্যয় ও ধ্বংসই হয় তার ললাটলিখন। তার পরাজিত বাহিনী পালিয়ে কারিনের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। তারা একত্রিত হয়ে একে অপরকে উসকানি দিতে থাকে। একপর্যায়ে সবাই মিলে মাজারে মুসলিমদের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করতে সংকল্পবদ্ধ হয়। এদিকে খালিদ রা. মুসান্না ইবনুল হারিসা ও তাঁর ভাই মুআন্নাকে তাদের পেছনে লাগিয়ে রেখেছিলেন। তাঁরা উভয়ে বেশ কয়েকটা দুর্গ করায়ত্ত করে নিয়েছিলেন। ভ্রাতৃদ্বয় পারসিক বাহিনীর আগমন-সংবাদ জানার পরপরই খালিদকে এ ব্যাপারে অবহিত করেন। খালিদও বিষয়টা আবু বকরকে জানান। তারা যাতে আচমকা হামলা করতে না পারে, এ জন্য যুদ্ধপ্রস্তুতিও শুরু করেন।
মাজার নামক স্থানে শত্রুবাহিনীর সঙ্গে মুসলিমদের সংঘাত বাঁধে। জাতুস সালাসিলে পরাজয়ের কারণে তারা এমনিতেই ছিল উত্তপ্ত। তাদের নেতা কারিন ময়দানে নেমে খালিদকে দ্বৈতযুদ্ধের আহ্বান জানায়। খালিদ ময়দানে বেরিয়ে আসেন; কিন্তু তাঁর আগেই মাকিল ইবনু আমাশ ইবনু নাব্বাশ কারিনকে হত্যা করে ফেলেন। কারিন তার ডান বাহুতে কাবাজ; আর বাম বাহুতে আনুশজানকে অধিনায়ক নিযুক্ত করে রেখেছিল।
এরা জাতুস সালাসিলযুদ্ধেও অগ্রবাহিনীর নেতৃত্বে ছিল। সেই যুদ্ধে পরাজয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল তাদের। তাদের মোকাবিলায় দুই মুসলিম বাহাদুর দাঁড়িয়ে যান। কাবাজকে হত্যা করেন আদি ইবনু হাতিম তাই; আর আনুশজানকে আসিম ইবনু আমর তামিমি।
উভয় নেতা নিহত হওয়ার পরপরই শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। পরপর তিন নেতার মৃত্যুতে পারসিক বাহিনী এমনিতেই নেতৃত্বহারা হয়ে পড়েছিল। ফলে মূল যুদ্ধ শুরু হলে তারা নিজেদের সামনে কেবল অন্ধকারই দেখতে পাচ্ছিল। এই যুদ্ধে তাদের ৩০ হাজার সেনা মারা যায়। বাকিরা কোনোমতে নৌকায় চড়ে পালাতে সক্ষম হয়। পানিতে মুসলিমরা তাদের ধাওয়া করতে পারেননি। খালিদ রা. মাজারে অবস্থান করে পারস্যবাহিনীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া গনিমত মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। তা ছাড়া যুদ্ধে যারা গুরুত্বপূর্ণ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছিল, গণিমতের এক-পঞ্চমাংশ থেকে তাদের বিশেষ সম্মাননাপুরস্কারও দান করেন। আর বাকি খুমুস (গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ) মদিনায় পাঠিয়ে দেন。
টিকাঃ
৩০২ প্রাগুক্ত: ৪/১৬৮; আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৩৪।
📄 ওয়ালাজার যুদ্ধ
১. যুদ্ধপরিকল্পনা ও আক্রমণ
মাজারে পারস্যবাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ শুনে কিসরা 'আন্দারজাগার'-এর নেতৃত্বে এক সুবিশাল বাহিনী এবং তার পেছনে পেছনে বাহমান জাদবিয়ার নেতৃত্বে আরেকটা বড় বাহিনীও পাঠায়। আন্দারজাগার মাদায়েন থেকে বেরিয়ে প্রথমে কাসকারে আসে, এরপর সেখান থেকে ওয়ালজায় পৌঁছায়। এদিকে বাহমান জাদবিয়া সাওয়াদের মধ্যাঞ্চল থেকে বেরিয়ে পড়ে। জাদবিয়ার উদ্দেশ্য ছিল, সে মুসলিমবাহিনীকে তার ও আন্দারজাগারের বাহিনীর মধ্যখানে ঘেরাও করে ফেলবে। সে রাস্তা থেকে প্রচুর স্বেচ্ছাসেবক এবং ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতিদের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে সমর্থ হয়। এভাবে পারসিকরা ওয়ালজায় একত্রিত হয়। আন্দারজাগার তার বাহিনীর বিশালতার অহমিকায় আক্রান্ত হয়ে খালিদের মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে খালিদ রা. যখন পারসিকদের ওয়ালজায় এসে সমবেত হওয়ার সংবাদ পান, তখন তিনি বসরার পাশে সানি অঞ্চলে ছিলেন। তিনি তখন তিন দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়াটাই উপযুক্ত মনে করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এভাবে আকস্মিক হামলার মাধ্যমে তাদের দিশেহারা করে তুলতে পারবেন।
সুতরাং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পেছনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে সুওয়াইদ ইবনু মুকাররিনকে নিযুক্ত করেন। তাঁকে খণ্ডবাহিনী নিয়ে হাফিরে অবস্থানের নির্দেশ দেন। এর পর নিজের বাহিনীকে নিয়ে ওয়ালজার দিকে এগিয়ে যান। সেখানে পৌঁছে পুরো অঞ্চলের অবস্থানগত বিষয়ের ওপর একটা পর্যালোচনা চালান। তিনি জানতে পারেন, যুদ্ধের জায়গাটা সমতল এবং যুদ্ধের জন্য উপযোগীও বটে। সেখানে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা সম্ভব। তাই ইতিপূর্বে তিন দিক থেকে আক্রমণ চালানোর যে পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন, তা বাস্তবায়ন করেন। দুটি খণ্ডবাহিনীর একটিকে পারস্যবাহিনীর একপ্রান্ত এবং আরেকটিকে পেছন দিক থেকে হামলার জন্য পাঠিয়ে দেন। একসময় যুদ্ধ শুরু হয়ে উভয় পক্ষে তুমুল লড়াই চলতে থাকে। খালিদ সামনের দিক থেকে পারস্যবাহিনীকে চেপে ধরেন। আর উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষারত খণ্ডবাহিনীও যথাসময়ে প্রচণ্ড বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে চোখে অন্ধকার দেখা পারস্যবাহিনী অল্পক্ষণেই পরাজিত হয়ে পালাতে থাকে। আন্দারজাগার তখন অল্পসংখ্যক সেনাসহ পালিয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু পথে তারা পিপাসার তীব্রতায় মারা পড়ে。
২. যুদ্ধ সমাপ্তির পর খালিদের ভাষণ যুদ্ধ সমাপ্তির পর খালিদ রা. তাঁর বাহিনীর উদ্দেশে তেজোদীপ্ত এক ভাষণ দেন। ভাষণে আরবের পরিবর্তে আজমের দিকে তাদের আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা চালান। তিনি বলছিলেন,
আমরা কি এখানে রকমারি খাদ্যদ্রব্যের বিপুল সমাহার দেখতে পাচ্ছি না? আল্লাহর শপথ, যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ এবং ইসলামের দিকে আহ্বান আমাদের ওপর ফরজ না-ও হতো, তবু বুদ্ধিমানের কাজ এটাই ছিল—আমরা এ ভূখণ্ড অর্জনের জন্য সর্বাত্মক প্রয়াস চালাই; আর ক্ষুধা-পিপাসা তাদের জন্য রেখে দিই, যারা আমাদের সঙ্গে বেরোতে রাজি নয়।
খালিদ রা. গনিমতের পাঁচ ভাগের চার অংশ মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করে এক অংশ মদিনায় আবু বকরের কাছে পাঠিয়ে দেন। এরপর বিদ্রোহী লড়াইকারীদের পরিবার-পরিজনদের বন্দি করে কৃষকদের ওপর জিজয়া-কর আবশ্যক করেন。
খালিদের ভাষণ থেকে এটাই স্পষ্ট হয় যে, আরবরা ছিল অন্ধকারে। তারা পরকালের ব্যাপারে ছিল অজ্ঞ। আর পারস্পরিক ঝগড়ার কারণে পার্থিব সমৃদ্ধি অর্জনেও অন্যান্য জাতি থেকে পিছিয়ে ছিল। খালিদ রা. মূলত এ কথাই বলতে চেয়েছিলেন- 'আমরা পরকালপ্রত্যাশী। আমরা একটা মহান উদ্দেশ্য নিয়ে দাঁড়িয়েছি। এর দিকে মানুষকে আহ্বান জানাচ্ছি। এই লক্ষ্যেই জিহাদ চালিয়ে যাচ্ছি। যদি মেনেও নিই, এ মহান উদ্দেশ্য আমাদের মৌলিক উদ্দেশ্য নয়, তথাপি বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে, অন্তত পার্থিব জীবনমান সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে এখানে যুদ্ধ করি।' খালিদের এ কথার উদ্দেশ্য কখনোই মহান উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পদ অর্জনকে মিলিয়ে ফেলা ছিল না; বরং তিনি একে কল্পনাগত অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করছিলেন। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, যখন বিবেকের চাহিদায় আমরা জাগতিক জীবনের সমৃদ্ধির লক্ষ্যে এখানে যুদ্ধ করতে পারি, তাহলে পরকালের কল্যাণের জন্য কেন করব না?
এ ধরনের কথায় সাধারণত সাহস বৃদ্ধি পায়। সংকল্প দৃঢ় হয়। চেতনার স্ফুরণ ঘটে। শক্তি উছলে ওঠে। এ কারণেই মুমিনরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য নিজেদের পুরো শক্তিসামর্থ্য ও জিনিসপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়。
৩. ওয়ালজাযুদ্ধে খালিদের বীরত্ব এক বর্ণনামতে, খালিদ রা. এই যুদ্ধে এমন ব্যক্তির মোকাবিলায় দ্বৈতযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন, যাকে হাজার মানুষের সমান শক্তিধর মনে করা হতো; কিন্তু তিনি তাকে হত্যা করতে সমর্থ হন। তাকে হত্যার পর তার গায়ে হেলান দিয়ে নিজের জন্য খাদ্য চেয়ে পাঠান। কাজটা মূলত পারসিকদের অপমানিত করতে করেছিলেন। এর দ্বারা তাদের অহংকার ও দম্ভ চূর্ণ করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য。
টিকাঃ
৩০০ আল-কামিল, ইবনু আসির: ২/৫২; আবু বাকরিনিস সিদ্দিক রা., খালিদ আল জুনাবি: ৪৮।
৩০৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩৫০。
৩০৫ আত-তারিখুল ইসলামি: ১/১৩৯।
৩০৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩৫০।
৩০৭ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৩৮।
📄 উল্লাইসযুদ্ধ ও আমগিশিয়া
এ যুদ্ধে কতিপয় আরব খ্রিষ্টান মুসলিমদের বিরুদ্ধে পারসিকদের সহায়তা করে। এদের নেতা ছিল আবদুল আসওয়াদ আজালি; আর পারসিকদের নেতা ছিল জাবান। তাকে বাহমান জাদবিয়া এই নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল, সে যেন আগে আক্রমণে না যায়। খালিদ রা. আরব খ্রিষ্টান ও হিরার পার্শ্ববর্তী অমুসলিম আরবদের সেনাসমাবেশের সংবাদ পেয়েই তাদের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। তিনি তাদের ওপর হামলার মনস্থ করেছিলেন; কিন্তু তারা যে পারস্যবাসীর সহযোগী হয়ে গেছে, বিষয়টা জানতে পারেননি।
১. 'যতক্ষণ-না ওদের রক্তের নদী প্রবাহিত হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা নিবৃত্ত হব না'
মুসলিমবাহিনী সেখানে পৌঁছার পর জাবান তার বাহিনীকে তাঁদের ওপর চড়াও হওয়ার নির্দেশ দেয়; কিন্তু তারা খালিদকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। খালিদ রা. তাদের খাবারের সুযোগ না দিলে তুমুল যুদ্ধ বেঁধে যায়। শত্রুরা উদ্দীপ্ত হয়ে লড়াই করার কারণ ছিল—তারা আশা করছিল, বাহমান জাদবিয়া বিশাল বাহিনী নিয়ে তাদের সহায়তায় আসছে। মুসলিমরাও দৃঢ়পায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। খালিদ তখন শপথ করে বলেন, 'আল্লাহ, আপনি যদি ওদের বাহুগুলো আমাদের কবজায় দিয়ে দেন, তাহলে যতক্ষণ-না ওদের রক্তের নদী প্রবাহিত হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা নিবৃত্ত হব না।'
লড়াইয়ে আল্লাহ মুসলিমদের বিজয় দান করেন। তাদের বাহুগুলো মুসলিমদের কবজায় চলে আসে। খালিদ রা. ঘোষণা দেন, 'ওদের বন্দি করো, বন্দি করো। শুধু তাকেই হত্যা করো, যে বাধা সৃষ্টি করে।' অশ্বারোহীরা দলে দলে লোকদের হাঁকিয়ে নিয়ে আসছিল। তিনি কয়েকজনকে এই দায়িত্বে নিযুক্ত করে রেখেছিলেন, যাতে তারা ওদের গর্দানগুলো উড়িয়ে নদীতে ফেলে দেয়। এক দিন ও এক রাত এমন করেই কেটে যায়। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনেও যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। একপর্যায়ে ধাওয়া করতে করতে তারা নাহরাইন পর্যন্ত পৌঁছে যান। আর একই দূরত্বে অবস্থিত উল্লাইসের চারদিকে তাদের হত্যা করা হতে থাকেন।
২. খালিদের শপথ পূরণ এমতাবস্থায় কা'কা রা. খালিদের কাছে এসে বলেন, 'আপনি যদি পৃথিবীর সমুদয় মানুষকে এখানে এনে হত্যা করেন, তবু এখানে রক্তের ধারা প্রবাহিত হবে না, যতক্ষণ-না নদীকে প্রবাহিত হওয়া থেকে এবং ভূমিকে রক্ত চুষে নেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারছেন। ওদের রক্ত জমাটবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। অতএব, আপনি শপথ পূরণ করতে চাইলে ওদের রক্তের ওপর পানি ছড়িয়ে দিন।' কা'কার পরামর্শে খালিদ তা-ই করেন। শপথ পূর্ণ করার নিমিত্তে নদীতে তিনি যে বাঁধ দিয়ে দিয়েছিলেন, বিজয়ের পর তা পুনরায় খুলে দেন। ফলে নদী দিয়ে তাজা রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে। এ কারণেই ওই নদীর নাম হয় নাহরুদ-দাম বা 'রক্তনদী'।
শত্রুবাহিনী পরাস্ত হয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর মুসলিমবাহিনী তাদের পশ্চাদ্ধাবন করা থেকে নিবৃত্ত হয়। এরপর তাদের শিবিরে প্রবেশ করে। খালিদ রা. তখন খাবারের পাশে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, 'আমি তোমাদের ইচ্ছামতো এই খাবার খাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি।' এরপর বলেন, 'রাসুল যখন পাকানো খাবারের কাছে যেতেন, তখন তা লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন।' তখন মুসলিমরা বিকালের খাবারের জন্য বসে পড়েন। যারা ইতিপূর্বে পাতলা রুটির কথা জানতেন না, জিজ্ঞেস করেন- 'এই পাতলা সাদা বস্তুগুলো কী?' যারা জানতেন তারা একটু কৌতুক করে বলেন, 'আপনারা কি রাকিকুল আইশের (সমৃদ্ধি) কথা জানেন না?' তারা বলেন, 'হ্যাঁ।' তারা বলেন, 'এটা সেই বস্তু।' এ জন্যই এই রুটির নাম পড়ে যায় 'রুকাক' মানে পাতলা রুটি। আরবরা ইতিপূর্বে একে কুরি বলত。
খালিদ রা. উল্লাইস থেকে অবসর হওয়ার পর আমগিশায়া যান। সেখানকার লোকজন জায়গাটা খালি করে সুওয়াইদ এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল। তিনি সেখানে পৌঁছে শহরটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। মুসলিমরা সেখানে এত বেশি গনিমত লাভ করেন, যা ইতিপূর্বে কোথাও তাঁরা অর্জন করেননি। প্রত্যেক অশ্বারোহী এখানে দেড় হাজার করে দিরহাম পান। এটা ছিল সেই সম্পদ ছাড়া, যা উত্তম কাজের পুরস্কারস্বরূপ দেওয়া হয়েছিল। মদিনায় খলিফার দরবারে এখানকার গনিমতের এক-পঞ্চমাংশসহ বিজয়ের সংবাদ পৌঁছলে খালিদসহ মুসলিমদের অসাধারণ বীরত্বের ওপর আনন্দ প্রকাশ করে খলিফা বলে ওঠেন, 'হে কুরাইশ, তোমাদের সিংহ শত্রুর সিংহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে! সে তার ওপর বিজয়ী হয়ে তার শরীরের মাংস ছিঁড়ে নিচ্ছে! নারীরা কি খালিদের মতো সন্তান জন্মাতে অক্ষম হয়ে গেছে?'
খালিদ রা. বিজয়ের সংবাদটি বনু আজালের একজনের মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একজন ঝানু বাহাদুর এবং রাস্তাঘাট সম্পর্কে সম্যক অবহিত। উল্লাইসের বিজয়, গনিমতের সম্পদের পরিমাণ, বন্দিদের সংখ্যা, খুমুসের অংশ, উত্তম কর্মসম্পাদনকারীদের পুরস্কার, সবকিছু সম্পর্কে তিনি তাঁকে অবহিত করেন। সংবাদবাহক খলিফার দরবারে গেলে তিনি তাঁর বাহাদুরি ও সংবাদপ্রদানের যথাযথ পদ্ধতি অনুধাবন করে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, 'তোমার নাম কী?' তিনি বলেন, 'জান্দাল।' আবু বকর বলেন, 'বেশ উত্তম।'
ইসামের সত্তা ইসামকে সরদার বানিয়ে দিয়েছে এবং তাকে পার্শ্বপরিবর্তন ও সামনে এগোতে অভ্যস্ত বানিয়েছে।
আবু বকর রা. খুশি হয়ে জান্দালকে কয়েদিদের থেকে একটা দাসী উপহার দেন। ওই দাসীর গর্ভে তাঁর এক সন্তান হয়েছিল।
৩. 'হে কুরাইশ, তোমাদের সিংহ শত্রুর সিংহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে!'
খালিদ রা. সম্পর্কে আবু বকর সিদ্দিকের উক্তি— ‘হে কুরাইশ, তোমাদের সিংহ শত্রুর সিংহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে! সে তার ওপর বিজয়ী হয়ে তার শরীরের মাংস ছিঁড়ে নিচ্ছে! নারীরা কি খালিদের মতো সন্তান জন্মাতে অক্ষম হয়ে গেছে?’ এটা মূলত খালিদের আভিজাত্য ও বিশাল খিদমতের স্বীকৃতি। এ ছাড়া এটা বিপন্ন মুহূর্তে উত্তম কৃতিত্ব প্রদর্শন, অসীম সাহস এবং মর্যাদাদানের প্রচেষ্টা। এর মাধ্যমে দুর্বলচিত্তদের অনুরূপ দুঃসাহসী ভূমিকা রাখার প্রতি উদ্দীপ্ত করাও উদ্দেশ্য ছিল, যাতে তাঁরা উদ্দীপ্ত হয়ে একজন অপরজন থেকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা করে。
আবু বকর রা. মানুষ চেনায় পারদর্শী ছিলেন। তাঁর মুখ দিয়ে খালিদের প্রশংসায় এমন কথা বের হওয়া ছিল তাঁর জন্য বড় এক সম্মান ও স্বীকৃতি। ইসলামে এই সম্মান কেবল তিনিই অর্জন করতে পেরেছিলেন। খলিফায়ে আজম আবু বকর রা. দক্ষতা, বীরত্ব ও দুঃসাহসে কাউকে খালিদের সমকক্ষ মনে করতেন না। বাহাদুরি ও যোগ্যতায় তাঁর সমকক্ষ দ্বিতীয় কেউ ছিলেন বলে বিশ্বাস করতেন না। খালিদের প্রতি আবু বকরের এই মনোভাব রাখাই তাঁর জন্য যথেষ্ট ছিল。
টিকাঃ
৩০৮ তারিখুত তাবারি: ৪/১৭৩。
৩০৯ প্রাগুক্ত: ৪/১৭৪-১৭৫।
৩১০ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৪৪।
৩১১ খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ২১৬।
📄 হিরা বিজয়
১. হিরা অভিমুখে খালিদের যাত্রা
হিরার শাসক আমগিশায়া র সংবাদ পেলে তার বিশ্বাস জন্মায় যে, এবার অবশ্যই খালিদ হিরার দিকে ছুটে আসবেন। তাই সে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তার ছেলের নেতৃত্বে একটা অগ্রবর্তী বাহিনী পাঠিয়ে পেছনে পেছনে নিজেও এগিয়ে আসতে থাকে। হিরা-অধিপতি তার ছেলেকে বলে দিয়েছিল, 'তুমি প্রথমেই ফুরাতের স্রোতোধারা বন্ধ করে দেবে। এতে মুসলিমদের হাতে থাকা নৌকাগুলো অকেজো হয়ে পড়বে।' ছেলে পিতার নির্দেশ বাস্তবায়ন করলে মুসলিমরা আচমকা সমস্যার মুখোমুখি হয়ে পড়েন। তাঁরা এ অবস্থায় বিচলিত হয়ে স্থানীয় কৃষকদের কাছে বাঁধ খুলে দেওয়ার কথা বলেন, যাতে তারা ও মুসলিমরা উভয়ই নদীর স্রোতোধারা থেকে উপকৃত হতে পারেন।
এই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে খালিদ রা. কতিপয় অশ্বারোহীকে নিয়ে হিরার শাসকের ছেলের বাহিনী অভিমুখে ছুটে যাচ্ছিলেন। পথে ওদের কতিপয় অশ্বারোহীর সাক্ষাৎ পেলে তাদের মৃত্যুর ঘুম পাড়িয়ে রেখে যান। হিরা-অধিপতির কাছে সংবাদটা পৌঁছার আগেই তিনি আরও এগিয়ে যান। ফুরাতের তীরে হিরার শাসক-তনয়ের বিরুদ্ধে তাঁর তুমুল লড়াই হয়। তাদের পরাজিত করে ফুরাতের বাঁধ খুলে দেন। এতে নদীতে পানিপ্রবাহ শুরু হয়। খালিদ রা. তখন তাঁর সেনাদলকে ডেকে হিরা অভিমুখে এগিয়ে যেতে থাকেন। হিরার শাসক একইসঙ্গে তার পুত্র ও সম্রাট আরদাশিরের মৃত্যুসংবাদ সম্পর্কে অবহিত হলে ভয়ে ফুরাত পাড়ি দিয়ে পালাতে থাকে। সে আর আক্রমণের দুঃসাহস দেখাতে পারেনি। সংবাদটা জানতে পেরে খালিদ সেখানেই তাঁর বাহিনীকে থামিয়ে দেন। হিরার লোকজন তখন দুর্গে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল।
২. হিরা অবরোধে খালিদের পরিকল্পনা খালিদ রা. নিম্নোক্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরো হিরা শহর অবরোধ করে রাখেন :
• জিরার ইবনুল আজওয়ারকে 'কাসরে আবইয়াজ' অবরোধের জন্য নিযুক্ত করেন। সেখানে ইয়াস ইবনু কাবিসা আশ্রয় নিয়েছিল।
• জিরার ইবনুল খাত্তাবকে 'কাসরে আদাসিয়িন' অবরোধের দায়িত্ব দেন। সেখানে আদি ইবনু আদি আল আব্বাদি আশ্রয় নিয়েছিল।
• জিরার ইবনু মুকাররিনকে 'কাসরে বনি মাজিন' অবরোধে নিযুক্ত করেন। সেখানে ইবনু কামাল আশ্রিত ছিল।
• মুসান্না ইবনুল হারিসাকে নিযুক্ত করেন 'কাসরে ইবনু বাকিলা' অবরোধের জন্য। সেখানে আমর ইবনু আবদিল মাসিহ অবরুদ্ধ ছিল।
খালিদ রা. তাঁর আমিরদের নামে ফরমান জারি করেন, তাঁরা যেন প্রথমে লোকজনকে ইসলামের দিকে আহ্বান করে। যদি তারা ইসলামগ্রহণ করে, তাহলে যেন তাদের নিরাপত্তা দেওয়া হয়; অস্বীকার করলে মাত্র এক দিনের সুযোগ দেওয়া হয়। আমিরদের আরও নির্দেশ দেন, 'সাবধান, শত্রুকে অহেতুক অবকাশ দেবে না। তাদের বিরুদ্ধে টানা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। মুজাহিদবাহিনীকে ওদের বিরুদ্ধে লড়তে বাধা দেবে না।'
৩. অবরুদ্ধ হিরাবাসীর সন্ধিপ্রস্তাব কিন্তু সেখানকার অবরুদ্ধ শত্রুরা আত্মসমর্পণ না করে মোকাবিলায় নেমে আসে। তারা মুসলিমবাহিনীর দিকে পাথর ছুড়তে থাকে। মুসলিমরা পাথরের জবাবে তির ছুঁড়তে থাকেন। এরপর প্রচন্ড হামলা চালিয়ে মহল ও দুর্গগুলো দখল করেন। পাদরিরা তখন চিৎকার দিয়ে বলছিল, 'হে মহলবাসী, তোমরা ছাড়া যেন অন্য কেউ আমাদের হত্যা করতে না পারে।' মহলবাসী চিৎকার দিয়ে বলে, 'হে আরববাসী, আমরা তো তোমাদের তিনটা শর্তের একটা মেনে নিয়েছি। অতএব, তোমরা হত্যাযজ্ঞ থামাতে পারো।' এ কথা বলে তারা বেরিয়ে আসে। খালিদ রা. প্রত্যেক মহলবাসীর সঙ্গে পৃথকভাবে বসেন। তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য তিরস্কার করেন। তারা জিজিয়া-কর দেওয়ার শর্তে তাঁর সঙ্গে সন্ধি করে। এরপর বার্ষিক ১ লাখ ৯০ হাজার দিরহাম জিজিয়া সাব্যস্ত করা হয়। খালিদ রা. বিজয়ের সুসংবাদসহ তাদের পক্ষ থেকে সন্তুষ্ট চিত্তে দেওয়া উপহারসামগ্রী আবু বকরের দরবারে পাঠিয়ে দেন।
আবু বকর রা. সেগুলো গ্রহণ করে তা জিজিয়ার মধ্যে যুক্ত করেন। আর ইসলামি শরিয়ত তাদের সঙ্গে যা করতে নিষেধ করেছে, তিনি জিজিয়াকে কেবল সে নিষেধাজ্ঞার রক্ষাকবচ সাব্যস্ত করেছেন। পারসিক বাহিনীর অভ্যাস ছিল, তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার পরও সম্পদ আত্মসাতের জন্য নানা ধরনের বাহানা খুঁজত। আবু বকর রা. মুসলিমবাহিনীকে ওদের অনুসরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন。
৪. অঙ্গীকারনামা খালিদ রা. হিরাবাসীর জন্য যে অঙ্গীকারনামা লিখিয়েছিলেন, তা নিম্নরূপ :
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। এই অঙ্গীকারনামা খালিদ ও আদি, আমর ইবনু আদি, আমর ইবনু আবদিল মাসিহ, ইয়াস ইবনু কাবিসা ও হিরি ইবনু আকালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত।
এরা হিরাবাসীর সরদার। হিরাবাসী এই সন্ধিতে রাজি। তাদের এই নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে যে, তারা নিজেদের নিরাপত্তার লক্ষ্যে প্রতিবছর ১ লাখ ৯০ হাজার দিরহাম খিলাফতের কোষাগারে জমা দেবে। জাগতিক সম্পদ যাদের হাতে থাকবে, তারা পাদরি হোক কিংবা যাজক, এই সন্ধির আওতায় আসবে। তবে যাদের কাছে কোনো সম্পদ নেই, যারা দুনিয়ার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না, তারা এর বাইরে এবং তারা নিরাপদ থাকবে। যদি তাদের নিরাপত্তার কোনো প্রয়োজন না থাকে, তাহলে তাদেরও কোনো প্রকার জিজিয়া দিতে হবে না; কিন্তু কথা বা কাজের মাধ্যমে কোনো প্রকার বিশ্বাসঘাতকতা বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে তারা এই প্রতিশ্রুতির আওতায় পড়বে না।
অঙ্গীকারনামাটি ১২ হিজরির রবিউল আউয়ালে লেখা হয়েছিল।
এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, খালিদ রা. হিরাবাসীকে তিনটা বিষয়ের যেকোনো একটা গ্রহণের অধিকার দিয়েছিলেন :
১. ইসলামগ্রহণ করে নাও, এতে তোমরা সেই অধিকার ভোগ করবে, যে অধিকার ভোগ করে থাকি আমরা। তোমাদের ওপর তখন সেই দায়িত্ব আরোপিত হবে, যে দায়িত্ব আরোপিত হয় আমাদের ওপর। চাইলে তোমরা এখানে থাকতে পারো অথবা অন্য কোথাও চলে যেতে পারবে।
২. অথবা নিজেদের দীনে অটল থেকে জিজয়া প্রদানে রাজি হয়ে যাও।
৩. প্রথম দুটির কোনো একটাতে রাজি না হলে মোকাবিলা বা যুদ্ধের পথ রয়েছে। এর মাধ্যমেই মীমাংসা হবে।
আল্লাহর শপথ, আমি এমন লোকদের নিয়ে এখানে এসেছি, যাদের কাছে মৃত্যু এতটাই কাম্য, যতটা কাম্য তোমাদের কাছে তোমাদের জীবন।
কিন্তু তারা ইসলামগ্রহণ না করে জিজয়া আদায়ে সম্মত হলে খালিদ তাদের বলেন, 'তোমাদের ধ্বংস হোক। কুফর তো একটা ভ্রান্তির ময়দান। আরবদের মধ্যে কুফর ধারণকারীরাই সবচেয়ে বেশি নির্বোধ।
৫. রাসুলের সুন্নাত প্রতিষ্ঠায় সাহাবিদের অদম্য আগ্রহ
খালিদের এই বক্তব্য থেকে ইমানের যে ঝলক প্রত্যক্ষ করা যায়, এই গুণগুলো ইরাকবিজয়ী প্রত্যেক সেনার মধ্যে ছিল। এ বাহিনী মহান একটা লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল। তাঁরা মানুষকে ইসলামে দীক্ষিত করে সত্যের পথে নিয়ে আসার প্রবল আকাঙ্ক্ষা লালন করতেন। রাষ্ট্র সম্প্রসারণ, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, পার্থিব সমৃদ্ধি উপভোগ করা মোটেই তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না। এসব বিজয়াভিযানের মহান সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ভাষ্য ছিল—যুদ্ধে মুসলিমদের ধারাবাহিক বিজয়ের মূল নিয়ামক হচ্ছে শাহাদাতের প্রতি অদম্য আগ্রহ, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন আর পরকালীন নিয়ামতে সমৃদ্ধ হওয়ার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা।
সাহাবিরা রাসুলের সুন্নাত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অদম্য আগ্রহী ছিলেন, খালিদের বক্তব্যই এর স্পষ্ট প্রমাণ। তাঁদের অন্তর ছিল মানুষকে হিদায়াতের দ্বারা সমৃদ্ধ করার বাসনায় পূর্ণ। তাই কুফরে অটল থেকে জিজয়া প্রদানে তারা সম্মত হলে খালিদ রা. সন্তুষ্ট হতে না পেরে তাদের তিরস্কার করেন; অথচ জিজয়া আদায়ের মাধ্যমে মুসলিমদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসবে, এটা তিনি জানতেন। কিন্তু খালিদ তো ছিলেন এমন এক জাতির অন্যতম কর্ণধার, যাঁদের দৃষ্টিতে দুনিয়ার কোনো মূল্য ছিল না, যাঁরা দুনিয়ার ওপর আখিরাতকে প্রাধান্য দিতেন। রাসুল তাঁদের জন্য উন্নত মূলনীতি নির্ধারণপূর্বক বলেছিলেন,
আল্লাহ যদি তোমাদের মাধ্যমে তাঁর একজন বান্দাকেও হিদায়াত দেন, তাহলে এটা তোমাদের জন্য লাল উট থেকেও উত্তম।
আবু বকর রা. হিরাবাসীর হাদিয়া গ্রহণ করেছিলেন। এ হাদিয়া তারা সন্তুষ্ট চিত্তেই প্রদান করেছিল। এরপর এই ভয় করেন যে, কী জানি এটা জিম্মিদের ওপর জুলুম হয়ে যায় কি না, এ জন্য এগুলো তিনি জিজয়ার মধ্যে যুক্ত করেন। তাঁর এই পদক্ষেপের মধ্যে ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অতুলনীয় এক শিক্ষা। আলি তানতাবি ইসলামি বিজয়াভিযান এবং ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করতে গিয়ে কবির এই পঙ্ক্তিগুলো তুলে ধরেছেন,
আমরা সাম্রাজ্য পেলে ন্যায়বিচার বানিয়েছি আমাদের নীতি; কিন্তু তোমাদের কাছে ক্ষমতা গেলে তোমরা বইয়েছ রক্তনদী। তোমরা আমাদের হাতে এলে আমরা সুবিচার করেছি, তোমাদের বন্দিদের অনুগ্রহ করেছি, ক্ষমা করে দিয়েছি; আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এই ব্যবধানই যথেষ্ট। প্রত্যেক ভদ্রজনের পাত্র থেকে তা-ই টপকায়, যা তাতে থাকে。
৬. হিরা : ইসলামি সেনাবাহিনীর কেন্দ্র
হিরা বিজয় ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি সামরিক কৃতিত্ব। এর ফলে পারস্যের ব্যাপারে মুসলিমদের আশা-আকাঙ্ক্ষায় ডালপালা মেলতে থাকে। ইরাক ও পারস্যের জন্য এই শহরের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তাই শহরটাকে মুসলিম সেনাপ্রধান তাঁর কেন্দ্র তথা রাজধানী বানিয়ে নেন। এখান থেকেই অভিযানে বেরোনো, যোগাযোগ স্থাপন, সাহায্য পাঠানো, বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা প্রদান, বন্দিদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ রাজনৈতিক বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পাদন করতেন। এখান থেকেই খালিদ রা. খারাজ ও জিজয়া আদায়ের জন্য বিভিন্ন প্রদেশে কর্মকর্তা পাঠাতেন। এখান থেকেই সীমান্তের নিরাপত্তার লক্ষ্যে আমির নির্ধারণ করে পাঠাতেন। এরপর নিজে এখানে কিছুদিন অবস্থান করে নাগরিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দেন। জায়গিরদার ও সরদারদের কাছে সংবাদ পৌঁছলে তারা তাঁর সঙ্গে সন্ধি করতে এগিয়ে আসে। তখন ইরাকের আশপাশে এমন কোনো সম্প্রদায় ছিল না, যারা মুসলিমদের সঙ্গে সন্ধি করেনি।
৭. পারস্যের সর্বসাধারণের উদ্দেশে খালিদের পত্রাবলি
যখন ইরাকের আবহাওয়া ঠিক হয়ে আসে, দিজলা ও হিরার মধ্যবর্তী ভূখণ্ড থেকে পারসিক শাসনের বিলুপ্তি ঘটে, পেছন থেকে হামলার আর কোনো সন্দেহ থাকেনি, তখন খালিদ রা. সরাসরি ইরানের ওপর হামলার সংকল্প করেন। কিসরা আরদাশির মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের অবস্থা এমনিতেই নাজুক ছিল। তদুপরি তার স্থলাভিষিক্ত নির্ধারণ নিয়ে শুরু হয়েছিল চরম অন্তর্দ্বন্দ্ব। এই সুযোগ কাজে লাগাতে তিনি সেখানকার বিশেষ লোকদের উদ্দেশে এই মর্মে চিঠি পাঠান,
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পক্ষ থেকে পারস্যের বাদশাহদের নামে।
হামদ ও সালাতের পর,
যাবতীয় প্রশংসা শুধু আল্লাহর, যিনি তোমাদের শাসনশৃঙ্খলা ভেঙে দিয়েছেন। তোমাদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছেন। তোমাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে তোমাদের শক্তিকে হ্রাস পাইয়ে দিয়েছেন। তোমাদের সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছেন। তোমাদের বিজয় ও সম্মানকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। অতএব, তোমাদের কাছে আমার এই চিঠি পৌঁছামাত্র ইসলামগ্রহণ করে নেবে, তাহলে তোমরা নিরাপদ হয়ে যাবে। অথবা জিজয়া-কর প্রদানে রাজি হয়ে যাবে। অন্যথায় আল্লাহর শপথ, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, আমি এমন এক বাহিনী নিয়ে তোমাদের কাছে চলে আসব, যারা মৃত্যুকে এতটাই ভালোবাসে, তোমরা জীবনকে যতটা ভালোবাসো। তারা পরকালের ব্যাপারে এতটা আগ্রহী, যতটা আগ্রহী তোমরা দুনিয়ার প্রতি।
আর তাদের সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর চিঠির ভাষ্য ছিল,
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পক্ষ থেকে পারস্যের আমিরদের নামে।
সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তোমাদের শাসনক্ষমতা ধ্বংস করে দিয়েছেন। তোমাদের মধ্যে মতবিরোধের জন্ম দিয়েছেন। তোমাদের শক্তি দুর্বল করে দিয়েছেন। সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছেন। তোমাদের বিজয় ও সম্মান মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। যখন আমার এই চিঠি তোমাদের হস্তগত হবে, তখন যদি তোমরা ইসলামগ্রহণ করে নাও, তবে নিরাপদ হয়ে যাবে। অথবা জিজয়া-কর প্রদানে রাজি হয়ে যাবে। অন্যথায় আল্লাহর শপথ, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, আমি এমন এক বাহিনী নিয়ে তোমাদের কাছে চলে আসব, যারা মৃত্যুকে এতটাই ভালোবাসে, জীবনকে তোমরা যতটা ভালোবাসো। তারা পরকালের ব্যাপারে এতটা আগ্রহী, যতটা আগ্রহী তোমরা দুনিয়ার প্রতি。
হিরা বিজয়ের পরে শহরটাকে ইসলামি সাম্রাজ্যের অধীন করার মাধ্যমে আবু বকরের অর্ধেক আশা পূর্ণতা পেয়েছিল। আর এটা ছিল সরাসরি ইরানের ওপর হামলার পূর্বাভাস। এ ক্ষেত্রে খালিদ রা. তাঁর দায়িত্ব পূর্ণমাত্রায় আদায় করেন। তিনি অল্পদিনেই হিরায় পৌঁছে যান। ইরাকের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১২ হিজরির মুহাররাম থেকে কাজিমার যুদ্ধের মাধ্যমে। আর একই বছর তিনি হিরা বিজয় সমাপ্ত করেন。
৮. হিরা বিজয়কালে খালিদ থেকে প্রকাশিত কারামত ইমাম তাবারি রাহ. তাঁর নিজের সনদে বর্ণনা করেন; ইবনু বুকায়লার (আমর ইবনু আবদিল মাসিহ) সঙ্গে এক খাদিম ছিল। তার কোমরে একটা থলে ঝোলানো ছিল। খালিদ রা. থলেটা তার হাত থেকে নিয়ে তাতে যা ছিল, তা নিজ হাতুলিতে রেখে আমরকে জিজ্ঞেস করেন, 'আমর, এগুলো কী?' সে বলে, 'আল্লাহর শপথ, এটা তাৎক্ষণিক ক্রিয়া করে এমন তীব্র বিষ।' জিজ্ঞেস করেন, 'এভাবে এ বিষ লুকিয়ে রাখার কারণ কী?' আমর বলে, 'আমার ভয় ছিল, যদি আপনাদের আমার ধারণার বাইরে পাই; আর আমার কারণে আমার গোত্র ও বস্তিবাসীকে কোনো খারাপ অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়, তখন বেঁচে থাকার চেয়ে আমার কাছে মরে যাওয়াটাই হবে প্রিয়।' খালিদ বলেন, 'কোনো প্রাণ ততক্ষণ পর্যন্ত মরতে পারে না, যতক্ষণ-না তার নির্ধারিত মৃত্যুকাল আসে।' এরপর তিনি বিষ তাঁর হাতে রেখেই বলেন, 'শুরু করছি আল্লাহর নামে, যিনি উত্তম নামের অধিকারী, যিনি আসমান ও জমিনের রব, যাঁর নামের সঙ্গে কোনো রোগ ক্ষতি পৌঁছাতে পারে না। তিনি দয়াময়, পরম দয়ালু।'
লোকজন ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে বিরত রাখতে চাচ্ছিল; কিন্তু ততক্ষণে তিনি বিষ গিলে ফেলেছেন। এ অবস্থা দেখে আমর বলে ওঠে, 'আল্লাহর শপথ হে আরববাসী, তোমাদের একটা লোকও যদি থাকে, তাহলে তোমরা নিজেদের ইচ্ছামতো সবকিছুর মালিক বনে যাবে!' এরপর হিরাবাসীকে বলে, 'আজকের মতো উজ্জ্বল দিন আমি কখনো দেখিনি。
হাফিজ ইবনু কাসির রাহ. বর্ণনাটি উল্লেখ করছেন; অথচ একে দুর্বল আখ্যা দেননি। হাফিজ ইবনু হাজার রাহ.-ও বর্ণনাটি উদ্ধৃত করে বলেছেন, 'এটি আবু ইয়ালা বর্ণনা করেছেন।' এ ছাড়া ইবনু সাআদ রাহ. বর্ণনাটি অন্য সূত্রে উল্লেখ করেছেন; কিন্তু কেউ-ই একে দুর্বল আখ্যা দেননি। আল্লামা ইবনু তাইমিয়া রাহ.-ও কারামাতের আলোচনার বর্ণনাটি আলোচনা করেছেন。
কিন্তু সমকালের কতিপয় লেখক এ কারামত অস্বীকার করে থাকেন। তারা একে কয়েকজন বর্ণনাকারীর মনগড়া বর্ণনা আখ্যা দেন; অথচ বর্ণনাটি সনদের দিক দিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত। তাবারি, ইবনু সাআদ, ইবনু কাসির ও ইবনু তাইমিয়ার মতো লোকজন তাতে কোনো প্রশ্ন তোলেননি। তবে কেউ কেউ সনদটিকে দুর্বল আখ্যা দিলেও মূল কাহিনি নিয়ে কোনো কথা বলেননি। অবশ্যই তাঁরা সমকালের লেখকদের থেকে বেশি জ্ঞানী ও অধিক ন্যায়পরায়ণ ছিলেন।
খালিদ রা. যখন বিষ পান করছিলেন, তখন তিনি ইমান ও বিশ্বাসের শীর্ষে অবস্থান করছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আল্লাহই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। একেক বস্তুতে একেক বিশেষত্ব মূলত তাঁরই দান। তিনি চাইলে যেকোনো সময় বস্তু থেকে সেই বিশেষত্ব উঠিয়ে নিতে পারেন। যেভাবে ইবরাহিম আ.-কে আগুনে ছুড়ে ফেলা হলে আল্লাহ আগুনের বৈশিষ্ট্য দূর করে আগুনকে শীতল ও আরামদায়ক বানিয়ে দিয়েছিলেন। এমন ঘটনা তো নবিগণ ছাড়া অনেক অলির সঙ্গেও ঘটেছে। যেমন: আবু মুসলিম খাওলানিকে যখন মুসায়লিমাতুল কাজ্জাব আগুনে ছুড়ে দেয়, তখন তিনি আগুনে থাকাবস্থায় সালাতে দাঁড়িয়ে যান। আগুন তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।
এখানে স্মর্তব্য যে, খালিদ রা. যখন বিষপান করেছিলেন, তখন তাঁর অন্তরে তিল পরিমাণ লৌকিকতা, খ্যাতির চাহিদা কিংবা সম্মান অর্জন অথবা প্রবৃত্তিপরায়ণতা ছিল না। তিনি জানতেন, এমন কিছু থাকলে তিনি আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত হবেন না। তাঁর কাছে বিষের প্রভাব দূর করার মতো কোনো শক্তিও ছিল না। এ ছিল এক বিরল অভিজ্ঞতা। তাই বলে বর্তমানে যদি কোনো মুসলমান এই লক্ষ্য নিয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তার কাছ থেকে এমন অভিজ্ঞতার বাস্তবায়ন ঘটানোর আবেদন করা যাবে না। কেননা, বর্তমানে কারও পক্ষে খালিদের বিশ্বাসের দৃঢ়তার পর্যায়ে উপনীত হওয়া অসম্ভব ব্যাপার。
হিরা বিজয় এবং খালিদ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা তথ্য হলো, খালিদ রা. হিরা জয়ের পর একই সালামে আট রাকআত সালাত আদায় করেছিলেন。
টিকাঃ
৩১২ অর্থাৎ, জিজিয়া দেওয়ার ফলে তাদের ওপর কোনো প্রকার জুলুম ও অন্যায় করা হবে না।
৩১৩ তারিখুদ দাওয়া ইলাল ইসলাম: ৩৪৮।
৩১৪ তারিখুত তাবারি: ৪/১৭৮।
৩১৫ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৪৮।
৩১৬ সহিহ বুখারি, মাগাজি: ৪২১০।
৩১৭ আবু বাকরিনিস সিদ্দিক, আলি তানতাবি: ৩৩।
৩১৮ খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন: ২২২১।
৩১৯ তারিখুত তাবারি: ৪/১৮৬।
৩২০ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৫০।
৩২১ তারিখুত তাবারি: ৪/১৮০।
৩২২ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৬/২৫১।
৩২৩ আল-ইসাবা, ইবনু হাজার ২/৩১৮, বর্ণনা: ২২০৬।
৩২৪ মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ১১/১৫৪।
৩২৫ আত-তারিখুল ইসলামি: ৯/১৫৩-১৫৪।
৩২৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩৫৩。